📄 নীড়ে ফেরার গল্প
একবার আমি জরুরি কাজে কয়েক মাসের জন্য বিদেশ যাই। আমার সাথে ছিল আরো একজন। বয়সে যুবক। তারুণ্যের অপরিসীম উচ্ছ্বাস তার হৃদয়ে উপচে পড়ছে। আমি তাকে চিনি না এবং তার সম্পর্কে কিছুই জানি না। ইতিপূর্বে তার সঙ্গে কখনো আমার দেখা হয়নি। সেখানে আমাদের একসাথে থাকতে দেওয়া হলো। কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত আমাদের একসাথে থাকতে হবে। একসাথে ঘুম থেকে পানাহার সবকিছুই। সে এসেছে জেদ্দা থেকে, আমি দাহরান থেকে। প্রথমে তার সঙ্গে থাকতে আমি অনেকটা ইতস্তত বোধ করছিলাম। মনে হলো, সেও আমার সঙ্গে স্বাভাবিক হতে পারছে না। তাছাড়া আমরা দুজন ছিলাম দুই মেরুর মানুষ। আমাদের পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন। আচার-স্বভাব কিছুতেই মিল ছিল না। আমি ভাবতে লাগলাম, কীভাবে এ ক-টি মাস কাটবে এখানে আমার। সেও তেমনটিই ভাবছিল। আমার কাছে মনে হচ্ছিল, হয়তো সে আমার দ্বারা প্রভাবিত হবে, অথবা আমি তার দ্বারা প্রভাবিত হবো। কিন্তু আমি জানি, সর্বদা সত্যই বিজয়ী হয়। সত্যের দ্বারা মিথ্যা প্রভাবিত হয়। সত্য সর্বদা সুদৃঢ় থাকে। এমনটি ভেবে আমি সান্ত্বনা অনুভব করলাম।
আমি সব সময় মসজিদে নামাজ পড়ে অভ্যস্ত। আজান হলে নিয়মিত মসজিদে চলে যাই। যতদিন সেখানে অবস্থান করব, মনস্থির করি মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে নামাজ পড়ব। আর মসজিদ ছিল নিকটেই। যদিও আমাদের হোটেলেই নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। আমি দেখেছি, প্রায় সকল হোটেল এবং অফিসেই এখন নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। তারা পারতপক্ষে মসজিদে যায় না। নিজেদের কর্মস্থলেই নামাজ আদায় করে নেয়। বিষয়টি আমার নিকট অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মনে হলো। মসজিদে নামাজ আদায়ের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। ওই কদমের চেয়ে উত্তম আর কোন কদম কী হতে পারে, যা মসজিদে গমনের জন্য হয়ে থাকে !! প্রতিটি কদমের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বান্দাকে একটি নেকি দান করেন এবং একটি গোনাহ মোচন করেন। পায়ে হেঁটে যদি মসজিদেই যেতে না পারে মানুষ তাহলে সে পায়ের মূল্যই-বা কী? যে পা আল্লাহর ঘর মসজিদে গমনের জন্য ব্যবহৃত হয় না সে পায়ের আর কী মূল্য রয়েছে?
নামাজের সময় ঘনিয়ে এলো। এখানে আসার পর এটি ছিল আমাদের প্রথম নামাজ। আমি আমার সঙ্গের লোকটিকে বললাম, চলো, আমরা মসজিদে যাই এবং জামাতের সাথে নামাজ আদায় করি। সে আমার কথা শোনে আশ্চর্যবোধ করল এবং বলল, এখানেই তো নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা সকলে হোটেলেই নামাজ পড়ব। আমি বললাম, না, আমি মসজিদে নামাজ পড়ব। আর মসজিদ তো নিকটেই। একশ কিংবা দুইশ মিটারের বেশি হবে না। এতটুকুন পথ পায়ে হেঁটে যেতে সমস্যা হবে না। কেয়ামতের দিন তুমি এর মূল্য দেখতে পারবে আমলের পাল্লায়। প্রতিটি পদক্ষেপে একটি করে মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং একটি করে গোনাহ মোচন হবে। কল্যাণের দিকে প্রতিটি পদক্ষেপের মূল্য আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে দেবেন। ইরশাদ করেন,
فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِنْكُمْ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ
'অতঃপর তাদের প্রভু তাদের দোয়া কবুল করে বলেন, তোমাদের কারো কাজ আমি নষ্ট করি না, সে পুরুষ হোক অথবা নারী। তোমরা একে অপরের অংশ।'⁶⁸
সুবহানাল্লাহ! এরপর লোকটি আমার সাথে মসজিদে যেতে লাগল। প্রতি ওয়াক্ত নামাজ আমার সাথে মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে আদায় করতে লাগল। এমনকি ফজরের নামাজও। আমি আশ্চর্য হলাম এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। আমার ধারণাই সত্য হলো, হক কখনো মিথ্যার দ্বারা প্রভাবিত হয় না, বরং হকের দ্বারা সকলে প্রভাবিত হয়। লোকটি ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে থাকে। যার জন্য একদা ফজরের সময় ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন, এখন তা হয়ে গেল খুবই সহজ। কখনো দেখি, আমার পূর্বে সে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে আমার অপেক্ষা করছে। এক নতুন জীবনে পদার্পণ করেছে সে। তার জীবনে উদিত হয়েছে এক নতুন ভোর। সত্যিই, পরিবর্তন হলো নিজের কাছে। যে নিজেকে পরিবর্তন করতে চায়, আল্লাহ তাকে পরিবর্তন করেন। উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ তৈরি করে দেন। যে আমল করতে চায় আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার জন্য আমলকে সহজ করে দেন। সবকিছু তার অনুকূল করে দেন।
লোকটি নিয়মিত আমার সাথে মসজিদে যেতে লাগল। তার মনোজগৎ সম্পূর্ণ পাল্টে গেল। হে আল্লাহর বান্দা! মসজিদই প্রকৃত হেদায়েতের উৎস। যে হেদায়েতের সাথে মসজিদ সম্পৃক্ত সেটিই প্রকৃত হেদায়েত। যে হেদায়েত মসজিদের সাথে অন্তরকে সম্পৃক্ত করে সে হেদায়েত আল্লাহর পক্ষ থেকে। পক্ষান্তরে যা মসজিদ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় তা কখনো প্রকৃত হেদায়েত নয়। তা মিথ্যা। তা সত্যের নামে প্রতারণা। তার ওপর আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার লানত ও অভিশাপ।
তখন সময়টি ছিল রমজান পরবর্তী শাওয়াল মাস। যে মাসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত ছয়টি রোজা পালন করতেন। যার ব্যাপারে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে প্রভূত ফজিলত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتًّا مِنْ شَوَّالٍ كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ
‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা এবং পরবর্তী শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রেখেছে সে যেন পূর্ণ বছর রোজা রেখেছে।’⁶⁹
এ ছয়টি রোজা অনেকের নিকট কঠিন মনে হয়। যেহেতু মাত্রই পূর্ণ এক মাস রমজানের রোজা রেখেছে তাই নতুন করে আরো ছয়টি রোজা তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য মনে হয়। কিন্তু এর রয়েছে অনেক ফজিলত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত শাওয়ালের ছয় রোজা রাখতেন। এবং এটি ছিল তার নিকট অত্যন্ত প্রিয় আমল।
আমি আমার সঙ্গের যুবকটিকে বললাম, যেন সেও আমার সাথে শাওয়ালের রোজা রাখে। আমার কথায় যুবকটি ভারি আশ্চর্যবোধ করল এবং বলল, আপনি আমাকে হোটেল থেকে মসজিদে নিয়েছেন, ফজরের সালাতে উঠতে বাধ্য করেছেন আর এখন বলছেন নফল রোজা রাখতে? আমি তাকে বললাম, তুমি কি রমজানের সবগুলো রোজা রেখেছ? সে বলল, হ্যাঁ।
আমি বললাম, তাহলে এখন শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখতে ভয় করছ কেন? কোন জিনিস তোমাকে এ ফজিলত লাভ করা থেকে বিরত রাখছে? যে ব্যক্তি শাওয়ালের ছয় রোজার ফজিলت সম্পর্কে জানে তার জন্য উচিত নয় এর থেকে বঞ্চিত হওয়া।
