📘 হেযবুত তওহীদ স্বরূপ বিশ্লেষণ 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


জনাব বায়াজীদ খান পন্নী ১৯৯৫ খৃস্টাব্দে 'হেযবুত তওহীদ' প্রতিষ্ঠা করেন। হাজার বছর ধরে চলে আসা ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস ও বিধি-বিধানের ব্যাখ্যার এক নবতর ধারার সূচনা করেন তিনি। শুধু এতটুকুতেই তার দাবি থেমে থাকেনি; তিনি আরো কয়েক কদম এগিয়ে বলে ফেললেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইন্তেকালের পরই তার সমস্ত উম্মাত একেবারে পথভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছে। কেউই আর সঠিক পথে থাকতে পারেনি। ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস ও বিধি-বিধানের হাকিকত তাদের একজনও মনে রাখেনি। আর আজ-এই চৌদ্দশত বছর পর এসে আমাকেই আল্লাহ ইসলামের প্রকৃত রূপরেখা বোলে দিয়েছেন। আমি তাঁর মনোনীত এমাম। আমিই এই যামানার একক নেতা-এমামুযযামান। আল্লাহর ইশারায় আমি এসলামের যে ব্যাখ্যা দিচ্ছি তা-ই ঠিক। বাকি সব ভুল!...

ভালো কথা। তিনি তার 'এসলামে'র ব্যাখ্যা দিতে শুরু করলেন। ধর্মীয় ক্ষেত্রে স্ব-শিক্ষায় 'শিক্ষিত' এই 'পণ্ডিত' সম্পূর্ণ নিজের বুঝ-বুদ্ধির উপর নির্ভর করে আমাদের সামনে একের পর এক যেসব ব্যাখ্যা পেশ করতে থাকলেন, তা দেখে অবাক হতে হতে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। কুরআনের আয়াত ও হাদীসে নববীর এমনসব ব্যাখ্যা তিনি করতে শুরু করলেন যা স্বয়ং 'মুহা ইলাইহি' -যার উপর ওহী নাযিল হয়েছে (অর্থাৎ, নবীজী)-এর ব্যাখ্যারই স্পষ্ট বিপরীত। এমনকি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছ থেকে যারা কুরআন-হাদীস তথা ইসলাম শিক্ষা লাভ করেছেন সেসব সাহাবী এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মের অর্থাৎ, তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ী ও উলামায়ে মুতাকাদ্দিমীনের কারো সঙ্গেই তার সেই 'নবব্যাখ্যা'র কোনো সাদৃশ্য থাকল না।

তার সেসব 'ব্যাখ্যা'র কিছু দৃষ্টান্ত: বর্তমান পৃথিবীতে প্রকৃত এসলামে কেউই নেই, সবাই গোমরাহ হয়ে গেছে; বাইবেল, বেদ, ত্রিপিটক ইত্যাদি সকল ধর্মগ্রন্থই আল্লাহপ্রদত্ত আসমানী কিতাব; মহর্ষী মনু, রাজা রামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির, মহাবীর জৈন, গৌতম বুদ্ধ-এরা সবাই আল্লাহর প্রেরিত নবী ছিলেন; গড, ঈশ্বর, ভগবান ও আল্লাহ সব একই সত্তা; উসমান রা.-এর শাসনামলের আগে কুরআনের কোনো লিখিত কপি ছিল না ইত্যাদি।

তার এই 'নবউদ্ভাবিত' কথাবার্তার হাবভাব দেখে আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সেই বিখ্যাত ভবিষ্যদ্বাণীর কথা মনে পড়ল-
«سيكون في آخر أمتي أناس يحدثونكم ما لم تسمعوا أنتم، ولا آباؤكم ، فإياكم وإياهم»
"আমার উম্মতের শেষাংশে এমন কিছু লোকের আবির্ভাব হবে, যারা তোমাদেরকে (দীনের নামে) এমনসব কথা শোনাবে, যা তোমরা ইতোপূর্বে কোনোদিন শোননি, এমনকি তোমাদের পূর্বসূরী (আলেম- উলামা)গণও কোনোদিন শোনেনি। তখন তোমরা তাদের থেকে দূরে থাকবে, তাদেরকেও তোমাদের থেকে দূরে রাখবে।”

