📄 ইংরেজদের যুগে হিন্দু ধর্ম (১৭০০- ১৯৫০ খ্রি)
ষোলশত শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ে বৃটেন থেকে ইংরেজরা ব্যবসার উদ্দেশ্যে উপমহাদেশে আসে। মোঘল সাম্রাজ্যের কিছু পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে বিভিন্ন শহরে তাদের কেন্দ্র স্থাপন করে। তখন থেকেই মোঘল সাম্রাজ্যের পতনের যুগ শুরু হয়ে যায়। সতেরো শতাব্দীতে মুসলমানদের পতন দেখে ইংরেজরা এখানের রাজনৈতিক বিষয়েও তৎপর হয়ে উঠে। এক সময় ব্যবসার নাম ধরে রাজনৈতিক চাল খাটিয়ে বাঙালকে ফ্রান্সিসরা নিজেদের অধিন করে নেয়। বাঙালের নেতাদেরকে পরাজিত করে এখানে ইংরজদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে একের পর এক প্রদেশ তাদের নিয়ন্ত্রণে আসতে থাকে। এবং পুরা ভারতবর্ষব্যাপী তাদের নেতৃত্বের প্রভাব বাড়তে থাকে। এমনকি আঠারো শতাব্দীর শেষের দিকে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন মুসলিম নবাব, রাজা ও নেতাদেরকে যুদ্ধের ময়দানে পরাজিত করে নিজেদের কর্তৃত্ব পুরা ভারত উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠিত করে। ইংরেজদের আমলে খ্রিস্টীয় ধর্ম প্রচারকরা স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে তাদের ধর্ম প্রচার করতে থাকে। তাদের প্রভাবে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষও পশ্চিমা চিন্তা-চেতনায় লালিত হতে থাকে। তখন অনেক হিন্দুরা নিজেদের ভেতরকার শ্রেণী-ভেদাভেদ প্রথায় অসন্তুষ্ট হয়ে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করে। খ্রিস্টবাদ প্রচারকদের জবাবে হিন্দুদের পক্ষ থেকে এমন অনেক ধর্ম প্রচারকগণও কাজ করতে থাকেন। যারা খ্রিস্টানদের উত্থাপিত আপত্তিগুলোর জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেন। এবং হিন্দুদেরকে পুনরায় তাদের প্রাচীন ধর্মের দিকে ফিরিয়ে আনেন। রাজা রাম মোহন রায় (১৭৭৪-১৮৩৩ খ্রি.), স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী (১৮২৪- ১৮৮৩ খ্রি.), ও মাহাত্ম্য গান্ধী (১৮৬৯- ১৯৮৪ খ্রি.)'র মতো এমন অনেক ধর্মীয় এবং সামাজিক নেতা সেই যুগে খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারকদের মোকাবেলা করেন। এবং হিন্দুদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের আগ্রহ জাগিয়ে তুলেন। তখন শুধু সমাজ পরিশুদ্ধির চেষ্টাই করা হয়নি; বরং হিন্দু ধর্মের নতুন গণ্ডি তৈরি করে, শিক্ষিত হিন্দুদের মাঝে তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করার আগ্রহ ও জাগরণ সৃষ্টি করা হয়। ইংরেজদের খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারকদের কারণে যে আগ্রহে ভাটা পড়েছিলো। এই চেষ্টা-প্রচেষ্টাকারীদের মধ্যে সবচে' গুরুত্বপূর্ণ হাত ছিলো স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী এবং তার পূর্ববর্তীদের।
📄 স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর আন্দোলন