সুবহানাল্লাহ! আমার সামান্য কথায় তার হৃদয়ে পরিবর্তন এলো। পরদিন থেকে সে আমার সাথে রোজা রাখতে আরম্ভ করল। কল্পনা করুন আমার সঙ্গী সে যুবকের অবস্থা। সে প্রতিদিন ফজরের পূর্বে ঘুম থেকে জাগ্রত হচ্ছে, রোজার প্রস্তুতির জন্য সাহরি খাচ্ছে। সাহরি শেষে কুরআন তিলাওয়াতের চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ বাদে মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে আসছে। আজান শোনে নামাজের জন্য মসজিদের দিকে রওনা হচ্ছে। এভাবেই কাটতে লাগল তার দিনগুলো।
আমরা পাঁচটি রোজা পূর্ণ করলাম। আর মাত্র একটি রোজা বাকি রয়েছে। এমন সময় একটি জরুরি কাজে আমাদের জেদ্দায় যেতে হলো। আমি আমার সঙ্গী যুবককে বললাম, এখনো আমাদের আরো একটি রোজা অবশিষ্ট রয়েছে। ইনশাআল্লাহ, জেদ্দা থেকে ফিরে এসে বাকি রোজা রাখব। যথারীতি কাজ শেষ করে আমরা ফিরে আসি আমাদের হোটেলে। যুবকই আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলো এবং বলল, হে শাইখ! আমাদের একটি রোজা এখানে অবশিষ্ট রয়েছে। আমি তার কথা শোনে দ্বিগুণ আনন্দিত হলাম। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ
'আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন না করে।' ⁷⁰
আরো আশ্চর্য এই যে, কিছুদিন পর আমি তার হাতে একটি চিরুনি দেখতে পেলাম। তা দিয়ে সে তার থুতনির আঁচড় কাটছে। অথচ তার দাড়ি তখনো তেমন প্রকাশিত হয়নি, যাতে চিরুনি ব্যবহার করা যায়। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার! তোমার হাতে চিরুনি কেন? সে আমাকে বিস্মিত করে বলল, আমার আশার চেয়েও তা ছিল অধিক কিছু। যুবকটি বলল, কিছুদিন পর আমার মুখমণ্ডলে দাড়ি উঠবে এবং আপনার দাড়ির মতোই সুন্দর দেখাবে। এ বলে সে হাসতে লাগল। ওই সত্তার শপথ যিনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে বের করে আনেন! আমার হৃদয় তখন আনন্দে ভরে উঠল। কায়মনোবাক্যে আমি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করলাম। আর ভাবতে লাগলাম, তার পরিবর্তনের কথা। কিছুদিন পূর্বেও যে ছিল উদাসীন আজ সে দ্বীনের ব্যাপারে কত সচেতন। নিজেকে প্রতিনিয়ত সে পরিবর্তন করছে। বস্তুত যে নিজেকে পরিবর্তন করতে চায়, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাকে পরিবর্তন করার সুযোগ তৈরি করে দেন। তার অন্তরকে হেদায়েতের জন্য প্রশস্ত করে দেন। আনুগত্যকে করে দেন সহজ। অবাধ্যতা ও নাফরমানিকে বানিয়ে দেন কঠিন ও দুর্বোধ্য। মানুষ যখন আজ তার দ্বীনের ব্যাপারে অতি উদাসীন। আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানির মাঝে অতিবাহিত করছে দিনরাত। তখন আমার সঙ্গীটি প্রতিনিয়ত দ্বীনের নতুন নতুন বিষয় শিখছে।
একদিন সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, রুকুতে গিয়ে কী দোয়া করবে? সিজদায় কী বলে প্রার্থনা করবে আল্লাহর নিকট? আমি তাকে দারুণ আগ্রহের সাথে সবকিছু শিখিয়ে দিতে থাকি। আমাদের দিন যত যেতে লাগল, ততই সে দ্বীনের বিভিন্ন বিষয় শিখতে লাগল। অন্যরা নামাজের পর চলে যায়। কিন্তু আমার সঙ্গী যুবকটি জায়নামাজে বসে থাকে। হিসনুল মুসলিম নামক দোয়ার একটি বই খুলে যেখানে সকাল-সন্ধ্যার বিভিন্ন দোয়া ও জিকির বর্ণিত রয়েছে। বইটি খুলে সে প্রতি নামাজের পর সে-সমস্ত দোয়া পড়তে থাকে। একনিষ্ঠ হয়ে আল্লাহর জিকির করে। দীর্ঘ মুনাজাত করে। চোখের অশ্রুতে কখনো তার বুক ভেসে যায়। দূর থেকে আমি এ আনন্দদায়ক দৃশ্য দেখে আল্লাহকে স্মরণ করি। তার শুকরিয়া জ্ঞাপন করি। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ .
'তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদেরকে স্মরণ করব। '⁷¹
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبِ
'জেনে রেখো! আল্লাহর জিকির দ্বারা অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।'⁷²
আমার সঙ্গী সে যুবক এক নতুন জীবন শুরু করল। পূর্বের জীবনের সাথে যার কোনো সাদৃশ্য নেই। আগে সে ফজরের সময় থাকত ঘুমে বিভোর, এখন মুয়াজ্জিনের আজান শোনামাত্র তার ঘুম ভেঙে যায়। বিছানা ছেড়ে মসজিদের দিকে ছুটতে থাকে। আগে তার মুখে ছিল না দাড়ি, এখন সুন্দর দাড়িতে তার মুখমণ্ডল উজ্জ্বল ও আলোকিত। আগে তার হৃদয় ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন, এখন তার হৃদয়ে আল্লাহর হেদায়েতের নূরে পরিপূর্ণ।
একদিন সে আমাকে বলল, একদিন আমি ছিলাম মৃত, এখন আল্লাহ তায়ালা আমাকে নতুন জীবন দান করেছেন। আমার জীবনের তখন কোনো মূল্য ছিল না। ছিলাম চতুষ্পদ জন্তুর মতো। বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট। সূর্যোদয়ের ঢের পর ঘুম থেকে উঠে কাজে যেতাম, ফিরতাম দুপুর দুইটায়। আমার জীবনে ছিল না আল্লাহর আনুগত্য। নামাজ পড়তাম না। রোজা রাখতাম না। গোনাহ ও পাপাচারে লিপ্ত ছিলাম। চোখের হেফাজত করতাম না। কান দিয়ে গান শুনতাম। সকল প্রকার নাফরমানি ও অবাধ্যতায় ভরপুর ছিল আমার জীবন। সে জীবনের কোনো মূল্যই ছিল না। প্রবৃত্তির অনুসরণ করতাম। মনে যা চাইত তাই করতাম তখন।'
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا أَمْ تَحْسَبُ أَنَّ أَكْثَرَهُمْ يَسْمَعُونَ أَوْ يَعْقِلُونَ ، إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ سَبِيلًا
'তুমি কি দেখেছ তাকে যে তার উপাস্য বানিয়েছে নিজের প্রবৃত্তিকে? তবুও কি তুমি তার জিম্মাদার হবে? নাকি তুমি মনে করো, তাদরে অধিকাংশ শোনে কিংবা বোঝে? তারা আসলে পশুদের মতোই, বরং তার চেয়েও অধিক পথভ্রষ্ট।'⁷³
সে বলতে লাগল, কিন্তু এখানে আপনি আমার সঙ্গী হলেন। আপনি আমাকে মসজিদে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমি কাতারবদ্ধ হয়ে জামাতের সাথে নামাজ পড়তে শুরু করি। আমি গানবাদ্য শুনতাম, কিন্তু আপনি আমার গানকে কুরআন দ্বারা পরিবর্তন করে দিলেন। প্রতিনিয়ত আপনি আমাকে দ্বীনের নতুন নতুন বিষয় শিক্ষা দিতে লাগলেন। আমার হৃদয়ে ঈমান শক্ত হতে লাগল। আল্লাহ আমাকে হেদায়েতের আলো দ্বারা সিক্ত করলেন। আপনার সঙ্গ আমাকে নতুন জীবন দান করেছে।'
বস্তুত হেদায়েত ব্যতীত মানুষ মৃত ব্যক্তির তুল্য। যার অন্তরে হেদায়েত নেই তার কোনো মূল্য নেই। মৃত ব্যক্তির এতই মূল্যহীন। মৃত ও জীবিত কখনো বরাবর নয়। যার অন্তরে ঈমান নেই সে তো অন্ধ। অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কখনো সমান নয়। যার অন্তরে হেদায়েত নেই সে অন্ধকার। অন্ধকার ও আলো কখনো সমান নয়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
أَوَمَنْ كَانَ مَيْتًا فَأَحْيَيْنَاهُ وَجَعَلْنَا لَهُ نُورًا يَمْشِي بِهِ فِي النَّاسِ كَمَنْ مَثَلُهُ فِي الظُّلُمَاتِ لَيْسَ بِخَارِجٍ مِنْهَا
'যে ব্যক্তি মৃত ছিল, আমি তাকে জীবিত করেছি এবং একটি আলো দান করেছি যার সাহায্যে সে মানুষের মধ্যে চলতে পারে, সে কি ওই ব্যক্তির মতো হতে পারে, যে অন্ধকারের মধ্যে আছে এবং সেখান থেকে বের হচ্ছে না?'⁷⁴
