📄 ব্রাহ্মণ যুগ ৯০০- ৬০০ খ্রিস্টপূর্ব
বৈদিকদের শেষ যুগ অর্থাৎ আর্যদের গঙ্গা ও যমুনার তীরে বসতি স্থাপনের যুগকে ব্রাহ্মণ যুগ বলা হয়। এ যুগ হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ বেদের শিক্ষার উপরেই প্রতিষ্ঠিত ছিলো। এ যুগের সময়কাল ভারতে আর্যদের বিজয়ের পর থেকে শুরু হয়। অর্থাৎ ৯০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে নিয়ে ৬০০ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত ছিলো। এই যুগে আর্য এবং ভারতের স্থানীয় ধর্মীয় সভ্যতা- সংস্কৃতি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ছিলো। আর্য জাতির নিজস্ব সংস্কৃতির কিছু বিষয় ছিলো, যেগুলো দ্রাবিড়রাও গ্রহণ করেছিলো। আর্যরা প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে তাল মিলিয়ে সে সংস্কৃতির দেবতাদেরকেও উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলো। ধীরে ধীরে আর্যদের ধর্মীয় রীতিনীতি, প্রথা-রেওয়াজ জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছিলো। এক সময় আর্যদের উপর একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর পূর্ণ দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিলো। দখলদারিত্বের প্রভাবে এদের ব্যাপারে মানুষের দিলে ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায়, এরা অন্য সকলের থেকে অভিজাত, উত্তম এবং সম্মানিত জাতি। এদেরকেই তখন ব্রাহ্মণ বলে জানা হতো। নেতা বা গুরু হওয়ার কারণে ব্রাহ্মণরা তখন নিজস্ব নিয়মে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন জাতিভেদ প্রথা চালু করে দেয়। যার চারটি শ্রেণী ছিলো। (১) ব্রাহ্মণঃ তারা নিজেদেরকে ধর্মীয় পথপ্রদর্শক ও নেতা বলে গণ্য করত। (২) ক্ষত্রিয়ঃ যোদ্ধা জাত বা দল। অর্থাৎ এরা যুদ্ধ পরিচালনাকারী দল। দেশের রাজনৈতিক বিষয়াবলি নিয়ন্ত্রণ করত। (৩) বৈশ্যঃ শিল্প- ব্যবসা, কল-কারখানা ইত্যাদি কাজের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল। (৪) শূদ্রঃ স্থানীয় জাতি অর্থাৎ দ্রাবিড়। শুরুতে এই জাতিভেদ প্রথায় কোনো বাড়াবাড়ি ছিলো না। বরং এদের পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়তা ও অন্যান্য সম্পর্ক তৈরি হত। কিন্তু পরবর্তীতে কোনো এক যুগে জাতিভেদ প্রথাকে ধর্মীয় রূপ দেওয়া হয়। প্রথমে ব্রাহ্মণদের তৈরি নিজস্ব নিয়ম-নীতির কারণে বিভিন্ন গোত্রের মাঝে এ ভেদাভেদ দেখা দেয়। যেমন, ভিন্ন গোত্রের সাথে বিবাহ বন্ধন না করা, একসাথে উঠাবসা না করা, ইত্যাদি বিষয়গুলো সমাজের সাধারণ সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু পরবর্তীতে এই নিয়মগুলো জাতিভেদ প্রথাকে কঠিন ও বিস্বাদ করে তুলে। এমনকি উঁচু জাতের লোকেরা নিচু জাতের উপর নির্যাতন-পীড়ন চালাতে শুরু করে।
📄 হিন্দু ধর্মের মাঝে পরিবর্তনসমূহ
এক সময় ধর্মীয় গুরুদের তত্ত্বাবধানে উপাসনা চলতো। তাদের কথায় মানুষ নিজেদের বিশ্বাসের ভিত গড়তো। তাদের কথাবার্তা ও দিকনির্দেশনার প্রভাবে সাধারণ মানুষ নিজেদের প্রাচীন প্রার্থনাগুলো ভুলে গিয়েছিল। যদিও মূর্তি পূজা এবং একাধিক উপাস্যের প্রথা প্রাচীনকালেও বিদ্যমান ছিলো; তবে, বৈদিকদের নিজস্ব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং সংস্কৃত ভাষার বিভিন্ন বিন্যাসের ফলে সনাতন ধর্মে ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে থাকে।
আনুমানিক ৫০০ খ্রিস্টপূর্বে বৈদিকদের জ্ঞান লাভের জন্যে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়। তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ছিলো ধর্মীয় সংস্কৃতির নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধর্মগ্রন্থ, সংস্কৃত শাস্ত্রীয় ব্যাকরণ, জ্যোতির্বিদ্যা, ছন্দশাস্ত্র ও অন্যান্য কিছু কিছু বিষয়। ধীরে ধীরে পরিবর্তন হয়ে এগুলোই মূলত বর্তমানের হিন্দু ধর্মের রূপ নেয়।
📄 বৌদ্ধ ধর্ম ও জৈন ধর্ম
