📘 হিন্দু ধর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি > 📄 প্রাচীন যুগ, ১৫০০ খ্রিস্টপূর্ব

📄 প্রাচীন যুগ, ১৫০০ খ্রিস্টপূর্ব


আর্যদের পূর্বে ভারতে দ্রাবিড় বংশ পরম্পরার লোকদের বসবাস ছিলো। ভারতীয় জাতি মূলত সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী ছিলো। এরপর ধীরে ধীরে আর্য, ব্রাক্ষ, হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মে প্রবর্তিত হতে থাকে। আর্য এবং সনাতনের উৎপত্তি নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে।

বর্তমানে কিছু সংখ্যক ইতিহাসবিদদের মতানুযায়ী হিন্দু শব্দটি সংস্কৃত সিন্ধু শব্দ থেকে এসেছে। সিন্ধু একটি ঐতিহাসিক নদীর নাম। হিন্দু ধর্মের পবিত্র গ্রন্থগুলোতে সিন্ধু নদির নামটি অনেক জায়গায় পাওয়া যায়। তবে, বৈদিক যুগে হিন্দুরা সাধারণত সনাতন ধর্মের নামেই নিজেদের পরিচয় পেশ করত। সনাতন সংস্কৃত ভাষার শব্দ। শাশ্বত বা চিরন্তন পথ বা নিয়মকে সনাতন ধর্ম বলা হয়ে থাকে।

হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলোতে এই ধর্মকে আর্যধর্ম বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। আর্য শব্দের অর্থ হলো মহান এবং সম্মানিত। সাধারণত এই নাম দ্বারা ওই সকল লোকদের বুঝানো হত, যারা ভারতে বাহির থেকে এসে বসবাস শুরু করেছিল।

মোটকথা, হিন্দুধর্মের উৎপত্তি নিয়ে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। একদল মনে করেন, আর্যদের আগমনের পূর্বে দ্রাবিড় নামে যে জাতি এ অঞ্চলে বাস করতো, তারাই মূলত হিন্দু ধর্মের প্রবর্তক। পরবর্তীতে বহিরাগত আর্যদের আগমনের ফলে এই ধর্ম বিকশিত হয়।

আর্যদের আগমনের পূর্বে ভারতে দ্রাবিড়দের সভ্যতা কেমন ছিল, সে ব্যাপারে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া দুষ্কর। তবে মাটি খননের মাধ্যমে প্রাপ্ত বিভিন্ন বস্তু থেকে এতটুকু ধারণা করা যায় যে, তাদের সভ্যতা সে যুগে অনেক উন্নত ছিলো। তারা নিজেদের সৌন্দর্য এবং সাজসজ্জার দিকে খুব খেয়াল রাখত। তাদের বাড়িঘরগুলোও বেশ উন্নত এবং আকর্ষণীয় ডিজাইনের ছিল। বাড়ি ও শহরের নকশাগুলোও ছিল চমৎকার।

দ্রাবিড়দের ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে বিশদ কিছু জানা যায় না। তাদের ইবাদতের স্থান নির্দিষ্ট ছিল না। তারা গাছ ও পাথরের পূজা করত। তবে তাদের মাঝে এক সৃষ্টিকর্তার বিশ্বাসও ছিল, যাকে তারা আসমান ও জমিনের স্রষ্টা বলে মানত। এই স্রষ্টাকে তারা বিভিন্ন নামে ডাকত, যার মধ্যে অন্যতম হলো ‘শিব’। এছাড়াও তাদের অন্যান্য উপাস্যও ছিল।

📘 হিন্দু ধর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি > 📄 ব্রাহ্মণ যুগ ৯০০- ৬০০ খ্রিস্টপূর্ব