হে আমার প্রিয় যুবক ভাইয়েরা! আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেককে আকল তথা জ্ঞান দান করেছেন। এটি আল্লাহ তায়ালার একটি অতি বড় নেয়ামত। এ জ্ঞান তিনি কেবল মানুষকেই দান করেছেন। যেন মানুষ চিনতে পারে কোনটি সত্য এবং কোনটি মিথ্যা। যেন মানুষ জানতে পারে, কোনটি তার জন্য কল্যাণকর এবং কোনটি তার জন্য ক্ষতিকর। তাই আমাদের উচিত, আল্লাহ তায়ালা আমাদের যে জ্ঞান দান করেছেন তা প্রয়োগ করে নিজেদের অবস্থা যাচাই করা। আমি যা কিছু করছি, তা কি কল্যাণকর নাকি অকল্যাণকর? তা আমার উপকারে আসবে নাকি ক্ষতি করবে? হে আমার প্রিয় যুবক ভাইয়েরা! নিজেদের জিজ্ঞেস করো, তুমি কী করছ, আর কী করা উচিত ছিল। জেনে রেখো! যে নিজেকে পরিবর্তন করতে চায়, আল্লাহ তায়ালা তাকে পরিবর্তন করেন। আর যে নিজেকে পরিবর্তন করতে চায় না, তাকে তার আপন অবস্থার ওপর রেখে দেন। তাই হে যুবক! নিজেকে পরিবর্তন করো। ফিরে এসো রবের দিকে। ফিরে এসো প্রকৃত কল্যাণের পথে। নাফরমানিকে আনুগত্যে রূপান্তরিত করো। গোনাহকে আমলে পরিণত করো। তুমি আল্লাহর হয়ে যাও। তাহলে দেখবে, আল্লাহ তোমার হয়ে গেছেন।
টিকাঃ
৬৮ সুরা আলে ইমরান: ১৯৫
৬৯ সহিহ মুসলিম: ১১৬৪
৭০ সুরা রাদ: ১১
৭১ সুরা বাকারা: ১৫২
৭২ সুরা রাদ: ২৮
৭৩ সুরা ফুরকান: ৪৩-৪৪
৭৪সুরা আনআম: ১২২
📄 আত্মশুদ্ধির গল্প
এমন কতিপয় কুরআনুল কারিমের আয়াত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস এবং আল্লাহর পুণ্যবান বান্দাদের কিছু চিত্তাকর্ষক গল্প আমি বর্ণনা করব, যা তোমাদের হৃদয়-নদীতে চিন্তার ঝড় তুলবে। তোমাদের মন ও মননে শুদ্ধতার সবুজ বাতাস প্রবাহিত করবে। ওই সকল বিশেষ বান্দাদের গল্প যাদের আত্মিক সম্পর্ক আসমানের সাথে। যাদের হৃদয়ের বন্ধন আরশের অধিপতির সাথে। বৈষয়িক সাধারণ তুচ্ছ বিষয়ের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন,
وَفِي السَّمَاءِ رِزْقُكُمْ وَمَا تُوعَدُونَ
'তোমাদের প্রতিশ্রুত রিজিক তো আসমানে।'⁷⁵
ওইসব বিশেষ বান্দাদের গল্প, যারা জমিনে বিচরণ করলেও তাদের পদধ্বনি শোনা যায় আসমানে। তাদের কদম জমিনে থাকলেও হৃদয় থাকে আল্লাহর সান্নিধ্য ও পরকালের চিন্তায় বিভোর। আল্লাহ তায়ালার সাথে তাদের সম্পর্ক অতি বিশেষ। মূলত তারাই আল্লাহর প্রকৃত বান্দা।
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا * وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا • وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا .
'রহমানের বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং মূর্খরা যখন তাদের সম্বোধন করে তখন তারা বলে সালাম। যারা তাদের প্রভুর উদ্দেশ্যে সিজদারত ও দণ্ডায়মান অবস্থায় রাত অতিবাহিত করে। যারা বলে হে আমাদের প্রভু! আমাদের থেকে জাহান্নামের শান্তিকে দূরে রাখুন। নিশ্চয় জাহান্নামের শান্তি বড় সর্বনাশা।'⁷⁶
ওইসব মনোনীত বান্দাদের গল্প শোনাব যারা আল্লাহ তায়ালার নিকট অত্যধিক প্রিয়। দুনিয়ার ভোগবিলাস এবং এর তুচ্ছ জিনিসের প্রতি তাদের নেই কোনো মোহ। তাদের হৃদয় সদা ব্যস্ত থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনে। তারা তাই করেন যা আল্লাহ চান। আর যা চান না তা থেকে বিরত থাকেন। তাদের স্বপ্ন ও আরাধ্য হলো ওইসকল বস্তু আল্লাহ তায়ালা যা প্রস্তুত করে রেখেছেন তাদের জন্য।
আবদুল ওহায়েদ ইবনে যিয়াদ সেসব পুণ্যবান ব্যক্তিদের একজন আল্লাহ তায়ালা যাদের তার প্রিয় বান্দা হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। আবদুল ওয়াহেদ ইবনে যিয়াদ বলেন, আমরা প্রায়শই আমাদের মজলিসে আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হওয়ার ফজিলত নিয়ে আলোচনা করতাম। আল্লাহ তায়ালার নিকট শহিদদের অতুলনীয় মর্যাদার কথা আলোচনা করতাম। আল্লাহ তায়ালা তার রাহে শহিদ হওয়া বান্দাদের সুউচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। তাদের দিয়েছেন বিশেষ সম্মানের আসন। এবং আল্লাহ তায়ালা তাদের দিয়েছেন এক বিশেষ প্রতিশ্রুতি। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শহিদদের ফজিলত ও মর্যাদা বর্ণনা করে ইরশাদ করেন,
إِنَّ لِلشُّهَدَاءِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ مِائَةَ دَرَجَةٍ فِي الْجَنَّةِ
‘আল্লাহর রাস্তায় শহিদদের জন্য বেহেশতে রয়েছে একশ মর্যাদা।’
সুতরাং চিন্তা করে দেখো! আল্লাহ তায়ালা তাদের কত বড় মর্যাদা দান করেছেন। যে মর্যাদার সাথে অন্য কোনো মর্যাদার কোনো প্রকার তুলনা হতে পারে না। এ বিশেষ মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে কেবল শহিদদের যারা আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জীবন উৎসর্গ করবে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন। আর বিনিময়স্বরূপ তাদের দিয়েছেন জান্নাতের প্রতিশ্রুতি।
পবিত্র কুরআনে তাদের সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে,
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ
‘আল্লাহ তো মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ কিনে নিয়েছেন। মূল্য হিসেবে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। ⁷⁷
অতঃপর আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
‘আল্লাহর চেয়ে বড় ওয়াদা পূরণকারী আর কে আছে? অতএব তোমরা যে বিক্রয় সম্পন্ন করেছ তাতে সন্তুষ্ট থাকো। এটিই বড় সাফল্য। ’⁷⁸
আবদুল ওয়াহেদ ইবনে যিয়াদ বলেন, এ কথা শুনে মজলিসে উপস্থিত এক ষোল বছরের বালক দাঁড়িয়ে বলল, হে আবদুল ওয়াহেদ ইবনে যিয়াদ! সত্যিই কি আল্লাহ জান্নাতের বিনিময়ে আমাদের জান ও মাল কিনে নিয়েছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ, আল্লাহ জান্নাতের বিনিময়ে আমাদের জান ও মাল কিনে নিয়েছেন। এ কথা শুনে উক্ত বালক অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলল, আমি একজন ইয়াতিম। পিতা-মাতা আমার জন্য অঢেল সম্পদ রেখে গিয়েছেন। ওয়ারিসসূত্রে প্রাপ্ত সে-সমস্ত সম্পদ এবং আমার জীবনের বিনিময়ে আল্লাহর নিকট থেকে আমি জান্নাত ক্রয় করতে চাই। আমার জান ও মাল একমাত্র আল্লাহর জন্য বিলীন করে দিতে চাই। আর বিনিময়ে আমি চাই আমার রবের প্রতিশ্রুত জান্নাত।
