📄 রাতের বেলা ইবাদত করা
যদি তুমি দিনের বেলা আল্লাহর নিকট প্রিয় হতে চাও তাহলে তোমাকে রাতের বেলা আল্লাহর নিকট প্রিয় হতে হবে। রাতের অন্ধকার আল্লাহর নিকট প্রিয় হওয়ার সর্বোত্তম ও সুবর্ণ সুযোগ। যুবকদের জন্য করণীয় হলো, রাতের অন্ধকারে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করা। বিগলিতচিত্তে রবের সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা। বিনয়াবনত হয়ে নামাজ পড়া। পরম ভালোবাসার সাথে রুকু করা। অত্যন্ত ভক্তি ও আবেগের সাথে আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হওয়া। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْئًا وَأَقْوَمُ قِيلًا
'রাতে (ইবাদতের জন্য) ওঠা (প্রবৃত্তিকে) শক্তভাবে দমনে এবং (কথা) সঠিকভাবে উচ্চারণে অত্যন্ত সহায়ক।'⁵⁰
অন্য আয়াতে ইরশাদ করেন,
تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا
'তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে পৃথক হয়। আশা নিয়ে তারা তাদের প্রভুকে ডাকে এবং তাদের যা দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে।'⁵¹
রাতের অন্ধকারে নামাজ পড়া শ্রেষ্ঠ ইবাদতসমূহের একটি। ফরজ ইবাদতের পর এটি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে অধিক সহায়ক। যাকে কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের নামাজ বলা হয়। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে অধিক নামাজ পড়তেন; এমনকি নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার পা মুবারক ফুলে যেত। যখন এ ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, তখন তিনি বলেছেন,
أفلا أكون عبداً شكوراً؟
অর্থাৎ, 'আমি কি আমার প্রভুর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না?'
রাতের গভীরে আল্লাহর সম্মুখে নামাজে দণ্ডায়মান হওয়া শ্রেষ্ঠ ও আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় ইবাদতসমূহের একটি। যে যুবক রাতে তার রবের সামনে নামাজে দাঁড়াবে তার যৌবনকাল অতিবাহিত হবে উত্তমভাবে। আল্লাহ তায়ালার সাথে তার সম্পর্ক হবে সুদৃঢ়। তার অন্তর হবে প্রশস্ত। তার ঈমান হবে শক্তিশালী। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের নামাজ সম্পর্কে ইরশাদ করেন,
أفضل الصلاة بعد المكتوبة الصلاة في جوف الليل
'ফরজ নামাজের পর সর্বশ্রেষ্ট নামাজ হলো ওই নামাজ যা রাতের গভীরে আদায় করা হয়। '⁵²
হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন ব্যক্তির কথা বলেছেন যাদের আল্লাহ তায়ালা ভালোবাসেন। উক্ত তিন ব্যক্তির মধ্যে এক প্রকার হলো তারা, যারা রাতে তাদের রবের সামনে নামাজের জন্য দাঁড়ায়। যাদের নিকট ঘুমের চেয়ে নামাজ প্রিয়। এবং দীর্ঘক্ষণ তারা এভাবে নামাজে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের রবকে স্মরণ করে।
রাতে কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করার গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে সকলেই অবগত। বান্দা যখন রাতের আরাম-আয়েশকে বিসর্জন দিয়ে গোপনে তার রবের সামনে নামাজে দাঁড়ায় তখন আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কেউ তাকে দেখতে পায় না। ফলে তখন তার মাঝে ইখলাস ও নিষ্ঠা থাকে পূর্ণমাত্রায়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা অত্যধিক পছন্দ করেন যে, বান্দা কেবল আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে আর কাউকে শরিক করবে না। এ জন্যই যারা মুনাফিক তারা রাতের গভীরে নামাজ পড়ে না। কারণ, তারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে না। আল্লাহ তায়ালার একনিষ্ঠ বান্দাগণই কেবল রাতে ইবাদত করে।
রাতের ইবাদতের মাঝে লুকিয়ে আছে মুমিনের শক্তি। মুমিনগণ এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সাহায্য কামনা করে। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে, মুমিনদের বিজয়ের পেছনে রয়েছে রাতের নামাজ ও চোখের বিগলিত অশ্রু। বদর যুদ্ধ সম্পর্কে হযরত আলি রা. বর্ণনা করেছেন যে, যুদ্ধের আগের দিন রাতে আমরা ভোর পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদত, দোয়া ও কান্নাকাটিতে কাটিয়ে দিই। যার ফলশ্রুতিতে পরদিন যুদ্ধের রণাঙ্গনে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের সাহায্যের জন্য আসমান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ফেরেশতা প্রেরণ করেছেন এবং মুসলমানদের বিজয় দান করেছেন। শুধু বদর যুদ্ধ নয়, ইসলামের সকল যুদ্ধের চিত্রই এমন। রাতের ইবাদতের মাঝে আল্লাহ তায়ালা বিশেষ একটি পাওয়ার দান করেছেন যা অন্যান্য ইবাদতে দান করেননি। এর কারণ তো এই যে, তখন বান্দা কেবল আল্লাহর জন্য ইবাদত করে। তার সাথে কাউকে শরিক করে না। আর না কাউকে দেখানোর জন্য ইবাদত করে। জেনে রেখো! মুমিনের শক্তির রহস্য লুকিয়ে আছে কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের মাঝে। বান্দা যখন অত্যন্ত কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয় তখন রাতের গভীরে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে। বান্দার ওপর আরোপিত কঠিন মুহূর্তে রাতের ইবাদতের প্রতি ধাবিত হয়। আল্লাহ তখন বান্দাকে সাহায্য করেন। আল্লাহ তখন বান্দার কঠিনকে করে দেন সহজ। আল্লাহ তায়ালা বদরে মুসলমানদের সেই কঠিন সময়ের কথা বর্ণনা করে ইরশাদ করেন,
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنِّي مُمِدُّكُمْ بِأَلْفٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُرْدِفِينَ
'যখন তোমরা তোমাদের প্রভুর নিকট সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছিলে এবং তিনি তোমাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে বলেছিলেন, আমি তোমাদের এক হাজার ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্য করব; যারা একজনের পেছনে আরেকজন ক্রমান্বয়ে আসতে থাকবে।' ⁵³
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় সাহাবি এবং ইসলামের সোনালি যুগের যুবকদের নিকট রাতের ইবাদত ছিল অত্যন্ত প্রিয়। রাতের গভীরে অত্যধিক নামাজ ও অশ্রুপাত তাদের আসীন করেছে সর্বোচ্চ চূড়ায়। ইমাম যাহাবি রহ. বলেন, হযরত আলি ইবনে হুসাইন ইবনে যাইনুল আবেদিন রাতভর ইবাদতে কাটিয়ে দিতেন। যখন দিন ফুরিয়ে যেত এবং রাত আগমন করত তখন তিনি অজু করে বিছানায় যেতেন। আর বলতেন, 'কতই-না উত্তম এ রাত্রি। জান্নাতে রয়েছে এর চেয়েও উত্তম। এর চেয়ে অধিক প্রশান্তি। আর বলতেন, সকাল পর্যন্ত আমি ইবাদত করব।' হ্যাঁ, তিনি ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন। যখন সকাল হতো তখন চেহারায় নূর চমকাতো। একটি উজ্জ্বল আলো তার মুখমণ্ডলে জ্বলজ্বল করত।
হযরত হাসান বসরি রহ. বলেন, 'যারা রাতে ইবাদত করে তাদের নূরের পোশাক পরিধান করানো হয়। নুর তাদের সর্বদা বেষ্টন করে রাখে।'
বিনিদ্র রজনী যারা ইবাদত করতেন তাদের মধ্যে একজন হলেন, হযরত রাবি ইবনে হায়সাম রহ.। তিনি রাতভর ইবাদত, নামাজ, জিকির ও কান্নাকাটিতে কাটিয়ে দিতেন। এবং এর পরিণাম এতই অধিক ছিল যে, তার মা তাকে একদিন জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কেন রাতভর না ঘুমিয়ে এত ইবাদত করো? তুমি কি কাউকে হত্যা করেছ যে আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না?' জবাবে রাবি ইবনে হায়সাম বলেন, 'হ্যাঁ, আমি নিজেকে গোনাহ ও অবাধ্যতা দ্বারা হত্যা করেছি।' হযরত রাবি ইবনে হায়সাম ছিলেন সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর শিষ্য। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. তার সম্পর্কে বলেন, 'যদি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে দেখতেন, তাহলে অবশ্যই তিনি তোমাকে ভালোবাসতেন।'
টিকাঃ
৫০ সুরা মুজাম্মিল: ৬
৫১ সুরা সিজদা: ১৬
৫২ সহিহ মুসলিম: ২০৬৯
৫৩ সুরা আনফাল: ৯
যদি তুমি দিনের বেলা আল্লাহর নিকট প্রিয় হতে চাও তাহলে তোমাকে রাতের বেলা আল্লাহর নিকট প্রিয় হতে হবে। রাতের অন্ধকার আল্লাহর নিকট প্রিয় হওয়ার সর্বোত্তম ও সুবর্ণ সুযোগ। যুবকদের জন্য করণীয় হলো, রাতের অন্ধকারে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করা। বিগলিতচিত্তে রবের সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা। বিনয়াবনত হয়ে নামাজ পড়া। পরম ভালোবাসার সাথে রুকু করা। অত্যন্ত ভক্তি ও আবেগের সাথে আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হওয়া। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْئًا وَأَقْوَمُ قِيلًا
'রাতে (ইবাদতের জন্য) ওঠা (প্রবৃত্তিকে) শক্তভাবে দমনে এবং (কথা) সঠিকভাবে উচ্চারণে অত্যন্ত সহায়ক।'⁵⁰
অন্য আয়াতে ইরশাদ করেন,
تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا
'তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে পৃথক হয়। আশা নিয়ে তারা তাদের প্রভুকে ডাকে এবং তাদের যা দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে।'⁵¹
রাতের অন্ধকারে নামাজ পড়া শ্রেষ্ঠ ইবাদতসমূহের একটি। ফরজ ইবাদতের পর এটি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে অধিক সহায়ক। যাকে কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের নামাজ বলা হয়। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে অধিক নামাজ পড়তেন; এমনকি নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার পা মুবারক ফুলে যেত। যখন এ ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, তখন তিনি বলেছেন,
أفلا أكون عبداً شكوراً؟
অর্থাৎ, 'আমি কি আমার প্রভুর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না?'
