📘 হে যুবক! ফিরে এসো রবের দিকে > 📄 গাফেলতের নিদর্শন

📄 গাফেলতের নিদর্শন


হে আল্লাহর বান্দা! গাফলতের কতিপয় নিদর্শন রয়েছে, যা দেখে নির্ধারণ করা যায়, কে গাফেল আর কে সতর্ক। হে যুবক! তুমি তাকিয়ে দেখো তোমার নিজের দিকে, খুঁজে পাও কিনা গাফলতের কোনো একটি প্রমাণ। গাফলতের প্রথম নিদর্শন হলো, নামাজ না-পড়া। নামাজের প্রতি যত্নবান না-হওয়া। নামাজের সময় অলসতা ও অবহেলার ঘুমে বিভোর থাকা। মসজিদ থেকে যখন আল্লাহু আকবারের স্বরে মধুর আজান ভেসে আসে তখনও দুনিয়াবি কাজে মশগুল থাকা। খেল-তামাশায় ডুবে থাকা। হাটে- বাজারে, পথে-ঘাটে উদাসীন হয়ে ঘুরতে থাকা। কিন্তু দুনিয়ায় আজ কত অগণিত মুসলমান। কিন্তু মসজিদে আসে কতজন? মসজিদের মিনার থেকে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয় তখন কয়জন ছুটে আসে মসজিদের দিকে? হ্যাঁ! তাদের সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য।
মসজিদ আজ শূন্য পড়ে আছে। দীর্ঘ কাতারগুলো পড়ে থাকে নামাজিবিহীন ফাঁকা। আল্লাহু আকবারের ধ্বনি তাদেরকে গাফলতের ঘুম থেকে জাগ্রত করতে পারে না। মিনারের আজান তাদের কর্মের আসর থেকে তুলে আনতে পারে না। রাতের নিদ্রা ভেঙে তারা আসে না কল্যাণের দিকে। তাদের সংখ্যা আজ অনেক। তাদের সংখ্যা বেড়ে চলছে প্রতিনিয়ত।
একটি দুঃখজনক ঘটনা বলি। কিছুদিন আগে একজন লোক এলো আমার নিকট। জিজ্ঞেস করল, হে শাইখ! যে ব্যক্তি নামাজ পড়ে না তার হুকুম কী? আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ঘটনা কী, খুলে বলো। সে তখন বলল, কিছুদিন পূর্বে এক ব্যক্তি মারা গেছে। তার বয়স ছিল সত্তর। কিন্তু সে নামাজ পড়ত না। তার দীর্ঘ জীবনে আমি কখনো তাকে মসজিদে আসতে দেখিনি। কোনোদিন তাকে নামাজের কাতারে দাঁড়ানো দেখিনি।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! এ হলো আজকে আমাদের অবস্থা! সত্তর বছর বয়সে একজন মুসলমান ইন্তেকাল করেছে। কিন্তু কোনোদিন সে মুসলমানদের মসজিদে আসেনি। কোনোদিন তার সৌভাগ্য হয়নি হাত বেঁধে আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়ার। তার সৌভাগ্য হয়নি আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালাকে একটি রুকু করার। একবারও সে রবের সামনে নত করেনি তার মাথা। এর চেয়ে আফসোস আর কি হতে পারে। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এমনই দুর্ভাগ্যের জীবনযাপন করছে আজ অগণিত মানুষ। আফসোসের মৃত্যু নিয়ে তারা চলে যাচ্ছে দুনিয়া ছেড়ে। পরকালে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে নিদারুণ অসহায়ত্ব। কঠিন আজাব তাদের জন্য রব প্রস্তুত করে রেখেছেন। জীবনে একবারও মসজিদে আসার তাওফিক হয়নি। হ্যাঁ, এটিই গাফলতের জিন্দেগি। উদাসীনতার চাদরে ঢাকা এক অভিশপ্ত জীবন।
জনৈক ব্যক্তি প্রত্যহ শেষ রাত্রিতে গ্রামের একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে নামাজের জন্য লোকদেরকে ডাকত। আর তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিত মৃত্যুর কথা। পরকালের কথা। লোকটি তাদেরকে ঘুম ছেড়ে নামাজের জন্য জাগ্রত হওয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান করত। কিন্তু প্রতিদিনের ন্যায় একদিন সে ডাক ভেসে আসছে না। রাতের শেষ তখন। পেরিয়ে যাচ্ছে পবিত্র সুবহে সাদিক। ভোর সমাগত। কিন্তু প্রতিদিনের মতো লোকটি গ্রামবাসীকে ডাকছে না। তাদের নামাজের জন্য জাগ্রত হতে প্রেমার্ত আহ্বান জানাচ্ছে না। তার সে হৃদয়বিদারক ডাক গ্রামের ঘরবাড়ি, গাছপালার উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে না সুকরুণ আবেদন জানিয়ে। গ্রামের সর্দারকে বিষয়টি ভাবিয়ে তুলল। কিছুটা বিচলিত হলো সর্দার। খবর আনতে পাঠাল তার এক সিপাহিকে। সিপাহি এসে গ্রামের সর্দারকে শোকার্ত কণ্ঠে বলল, লোকটি গতকাল মারা গেছে। গ্রামের সর্দার তখন নিদারুণ আক্ষেপের স্বরে বলল, যে আমাদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দিত আজ সেই চলে গেছে দুনিয়া ছেড়ে।