📄 চতুর্থ উপদেশ...
যায়দ ইবনু আবিয যারকা বলেন, “সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বের হলেন। এমতাবস্থায় আমরা তার দরজার সামনে দন্ডায়মান ছিলাম। তিনি তখন আমাদের উদ্দেশ্য করে বলেন- হে যুবসম্প্রদায়! এই ইলমের বরকত তাড়াতাড়ি হাসিল কর। কারণ, তোমরা জানোনা যে তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য পর্যন্ত পৌছতে পারবে কিনা, তাই ইলমের অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে একে অপরের থেকে ইলমি ফায়দা নাও।”
সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ্র উক্তি- 'এই ইলমের বরকত তাড়াতাড়ি হাসিল কর' এর মানে হল— তোমরা তোমাদের যৌবনকালের সুন্দর ব্যবহার কর, সঠিক কাজে ব্যবহার কর। কারণ, মানুষ যখন বৃদ্ধ হয়ে যায় তখন তার মাঝে যৌবনকালের মত প্রফুল্লতা ও কর্মে চাঞ্চল্য থাকে না। থাকে না মেধা ও স্মৃতিশক্তি, যার কারণে সে মুখস্থ করতে পারে না, মনে রাখতে পারে না। তদুপরি তার উপর যখন একের পর এক দায়িত্ব আসে তখন তা তার জন্য ধ্বংসাত্মক বিষয়ে পরিণত হয়। যৌবনকালে তার মাঝে এসব বিষয় থাকা উচিত নয়। তাছাড়া যৌবনকাল চলেও যায় তাড়াতাড়ি।
যেমন ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রহিমাহুল্লাহ বলেন- “আমি যৌবনকাল অতিবাহিত হওয়াটা ততটুকুই অনুভব করেছি যতটুকু অনুভূত হয় কোন মানুষের আস্তিনে রাখা জিনিষ পড়ে গেলে।”
সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ্র উক্তি- 'তোমরা জানোনা যে তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে কিনা' এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল- যে যুবক অনেক পরিমাণ ইলম হাসিল করতে চায় ও অনেক কিতাব মুখস্থ ও অধ্যায়ণ করার ইচ্ছে করে থাকে। তাছাড়াও বিভিন্ন কিছুর আশা করে, কিন্তু মেহনত মুজাহাদা না করার কারণে তা অর্জন করতে পারে না। কিন্তু যখনই যুবক চেষ্টা মেহনত করে, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে এবং যৌবনকালের সময়টাকে যথাযথ কাজে লাগায় তখনই সে আল্লাহর অনুগ্রহ ও বরকতে ভাল কিছু হাসিল করে থাকে। আর আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
“আর যারা আমার রাস্তায় মেহনত মুজাহাদা করে আমি তাদের জন্য বিভিন্ন পথ খুলে দিই। আর নিশ্চয় আল্লাহপাক অনুগ্রহশীলদের সাথে রয়েছেন।”
'তোমরা একে অপরের থেকে ইলমি ফায়দা নাও' এখানে সুফিয়ান সাওরি রহ. যুবকদের একে অপরের সাক্ষাতকে গণিমত মনে করে তার কাছ থেকে উপকার (ইলম) হাসিল করা এবং পরস্পর সুন্দরভাবে ইলমি মুজাকারা করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন।
টিকাঃ
[১২২] হিলয়াতুল আউলিয়া : ৬/৩৭০।
[১২৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/৩০৫।
[১২৪] সুরা আনকাবুত : ২৯।
📄 পঞ্চম উপদেশ
হাসান আল বসরি রহিমাহুল্লাহ যুবকদেরকে উপদেশ দিয়ে বলতেন- “হে যুবসম্প্রদায়! তোমাদের উপর আবশ্যক হল যে তোমরা আখিরাতকে অর্জন করবে। অতএব, তোমরা তা-ই কামনা কর। কেননা, আমরা দেখেছি যারা আখিরাতকে কামনা করেছে তার অধিকাংশই আখিরাতের সাথে সাথে দুনিয়াকেও পেয়েছে। আর এমন কাউকে দেখিনি যে, দুনিয়া কামনা করেছে আর তার সাথে আখিরাতকেও পেয়েছে।”