রাতের গভীরে আল্লাহর সম্মুখে নামাজে দণ্ডায়মান হওয়া শ্রেষ্ঠ ও আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় ইবাদতসমূহের একটি। যে যুবক রাতে তার রবের সামনে নামাজে দাঁড়াবে তার যৌবনকাল অতিবাহিত হবে উত্তমভাবে। আল্লাহ তায়ালার সাথে তার সম্পর্ক হবে সুদৃঢ়। তার অন্তর হবে প্রশস্ত। তার ঈমান হবে শক্তিশালী। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের নামাজ সম্পর্কে ইরশাদ করেন,
أفضل الصلاة بعد المكتوبة الصلاة في جوف الليل
'ফরজ নামাজের পর সর্বশ্রেষ্ট নামাজ হলো ওই নামাজ যা রাতের গভীরে আদায় করা হয়। '⁵²
হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন ব্যক্তির কথা বলেছেন যাদের আল্লাহ তায়ালা ভালোবাসেন। উক্ত তিন ব্যক্তির মধ্যে এক প্রকার হলো তারা, যারা রাতে তাদের রবের সামনে নামাজের জন্য দাঁড়ায়। যাদের নিকট ঘুমের চেয়ে নামাজ প্রিয়। এবং দীর্ঘক্ষণ তারা এভাবে নামাজে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের রবকে স্মরণ করে।
রাতে কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করার গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে সকলেই অবগত। বান্দা যখন রাতের আরাম-আয়েশকে বিসর্জন দিয়ে গোপনে তার রবের সামনে নামাজে দাঁড়ায় তখন আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কেউ তাকে দেখতে পায় না। ফলে তখন তার মাঝে ইখলাস ও নিষ্ঠা থাকে পূর্ণমাত্রায়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা অত্যধিক পছন্দ করেন যে, বান্দা কেবল আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে আর কাউকে শরিক করবে না। এ জন্যই যারা মুনাফিক তারা রাতের গভীরে নামাজ পড়ে না। কারণ, তারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে না। আল্লাহ তায়ালার একনিষ্ঠ বান্দাগণই কেবল রাতে ইবাদত করে।
রাতের ইবাদতের মাঝে লুকিয়ে আছে মুমিনের শক্তি। মুমিনগণ এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সাহায্য কামনা করে। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে, মুমিনদের বিজয়ের পেছনে রয়েছে রাতের নামাজ ও চোখের বিগলিত অশ্রু। বদর যুদ্ধ সম্পর্কে হযরত আলি রা. বর্ণনা করেছেন যে, যুদ্ধের আগের দিন রাতে আমরা ভোর পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদত, দোয়া ও কান্নাকাটিতে কাটিয়ে দিই। যার ফলশ্রুতিতে পরদিন যুদ্ধের রণাঙ্গনে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের সাহায্যের জন্য আসমান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ফেরেশতা প্রেরণ করেছেন এবং মুসলমানদের বিজয় দান করেছেন। শুধু বদর যুদ্ধ নয়, ইসলামের সকল যুদ্ধের চিত্রই এমন। রাতের ইবাদতের মাঝে আল্লাহ তায়ালা বিশেষ একটি পাওয়ার দান করেছেন যা অন্যান্য ইবাদতে দান করেননি। এর কারণ তো এই যে, তখন বান্দা কেবল আল্লাহর জন্য ইবাদত করে। তার সাথে কাউকে শরিক করে না। আর না কাউকে দেখানোর জন্য ইবাদত করে। জেনে রেখো! মুমিনের শক্তির রহস্য লুকিয়ে আছে কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের মাঝে। বান্দা যখন অত্যন্ত কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয় তখন রাতের গভীরে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে। বান্দার ওপর আরোপিত কঠিন মুহূর্তে রাতের ইবাদতের প্রতি ধাবিত হয়। আল্লাহ তখন বান্দাকে সাহায্য করেন। আল্লাহ তখন বান্দার কঠিনকে করে দেন সহজ। আল্লাহ তায়ালা বদরে মুসলমানদের সেই কঠিন সময়ের কথা বর্ণনা করে ইরশাদ করেন,
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنِّي مُمِدُّكُمْ بِأَلْفٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُرْدِفِينَ
'যখন তোমরা তোমাদের প্রভুর নিকট সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছিলে এবং তিনি তোমাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে বলেছিলেন, আমি তোমাদের এক হাজার ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্য করব; যারা একজনের পেছনে আরেকজন ক্রমান্বয়ে আসতে থাকবে।' ⁵³
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় সাহাবি এবং ইসলামের সোনালি যুগের যুবকদের নিকট রাতের ইবাদত ছিল অত্যন্ত প্রিয়। রাতের গভীরে অত্যধিক নামাজ ও অশ্রুপাত তাদের আসীন করেছে সর্বোচ্চ চূড়ায়। ইমাম যাহাবি রহ. বলেন, হযরত আলি ইবনে হুসাইন ইবনে যাইনুল আবেদিন রাতভর ইবাদতে কাটিয়ে দিতেন। যখন দিন ফুরিয়ে যেত এবং রাত আগমন করত তখন তিনি অজু করে বিছানায় যেতেন। আর বলতেন, 'কতই-না উত্তম এ রাত্রি। জান্নাতে রয়েছে এর চেয়েও উত্তম। এর চেয়ে অধিক প্রশান্তি। আর বলতেন, সকাল পর্যন্ত আমি ইবাদত করব।' হ্যাঁ, তিনি ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন। যখন সকাল হতো তখন চেহারায় নূর চমকাতো। একটি উজ্জ্বল আলো তার মুখমণ্ডলে জ্বলজ্বল করত।
হযরত হাসান বসরি রহ. বলেন, 'যারা রাতে ইবাদত করে তাদের নূরের পোশাক পরিধান করানো হয়। নুর তাদের সর্বদা বেষ্টন করে রাখে।'
বিনিদ্র রজনী যারা ইবাদত করতেন তাদের মধ্যে একজন হলেন, হযরত রাবি ইবনে হায়সাম রহ.। তিনি রাতভর ইবাদত, নামাজ, জিকির ও কান্নাকাটিতে কাটিয়ে দিতেন। এবং এর পরিণাম এতই অধিক ছিল যে, তার মা তাকে একদিন জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কেন রাতভর না ঘুমিয়ে এত ইবাদত করো? তুমি কি কাউকে হত্যা করেছ যে আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না?' জবাবে রাবি ইবনে হায়সাম বলেন, 'হ্যাঁ, আমি নিজেকে গোনাহ ও অবাধ্যতা দ্বারা হত্যা করেছি।' হযরত রাবি ইবনে হায়সাম ছিলেন সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর শিষ্য। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. তার সম্পর্কে বলেন, 'যদি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে দেখতেন, তাহলে অবশ্যই তিনি তোমাকে ভালোবাসতেন।'
টিকাঃ
৫০ সুরা মুজাম্মিল: ৬
৫১ সুরা সিজদা: ১৬
৫২ সহিহ মুসলিম: ২০৬৯
৫৩ সুরা আনফাল: ৯
📄 যুবকদের মর্যাদা
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعًا
'যে সম্মান চায় তার জানা উচিত, যাবতীয় সম্মান একমাত্র আল্লাহর জন্য।'⁵⁴
অপর আয়াতে ইরশাদ করেন,
وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ
'আসলে সম্মান তো আল্লাহর, তার রাসুলের এবং মুমিনদের। কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।'⁵⁵
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছেন এবং মদিনায় ইসলামের প্রচার-প্রসার করছেন। মদিনার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে ঈমানের আলো। মদিনার লোকেরা দলে দলে মুসলমান হতে লাগল। কিন্তু এ দৃশ্যে গাত্রদাহ শুরু হলো ইসলামের শত্রুদের। কাফের মুশরিকরা মুসলমানদের এ অগ্রযাত্রাকে যে-কোনো মূল্যে রুখে দিতে চাইল। আর এ জন্য তারা গ্রহণ করল একটি মাস্টারপ্ল্যান। মদিনার চারপাশের সকল গোত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হলো। তারা যে-কোনো মূল্যে ইসলামের আলোকে নিভিয়ে দিতে চায়। থামিয়ে দিতে চায় কালিমার অগ্রযাত্রাকে। মদিনায় ইসলাম ও মুসলমানদের তখন নিদারুণ ক্রান্তিকাল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মুসলমানদের সে অবস্থা বর্ণনা করে বলেন,