ফলে আমরা-যাদেরকে জনসাধারণ আলেম বলে মনে করে থাকে-নিজেদের যোগ্যতার স্বল্পতা এবং ইলমের কমতি সত্ত্বেও জনসাধারণের উপর্যুপরি দাবীর প্রেক্ষিতে হেযবুত তওহীদ এবং তার প্রতিষ্ঠাতা জনাব বায়াজীদ খান পন্নীর চিন্তাধারা সম্পর্কে যৎকিঞ্চিৎ বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হলাম। সময়ের অভাবে আমরা ইচ্ছা থাকলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলতে পারলাম না এবং বহুক্ষেত্রে বিস্তারিত আলোচনার দাবী থাকলেও সংক্ষেপিত করতে বাধ্য হলাম। আল্লাহ তাআলার তাওফীক হলে ভবিষ্যতে আমাদের বাকী দায়িত্বটুকু পূর্ণ করবো। ইনশা আল্লাহ।

জনাব পন্নীর বক্তব্যগুলো উল্লেখ করতে গিয়ে কখনো কখনো আমাদের হাত কেঁপে উঠেছে, মনে হয়েছে, এসব কথায় সাধারণ পাঠকেরা আবার আক্রান্ত হয়ে যায় কি না। কিন্তু আমরা দায়িত্ব পালনার্থে সেগুলো উদ্ধৃত করতে বাধ্য হয়েছি। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন। সকল অনিষ্ট থেকে আমাদের সবাইকে রক্ষা করুন। পাঠকগণ সেসব পড়ার সময় অবশ্যই নাউযুবিল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ বলে হৃদয়কে পবিত্র করবেন।

পুস্তকটি রচনায় হেযবুত তওহীদের যে সকল গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি গ্রহণ করেছি, সেগুলোর লেখক, প্রকাশকালসহ 'তথ্যনির্দেশ' শিরোনামে বইয়ের শেষে উল্লেখ করেছি। গ্রন্থগুলো আমাদের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে। আমাদের সংগ্রহে নেই-এমন কোনো বইয়ের উদ্ধৃতি উল্লেখ করিনি। হাদীসের উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে 'আল-মাকতাবাতুশ শামিলা'র সহায়তাও গ্রহণ করেছি। বইটি আমাদের সাধ্যমত নির্ভুল করার চেষ্টা করেছি। তারপরও যদি কোনো ভুল দৃষ্টিগোচর হয়, আমাদের অবহিত করলে পরবর্তী সংস্করণে আমরা ঠিক করে দেব। ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা ও তাঁর হাবীব রাহমাতুল্লিল আলামীন এবং তাঁর একমাত্র পছন্দনীয় ধর্ম ইসলাম এবং সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ কুরআনুল কারীমের বিরুদ্ধে অশোভন নিন্দামূলক (blasphemous) অপপ্রচারের প্রতিরোধে এ সামান্য প্রচেষ্টাকে মহান আল্লাহ আমার, আমার পিতামাতা, স্ত্রী, সকল পাঠক ও দীনের সকল প্রচারকের বিশেষ করে যারা পুস্তিকাটির ক্ষেত্রে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন-সবার নাজাতের ওসীলা হিসেবে কবুল করুন। আল্লাহ তাআলা নিজ অনুগ্রহে আমাদেরকে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তাঁর দীনের ওপর কায়িম রাখুন এবং ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু নসীব করুন। আমীন।

-মুশাহিদ আলী

টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম: হাদীস-১৫; মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-৮২৫০