এটি যুবকদের প্রতি হাসান আল বসরি রহিমাহুল্লাহ্র পক্ষ হতে গুরুত্বপূর্ণ একটি সতর্কতামূলক নসিহত। তিনি যুবকদের এ ধরণের নসিহত প্রদান করতেন, যাতে করে যুবকরা আখিরাত অর্জনের করতে সচেষ্ট হয়, আখিরাতে মুক্তি ও সফলতার কাজ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়। এবং সময়গুলোকে ব্যয় করে মহান রবের নৈকট্য অর্জন করার আমলের মাঝে। যদি যুবকরা এগুলো করে তাহলে তাকে আল্লাহপাক তার নির্ধারিত অংশ তথা আল্লাহর নৈকট্য দান করবেন এবং দুনিয়াতেও তার নির্ধারিত অংশ দিবেন।
উল্লিখিত আলোচনা হতে কারো যেন এ ধারণা না আসে যে—মানুষ দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য রিজিক অন্বেষণ বাদ দিয়ে নিজে চলার জন্য প্রয়োজনীয় খোরপোষ ও আসবাবপত্র ছেড়ে দিয়ে নিজের বোঝা অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়া যাবে। এমনটি করা যাবে না। তবে যার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে দুনিয়া কামানো, যার ইলম অর্জনের মাকসাদ হয় দুনিয়াবি কোন যশখ্যাতি, তাহলে তার জন্য হবে সম্পদ ক্ষতিকারক বস্তু।
যেমন নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়ায় বলতেন- “হে আল্লাহ! দুনিয়াকে আমাদের মূল অভিপ্রায় ও আমাদের ইলম অর্জনের উদ্দেশ্য বানিয়ো না।”
রাসুলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন- “নিশ্চয় তুমি তোমার পরিবারকে ধনী বানিয়ে যাও। যা তাদের জন্য মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়া হতে উত্তম।”
সুতরাং যে ব্যক্তি আখিরাতকে তার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বানিয়ে নেয় আল্লাহ তায়ালা তাকে আখিরাতের সবকিছু দিয়ে থাকেন এবং দুনিয়াও তার অনিচ্ছা ও অনীহা থাকা সত্ত্বেও এমনিতেই এসে যায়। কিন্তু যে দুনিয়াকেই মূল উদ্দেশ্য বানায় আল্লাহপাক তার চোখের সামনেই তাকে দরিদ্র বানিয়ে দেন। অথচ সে দুনিয়াতে ততটুকুই পায় যতটুকু আল্লাহ তায়ালা তার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন।
টিকাঃ
[১২৫] কিতাবুয যুহদ: ১২।
[১২৬] জামিউত তিরমিযি, আবওয়াবুদ দাওয়াহ : ৩৫০২।
[১২৭] সহিহ বুখারি: ১২৯০; সহিহ মুসলিম: ১৬২৮।
📄 ষষ্ঠ উপদেশ...
উকবা ইবনু আবি হাকিম বলেন, “আমরা আউন বিন আবদুল্লাহ্র কাছে বসা ছিলাম। তখন তিনি আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, হে যুব সম্প্রদায়! আমরা এমনসব লোকদের দেখেছি যারা যৌবনকালে মৃত্যুবরণ করেছে। আর ফসল কাঁটার সময়ে এসে উপনীত হলে তা আর ক্ষেতের মাঝে রেখে দেয়ার অপেক্ষা করা হয় না। বর্ণনাকারী বলেন- তারপর তিনি তাঁর দাঁড়িতে স্পর্শ করেন।”
