📄 জান্নাতের আলোতে আলোকিত হবেন যারা...
মুয়াজ বিন জাবাল রা. বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
“যে ব্যক্তি ক্ষুণরাঙ্গা পিচ্ছিল পথে যুদ্ধের ময়দানে ততক্ষণ জিহাদ করে যতক্ষণ কোনো উটের দুধ দোহন করতে সময় লাগে, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় ক্ষত হবে অথবা কোনো মুজাহিদ যুদ্ধের ময়দানে দুর্ঘটনার শীকার হয় তাহলে সে আখেরাতের ময়দানে এমন অবস্থায় উত্থিত হবে যে-তার শরীরে মেশক আম্বরের মতো সুঘ্রাণ ছড়াতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় ময়দানে বের হবে, তাহলে সে নিজের উপর শাহাদাতের সীল মেরে নিলো।”
ইবনু আসিমিন রহ. বলেন, উপরোক্ত হাদিসে প্রিয়তম প্রভুর রাহে যুদ্ধ করার ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে, “যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করবে এবং এ অবস্থায় যদি সে শহীদ বা কোনো ক্ষত হয়ে যায়, তাহলে আখেরাতের ময়দানে তার ঐ রক্ত সুঘ্রাণ হয়ে ছড়িয়ে পড়বে পুরো জান্নাতবাসীর উপর। যে সুঘ্রাণ উপলব্ধি করবে সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ মানুষেরা। সেদিন ফেরেস্তাকুলও উপস্থিত থাকবেন। এটা শহীদের মহান মর্যাদা। ঐ ব্যক্তিরও যুদ্ধের মহান মর্যাদা অর্জিত হবে যে ব্যক্তি উটের দুধ দোহন সমপরিমান সময় আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে তাঁর মহা বাণীকে উচু করণার্থে। তাহলে সেও জান্নাতের আলোতে আলোকিত হবেন।”
টিকাঃ
[৫৬] সুনানু আবু দাউদ: ২৫৪১।
[৫৭] শরহু রিয়াজুস সালেহিন: ৫/৩২০।
📄 এই যে দেখো জান্নাতি মেহমান
উকবা বিন আমের জুহানি রা. বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
“যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় গিয়ে তার তিন সন্তানহারা হয়ে যায় এবং সে ধৈর্যধারণ করে আল্লাহর কাছে জান্নাত পাওয়ার আশা করে, তাহলে তার জন্য ওয়াজিব হবে।”
ইবনু আসিমিন রহ. বলেন, “যে ব্যক্তি মারা যায় এবং তার ছোট্ট কচি-কচি শিশু থাকে যারা এখনো প্রাপ্ত বয়স্ক হয়নি, তারা মৃত্যুবরণ করলে জান্নাতে যাবে এবং তাদের পিতা-মাতা জাহান্নাম থেকে মুক্তির পর্দা হিসেবে হবে। কিন্তু যদি সন্তান প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে যায়, তখন আর তারা রহমতের কারণ হয় না; যেমন ছোট্টরা হতো। তবে যে ব্যক্তি যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে তার প্রাপ্ত সন্তানকে হারিয়ে তাতে ধৈর্যধারণ করে এবং আল্লাহর কাছে সওয়াবের কামনা করে তাহলে তারাও জান্নাতি মেহমান হবে।”
টিকাঃ
[৫৮] মুসনাদু আহমাদ: ১৭২৯৮।
[৫৯] শরহে রিয়াজুস সালেহিন: ৪/৫৭৫।
📄 কোনো মুমিন শিরকবিহীন মৃত্যুবরণ করলো তিনিও জান্নাতি
খুরাইম রা. বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
“মানুষ চার শ্রেণীর। আমল ছয় শ্রেণীর। (মানুষের প্রকার হলো) ১. ঐ ব্যক্তি যাকে দুনিয়া ও আখেরাতের উভয় জগতে প্রশস্ততা দেওয়া হয়েছে। ২. ঐ ব্যক্তি যাকে দুনিয়াতে প্রশস্ততা দেওয়া হয়েছে কিন্তু আখেরাতে সংকীর্ণ করে দেওয়া হয়েছে। ৩. ঐ ব্যক্তি যাকে দুনিয়াতে সংকীর্ণতা দান করা হয়েছে কিন্তু আখেরাতে প্রশস্ততা দেওয়া হয়েছে। ৪. ঐ ব্যক্তি যাকে দুনিয়া ও আখেরাতে সবখানে সংকীর্ণতা দেওয়া হয়েছে। আর আমলের প্রকার হলো-আবশ্যকীয় আমল দুইটি; এক. যে আমল করবে তাকে সওয়াব আমলের সমান-সমান দেওয়া হবে। দুই. আমলের বিনিময় দশ নেকি থেকে সত্তর নেকি পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হবে। আবশ্যকীয় দুটি হলো-
এক. ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহর সাথে শিরক ব্যতিত মৃত্যুবরণ করেছে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব। দুই. ঐ ব্যক্তি যে কাফির হয়ে শিরক করে মৃত্যুবরণ করেছে তার জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব। আর যে ব্যক্তি কোনো নেক আমল করার ইচ্ছা করলো, কিন্তু সে নেক কাজটি করতে সক্ষম হয়নি। তাহলে আল্লাহ তায়ালা তাকে নেকি দান করবেন। কারণ অন্তরযামী প্রভু তার অন্তরের খবর জানে। আর যে ব্যক্তি কোনো বদআমল করতে ইচ্ছে করে তাহলে তা করার পূর্ব পর্যন্ত তার আমলনামায় কোনো বদআমল লেখা হয় না। যদি করে তাহলে সমান-সমান গুনাহ লেখা হয়; বেশি না। আর যে ব্যক্তি কোনো নেক আমল করে তাহলে তার জন্য দশগুণ সমপরিমাণ সওয়াব বা নেকি লেখা হয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় কোনো কিছু ব্যয় করে তাহলে তার আমলনামায় সত্তরগুণ সমপরিমাণ লেখা হয়."
