📄 এ অবস্থা থেকে মুসলিম তরুণ প্রজন্মের উত্তোরণের পথ কী?
এর থেকে উত্তরণের পথ স্বয়ং তরুণরাই। তারা যদি চায় যে আমরা সংশোধন হবো, তাহলে তাদের সংশোধন হবে। তারা যদি চায় আমরা দ্বিগুণ নষ্ট হবো, তাহলে তারা নষ্ট হবে। সংশোধনের চাবিকাঠি তাদের নিজেদের হাতেই। ফিরে আসার মন্ত্র তাদের কণ্ঠেই। তাই হে মুসলিম তরুণ প্রজন্ম! ফিরে এসো। ফিরে এসো রবের দিকে। নিজেদের সংশোধনে ব্রতী হও। নষ্ট জীবনকে পেছনে ফেলে এগিয়ে এসো আলোর দিকে। ইসলামের শাশ্বত চেতনা হৃদয়ে ধারণ করো। হাতে তুলে নাও আলোর মশাল। জ্বালিয়ে দাও দিকে দিকে ইসলামের নুরের বাতি। হৃদয় থেকে হৃদয়ে প্রজ্জ্বলিত করো ওহির আলো।
📄 অনুতপ্ত অশ্রু
তারা ছিল তিন বন্ধু। একসাথে থাকত, চলত এবং ফিরত। তারা তিনজন ছিল ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত। অবাধ্যতায় লিপ্ত। পরস্পরকে তারা আল্লাহর নাফরমানি ও পাপাচারে সহযোগিতা করত। লোকদের সৎকাজ থেকে বিরত রাখত। অসৎকাজে আদেশ করত। সৌভাগ্যক্রমে আল্লাহ তায়ালা তাদের একজনকে হেদায়েত করলেন। অবাধ্যতা থেকে বাধ্যতার পথে ফিরিয়ে আনেন। অসৎপথ থেকে সৎপথে তুলে আনেন। অন্ধকার থেকে আলোর মিছিলে অংশগ্রহণ করে। তার প্রতি এ ছিল আল্লাহ তায়ালার অপার অনুগ্রহ। কিন্তু বাকি দুজন তখনো অন্যায় ও পাপাচারে নিমজ্জিত। সে চাইল তার বাকি দুই বন্ধুকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে চাইল। তারপর শুরু করল ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। বিভিন্নভাবে সে তাদের বোঝাতে লাগল। তাদের সামনে তুলে ধরতে লাগল তাদের অবাধ্যতা ও আখেরাতে এর ভয়াবহ পরিণামের কথা। অনবরত চেষ্ট করতে লাগল তাদেরকে সত্য ও আলোর পথে আনতে। পাশাপাশি আল্লাহর নিকট তাদের হেদায়েতের জন্য দোয়া করতে লাগল। গভীর রাতে সে তার বন্ধুদের জন্য আল্লাহর দরবারে চোখের অশ্রু ফেলত। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার চেষ্টা ও দোয়া কবুল করলেন। তার চেষ্টার বদৌলতে একদিন তার দুই বন্ধু অবাধ্যতা ও নাফরমানি ছেড়ে দিলো। ফিরে এলো আল্লাহর পথে। ফিরে এলো আলোর পথে। এবার তিন বন্ধু তারা এক পথ ও এক মোহনায় এসে মিলিত হলো। তারা তাদের অতীত জীবনের ভুলের দিকে তাকিয়ে নিদারুণ লজ্জিত হলো। তখন তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল, এতদিন পর্যন্ত তারা নাফরমানি ও পাপাচারে লিপ্ত ছিল। লোকদের সৎকাজ থেকে বিরত রাখত। অসৎকাজে আদেশ করত। এখন তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল, বাকি জীবন তারা আল্লাহর আনুগত্যে কাটাবে। লোকদের সৎকাজের আদেশ করবে। অসৎকাজ থেকে বিরত রাখবে। তাদের বাকি জীবন পরিচালিত হবে একমাত্র আল্লাহর নির্দেশনা এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর অনুসরণ করে।
তিন বন্ধু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল, প্রতিদিন ফজরের আজানের এক ঘণ্টা পূর্বে তারা ঘুম থেকে জাগবে। তখন নিরিবিলি সময়ে একান্তচিত্তে আল্লাহর ইবাদত করবে। তার নিকট কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করবে। কেননা, তারা জেনেছে, রাত্রির শেষ প্রহরের এ সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তখন আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের ডাকতে থাকেন আর বলতে থাকেন, কে আছ তওবাকারী? আমি তার তওবা কবুল করব। কে আছ গোনাহ মোচনকারী? আমি তার গোনাহ মোচন করব। কে আছ ক্ষমাপ্রার্থনাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করব। তাই তারা সুন্দর ও অধিকতর কল্যাণকর এ সময়কে নিজেদের ইবাদত ও প্রার্থনার জন্য বেছে নিল। প্রতিদিন ঘুম থেকে জেগে তারা নিকটস্থ মসজিদে চলে যেত। ফজর পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকত।