হে মুসলিম যুব ও তরুণ প্রজন্ম! দেখো! এক ষোল বছরের বালক কী বলছে। হে যুবক! শোনো কী বলছে সে তরুণ। তার সাহস ও উদ্দীপনার পারদ কত! তার বয়স সবে ষোল কিন্তু তার কাজ প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের চেয়েও অধিক। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ ষোল বছরের ছেলেদের বলা হচ্ছে ওরা কিশোর এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক। তাদের বড়দের কাতারে গণ্যই করা হচ্ছে না। তাদের মনে করা হচ্ছে অবুঝ ও কর্মে অক্ষম। তাদের অপরাধকে অপরাধ গণ্য করা হচ্ছে না। তাদের শাস্তির উপযুক্ত মনে করা হচ্ছে না। তাদের আল্লাহর আদেশসমূহ পালনের জন্য উপযুক্ত জ্ঞান করা হচ্ছে না। মসজিদের মিনার থেকে ফজরের আজান ভেসে আসে তখন তাদের ছোট বলে ঘুম থেকে জাগ্রত করা হয় না। হারাম ও নাজায়েজ কাজ থেকে কেউ তাদের নিবৃত করে না। ভাবছে, তারা তো এখনো দ্বীন পালনের জন্য উপযুক্তই হয়নি। অথচ ইসলামের নিকট ও দূর অতীতে এমন কোনো প্রচলন ছিল না। ষোল বছর পেরিয়ে গেলেও আজ তাদের শরিয়তের বিধানাবলির উপযুক্ত গণ্য করা হচ্ছে না। তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের উপর শরিয়তের বিধানাবালি প্রয়োগ করা হচ্ছে না। হে মুসলমান! জেনে রেখো! সূচনাতেই ইসলামের শক্তিকে নড়বড়ে করে দেওয়ার এ এক পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্র। প্রত্যেক জাতির প্রাণশক্তি হলো তরুণ ও যুব সমাজ। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর তরুণদের সঠিক পথ থেকে অঙ্কুরেই বিচ্যুত করে দিচ্ছে। ইসলামের শত্রুদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়ে মুসলমান পিতা-মাতাগণ তাদের সন্তানদের হৃদয় থেকে কচিকালেই ইসলামের সৌন্দর্য ধ্বংস করে দিচ্ছে। ইসলামের দৃষ্টিতে তারা প্রাপ্তবয়স্ক এবং শরিয়তের বিধি-বিধান পালনের উপযুক্ত সাব্যস্ত হলেও পাশ্চাত্য সভ্যতার গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসিয়ে সন্তানদের তারা ছোট ও অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে ইসলামের বিধিবিধান পালন থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে।
অতঃপর আবদুল ওয়াহেদ ইবনে যিয়াদ বলেন, ষোল বছরের সে ছেলেটি ফের আমাকে জিজ্ঞেস করল একই কথা। আমিও দৃঢ়তার সাথে তাকে জবাব দিলাম। পুনরায় সে তার জান ও সমুধয় মাল দিয়ে আল্লাহর নিকট থেকে জান্নাত ক্রয়ের শক্ত অভিপ্রায় ব্যক্ত করল। সে জিহাদে যেতে চাইল এবং আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হয়ে বিশেষ ফজিলত লাভ করতে প্রচণ্ড আগ্রহী হলো। কিন্তু আমি তাকে বললাম, তুমি তো বয়সে ছোট। যুদ্ধের ময়দানে তরবারির বিভৎস ধ্বনি শোনে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে এবং শত্রুর ভয়ে পালিয়ে আসবে। আমার কথা শুনে ছেলেটি বলল, যদি অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনে রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে আসি তাহলে আমার চেয়ে দুর্ভাগ্যবান আর কেউ নেই, অথচ আমার বক্ষে রয়েছে আল্লাহর কিতাব। দুশমনের শানিত তরবারির ঝলক দেখে আল্লাহর শপথ আমি ভীত হবো না। মৃত্যুভয়ে কখনো পালিয়ে আসব না রণাঙ্গন থেকে।
আবদুল ওয়াহেদ ইবনে যিয়াদ বলেন, পরদিন ভোরে সকলের আগে সে তার সমুদয় মাল নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। কেউ তার পূর্বে জান ও মাল নিয়ে উপস্থিত হতে পারেনি। আল্লাহ জান্নাতের বিনিময়ে মুমিনদের জান ও মাল কিনে নিয়েছেন শোনার পর তার হৃদয়ে শাহাদতের যে জ্বলন ও স্পৃহা প্রজ্বলিত হয়েছে তা সত্যিই অবাক ও বিমুগ্ধ করেছে আমাদের। তার সাহস ও উদ্দীপনা দেখে যারপরনাই আমরা প্রফুল্ল হয়েছি। সমস্ত মাল আমার সামনে রেখে বলল, 'হে আবদুল ওয়াহেদ! গ্রহণ করুন আমার সমস্ত মাল। খরচ করুন আল্লাহর রাস্তায় নিয়োজিত মুজাহিদদের পেছনে। এবং আমাকেও তাদের সেবায় সাদরে গ্রহণ করুন। আমি আমার জান ও মাল সম্পূর্ণ আল্লাহর রাস্তায় মিটিয়ে দিতে চাই। এখন আমার নিকট আমার রবের প্রতিশ্রুত জান্নাতের চেয়ে আর কিছুই প্রিয় নয়।'
যুদ্ধের পুরো সফরে সে মুজাহিদদের সীমাহীন খেদমত করেছে। বড়দের সম্মানে পূর্ণ ছিল তার হৃদয়। ছোটদের প্রতি ছিল অসম্ভব স্নেহ। আমিরের নির্দেশের প্রতি ছিল অকুণ্ঠ আত্মসমর্পণ। আল্লাহু আকবার! কে লালন-পালন করেছে এই ইয়াতিম ছেলেকে। কে তাকে এত সাহসী করে তুলেছে। হ্যাঁ, কুরআন তাকে লালন-পালন করেছে। সে ছিল কুরআনের হাফিজ। তার চিত্তকে প্রসারিত ও বিমোহিত করেছে পবিত্র কুরআনের পরশ। শৈশব থেকেই কুরআনের সাথে ছিল তার নিবিড় সম্পর্ক। জীবনের সূচনাতেই সে নিজেকে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যে সমর্পণ করেছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর সান্নিধ্যে বেড়ে উঠেছে তার শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের প্রারম্ভ। আর সেজন্যই ইসলামের জন্য সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়ার মানসিকতা গড়ে উঠেছে তার অন্তরে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ মুসলমানদের সন্তানরা জন্ম থেকেই বেড়ে উঠছে অবাধ্যতা ও নাফরমানির ভেতর। শৈশব থেকে তাদের ইসলামের শাশ্বত রূপ ও সৌন্দর্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। ছোট বলে তাদের শেখানো হচ্ছে না ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে তাদের আল্লাহ তায়ালার বিধি-বিধান পালন থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে পিতা-মাতা। শারীরিক ও মানসিক বিকার হবে বলে সকালে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিচ্ছে না নামাজ ও কুরআন পাঠের জন্য। অপুষ্টি ও ঘুমের অজুহাত দিয়ে পিতা-মাতা নিজ সন্তানদের নামাজের জন্য প্রস্তুত করছে না। ফলে শৈশব থেকে তারা ইসলামের আলো-ছায়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
তাদের বানানো পরিভাষায় যখন তাদের সন্তানরা প্রাপ্তবয়স্কে পৌঁছে তখন তাদের হৃদয় ইসলামের বর্ণিল ও ভুবনজয়ী চেতনাকে ধারণ করতে সক্ষম হয় না। এভাবেই চেতনাহীন একটি প্রজন্ম গড়ে উঠছে মুসলিম উম্মাহর। তাদের নাম পরিচয় মুসলমান থাকলেও তাদের হৃদয়ে নেই ইসলামের সৌন্দর্য। চিন্তা-চেতনায় তারা পাশ্চাত্যের গোলামিপনায় বন্দি। আল্লাহর রাস্তায় নিয়োজিত মুজাহিদরা যাদের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে, তারা সে শত্রুদের চিন্তা-চেতনা, শিক্ষা-দীক্ষায় লালিত হচ্ছে।
আবদুল ওয়াহেদ ইবনে যিয়াদ বলেন, 'তারপর যুদ্ধের সময় ঘনিয়ে এলো। শত্রুপক্ষ অদূরে তাদের শিবির স্থাপন করেছে। আমরা আমাদের যুদ্ধের সারি প্রস্তুত করলাম। ষোল বছরের তরুণটি ছিল সর্বাগ্রে। একটি ঘোড়ার ওপর আরোহন করে সে শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল। সীমাহীন সাহস এবং প্রচণ্ড শক্তিতে শত্রুদের বিরুদ্ধে সে লড়ে যাচ্ছিল।