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! পবিত্র সেই সত্তার শপথ যিনি সৃজন করেছেন তাবৎ কিছু! এটিই বাস্তবতা। চিরসত্য বাস্তবতা। এখানে যে আসবে সেই চলে যাবে। কেউ থাকতে পারেনি কখনো। পারবেও না কেউ। এটি থাকার জায়গা নয়। দুনিয়া প্রস্থানের জায়গা। দুনিয়াতে কেউ চিরদিন থাকতে পারবে না। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনে তার ওইসব বান্দাদের নিন্দা করেছেন যারা দুনিয়াতে দীর্ঘদিন থাকার স্বপ্ন পোষণ করে।
ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الأَمَلُ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ
'তাদের আহার করতে, ভোগ করতে আর আশায় ভুলে থাকতে দাও। অচিরেই তারা জানতে পারবে।'²¹
দুনিয়াতে যারা দীর্ঘদিন থাকার আশা করে, দুনিয়ার প্রতি যাদের লালসা ও মোহ তীব্র তারা উদাসীন। তারা নামাজ পড়ে না। রুকু করে না। নত হয় না আল্লাহর সম্মুখে। সেজদা করে না। মসজিদে তাদের আগমন হয় না। দুনিয়ার মায়ায় তারা এত মত্ত থাকে যে, মসজিদের ঘোষণা তাদের টেনে আনতে পারে না। সম্পদের লালসা তাদের এতই গ্রাস করে রাখে যে, কাজ- কর্ম রেখে নামাজের জন্য মসজিদে ছুটে আসতে তাদের সময় হয় না।
একদিন আমি পথ চলছিলাম। পথে অনেকগুলো তরুণ বয়সি ছেলের সাথে আমার দেখা হলো। আমি তাদের কাছে ডাকলাম। তাদের সাথে আমার যে কথা হলো তা আমি আপনাদের বলছি।
আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কী করছ এখানে? তারা বলল, আমরা এখানে কাজের তালাশে এসেছি।
তারপর আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কি নিয়মিত নামাজ পড়? আমি আল্লাহর কিতাব ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর প্রতি আস্থা রেখে এ কথা বলতে পারি, নামাজ হলো সকল বরকতের মূল। যে নামাজ পড়ে তার জন্য আল্লাহ তায়ালা উত্তম রিজিকের ব্যবস্থা করে দেন। অকল্পনীয় জায়গা থেকে আল্লাহ তায়ালা তার রিজিকের বন্দোবস্ত করে দেন। এবং দুনিয়া আখেরাতে সম্মানিত করেন তাকে। নামাজ হলো বরকতের চাবিকাঠি।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى
'তোমার পরিবার-পরিজনকে নামাজের আদেশ দাও এবং নিজে তাতে অটল থাকো। আমি তোমার কাছে কোনো জীবিকা চাচ্ছি না। আমিই তোমাকে জীবিকা দিয়ে থাকি। আর শুভ পরিণাম তাদের জন্য যাদের হৃদয়ে আছে তাকওয়া-খোদাভীতি।' ²²
যুবকদের মধ্যে প্রথমজন বলল, হে শাইখ! আমি কি সত্য বলব নাকি মিথ্যা বলব? আমি বললাম, যদি মিথ্যা বলো তাহলে এর পরিণাম তোমাকেই ভোগ করতে হবে।
এ শুনে যুবকটি বলল, হে শাইখ! সত্য বলছি আমি নামাজ পড়ি না! আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি কাফের? যুবকটি বলল, না, আমি মুসলমান। আমি বললাম, তাহলে তুমি মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও নামাজ পড় না কেন? তুমি কি জানো না রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমান ও কাফেরের মাঝে পার্থক্য করেছেন নামাজের মাধ্যমে?
العهد الذي بيننا وبينهم الصلاة، فمن تركها فقد كفر
'আমাদের মাঝে এবং তাদের মাঝে অঙ্গীকার হচ্ছে নামাজ। সুতরাং যে নামাজ ছেড়ে দিয়েছে সে কাফের হয়ে গেছে।'²³
এবার দ্বিতীয় যুবকটি বলল, হে শাইখ! আমি তার চেয়ে ভালো।
আমি বললাম, কীভাবে?