উল্লিখিত আছারটিতে তিনি ফসল কাঁটার সময় ঘনিয়ে আসার দ্বারা মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসা উদ্দেশ্য নিয়েছেন। দাঁড়িতে স্পর্শ করার দ্বারা উদ্দেশ্য হল- যে ব্যক্তি এ বয়স তথা বার্ধক্যে উপনীত হবে তার-ই ফসল কাঁটা তথা মরণের সময় ঘনিয়ে এসেছে। কেননা ফসল যেমনিভাবে পেকে যায় তখন কাঁটার সময় এসে যায়। তেমনিভাবে যে বৃদ্ধ হয়ে যায় তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসে। আউন বিন আবদুল্লাহ তাদেরকে এসব বলতেন যাতে করে তারা ধোঁকা না খায়। আর এ কারণে অনেক মানুষ বয়োবৃদ্ধ লোকদের দেখে ধোঁকা খেয়েছে। আর নিজেদের ব্যাপারে ধারণা করেছে তাদেরকেও সেসব বৃদ্ধদের মত জীবনকাল দেয়া হবে। এর ফলে তারা নিজেদের জীবনঘনিষ্ঠ, আমলঘনিষ্ঠ অনেক বিষয়েই করেছে অবহেলা ও করেছে গড়িমসি।
যেমন বলা হয়- বৃদ্ধ হল একজন + ধোঁকা খেল সবজনে / ভুলে যাওয়া হল + যৌবনে মরল তাকে।
এ ব্যাপারে হাসান আল বসরি রহিমাহুল্লাহর হিকমাহ সম্বলিত উক্তি রয়েছে- হাসান আল বসরি রহিমাহুল্লাহ একদিন তার সাথে উপবিষ্ট লোকদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন- (যেখানে যুবক, বৃদ্ধ সকলেই ছিল) হে বৃদ্ধামহল! ফসল পেকে গেলে কীসের অপেক্ষা করা হয়? তখন তারা সকলেই বলল, ফসলকে কাঁটার অপেক্ষা করা হয়। অতঃপর তিনি যুবকদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলেন, হে যুবসম্প্রদায়! নিশ্চয় ফসল কাঁটার সময়ে পৌঁছার আগেই তাকে আসমানি মুসিবত পেয়ে বসে।
তাই মুসলিমদের এমন হালত হওয়াই উচিত যা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে- “অর্থাৎ যখন তুমি সন্ধ্যা করবে তখন আর সকালের জন্য অপেক্ষা করো না, আর যখন সকাল করবে তখন আর সন্ধ্যা হওয়ার অপেক্ষা করো না।”
আল্লামা ইবনুল জাওযি রহিমাহুল্লাহ বলেন- “যার জানা নেই যে কখন মৃত্যু আসবে তার জন্য আবশ্যক হল, সর্বদা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা। আর যৌবন ও সুস্থতার দ্বারা ধোঁকা না খাওয়া। কেননা সে ধারণা করে যে, বৃদ্ধ ব্যক্তির বয়স কম আর যুবক বয়স বেশি পেয়ে থাকে।” এর উত্তম দৃষ্টান্ত ও উদাহরণ ঐসব পরিবার ও গোত্র গুলোর মাঝেই লক্ষ্য করা যায়, যার অধিকাংশ মানুষ যৌবনকালে কিংবা শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেছে।
টিকাঃ
[১২৮] আল উমরু ওয়াশ শাইর লিইবনি আবিদ্দুনয়া: ৪২।
[১২৯] সুনানু বায়হাকি, কিতাবুয যুহদ: ৫০০।
[১৩০] সহিহ বুখারিতে বর্ণিত ইবনু উমরের উপর মাওকুফ, হাদিস: ৬৪১৬।
[১৩১] সয়দুল খাতির: ২৪০।
📄 সপ্তম উপদেশ...
কাবুস বিন ইবনু যাবয়ান রহিমাহুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “একদিন আমরা আবু যাবয়ান রহিমাহুল্লাহ্র ইমামতিতে ফজর সালাত আদায় করি। আর মুআজ্জিন ছাড়া আমরা সকলেই ছিলাম যুবক। তিনি সালাম ফিরিয়ে আমাদের দিকে ঘুরে বসেন। এবং আমাদেরকে প্রশ্ন করতে থাকলেন। তুমি কে? তুমি কে? এবং সকলকে উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেয়ার লক্ষ্যে বললেন— নিশ্চয় কোন নবিকে যুবক বানানো ছাড়া প্রেরণ করা হয়নি। আর যুবক অবস্থার চেয়ে উত্তম ইলম কাউকে দেওয়া হয়নি।”
এখানে আবু যাবয়ান রহিমাহুল্লাহ যৌবনকালের কল্যাণ ও বরকতের সঠিক ব্যবহার করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর নিশ্চয় যৌবনকাল এমনই একটি সময় যা পরকালের পাথেয় অর্জন ও ইলম হাসিলের সঠিক সময় এবং আত্মীক প্রফুল্লতা ও শারীরিক শক্তি-সামর্থকে কাজে লাগানোর মোক্ষম সময়।
টিকাঃ
[১৩২] আবু খায়সামার কিতাবুল ইলম: ৮০।