📄 ত্রয়োদশতম উপদেশ
রবিয়াহ বিন কুলসুম বলেন, “আমরা হাসান আল বসরি রহিমাহুল্লাহ্র পাশে জমা হয়ে বসা ছিলাম। তিনি যুবকদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, হে যুবসম্প্রদায়! তোমরা কি ডাগর ডাগর চক্ষুবিশিষ্ট জান্নাতি হুরের আশা কর না?”
এখানে হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ খুবই সুক্ষ্ম ও চমৎকারভাবে যুবকদের দৃষ্টিকে জান্নাত লাভ ও তার নিয়ামত অর্জনের প্রতি ফিরিয়ে দিতে চেয়েছেন। আর জান্নাতের মাঝে রয়েছে সবরকম সুস্বাদু খাবার, আরাম আয়েশের উপকরণ এবং রয়েছে ডাগর ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট অনিন্দ সুন্দরী, আনতনয়না পূর্ণযৌবনা, রূপসী হুর। যাতে করে যুবকদের মনে জান্নাত লাভের প্রফুল্লতা ও তার প্রতি আগ্রহ অন্তরে দানা বাঁধে, আগ্রহ জাগে মনে। আর যখন যুবকদের অন্তরে জান্নাত লাভের আশা পয়দা হবে তখন আল্লাহপাকের তাওফিক ও অনুগ্রহে সে আখিরাত হাসিলের জন্য নেক আমল করার প্রতি ধাবিত হবে এবং জান্নাত লাভে সচেষ্ট হবে।
আর আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন বলেন, “আর যারা আখিরাত কামনা করে এবং মুমিন অবস্থায় তার যথাসাধ্য চেষ্টা সাধনা করে এমন লোকদের চেষ্টাই স্বীকৃত হয়ে থাকে।”
টিকাঃ
১৩৯. ইবনু আবিদ্দুনিয়া প্রণিত সিফাতুল জান্নাহ: ৩১২।
১৪০. সুরা আল ইসরা: ১৯।
📄 চতুর্দশতম উপদেশ
হাসান আল বসরি রহিমাহুল্লাহ হতে বর্ণিত, “তিনি বলেন, হে যুবসম্প্রদায়! তোমরা কাজের বিলম্বিতকরণ হতে বাঁচো, যে কাজটা শিগগির করে নেব, শিগগির করে নেব।”
হাসান রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'তোমরা কাজের বিলম্বিতকরণ হতে বাঁচো'। এটি বলার কারণ হল তাসউইফ বা বিলম্বিতকরণ। এটি এমন একটি খতরনাক রোগ, যে কারণে অধিকাংশ যুবক ধ্বংস হয়েছে। যেমন কেউ বলে— অতিসত্বর তাওবা করে নেব, অতিসত্বর সালাতের প্রতি যত্নবান হবো এবং পিতামাতার সদাচরণ ও তাদের হক আদায় করব। যারা এমন বলে এ ধরণের লোকেরা তা করতে পারে না, কোন কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে পারে না এবং সময়ের যথাযথ মূল্যায়ণ ও তাকে সঠিক কাজে লাগাতে পারে না। বরং সে কাজকে বিলম্বিত করে, রেখে দেয় পরবর্তী সময়ের জন্য। অতঃপর যখন স্বীয় গাফলতি হতে তাওবা করার মনস্থ করে এবং সালাতে মনোযোগি হতে চায় তখনই মুসিবত এসে পতিত হয়। তাকে সরিয়ে দেয় তার সদিচ্ছা হতে, সরিয়ে দেয় তাওবা ও সালাতে মনোযোগি হওয়া থেকে। আর সে কাজকে বিলম্বিত ও স্থগিত করতে থাকে। আর এমতাবস্থাতেই তার বরকতপূর্ণ সময় যৌবনকাল শেষ হয়ে যায়। আর কতেক লোক তো তাওবা করাকে বিলম্বিত করতে করতে শেষবয়সের জন্য রেখে দেয়। অতঃপর সেই বয়স আসার আগেই মৃত্যু তাকে নিয়ে যায় ছোঁ মেরে।
টিকাঃ
১৪১. কিসারুল আমাল লিইবনি আবিদ্দুনিয়া: ২১২।
📄 পঞ্চদশতম উপদেশ...