ধর্মীয় ভেদাভেদের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে অধিকাংশ মানুষের মনে একথার উপলব্ধি হয়ে গিয়েছিলো, তাদের ধর্ম মূলত আদর্শচ্যুত ধর্মীয় গুরুদের (আচার্যদের) কারণে এখন শুধু জাতিভেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। এই উপলব্ধি এবং ব্যাকুলতায় লোকজন জঙ্গলে একাকিত্বের জীবন যাপন শুরু করে। এবং সেখানে গভীর চিন্তা ভাবনায় বিভোর হয়ে যায়। তখন থেকেই সমাজের গুরুদের সন্যাসী জীবন-যাপন শুরু হয়। তাদের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা এক সময় দার্শনিক ধ্যান-ধারণার রূপ নেয়। তারা ধ্যানমগ্নতার মাধ্যমে মুক্তির পথ খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে যায়। একাকিত্বের এই সংস্কৃতিই পরবর্তীতে বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মমত তৈরি করে। যা হিন্দু ধর্মকে একটি নতুন মোড়ে নিয়ে যায়।
খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গৌতম বুদ্ধ ও জৈনধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মহাবীরের জন্ম হয়। এসব ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, তাদের ধর্ম এ দু' ব্যক্তির পূর্বেও পৃথিবীতে ছিলো। এবং এসব ধর্মের প্রচারক হিসেবে গৌতম ও মহাবীরের পূর্বে আরো অনেক সম্মানিত ব্যক্তিবর্গও অতিবাহিত হয়েছেন। কিন্তু ইতিহাসে তাদের পৃথক কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না। গৌতম বুদ্ধ এবং মহাবীর শুধু একই সময়ের ছিলেন না, বরং তাদের জীবনীর যথেষ্ট মিলও পাওয়া যায়। তাদের ধর্ম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিলো, হিন্দুধর্মের ধর্মীয় গোঁড়ামি দূর করা। এই ধর্ম দুটি প্রথম থেকেই জাতিভেদ প্রথার প্রচণ্ড বিরোধিতা করে। এর ফলশ্রুতিতে প্রচুর পরিমাণে লোকজন তাদের ধর্মে দীক্ষিত হতে থাকে। কিন্তু তাদের ধর্ম দুটিতে সৃষ্টিকর্তা এবং মৃত্যু পরবর্তী বিশ্বাস সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট বর্ণনা ছিলো না। তাদের ধর্মের মূল চালিকা শক্তি ছিলো, সমাজে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও শিষ্টাচারের শিক্ষা পৌঁছে দেয়া। সমাজ সংস্কারের জন্যে বিভিন্ন মতপার্থক্যের দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে এটি একটি ভালো কার্যকরী দর্শন ছিলো। যার সম্পর্ক মানুষের সামাজিক জীবনের সাথে মিশে ছিলো। তবে, দুটো ধর্মই দেবতা ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস লালন করা থেকে সম্পূর্ণ দূরে ছিলো। শিক্ষা ও কাজে মানুষের তৈরি চারিত্রিক দর্শনই ছিলো তাদের উপসনার মূল দেবতা।
📄 বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তারলাভ
শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, চীন এবং জাপানের প্রাচীন গল্পের সাথে সাদৃশ্য থাকার দরূণ বৌদ্ধধর্ম সেখানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আরো প্রচার ও অগ্রগতি লাভ করে এ ধর্মটি ভারতে স্থান করে নেয়। ভারত তখন সামাজিক ব্যাধিসমূহের প্রতিকৃতি ছিলো। সেক্ষেত্রে বৌদ্ধধর্ম সামাজিক অনেক পাপসমূহ থেকে মুক্ত ছিলো। এর দরোজাও সবার জন্যে উন্মুক্ত ছিলো। যার দরুণ অনেক কম সময়ে বিদ্যুৎগতিতে ধর্মটি ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। এটি নিজের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে ভারতের সাধারণ মানুষ খুব বেশি পরিমাণে গ্রহণ করে নেয়। ভাগ্যক্রমে খ্রিস্টপূর্ব ৩০৪-২৩২ সনে বৌদ্ধ ধর্মের নেতৃত্ব বাদশাহ অশুকের হাতে আসে। বাদশাহ অশুক এ ধর্মের প্রচার-প্রসারে মনোযোগী হন। বিভিন্ন জায়গায় ধর্ম প্রচারক পাঠাতে থাকেন। ভারতের মাটিতেও বিভিন্ন ধর্মগুরু এবং পাঠ্য বইয়ের মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাপকতা লাভ করে। আশুকের প্রসার-প্রচারণার মাধ্যমে বৌদ্ধধর্ম প্রাচ্যের দেশসমূহে ছড়িয়ে পড়ে।
একদিকে হিন্দু সন্ন্যাসী লোকজন ছিলো, যারা দার্শনিক ধ্যান-ধারণা লালন করতো। যারা সত্যের পথ হন্যে হয়ে খুঁজছিলো। অন্যদিকে সমাজের উঁচু শ্রেণীরা নিচু পর্যায়ের মানুষের উপর নির্যাতন-পীড়ন করে বেড়াতো। এমতাবস্থায় বৌদ্ধ ধর্ম চারিত্রিক গুণাবলীর থিউরি পেশ করলে তখন সেটা উভয় দলের জন্যে তাদের পেরেশানির একটা সাময়িক সমাধান হিসেবে আপতিত হয়। হিন্দু ধর্ম অনুসারীদের একটা বিশাল সংখ্যক তাদের মতবাদে শরিক হতে থাকে। এই প্রচার-প্রসারের ফলে হিন্দু ধর্মের অনেক সংস্কৃতি বৌদ্ধ ধর্মের সাথে তালগোল পাকিয়ে ফেলে।