📄 শেষ কথা...
হে যুবক! তুমি যদি আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াসে জান্নাতের আমল করে জান্নাতকে কিনে নাও তাহলে সৃষ্টিকুলে শ্রেষ্ঠ মানবের অমিয় বাণীটি স্মরণ করিও, যেখানে তিনি বলেছেন-
“যে ব্যক্তি কাউকে কোনো ভালো কাজের সন্ধান দেয়, তাহলে যে সন্ধান দিল সে ততটুকু সওয়াব পাবে যতটুকু আমলকারী পাবে।”
সুসংবাদ সেসব সৌভাগ্যবান মানবের জন্য যারা পথহারা ব্যক্তিকে জান্নাতের পথে ডাকে ও পথ দেখায়। আর যে আল্লাহকে ভয় করে এবং মানুষকে সঠিক পথে পথিকৃত করেন কেবল আল্লাহর ভালোবাসা ও তার সন্তুষ্টির কামনায়। চাই তা ইন্টারনেট, অনুবাদ ও লেখালেখির মাধ্যমে। তার জন্য প্রিয় নবিজির সে হাদিসই যথেষ্ট যেখানে তিনি বলেছেন-
“আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে প্রফুল্লচিত্ত ও সুখে-শান্তিতে রাখুন যে আমার হাদিস শুনলো এবং তা মুখস্থ করে অন্যের নিকট পৌঁছে দেন। কেননা যার কাছে কোনো হাদিস থাকে তার চেয়ে ঐ ব্যক্তি কখনো অনেক বুঝবান হয়ে থাকে যার কাছে হাদিস পৌঁছানো হয়ে থাকে। আর অনেক ফকিহওয়ালা আছেন যারা ফকিহ নন।"
দরদীর কথা ভুলে যেও না-
আমি তো মরে যাবো রেখে যাবো লিখেছি যা আমি,
হে আমার প্রিয় বন্ধু! আমার জন্য দোয়া করো তুমি।
আল্লাহ হয়ত ক্ষমা করে দিবেন মোরে,
রাখবেন না আমায় তিনি পাপ সাগরে ডুবে।
টিকাঃ
[১১২] সহিহ মুসলিম : ১৩৩।
📄 প্রথম উপদেশ
আবুল আহওয়াস হতে বর্ণিত, আবু ইসহাক (তিনি হলেন আমর সাবিয়ী) বলেছেন, “হে যুবসম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের যৌবনকালকে গণিমত মনে করে তার সঠিক ব্যবহার কর ও সঠিকভাবে কাজে লাগাও। খুব কম রাতই আমার এমন অতিবাহিত হয়েছে যে রাতে হতে আমি একহাজার আয়াত কুরআন তিলাওয়াত করিনি। আর অবশ্যই আমি এক রাকাতে সুরা বাকারা তিলাওয়াত করে থাকি। এবং আশহুরুল হুরুম তথা নিষিদ্ধ মাসসমূহ ও প্রতি মাসে তিনদিন এবং সোমবার ও বৃহস্পতিবার সাওম পালন করে থাকি। অতঃপর তিলাওয়াত করেন- আর তুমি তোমার রবের নিআমত বর্ণনা কর।"
আবু ইসহাক রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'প্রতিরাতে আমি এক হাজার আয়াত কুরআন তিলাওয়াত করে থাকি' এ কথার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, একহাজার অথবা তার কাছাকাছি সংখ্যার প্রতি ইঙ্গিত প্রদানকরণ; নির্দিষ্ট বা সীমাবদ্ধকরণ নয়। অর্থাৎ তিনি প্রতি সপ্তাহে একবার কুরআন খতম করতেন। আর প্রতি সপ্তাহে একবার কুরআন শরিফ খতম করা অধিকাংশ পূর্বসুরি সালাফদের তরিকা।
