📄 ষষ্ঠ উপদেশ...
উকবা ইবনু আবি হাকিম বলেন, “আমরা আউন বিন আবদুল্লাহ্র কাছে বসা ছিলাম। তখন তিনি আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, হে যুব সম্প্রদায়! আমরা এমনসব লোকদের দেখেছি যারা যৌবনকালে মৃত্যুবরণ করেছে। আর ফসল কাঁটার সময়ে এসে উপনীত হলে তা আর ক্ষেতের মাঝে রেখে দেয়ার অপেক্ষা করা হয় না। বর্ণনাকারী বলেন- তারপর তিনি তাঁর দাঁড়িতে স্পর্শ করেন।”
উল্লিখিত আছারটিতে তিনি ফসল কাঁটার সময় ঘনিয়ে আসার দ্বারা মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসা উদ্দেশ্য নিয়েছেন। দাঁড়িতে স্পর্শ করার দ্বারা উদ্দেশ্য হল- যে ব্যক্তি এ বয়স তথা বার্ধক্যে উপনীত হবে তার-ই ফসল কাঁটা তথা মরণের সময় ঘনিয়ে এসেছে। কেননা ফসল যেমনিভাবে পেকে যায় তখন কাঁটার সময় এসে যায়। তেমনিভাবে যে বৃদ্ধ হয়ে যায় তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসে। আউন বিন আবদুল্লাহ তাদেরকে এসব বলতেন যাতে করে তারা ধোঁকা না খায়। আর এ কারণে অনেক মানুষ বয়োবৃদ্ধ লোকদের দেখে ধোঁকা খেয়েছে। আর নিজেদের ব্যাপারে ধারণা করেছে তাদেরকেও সেসব বৃদ্ধদের মত জীবনকাল দেয়া হবে। এর ফলে তারা নিজেদের জীবনঘনিষ্ঠ, আমলঘনিষ্ঠ অনেক বিষয়েই করেছে অবহেলা ও করেছে গড়িমসি।
যেমন বলা হয়- বৃদ্ধ হল একজন + ধোঁকা খেল সবজনে / ভুলে যাওয়া হল + যৌবনে মরল তাকে।
এ ব্যাপারে হাসান আল বসরি রহিমাহুল্লাহর হিকমাহ সম্বলিত উক্তি রয়েছে- হাসান আল বসরি রহিমাহুল্লাহ একদিন তার সাথে উপবিষ্ট লোকদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন- (যেখানে যুবক, বৃদ্ধ সকলেই ছিল) হে বৃদ্ধামহল! ফসল পেকে গেলে কীসের অপেক্ষা করা হয়? তখন তারা সকলেই বলল, ফসলকে কাঁটার অপেক্ষা করা হয়। অতঃপর তিনি যুবকদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলেন, হে যুবসম্প্রদায়! নিশ্চয় ফসল কাঁটার সময়ে পৌঁছার আগেই তাকে আসমানি মুসিবত পেয়ে বসে।
তাই মুসলিমদের এমন হালত হওয়াই উচিত যা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে- “অর্থাৎ যখন তুমি সন্ধ্যা করবে তখন আর সকালের জন্য অপেক্ষা করো না, আর যখন সকাল করবে তখন আর সন্ধ্যা হওয়ার অপেক্ষা করো না।”
আল্লামা ইবনুল জাওযি রহিমাহুল্লাহ বলেন- “যার জানা নেই যে কখন মৃত্যু আসবে তার জন্য আবশ্যক হল, সর্বদা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা। আর যৌবন ও সুস্থতার দ্বারা ধোঁকা না খাওয়া। কেননা সে ধারণা করে যে, বৃদ্ধ ব্যক্তির বয়স কম আর যুবক বয়স বেশি পেয়ে থাকে।” এর উত্তম দৃষ্টান্ত ও উদাহরণ ঐসব পরিবার ও গোত্র গুলোর মাঝেই লক্ষ্য করা যায়, যার অধিকাংশ মানুষ যৌবনকালে কিংবা শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেছে।
টিকাঃ
[১২৮] আল উমরু ওয়াশ শাইর লিইবনি আবিদ্দুনয়া: ৪২।
[১২৯] সুনানু বায়হাকি, কিতাবুয যুহদ: ৫০০।
[১৩০] সহিহ বুখারিতে বর্ণিত ইবনু উমরের উপর মাওকুফ, হাদিস: ৬৪১৬।
[১৩১] সয়দুল খাতির: ২৪০।
📄 সপ্তম উপদেশ...