হাফসা বিনতে সিরিন রহিমাহাল্লাহ বলেন, “হে যুবসম্প্রদায়! তোমরা যৌবনকালে খুব বেশি বেশি ইবাদত করে আত্মতৃপ্তি লাভ কর। রাব্বে কারিমের কসম! আমি যৌবনকাল ছাড়া আমলের ভাল সময় দেখিনি।”
হাফসা রহিমাহাল্লাহ বলেছেন— “আমি যৌবনকাল ছাড়া আমলের ভাল সময় দেখিনি অর্থাৎ যৌবনকাল হল জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল। এটি তার জন্য উত্তম সময়কাল, যদি সে আল্লাহপাকের তাওফিকে এর উত্তম ব্যবহার করতে পারে। পক্ষান্তরে যদি যুবক সময়টাকে সঠিকভাবে কাজে না লাগায়, উপরন্তু এ সময়টির অবহেলা করে এবং এই মূল্যবান সময়কে নষ্ট করে কুপ্রবৃত্তি ও লালসা এবং নফসের অনুসরণে, বিশেষত হারাম কাজ করে তাহলে সে স্বহস্তেই স্বীয় যৌবনকাল নষ্ট করল ও তার ভবিষ্যৎ বরবাদ করল।
যেমন কোন বক্তা বলেন- “যৌবনকালের কামনা-বাসনা যুবকের জন্য হয়ে থাকে খুবই চমৎকার, বৃদ্ধকালে তা হয় আজাবের কারণ।”
সুতরাং যৌবনকালের কাম্যবস্তু খুবই চমৎকার থাকে। যাকে যুবকরা খুবই স্বাদযুক্ত, চটকদার মনে করে। অতঃপর যখন বৃদ্ধ হয়ে যায় তখন সেসব আর তার কাছে ভাল লাগে না। তা তার কাছে একদম অসহ্য ও অস্বস্তিকর এবং আজাব মনে হয়। আর একথা স্বতঃসিদ্ধ যে- যৌবনকাল প্রত্যেকের জীবনের মহামূল্যবান সময়। তাই যুবকের উপর আবশ্যক হল- সে এই সময়টাকে সুন্দরভাবে গুজরান করবে এবং তার যথাযথ মূল্যায়ণ ও সঠিক ব্যবহার করবে। যৌবনকালের পূর্ণাঙ্গ খায়র ও বরকত পাওয়ার জন্য গভীর চেষ্টা ও সাধনা করবে। আল্লাহ তায়ালার সাহায্য ও তাওফিক চাইবে যৌবনকাল সঠিকভাবে ব্যবহার করার জন্য। আর একথা মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কিয়ামত দিবসে এই যৌবনকাল সম্পর্কে কঠিন থেকে কঠিনতর প্রশ্ন করবেন।
টিকাঃ
১৪২. মুখতাসারু কিয়ামিল লাইল: ৪৯।
📄 হে যুবক! যে পথে পাবে সফলতা...
