📘 হেযবুত তওহীদ স্বরূপ বিশ্লেষণ 📄 ‘ইলাহ’ শব্দের অর্থ ‘মাবুদ’

📄 ‘ইলাহ’ শব্দের অর্থ ‘মাবুদ’


আল্লাহ তাআলা ছাড়া কোনো বিধানদাতা নেই- এটা সকল মুমিনের বিশ্বাস। কারণ, আল্লাহ তাআলা একমাত্র স্রষ্টা। সকল সৃষ্টি তাঁর, এজন্য সবকিছুর মালিকানাও তাঁর। যখন মালিকানা তাঁর তখন বিধানও মানতে হবে একমাত্র তাঁর। এ সম্পর্কে কুরআনের সূরা আনআম ৫৮ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ” “আল্লাহ ছাড়া আর কারোর হুকুম চলে না।” একই কথা সূরা ইউসুফ ৪০ ও ৬৭ আয়াতেও রয়েছে।

বায়াজীদ খান পন্নীর একাধিক বক্তব্য থেকে একটি বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, মানুষ ও আল্লাহ তাআলার মাঝে আসল সম্পর্ক ও বন্ধন হচ্ছে, শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক, রাষ্ট্র ও প্রজার সম্পর্ক। পন্নীর সামগ্রিক বক্তব্য এমন- নবী-রাসূলদের প্রেরণ, আসমানী কিতাবসমূহের অবতরণ এবং দাওয়াত-তাবলীগের আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ হল, আল্লাহর তাআলার শাসনকর্তৃত্ব ও তাঁর সর্বক্ষমতা স্বীকারের উপর সবার স্বীকৃতি আদায় করা ও সে মোতাবেক জীবন-যাপনের উপর সবাইকে অনুগত করা।

বিজ্ঞ পাঠক! উল্লিখিত বিষয়গুলো যদিও আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনা ও ইসলাম গ্রহণ করার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি ও ইসলামের স্বাভাবিক দাবী। কিন্তু আল্লাহর মহান সত্ত্বা ও গুণবাচক বিশেষণসমূহের দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো তাঁর নিজ মাখলুকাতের সাথে সম্পর্ক ও মাখলুকাতের তাঁর সাথে সম্পর্কের অত্যন্ত গৌণ অংশ ও অতি তুচ্ছ একটি বিষয়। প্রকৃতপক্ষে স্রষ্টা ও সৃষ্টির, বান্দা ও মাবুদের সম্পর্কটি শাসক ও শাসিতের, রাজা ও প্রজার সম্পর্কের চেয়ে অনেক অনেক বিস্তৃত, বেশি গভীর, বেশি পবিত্র ও বেশি সুন্দর।

আমাদের আলোচ্য বিষয় এটা নয়; এখানে আলোচনার প্রসঙ্গ হলো: 'লাইলাহা ইল্লাল্লাহ' বাক্যে ব্যবহৃত 'ইলাহ' শব্দের অর্থ। পন্নী ও তার অনুসারীরা বলে, কালিমাতুত তাওহীদের অর্থ হলো, “আল্লাহ ছাড়া কোনো বিধানদাতা নেই।” আমরা বলি, “আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই।”

বিষয়টি সংক্ষেপে বিশ্লেষণ এভাবে বিশ্লেষণ করা যায়- لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ 'লাইলাহা ইল্লাল্লাহ' বাক্যে দু'টি অংশ রয়েছে। 'লাইলাহা' অর্থ: কোনো ইলাহ নেই। 'ইল্লাল্লাহ' আল্লাহ ছাড়া। কালিমাতুত তাওহীদে ব্যবহৃত 'ইলাহ' শব্দের অর্থ হলো: মাবুদ, উপাস্য বা ইবাদত পাওয়ার উপযুক্ত একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার/প্রকৃত কোনো মাবুদ নেই। ৪র্থ হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ ভাষাবিদ ও অভিধান-প্রণেতা আবুল হুসাইন আহমদ ইবনে ফারিস বলেন- (اله) الهمزة واللام والهاء أصل واحد، وهو التعبد. فالإله الله تعالى، وسمّي بذلك لأنه معبود.

