📘 হে যুবক! ফিরে এসো রবের দিকে > 📄 জ্ঞান অর্জনকারীর গুণাবলি

📄 জ্ঞান অর্জনকারীর গুণাবলি


জ্ঞান এক মূল্যবান সম্পদ। দুনিয়ার কোনো বস্তু দিয়ে তা ক্রয় করা যায় না। জ্ঞান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার এক বিশেষ দান। কেবল নিজের চাওয়া-পাওয়া ও অধিক কামনার মাধ্যমেই তা অর্জন করা যায় না। জ্ঞান অর্জন করার জন্য রয়েছে কতিপয় বিশেষ শর্ত। জ্ঞান অর্জনকারীর মাঝে থাকতে হবে বিশেষ গুণাবলি। তন্মধ্যে প্রথম গুণ হলো, জ্ঞান করার জন্য প্রয়োজন উঁচু হিম্মত। জ্ঞান অর্জন করার পূর্বশর্ত হলো, ব্যক্তিকে প্রবল সাহসের অধিকারী হতে হবে। ইলম অর্জনের জন্য নিতে হবে ঝুঁকি। ঘুরে বেড়াতে হবে দেশ থেকে দেশান্তরে। হযরত আসাদ ইবনুল ফুরাত রহ. জ্ঞান অর্জন করার জন্য তার জন্মস্থান কায়রাওয়ান থেকে মদিনায় হিজরত করেন। সেখানে তিনি হযরত ইমাম মালেক রহ.-এর নিকট মুয়াত্তা মালেক শ্রবণ করেন। অতঃপর তিনি মদিনা থেকে ইরাক গমন করেন। সেখানে হযরত আবু হানিফা রহ.-এর শিষ্যদের থেকে ফিকহ শাস্ত্রে গভীর বুৎপত্তি অর্জন করেন। অতঃপর তিনি ছুটে যান ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর নিকট।
তিনি তাকে বলেন, 'আমি অনেক দরিদ্র, বহু দূর থেকে এসেছি। আমার সামর্থ্য নেই আপনার নিকট থেকে ইলম অর্জন করার।' ইমাম মুহাম্মদ রহ. বললেন, 'তুমি আমার নিকট থাকতে থাকো। দিনের বেলা ইরাকের ছেলেদের সাথে ইলম অর্জন করবে। রাতে বিশেষভাবে তুমি আমার নিকট হাদিস পড়বে। আর তুমি এখানেই রাত্রিযাপন করবে। তোমার সমস্ত দায়িত্ব আমার।' ইমাম মুহাম্মদ রহ. তাকে ইলম অর্জনের সকল ব্যবস্থা করে দিলেন। নিশ্চিন্তে তিনি সেখানে ইলম অর্জন করতে লাগলেন। হযরত আসাদ ইবনুল ফুরাত বলেন, 'আমি রাতভর পড়তাম। আমার সামনে পানির একটি পাত্র থাকত। প্রচণ্ড ক্লান্তিতে যখন আমার তন্দ্রা আসত আমি চোখে-মুখে পানি ছিটিয়ে দিতাম।'
সালাফগণ বলেছেন, 'যে উঁচু মর্যাদা লাভ করতে চায় সে যেন রাত্রি জাগরণ করে।'
ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, 'মুসাফির যদি ঘুমিয়ে পড়ে আর তার পথ হয় দীর্ঘ তাহলে সে কখনো তার গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে না।'
দ্বিতীয় গুণ
ইলম অর্জনকারীর দ্বিতীয় গুণ হলো, সময়ের মূল্যায়ন করা। যারা ইলম অর্জন করতে চায়, যারা সম্মান ও মর্যাদার সুউচ্চ আসনে সমাসীন হতে চায়, সর্বপ্রথম তাদের সময়ের মূল্য দিতে হবে। সময় অত্যন্ত মূল্যবান এক সম্পদ। সময়কে অযথা ও অনর্থক কাজে ব্যয় করা যাবে না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
'রহমানের বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং মূর্খরা যখন তাদের ডাকে তখন তারা বলে সালাম। (অর্থাৎ, তারা মূর্খদের সাথে অযথা তর্কে লিপ্ত হয়ে নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে না।)'⁴⁶
এ হলো ইলম অর্জনকারীদের দিনের অবস্থা। আর তাদের রাতের অবস্থা হবে কেমন? সে সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,
وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّnَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا
'যারা তাদের প্রভুর উদ্দেশ্যে সেজদারত ও দণ্ডায়মান অবস্থায় রাত কাটায়। যারা বলে, হে আমাদের প্রভু! আমাদের থেকে জাহান্নামের আজাবকে দূরে রাখো। নিশ্চয়ই তার আজাব বড় সর্বনাশ। '⁴⁷
অন্য আয়াতে ইরশাদ করেন,
وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ ، وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا
'যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং বাজে কথা শুনতে পেলে সম্মান বাঁচিয়ে চলে যায়। '⁴⁸
যারা ইলম অন্বেষণকারী এবং ইলম অর্জনের প্রতি রয়েছে যাদের সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা, তারা ইলম ব্যতীত অন্য কোনো কাজে সময় নষ্ট করে না। কেননা, সময় অত্যন্ত মূল্যবান জিনিস। তারা কেবল ইলম অর্জনের পেছনেই সময় ব্যয় করে। বর্ণিত আছে, একদা হযরত মালেক রা. মদিনায় হাদিসের দরস দিচ্ছিলেন। হঠাৎ বাহিরে শোরগোল শোনা গেল। ছেলেরা চিৎকার চেঁচামেচি করছে। ছুটোছুটি করছে। খবর এলো, মদিনায় হাতি এসেছে। তখন মদিনায় হাতি ছিল বিরল প্রাণী। কদাচিৎ এর দেখা মিলে। ছাত্ররা সবাই দৌড়ে চলে গেল হাতি দেখতে। কিন্তু একজন ছাত্র বসে আছে। তিনি ইয়াহইয়া উন্দুলুসি। সুদূর স্পেন থেকে মদিনায় এসেছেন হযরত ইমাম মালেকের নিকট থেকে হাদিসের ইলম অর্জন করার জন্য। তিনি বসে আছেন শুধু। বাকিরা চলে গেছে হাতি দেখতে। ইমাম মালেক রহ. তাকে বললেন, সকলে হাতি দেখতে গেছে, ইয়াহইয়া তুমি যাও। মদিনায় সাধারণত হাতি আসে না। তুমি কেন হাতি দর্শনের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবে? তখন ইয়াহইয়া উন্দুলুসি জবাবে বলেন, আমি স্পেন থেকে এসেছি আপনার নিকট থেকে ইলম অর্জন করতে, হাতি দেখতে নয়।' ইতিহাসের পাতায় তার জবাব স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
সুতরাং ইলম অন্বেষণকারীদের একটি অন্যতম গুণ হবে সময়কে সংরক্ষণ করা। অযথা ও অনর্থক কাজে মূল্যবান সময় নষ্ট না করা। সময় স্বর্ণের চেয়ে দামি। পৃথিবীতে এর চেয়ে আর কোনো দামি বস্তু সৃষ্টি হয়নি। সকল বস্তুই একবার চলে পুনরায় ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু সময় এমন এক মূল্যবান জিনিস যা চলে গেলে আর কখনো ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই।
তৃতীয় গুণ
ইলম অর্জনকারীর তৃতীয় গুণ হলো, ইলম অনুযায়ী আমল করা। যে যুবক ইলম অর্জন করতে চায় সে যেন অর্জিত ইলম অনুযায়ী আমল করে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ। কেননা, ইলম অর্জন করার পর যদি ইলম অনুপাতে আমল না করে তাহলে কেয়ামতের দিন অর্জিত ইলম তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। আমলহীন আলেমের শাস্তি অত্যন্ত কঠিন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
أشد الناس عذاباً يوم القيامة عالم لا ينتفع بعلمه
'কেয়ামতের দিন লোকদের মধ্যে সর্বাধিক কঠিন শাস্তি ভোগ করবে ওই আলেম যে তার ইলম দ্বারা উপকৃত হয়নি। অর্থাৎ যে আলেম তার ইলম অনুযায়ী আমল করেনি। ⁴⁹
এক ছাত্র ইমাম গাজালি রহ.-কে কিছু নসিহত করতে বলল। তখন ইমাম গাজালি রহ. বললেন, 'নসিহত করা সহজ, কিন্তু কঠিন হলো, নসিহতকে কবুল করা। তদনুযায়ী আমল করা।'

টিকাঃ
৪৬ সুরা ফুরকান: ৬৩
৪৭ সুরা ফুরকান: ৬৪-৬৫
৪৮ সুরা ফুরকান: ৭২।
৪৯ আল মুজামুস সগির-১/১৮৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00