📘 হেযবুত তওহীদ স্বরূপ বিশ্লেষণ 📄 বিভ্রান্তির ক্রমধারা

📄 বিভ্রান্তির ক্রমধারা


অনেক আগে থেকেই কিছু মানুষ ছিল, যারা কুরআন-সুন্নাহর বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে সাহাবায়ে কিরাম, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈনসহ (যারা ছিলেন ইসলামের সর্বোত্তম যুগের সেরা মানব) ইমামগণের সর্বসম্মত ও স্বীকৃত বিষয়সমূহের বিপরীত মতাদর্শ পোষণ করে নিজেরা পথভ্রষ্ট হয়েছে, মানুষকেও সত্যপথ থেকে বিচ্যুত করেছে। শেষ যামানায় আবির্ভূত ভ্রান্ত চিন্তার কিছু মানুষ, যাদের মনগড়া ব্যাখ্যা ও মিথ্যা হাদীস বর্ণনা সম্পর্কে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে সতর্ক করে বলেছেন-
«سيكون في آخر أمتي أناس يحدثونكم ما لم تسمعوا أنتم، ولا آباؤكم، فإياكم وإياهم»
'শেষ যামানায় আমার উম্মতের মধ্যে এরূপ কিছু লোকের আবির্ভাব হবে, যারা তোমাদেরকে এমন হাদীস শুনাবে যা তোমরা বা তোমাদের পূর্বপুরুষ (উলামায়ে কেরাম)গণও কখনো শোননি। সুতরাং তোমরা এরকম লোকদের সংশ্রব থেকে সাবধান থাকবে এবং তাদেরকেও তোমাদের নিকট থেকে দূরে রাখবে।'

টিকাঃ
২. মুসলিম: হাদীস-১৫

📘 হেযবুত তওহীদ স্বরূপ বিশ্লেষণ 📄 হেযবুত তওহীদ : সংক্ষিপ্ত পরিচয়

📄 হেযবুত তওহীদ : সংক্ষিপ্ত পরিচয়


হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠাতা বায়াজীদ খান পন্নী ১১ মার্চ ১৯২৫ করটিয়ার পন্নী পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। গ্রামের স্কুলে পাঠ শেষে এইচ.এম. ইনস্টিটিউশন থেকে ১৯৪২ সনে মেট্রিকুলেশান তারপর বগুড়া সরকারী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার ১ম বর্ষ এবং কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে ২য় বর্ষ সমাপ্ত করে। পেশায় একজন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। ১৯৬৩ খৃ. তিনি প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

বায়াজীদ খান পন্নী নিজেকে আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত, মুজিযাপ্রাপ্ত ইত্যাদি বিভিন্ন উদ্ভট দাবী করতে শুরু করেন। নিজের রচিত কিছু বইয়ে তার আকীদা-বিশ্বাস তুলে ধরেন। ১৯৯৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী, তিনি দাউদ মহল, করটিয়া, টাঙ্গাইলে 'হেযবুত তওহীদ' প্রতিষ্ঠা করে। নিজ গ্রামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে তার দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যান। একপর্যায়ে তার উদ্ভট আকীদা-বিশ্বাস ও বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা জনগণের সামনে প্রকাশিত হলে সাধারণ জনতার চাপে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়। প্রথমে সশস্ত্র সংগ্রাম, রাষ্ট্র দখল-এরূপ উগ্রপন্থায় সোচ্চার ছিল- যা তার রচিত গ্রন্থাবলীতে বিদ্যমান। কিন্তু পরবর্তীতে দেশের পরিবেশ সুবিধাজনক না দেখে সুর পরিবর্তন করে জঙ্গিবাদ বিরোধী স্লোগান দিতে শুরু করে। বায়াজীদ খান পন্নী ২০১২ সালে মারা যায়।

📘 হেযবুত তওহীদ স্বরূপ বিশ্লেষণ 📄 হেযবুত তওহীদের আকীদা-বিশ্বাস

📄 হেযবুত তওহীদের আকীদা-বিশ্বাস


'হেযবুত তওহীদের আকীদা-বিশ্বাস' শিরোনামে আলোচনা করতে হলে আবশ্যকভাবেই বইয়ের কলেবর বিরাট আকার ধারণ করবে। আলোচনা-পর্যালোচনার সেই বিস্তৃত পরিসরে প্রবেশের অবকাশ আমাদের নেই। তাই আমরা কয়েকটি বিষয়ে খুব সংক্ষেপে আলোকপাত করার চেষ্টা করব। ইনশাআল্লাহ। প্রথমে আমরা তাদের আকীদা-বিশ্বাস উল্লেখ করব তাদের রচিত এবং নিজস্ব প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত গ্রন্থ থেকে। তারপর সংক্ষেপে জবাব দেয়ার চেষ্টা করব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক ও সহীহ বুঝার এবং মানার তাওফীক দান করুন। আমীন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px