সালাফগণ অপর ভাইয়ের প্রতি নেক আমলের উৎসাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে নিজের আমলের কথা উল্লেখ করতেন। হাকিম আবু আবদিল্লাহ নিশাপুরি রহিমাহুল্লাহ তার মুস্তাদরাকে বর্ণনা করেছেন- আমর বিন মায়মুন কোন মুসলিম ভাইয়ের সাক্ষাত হলে বলতেন—গত রজনীতে আল্লাহপাক আমাকে এত রাকাত সালাত আদায় করার তাওফিক দিয়েছেন এবং অমুক অমুক উত্তম কাজ করার তাওফিক দিয়েছেন।
আবু আবদিল্লাহ হাকিম উল্লিখিত আছার দুটি তার কিতাব মুস্তাদরাকে আনার পর বলেন—আমর ইবনু উবায়দুল্লাহ আসসাবিয়ি ও আমর ইবনু মায়মুন আল আওদিকে আল্লাহপাক রহম করুন। অবশ্যই তারা এমন অসিয়ত বর্ণনা করেছেন, যা যুবকদেরকে ইবাদত বন্দেগিতে মশগুল হতে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করে।
আর আছার দুটিতে তরবিয়াতি আদর্শ ও নমুনা পেশ করা হয়েছে। যুবকরাও এই মাকাম ও মর্যাদা পেতে আগ্রহী। এর উল্লেখের কারণ—যাতে যুবকরা নেক আমলে উৎসাহিত হয়, আর এতে তাদের জন্য দ্বীনের উপর চলা সহজ হয়ে যায়। তবে শিক্ষক বা গুরুজনের উচিত হল তারা তাদের নিয়্যাতকে খালিস করা ও সুন্দর ইচ্ছার প্রতি জোর দেওয়া, যাতে সে রিয়া- লোক দেখানোতে পতিত না হয়, অহংকার না করে, অন্যথায় এই অহংকার বা লৌকিকতার কারণে তার আমলসমূহ বরবাদ হয়ে যাবে।
টিকাঃ
[১১৭] মুস্তাদরাকে লিল হাকিম: ৩৯৪৭।
[১১৮] মুস্তাদরাকে লিল হাকিম: ৪৮।
📄 দ্বিতীয় উপদেশ
হাম্মাদ ইবনু যায়দ বলেন, "আমরা আনাস ইবনু সিরিন রাহিমাহুল্লাহর অসুস্থতার সময় তার দরবারে উপস্থিত হলাম। তখন তিনি বলেছিলেন 'হে যুবসম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। এবং যার কাছ থেকে এই হাদিসগুলো গ্রহণ করছো তাকে ভালভাবে পরখ করে নাও। কেননা তা তোমাদের দ্বীনের অংশ।”
এই উপদেশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ইলম ও হাদিস শিখতে বের হওয়া যুবকের জন্য আবশ্যক হল, এমন ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে ইলম ও হাদিস শিখা-যারা রাসিখ ফিল ইলম বা উক্ত ইলম ও শাস্ত্রের ব্যাপারে দক্ষ, পারদর্শী ও দৃঢ়পদ। এমন ব্যক্তি থেকে ইলম ও হাদিস শিক্ষা করতে হবে যে ব্যক্তি অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ও সুক্ষ্মদর্শী এবং ইলমের পথে মহান। যেনতেন ব্যক্তি থেকে ইলম নেয়া যাবে না, হাদিস গ্রহণ করা যাবে না। কেবল এমন ব্যক্তি থেকেই ইলম হাসিল করতে হবে যে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অনুসারী এবং দ্বীনি জ্ঞানের ক্ষেত্রে বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ।
ইবনু শাওযাব রা. বলেন, “যুবক যখন ইবাদত ও তপস্যার পথকে গ্রহণ করে তখন তার উপর আল্লাহ তায়ালার সবচেয়ে বড় নিয়ামাত হল- সে এমন একজন ব্যক্তিকে সাথি হিসাবে নেয় যে নিজে সুন্নাহ্ পাবন্দি করে এবং তাকেও সে সুন্নাহ্র পাবন্দ বানায়।"