বিখ্যাত অভিধান 'আল মুজামুল ওয়াসীত' গ্রন্থে বলা হয়েছে, “এমন সকল ব্যক্তি, বস্তু বা দ্রব্যকে 'ইলাহ' বলা হয়- যার ইবাদত করা হয়।” কুরআন-হাদীসে 'ইলাহ' শব্দটি 'মাবুদ' উপাস্য অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, কোনো কোনো সম্প্রদায় সূর্যের পূজা করত, সেজন্য সূরা আরাফ ১২৭ আয়াতে সূর্যকে 'ইলাহ' বলা হয়েছে। এভাবে সূরা আম্বিয়া ২১ আয়াতে মূর্তিকে ইলাহ বলা হয়েছে। মক্কার কাফিররা নিজের হাতে মূর্তি তৈরি করত; যারা কথা বলতে পারত না। অথচ কুরআনে ব্যবহৃত শব্দটি হলো 'ইলাহ'। আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন-
মানুষ তাকে [আল্লাহকে] ছেড়ে এমন সব ইলাহ গ্রহণ করে নিয়েছে, যারা কোনো কিছু সৃষ্টি করতে পারে না; বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়ে থাকে। তাদের নেই নিজেদেরও কোনো ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতা। আর না আছে কারো মৃত্যু ও জীবন দান কিংবা কাউকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষমতা।

এবং (সেই সময়ের বৃত্তান্ত শুনুন) যখন ইবরাহীম তার পিতা আযরকে বলেছিল, আপনি কি মূর্তিদেরকে ইলাহ বানিয়ে নিয়েছেন? আমি তো দেখছি, আপনি আপনার সম্প্রদায় স্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত রয়েছেন। (মক্কার কাফিররা বলল) সে (মুহাম্মাদ) কি সমস্ত ইলাহকে এক ইলাহে পরিণত করেছে? এটা তো বড় আজব কথা!

এভাবে কুরআনের অনেক আয়াতে 'ইলাহ' শব্দটি 'মাবুদ/উপাস্য' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় বিস্তারিত আলোচনা থেকে বিরত থাকলাম।

টিকাঃ
২৩৯. আল মুজামুল ওয়াসীত, বাবুল হামযা, ১ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৬৫
২৪০. সূরা ফুরকান: আয়াত-৩
২৪১. সূরা আনআম: আয়াত-৭৪
২৪২. সূরা সোয়াদ: আয়াত-৫

📘 হেযবুত তওহীদ স্বরূপ বিশ্লেষণ 📄 মূল উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়নের উপকরণ

📄 মূল উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়নের উপকরণ


আল্লাহ তাআলা বলেছেন, পাপিষ্ঠ জাহান্নামীদেরকে ফিরিশতা জিজ্ঞাসাবাদ করবে- কোন্ জিনিস তোমাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করিয়েছে? তারা বলবে, আমার নামাযী ছিলাম না, আমরা মিসকীনদেরকে খাবার দিতাম না। আর যারা অহেতুক আলাপ-আলোচনায় মগ্ন হত, আমরাও তাদের সঙ্গে তাতে মগ্ন হতাম এবং কর্মফল দিবসকে মিথ্যা সাব্যস্ত করতাম। “ধ্বংস মুশকিদের জন্য- যারা যাকাত আদায় করে না।” সূরা আনফাল শুরুতে মুমিনের পরিচয় দিয়ে বলা হয়েছে, আল্লাহর স্মরণে তাদের অন্তর ভীত হয়, কুরআন শ্রবণে তাদের ঈমান বেড়ে যায়, তারা আল্লাহর উপর ভরসা রাখে, নামায কায়েম করে এবং দান করে। তারপর বলা হয়েছে, "তারা হলো প্রকৃত মুমিন।”

এ সকল আয়াত থেকে পরিস্কার জানা যায়, নামায, যাকাত ইত্যাদি ইবাদত দীনী ব্যবস্থাপনার মাঝে মৌলিক ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে; বরং এগুলোই হলো প্রকৃত লক্ষ্য ও প্রকৃত কাম্য। এগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে এবং জবাবদিহীও করতে হবে। বাকী অন্যান্য বিষয়গুলো যেমন, আল্লাহর শাসন কায়িম করা ও মানবসভ্যতাকে কল্যাণ ও সফলতার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করা; এগুলো হচ্ছে মূল ইবাদতের মাধ্যম ও উপকরণমাত্র। মূল হলো, আল্লাহর ইবাদত করা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আমি জ্বিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।”

টিকাঃ
২৪৩. মুসলিম: হাদীস-১২৩, বুখারী: হাদীস-৪২৪৩
২৪৪. সূরা মুদ্দাসসির: আয়াত-৪০-৪৬
২৪৫. সূরা হা মীম সিজদাহ: আয়াত-৬-৭
২৪৬. সূরা যারিয়াত: আয়াত-৫৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px