📄 ব্রাহ্মণ যুগ ৯০০- ৬০০ খ্রিস্টপূর্ব


বৈদিকদের শেষ যুগ অর্থাৎ আর্যদের গঙ্গা ও যমুনার তীরে বসতি স্থাপনের যুগকে ব্রাহ্মণ যুগ বলা হয়। এ যুগ হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ বেদের শিক্ষার উপরেই প্রতিষ্ঠিত ছিলো। এ যুগের সময়কাল ভারতে আর্যদের বিজয়ের পর থেকে শুরু হয়। অর্থাৎ ৯০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে নিয়ে ৬০০ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত ছিলো। এই যুগে আর্য এবং ভারতের স্থানীয় ধর্মীয় সভ্যতা- সংস্কৃতি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ছিলো। আর্য জাতির নিজস্ব সংস্কৃতির কিছু বিষয় ছিলো, যেগুলো দ্রাবিড়রাও গ্রহণ করেছিলো। আর্যরা প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে তাল মিলিয়ে সে সংস্কৃতির দেবতাদেরকেও উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলো। ধীরে ধীরে আর্যদের ধর্মীয় রীতিনীতি, প্রথা-রেওয়াজ জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছিলো। এক সময় আর্যদের উপর একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর পূর্ণ দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিলো। দখলদারিত্বের প্রভাবে এদের ব্যাপারে মানুষের দিলে ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায়, এরা অন্য সকলের থেকে অভিজাত, উত্তম এবং সম্মানিত জাতি। এদেরকেই তখন ব্রাহ্মণ বলে জানা হতো। নেতা বা গুরু হওয়ার কারণে ব্রাহ্মণরা তখন নিজস্ব নিয়মে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন জাতিভেদ প্রথা চালু করে দেয়। যার চারটি শ্রেণী ছিলো। (১) ব্রাহ্মণঃ তারা নিজেদেরকে ধর্মীয় পথপ্রদর্শক ও নেতা বলে গণ্য করত। (২) ক্ষত্রিয়ঃ যোদ্ধা জাত বা দল। অর্থাৎ এরা যুদ্ধ পরিচালনাকারী দল। দেশের রাজনৈতিক বিষয়াবলি নিয়ন্ত্রণ করত। (৩) বৈশ্যঃ শিল্প- ব্যবসা, কল-কারখানা ইত্যাদি কাজের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল। (৪) শূদ্রঃ স্থানীয় জাতি অর্থাৎ দ্রাবিড়। শুরুতে এই জাতিভেদ প্রথায় কোনো বাড়াবাড়ি ছিলো না। বরং এদের পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়তা ও অন্যান্য সম্পর্ক তৈরি হত। কিন্তু পরবর্তীতে কোনো এক যুগে জাতিভেদ প্রথাকে ধর্মীয় রূপ দেওয়া হয়। প্রথমে ব্রাহ্মণদের তৈরি নিজস্ব নিয়ম-নীতির কারণে বিভিন্ন গোত্রের মাঝে এ ভেদাভেদ দেখা দেয়। যেমন, ভিন্ন গোত্রের সাথে বিবাহ বন্ধন না করা, একসাথে উঠাবসা না করা, ইত্যাদি বিষয়গুলো সমাজের সাধারণ সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু পরবর্তীতে এই নিয়মগুলো জাতিভেদ প্রথাকে কঠিন ও বিস্বাদ করে তুলে। এমনকি উঁচু জাতের লোকেরা নিচু জাতের উপর নির্যাতন-পীড়ন চালাতে শুরু করে।

📘 হিন্দু ধর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি > 📄 হিন্দু ধর্মের মাঝে পরিবর্তনসমূহ