প্রতিদিনের ন্যায় একদিন তারা তিন বন্ধু রাতের শেষ প্রহরে মসজিদের দিকে যাচ্ছে। চারদিক তখন নীরব-নিস্তব্ধ। পুরো পৃথিবী ঘুমের ঘোরে অচেতন। আকাশ-পৃথিবী শান্ত ও গম্ভীর। কোথাও কেউ নেই। চলতে চলতে হঠাৎ একটি বাড়ি থেকে তাদের কানে গান ও মিউজিকের আওয়াজ ভেসে এলো। এটা শুনে তারা তিন বন্ধু থমকে দাঁড়াল। তারপর এগিয়ে গেল বাড়িটির দিকে যেখান থেকে গান ও মিউজিকের আওয়াজ ভেসে আসছে। তারা দেখল, তাদের বয়সি এক তরুণ রাতভর গান ও মিউজিক বাজাচ্ছে। রাতভর সে এভাবেই ব্যস্ত ছিল। এ দেখে সে যুবকের প্রতি দারুণ মায়া জাগল তাদের অন্তরে। তার অবাধ্যতা ও পাপাচার দেখে তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হলো। তাই তারা চাইল তাকে অবাধ্যতার পথ থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে। প্রথমজন তাকে ডাক দিলো। কিন্তু সে যুবক তার ডাকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করল না। অতঃপর দ্বিতীয়জন ডাকল। এবারও সে কোনো সাড়া দিলো না। সর্বশেষ তৃতীয়জন ডাকল। এবারও পূর্বের মতোই সে নিরুত্তর। বেশ চেষ্টা করেও যখন কোনো কাজ হলো না, তখন নিরুপায় হয়ে তারা মসজিদের দিকে ফিরে আসতে চাইল। তখন তাদের একজন দাঁড়িয়ে গেল। অপর দুজন তার দাঁড়িয়ে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করল? সে বলল, 'আমাদের উচিত তাকে অবাধ্যতা ও নাফরমানির পথ থেকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা। শয়তানের পথ থেকে আল্লাহর পথে ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের আপ্রাণ চেষ্টা করা উচিত। যদি আজ রাতেই সে মারা যায় তাহলে তার আখেরাত কেমন হবে? হয়তো আজ রাতে আল্লাহ তাকে হেদায়েত দেবেন। আমাদের উচিত আমরা যা পছন্দ করি তা অপর ভাইয়ের জন্যও পছন্দ করা। সুতরাং ঈমান ও নেক আমলের চেয়ে উত্তম নেয়ামত আর কী আছে? ইসলামের চেয়ে উৎকৃষ্ট পছন্দ আর কী আছে? তাই এসো আমরা তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করি। আজকের রাতটুকু আমরা তার পেছনেই চেষ্টা অব্যাহত রাখি।'
তার কথা শোনে দুই বন্ধু সম্মত হলো। পুনরায় তারা এগিয়ে গেল যুবকের নিকট। বহু চেষ্টার পর তারা যুবকের দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে সক্ষম হলো। যুবকটি ফিরে তাকালে তারা তাকে ইশারায় বাহিরে বেরিয়ে আসতে আহ্বান জানাল। যুবক তাদের প্রশাসনের সদস্য মনে করে বাহিরে বেরিয়ে এলো। তিনজন প্রথমে হাসিমুখে তাকে সালাম দিলো এবং তার সাথে করমর্দন করল। তার নাম জিজ্ঞেস করল। সে বলল, আমার নাম হাসান। তাদের জিজ্ঞেস করল, কী চাও তোমরা? তারা বলল, 'তুমি কি জানো, এখন কোন সময়? এটি দিনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সময়। অত্যন্ত দামি ও মূল্যবান সময়। এ সময় কেউ আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করলে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। এ সময় তওবাকারীর তওবা কবুল করা হয়। পাপীর পাপ, গোনাহগারের গোনাহ ক্ষমা করা হয়। তুমি আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে ডুবে আছ। সুতরাং তুমি ফিরে এসো। আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করো। তার নিকট অনুনয়-বিনয়ের সাথে সকল গোনাহ থেকে তওবা করো। আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দেবেন। কেননা, আল্লাহ তায়ালা হলেন সবচেয়ে মহান। অতি ক্ষমাশীল। তার হৃদয় দয়া ও রহমে পূর্ণ।
