📄 যুবক ভাইদের দৃষ্টি আকর্ষণ!
এ যুগে এটি খুবই আফসোসের বিষয় যে, বিধর্মী কাফের-মুশরিকরা দুনিয়ার চাকচিক্যতা, মান-মর্যাদা ও পৃথিবির কেন্দ্রীয় শাসন ক্ষমতায় নিজেদেরকে অধিষ্ঠিত করেছে। অন্যদিকে শক্তি ও নেতৃত্বহারা যুবসমাজ, দিশেহারা জাতি নিজেদের শৌর্য-বীর্য বিসর্জন দিয়ে উন্মাদের মত তাদের পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের সর্বশেষ ধ্বংসের প্রহর গুনছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, গাফলতির মসনদে বসে দম্ভ ও অসার নীল স্বপ্নের পিছনে দিনাতিপাত করে নিজেদের মূল্যবান সময় ও জীবন দু'টিই নষ্ট করে চলেছে।
সুতরাং যুবক ভাইদের প্রতি প্রশ্ন-
০ হে যুবক! মাঠে-ময়দানে বলের পিছনে এলোপাতাড়িভাবে লাথি দেওয়া যায় এবং তার প্রতিউত্তরও দেওয়া যায়, কিন্তু সালাত আদায় করা যায় না কেন?
০ মুসলমানিত্ব দাবি করা যায় অথচ নিজে ইসলাম থেকে মুক্ত কেন?
০ সে মসজিদ জাঁকজমক করার প্রতি আগ্রহী কিন্তু তাকে মসজিদের কাতারে দেখা যায় না কেন?
০ সে গান শুনতে ভালবাসে-যা শয়তানের বার্তা। অথচ কুরআনুল কারীম-যা আল্লাহ তায়ালার অহি। যা অন্তরের সুস্থতা, মানুষের জন্য রহমত ও হেদায়াত, তা শ্রবণ করা তার সহ্য হয়না কেন?
০ গায়ক, নায়ক, খেলোয়াড়দের সকলকে পছন্দ হয় ও তাদের সংবাদ শুনতে মন চায়, এমনকি তাদের স্ত্রী-সন্তানদের নাম পর্যন্ত মুখস্থ থাকে অথচ যে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তাকে চিনি না কেন?
০ সে নির্লজ্জ কবিতার বই ও ভ্রান্ত বর্ণনা পাঠ করে এবং সমস্ত পত্র-পত্রিকা অধ্যয়ণ করে-যা ধ্বংস ডেকে আনে, অথচ মাসের পর মাস কেটে যায় সে কুরআন স্পর্শ করে না কেন?
০ সে উপদেশ শ্রবণ করে কিন্তু উপদেশ গ্রহণ করে না। সত্য দেখে কিন্তু মানে না। উপদেশ গ্রহণকারীদের প্রতি মনোযোগ দেয় কিন্তু যা বলা হয় তা বাস্তবায়ন করেনা কেন?
📄 যুবক ভাইদের প্রতি বিশেষ নসিহত...
১. দো'আকে নিজের উপর আবশ্যক করে নাও এবং তার নিকট প্রার্থনা কর—যেন তিনি তোমাকে হেদায়াত ও কবুলিয়াতের জন্য সাহায্য করেন এবং গুনাহ্র প্রতি তোমার আগ্রহকে ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেন। আর আল্লাহর নিকট প্রার্থনার জন্য কিছু সময় নির্ধারণ কর-যেমন রাতের শেষ তৃতীয়াংশে এবং আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়।
২. যে সমস্ত বস্তু তোমাকে গুনাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় তা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখ এবং প্রতিটি নেক কাজ শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্য কর এবং ধনী হওয়ার জন্য লালসার পথ থেকে নিজেকে দূরে রাখ। আর এ কথা সর্বদা স্মরণ রাখ-যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কোন কিছু ত্যাগ করে আল্লাহ তাকে আরো উত্তম বস্তু দান করেন।
৩. দৈনন্দিন কুরআন তিলাওয়াত কর ও পাবন্দির সাথে যিকির-আযকার কর। সাথে সাথে ফরয ও নফল ইবাদতগুলিও পালনে মনযোগী হও।
৪. তোমার জন্য আবশ্যক হল জ্ঞানীদের সাথে চলাফেরা করা। আর তাদের সঠিক দিক-নির্দেশনা ও সুপরামর্শ অনুযায়ী ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা।
৫. অতীতের যে বন্ধু-বান্ধব তোমাকে গুনাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় তাদের থেকে বিরত থাক। অতঃপর যখন তুমি ভাল দ্বীনদার হবে এবং তোমার সকল দলিল প্রমাণ পাকাপোক্ত হবে এবং কোন প্রশ্নের সম্মুখীন হলে তার উত্তর দিতে পারবে, তখন তাদেরকে হেদায়াতের পথে আহবান করতে থাক।
৬. তুমি একটি সময় নির্ধারণ কর যা তুমি ধর্মীয় গান শ্রবণ কিংবা সুস্থ-হালাল বিনোদনে ব্যয় করবে। কেননা এর দ্বারা ইমান শক্তিশালী হয় এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মযবুত হয়। সাথে সাথে উপকারী জ্ঞানও বৃদ্ধি পায়।