ইবনু বায রহ. বলেন, “যে ব্যক্তি তাওহিদের উপর অটল থাকে এবং মালিকের সাথে কাউকে শরিক না করে আর এমতাবস্তায় তার মৃত্যুর টিকিট এসে যায় তাহলে সে জান্নাতি হবে। তবে যদি সে যিনা, চুরি, অন্যায়সহ হরেক রকমের গুনাহও করে, তবুও হতে পারে আল্লাহ তায়ালা তাকে তাঁর অনুগ্রহে ক্ষমা করে দিবেন। কিংবা সে কিছুকাল জাহান্নামের আগুনে প্রজ্জলিত হবে তারপর পূত-পবিত্র করে জান্নাতুর উপযোগী করে তাকে জান্নাত দান করবেন। সে কাফেরের মতো চিরস্থায়ী জাহান্নামি হবে না।”
টিকাঃ
[৬০] মুসনাদু আহমাদ: ১৯০৩৫।
[৬১] ফাতাওয়ায়ে ইবনু বায: ৬/৫১।
📄 ভালো গুনাগুণ যার জান্নাত হবে তাঁর
প্রিয় যুবক ভাই! তোমার ভালো গুণ তোমাকে জান্নাতের ঐ সুমহান আলীশানে পৌঁছে দিবে। যদি আমরা এ দুনিয়ায় মানবের সাথে ভালো আচরণ ও ভালো গুণের কাজ করে যেতে পারি, তাহলে আমাদের এ ভালো কাজের দরুণ আল্লাহ তায়ালা জান্নাত উপহার দিবেন। কতইনা উত্তম প্রিয়তম প্রভুর সে দামি উপহারটি। তাই মানুষের মুখে তোমার ভালো গুণ শুনতে হলে ও জান্নাত পেতে হলে তোমাকে দ্বীনের সঠিক পথে চলতে হবে।
আবিল আসওয়াদ বলেন, "আমি মদিনায় গিয়ে ওমর ইবনু খাত্তাবের সাথে সাক্ষাত করলাম, পথিমধ্যে একটি জানাযা যাচ্ছিলো; তখন সাহাবায়ে কেরাম সে জানাযার প্রশংসা করলেন, তখন ওমর ইবন খাত্তাব রা. বলেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে। আমি তখন তাকে বললাম, কি ওয়াজিব হয়ে গেছে? ওমর রা. তখন বললেন, আমি সেরকমই বললাম যেমন আমার প্রিয়তম নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন। নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, যদি কোনো মুসলমানের উপর কোনো তিনজন ব্যক্তি ভালো বলে প্রশংসা করে, তাহলে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। ওমর বলেন, আমরা বললাম—হে প্রিয়তম রাসুল! যদি দুজনে ভালো বলে তাহলে..? তখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, হ্যাঁ, দুজনে সাক্ষি দিলেও হবে (জান্নাত পাবে)। ওমর রা. বলেন, আমরা প্রিয়তম নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একজনের ব্যাপারে কিছুই জিজ্ঞেস করিনি।”
ইবনু আসিমিন রহ. বলেন, আসলে কোনো ব্যক্তির জান্নাতি হওয়ার ব্যাপারে নবির উপর ওহি নাযিল হয়েছে, নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন সাহাবিকে জান্নাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন এই জন্য যে, তার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে এই মর্মে ওহি এসেছিলো। বলা যায়, এটা প্রিয় নবির জন্য খাস বা বৈশিষ্ট্য।
তবে এক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা হলো, আমরা কারো ব্যাপারে জান্নাত বা জাহান্নামের গ্যারান্টি দিতে পারবো না। তবে যে ক্ষেত্রে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদেরকে জান্নাতি বা জাহান্নামি বলেছেন তাদেরকে আমরা জান্নাতি বা জাহান্নামি বলবো, আমরা কারো ব্যাপারে বানিয়ে কোনো কিছু বলবো না। যেমন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুলাফায়ে রাশেদিন বা চার খলিফার ব্যাপারে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন, এমনিভাবে আরো দশজন সাহাবাদের ব্যপারে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন এবং যাদের ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সরাসরি জান্নাতি বলেছেন। আমরা তাদেরকেই কেবল জান্নাতের সবুজ পাখি বলবো। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আবু বকর জান্নাতি, ওমর জান্নাতি, ওসমান জান্নাতি, আলি জান্নাতি। সাদ বিন ওয়াক্কাস জান্নাতে যাবে, সাঈদ বিন যায়েদ, আব্দুর রহমান বিন আওফ, ওবায়দা বিন জাররাহ, যুবাইর বিন আওয়াম জান্নাতে যাবে। ওকাসা বিন মিহসানও জান্নাতে যাবে।
একদা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আমার এ উম্মতের সত্তর হাজার মানুষ বিনা হিসাবে ও আযাব বিহীন জান্নাতে যাবে, তখন ওকাসা বললেন, হে রাসুল! আপনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন, আল্লাহ যেন আমাকে সে দলের অন্তর্ভুক্ত করে দেন। তখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যাও তুমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত। এরপরে অপর আরেক সাহাবা বলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমার জন্য ও দুয়া করুন যেন আমিও সে দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাই। তখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ওকাসা তোমার আগে বলে ফেলেছে।”
টিকাঃ
[৬২] সহিহুল জামে: ১০৬৯৮।
[৬৩] সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম; শরহে রিয়াজুস সালেহিন: ৪/৫৭২।