📄 হিন্দু ধর্মের মাঝে পরিবর্তনসমূহ


এক সময় ধর্মীয় গুরুদের তত্ত্বাবধানে উপাসনা চলতো। তাদের কথায় মানুষ নিজেদের বিশ্বাসের ভিত গড়তো। তাদের কথাবার্তা ও দিকনির্দেশনার প্রভাবে সাধারণ মানুষ নিজেদের প্রাচীন প্রার্থনাগুলো ভুলে গিয়েছিল। যদিও মূর্তি পূজা এবং একাধিক উপাস্যের প্রথা প্রাচীনকালেও বিদ্যমান ছিলো; তবে, বৈদিকদের নিজস্ব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং সংস্কৃত ভাষার বিভিন্ন বিন্যাসের ফলে সনাতন ধর্মে ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে থাকে।
আনুমানিক ৫০০ খ্রিস্টপূর্বে বৈদিকদের জ্ঞান লাভের জন্যে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়। তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ছিলো ধর্মীয় সংস্কৃতির নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধর্মগ্রন্থ, সংস্কৃত শাস্ত্রীয় ব্যাকরণ, জ্যোতির্বিদ্যা, ছন্দশাস্ত্র ও অন্যান্য কিছু কিছু বিষয়। ধীরে ধীরে পরিবর্তন হয়ে এগুলোই মূলত বর্তমানের হিন্দু ধর্মের রূপ নেয়।

📘 হিন্দু ধর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি > 📄 বৌদ্ধ ধর্ম ও জৈন ধর্ম

📄 বৌদ্ধ ধর্ম ও জৈন ধর্ম


ধর্মীয় ভেদাভেদের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে অধিকাংশ মানুষের মনে একথার উপলব্ধি হয়ে গিয়েছিলো, তাদের ধর্ম মূলত আদর্শচ্যুত ধর্মীয় গুরুদের (আচার্যদের) কারণে এখন শুধু জাতিভেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। এই উপলব্ধি এবং ব্যাকুলতায় লোকজন জঙ্গলে একাকিত্বের জীবন যাপন শুরু করে। এবং সেখানে গভীর চিন্তা ভাবনায় বিভোর হয়ে যায়। তখন থেকেই সমাজের গুরুদের সন্যাসী জীবন-যাপন শুরু হয়। তাদের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা এক সময় দার্শনিক ধ্যান-ধারণার রূপ নেয়। তারা ধ্যানমগ্নতার মাধ্যমে মুক্তির পথ খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে যায়। একাকিত্বের এই সংস্কৃতিই পরবর্তীতে বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মমত তৈরি করে। যা হিন্দু ধর্মকে একটি নতুন মোড়ে নিয়ে যায়।

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গৌতম বুদ্ধ ও জৈনধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মহাবীরের জন্ম হয়। এসব ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, তাদের ধর্ম এ দু' ব্যক্তির পূর্বেও পৃথিবীতে ছিলো। এবং এসব ধর্মের প্রচারক হিসেবে গৌতম ও মহাবীরের পূর্বে আরো অনেক সম্মানিত ব্যক্তিবর্গও অতিবাহিত হয়েছেন। কিন্তু ইতিহাসে তাদের পৃথক কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না। গৌতম বুদ্ধ এবং মহাবীর শুধু একই সময়ের ছিলেন না, বরং তাদের জীবনীর যথেষ্ট মিলও পাওয়া যায়। তাদের ধর্ম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিলো, হিন্দুধর্মের ধর্মীয় গোঁড়ামি দূর করা। এই ধর্ম দুটি প্রথম থেকেই জাতিভেদ প্রথার প্রচণ্ড বিরোধিতা করে। এর ফলশ্রুতিতে প্রচুর পরিমাণে লোকজন তাদের ধর্মে দীক্ষিত হতে থাকে। কিন্তু তাদের ধর্ম দুটিতে সৃষ্টিকর্তা এবং মৃত্যু পরবর্তী বিশ্বাস সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট বর্ণনা ছিলো না। তাদের ধর্মের মূল চালিকা শক্তি ছিলো, সমাজে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও শিষ্টাচারের শিক্ষা পৌঁছে দেয়া। সমাজ সংস্কারের জন্যে বিভিন্ন মতপার্থক্যের দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে এটি একটি ভালো কার্যকরী দর্শন ছিলো। যার সম্পর্ক মানুষের সামাজিক জীবনের সাথে মিশে ছিলো। তবে, দুটো ধর্মই দেবতা ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস লালন করা থেকে সম্পূর্ণ দূরে ছিলো। শিক্ষা ও কাজে মানুষের তৈরি চারিত্রিক দর্শনই ছিলো তাদের উপসনার মূল দেবতা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00