আমাদের সে যুদ্ধ ছিল দীর্ঘস্থায়ী। সমগ্র দিন যুদ্ধ করে আমরা রণাঙ্গনেই তাবু স্থাপন করে রাত্রিযাপন করতাম। সে দিনগুলো ছিল আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের। এক ঘোর বিপদ নেমে এসেছিল আমাদের ওপর। মুজাহিদগণ রাতভর নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতেন। দীর্ঘ মুনাজাতে কান্নাকাটি করতেন। আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করতেন। রাতের খুব অল্প সময়ই তারা ঘুমাতেন। এক সকালে ছেলেটি আমার নিকট এলো। তাকে সেদিন ভারি উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল। তার চোখে-মুখে ছিল খুশির আভা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলতে শুরু করল। 'কাল রাতে আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি। এ স্বপ্নের কথা আপনি কাউকে বলবেন না, যতক্ষণ না আমি শাহাদতের পেয়ালা পান করি। ছেলেটি বলল, স্বপ্নে দেখি আমি বেহেশতের একটি বাগানে প্রবেশ করেছি। অগণিত ও অফুরন্ত সুন্দর সব হুর সেখানে বিচরণ করছে। তাদের চোখ ছিল ডাগর ডাগর। তাদের কেশ ছিল ঘনকালো। তাদের বাহু ছিল দীর্ঘ ও বিস্তৃত। তাদের গলা সরু ও দীঘল। তাদের দেহ থেকে ছড়াচ্ছিল অনির্বচনীয় সুবাস। পৃথিবীর কোনো চোখ কখনো তা দেখেনি। কোনো কান শ্রবণ করেনি এমন রূপের বর্ণনা। কোনো হৃদয় কল্পনা করেনি এমন রমণীদের সৌন্দর্য।
আমাকে দেখে তারা হর্ষিত হয়ে উঠল। যেন আনন্দে নেচে উঠলো তাদের মন। তারা আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থন জানাল। এবং তারা আমাকে দেখে সমস্বরে চিৎকার করে উঠল, বিমুগ্ধ আনতনয়না এক হুর রমণীর স্বামী বলে।
তাদের এমন সমস্বরিত ধ্বনি শোনে আমি কৌতূহলী হলাম এবং তাদের জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় সে বিমুগ্ধ আনতনয়না হুর রমণী? তারা প্রতিউত্তরে বলল, এখানে নয়। আপনি আরো সামনে চলুন। আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।' অতঃপর তাদের কথায় আমি সামনে চলতে লাগলাম। চলতে চলতে একটি নদীর তীরে এসে দাঁড়াই। নদীর কোমল ও শীতল আবহে পানিতে পা ভিজিয়ে বসে আছে অসংখ্য সুন্দরী হুর। পূর্বের মতোই তাদের রূপ-সৌন্দর্য। তারাও আমাকে 'বিমুগ্ধ আনতনয়না হুর রমণীর স্বামী' বলে সমস্বরে ধ্বনি দিয়ে উঠল। আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় সে বিমুগ্ধ আনতনয়না হুর রমণী? পূর্বের হুর রমণীদের মতো তারাও বলল, এখানে নয়। আপনি সামনে চলুন। আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।' আমি আবারো সামনে চলতে শুরু করি। চলতে চলতে একটি দুধের নদীবর্তী তীরে এসে পৌঁছি। পূর্বের মতো এখানেও একদল হুর রমণী ধবধবে সাদা দুধের নদীতে পা ভিজিয়ে খোশগল্প করছে। আমাকে দেখে তারা, বিমুগ্ধ আনতনয়না হুর রমণীর স্বামী বলে সমস্বরে ধ্বনি দিয়ে উঠল। আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় সে বিমুগ্ধ আনতনয়না হুর রমণী? তারা বলল 'এখানে নয়। আপনি সামনে চলুন। আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।' আমি আরো দ্বিগুণ কৌতূহলী হলাম। আমার কৌতূহল ক্রমাগত বাড়তে থাকে। চলতে চলতে একটি মধুর শরাবের নদীর তীরে এসে পৌঁছলাম। এখানেও দেখি, একদল হুর রমণী খোশ-গল্পে মত্ত। আমাকে দেখে তারা বিমুগ্ধ আনতনয়না হুর রমণীর স্বামী বলে সমস্বরে ধ্বনি দিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় সে বিমুগ্ধ আনতনয়না হুর রমণী? তারা চিকন ও মিষ্টি কণ্ঠে জবাব দিলো, এখানে নয়। আপনি সামনে চলুন। আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।' ফের সামনে চলতে থাকি। চলতে চলতে একটি স্বচ্ছ মধুর নদী তীরে এসে পৌঁছি। এখানে একদল হুর রমণী খোশ-গল্পে মেতে আছে। তাদের হাসিতে মুখরিত হয়ে আছে চারপাশ। আমাকে দেখে তারা সমস্বরে বিমুগ্ধ আনতনয়না হুর রমণীর স্বামী বলে ধ্বনি দিলো।
আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় সে বিমুগ্ধ আনতনয়না হুর রমণী? তারা বলল, 'এখানে নয়। আপনি সামনে চলুন। আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।' আমার কৌতূহল দ্বিগুণ হতে থাকে। তাদের কথামতো আবারো চলতে লাগলাম। চলতে চলতে দেখি একটি সুরম্য তাবু। আমি তাবুটির দিকে এগিয়ে গেলাম। তাবুর সামনে একজন হুর প্রহরায় নিযুক্ত। যথারীতি আমাকে বিমুগ্ধ আনতনয়না হুর রমণীর স্বামী বলে স্বাগত জানাল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় সে বিমুগ্ধ আনতনয়না হুর রমণী? হুর প্রহরিণী জবাব দিলো, ভেতরে আছে। চলুন। আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।' তার অনুমতি পেয়ে আমি তাবুর ভেতর প্রবেশ করলাম। দেখি, একজন হুর রমণী সোনার পালঙ্কে বসে আছে। পূর্বের হুরদের চেয়ে তার দেহ সৌন্দর্য অধিক। বরং তার সাথে তাদের কোনো তুলনাই চলে না।
আল্লাহর কসম! কোনো চক্ষু এমন সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করেনি। কোনো কান এমন রূপের বর্ণনা কখনো শোনেনি। কোনো হৃদয় এমন সৌন্দর্য কল্পনা করেনি। সে যখন কথা বলে তার চিকন সারিবদ্ধ দুধেল সাদা দন্তরাজি বিকশিত হচ্ছে। সে দন্তরাজির সৌন্দর্যের সামনে চাঁদ-সূর্যের কোনো উপমা অবান্তর। তার মুখের থুথু এমন সুমিষ্ট, যদি এক চিমটি থুথু দুনিয়াতে নিক্ষেপ করে তাহলে পৃথিবীর সমস্ত সমুদ্রের পানি মধু হয়ে যাবে। সে যদি একবার পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে হাসি দেয় তাহলে সূর্যের কিরণ ম্লান হয়ে যাবে। দুনিয়া ছেয়ে যাবে ঘনকৃষ্ণ আঁধারে। আর তার দেহ থেকে ছড়াচ্ছিল এমন সুবাস যার কোনো বিবরণ দেওয়া সম্ভব নয়।
সে হুর রমণীর দেহ সৌন্দর্যে আমি এতই অভিভূত ও বিমোহিত হয়ে পড়ি যে, আমি তার দিকে এগিয়ে যাই এবং তাকে স্পর্শ করতে উদ্যত হই। কিন্তু অমনি সে পিছিয়ে যায় এবং আমাকে বারণ করে তাকে স্পর্শ করা থেকে। বলল, 'আপনি এখনো জীবিত। আপনার ভেতরে প্রাণ আছে। কোনো প্রাণময় মানুষ আমাদের স্পর্শ করতে পারে না। আপনি বরং আজ আমাদের সাথে ইফতারি করুন।'
আবদুল ওয়াহেদ ইবনে যিয়াদ বলেন, 'এই ছিল তার স্বপ্নের বিশদ বিবরণ। সে ছিল রোজাদার। প্রতিরাতে সে দীর্ঘ সময় নামাজে দাঁড়িয়ে থাকত আর দিনে রোজা রাখত। যুদ্ধের কঠিন দিনেও সে রোজা ভঙ্গ করত না। তারপর যুদ্ধের সময় ঘনিয়ে এলো। সে ঘোড়ার ওপর চড়ে রণাঙ্গনের দিকে এগিয়ে গেল। সেদিনই রোজা অবস্থায় লড়াই করতে করতে শাহাদতবরণ করে। আল্লাহর রাস্তায় সে শহিদ হলো। তার হৃদয়ের গভীর আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলো।'
হে আল্লাহর বান্দাগণ! হে মুসলিম যুব ও তরুণ প্রজন্ম! তার হৃদয়ে ইসলামের অপরিসীম চেতনা কীভাবে প্রোথিত হলো? কে লালন-পালন করেছে তাকে? হ্যাঁ, কুরআন তাকে লালন-পালন করেছে। আল্লাহর পবিত্র কালাম বুকে নিয়ে বেড়ে উঠেছে তার শৈশব। ছোট ও অপ্রাপ্ত বয়স থেকেই আল্লাহর আনুগত্য এবং শরিয়তের বিধি-বিধানের প্রতি সে ছিল সচেষ্ট। অবুঝ বয়স থেকেই তার চিন্তা-চেতনায় ছিল পবিত্র কুরআনের এ আয়াতের উপলব্ধি।
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ * فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ * يَلْبَسُونَ مِنْ سُندُسٍ وَإِسْتَبْرَقٍ مُتَقَابِلِينَ * كَذَلِكَ وَزَوَّجْنَاهُمْ بِحُورٍ عِينٍ * يَدْعُونَ فِيهَا بِكُلِّ فَاكِهَةٍ آمِنِينَ * لَا يَذُوقُونَ فِيهَا الْمَوْتَ * إِلَّا الْمَوْتَةَ الأُولَى وَوَقَاهُمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ * فَضْلًا مِنْ رَبِّكَ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ * فَإِنَّمَا يَسَّرْنَاهُ بِلِسَانِكَ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ * فَارْتَقِبْ إِنَّهُمْ مُرْتَقِبُونَ