إِذْ جَاءُوكُم مِّن فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللَّهِ الظُّنُونَا هُنَالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْزَالًا شَدِيدًا
'যখন তোমাদের উপরের দিক থেকে ও নিচের দিক থেকে শত্রুরা তোমাদের দিকে এসেছিল, যখন ভয়ে তোমাদের দৃষ্টিসমূহ নিস্তেজ হয়ে এসেছিল ও হৃৎপিণ্ডগুলো গলার কাছে চলে এসেছিল এবং তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা রকম সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করেছিলে। সেখানেই মুমিনরা পরীক্ষায় নিপতিত হয়েছিল এবং দারুণভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল।’⁵⁶
মদিনায় মুসলমানদের তখন নিদারুণ ক্রান্তিকাল। দ্বীন ও জাতির এমন কঠিন মুহূর্তে এবং ঘোরতর বিপদের সময় ঈমানদার যুবকদের মর্যাদা পরিলক্ষিত হয়। প্রস্ফুটিত হয় মুসলিম যুবকদের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য। রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দেখলেন, মদিনা ও মদিনার আশপাশের ইহুদি- খ্রিষ্টান ও কাফের মুশরিকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সম্মিলিত জোট হয়ে তারা মুসলমানদের মদিনা থেকে বিতাড়িত করতে চাচ্ছে। নিভিয়ে দিতে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে আল্লাহর দ্বীনকে। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার গাতফান গোত্রের দুজন নেতার সাথে গোপনে সাক্ষাৎ করলেন এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গাতফান গোত্রের মনোভাব জানলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পারলেন, গাতফান গোত্রের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সম্পদ। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের কোনো প্রকার শত্রুতা নেই। তাদের উদ্দেশ্য ধন-সম্পদ। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সন্ধির প্রস্তাব দিলেন। যেন তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত জোটের অভিযানে অংশগ্রহণ না করে। এর মাধ্যমে মদিনাবাসীর ওপর শত্রুদের চাপ কিছুটা হলেও লাঘব হবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে মদিনার মুসলমানদের এক তৃতীয়াংশ ফসলের বিনিময়ে সন্ধি করলেন। তবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি শর্ত দিলেন। শর্তটি হলো, তিনি এ ব্যাপারে সাদ ইবনে মুয়াজ রা.-যিনি আউস সম্প্রদায়ের নেতা-এবং সাদ ইবনে উবাদা রা.-যিনি খাজরাজ গোত্রের নেতা-এ দুজনের সাথে পরামর্শ করে তবেই সন্ধিপত্র চূড়ান্ত করবেন।
হযরত সাদ ইবনে মুয়াজ এবং হযরত সাদ ইবনে উবাদা রা. দুজনই ছিলেন বয়সে পরিণত যুবক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় ইসলাম ও মুসলমানদের চরম সঙ্কটপূর্ণ দিনে দুজন যুবকের সাথে পরামর্শ করে গাতফান গোত্রের সাথে সন্ধিচুক্তি চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সকলের ওপর দুজন যুবক সাহাবিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। মদিনায় তখন আরো অনেক প্রবীণ সাহাবি ছিলেন। কিন্তু পরামর্শ ও সিদ্ধান্তের জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের মধ্যে কেবল দুজন যুবক সাহাবিকে নির্বাচন করলেন। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে পরামর্শ করে গাতফান গোত্রের সাথে সন্ধি চূড়ান্ত করলেন। ইসলাম ও মুসলমানদের কঠিনতম দিনে যুবকদের মর্যাদা পরিলক্ষিত হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ
'আসলে সম্মান তো আল্লাহর, তার রাসুলের এবং মুমিনদের। কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না। '⁵⁷
মুসলিম যুবকদের মর্যাদার কথা পবিত্র কুরআনেই বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন,
وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ إِن يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌ فَقَدْ مَسَّ الْقَوْمَ قَرْحٌ مِثْلُهُ ، وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَتَّخِذَ مِنكُمْ شُهَدَاءَ ، وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ وَلِيُمَحِّصَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَمْحَقَ الْكَافِرِينَ أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنكُم وَيَعْلَمَ الصَّابِرِينَ
'শত্রুর সামনে তোমরা দুর্বল ও বিষণ্ণ হয়ো না। ঈমানদার হলে তোমরাই বিজয়ী হবে। যদি তোমাদের কোনো আঘাত লাগে তাহলে মনে করবে অনুরূপ আঘাত তো অন্যদেরও লেগেছে। আর এই দিনগুলো আমি মানুষের মধ্যে অদলবদল করি; যাতে আল্লাহ মুমিনদের যাচাই করতে পারেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে শহিদদের গ্রহণ করতে পারেন। আল্লাহ জালেমদের ভালোবাসেন না। এবং যাতে তিনি মুমিনদের সংশোধন আর কাফেরদের নির্মূল করতে পারেন। আল্লাহ তোমাদের মধ্য থেকে জিহাদকারী ও ধৈর্যধারণকারীদের যাচাই করতে পারেন।' ⁵⁸
পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী কাফের মুশরিক, ইহুদি, খ্রিষ্টান তারা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মদিনায় আক্রমন করল। কিন্তু সেদিন ঈমানদার যুবকরা তাদের দ্বীনের ওপর ছিল অটল। তারা সেদিন সাহায্য করেছে ইসলামকে। মুসলিম যুবকদের সম্মিলিত প্রতিরোধ ও প্রচেষ্টায় শত্রুর বিশাল দল পলায়ন করতে বাধ্য হয়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَرَدَّ اللَّهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوا خَيْرًا وَكَفَى اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ الْقِتَالَ
'আল্লাহ কাফেরদের তাদের ক্রোধ নিয়েই ফিরিয়ে দিলেন। তারা কোনো কল্যাণ লাভ করতে পারেনি। যুদ্ধে মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ হলেন মহাশক্তিধর ও পরাক্রমশালী।'⁵⁹
মদিনায় তখন মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা ছিল নিতান্তই স্বল্প। কিন্তু আল্লাহ ঈমানদারদের সাহায্য করেছেন। ঈমানদারদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ স্বয়ং দিয়েছেন,
وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنْتُمْ أَذِلَّةٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
'তোমরা দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও বদরে আল্লাহ তোমাদেরকে বিজয়ী করেছিলেন। অতএব আল্লাহকে ভয় করো। যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পারো।'⁶⁰
সাহাবায়ে কেরام রাতের অন্ধকারে ছিলেন সাধক এবং দিনের আলোতে ছিলেন সাহসী ঘোরসওয়ার। আজ পৃথিবীতে মুসলমানরা একমাত্র লাঞ্ছিত, নির্যাতিত। দেশে দেশে আজ মুসলমানদের ওপর চলছে ইতিহাসের ভয়াবহ জুলুম। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে এবং কাঙ্ক্ষিত বিজয় ছিনিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন মুসলিম যুবকদের জাগরণ। মুসলিম যুবকদের সাহাবায়ে কেরামের আদর্শে আদর্শিত হতে হবে। সাহাবায়ে কেরামের মতো রাতের সাধক এবং দিনের ঘোরসওয়ার হতে হবে।
টিকাঃ
৫৪ সূরা ফাতির: ১০
৫৫ সুরা মুনাফিকুন: ৮
৫৬ সুরা আহযাব: ৯-১০
৫৭ সুরা মুনাফিকুন: ৮
৫৮ সুরা আলে ইমরান: ১৩৯-১৪২
