📄 ইসলামী শরীয়তে পর্দার স্বরূপ
এক. আল্লাহ তাআলা বলেছেন- মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। এটাই তাদের জন্য উৎকৃষ্ট পন্থা। তারা যা কিছু করে আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত।
দৃষ্টি নত রাখার অর্থ হলো, দৃষ্টিকে এমন বস্তু থেকে ফিরিয়ে নেয়া, যা দেখা শরিয়তে নিষিদ্ধ ও অবৈধ। বেগানা নারীর প্রতি তাকানো, গোপনীয় অঙ্গের প্রতি দৃষ্টি, গোপন তথ্য জানার জন্য তার গৃহে উঁকি মেরে দেখা এবং যেসব কাজে দৃষ্টি ব্যবহার করা শরীয়ত নিষিদ্ধ করেছে, সেগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত।
দুই. আল্লাহ তাআলা বলেছেন- মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হিফাজত করে এবং নিজেদের ভূষণ অন্যদের কাছে প্রকাশ না করে, যা আপনিই প্রকাশ পায় তা ছাড়া। এবং তারা যেন তাদের ওড়নার আঁচল নিজ বক্ষদেশে নামিয়ে দেয়...
এখানে ভূষণ দ্বারা শরীরের সেই অংশ বোঝানো হয়েছে, যাতে অলংকার বা আকর্ষণীয় পোশাক পরিধান করা হয়। এভাবে এ আয়াতে নারীদেরকে হুকুম করা হয়েছে, তারা যেন গায়রে মাহরাম বা পরপুরুষের সামনে নিজেদের গোটা শরীর বড় চাদর বা বোরকা দ্বারা ঢেকে রাখে, যাতে তারা তার সাজ-সজ্জার অঙ্গসমূহ দেখতে না পায়। তবে শরীরে এ রকম অংশ যদি কাজকর্ম করার সময় আপনিই খুলে যায় বা বিশেষ প্রয়োজনবশত খোলার দরকার হয়, তাতে গোনাহ হবে না। সে সম্পর্কে বলা হয়েছে 'যা আপনিই প্রকাশ পায় তা ছাড়া'। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. বলেন, নারী যে চাদর দ্বারা শরীর ঢাকে, এ ব্যতিক্রম দ্বারা সেটাই বোঝানো উদ্দেশ্য, যেহেতু তা আবৃত করা সম্ভব নয়।
তিন. আল্লাহ তাআলা বলেছেন- (হে নারীরা!) নিজ গৃহে অবস্থান কর। প্রাচীন জাহেলী যুগের মতো (পর পুরুষকে) সাজসজ্জা প্রদর্শন করে বেড়িও না।
এ আয়াতে পর্দা সম্পর্কিত দু'টি বিষয় জানা গেল। প্রথমত: প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার নিকট নারীদের বাড়ি থেকে বের না হওয়াই কাম্য- গৃহব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যেই তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে; এতেই তারা পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করবে। বস্তুত শরিয়তের চাহিদা অনুযায়ী আসল পর্দা হলো গৃহের অভ্যন্তর অনুসৃত পর্দা। দ্বিতীয়ত এ কথা জানা গেছে যে, শরঈ প্রয়োজনের তাকীদের যদি নারীকে বাড়ি থেকে বের হতে হয়, তবে যেন সৌন্দর্য ও দেহ সৌষ্ঠব প্রদর্শন না করে বের হয়; বরং বোরকা বা গোটা শরীর আবৃত করে ফেলে- এমন চাদর ব্যবহার করে বের হবে।
চার. আল্লাহ তাআলা বলেছেন- নবীর স্ত্রীগণের কাছে তোমরা কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এ পন্থা তোমাদের অন্তর ও তাদের অন্তর অধিকতর পবিত্র রাখার পক্ষে সহায়ক হবে...।
এটি উম্মুল মুমিনীনদেরকে সরাসরি সম্বোধন করা হলেও বিধানটি সাধারণ এবং সবার জন্য প্রযোজ্য।
পাঁচ. আল্লাহ তাআলা বলেছেন- হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, আপনার কন্যাদের ও মুমিন নারীদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের চাদর নিজেদের (মুখের) উপর নামিয়ে দেয়। এ পন্থায় তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না।
এ আয়াত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, পর্দার বিধান সমস্ত মুসলিম নারীদের জন্যই। তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তারা যখন কোনো প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যায়, তখন যেন তাদের চাদর মুখের উপর টেনে দেয় এবং এভাবে তাদের চেহারা ঢেকে রাখে। একদল মুনাফিক রাস্তাঘাটে মুমিন নারীদেরকে উত্যক্ত করত। এ আয়াতে পর্দার সাথে চলাফেরা করার একটা উপকার এই নির্দেশ করা হয়েছে যে, পর্দার সাথে চলাফেরা করলে সকলেই বুঝতে পরবে তারা শরীফ ও চরিত্রবতী নারী। ফলে মুনাফিকরা তাদেরকে উত্যক্ত করার সাহস করবে না।
ছয়. সুনানে আবু দাউদ শরীফে এসেছে- যখন সূরা আহযাব ৫৯ আয়াত নাযিল হলো তখন থেকে আনসার মহিলারা তাদের মাথায় এমন চাদর জড়িয়ে বের হতেন, মনে হতো তাতে যেন কাক বসে আছে।
সাত. হজ্জের সময় মহিলাদের চেহারা খোলা রাখার নির্দেশ রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটেও আম্মাজান আয়িশা রাযি. বলেন- 'অনেক কাফেলা আমাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিল। তখন আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে ইহরাম বাঁধা অবস্থায় ছিলাম। তারা আমাদের সামনা-সামনি আসলে আমাদের নারীরা নিজ মুখাবরণ মাথা থেকে নামিয়ে নিজ মুখমণ্ডল ঢেকে ফেলতেন। অতপর তারা অতিক্রম করে চলে গেলে আমরা মুখ খুলতাম।'
স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, নারীরা তাদের শরীরের সবটুকু অংশ ঢেকে রেখে পর্দা করার বিষয়টি কীভাবে গুরুত্বসহ পালন করতেন। কুরআন ও হাদীসের এসব দলীল আমাদের সামনে সত্যিকারের পর্দা ও হিজাবের আসল রূপ তুলে ধরেছে। নির্ভরযোগ্যতার বিচারে আমাদেরকে শরীয়তের বিধি-বিধান কুরআন-হাদীস থেকেই আহরণ করতে হয়, ইতিহাস ও পরে বই থেকে নয়।
টিকাঃ
১৮৫. সূরা নূর: আয়াত-৩০
১৮৬. তাফসীরে জালালাইন
১৮৭. সূরা নূর: আয়াত-৩১
১৮৮. তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন
১৮৯. তাফসীরে জালালাইন
১৯০. সূরা আহযাব: আয়াত-৩৩
১৯১. তাফসীরে জালালাইন
১৯২. সূরা আহযাব: আয়াত-৫৩
১৯৩. তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন
১৯৪. সূরা আহযাব: আয়াত-৫৯
১৯৫. তাফসীরে জালালাইন
১৯৬. তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন
১৯৭. আল বাহরুল মুহীত
১৯৮. তাফসীরে জালালাইন
১৯৯. আবু দাউদ: হাদীস-৪১০১
২০০. আবু দাউদ ১৮৩৩, মুসনাদে আহমদ ২৪০২১