কাবুস বিন ইবনু যাবয়ান রহিমাহুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “একদিন আমরা আবু যাবয়ান রহিমাহুল্লাহ্র ইমামতিতে ফজর সালাত আদায় করি। আর মুআজ্জিন ছাড়া আমরা সকলেই ছিলাম যুবক। তিনি সালাম ফিরিয়ে আমাদের দিকে ঘুরে বসেন। এবং আমাদেরকে প্রশ্ন করতে থাকলেন। তুমি কে? তুমি কে? এবং সকলকে উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেয়ার লক্ষ্যে বললেন— নিশ্চয় কোন নবিকে যুবক বানানো ছাড়া প্রেরণ করা হয়নি। আর যুবক অবস্থার চেয়ে উত্তম ইলম কাউকে দেওয়া হয়নি।”
এখানে আবু যাবয়ান রহিমাহুল্লাহ যৌবনকালের কল্যাণ ও বরকতের সঠিক ব্যবহার করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর নিশ্চয় যৌবনকাল এমনই একটি সময় যা পরকালের পাথেয় অর্জন ও ইলম হাসিলের সঠিক সময় এবং আত্মীক প্রফুল্লতা ও শারীরিক শক্তি-সামর্থকে কাজে লাগানোর মোক্ষম সময়।
টিকাঃ
[১৩২] আবু খায়সামার কিতাবুল ইলম: ৮০।
📄 অষ্টম উপদেশ
ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহ আবদুল ওয়াহহাব আসসাকাফি হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আইয়ুব সাখতিয়ানি রহিমাহুল্লাহ আমাদের কাছে তাশরিফ এনে বলতেন, হে যুবসম্প্রদায়! তোমরা পেশাকে গ্রহণ কর। তাহলে তোমাদের এসব আমিরদের তোষামোদী ও চাটুকারিতার প্রয়োজন পড়বে না।”
অর্থাৎ এখানে আইয়ুব সাখতিয়ানি রহিমাহুল্লাহ বুঝাতে চেয়েছেন যে, ইলম অর্জনের পাশাপাশি কোন একটা পেশা থাকা উচিত, যাতে সে টাকা-পয়সা ধন-সম্পদ অর্জন করতে পারে। এবং রিজিক অন্বেষণ করে নিজের প্রয়োজন মিটাতে পারে—এমনকি পরবর্তীতে পরিবার সন্তানাদি ইত্যাদির খোরপোষ দিতে পারে। আর পরিবারকে অন্যের উপর বোঝা না বানানো উচিত। যাতে করে বয়োবৃদ্ধ হওয়ার পরও অমুক লোকের কাছে তমুক লোকের কাছে সাহায্য ও সহযোগিতার জন্য হাত না পাততে হয়। আর নিজের হাতে উপার্জিত রিজিক সবচেয়ে বেশি বরকতপূর্ণ ও বেশি উপকারি এবং সবচেয়ে বেশি পবিত্র।
টিকাঃ
[১৩৩] কিতাবুল ওয়ার-ই: ৯৩।
📄 নবম উপদেশ
জাফর রহিমাহুল্লাহ বলেন, “সাবিত আল বুনানি রহিমাহুল্লাহ আমাদের কাছে তাশরিফ আনলেন। তখন আমরা কিবলার দিকে পিঠ লাগিয়ে বসা ছিলাম। তিনি আমাদেরকে বলতে লাগলেন- হে যুবসম্প্রদায়! আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর রহম করুন। আমি ও আমার রবের ইবাদত এবং রবের প্রতি একনিষ্ঠ সিজদার মাঝে তোমরা আমার প্রতিবন্ধক হয়ে আছো। সাবিত বুনানি রহিমাহুল্লাহ্র কাছে সালাত আদায় করা খুব পছন্দের ছিল।”
এখানে সাবিত আল বুনানি রহিমাহুল্লাহ সেসব যুবকদের প্রতি ইশারা করেছেন—যারা বন্ধু-বান্ধব ও সহপাঠিদের সাথে মসজিদে সাক্ষাত করে এবং সেখানেই জমায়েত হয়। এবং তারা তাদের বন্ধুদের সাক্ষাতকে সুযোগ মনে করে মসজিদের মাঝেই সমুচ্চস্বরে গালগল্পে মেতে উঠে। এতে করে আসে আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের উদ্দেশ্যে মসজিদে আসে এবং স্বীয় সালাতে একনিষ্ঠতা, বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন করে থাকে তাদের সালাত ও ইবাদতের মাঝে এসব যুবকরা প্রতিবন্ধক হয়ে থাকে। তাদের শোরগোলের কারণে সালাতের খুশু খুজু বা বিনয় ও নম্রতা চলে যায়।
বর্তমান যুগ হল সাইন্স, টেকনোলজি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যুগ। এ যুগের যুবকরা পকেটে মোবাইল ফোন নিয়েই মসজিদে প্রবেশ করে। আর তাদের মোবাইলের রিংটোনের আওয়াজে মুসল্লিদের সালাতের খুশু খুজু ও একাগ্রতা বরবাদ হয়ে যায়। কখনো কখনো মোবাইলে উঁচু আওয়াজে কথা বলে মসজিদের বেহুরমতি করা হয় ও সালাতে ব্যাঘাত ঘটায়। এভাবেই প্রশান্তি, শীতলতা ও আরামের জায়গা মসজিদের পরিবেশকে অশান্তি ও অসহ্যকর এক পরিবেশে রূপ দেয়।
টিকাঃ
[১৩৪] হিলয়াতুল আউলিয়া: ২/৩২২