৫৯ সুরা আহযাব: ২৫
৬০ সুরা আলে ইমরান: ১২৩
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعًا
'যে সম্মান চায় তার জানা উচিত, যাবতীয় সম্মান একমাত্র আল্লাহর জন্য।'⁵⁴
অপর আয়াতে ইরশাদ করেন,
وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ
'আসলে সম্মান তো আল্লাহর, তার রাসুলের এবং মুমিনদের। কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।'⁵⁵
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছেন এবং মদিনায় ইসলামের প্রচার-প্রসার করছেন। মদিনার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে ঈমানের আলো। মদিনার লোকেরা দলে দলে মুসলমান হতে লাগল। কিন্তু এ দৃশ্যে গাত্রদাহ শুরু হলো ইসলামের শত্রুদের। কাফের মুশরিকরা মুসলমানদের এ অগ্রযাত্রাকে যে-কোনো মূল্যে রুখে দিতে চাইল। আর এ জন্য তারা গ্রহণ করল একটি মাস্টারপ্ল্যান। মদিনার চারপাশের সকল গোত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হলো। তারা যে-কোনো মূল্যে ইসলামের আলোকে নিভিয়ে দিতে চায়। থামিয়ে দিতে চায় কালিমার অগ্রযাত্রাকে। মদিনায় ইসলাম ও মুসলমানদের তখন নিদারুণ ক্রান্তিকাল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মুসলমানদের সে অবস্থা বর্ণনা করে বলেন,
إِذْ جَاءُوكُم مِّن فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللَّهِ الظُّنُونَا هُنَالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْزَالًا شَدِيدًا
'যখন তোমাদের উপরের দিক থেকে ও নিচের দিক থেকে শত্রুরা তোমাদের দিকে এসেছিল, যখন ভয়ে তোমাদের দৃষ্টিসমূহ নিস্তেজ হয়ে এসেছিল ও হৃৎপিণ্ডগুলো গলার কাছে চলে এসেছিল এবং তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা রকম সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করেছিলে। সেখানেই মুমিনরা পরীক্ষায় নিপতিত হয়েছিল এবং দারুণভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল।’⁵⁶
মদিনায় মুসলমানদের তখন নিদারুণ ক্রান্তিকাল। দ্বীন ও জাতির এমন কঠিন মুহূর্তে এবং ঘোরতর বিপদের সময় ঈমানদার যুবকদের মর্যাদা পরিলক্ষিত হয়। প্রস্ফুটিত হয় মুসলিম যুবকদের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য। রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দেখলেন, মদিনা ও মদিনার আশপাশের ইহুদি- খ্রিষ্টান ও কাফের মুশরিকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সম্মিলিত জোট হয়ে তারা মুসলমানদের মদিনা থেকে বিতাড়িত করতে চাচ্ছে। নিভিয়ে দিতে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে আল্লাহর দ্বীনকে। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার গাতফান গোত্রের দুজন নেতার সাথে গোপনে সাক্ষাৎ করলেন এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গাতফান গোত্রের মনোভাব জানলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পারলেন, গাতফান গোত্রের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সম্পদ। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের কোনো প্রকার শত্রুতা নেই। তাদের উদ্দেশ্য ধন-সম্পদ। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সন্ধির প্রস্তাব দিলেন। যেন তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত জোটের অভিযানে অংশগ্রহণ না করে। এর মাধ্যমে মদিনাবাসীর ওপর শত্রুদের চাপ কিছুটা হলেও লাঘব হবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে মদিনার মুসলমানদের এক তৃতীয়াংশ ফসলের বিনিময়ে সন্ধি করলেন। তবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি শর্ত দিলেন। শর্তটি হলো, তিনি এ ব্যাপারে সাদ ইবনে মুয়াজ রা.-যিনি আউস সম্প্রদায়ের নেতা-এবং সাদ ইবনে উবাদা রা.-যিনি খাজরাজ গোত্রের নেতা-এ দুজনের সাথে পরামর্শ করে তবেই সন্ধিপত্র চূড়ান্ত করবেন।
হযরত সাদ ইবনে মুয়াজ এবং হযরত সাদ ইবনে উবাদা রা. দুজনই ছিলেন বয়সে পরিণত যুবক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় ইসলাম ও মুসলমানদের চরম সঙ্কটপূর্ণ দিনে দুজন যুবকের সাথে পরামর্শ করে গাতফান গোত্রের সাথে সন্ধিচুক্তি চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সকলের ওপর দুজন যুবক সাহাবিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। মদিনায় তখন আরো অনেক প্রবীণ সাহাবি ছিলেন। কিন্তু পরামর্শ ও সিদ্ধান্তের জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের মধ্যে কেবল দুজন যুবক সাহাবিকে নির্বাচন করলেন। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে পরামর্শ করে গাতফান গোত্রের সাথে সন্ধি চূড়ান্ত করলেন। ইসলাম ও মুসলমানদের কঠিনতম দিনে যুবকদের মর্যাদা পরিলক্ষিত হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ
'আসলে সম্মান তো আল্লাহর, তার রাসুলের এবং মুমিনদের। কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না। '⁵⁷
মুসলিম যুবকদের মর্যাদার কথা পবিত্র কুরআনেই বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন,
وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ إِن يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌ فَقَدْ مَسَّ الْقَوْمَ قَرْحٌ مِثْلُهُ ، وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَتَّخِذَ مِنكُمْ شُهَدَاءَ ، وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ وَلِيُمَحِّصَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَمْحَقَ الْكَافِرِينَ أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنكُم وَيَعْلَمَ الصَّابِرِينَ
'শত্রুর সামনে তোমরা দুর্বল ও বিষণ্ণ হয়ো না। ঈমানদার হলে তোমরাই বিজয়ী হবে। যদি তোমাদের কোনো আঘাত লাগে তাহলে মনে করবে অনুরূপ আঘাত তো অন্যদেরও লেগেছে। আর এই দিনগুলো আমি মানুষের মধ্যে অদলবদল করি; যাতে আল্লাহ মুমিনদের যাচাই করতে পারেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে শহিদদের গ্রহণ করতে পারেন। আল্লাহ জালেমদের ভালোবাসেন না। এবং যাতে তিনি মুমিনদের সংশোধন আর কাফেরদের নির্মূল করতে পারেন। আল্লাহ তোমাদের মধ্য থেকে জিহাদকারী ও ধৈর্যধারণকারীদের যাচাই করতে পারেন।' ⁵⁸
পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী কাফের মুশরিক, ইহুদি, খ্রিষ্টান তারা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মদিনায় আক্রমন করল। কিন্তু সেদিন ঈমানদার যুবকরা তাদের দ্বীনের ওপর ছিল অটল। তারা সেদিন সাহায্য করেছে ইসলামকে। মুসলিম যুবকদের সম্মিলিত প্রতিরোধ ও প্রচেষ্টায় শত্রুর বিশাল দল পলায়ন করতে বাধ্য হয়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَرَدَّ اللَّهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوا خَيْرًا وَكَفَى اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ الْقِتَالَ
'আল্লাহ কাফেরদের তাদের ক্রোধ নিয়েই ফিরিয়ে দিলেন। তারা কোনো কল্যাণ লাভ করতে পারেনি। যুদ্ধে মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ হলেন মহাশক্তিধর ও পরাক্রমশালী।'⁵⁹
