📘 হে যুবক জান্নাত তোমার প্রতিক্ষায় > 📄 দ্বিতীয় উপদেশ

📄 দ্বিতীয় উপদেশ


হাম্মাদ ইবনু যায়দ বলেন, "আমরা আনাস ইবনু সিরিন রাহিমাহুল্লাহর অসুস্থতার সময় তার দরবারে উপস্থিত হলাম। তখন তিনি বলেছিলেন 'হে যুবসম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। এবং যার কাছ থেকে এই হাদিসগুলো গ্রহণ করছো তাকে ভালভাবে পরখ করে নাও। কেননা তা তোমাদের দ্বীনের অংশ।”

এই উপদেশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ইলম ও হাদিস শিখতে বের হওয়া যুবকের জন্য আবশ্যক হল, এমন ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে ইলম ও হাদিস শিখা-যারা রাসিখ ফিল ইলম বা উক্ত ইলম ও শাস্ত্রের ব্যাপারে দক্ষ, পারদর্শী ও দৃঢ়পদ। এমন ব্যক্তি থেকে ইলম ও হাদিস শিক্ষা করতে হবে যে ব্যক্তি অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ও সুক্ষ্মদর্শী এবং ইলমের পথে মহান। যেনতেন ব্যক্তি থেকে ইলম নেয়া যাবে না, হাদিস গ্রহণ করা যাবে না। কেবল এমন ব্যক্তি থেকেই ইলম হাসিল করতে হবে যে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অনুসারী এবং দ্বীনি জ্ঞানের ক্ষেত্রে বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ।

ইবনু শাওযাব রা. বলেন, “যুবক যখন ইবাদত ও তপস্যার পথকে গ্রহণ করে তখন তার উপর আল্লাহ তায়ালার সবচেয়ে বড় নিয়ামাত হল- সে এমন একজন ব্যক্তিকে সাথি হিসাবে নেয় যে নিজে সুন্নাহ্ পাবন্দি করে এবং তাকেও সে সুন্নাহ্র পাবন্দ বানায়।"

আমর ইবনু কায়স মোল্লায়ি রহিমাহুল্লাহ বলেন- “যদি কোন যুবককে প্রথমে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ্র সাথে প্রতিপালিত হতে দেখ, বড় হতে দেখ (এর মানে হল তাদের সাথে চলাফেরা করে ও তাদের দরসে বসে) তাহলে তার ব্যাপারে তুমি (ভাল কিছুর) আশা কর। আর যদি আহলুল বিদআহ্-এর সাথে তার বেড়ে উঠতে দেখ তাহলে তার কাছ তুমি (ভালো কিছুর ব্যাপারে) নিরাশ হও। কেননা যুবককে তার বেড়ে উঠার প্রথমাবস্থার উপর নির্ভর করে চেনা যায়।” তিনি আরো বলেন, “নিশ্চয় যুবক প্রতিপালিত হয়। যদি যুবকের প্রাথমিক অবস্থা আহলুল ইলমের সাহচর্য বেশি পায়, তাদের সাথে লালিতপালিত হওয়ার উপর প্রাধান্য পায় তাহলে তাকে সমর্থন করা হবে। আর যদি তার প্রাথমিক অবস্থা অতিবাহিত হয় জাহেলদের সুহবতে, তাহলে এমন হয়ে যেতে পারে যে দুইয়ের বদলে চার হয়ে যাবে।”

টিকাঃ
[১১৯] আলজামিউ লিআখলাকির রাওয়ি ওয়া আদাবিস সামি : ১৩৯।
[১২০] আল ইবানাতুল কুবরা লিইবনি বাত্তাহ: ১/২০৪, ক্রমিক নং ৪২, ৪৩, ৪৪।

📘 হে যুবক জান্নাত তোমার প্রতিক্ষায় > 📄 তৃতীয় উপদেশ

📄 তৃতীয় উপদেশ


হযরত মালিক বিন দিনার রহিমাহুল্লাহ বলেন, “যুবকদের মাঝেই খায়র রয়েছে।”

এটি মালিক বিন দিনার রহিমাহুল্লাহ হতে যৌবনকালের মহামূল্যবান সময়ের গুরুত্ব বোঝাতে বিরাট একটি নসিহত। কেননা যদি যুবক তার যৌবনকালের সঠিকভাবে ব্যবহার করে তাহলে সে অনেক উন্নতি সাধন করতে পারবে এবং সে যৌবনকালে যা অর্জন করবে তার জন্য তা হবে সঞ্চিত মূল্যবান সম্পদ ও অবলম্বন এবং স্থায়ী উৎস, যা তার মৃত্যু পর্যন্ত নিজের ও উম্মাহ্র উপকারস্বরূপ থাকবে। এবং অন্যের জন্য তা হবে কল্যাণকামনা।