৭. যখন তোমার আশাপাশের কাউকে হতোদ্যম দেখবে, তখন তাদের অবস্থার উপর দয়ার দৃষ্টি দিও এটা ভেবে যে-তারা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে এবং আল্লাহ তায়ালার নিকট সকলের জন্য হেদায়াতের প্রার্থনা করবে। আর একথা স্মরণ রাখো-জান্নাতে কেবল মুমিন আত্মাই প্রবেশ করবে। মহান আল্লাহ বলেন-
“আর তোমরা ঐ দিনকে ভয় কর, যেদিন তোমরা সকলে আল্লাহর নিকটে ফিরে যাবে। অতঃপর সেদিন প্রত্যেকে স্ব স্ব কর্মের ফল পুরোপুরি পাবে এবং তাদের প্রতি কোনরূপ অবিচার করা হবে না।”
আর কিয়ামতের মাঠের পাঁচটি প্রশ্নের প্রস্তুতি গ্রহণ কর। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
"কিয়ামত দিবসে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার আগ পর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় আল্লাহ তায়ালার নিকট হতে সরাতে পারবেনা। তার জীবনকাল সম্পর্কে-কিভাবে তা অতিবাহিত করেছে? তার যৌবনকাল সম্পর্কে-কি কাজে তা বিনাশ করেছে? তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে-কোথা হতে তা উপার্জন করেছে এবং তা কি কি খাতে খরচ করেছে। এবং সে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল সে মোতাবেক কি কি আমল করেছে?"
টিকাঃ
২১৪. সুরা বাকারা: ২৮১।
২১৫. সুনানু তিরমিযি: ২৪১৬।
📄 যুবকদের প্রতি বিশেষ উপদেশ...
১. তোমরা যে অবস্থায় থাক না কেন আযান শোনার সাথে সাথে নামাযের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করবে।
২. কোরআনকে পাঠ কর এবং এটা নিয়ে গবেষণা কর। যত কম সময়ই হোক না কেন সেটাকে আজেবাজে কাজে ব্যয় কর না।
৩. সবসময় স্পষ্টবাদী হওয়ার চেষ্টা কর-কেননা এর দ্বারা প্রমাণ হবে তুমি যে মুসলিম। আরবি শিখার চেষ্টা কর-কেননা কেবলমাত্র আরবি ভাষার মাধ্যমেই কুরআনকে ভালোভাবে বুঝা সম্ভব।
৪. কোন বিষয়েই মাত্রাতিরিক্ত তর্কে জড়াবে না। কেননা এটা কোন সময় সফলতা বয়ে আনে না।
৫. কখনোই বেশি হাসবে না। কেননা আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত আত্মা সবসময় শান্তচিত্ত ও ভারি হয়।
৬. কখনোই মশকরা করো না। কেননা একটি মুজাহিদ জাতি গম্ভির ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না।
৭. শ্রোতা যতটুকু পছন্দ করে ততটুকুই তোমার আওয়াজকে বড় করো। কেননা এটা স্বার্থপরতা ও অন্যকে নিপীড়ন করার শামিল।
৮. কখনোই কাওকে ছোট করো না। কল্যাণকর ছাড়া অন্য কোন ব্যাপারে কথা বল না।
৯. তোমার প্রতিবেশি কোন ভাই তোমার সাথে পরিচয় হতে না চাইলেও তার সাথে পরিচিত হও।
১০. আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব আমাদের যে সময় দেওয়া হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি। অন্য জনের সময় বাঁচানোর জন্য সবসময় ব্রত হও। যদি তোমার উপর কোন দায়িত্ব অর্পিত হয় সেটাকে সবচেয়ে সহজ পন্থায় ও সুন্দর করে করার চেষ্টা কর।
১১. সবসময় পরিষ্কার পরিছন্নতার দিকে নজর দিবে। তোমাদের ঘর-বাড়ি, পোশাক-পরিচ্ছদ, শরীর ও তোমাদের কাজের জায়গাকে পরিচ্ছন্ন রাখ। কেননা এই দ্বীন পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার উপরেই নির্মিত হয়েছে।
১২. তোমাদের ওয়াদা—তোমাদের কথা ও কাজে সবসময় মিল রাখবে। শর্ত যাই হোক না কেন সর্বদা এর উপর অটল অবিচল থাকবে।
১৩. পড়ালেখায় মনোযোগ দাও। মুসলিমদের প্রকাশিত পত্রপত্রিকা ও ম্যাগাজিন নিয়ে পরস্পর আলোচনা কর। ছোট করে হলেও নিজস্ব একটা লাইব্রেরি গড়ে তুলো। নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে গভীরজ্ঞানের অধিকারী হওয়ার চেষ্টা কর।