মদিনায় তখন মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা ছিল নিতান্তই স্বল্প। কিন্তু আল্লাহ ঈমানদারদের সাহায্য করেছেন। ঈমানদারদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ স্বয়ং দিয়েছেন,
وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنْتُمْ أَذِلَّةٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
'তোমরা দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও বদরে আল্লাহ তোমাদেরকে বিজয়ী করেছিলেন। অতএব আল্লাহকে ভয় করো। যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পারো।'⁶⁰
সাহাবায়ে কেরام রাতের অন্ধকারে ছিলেন সাধক এবং দিনের আলোতে ছিলেন সাহসী ঘোরসওয়ার। আজ পৃথিবীতে মুসলমানরা একমাত্র লাঞ্ছিত, নির্যাতিত। দেশে দেশে আজ মুসলমানদের ওপর চলছে ইতিহাসের ভয়াবহ জুলুম। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে এবং কাঙ্ক্ষিত বিজয় ছিনিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন মুসলিম যুবকদের জাগরণ। মুসলিম যুবকদের সাহাবায়ে কেরামের আদর্শে আদর্শিত হতে হবে। সাহাবায়ে কেরামের মতো রাতের সাধক এবং দিনের ঘোরসওয়ার হতে হবে।
টিকাঃ
৫৪ সূরা ফাতির: ১০
৫৫ সুরা মুনাফিকুন: ৮
৫৬ সুরা আহযাব: ৯-১০
৫৭ সুরা মুনাফিকুন: ৮
৫৮ সুরা আলে ইমরান: ১৩৯-১৪২
৫৯ সুরা আহযাব: ২৫
৬০ সুরা আলে ইমরান: ১২৩
📄 যুবকদের প্রতি জান্নাতের হাতছানি
আল্লাহ ও মুসলিম যুবকদের মাঝে সম্পাদিত হয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা হলেন ক্রেতা, যুবকরা হলো বিক্রেতা। আর দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মূল্য হলো জান্নাত। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ فَمَنْ نَكَثَ فَإِنَّمَا يَنْكُثُ عَلَى نَفْسِهِ وَمَنْ أَوْفَى بِمَا عَاهَدَ عَلَيْهُ اللَّهَ فَسَيُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
'হে নবী! যারা আপনার নিকট বাইয়াত করে, তারা মূলত আল্লাহর কাছেই বাইয়াত করে। তাদের হাতের উপর রয়েছে আল্লাহর হাত। সুতরাং যে তা ভঙ্গ করে সে নিজেরই ক্ষতি করে। আর যে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণ করে তাকে তিনি বড় এক বড় পুরস্কার (জান্নাত) দেবেন।'৬১
যুবকদের একটি বড় গুণ হলো, যুবকরা হয় প্রচণ্ড সাহসী। তাদের শিরায় শিরায় বীরত্ব। তাদের দমনীতে প্রবাহিত হয় উষ্ণ রক্ত। যুবকরা হলো আল্লাহর সৈনিক। তাদের চেতনা হলো, আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠা করা এবং কাফেরদের পরাজিত ও অপদস্থ করা। যুবকদের প্রতীক হলো,
نحن الذين بايعوا محمداً على الجهاد ما بقينا أبداً
'আমরা আজন্ম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর জিহাদের বাইয়াত গ্রহণ করেছি।
যুবকদের শ্লোগান হলো,
كنا جبالاً فوق الجبال وربما صرنا على موج البحار بحاراً
'আমরা পাহাড়ের চেয়েও সুদৃঢ়। আমাদের হৃদয় সমুদ্রেরও অধিক তরঙ্গবিক্ষুব্ধ।'
যুবকদের হাতছানি দিচ্ছে জান্নাত। আর তারাও জান্নাতকে হাতছানি দিচ্ছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর ইসলাম ও মুসলমানদের ওপর নেমে এলো আকস্মিক মহা বিপর্যয়। দিকে দিকে ফেতনা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে লাগল। ইসলাম ত্যাগ করে অনেকে মুরতাদ হয়ে যাচ্ছিল। কোনো কোনো ভণ্ড ও প্রতারক নিজেকে নবী বলে দাবি করে। মুসলমানদের অনেকে ঈমান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। মুসলমানদের মধ্যে তখন যারা ইসলামের ওপর অটল ছিলেন তারা ইসলামকে সাহায্য করেন। পাহাড়ের মতো অটল থেকে তারা ইসলামের ওপর আরোপিত সকল ফেতনা মোকাবেলা করেন। হযরত আবু বকর রা. নিজ মনোবলকে অত্যন্ত সুদৃঢ় করেন। খেলাফতের আসনে বসে তিনি সেসব ফেতনা মোকাবেলা করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সমগ্র মুসলমানদের তিনি এগারটি দলে বিভক্ত করেন। তাদের মাঝে নিযুক্ত করেন এগার জন সেনাপতি। তাদের হাতে তুলে দেন এগারটি পতাকা। তাদের তিনি যুদ্ধের সরঞ্জাম দিয়ে আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন দিকে প্রেরণ করেন।
সর্বাধিক বড় ফিতনা ছিল তখন মুসাইলামা। মুসাইলামা নিজেকে নবী বলে দাবি করে। তার সাথে তার গোত্রের লোকেরা ঐক্যবদ্ধ হয়। সংখ্যায় ছিল তারা চল্লিশ হাজার। হযরত আবু বকর রা. তাদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের শক্তিশালী একটি সৈন্যদল প্রেরণ করেন। সেনাপতি নিযুক্ত করেন হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-কে। হযরত আবু বকর রা. বলেন, মুসাইলামার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য খালিদকে প্রয়োজন। হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. ছিলেন একজন যুবক সাহাবি। সাহসিকতা ও বীরত্বে তিনি ছিলেন মুসলমানদের মধ্যে সেরা। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সাইফুল্লাহ তথা আল্লাহর তরবারি বলে উপাধি দিয়েছেন।
হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. আনসার ও মুহাজিরদের একটি কাফেলা নিয়ে রওনা হলেন ইয়ামামার প্রান্তরে। মুসাইলামার বাহিনী সেখানে প্রস্তুত ছিল। উভয় দল মুখোমুখি হলো। সৈন্যসংখ্যায় কাফেররা ছিল অধিক। মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা নিতান্তই নগণ্য। তবুও তাদের ভয় নেই। কেননা, তাদের জন্য সাহায্য প্রেরিত হয় আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে। مسلمانوں کا বিজয় লেখা হয় আল্লাহর কুদরতি হাতে। রবের পক্ষ থেকে তাদের দেওয়া হয় যুদ্ধের নির্দেশনা। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوهُمُ الْأَدْبَارَ
'হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা কাফেরদের সাথে যুদ্ধের ময়দানে মুখোমুখি হবে তখন তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে না। '⁶²
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمْ فِئَةً فَاثْبُتُوا وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা কোনো বাহিনীর মুখোমুখি হবে তখন অবিচল থাকবে এবং আল্লাহকে স্মরণ করবে, যাতে তোমরা সফল হতে পারে। '⁶³
শুরু হলো উভয় বাহিনীর লড়াই। ইয়ামামার প্রান্তরে মুসাইলামা ও হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-এর বাহিনীর মধ্যে চলছে তুমুল সংঘাত। মুসলিম বাহিনীর মধ্যে ছিলেন হযরত বারা ইবনে মালিক রা.। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী এক যোদ্ধা। শক্তি ও বিচক্ষণতার সমাহার ছিল তার মধ্যে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। প্রতিটি যুদ্ধেই সাহস ও রণকৌশলের স্বাক্ষর রেখেছেন। মুসলিম শিবিরে প্রসিদ্ধ ছিল তার অসীম বীরত্বের কথা।
নবীজির প্রতি হযরত বারা রা. এর ভালোবাসা ছিল অত্যধিক। সে ভালোবাসা ছিল মরুভূমির বালির চেয়েও অধিক। চাঁদের জোছনার মতো কোমল। সূর্যের মতো নিখাদ ও শানিত। হযরত বারা ইবনে মালেকের সাহস ও নবীর প্রতি অসীম ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি লড়ে যাচ্ছেন প্রচণ্ড বীরবিক্রমে। তার বীরত্ব টগবগ করে উঠছে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির মতো। যুদ্ধ চলছে তুমুল তুফানে। ক্ষিপ্রগতিতে মুসলিম সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়ে কাফেরদের ওপর। উভয় পক্ষ সমানে সমান। কেউ ছাড় দিতে রাজি নয় আজ। না মুসলিম বাহিনী। না মুসায়লামার দল। এ লড়াই নিছক জয়- পরাজয়ের লড়াই নয়; সত্য ও মিথ্যার এক চূড়ান্ত পার্থক্যকারী যুদ্ধ।