তাদের কথা শোনে হাসান বলল, 'আমি এমন এক গোনাহগার আল্লাহ যাকে কখনো মাফ করবেন না। আমি আজন্ম আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপাচারে লিপ্ত বয়েছি। কখনো কোনো ভালো কাজ করিনি। আমার হৃদয় আল্লাহর নাফরমানিতে কালো হয়ে গেছে। তিনি আমাকে কখনো ক্ষমা করবেন না।' এবার তারা তিনজন হাসানকে বোঝাতে শুরু করল। তখন রাতের শেষ প্রহর। পৃথিবী নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে আছে। রাত্রির অখণ্ড নীরবতায় গুরুগম্ভীর কণ্ঠে তারা হাসানের সামনে তুলে ধরল আল্লাহর পরিচয়। একে একে তারা আল্লাহর গুণাবলি হাসানের সামনে ফুটিয়ে তুলতে লাগল। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু, তিনি বান্দার তওবা কবুল করেন, ইত্যাদি প্রলুব্ধ কথাবার্তায় তারা হাসানের হৃদয় গলানোর চেষ্টা চালাতে লাগল। তারা তাকে শোনাল পবিত্র কুরআনের বাণী।
وَإِنِّي لَغَفَّارُ لِمَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَى
'আর যে তওবা করে, ঈমান আনে, সৎকর্ম করে এবং সঠিক পথের অনুসরণ করে, তার প্রতি আমি ক্ষমাশীল।’⁸⁰
إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُوْلَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا
'তারা ব্যতীত যারা তওবা করে, ঈমান রাখে এবং সৎকাজ করে; আল্লাহ তাদের পাপসমূহ পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। '⁸¹
وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِمَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَى
'যে তওবা করে, ঈমান রাখে, সৎকাজ করে আর সঠিক পথ অনুসরণ করে, তার প্রতি আমি অবশ্যই ক্ষমাশীল। '⁸²
لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ
'তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। '⁸³
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
التائب من الذنب كمن لا ذنب له
'গোনাহ থেকে তওবাকারী ঐ ব্যক্তির মতো, যার কোনো গোনাহ নেই।'
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন, 'বান্দা যদি পাহাড় সমপরিমাণ গোনাহ নিয়েও আমার দিকে ফিরে আসে আমি তাকে ক্ষমা করে দিই। এবং আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করতে কোনো প্রকার পরোয়া করি না।'
এভাবে একের-পর-এক আল্লাহর পরিচয় তারা তুলে ধরতে থাকে হাসানের সামনে। তাকে অভয় দিতে লাগল। তার হৃদয়ে সাহস সঞ্চার করছে। সেইসঙ্গে তাদের নিজেদের অতীত জীবন এবং আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক তাদের সৎপথে ফিরে আনার গল্পও তারা শোনাল হাসানকে। সব শুনে হাসান চুপ মেরে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কথা বলছে না। ভাবনার অথৈ সমুদ্রে হারিয়ে গেছে হাসান। চিন্তার মনোজগতে ডুব দিয়ে কী যেন ভাবছে। আগন্তুক তিনজন তাকিয়ে আছে হাসানের দিকে। তারাও চুপ। কোনো কথা বলছে না। হাসানকে তারা ভাবনার অফুরন্ত সময় দিচ্ছে। আর নিঃশব্দে দোয়া করছে আল্লাহ তায়ালা নিকট। তিনি যেন হাসানকে ফিরিয়ে দেন সুপথে। গোনাহ ও পাপাচারের গলিজ ও দুর্গন্ধ জীবন পেছনে ফেলে হাসান যেন ফিরে আসে শাশ্বত সত্যের পথে। হাসান যেন হয় তাদেরই একজন। যে লোকদের সৎকাজের আদেশ করবে। অসৎকাজ থেকে বিরত রাখবে। আল্লাহর আনুগত্য এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহভিত্তিক জীবন পরিচালনা করবে। তারা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হাসানের দিকে। এদিকে সময়ও ফুরিয়ে আসছে দ্রুত। হঠাৎ তারা প্রত্যক্ষ করে, হাসানের চোখে-মুখে ফুটে উঠতে লাগল সত্য ও সুন্দরের আভা। যেন ভাবনার অথৈ দিগন্ত পেরিয়ে আলোর এক বন্দরে নোঙর করেছে সে। হাসানের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো আকাঙ্ক্ষিত সে কথা। 'আমি তওবা করতে চাই।' তারা তিনজন আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করল। অপার তৃপ্তিতে তাদের হৃদয়ে আনন্দের বান বয়ে যেতে লাগল। চোখে-মুখে ফুটে উঠল দৃপ্তির রেখা। অতঃপর হাসান তাদের থেকে অনুমতি নিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। উত্তমরূপে গোসল করল। শরীরে উত্তম সুগন্ধি মাখল। এক পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র হৃদয় নিয়ে হাসান তাদের সাথে মসজিদের দিকে হাঁটতে লাগল। আজ তারা চারজন। একদিন ছিল একজন। তারপর দুইজন। তারপর তিনজন। আজ তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাসান।