'নিশ্চয় মুত্তাকিরা এক নিরাপদ স্থানে থাকবে। উদ্যান ও ঝরনার মাঝে। তারা মিহি ও পুরু রেশম কাপড় পরিধান করবে। একে অপরের সামনা-সামনি বসবে। এমনই হবে। আর তাদের আমি সুনয়না সুন্দরী স্ত্রী দেব। সেখানে তারা প্রশান্ত মনে প্রত্যেক প্রকারের ফল আনতে বলবে। সেখানে তারা মৃত্যু আস্বাদন করবে না। এবং তিনি তাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন। তোমার প্রভুর অনুগ্রহে। এটাই তো বড় সাফল্য। বস্তুত আমি কুরআনকে তোমার ভাষায় সহজ করে দিয়েছি, যাতে তারা মনে রাখতে পারে। অতএব তুমি অপেক্ষা করো, তারাও অপেক্ষা করছে। '⁷⁹
হে আল্লাহর বান্দাগণ! উম্মাহ সর্বদা তাকিয়ে আছে এমন প্রজন্মের দিকে যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের জান ও মাল উৎসর্গ করতে সদা প্রস্তুত থাকবে। যাদের হৃদয়ে প্রোথিত থাকবে ইসলাম ও مسلمانوں کا প্রতি সীমাহীন দরদ ও আবেগ। কিন্তু বর্তমান তরুণ প্রজন্মের চিত্র কী? সোনালি প্রজন্মের যুবকদের রাত্রি অতিবাহিত হতো রুকু-সিজদায়। আজকের তরুণ প্রজন্মের রাত্রি অতিবাহিত হয় গান-বাদ্য, অশ্লীলতায়। সোনালি প্রজন্মের যুবকরা কুরআন তিলাওয়াতে মশগুল থাকত। আজকের তরুন প্রজন্ম ব্যস্ত থাকে গানের সুরে। সোনালি প্রজন্মের যুবকদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ছিল আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার সন্তুষ্টি এবং জান্নাত লাভ। বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা হলো পার্থিব জীবনের উন্নতি এবং অঢেল ধন-সম্পদ উপার্জন। খেল-তামাশায় কেটে যাচ্ছে তাদের প্রতিদিনের জীবন। দুনিয়ার মোহ-লালসায় আচ্ছন্ন তাদের অহর্নিশ। যেন পার্থিব সমৃদ্ধিই তাদের একমাত্র আরাধ্য।
টিকাঃ
৭৫ সুরা যারিয়াত: ২২
৭৬ সুরা ফুরকান: ৬৩-৬৫
৭৭ সুরা তাওবা: ১১১
৭৮ সুরা তাওবা: ১১১
৭৯ সুরা দুখান: ৫১-৫৯
📄 এ অবস্থা থেকে মুসলিম তরুণ প্রজন্মের উত্তোরণের পথ কী?
এর থেকে উত্তরণের পথ স্বয়ং তরুণরাই। তারা যদি চায় যে আমরা সংশোধন হবো, তাহলে তাদের সংশোধন হবে। তারা যদি চায় আমরা দ্বিগুণ নষ্ট হবো, তাহলে তারা নষ্ট হবে। সংশোধনের চাবিকাঠি তাদের নিজেদের হাতেই। ফিরে আসার মন্ত্র তাদের কণ্ঠেই। তাই হে মুসলিম তরুণ প্রজন্ম! ফিরে এসো। ফিরে এসো রবের দিকে। নিজেদের সংশোধনে ব্রতী হও। নষ্ট জীবনকে পেছনে ফেলে এগিয়ে এসো আলোর দিকে। ইসলামের শাশ্বত চেতনা হৃদয়ে ধারণ করো। হাতে তুলে নাও আলোর মশাল। জ্বালিয়ে দাও দিকে দিকে ইসলামের নুরের বাতি। হৃদয় থেকে হৃদয়ে প্রজ্জ্বলিত করো ওহির আলো।
📄 অনুতপ্ত অশ্রু
তারা ছিল তিন বন্ধু। একসাথে থাকত, চলত এবং ফিরত। তারা তিনজন ছিল ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত। অবাধ্যতায় লিপ্ত। পরস্পরকে তারা আল্লাহর নাফরমানি ও পাপাচারে সহযোগিতা করত। লোকদের সৎকাজ থেকে বিরত রাখত। অসৎকাজে আদেশ করত। সৌভাগ্যক্রমে আল্লাহ তায়ালা তাদের একজনকে হেদায়েত করলেন। অবাধ্যতা থেকে বাধ্যতার পথে ফিরিয়ে আনেন। অসৎপথ থেকে সৎপথে তুলে আনেন। অন্ধকার থেকে আলোর মিছিলে অংশগ্রহণ করে। তার প্রতি এ ছিল আল্লাহ তায়ালার অপার অনুগ্রহ। কিন্তু বাকি দুজন তখনো অন্যায় ও পাপাচারে নিমজ্জিত। সে চাইল তার বাকি দুই বন্ধুকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে চাইল। তারপর শুরু করল ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। বিভিন্নভাবে সে তাদের বোঝাতে লাগল। তাদের সামনে তুলে ধরতে লাগল তাদের অবাধ্যতা ও আখেরাতে এর ভয়াবহ পরিণামের কথা। অনবরত চেষ্ট করতে লাগল তাদেরকে সত্য ও আলোর পথে আনতে। পাশাপাশি আল্লাহর নিকট তাদের হেদায়েতের জন্য দোয়া করতে লাগল। গভীর রাতে সে তার বন্ধুদের জন্য আল্লাহর দরবারে চোখের অশ্রু ফেলত। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার চেষ্টা ও দোয়া কবুল করলেন। তার চেষ্টার বদৌলতে একদিন তার দুই বন্ধু অবাধ্যতা ও নাফরমানি ছেড়ে দিলো। ফিরে এলো আল্লাহর পথে। ফিরে এলো আলোর পথে। এবার তিন বন্ধু তারা এক পথ ও এক মোহনায় এসে মিলিত হলো। তারা তাদের অতীত জীবনের ভুলের দিকে তাকিয়ে নিদারুণ লজ্জিত হলো। তখন তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল, এতদিন পর্যন্ত তারা নাফরমানি ও পাপাচারে লিপ্ত ছিল। লোকদের সৎকাজ থেকে বিরত রাখত। অসৎকাজে আদেশ করত। এখন তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল, বাকি জীবন তারা আল্লাহর আনুগত্যে কাটাবে। লোকদের সৎকাজের আদেশ করবে। অসৎকাজ থেকে বিরত রাখবে। তাদের বাকি জীবন পরিচালিত হবে একমাত্র আল্লাহর নির্দেশনা এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর অনুসরণ করে।
তিন বন্ধু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল, প্রতিদিন ফজরের আজানের এক ঘণ্টা পূর্বে তারা ঘুম থেকে জাগবে। তখন নিরিবিলি সময়ে একান্তচিত্তে আল্লাহর ইবাদত করবে। তার নিকট কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করবে। কেননা, তারা জেনেছে, রাত্রির শেষ প্রহরের এ সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তখন আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের ডাকতে থাকেন আর বলতে থাকেন, কে আছ তওবাকারী? আমি তার তওবা কবুল করব। কে আছ গোনাহ মোচনকারী? আমি তার গোনাহ মোচন করব। কে আছ ক্ষমাপ্রার্থনাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করব। তাই তারা সুন্দর ও অধিকতর কল্যাণকর এ সময়কে নিজেদের ইবাদত ও প্রার্থনার জন্য বেছে নিল। প্রতিদিন ঘুম থেকে জেগে তারা নিকটস্থ মসজিদে চলে যেত। ফজর পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকত।
প্রতিদিনের ন্যায় একদিন তারা তিন বন্ধু রাতের শেষ প্রহরে মসজিদের দিকে যাচ্ছে। চারদিক তখন নীরব-নিস্তব্ধ। পুরো পৃথিবী ঘুমের ঘোরে অচেতন। আকাশ-পৃথিবী শান্ত ও গম্ভীর। কোথাও কেউ নেই। চলতে চলতে হঠাৎ একটি বাড়ি থেকে তাদের কানে গান ও মিউজিকের আওয়াজ ভেসে এলো। এটা শুনে তারা তিন বন্ধু থমকে দাঁড়াল। তারপর এগিয়ে গেল বাড়িটির দিকে যেখান থেকে গান ও মিউজিকের আওয়াজ ভেসে আসছে। তারা দেখল, তাদের বয়সি এক তরুণ রাতভর গান ও মিউজিক বাজাচ্ছে। রাতভর সে এভাবেই ব্যস্ত ছিল। এ দেখে সে যুবকের প্রতি দারুণ মায়া জাগল তাদের অন্তরে। তার অবাধ্যতা ও পাপাচার দেখে তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হলো। তাই তারা চাইল তাকে অবাধ্যতার পথ থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে। প্রথমজন তাকে ডাক দিলো। কিন্তু সে যুবক তার ডাকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করল না। অতঃপর দ্বিতীয়জন ডাকল। এবারও সে কোনো সাড়া দিলো না। সর্বশেষ তৃতীয়জন ডাকল। এবারও পূর্বের মতোই সে নিরুত্তর। বেশ চেষ্টা করেও যখন কোনো কাজ হলো না, তখন নিরুপায় হয়ে তারা মসজিদের দিকে ফিরে আসতে চাইল। তখন তাদের একজন দাঁড়িয়ে গেল। অপর দুজন তার দাঁড়িয়ে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করল? সে বলল, 'আমাদের উচিত তাকে অবাধ্যতা ও নাফরমানির পথ থেকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা। শয়তানের পথ থেকে আল্লাহর পথে ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের আপ্রাণ চেষ্টা করা উচিত। যদি আজ রাতেই সে মারা যায় তাহলে তার আখেরাত কেমন হবে? হয়তো আজ রাতে আল্লাহ তাকে হেদায়েত দেবেন। আমাদের উচিত আমরা যা পছন্দ করি তা অপর ভাইয়ের জন্যও পছন্দ করা। সুতরাং ঈমান ও নেক আমলের চেয়ে উত্তম নেয়ামত আর কী আছে? ইসলামের চেয়ে উৎকৃষ্ট পছন্দ আর কী আছে? তাই এসো আমরা তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করি। আজকের রাতটুকু আমরা তার পেছনেই চেষ্টা অব্যাহত রাখি।'