যুদ্ধের মাঝেই সেনাপতি হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ নিজ ঘোড়ার ওপর দাঁড়িয়ে তেজস্বী কণ্ঠে মুসলিম বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তিনি বলেন, 'হে মদিনার অধিবাসীগণ! আজ তোমরা অন্তর থেকে মদিনার চিন্তা মুছে ফেলো। আজ তোমাদের অন্তরে থাকবে কেবল আল্লাহ এবং জান্নাতের স্মরণ। আজকের এ লড়াই আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে নিশ্চিত হবে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য।'
সেনাপতি হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-এর এমন অগ্নিময় ভাষণ শুনে দ্বিগুণ শক্তিতে জ্বলে ওঠেন হযরত বারা ইবনে মালিক। তার রক্তে বলখ মেরে উঠে সাহস ও শৌর্যের আগুন। নতুন প্রেরণায় তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন শত্রুর ওপর। নাঙা তলোয়ার উঁচিয়ে প্রবল তেজে তিনি ঘোড়া ছুটিয়েছেন শত্রুর দিকে।
তারপর একের-পর-এক বীর পাহলোয়ান যোদ্ধাকে ধরাশয়ী করে মাটিতে ফেলে দেন হযরত বারা। তারপর পেটে তলোয়ার ঢুকিয়ে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলেন মুহূর্তের মধ্যে। রক্তে মেখে যায় তার ঘোড়ার পা। মুসলিম বাহিনীর আক্রমণের প্রচণ্ডতায় মুসায়লামার বাহিনী পিছু হঠতে বাধ্য হয়। ইয়ামামার অদূরে ছিল প্রাচীরবেষ্টিত একটি বাগান। মুসায়লামা লুকিয়ে ছিল বাগানের ভেতর। মুসাইলামার বাহিনী পিছু হঠতে হঠতে বাগানের নিকটবর্তী হলে মুসাইলামা তাদের প্রাচীরের ভেতর চলে আসতে আহ্বান করে। শত্রুরা প্রাচীরের ভেতর প্রবেশ করলে প্রাচীরের ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়।
দুঃসাহসী বারা রা.। শত্রুপক্ষকে পিছু হঠিয়ে তবুও শীতল হয় না তার রক্তে জ্বলা আগুন। টগবগ করতে থাকে সাহসের প্রচণ্ডতায়। সঙ্গী সৈনিকদের বলেন তিনি, আমাকে প্রাচীরের ওপারে নিক্ষেপ করো। আমি লড়ব তাদের সাথে। মুসাইলামার একটা দফারফা না করে আজ ফিরব না।'
কিন্তু হযরত বারা ইবনে মালিকের কথায় প্রথমে অমত করে বাকিরা। তারা চান না, বারা ইবনে মালিক নিজেকে শত্রুর হাতে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পতিত হোক। সকলেই নিষেধ করলেন বারা ইবনে মালিককে। কিন্তু, তিনি অনড় নিজের সিদ্ধান্তে। নবীর দুশমনদের আজ অমনি অমনি ছেড়ে দেবেন না। সঙ্গীদের পীড়াপীড়ি করতে থাকেন তিনি। তার অনড় সিদ্ধান্তের সামনে নতি স্বীকার করলেন সাহাবায়ে কেরাম। প্রাচীরের উপর উচু করে তুলে ধরেন তারা হযরত বারা ইবনে মালিককে। প্রাচীরের উপর বসে প্রথমে ভেতরটা ভালো করে পরখ করে নেন তিনি।
অতঃপর ঝাঁপিয়ে পড়েন প্রাচীরের ভেতরে। ক্ষিপ্র বাঘের মতো তিনি হামলে পড়েন। অতর্কিত আক্রমণ করতে থাকেন শত্রুদের ওপর। হযরত বারা ইবনে মালিকের অমন অতর্কিত আক্রমনের কথা ভাবতেই পারেনি শত্রুপক্ষ। তার আচানক হামলায় দিশেহারা হয়ে পড়ে মুসাইলামার দল। তারা বাগানের ভেতর দিগ্বিদিক ছুটোছুটি করতে থাকে। পালাতে থাকে কেউ কউে এদিক-সেদিক। সুযোগ বুঝে বাগানের ফটক খুলে দেন হযরত বারা। আর অমনি মুসলিম সৈন্যরা হুমড়ি দিয়ে ঢুকে পড়ে দূর্গের ভেতরে। আর রক্ষা কোথায় তাদের। বেধড়ক তলোয়ার চালাতে থাকেন মুসলিম সৈন্যরা। মুসলমানদের তরবারি ফায়সালা করতে থাকে ভণ্ড প্রতারকদের। মুহূর্তে রক্তে ছেয়ে যায় প্রাচীরঘেরা বাগান। একটি আঘাত মুসাইলামার জীবন সাঙ্গ করে দেয়। লুটিয়ে পড়ে মুসাইলামা। তারপর আরেকটি আঘাত, তারপর আরেকটি...। দুনিয়া থেকে চিরবিদায় হলো মিথ্যা নবী দাবিদার মুসাইলামা।
মুসলমান সৈন্যরা শত্রুদের ধরে ধরে হত্যা করতে থাকে। বিশ হাজার শত্রুকে সেদিন হত্যা করা হয়। বাকিরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। যুদ্ধে পরাজিত হয় মুসাইলামার বাহিনী। ইয়ামামার ধূসর প্রান্তরে রচিত হয় এক যুগান্তকারী ইতিহাসের। ইয়ামামার যুদ্ধে হযরত বারা ইবনে মালিক দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করেন। সেনাপতি হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং হযরত বারা ইবনে মালেক রা.-এর অসীম বীরত্বে জয়লাভ করে মুসলমানরা। ইয়ামামার প্রান্তরে রচিত হয় নতুন ইতিহাস। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মান ও নবুওয়াত রক্ষার প্রথম নজরানা আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
فَإِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا فَضَرْبَ الرِّقَابِ حَتَّى إِذَا أَثْخَنتُمُوهُمْ فَشُدُّوا الْوَثَاقَ فَإِمَّا مَنَّا بَعْدُ وَإِمَّا فِدَاءً حَتَّى تَضَعَ الْحَرْبُ أَوْزَارَهَا ، ذَلِكَ وَلَوْ يَشَاءُ اللَّهُ لَا نَتَصَرَ مِنْهُمْ وَلَكِن لِّيَبْلُوَ بَعْضَكُم بِبَعْضٍ وَالَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَلَن يُضِلَّ أَعْمَالَهُمْ سَيَهْدِيهِمْ وَيُصْلِحُ بَالَهُمْ وَيُدْخِلُهُمُ الْجَنَّةَ عَرَّفَهَا لَهُمْ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَنصُرُوا اللَّهَ يَنصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ
'কাফেরদের সাথে যখন যুদ্ধের ময়দানে তোমাদের মোকাবেলা হবে তখন তাদের গর্দানে আঘাত করবে। অবশেষে যখন তোমরা তাদের রক্তপাত ঘটাবে তখন বাকিদের শক্ত করে বাঁধবে। তারপর হয় তাদের প্রতি অনুগ্রহ করবে অথবা মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দেবে। যতক্ষণ না যুদ্ধ তার বোঝা নামিয়ে রাখে। এটিই আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহ চাইলে তাদের থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি চান তোমাদের কতককে কতকের দ্বারা পরীক্ষা করতে। তবে যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদের আমল তিনি কিছুতেই নষ্ট করবেন না। তিনি তাদের সেই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার কথা তিনি তাদের জানিয়ে দিয়েছেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য করো তাহলে তিনিও তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা সুদৃঢ় রাখবেন। '⁶⁴
টিকাঃ
৬১সুরা ফাতহ: ১০
৬২ সুরা আনফাল: ১৫
৬৩ সুরা আনফাল: ৪৫
৬৪ সুরা মুহাম্মদ: ৪-৭
আল্লাহ ও মুসলিম যুবকদের মাঝে সম্পাদিত হয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা হলেন ক্রেতা, যুবকরা হলো বিক্রেতা। আর দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মূল্য হলো জান্নাত। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ فَمَنْ نَكَثَ فَإِنَّمَا يَنْكُثُ عَلَى نَفْسِهِ وَمَنْ أَوْفَى بِمَا عَاهَدَ عَلَيْهُ اللَّهَ فَسَيُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا
'হে নবী! যারা আপনার নিকট বাইয়াত করে, তারা মূলত আল্লাহর কাছেই বাইয়াত করে। তাদের হাতের উপর রয়েছে আল্লাহর হাত। সুতরাং যে তা ভঙ্গ করে সে নিজেরই ক্ষতি করে। আর যে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণ করে তাকে তিনি বড় এক বড় পুরস্কার (জান্নাত) দেবেন।'৬১
যুবকদের একটি বড় গুণ হলো, যুবকরা হয় প্রচণ্ড সাহসী। তাদের শিরায় শিরায় বীরত্ব। তাদের দমনীতে প্রবাহিত হয় উষ্ণ রক্ত। যুবকরা হলো আল্লাহর সৈনিক। তাদের চেতনা হলো, আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠা করা এবং কাফেরদের পরাজিত ও অপদস্থ করা। যুবকদের প্রতীক হলো,