আর যদি সে তার যৌবনকালের সঠিক ও যথাযথ ব্যবহার না করে তাহলে সে অবশ্যই যৌবনকালের খায়র ও বরকত থেকে মাহরুম হয়ে নিজের জীবন নষ্ট করল। নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারল। আর যখন যুবকদের মাঝে একসাথে পাওয়া যায় যৌবনে দুরন্তপনা, যৌবন শক্তি, সময়ের অবসরতা ও হাত ভর্তি টাকা-পয়সা তাহলে তা তাদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক জিনিষ হয়ে উঠে।

সুতরাং যখন যৌবনশক্তি, সময়ের অবসরতা ও ধনসম্পদের প্রাচুর্যতার সাথে মিলিত হয় চতুর্থ আরেকটি জিনিষ—তা হল অধিক পরিমাণে ফিতনা, একাকিত্ব এবং একাধিক কর্মস্থল; তাহলে তা যুবকদের জন্য মারাত্মক ধ্বংসের বিষয় হবে, যা তাকে যৌবনকালে বড় বড় অপরাধে লিপ্ত করে যৌবনকালের খায়র ও বরকত হতে মাহরুম করবে। যৌবনকালের খায়র ও বরকতের ব্যাপারে সচেতন করতেই মালিক বিন দিনার রহিমাহুল্লাহ বলেন-“নিশ্চয়ই খায়র রয়েছে যৌবনকালে"। যাতে আল্লাহ তায়ালা যুবকদেরকে তাঁর সাহায্যে যৌবনকালের সঠিক ব্যবহার করার তাওফিক দান করেন যেভাবে তিনি পছন্দ করেন।

টিকাঃ
[১২১] আলজামিউ লিআখলাকির রাওয়ি ওয়া আদাবিস সামি: ২৭৩।

📘 হে যুবক জান্নাত তোমার প্রতিক্ষায় > 📄 চতুর্থ উপদেশ...

📄 চতুর্থ উপদেশ...


যায়দ ইবনু আবিয যারকা বলেন, “সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বের হলেন। এমতাবস্থায় আমরা তার দরজার সামনে দন্ডায়মান ছিলাম। তিনি তখন আমাদের উদ্দেশ্য করে বলেন- হে যুবসম্প্রদায়! এই ইলমের বরকত তাড়াতাড়ি হাসিল কর। কারণ, তোমরা জানোনা যে তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য পর্যন্ত পৌছতে পারবে কিনা, তাই ইলমের অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে একে অপরের থেকে ইলমি ফায়দা নাও।”

সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ্র উক্তি- 'এই ইলমের বরকত তাড়াতাড়ি হাসিল কর' এর মানে হল— তোমরা তোমাদের যৌবনকালের সুন্দর ব্যবহার কর, সঠিক কাজে ব্যবহার কর। কারণ, মানুষ যখন বৃদ্ধ হয়ে যায় তখন তার মাঝে যৌবনকালের মত প্রফুল্লতা ও কর্মে চাঞ্চল্য থাকে না। থাকে না মেধা ও স্মৃতিশক্তি, যার কারণে সে মুখস্থ করতে পারে না, মনে রাখতে পারে না। তদুপরি তার উপর যখন একের পর এক দায়িত্ব আসে তখন তা তার জন্য ধ্বংসাত্মক বিষয়ে পরিণত হয়। যৌবনকালে তার মাঝে এসব বিষয় থাকা উচিত নয়। তাছাড়া যৌবনকাল চলেও যায় তাড়াতাড়ি।

যেমন ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রহিমাহুল্লাহ বলেন- “আমি যৌবনকাল অতিবাহিত হওয়াটা ততটুকুই অনুভব করেছি যতটুকু অনুভূত হয় কোন মানুষের আস্তিনে রাখা জিনিষ পড়ে গেলে।”

সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ্র উক্তি- 'তোমরা জানোনা যে তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে কিনা' এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল- যে যুবক অনেক পরিমাণ ইলম হাসিল করতে চায় ও অনেক কিতাব মুখস্থ ও অধ্যায়ণ করার ইচ্ছে করে থাকে। তাছাড়াও বিভিন্ন কিছুর আশা করে, কিন্তু মেহনত মুজাহাদা না করার কারণে তা অর্জন করতে পারে না। কিন্তু যখনই যুবক চেষ্টা মেহনত করে, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে এবং যৌবনকালের সময়টাকে যথাযথ কাজে লাগায় তখনই সে আল্লাহর অনুগ্রহ ও বরকতে ভাল কিছু হাসিল করে থাকে। আর আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
“আর যারা আমার রাস্তায় মেহনত মুজাহাদা করে আমি তাদের জন্য বিভিন্ন পথ খুলে দিই। আর নিশ্চয় আল্লাহপাক অনুগ্রহশীলদের সাথে রয়েছেন।”