তার কথা শোনে দুই বন্ধু সম্মত হলো। পুনরায় তারা এগিয়ে গেল যুবকের নিকট। বহু চেষ্টার পর তারা যুবকের দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে সক্ষম হলো। যুবকটি ফিরে তাকালে তারা তাকে ইশারায় বাহিরে বেরিয়ে আসতে আহ্বান জানাল। যুবক তাদের প্রশাসনের সদস্য মনে করে বাহিরে বেরিয়ে এলো। তিনজন প্রথমে হাসিমুখে তাকে সালাম দিলো এবং তার সাথে করমর্দন করল। তার নাম জিজ্ঞেস করল। সে বলল, আমার নাম হাসান। তাদের জিজ্ঞেস করল, কী চাও তোমরা? তারা বলল, 'তুমি কি জানো, এখন কোন সময়? এটি দিনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সময়। অত্যন্ত দামি ও মূল্যবান সময়। এ সময় কেউ আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করলে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। এ সময় তওবাকারীর তওবা কবুল করা হয়। পাপীর পাপ, গোনাহগারের গোনাহ ক্ষমা করা হয়। তুমি আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে ডুবে আছ। সুতরাং তুমি ফিরে এসো। আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করো। তার নিকট অনুনয়-বিনয়ের সাথে সকল গোনাহ থেকে তওবা করো। আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দেবেন। কেননা, আল্লাহ তায়ালা হলেন সবচেয়ে মহান। অতি ক্ষমাশীল। তার হৃদয় দয়া ও রহমে পূর্ণ।
তাদের কথা শোনে হাসান বলল, 'আমি এমন এক গোনাহগার আল্লাহ যাকে কখনো মাফ করবেন না। আমি আজন্ম আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপাচারে লিপ্ত বয়েছি। কখনো কোনো ভালো কাজ করিনি। আমার হৃদয় আল্লাহর নাফরমানিতে কালো হয়ে গেছে। তিনি আমাকে কখনো ক্ষমা করবেন না।' এবার তারা তিনজন হাসানকে বোঝাতে শুরু করল। তখন রাতের শেষ প্রহর। পৃথিবী নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে আছে। রাত্রির অখণ্ড নীরবতায় গুরুগম্ভীর কণ্ঠে তারা হাসানের সামনে তুলে ধরল আল্লাহর পরিচয়। একে একে তারা আল্লাহর গুণাবলি হাসানের সামনে ফুটিয়ে তুলতে লাগল। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু, তিনি বান্দার তওবা কবুল করেন, ইত্যাদি প্রলুব্ধ কথাবার্তায় তারা হাসানের হৃদয় গলানোর চেষ্টা চালাতে লাগল। তারা তাকে শোনাল পবিত্র কুরআনের বাণী।
وَإِنِّي لَغَفَّارُ لِمَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَى
'আর যে তওবা করে, ঈমান আনে, সৎকর্ম করে এবং সঠিক পথের অনুসরণ করে, তার প্রতি আমি ক্ষমাশীল।’⁸⁰
إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُوْلَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا
'তারা ব্যতীত যারা তওবা করে, ঈমান রাখে এবং সৎকাজ করে; আল্লাহ তাদের পাপসমূহ পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। '⁸¹
وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِمَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَى
'যে তওবা করে, ঈমান রাখে, সৎকাজ করে আর সঠিক পথ অনুসরণ করে, তার প্রতি আমি অবশ্যই ক্ষমাশীল। '⁸²
لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ
'তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। '⁸³
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
التائب من الذنب كمن لا ذنب له
'গোনাহ থেকে তওবাকারী ঐ ব্যক্তির মতো, যার কোনো গোনাহ নেই।'
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন, 'বান্দা যদি পাহাড় সমপরিমাণ গোনাহ নিয়েও আমার দিকে ফিরে আসে আমি তাকে ক্ষমা করে দিই। এবং আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করতে কোনো প্রকার পরোয়া করি না।'
এভাবে একের-পর-এক আল্লাহর পরিচয় তারা তুলে ধরতে থাকে হাসানের সামনে। তাকে অভয় দিতে লাগল। তার হৃদয়ে সাহস সঞ্চার করছে। সেইসঙ্গে তাদের নিজেদের অতীত জীবন এবং আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক তাদের সৎপথে ফিরে আনার গল্পও তারা শোনাল হাসানকে। সব শুনে হাসান চুপ মেরে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কথা বলছে না। ভাবনার অথৈ সমুদ্রে হারিয়ে গেছে হাসান। চিন্তার মনোজগতে ডুব দিয়ে কী যেন ভাবছে। আগন্তুক তিনজন তাকিয়ে আছে হাসানের দিকে। তারাও চুপ। কোনো কথা বলছে না। হাসানকে তারা ভাবনার অফুরন্ত সময় দিচ্ছে। আর নিঃশব্দে দোয়া করছে আল্লাহ তায়ালা নিকট। তিনি যেন হাসানকে ফিরিয়ে দেন সুপথে। গোনাহ ও পাপাচারের গলিজ ও দুর্গন্ধ জীবন পেছনে ফেলে হাসান যেন ফিরে আসে শাশ্বত সত্যের পথে। হাসান যেন হয় তাদেরই একজন। যে লোকদের সৎকাজের আদেশ করবে। অসৎকাজ থেকে বিরত রাখবে। আল্লাহর আনুগত্য এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহভিত্তিক জীবন পরিচালনা করবে। তারা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হাসানের দিকে। এদিকে সময়ও ফুরিয়ে আসছে দ্রুত। হঠাৎ তারা প্রত্যক্ষ করে, হাসানের চোখে-মুখে ফুটে উঠতে লাগল সত্য ও সুন্দরের আভা। যেন ভাবনার অথৈ দিগন্ত পেরিয়ে আলোর এক বন্দরে নোঙর করেছে সে। হাসানের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো আকাঙ্ক্ষিত সে কথা। 'আমি তওবা করতে চাই।' তারা তিনজন আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করল। অপার তৃপ্তিতে তাদের হৃদয়ে আনন্দের বান বয়ে যেতে লাগল। চোখে-মুখে ফুটে উঠল দৃপ্তির রেখা। অতঃপর হাসান তাদের থেকে অনুমতি নিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। উত্তমরূপে গোসল করল। শরীরে উত্তম সুগন্ধি মাখল। এক পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র হৃদয় নিয়ে হাসান তাদের সাথে মসজিদের দিকে হাঁটতে লাগল। আজ তারা চারজন। একদিন ছিল একজন। তারপর দুইজন। তারপর তিনজন। আজ তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাসান।
এভাবেই আলোর কাফেলা ক্রমশ বাড়তে থাকে। সত্যের দিকে মানুষের ছুটে চলা এভাবে বাড়তে থাকে। যদি ব্যথিত হৃদয় এবং সংবেদনশীল মন নিয়ে পাপী ও গোনাহগারদের আল্লাহর পথের দিকে ডাকা হয় তাহলে সত্যিই তারা সে ডাকে সাড়া দেবে। তাদের হৃদয়ে বেজে উঠবে শাশ্বত সত্য সুন্দরের ধ্বনি।