এভাবেই আলোর কাফেলা ক্রমশ বাড়তে থাকে। সত্যের দিকে মানুষের ছুটে চলা এভাবে বাড়তে থাকে। যদি ব্যথিত হৃদয় এবং সংবেদনশীল মন নিয়ে পাপী ও গোনাহগারদের আল্লাহর পথের দিকে ডাকা হয় তাহলে সত্যিই তারা সে ডাকে সাড়া দেবে। তাদের হৃদয়ে বেজে উঠবে শাশ্বত সত্য সুন্দরের ধ্বনি।
হাসান তাদের সাথে মসজিদে প্রবেশ করল। জীবনে কোনোদিন হাসান মসজিদে আসেনি। কোনোদিন সে সিজদা করেনি আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালাকে। কোনোদিন সে প্রভুর দরবারে নত করেনি মাথা। গোনাহ ও নাফরমানির দরিয়ায় ডুবে ছিল আকণ্ঠ। ইমাম সাহেব ফজরের সালাত শুরু করলেন। আজ হাসানও দাঁড়াল সকলের সাথে। ইমাম সাহেব আবেগমথিত কণ্ঠে হৃদয় উজাড় করে পড়তে থাকেন মহান রবের পাক কালাম। মসজিদজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল মধুর কণ্ঠের এক পবিত্র সুরলহরী। ইমাম সাহেব সেদিন তিলাওয়াত করেন,
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
'আমার এ কথা লোকদের বলে দিন, হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করছ। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু।' ⁸⁴
হ্যাঁ, সত্যিই আমার রব তার বান্দাদের প্রতি সীমাহীন দয়ালু। তিনি তাদের তওবা কবুল করেন। মুছে দেন তাদের সমুদ্র পরিমাণ পাপ। তিনি অপেক্ষায় থাকেন, কখন বান্দা ফিরে আসবে। কখন তওবা করবে। কখন বান্দা হৃদয় উজার করে তার পবিত্র নাম উচ্চারণ করবে। বরং আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা এতই দয়ালু, এতই ক্ষমাশীল যে, রাত্রির শেষ মুহূর্তে তিনি বান্দাদের লক্ষ্য করে ডাকতে থাকনে, আছে কি কোনো তওবাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। আছে কি কোনো পাপ মোচনকারী? আমি তার পাপ মোচন করে দেব। আছে কি কোনো ক্ষমাপ্রার্থনাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।
হে যুবক! হে তরুণ! দেখো, যে হাসান বলেছিল-আমি এমন পাপী আল্লাহ যাকে কখনো ক্ষমা করবেন না। জাহান্নাম কেবল আমার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। আমার জন্যই প্রজ্বলিত করা হয়েছে জাহান্নামের লেলিহান আগুন। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা হাসানের মতো জঘন্য পাপী ও গোনাহগার বান্দাকেও অভিশপ্ত পথ থেকে তুলে এনে মসজিদে প্রবেশ করিয়েছেন। দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন নামাজে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার সম্মুখে। কতই-না মেহেরবান আমার রব। কতই-না দয়ালু আমার প্রভু।
অতঃপর হাসান ফজরের সালাত শেষে তাদের সাথে মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলো। হাসান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। তাদের অন্তরের অন্তস্থল থেকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করল। এবার হাসান একে একে তার অতীত জীবনের কাহিনি তাদের নিকট বর্ণনা করতে লাগল। তার পাপ ও গোনাহের ধারাবাহিক বিবরণ সে তাদের শোনাতে লাগল। আর তার চোখ দিয়ে প্রবহমান ঝরনার মতো অনুতপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। তারা হাসানকে সান্ত্বনার বাণী শোনাতে লাগল। একপর্যায়ে হাসান হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। কেউ তাকে তার কান্না থেকে বিরত রাখতে পারছিল না। কান্নামাখা কণ্ঠে হাসান তাদের বলল, গ্রামে আমার বৃদ্ধ পিতা এবং বৃদ্ধ মা রয়েছে। তারা জীবনের বার্ধক্যে পদার্পণ করেছে। তারা এখন কাজ-কর্ম এবং চলাফেরায় অন্যের মুখাপেক্ষী। কিন্তু আমি তাদের কোনো সেবা করছি না।