নিশ্চয় প্রত্যেকটি মানুষের দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে নানা ধরণের চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও নানাবিধ আশা-আকাঙ্ক্ষা থাকে। এর রকমফেরের কোন শেষ নেই। আর সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য মানুষের মনে নানামুখী উদ্দেশ্য ও স্বপ্ন কিলবিল করতে থাকে। আর এটাই স্বাভাবিক যে, মানুষ স্বভাবগতভাবে আশা-আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নগুলো তড়িৎ করতে এবং সফল ব্যক্তি হিসাবে নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে নানা পথ ও পন্থা বেছে নেয়। কিন্তু জীবনের বিস্তীর্ণ ময়দান এমন একটি যুদ্ধক্ষেত্র—যাতে রয়েছে নানা রকম কষ্ট-ক্লেশ, বাধা-বিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন- “নিশ্চয়ই আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে শ্রমনির্ভররূপে।”
এ বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে অনেকেরই স্বপ্ন ভঙ্গ হতে পারে, অনেকের স্বপ্ন স্নান বা ফিকে হয়ে যেতে পারে। আবার কারো স্বপ্ন ধরা দেয় বাস্তবে। লক্ষ্যণীয় হল, যখনই দুনিয়ার সফলতা মানুষের হাতে ধরা দেয়, সাধারণত তখনই সে আখেরাত থেকে বিমুখ হতে থাকে। যার ফলে দুনিয়াবী জীবনে সফলতা সত্ত্বেও প্রকৃতপক্ষে সে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হতে থাকে। ফলে কিয়ামতের দিন তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যায়। দুনিয়ার জীবন ক্রমান্বয়ে খুব দ্রুত এগিয়ে চলছে। আর ব্যক্তির মান-মর্যাদা, সুনাম-সুখ্যাতি, সফলতা, ধন-সম্পদ অর্জন ও পদমর্যাদা তো তখনই সফল বাস্তবায়ন হয়--যখন সে পরিপূর্ণরূপে ঈমানি পোষাক পরিধান করে দয়াবান প্রভুর আনুগত্যে প্রবেশ করে। একজন মুসলিম যুবকও এর ব্যতিক্রম নয়। অতএব সবসময় দুনিয়ার বিভিন্ন দুর্ঘটনা ও সংকীর্ণতার মধ্য দিয়েই যৌবন অতিবাহিত হয়। নিম্নে একজন মুসলিম যুবকের সফলতার সোপান সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো:
১. আল্লাহ তায়ালার প্রতি পূর্ণ আস্থা, উত্তম ধারনা পোষণ ও তাঁর রহমতের আশায় বুক বাঁধা।
যখন কোন যুবক তার রিযিকের ক্ষেত্রে ও নিজের সকল বিষয় আল্লাহর প্রতি সোপর্দ করার ব্যাপারে পূর্ণ আস্থাশীল হয় এবং এ বিশ্বাস পোষণ কর যে— প্রকৃত রিযিকদাতা ও মহা দানশীল কেবল তিনিই। তখন আল্লাহ তায়ালা তার জন্য রিযিকের দরজা খুলে দেন এবং অকল্পনীয় স্থান থেকে তার জন্য রিযিকের ব্যবস্থা করেন।
২. সময়মত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা
যৌবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন হলো সময়মত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা। কেননা সালাত সকল কল্যাণের চাবিকাঠি ও মুসলিম জীবনে সকল নেক কাজের উৎস এবং বরকত লাভের সবচেয়ে বড় মাধ্যম।
৩. মহা মহীয়ান আল্লাহর নিকট দো'আ প্রার্থনা করা
অতি দয়ালু, বদান্য, দানশীল মহান প্রতিপালক আল্লাহকে তাঁর সিফাতি নাম ও গুণাবলীসহ দো'আ প্রার্থনা করার মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করা বাঞ্চনীয়। কেননা দো'আ মানুষের রিযিক বৃদ্ধি ও কষ্ট দূর করার অন্যতম একটি মাধ্যম।
