📄 বিভ্রান্তির ক্রমধারা
অনেক আগে থেকেই কিছু মানুষ ছিল, যারা কুরআন-সুন্নাহর বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে সাহাবায়ে কিরাম, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈনসহ (যারা ছিলেন ইসলামের সর্বোত্তম যুগের সেরা মানব) ইমামগণের সর্বসম্মত ও স্বীকৃত বিষয়সমূহের বিপরীত মতাদর্শ পোষণ করে নিজেরা পথভ্রষ্ট হয়েছে, মানুষকেও সত্যপথ থেকে বিচ্যুত করেছে। শেষ যামানায় আবির্ভূত ভ্রান্ত চিন্তার কিছু মানুষ, যাদের মনগড়া ব্যাখ্যা ও মিথ্যা হাদীস বর্ণনা সম্পর্কে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে সতর্ক করে বলেছেন-
«سيكون في آخر أمتي أناس يحدثونكم ما لم تسمعوا أنتم، ولا آباؤكم، فإياكم وإياهم»
'শেষ যামানায় আমার উম্মতের মধ্যে এরূপ কিছু লোকের আবির্ভাব হবে, যারা তোমাদেরকে এমন হাদীস শুনাবে যা তোমরা বা তোমাদের পূর্বপুরুষ (উলামায়ে কেরাম)গণও কখনো শোননি। সুতরাং তোমরা এরকম লোকদের সংশ্রব থেকে সাবধান থাকবে এবং তাদেরকেও তোমাদের নিকট থেকে দূরে রাখবে।'
টিকাঃ
২. মুসলিম: হাদীস-১৫
📄 হেযবুত তওহীদ : সংক্ষিপ্ত পরিচয়
হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠাতা বায়াজীদ খান পন্নী ১১ মার্চ ১৯২৫ করটিয়ার পন্নী পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। গ্রামের স্কুলে পাঠ শেষে এইচ.এম. ইনস্টিটিউশন থেকে ১৯৪২ সনে মেট্রিকুলেশান তারপর বগুড়া সরকারী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার ১ম বর্ষ এবং কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে ২য় বর্ষ সমাপ্ত করে। পেশায় একজন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। ১৯৬৩ খৃ. তিনি প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
বায়াজীদ খান পন্নী নিজেকে আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত, মুজিযাপ্রাপ্ত ইত্যাদি বিভিন্ন উদ্ভট দাবী করতে শুরু করেন। নিজের রচিত কিছু বইয়ে তার আকীদা-বিশ্বাস তুলে ধরেন। ১৯৯৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী, তিনি দাউদ মহল, করটিয়া, টাঙ্গাইলে 'হেযবুত তওহীদ' প্রতিষ্ঠা করে। নিজ গ্রামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে তার দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যান। একপর্যায়ে তার উদ্ভট আকীদা-বিশ্বাস ও বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা জনগণের সামনে প্রকাশিত হলে সাধারণ জনতার চাপে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়। প্রথমে সশস্ত্র সংগ্রাম, রাষ্ট্র দখল-এরূপ উগ্রপন্থায় সোচ্চার ছিল- যা তার রচিত গ্রন্থাবলীতে বিদ্যমান। কিন্তু পরবর্তীতে দেশের পরিবেশ সুবিধাজনক না দেখে সুর পরিবর্তন করে জঙ্গিবাদ বিরোধী স্লোগান দিতে শুরু করে। বায়াজীদ খান পন্নী ২০১২ সালে মারা যায়।
📄 হেযবুত তওহীদের আকীদা-বিশ্বাস
'হেযবুত তওহীদের আকীদা-বিশ্বাস' শিরোনামে আলোচনা করতে হলে আবশ্যকভাবেই বইয়ের কলেবর বিরাট আকার ধারণ করবে। আলোচনা-পর্যালোচনার সেই বিস্তৃত পরিসরে প্রবেশের অবকাশ আমাদের নেই। তাই আমরা কয়েকটি বিষয়ে খুব সংক্ষেপে আলোকপাত করার চেষ্টা করব। ইনশাআল্লাহ। প্রথমে আমরা তাদের আকীদা-বিশ্বাস উল্লেখ করব তাদের রচিত এবং নিজস্ব প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত গ্রন্থ থেকে। তারপর সংক্ষেপে জবাব দেয়ার চেষ্টা করব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক ও সহীহ বুঝার এবং মানার তাওফীক দান করুন। আমীন।
📄 ৫. প্রকৃত ইসলামে বর্তমানে কেউ নেই
পন্নীর বক্তব্য: "মহানবীর ভবিষ্যদ্বাণী মোতাবেক ৬০/৭০ বছর যখন উম্মতে মোহাম্মদীর জাতি হিসাবে মৃত্যু হোলো তখন কি রইলো?"