বরং তাদের ওপর অনেক অত্যাচার করেছি। আমি তাদের সীমাহীন কষ্ট দিয়েছি। তারা দূর গ্রামে থাকে। আমি দীর্ঘ সময় তাদের দেখতে যাই না। জানি না গ্রামে কেমন আছে তারা। আমি তাদের এত কষ্ট দিয়েছি, হয়তো কোনোদিন তারা আমাকে ক্ষমা করবে না। হাসানের এমন কান্না তাদের অন্তরকে ব্যথিত করল। তাদের হৃদয়কে স্পর্শ করল।
তারা হাসানকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামে তার পিতা-মাতার নিকট গেল। হাসানের পিতা ফজরের সালাত শেষ করে ঘরে ফিরেছেন মাত্র। হাসানকে বাড়ির বাহিরে রেখে তারা তিনজন বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। মমতা জড়ানো কণ্ঠে তারা হাসানের পিতাকে সালাম জানাল। গ্রাম্য বৃদ্ধ প্রথমে তাদের চিনতে পারেনি। তারা নিজেদের হাসানের বন্ধু বলে পরিচয় দিলো। হাসানের নাম শোনামাত্র বৃদ্ধ লোকটি ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। উত্তেজিত তবে কিছুটা বেদনামাখা কণ্ঠে বললেন, 'হাসান! যে সর্বদা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত থাকে। পিতা-মাতাকে কষ্ট দেয়। আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করুক। সে আমাদের যেভাবে কষ্ট দিয়েছে আল্লাহ তাকে তদ্রূপ কষ্ট দিক।' বৃদ্ধের কথা শুনে একজন বলল, হাসান তওবা করেছে এবং অতীত জীবন থেকে ফিরে এসেছে। এ কথা শোনে বৃদ্ধ চমকে উঠল। তার চোখে-মুখে ফুটে উঠল বিস্ময়ের রেখা। অবিশ্বাসের সুরে তিনি বললেন, হাসান তওবা করেছে? কোন হাসান? আমার ছেলে? এবার দৃঢ়তার সঙ্গে তারা বলল, হ্যাঁ, আপনার সন্তান হাসান। আজ আমাদের সঙ্গে সে মসজিদে জামাতের সাথে ফজরের নামাজ আদায় করেছে। আমরা তাকে আপনার নিকট নিয়ে এসেছি। সে আপনাদের নিকট ক্ষমা চাইতে এসেছে। আপনি কি হাসানকে ক্ষমা করবেন না?' এ কথা শোনে বৃদ্ধ হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। তার চোখ ফেটে অশ্রু ঝরতে লাগল। অতঃপর আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে শুকরিয়া আদায় করলেন। হাসানকে তারা তার পিতার সামনে এনে হাজির করল। বৃদ্ধ পিতা অনেকদিন পর সন্তানকে দেখে আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়লেন। আদর ও স্নেহের সাথে জড়িয়ে ধরলেন হাসানকে।
হে মুসলিম যুব প্রজন্ম! ফিরে এসো তোমাদের মহান রবের দিকে। অন্যায় ও পাপের জীবন ছেড়ে আলোর জীবন গ্রহণ করো। অতীত নাফরমানি থেকে বিশুদ্ধ হৃদয়ে আল্লাহ তায়ালার নিকট তওবা করো। তিনি বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু। কোনো বান্দা যখন তওবা করে তখন তিনি তার প্রতি সীমাহীন খুশি হোন।
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
'আমার এ কথা লোকদের বলে দিন, হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করছ। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু।'⁸⁵
وَإِنِّي لَغَفَّارُ لِمَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَى
'আর যে তওবা করে, ঈমান আনে, সৎকর্ম করে এবং সঠিক পথের অনুসরণ করে, তার প্রতি আমি ক্ষমাশীল।'⁸⁶
إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُوْلَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا
'তারা ব্যতীত যারা তওবা করে, ঈমান রাখে এবং সৎকাজ করে; আল্লাহ তাদের পাপসমূহ পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' ⁸⁷
টিকাঃ
৮০ সুরা তহা: ৮২
৮১ সুরা ফুরকান: ৭০
৮২ সুরা তহা: ৮২
৮৩ সুরা যুমার: ৫৩।
৮৪ সুরা যুমার: ৫৩
৮৫ সুরা যুমার: ৫৩
৮৬ সুরা তহা: ৮২
৮৭ সুরা ফুরকান: ৭০