৪. পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করা
পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করা, কথাবার্তা ও কাজ কর্ম দ্বারা তাদের প্রতি ইহসান করা ও তাদের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা। তাদের উদ্দেশ্যে বাস্তবায়ন করার ব্যাপারেও সর্বাত্মক চেষ্টা করা এবং তাদেরকে মানুষ থেকে অমুখাপেক্ষী রাখা এবং তাদেরকে পরিপূর্ণরূপে শ্রদ্ধা করা বিশেষ করে যখন তারা বার্ধক্যে পৌঁছে যায়।
৫. আল্লাহর নিকট অধিক পরিমাণে তওবা, ইস্তেগফার করা
আল্লাহর নিকট অধিক পরিমাণে ইস্তেগফার ও তওবা করা। কেননা মুসলিম যুবকের ইস্তেগফার তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে এবং রিযিকের দরজা খুলে দেয় ও তার উপর রহমত বর্ষিত হয়।
৬. দান-সদকা
ফকির-মিসকিনদেরকে দান সদকা করা এবং সাধ্যানুযায়ী সাধারণ মানুষকে প্রতিটি কাজে সহযোগিতা করা। যেমন সুফারিশ, উপদেশ, সঠিক পথ প্রদর্শন, দুশ্চিন্তা মুক্ত করা, ঋণ-পরিশোধ ইত্যাদি। অর্থনৈতিক উন্নতির পিছনে দান-সদকার বিরাট প্রভাব রয়েছে।
৭. পরিকল্পনা মাফিক কাজ করা
প্রতিটি কাজের পেছনে পূর্ব পরিকল্পনা, চিন্তা-ফিকির, সুস্পষ্ট কর্মপদ্ধতি ও লক্ষ্যস্থল নির্ধারণসহ দূরদর্শিতা নিয়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।
৮. অলসতা ও অপারগতা প্রকাশ না করা
কোন কাজে সফলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল সেই কাজে অব্যাহতভাবে লেগে থাকা ও দিন দিন তৎপরতা বৃদ্ধি করা। রিযিক তালাশ করার ক্ষেত্রে চেষ্টা করা এবং বাপ-দাদার সম্মান ও অন্যের উপকারের প্রতি ভরসা করে অলসতা ও অপারগতার উপর নির্ভর না করা।
৯. জ্ঞানীগুণীদের পরামর্শ ও জামা'আতবদ্ধ জীবনযাপন করা
ব্যবসা-বাণিজ্য ও কাজকর্মের ক্ষেত্রে জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তির সাথে পরামর্শ কর যাতে কর্ম পরিচালনায় এমন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পার যে, সার্বিক পরিস্থিতি তোমার শক্তি-সামর্থের অনুকূলে হয়।
১০. অনর্থক আড্ডাবাজি পরিত্যাগ করা
সফল জীবনের জন্য অনর্থক আড্ডাবাজি থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। শয়তানের ফাঁদে পড়া থেকে নিজেকে হেফাযত কর। যেমন অবৈধ প্রেম-ভালবাসা, মদ সেবন এবং এ জাতীয় খারাপ বিষয়াদি।
টিকাঃ
১৪৩. সুরা বালাদ : ৪।
১৪৪. সুরা তালাক: ২-৩।
১৪৫. সুনানু তিরমিযি: ২৩৪৪।
১৪৬. সুনানু তিরমিযি : ২৪৬৬।
১৪৭. সুরা ত্বহা: ১৩২।
১৪৮. সুরা আনকাবুত : ৪৫।
১৪৯. মুসনাদু আহমাদ: ৯৭৭৮।
১৫০. সহিহ বুখারি : ৬৩৮৯।
১৫১. সুরা বনি ইসরাঈল: ২৩-২৪।
১৫২. সহিহ বুখারি : ৫৯৮৬।
১৫৩. সুরা নূহ: ১০-১২।
১৫৪. সহিহ বুখারি: ৬৩০৭।
১৫৫. সুরা সাবা: ৩৯।
১৫৬. সহিহ বুখারি: ৫৩৫২।
১৫৭. সহিহ বুখারি: ১৪৪২।
১৫৮. সুরা আলে-ইমরান: ১৯১।
১৫৯. সুরা নাজম: ৩৯-৪০।
১৬০. সুনানু ইবনু মাজাহ: ৭৯।
১৬১. সহিহ বুখারি: ১৪৭১।
১৬২. সুরা আলে ইমরান: ১৫৯।
১৬৩. সুরা নাহল: ৪৩।
১৬৪. সুরা আলে ইমরান: ১০৪।
১৬৫. সুনানু তিরমিজি: ২১৬৫।