১৪. কখনো রাষ্ট্রের মুখাপেক্ষি হবে না। কেননা রিজিক এর সবচেয়ে সংকীর্ণ দরজা হল তাদের দরজা। তবে তোমাদেরকে যদি সুযোগ সুবিধা দেয় সেটাকে প্রত্যাখ্যান কর না। তোমাদের দাওয়াতকে ও তোমাদের নিজস্ব গতিকে স্তব্ধ করে না দেওয়া পর্যন্ত এর থেকে পৃথক হবে না।
১৫. তোমাদের সম্পদের একটা অংশ উম্মাহ্র সিংহপুরুষদের কাছে পৌঁছে দাও। আর ফরজ যাকাত একসাথে করে দাও। সেটার পরিমাণ যত সল্পই হোক না কেন সেখান থেকে গরীব দুঃখীদের দান কর।
১৬. অপ্রত্যাশিত বিপদ আসার আগেই স্বল্প পরিমাণ হলেও সম্পদের একটা অংশকে সঞ্চয় করে রাখ। এবং কখনোই জাঁকজমকপূর্ণ আসবাবপত্র ক্রয়ে সম্পদ ব্যয় কর না।
১৭. সকল অবস্থায় তাওবা ও ইস্তিগফার পাঠ কর। রাতে ঘুমানোর আগে কয়েক মিনিট আত্মসমালোচনা কর। হারাম থেকে বেঁচে থাকার জন্য সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাক।
১৮. বিনোদন এর জায়গা থেকে এই ভেবে দূরে থাক যে এর বিরুদ্ধেই আমার সংগ্রাম। সকল প্রকার প্রসন্নতা ও আরামদায়ক বিষয় থেকে দূরে থাক।
১৯. সকল জায়গায় তোমার দাওয়াতকে বুলন্দ করার চেষ্টা করবে। নিজের নফসের সাথে এমন আচরন করবে, যাতে সে তোমাকে মেনে চলতে বাধ্য হয়। তোমাদের চোখকে হারাম থেকে বিরত রাখ। নিজের আবেগের উপর প্রাধান্য বিস্তার কর।
২০. নিজেকে সর্বদা উম্মাহ্র প্রয়োজনের সাথে সম্পর্কিত রাখ এবং একজন নিবেদিত প্রাণ সেনার মত নেতার আদেশ মানতে সর্বদায় প্রস্তুত থাক। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই নেক উপদেশগুলো যথাযথভাবে আমল করার তৌফিক দান করুন, আমিন।
📄 হে যুবক! এখনই ইবাদতের জন্য তৈরি হও
যৌবনকালের ইবাদতে যুবক-যুবতির পুরস্কার!!
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে যুবক-যুবতি যৌবনে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকবে, আল্লাহ তা'য়ালা তাকে আরশে পাকের ছায়া তলে আশ্রয় দান করবেন।”
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “কোন মুসলমান বান্দার দৃষ্টি যখন কোন নারির সৌন্দর্যের প্রতি প্রথমবার পড়ে যায়, অতঃপর সে তার দৃষ্টি সরিয়ে নেয় (তার দিকে তাকায় না), যার কারণে আল্লাহ তা'য়ালা তাকে এমন ইবাদত করার তাওফিক দান করবেন, যার মিষ্টতা এবং স্বাদ সে অবশ্যই অনুভব করব।”
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি তার জিহ্বা এবং লজ্জাস্থান হেফাজতের দায়িত্ব নিবে, আমি তার জান্নাতের দায়িত্ব নিলাম।”
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তাঁর (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ সে যুবক-যুবতি, যে তার রবের ইবাদতের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে।”
যৌবনের শক্তি ও উদ্যমতা দিয়ে বেশি বেশি ইবাদত করো। হাদিস শরিফে এসেছে, বুদ্ধিমান তো সেই যে নিজেকে উপলব্ধি করতে পারে ও মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করে।
যুবক-যুবতি ভাই ও বোনেরা! মনে রাখবেন, একমাত্র ইসলামের শরিয়ত মোতাবেক চললেই দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি আর শান্তি পাবেন। সবাই ৫ ওয়াক্ত নামায সঠিক সময়ে, শুদ্ধভাবে এবং মনযোগ সহকারে আদায় করার চেষ্টা করি। কারণ নামায যত বেশি সুন্দর হবে, আল্লাহর সাথে সম্পর্কও ততো বেশি সুন্দর হবে। এবং অন্যকে নামাজের দাওয়াত দিন, অসৎ কাজে যেভাবেই পারেন বাধা দিন।
আর বোনদের বলবো-নামাযের সাথে ইসলামিক নিয়মে পর্দা করবেন। লোক দেখানো ফ্যাশনমার্কা হিজাব থেকে বিরত থাকুন।
টিকাঃ
২১৬. সহিহ বুখারি : ৬৮০৬।
২১৭. মুসনাদু আহমাদ: ২২১৭৯।
২১৮. সহিহ বুখারি: ৬৪৭৪।
২১৯. মিশকাতুল মাসাবিহ: ৭০১।
২২০. তিরমিযি শরিফ: ২৪৫৯।