“পৃথিবীর কর্তৃত্ব গত কয়েক শতাব্দী ধরেই ইহুদি-খ্রিষ্টানদের হাতে আছে। কর্তৃত্বের কথা দূরে থাক, এ জাতি আজ ফুটবলের মতো অন্যান্য সব জাতির লাথি খাচ্ছে। তাহলে এ জাতি মো'মেন বা ঈমানদার হলে আল্লাহ মিথ্যা ওয়াদা করেছেন (নাউযুবিল্লাহ), আর আল্লাহ যদি মিথ্যা না বলে থাকেন তবে এই জাতি তার সমস্ত নামাজ, যাকাত, হজ্ব রোযা সব সুদ্ধ বেঈমান অর্থাৎ কাফের, মোশরেক।”
“১৩০০ বছর ধরে বহুভাবে বিকৃত হওয়া ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মগুলোও মানুষকে কেবল সুখস্বপ্নে বিভোর করে প্রতারিতই করে এবং করবে। সেগুলো আর মানুষের ধর্ম নয়, কল্যাণের ধর্ম নয়, সেগুলো পুরোহিত-আলেম, পীর, রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী, ডানপন্থী, রক্ষণশীল আর উগ্রপন্থী জঙ্গিদের ধর্ম।”
“ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা কোনো স্কুলেও নাই, মাদ্রাসায়ও নাই, আছে একমাত্র হেযবুত তওহীদের কাছে।”
পন্নীর মতে বর্তমান পৃথিবীর দেড় শতাধিক মুসলিমের মধ্যে বিদ্যমান সকল নামাযী, রোযাদার, হাজী, পরহেজগার, উলামায়ে কেরাম এবং ওলীআল্লাহ- বুযুর্গদের কেউই প্রকৃত ইসলামের উপর নেই! সবাই পথভ্রষ্ট-গোমরাহ হয়ে গেছে! (নাউযুবিল্লাহ!) অথচ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
«لا تزال طائفة من أمتى قائمة بأمر الله لا يضرهم من خذلهم أو خالفهم حتى يأتى أمر الله وهم ظاهرون على الناس».
আমার উম্মাতের একদল লোক সর্বদাই হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। তাদের সঙ্গ ত্যাগ করে বা বিরোধিতা করে কেউ তাদের কোনো অনিষ্ট করতে পারবে না। এমন কি এভাবে আল্লাহর আদেশ (অর্থাৎ কিয়ামত) এসে পড়বে আর তারা যেমনটি ছিল তেমনটিই থাকবে।
ইমাম বুখারী রহ. বলেছেন, “নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম) - এর বাণী 'আমার উম্মাতের মধ্যে একদল সর্বদাই হকের উপর বিজয়ী থাকবে'- বলে যাদের বুঝানো হয়েছে, তাঁরা হলেন উলামায়ে কেরাম।”
"উম্মতে মোহাম্মাদীর সকল সদস্য কখনোই গোমরাহ হয়ে যাবে না, দীনে হকের উপর কমপক্ষে একদল লোক সর্বদাই অটল-অবিচল থাকবে”-এই মর্মে চারজন খোলাফায়ে রাশেদীনসহ চল্লিশের বেশি সংখ্যক সাহাবী থেকে বর্ণিত শতাধিক হাদীস রয়েছে। এই বিরাট সংখ্যক হাদীসে যেখানে রাসূলুল্লাহ বলেছেন যে, কিয়ামত পর্যন্ত একদল মানুষ হকের উপর থাকবে, সবাই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে না, সেখানে পন্নী বলছে, সবাই গোমরাহ, পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। যারা 'সবাই খারাপ, শুধুমাত্র আমরা ভালো' বলে, তাদের সম্পর্কেও মহানবী আমাদের নির্দেশনা দিয়ে গিয়েছেন। তিনি বলেছেন-
"إذا قال الرجل : هلك الناس فهو أهلكهم "
“যদি কোনো লোক বলে 'মানুষ বরবাদ হয়ে গেছে' তাহলে সে সব মানুষের চেয়ে বেশি বরবাদ, বেশি ধ্বংসপ্রাপ্ত।”
টিকাঃ
৮৫. এ ইসলাম ইসলামই নয়: পৃষ্ঠা-১২৪
৮৬. মহাসত্যের আহ্বান: পৃষ্ঠা-১৫
৮৭. চলমান সংকট নিরসনে আদর্শিক লড়াই: পৃষ্ঠা-৫
৮৮. চলমান সংকট নিরসনে আদর্শিক লড়াই, পৃষ্ঠা ১৩
৮৯. মুসলিম ১০৩৭, বুখারী ২৭১০
৯০. মুসলিম ২৬২৩