نحن الذين بايعوا محمداً على الجهاد ما بقينا أبداً
'আমরা আজন্ম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর জিহাদের বাইয়াত গ্রহণ করেছি।
যুবকদের শ্লোগান হলো,
كنا جبالاً فوق الجبال وربما صرنا على موج البحار بحاراً
'আমরা পাহাড়ের চেয়েও সুদৃঢ়। আমাদের হৃদয় সমুদ্রেরও অধিক তরঙ্গবিক্ষুব্ধ।'
যুবকদের হাতছানি দিচ্ছে জান্নাত। আর তারাও জান্নাতকে হাতছানি দিচ্ছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর ইসলাম ও মুসলমানদের ওপর নেমে এলো আকস্মিক মহা বিপর্যয়। দিকে দিকে ফেতনা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে লাগল। ইসলাম ত্যাগ করে অনেকে মুরতাদ হয়ে যাচ্ছিল। কোনো কোনো ভণ্ড ও প্রতারক নিজেকে নবী বলে দাবি করে। মুসলমানদের অনেকে ঈমান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। মুসলমানদের মধ্যে তখন যারা ইসলামের ওপর অটল ছিলেন তারা ইসলামকে সাহায্য করেন। পাহাড়ের মতো অটল থেকে তারা ইসলামের ওপর আরোপিত সকল ফেতনা মোকাবেলা করেন। হযরত আবু বকর রা. নিজ মনোবলকে অত্যন্ত সুদৃঢ় করেন। খেলাফতের আসনে বসে তিনি সেসব ফেতনা মোকাবেলা করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সমগ্র মুসলমানদের তিনি এগারটি দলে বিভক্ত করেন। তাদের মাঝে নিযুক্ত করেন এগার জন সেনাপতি। তাদের হাতে তুলে দেন এগারটি পতাকা। তাদের তিনি যুদ্ধের সরঞ্জাম দিয়ে আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন দিকে প্রেরণ করেন।
সর্বাধিক বড় ফিতনা ছিল তখন মুসাইলামা। মুসাইলামা নিজেকে নবী বলে দাবি করে। তার সাথে তার গোত্রের লোকেরা ঐক্যবদ্ধ হয়। সংখ্যায় ছিল তারা চল্লিশ হাজার। হযরত আবু বকর রা. তাদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের শক্তিশালী একটি সৈন্যদল প্রেরণ করেন। সেনাপতি নিযুক্ত করেন হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-কে। হযরত আবু বকর রা. বলেন, মুসাইলামার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য খালিদকে প্রয়োজন। হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. ছিলেন একজন যুবক সাহাবি। সাহসিকতা ও বীরত্বে তিনি ছিলেন মুসলমানদের মধ্যে সেরা। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সাইফুল্লাহ তথা আল্লাহর তরবারি বলে উপাধি দিয়েছেন।
হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. আনসার ও মুহাজিরদের একটি কাফেলা নিয়ে রওনা হলেন ইয়ামামার প্রান্তরে। মুসাইলামার বাহিনী সেখানে প্রস্তুত ছিল। উভয় দল মুখোমুখি হলো। সৈন্যসংখ্যায় কাফেররা ছিল অধিক। মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা নিতান্তই নগণ্য। তবুও তাদের ভয় নেই। কেননা, তাদের জন্য সাহায্য প্রেরিত হয় আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে। مسلمانوں کا বিজয় লেখা হয় আল্লাহর কুদরতি হাতে। রবের পক্ষ থেকে তাদের দেওয়া হয় যুদ্ধের নির্দেশনা। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوهُمُ الْأَدْبَارَ
'হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা কাফেরদের সাথে যুদ্ধের ময়দানে মুখোমুখি হবে তখন তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে না। '⁶²
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمْ فِئَةً فَاثْبُتُوا وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা কোনো বাহিনীর মুখোমুখি হবে তখন অবিচল থাকবে এবং আল্লাহকে স্মরণ করবে, যাতে তোমরা সফল হতে পারে। '⁶³
শুরু হলো উভয় বাহিনীর লড়াই। ইয়ামামার প্রান্তরে মুসাইলামা ও হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-এর বাহিনীর মধ্যে চলছে তুমুল সংঘাত। মুসলিম বাহিনীর মধ্যে ছিলেন হযরত বারা ইবনে মালিক রা.। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী এক যোদ্ধা। শক্তি ও বিচক্ষণতার সমাহার ছিল তার মধ্যে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। প্রতিটি যুদ্ধেই সাহস ও রণকৌশলের স্বাক্ষর রেখেছেন। মুসলিম শিবিরে প্রসিদ্ধ ছিল তার অসীম বীরত্বের কথা।
নবীজির প্রতি হযরত বারা রা. এর ভালোবাসা ছিল অত্যধিক। সে ভালোবাসা ছিল মরুভূমির বালির চেয়েও অধিক। চাঁদের জোছনার মতো কোমল। সূর্যের মতো নিখাদ ও শানিত। হযরত বারা ইবনে মালেকের সাহস ও নবীর প্রতি অসীম ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি লড়ে যাচ্ছেন প্রচণ্ড বীরবিক্রমে। তার বীরত্ব টগবগ করে উঠছে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির মতো। যুদ্ধ চলছে তুমুল তুফানে। ক্ষিপ্রগতিতে মুসলিম সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়ে কাফেরদের ওপর। উভয় পক্ষ সমানে সমান। কেউ ছাড় দিতে রাজি নয় আজ। না মুসলিম বাহিনী। না মুসায়লামার দল। এ লড়াই নিছক জয়- পরাজয়ের লড়াই নয়; সত্য ও মিথ্যার এক চূড়ান্ত পার্থক্যকারী যুদ্ধ।
যুদ্ধের মাঝেই সেনাপতি হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ নিজ ঘোড়ার ওপর দাঁড়িয়ে তেজস্বী কণ্ঠে মুসলিম বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তিনি বলেন, 'হে মদিনার অধিবাসীগণ! আজ তোমরা অন্তর থেকে মদিনার চিন্তা মুছে ফেলো। আজ তোমাদের অন্তরে থাকবে কেবল আল্লাহ এবং জান্নাতের স্মরণ। আজকের এ লড়াই আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে নিশ্চিত হবে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য।'
সেনাপতি হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-এর এমন অগ্নিময় ভাষণ শুনে দ্বিগুণ শক্তিতে জ্বলে ওঠেন হযরত বারা ইবনে মালিক। তার রক্তে বলখ মেরে উঠে সাহস ও শৌর্যের আগুন। নতুন প্রেরণায় তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন শত্রুর ওপর। নাঙা তলোয়ার উঁচিয়ে প্রবল তেজে তিনি ঘোড়া ছুটিয়েছেন শত্রুর দিকে।
তারপর একের-পর-এক বীর পাহলোয়ান যোদ্ধাকে ধরাশয়ী করে মাটিতে ফেলে দেন হযরত বারা। তারপর পেটে তলোয়ার ঢুকিয়ে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলেন মুহূর্তের মধ্যে। রক্তে মেখে যায় তার ঘোড়ার পা। মুসলিম বাহিনীর আক্রমণের প্রচণ্ডতায় মুসায়লামার বাহিনী পিছু হঠতে বাধ্য হয়। ইয়ামামার অদূরে ছিল প্রাচীরবেষ্টিত একটি বাগান। মুসায়লামা লুকিয়ে ছিল বাগানের ভেতর। মুসাইলামার বাহিনী পিছু হঠতে হঠতে বাগানের নিকটবর্তী হলে মুসাইলামা তাদের প্রাচীরের ভেতর চলে আসতে আহ্বান করে। শত্রুরা প্রাচীরের ভেতর প্রবেশ করলে প্রাচীরের ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়।
দুঃসাহসী বারা রা.। শত্রুপক্ষকে পিছু হঠিয়ে তবুও শীতল হয় না তার রক্তে জ্বলা আগুন। টগবগ করতে থাকে সাহসের প্রচণ্ডতায়। সঙ্গী সৈনিকদের বলেন তিনি, আমাকে প্রাচীরের ওপারে নিক্ষেপ করো। আমি লড়ব তাদের সাথে। মুসাইলামার একটা দফারফা না করে আজ ফিরব না।'