আমর ইবনু কায়স মোল্লায়ি রহিমাহুল্লাহ বলেন- “যদি কোন যুবককে প্রথমে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ্র সাথে প্রতিপালিত হতে দেখ, বড় হতে দেখ (এর মানে হল তাদের সাথে চলাফেরা করে ও তাদের দরসে বসে) তাহলে তার ব্যাপারে তুমি (ভাল কিছুর) আশা কর। আর যদি আহলুল বিদআহ্-এর সাথে তার বেড়ে উঠতে দেখ তাহলে তার কাছ তুমি (ভালো কিছুর ব্যাপারে) নিরাশ হও। কেননা যুবককে তার বেড়ে উঠার প্রথমাবস্থার উপর নির্ভর করে চেনা যায়।” তিনি আরো বলেন, “নিশ্চয় যুবক প্রতিপালিত হয়। যদি যুবকের প্রাথমিক অবস্থা আহলুল ইলমের সাহচর্য বেশি পায়, তাদের সাথে লালিতপালিত হওয়ার উপর প্রাধান্য পায় তাহলে তাকে সমর্থন করা হবে। আর যদি তার প্রাথমিক অবস্থা অতিবাহিত হয় জাহেলদের সুহবতে, তাহলে এমন হয়ে যেতে পারে যে দুইয়ের বদলে চার হয়ে যাবে।”
টিকাঃ
[১১৯] আলজামিউ লিআখলাকির রাওয়ি ওয়া আদাবিস সামি : ১৩৯।
[১২০] আল ইবানাতুল কুবরা লিইবনি বাত্তাহ: ১/২০৪, ক্রমিক নং ৪২, ৪৩, ৪৪।
📄 তৃতীয় উপদেশ
হযরত মালিক বিন দিনার রহিমাহুল্লাহ বলেন, “যুবকদের মাঝেই খায়র রয়েছে।”
এটি মালিক বিন দিনার রহিমাহুল্লাহ হতে যৌবনকালের মহামূল্যবান সময়ের গুরুত্ব বোঝাতে বিরাট একটি নসিহত। কেননা যদি যুবক তার যৌবনকালের সঠিকভাবে ব্যবহার করে তাহলে সে অনেক উন্নতি সাধন করতে পারবে এবং সে যৌবনকালে যা অর্জন করবে তার জন্য তা হবে সঞ্চিত মূল্যবান সম্পদ ও অবলম্বন এবং স্থায়ী উৎস, যা তার মৃত্যু পর্যন্ত নিজের ও উম্মাহ্র উপকারস্বরূপ থাকবে। এবং অন্যের জন্য তা হবে কল্যাণকামনা।
আর যদি সে তার যৌবনকালের সঠিক ও যথাযথ ব্যবহার না করে তাহলে সে অবশ্যই যৌবনকালের খায়র ও বরকত থেকে মাহরুম হয়ে নিজের জীবন নষ্ট করল। নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারল। আর যখন যুবকদের মাঝে একসাথে পাওয়া যায় যৌবনে দুরন্তপনা, যৌবন শক্তি, সময়ের অবসরতা ও হাত ভর্তি টাকা-পয়সা তাহলে তা তাদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক জিনিষ হয়ে উঠে।
সুতরাং যখন যৌবনশক্তি, সময়ের অবসরতা ও ধনসম্পদের প্রাচুর্যতার সাথে মিলিত হয় চতুর্থ আরেকটি জিনিষ—তা হল অধিক পরিমাণে ফিতনা, একাকিত্ব এবং একাধিক কর্মস্থল; তাহলে তা যুবকদের জন্য মারাত্মক ধ্বংসের বিষয় হবে, যা তাকে যৌবনকালে বড় বড় অপরাধে লিপ্ত করে যৌবনকালের খায়র ও বরকত হতে মাহরুম করবে। যৌবনকালের খায়র ও বরকতের ব্যাপারে সচেতন করতেই মালিক বিন দিনার রহিমাহুল্লাহ বলেন-“নিশ্চয়ই খায়র রয়েছে যৌবনকালে"। যাতে আল্লাহ তায়ালা যুবকদেরকে তাঁর সাহায্যে যৌবনকালের সঠিক ব্যবহার করার তাওফিক দান করেন যেভাবে তিনি পছন্দ করেন।
টিকাঃ
[১২১] আলজামিউ লিআখলাকির রাওয়ি ওয়া আদাবিস সামি: ২৭৩।