'তোমরা একে অপরের থেকে ইলমি ফায়দা নাও' এখানে সুফিয়ান সাওরি রহ. যুবকদের একে অপরের সাক্ষাতকে গণিমত মনে করে তার কাছ থেকে উপকার (ইলম) হাসিল করা এবং পরস্পর সুন্দরভাবে ইলমি মুজাকারা করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন।

টিকাঃ
[১২২] হিলয়াতুল আউলিয়া : ৬/৩৭০।
[১২৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/৩০৫।
[১২৪] সুরা আনকাবুত : ২৯।

📘 হে যুবক জান্নাত তোমার প্রতিক্ষায় > 📄 পঞ্চম উপদেশ

📄 পঞ্চম উপদেশ


হাসান আল বসরি রহিমাহুল্লাহ যুবকদেরকে উপদেশ দিয়ে বলতেন- “হে যুবসম্প্রদায়! তোমাদের উপর আবশ্যক হল যে তোমরা আখিরাতকে অর্জন করবে। অতএব, তোমরা তা-ই কামনা কর। কেননা, আমরা দেখেছি যারা আখিরাতকে কামনা করেছে তার অধিকাংশই আখিরাতের সাথে সাথে দুনিয়াকেও পেয়েছে। আর এমন কাউকে দেখিনি যে, দুনিয়া কামনা করেছে আর তার সাথে আখিরাতকেও পেয়েছে।”

এটি যুবকদের প্রতি হাসান আল বসরি রহিমাহুল্লাহ্র পক্ষ হতে গুরুত্বপূর্ণ একটি সতর্কতামূলক নসিহত। তিনি যুবকদের এ ধরণের নসিহত প্রদান করতেন, যাতে করে যুবকরা আখিরাত অর্জনের করতে সচেষ্ট হয়, আখিরাতে মুক্তি ও সফলতার কাজ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়। এবং সময়গুলোকে ব্যয় করে মহান রবের নৈকট্য অর্জন করার আমলের মাঝে। যদি যুবকরা এগুলো করে তাহলে তাকে আল্লাহপাক তার নির্ধারিত অংশ তথা আল্লাহর নৈকট্য দান করবেন এবং দুনিয়াতেও তার নির্ধারিত অংশ দিবেন।

উল্লিখিত আলোচনা হতে কারো যেন এ ধারণা না আসে যে—মানুষ দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য রিজিক অন্বেষণ বাদ দিয়ে নিজে চলার জন্য প্রয়োজনীয় খোরপোষ ও আসবাবপত্র ছেড়ে দিয়ে নিজের বোঝা অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়া যাবে। এমনটি করা যাবে না। তবে যার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে দুনিয়া কামানো, যার ইলম অর্জনের মাকসাদ হয় দুনিয়াবি কোন যশখ্যাতি, তাহলে তার জন্য হবে সম্পদ ক্ষতিকারক বস্তু।

যেমন নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়ায় বলতেন- “হে আল্লাহ! দুনিয়াকে আমাদের মূল অভিপ্রায় ও আমাদের ইলম অর্জনের উদ্দেশ্য বানিয়ো না।”

রাসুলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন- “নিশ্চয় তুমি তোমার পরিবারকে ধনী বানিয়ে যাও। যা তাদের জন্য মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়া হতে উত্তম।”

সুতরাং যে ব্যক্তি আখিরাতকে তার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বানিয়ে নেয় আল্লাহ তায়ালা তাকে আখিরাতের সবকিছু দিয়ে থাকেন এবং দুনিয়াও তার অনিচ্ছা ও অনীহা থাকা সত্ত্বেও এমনিতেই এসে যায়। কিন্তু যে দুনিয়াকেই মূল উদ্দেশ্য বানায় আল্লাহপাক তার চোখের সামনেই তাকে দরিদ্র বানিয়ে দেন। অথচ সে দুনিয়াতে ততটুকুই পায় যতটুকু আল্লাহ তায়ালা তার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন।

টিকাঃ
[১২৫] কিতাবুয যুহদ: ১২।
[১২৬] জামিউত তিরমিযি, আবওয়াবুদ দাওয়াহ : ৩৫০২।
[১২৭] সহিহ বুখারি: ১২৯০; সহিহ মুসলিম: ১৬২৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00