📘 হিন্দু ধর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি > 📄 হিন্দু ধর্মের মাঝে পরিবর্তনসমূহ

📄 হিন্দু ধর্মের মাঝে পরিবর্তনসমূহ


এক সময় ধর্মীয় গুরুদের তত্ত্বাবধানে উপাসনা চলতো। তাদের কথায় মানুষ নিজেদের বিশ্বাসের ভিত গড়তো। তাদের কথাবার্তা ও দিকনির্দেশনার প্রভাবে সাধারণ মানুষ নিজেদের প্রাচীন প্রার্থনাগুলো ভুলে গিয়েছিল। যদিও মূর্তি পূজা এবং একাধিক উপাস্যের প্রথা প্রাচীনকালেও বিদ্যমান ছিলো; তবে, বৈদিকদের নিজস্ব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং সংস্কৃত ভাষার বিভিন্ন বিন্যাসের ফলে সনাতন ধর্মে ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে থাকে।
আনুমানিক ৫০০ খ্রিস্টপূর্বে বৈদিকদের জ্ঞান লাভের জন্যে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়। তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ছিলো ধর্মীয় সংস্কৃতির নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধর্মগ্রন্থ, সংস্কৃত শাস্ত্রীয় ব্যাকরণ, জ্যোতির্বিদ্যা, ছন্দশাস্ত্র ও অন্যান্য কিছু কিছু বিষয়। ধীরে ধীরে পরিবর্তন হয়ে এগুলোই মূলত বর্তমানের হিন্দু ধর্মের রূপ নেয়।

📘 হিন্দু ধর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি > 📄 বৌদ্ধ ধর্ম ও জৈন ধর্ম

📄 বৌদ্ধ ধর্ম ও জৈন ধর্ম


ধর্মীয় ভেদাভেদের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে অধিকাংশ মানুষের মনে একথার উপলব্ধি হয়ে গিয়েছিলো, তাদের ধর্ম মূলত আদর্শচ্যুত ধর্মীয় গুরুদের (আচার্যদের) কারণে এখন শুধু জাতিভেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। এই উপলব্ধি এবং ব্যাকুলতায় লোকজন জঙ্গলে একাকিত্বের জীবন যাপন শুরু করে। এবং সেখানে গভীর চিন্তা ভাবনায় বিভোর হয়ে যায়। তখন থেকেই সমাজের গুরুদের সন্যাসী জীবন-যাপন শুরু হয়। তাদের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা এক সময় দার্শনিক ধ্যান-ধারণার রূপ নেয়। তারা ধ্যানমগ্নতার মাধ্যমে মুক্তির পথ খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে যায়। একাকিত্বের এই সংস্কৃতিই পরবর্তীতে বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মমত তৈরি করে। যা হিন্দু ধর্মকে একটি নতুন মোড়ে নিয়ে যায়।

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গৌতম বুদ্ধ ও জৈনধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মহাবীরের জন্ম হয়। এসব ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, তাদের ধর্ম এ দু' ব্যক্তির পূর্বেও পৃথিবীতে ছিলো। এবং এসব ধর্মের প্রচারক হিসেবে গৌতম ও মহাবীরের পূর্বে আরো অনেক সম্মানিত ব্যক্তিবর্গও অতিবাহিত হয়েছেন। কিন্তু ইতিহাসে তাদের পৃথক কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না। গৌতম বুদ্ধ এবং মহাবীর শুধু একই সময়ের ছিলেন না, বরং তাদের জীবনীর যথেষ্ট মিলও পাওয়া যায়। তাদের ধর্ম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিলো, হিন্দুধর্মের ধর্মীয় গোঁড়ামি দূর করা। এই ধর্ম দুটি প্রথম থেকেই জাতিভেদ প্রথার প্রচণ্ড বিরোধিতা করে। এর ফলশ্রুতিতে প্রচুর পরিমাণে লোকজন তাদের ধর্মে দীক্ষিত হতে থাকে। কিন্তু তাদের ধর্ম দুটিতে সৃষ্টিকর্তা এবং মৃত্যু পরবর্তী বিশ্বাস সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট বর্ণনা ছিলো না। তাদের ধর্মের মূল চালিকা শক্তি ছিলো, সমাজে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও শিষ্টাচারের শিক্ষা পৌঁছে দেয়া। সমাজ সংস্কারের জন্যে বিভিন্ন মতপার্থক্যের দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে এটি একটি ভালো কার্যকরী দর্শন ছিলো। যার সম্পর্ক মানুষের সামাজিক জীবনের সাথে মিশে ছিলো। তবে, দুটো ধর্মই দেবতা ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস লালন করা থেকে সম্পূর্ণ দূরে ছিলো। শিক্ষা ও কাজে মানুষের তৈরি চারিত্রিক দর্শনই ছিলো তাদের উপসনার মূল দেবতা।

📘 হিন্দু ধর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি > 📄 বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তারলাভ