কিন্তু হযরত বারা ইবনে মালিকের কথায় প্রথমে অমত করে বাকিরা। তারা চান না, বারা ইবনে মালিক নিজেকে শত্রুর হাতে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পতিত হোক। সকলেই নিষেধ করলেন বারা ইবনে মালিককে। কিন্তু, তিনি অনড় নিজের সিদ্ধান্তে। নবীর দুশমনদের আজ অমনি অমনি ছেড়ে দেবেন না। সঙ্গীদের পীড়াপীড়ি করতে থাকেন তিনি। তার অনড় সিদ্ধান্তের সামনে নতি স্বীকার করলেন সাহাবায়ে কেরাম। প্রাচীরের উপর উচু করে তুলে ধরেন তারা হযরত বারা ইবনে মালিককে। প্রাচীরের উপর বসে প্রথমে ভেতরটা ভালো করে পরখ করে নেন তিনি।
অতঃপর ঝাঁপিয়ে পড়েন প্রাচীরের ভেতরে। ক্ষিপ্র বাঘের মতো তিনি হামলে পড়েন। অতর্কিত আক্রমণ করতে থাকেন শত্রুদের ওপর। হযরত বারা ইবনে মালিকের অমন অতর্কিত আক্রমনের কথা ভাবতেই পারেনি শত্রুপক্ষ। তার আচানক হামলায় দিশেহারা হয়ে পড়ে মুসাইলামার দল। তারা বাগানের ভেতর দিগ্বিদিক ছুটোছুটি করতে থাকে। পালাতে থাকে কেউ কউে এদিক-সেদিক। সুযোগ বুঝে বাগানের ফটক খুলে দেন হযরত বারা। আর অমনি মুসলিম সৈন্যরা হুমড়ি দিয়ে ঢুকে পড়ে দূর্গের ভেতরে। আর রক্ষা কোথায় তাদের। বেধড়ক তলোয়ার চালাতে থাকেন মুসলিম সৈন্যরা। মুসলমানদের তরবারি ফায়সালা করতে থাকে ভণ্ড প্রতারকদের। মুহূর্তে রক্তে ছেয়ে যায় প্রাচীরঘেরা বাগান। একটি আঘাত মুসাইলামার জীবন সাঙ্গ করে দেয়। লুটিয়ে পড়ে মুসাইলামা। তারপর আরেকটি আঘাত, তারপর আরেকটি...। দুনিয়া থেকে চিরবিদায় হলো মিথ্যা নবী দাবিদার মুসাইলামা।
মুসলমান সৈন্যরা শত্রুদের ধরে ধরে হত্যা করতে থাকে। বিশ হাজার শত্রুকে সেদিন হত্যা করা হয়। বাকিরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। যুদ্ধে পরাজিত হয় মুসাইলামার বাহিনী। ইয়ামামার ধূসর প্রান্তরে রচিত হয় এক যুগান্তকারী ইতিহাসের। ইয়ামামার যুদ্ধে হযরত বারা ইবনে মালিক দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করেন। সেনাপতি হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং হযরত বারা ইবনে মালেক রা.-এর অসীম বীরত্বে জয়লাভ করে মুসলমানরা। ইয়ামামার প্রান্তরে রচিত হয় নতুন ইতিহাস। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মান ও নবুওয়াত রক্ষার প্রথম নজরানা আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
فَإِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا فَضَرْبَ الرِّقَابِ حَتَّى إِذَا أَثْخَنتُمُوهُمْ فَشُدُّوا الْوَثَاقَ فَإِمَّا مَنَّا بَعْدُ وَإِمَّا فِدَاءً حَتَّى تَضَعَ الْحَرْبُ أَوْزَارَهَا ، ذَلِكَ وَلَوْ يَشَاءُ اللَّهُ لَا نَتَصَرَ مِنْهُمْ وَلَكِن لِّيَبْلُوَ بَعْضَكُم بِبَعْضٍ وَالَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَلَن يُضِلَّ أَعْمَالَهُمْ سَيَهْدِيهِمْ وَيُصْلِحُ بَالَهُمْ وَيُدْخِلُهُمُ الْجَنَّةَ عَرَّفَهَا لَهُمْ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَنصُرُوا اللَّهَ يَنصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ
'কাফেরদের সাথে যখন যুদ্ধের ময়দানে তোমাদের মোকাবেলা হবে তখন তাদের গর্দানে আঘাত করবে। অবশেষে যখন তোমরা তাদের রক্তপাত ঘটাবে তখন বাকিদের শক্ত করে বাঁধবে। তারপর হয় তাদের প্রতি অনুগ্রহ করবে অথবা মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দেবে। যতক্ষণ না যুদ্ধ তার বোঝা নামিয়ে রাখে। এটিই আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহ চাইলে তাদের থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি চান তোমাদের কতককে কতকের দ্বারা পরীক্ষা করতে। তবে যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদের আমল তিনি কিছুতেই নষ্ট করবেন না। তিনি তাদের সেই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার কথা তিনি তাদের জানিয়ে দিয়েছেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য করো তাহলে তিনিও তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা সুদৃঢ় রাখবেন। '⁶⁴
টিকাঃ
৬১সুরা ফাতহ: ১০
৬২ সুরা আনফাল: ১৫
৬৩ সুরা আনফাল: ৪৫
৬৪ সুরা মুহাম্মদ: ৪-৭
📄 যুবসমাজের অবক্ষয় ও তার পরিবর্তন
বর্তমান যুবসমাজের মারাত্মক অবক্ষয় ঘটেছে। তাদের চরিত্র নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তাদের চেতনার বিলুপ্তি ঘটেছে। সোনালি যুগের সেসব যুবক যাদের হাতে রচিত হয়েছে ইসলামের ইতিহাস, আজ যুবসমাজ কল্যাণের সেই পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছে। তাদের অন্তরে বাসা বেঁধেছে চরম গাফলত ও সীমাহীন আলস্য। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا
'তাদের পরে এমন এক প্রজন্ম এলো যারা নামাজ বিনষ্ট করল এবং প্রবৃত্তির বশবর্তী হলো। অতএব তারা ভ্রষ্টতার পরিণতি দেখতে পারে। '⁶⁵
সোনালি যুগের যুবকদের পর এলো এমন এক প্রজন্ম, যারা তাসবিহ, তাহলিল ও তাকবিরের পরিবর্তে অনর্থক কথাবার্তা এবং গাল-গল্পে মেতে থাকে। তারা মিসওয়াকের পরিবর্তে হাতে তুলে নিয়েছে সিগারেট ও নেশাজাতীয় দ্রব্য। কুরআনের পরিবর্তে হাতে তুলে নিয়েছে পত্রিকা ও অশ্লীল বিভিন্ন ম্যাগাজিন। ইলমি মজলিসকে রূপান্তর করেছে গান-বাদ্য ও সিনেমা-নাটকের দ্বারা। কুরআন তিলাওয়াত ও শ্রবণের পরিবর্তে আজকের যুব প্রজন্ম অশ্লীল গান ও মিউজিক শ্রবণ করছে। তারা ভুলে গিয়েছে জিহাদ। জিহাদের পরিবর্তে তারা মেতে উঠেছে ভ্রষ্টতা ও হঠকারিতায়। আজকের যুব ও তরুণ প্রজন্ম অবক্ষয়ের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়েছে। তাদের অন্তরে নেই ইসলামের জন্য আবেগ ও ভালোবাসা। মুমিনদের জন্য নেই দায়িত্ববোধ। আল্লাহর দেওয়া প্রতিশ্রুতি তারা ভুলে গিয়েছে। কোথায় সেসব যুবক আর কোথায় আজকের যুব প্রজন্ম?
কী হলো, আজ مسلمانوں کا মধ্যে নেই সেসব ব্যক্তি। নেই সাদ ও মিকদাদ রা.-এর মতো সাহসী যুবক। নেই খালিদ ও বারা ইবনে মালেক রা.-এর মতো বীর তরুণ। আজকের যুবকদের ঈমান হয়ে গিয়েছে দুর্বল ও ভঙ্গুর। তাদের ঈমানে নেই তেজোদীপ্ততা। তাদের অন্তরে নেই সাহসের বারুদ। নিভে গিয়েছে তাদের চেতনার আগুন। আজ তারা মৃত। তাদের দেহ মৃত। তাদের অন্তর মৃত। তাদের ঈমান মৃত। অথচ যুবক ও তরুণরাই হলো জাতির শক্তি। জাতির মূল স্প্রিট। অতীতে মুসলিম তরুণদের হাতেই রচিত হয়েছে বিজয়ের ইতিহাস। তাদের গর্জনে কেঁপে উঠেছে শত্রুর হৃদপিণ্ড। বর্তমানে তাদের চেয়ে আরো অধিক সাহসী তরুণদের প্রয়োজন। ইসলাম ও মুসলমানদের আজ চলছে নিদারুণ ক্রান্তিকাল। পৃথিবীর সর্বত্র আজ তারা নির্যাতিত নিপীড়িত। তাদের আর্তনাতে ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ বাতাস। উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু সর্বত্র আজ অসহায় মুসলমানদের আর্তনাদ। আজ তাই প্রয়োজন সেসব সাহসী যুবকদের, যারা রচনা করবে উম্মাহর নতুন ইতিহাস। যারা মুক্ত করবে অসহায় মুসলমানদের। হে যুবক! ফিরে এসো। ফিরে এসো রবের দিকে। ঈমানের আলোয় ফিরে এসো। অবাধ্যতা ও নাফরমানির বৃত্ত ভেঙ্গে ফিরে এসো আনুগত্য ও কল্যাণের পথে। আজ বড়ই প্রয়োজন তোমাদের। তোমাদের হতে হবে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার এই আয়াতের আদর্শ।
إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ آمَنُوا بِرَبِّهِمْ وَزِدْنَاهُمْ هُدًى
'তারা ছিল কয়েকজন যুবক, যারা তাদের প্রভুর প্রতি ঈমান এনেছিল এবং তাদের হেদায়েতকে আমি বৃদ্ধি করেছি।' ⁶⁶
টিকাঃ
৬৫ সুরা মারইয়াম: ৫৯
৬৬ সুরা কাহফ: ১৩