হাসান তাদের সাথে মসজিদে প্রবেশ করল। জীবনে কোনোদিন হাসান মসজিদে আসেনি। কোনোদিন সে সিজদা করেনি আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালাকে। কোনোদিন সে প্রভুর দরবারে নত করেনি মাথা। গোনাহ ও নাফরমানির দরিয়ায় ডুবে ছিল আকণ্ঠ। ইমাম সাহেব ফজরের সালাত শুরু করলেন। আজ হাসানও দাঁড়াল সকলের সাথে। ইমাম সাহেব আবেগমথিত কণ্ঠে হৃদয় উজাড় করে পড়তে থাকেন মহান রবের পাক কালাম। মসজিদজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল মধুর কণ্ঠের এক পবিত্র সুরলহরী। ইমাম সাহেব সেদিন তিলাওয়াত করেন,
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
'আমার এ কথা লোকদের বলে দিন, হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করছ। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু।' ⁸⁴
হ্যাঁ, সত্যিই আমার রব তার বান্দাদের প্রতি সীমাহীন দয়ালু। তিনি তাদের তওবা কবুল করেন। মুছে দেন তাদের সমুদ্র পরিমাণ পাপ। তিনি অপেক্ষায় থাকেন, কখন বান্দা ফিরে আসবে। কখন তওবা করবে। কখন বান্দা হৃদয় উজার করে তার পবিত্র নাম উচ্চারণ করবে। বরং আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা এতই দয়ালু, এতই ক্ষমাশীল যে, রাত্রির শেষ মুহূর্তে তিনি বান্দাদের লক্ষ্য করে ডাকতে থাকনে, আছে কি কোনো তওবাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। আছে কি কোনো পাপ মোচনকারী? আমি তার পাপ মোচন করে দেব। আছে কি কোনো ক্ষমাপ্রার্থনাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।
হে যুবক! হে তরুণ! দেখো, যে হাসান বলেছিল-আমি এমন পাপী আল্লাহ যাকে কখনো ক্ষমা করবেন না। জাহান্নাম কেবল আমার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। আমার জন্যই প্রজ্বলিত করা হয়েছে জাহান্নামের লেলিহান আগুন। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা হাসানের মতো জঘন্য পাপী ও গোনাহগার বান্দাকেও অভিশপ্ত পথ থেকে তুলে এনে মসজিদে প্রবেশ করিয়েছেন। দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন নামাজে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার সম্মুখে। কতই-না মেহেরবান আমার রব। কতই-না দয়ালু আমার প্রভু।
অতঃপর হাসান ফজরের সালাত শেষে তাদের সাথে মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলো। হাসান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। তাদের অন্তরের অন্তস্থল থেকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করল। এবার হাসান একে একে তার অতীত জীবনের কাহিনি তাদের নিকট বর্ণনা করতে লাগল। তার পাপ ও গোনাহের ধারাবাহিক বিবরণ সে তাদের শোনাতে লাগল। আর তার চোখ দিয়ে প্রবহমান ঝরনার মতো অনুতপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। তারা হাসানকে সান্ত্বনার বাণী শোনাতে লাগল। একপর্যায়ে হাসান হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। কেউ তাকে তার কান্না থেকে বিরত রাখতে পারছিল না। কান্নামাখা কণ্ঠে হাসান তাদের বলল, গ্রামে আমার বৃদ্ধ পিতা এবং বৃদ্ধ মা রয়েছে। তারা জীবনের বার্ধক্যে পদার্পণ করেছে। তারা এখন কাজ-কর্ম এবং চলাফেরায় অন্যের মুখাপেক্ষী। কিন্তু আমি তাদের কোনো সেবা করছি না।
বরং তাদের ওপর অনেক অত্যাচার করেছি। আমি তাদের সীমাহীন কষ্ট দিয়েছি। তারা দূর গ্রামে থাকে। আমি দীর্ঘ সময় তাদের দেখতে যাই না। জানি না গ্রামে কেমন আছে তারা। আমি তাদের এত কষ্ট দিয়েছি, হয়তো কোনোদিন তারা আমাকে ক্ষমা করবে না। হাসানের এমন কান্না তাদের অন্তরকে ব্যথিত করল। তাদের হৃদয়কে স্পর্শ করল।
তারা হাসানকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামে তার পিতা-মাতার নিকট গেল। হাসানের পিতা ফজরের সালাত শেষ করে ঘরে ফিরেছেন মাত্র। হাসানকে বাড়ির বাহিরে রেখে তারা তিনজন বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। মমতা জড়ানো কণ্ঠে তারা হাসানের পিতাকে সালাম জানাল। গ্রাম্য বৃদ্ধ প্রথমে তাদের চিনতে পারেনি। তারা নিজেদের হাসানের বন্ধু বলে পরিচয় দিলো। হাসানের নাম শোনামাত্র বৃদ্ধ লোকটি ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। উত্তেজিত তবে কিছুটা বেদনামাখা কণ্ঠে বললেন, 'হাসান! যে সর্বদা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত থাকে। পিতা-মাতাকে কষ্ট দেয়। আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করুক। সে আমাদের যেভাবে কষ্ট দিয়েছে আল্লাহ তাকে তদ্রূপ কষ্ট দিক।' বৃদ্ধের কথা শুনে একজন বলল, হাসান তওবা করেছে এবং অতীত জীবন থেকে ফিরে এসেছে। এ কথা শোনে বৃদ্ধ চমকে উঠল। তার চোখে-মুখে ফুটে উঠল বিস্ময়ের রেখা। অবিশ্বাসের সুরে তিনি বললেন, হাসান তওবা করেছে? কোন হাসান? আমার ছেলে? এবার দৃঢ়তার সঙ্গে তারা বলল, হ্যাঁ, আপনার সন্তান হাসান। আজ আমাদের সঙ্গে সে মসজিদে জামাতের সাথে ফজরের নামাজ আদায় করেছে। আমরা তাকে আপনার নিকট নিয়ে এসেছি। সে আপনাদের নিকট ক্ষমা চাইতে এসেছে। আপনি কি হাসানকে ক্ষমা করবেন না?' এ কথা শোনে বৃদ্ধ হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। তার চোখ ফেটে অশ্রু ঝরতে লাগল। অতঃপর আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে শুকরিয়া আদায় করলেন। হাসানকে তারা তার পিতার সামনে এনে হাজির করল। বৃদ্ধ পিতা অনেকদিন পর সন্তানকে দেখে আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়লেন। আদর ও স্নেহের সাথে জড়িয়ে ধরলেন হাসানকে।
হে মুসলিম যুব প্রজন্ম! ফিরে এসো তোমাদের মহান রবের দিকে। অন্যায় ও পাপের জীবন ছেড়ে আলোর জীবন গ্রহণ করো। অতীত নাফরমানি থেকে বিশুদ্ধ হৃদয়ে আল্লাহ তায়ালার নিকট তওবা করো। তিনি বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু। কোনো বান্দা যখন তওবা করে তখন তিনি তার প্রতি সীমাহীন খুশি হোন।
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
'আমার এ কথা লোকদের বলে দিন, হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করছ। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু।'⁸⁵
وَإِنِّي لَغَفَّارُ لِمَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَى
'আর যে তওবা করে, ঈমান আনে, সৎকর্ম করে এবং সঠিক পথের অনুসরণ করে, তার প্রতি আমি ক্ষমাশীল।'⁸⁶
إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُوْلَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا
'তারা ব্যতীত যারা তওবা করে, ঈমান রাখে এবং সৎকাজ করে; আল্লাহ তাদের পাপসমূহ পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' ⁸⁷
টিকাঃ
৮০ সুরা তহা: ৮২
৮১ সুরা ফুরকান: ৭০
৮২ সুরা তহা: ৮২
৮৩ সুরা যুমার: ৫৩।
৮৪ সুরা যুমার: ৫৩
৮৫ সুরা যুমার: ৫৩
৮৬ সুরা তহা: ৮২
৮৭ সুরা ফুরকান: ৭০