📄 বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তারলাভ


শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, চীন এবং জাপানের প্রাচীন গল্পের সাথে সাদৃশ্য থাকার দরূণ বৌদ্ধধর্ম সেখানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আরো প্রচার ও অগ্রগতি লাভ করে এ ধর্মটি ভারতে স্থান করে নেয়। ভারত তখন সামাজিক ব্যাধিসমূহের প্রতিকৃতি ছিলো। সেক্ষেত্রে বৌদ্ধধর্ম সামাজিক অনেক পাপসমূহ থেকে মুক্ত ছিলো। এর দরোজাও সবার জন্যে উন্মুক্ত ছিলো। যার দরুণ অনেক কম সময়ে বিদ্যুৎগতিতে ধর্মটি ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। এটি নিজের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে ভারতের সাধারণ মানুষ খুব বেশি পরিমাণে গ্রহণ করে নেয়। ভাগ্যক্রমে খ্রিস্টপূর্ব ৩০৪-২৩২ সনে বৌদ্ধ ধর্মের নেতৃত্ব বাদশাহ অশুকের হাতে আসে। বাদশাহ অশুক এ ধর্মের প্রচার-প্রসারে মনোযোগী হন। বিভিন্ন জায়গায় ধর্ম প্রচারক পাঠাতে থাকেন। ভারতের মাটিতেও বিভিন্ন ধর্মগুরু এবং পাঠ্য বইয়ের মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাপকতা লাভ করে। আশুকের প্রসার-প্রচারণার মাধ্যমে বৌদ্ধধর্ম প্রাচ্যের দেশসমূহে ছড়িয়ে পড়ে।

একদিকে হিন্দু সন্ন্যাসী লোকজন ছিলো, যারা দার্শনিক ধ্যান-ধারণা লালন করতো। যারা সত্যের পথ হন্যে হয়ে খুঁজছিলো। অন্যদিকে সমাজের উঁচু শ্রেণীরা নিচু পর্যায়ের মানুষের উপর নির্যাতন-পীড়ন করে বেড়াতো। এমতাবস্থায় বৌদ্ধ ধর্ম চারিত্রিক গুণাবলীর থিউরি পেশ করলে তখন সেটা উভয় দলের জন্যে তাদের পেরেশানির একটা সাময়িক সমাধান হিসেবে আপতিত হয়। হিন্দু ধর্ম অনুসারীদের একটা বিশাল সংখ্যক তাদের মতবাদে শরিক হতে থাকে। এই প্রচার-প্রসারের ফলে হিন্দু ধর্মের অনেক সংস্কৃতি বৌদ্ধ ধর্মের সাথে তালগোল পাকিয়ে ফেলে।

📘 হিন্দু ধর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি > 📄 হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের পরস্পর সংমিশ্রণ

📄 হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের পরস্পর সংমিশ্রণ


অনেক আগে থেকেই ভারত মূলত বিভিন্ন জাতি ও বিভিন্ন চিন্তা-চেতনার অনুসারীদের কেন্দ্রভূমি ছিলো। বিভিন্ন জাতি তাদের নিজস্ব পুরোনো সংস্কৃতি নিয়ে থাকতে পছন্দ করতো। তাই নতুন ধর্মের সঠিক বিষয়গুলো তাদের অভ্যাসে পরিণত হওয়া কঠিন ছিলো। তাই বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণকারী নতুন নতুন অনুসারীদের নানাবিধ সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণে এ ধর্মালম্বালীরা তাদের ধর্মের শিক্ষা থেকে দূরে সরতে থাকে। এবং ধীরে ধীরে ব্রাহ্মণধর্মের নিকটবর্তী হতে থাকে। তবে, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম ভারতের ব্রাহ্মণ ধর্মের কিছু কিছু বিষয় ছেড়ে দিলেও অনেক কিছুই তাদের কাছে থেকে গ্রহণও করে। পুনর্জন্মের বিষয়টি এই ধর্মে মূলত ব্রাহ্মণ ধর্ম থেকেই এসেছে। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মে দেবতা পূজার কোনো বিশেষ নিয়মনীতি ছিলো না। এজন্য ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই শূন্যতাকে পূরণ করতে এ ধর্মদ্বয়ের অনুসারীরা ভারতের স্থানীয় সংস্কৃতিকে অনুসরণ শুরু করে। এবং মহাবীর ও গৌতম বুদ্ধকেই তাদের উপাস্য বানিয়ে নেয়, তাদের পূজা ও উপাসনা করতে থাকে। এক সময় এই ধর্ম দুটি ভারতের স্থানীয় ধর্ম হিন্দু ধর্মের সাথে একাকার হয়ে যায়। তাদের গঠনটা যদিও একটি পৃথক মতধারা হিসেবে হয়, কিন্তু তাদের শিক্ষাসমূহ অনেকাংশে হিন্দু ধর্মের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়ে।

খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্ম ভারতের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মের বাড়াবাড়ির কারণে এদের অনুসারীরা ভারত ছাড়তে বাধ্য হয়। এবং অধিকাংশই তাদের ধর্ম পরিবর্তন করে ফেলে। এভাবে বৌদ্ধধর্মকে ভারত থেকে বিতাড়িত করা হয়। কিন্তু বৌদ্ধধর্মের সভ্যতা সংস্কৃতির যে প্রভাব হিন্দু ধর্মের উপর পড়েছিলো, তা দূরীভূত করা কারো পক্ষে সম্ভবপর ছিলো না। এরপর ভারতে মুসলিম শাসকদের যুগ শুরু হলে বৌদ্ধরা আবার সিন্ধে আসার সুযোগ পায়। কেননা বিতাড়িত হওয়ার এক যুগ পরে ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধধর্মের বাস্তবতাকে গ্রহণ করে গৌতম বুদ্ধকে তাদের দেবতা বলে মেনে নেয়। তখন ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধ ধর্ম মিলে একই ধর্মের রুপ নেয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00