স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী আর্য সমাজের ভিত্তি স্থাপন করেন। যেটি অনেক কম সময়ে ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের রূপ নেয়। স্বামীজি বেদ সমূহের নতুন ব্যাখ্যা গ্রন্থ লিখেন। এবং হিন্দু ধর্মের শেণীভেদ, মূর্তি পূজা ইত্যাদি অস্বীকার করে একত্ববাদের বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা চালান। তাদের প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিলো, স্বামীজি এবং তাঁর অনুসারীরা নিজেদের ধর্মের ভিত্তি সাইন্সের উপর প্রতিষ্ঠিত করেন। এবং হিন্দু ধর্মকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যা সাইন্সের সাথে পুরোপুরি ভাবে মিলে যায়। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁর অভিমতকে সাইন্সের চেয়েও অগ্রবর্তী মনে হয়; যদিও অতীতের সংস্কারকদের মতো তাওহিদ অর্থাৎ একত্ববাদ এবং মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে তার চেষ্টা খুব বেশি একটা ছিলো না। এর সাথে সাধারণ মানুষ এবং ধর্মীয় পণ্ডিতগণের বড় একটি সংখ্যা তার বিরোধিতা করে। কিন্তু তারা শ্রেণী-ভেদাভেদের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে কোরবানি (উৎসর্গ)সহ স্বামী দয়ানন্দ' র অন্যান্য পজেটিভ সংস্কৃতিকে সাধারণভাবেই গ্রহণ করে নেয়।
📄 নতুন হিন্দু ধর্ম, ১৯৫০ খৃস্টাব্দের পর
১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ ভাগ হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তান পৃথক দুটি দেশের সৃষ্টি হয়। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরই সেকুলারিজমের পথে চলতে শুরু করে। কিন্তু এই যুগে হিন্দু ধর্মকে পৃথিবীর সামনে যেভাবে বৈজ্ঞানিক এবং পবিত্র ধর্ম হিসেবে পেশ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, এর নমুনা অতীতের ইতিহাসে পাওয়া যায় না। হিন্দু পণ্ডিতরা এর পূর্বেই পশ্চিমা বিশ্বে তাদের ধর্মের তৎপরতা শুরু করে দিয়েছিলো৷ স্বাধীনতার পর তাদের কার্যক্রমে অনেক কিছু সংযুক্ত হয়। এবং এমন অনেক সংস্থা নিয়োগ দেয়া হয় যাদের উদ্দেশ্য ছিলো পশ্চিমা বিশ্বে হিন্দু ধর্মের প্রচার-প্রসার। এ উদ্দেশ্যে ইংরেজিতে হিন্দু ধর্ম প্রচারে বিভিন্ন টিমও গঠন করা হয়। যে ধারাবাহিকতা এখনো বিদ্যমান আছে। পাশাপাশি ভারতে হিন্দু ধর্মের প্রাচীন ভাষা সংস্কৃত সরকারি ভাষার স্বীকৃতি লাভ করে। এবং এ ভাষার প্রচার ও প্রসিদ্ধির জন্যে অনেক প্রতিষ্ঠান চালু হয়। হিন্দিতে আরবি এবং ফারসির ভালো প্রভাব আছে। কোথাও কোথাও অনেক শব্দ সংস্কৃত থেকে নির্গত হয়ে হিন্দি শব্দে রূপান্তরিত হয়। হিন্দিতে উর্দুর প্রভাবও অস্বীকার করার মতো নয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর হিন্দিতে উর্দুর প্রভাব কমিয়ে সংস্কৃত শব্দ সমূহের ব্যবহার বৃদ্ধি করা হয়।
হিন্দু ধর্মের শিক্ষা ও অনুভূতিকে জাগ্রত করার জন্যে টিভি সিরিয়ালের প্রভাবকেও ব্যবহার করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় সবচেয়ে' গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা ছিলো মহাভারত সিরিয়ালের প্রচার ও প্রসার। এতে মহাভারতের গল্পকে নতুন করে বিন্যস্ত পন্থায় উপস্থাপন করা হয়। এসব কিছুর উদ্দেশ্য ছিলো, হিন্দুদেরকে পুনরায় তাদের প্রাচীন সভ্যতা সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত করা।
📄 একাধিক দর্শন ও মতবাদের সমষ্টি
এ সকল কার্যকলাপ যেগুলো আমরা পর্যবেক্ষণ করলাম। এগুলোর উপর ভিত্তি করে আমরা বলতে পারি, বর্তমান হিন্দু ধর্ম কোনো নির্দিষ্ট সুন্দর দর্শন কিংবা জীবন পরিচালনার কোনো সুবিন্যস্ত নীতি ও সংবিধানের উপর নেই। বরং এটি বিভিন্ন দর্শন ও মতবাদের এমন গোঁজামিলের সমষ্টি, যেটার উদাহরণ পৃথিবীর কোথাও পাওয়া যাবে না। বর্তমানে এ ধর্ম এমন এক জোড়াতালি ও বিক্ষিপ্ত মতাদর্শের নাম যে, এর কোনো কুল-কিনারা, ভিত্তিই পাওয়া দুষ্কর।