সে বলল, আমি দৈনিক দুই ওয়াক্ত নামাজ পড়ি।
আমি বললাম, এ তো ভারি আশ্চর্যের কথা যে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের ওপর দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। আর তুমি কিনা দিনে পড় মাত্র দুই ওয়াক্ত! এ কেমন উদাসীনতা? হে যুবক! তুমি কি জানো না ইসলামের ভিত্তি রাখা হয়েছে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ওপর?
তৃতীয়জনের অবস্থা তো আর ভারি আশ্চর্যের! সে বলল, আমি নিয়মিত সাপ্তাহিক জুমার নামাজ পড়ি। প্রতি জুমায় নিয়ম করে একবার মসজিদে যাই। আমি বললাম, ইন্নালিল্লাহি...
এই হলো আজ মুসলিম যুবকদের অবস্থা। ছোট-বড়, যুবক-বৃদ্ধ সকলের অবস্থা এর চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কি হতে পারে যে, মুসলমান অথচ নামাজের ব্যাপারে গাফেল। আল্লাহর কসম! এর চেয়ে বড় গাফলত আর হতে পারে না। নামাজের মাধ্যমে পার্থক্য করা যাবে, কে গাফেল আর কে সতর্ক। কে উদাসীন কে জাগ্রত। হে যুবক! তুমি নিজেকে যাচাই করে নাও। তুমি তোমার ঈমান ও আমলের ব্যাপারে গাফেল নাকি জাগ্রত? ভেবে দেখো! আজকের ফজরের নামাজের সময় তুমি কোথায় ছিলে? মসজিদের প্রথম কাতারে নাকি উদাসীনতার চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমের ঘোরে?
মসজিদের মিনার থেকে প্রতিদিন পাঁচবার আজান ভেসে আসে আমাদের কর্ণকোহরে। কিন্তু আমাদের অন্তরে কোনো প্রকার বোধোদয় ঘটে না। দৈনিক পাঁচবার মুয়াজ্জিন আল্লাহর নামে ডেকে ডেকে বলে, এসো কল্যাণের পথে! এসো কল্যাণের পথে! কিন্তু কল্যাণের ডাক আমাদেরকে আমাদের গাফলত থেকে টলাতে পারে না। আমরা নামাজ থেকে যত দূরে সরে যাচ্ছি আমাদের পরিণাম তত খারাপ হচ্ছে। আমাদের ভাগ্য তত মন্দ হচ্ছে। আমাদের ঈমান তত দুর্বল হচ্ছে। ফজরের সময় যখন মসজিদ থেকে আজান ভেসে আসে আমরা তখন অলস ঘুমের ঘোরে মৃত হয়ে পড়ে থাকি।
মধ্য দিবসে যখন জোহরের জন্য মুয়াজ্জিন মসজিদের মিনার থেকে আমাদের ডাকেন। তখন আমরা কর্মের ব্যস্ততায় ডুবে থাকি। এভাবে বিকেল, সন্ধ্যা এবং রাতের প্রথম প্রহরেও আমরা পরিবার-পরিজনকে নিয়ে মত্ত থাকি আরাম-আয়েশে। এসবই আমাদের গাফলতের নিদর্শন। গাফলত আমাদের জীবনের চূড়ান্ত মাকসাদকে পুড়িয়ে ফেলছে। ধ্বংস করে দিচ্ছে আখেরাতকে। তাদের দিকে লক্ষ্য করেই আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ
'আমি জাহান্নামের জন্য অনেক জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি।' ²⁴
কত আফসোস! মুসলমান আজ নামাজ পড়ে না। মুসলমানদের মসজিদগুলো পড়ে আছে রিক্ত হয়ে। বিরান হয়ে যাচ্ছে কত মসজিদ। মসজিদের কাতারগুলো ফাঁকা। হৃদয় সীমাহীন যন্ত্রণায় আহ করে ওঠে। চোখ ফেটে যেন অশ্রু বেরিয়ে আসতে চায়। প্রতিনিয়ত নামাজের মতো মহান আমল থেকে দূরে সরে যাচ্ছি আমরা। আমরা আমাদের মুসলমান বলে দাবি করি অথচ নামাজ হলো মুসলমানদের প্রতীক। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমান ও কাফেরের মাঝে পার্থক্যের মাপকাঠি নির্ধারণ করেছেন নামাজকে। নামাজের মাধ্যমে নির্ণিত হয় কে মুসলমান আর কে কাফের। আজ মুসলমান ঈমান ও কুফরের পার্থক্যের সে রেখা মুছে দিচ্ছে। তাহলে উম্মাহর ভাগ্য কীভাবে পরিবর্তন হবে? কে পরিবর্তন করবে উম্মাহর নিপীড়িত ভাগ্য? যদি এভাবেই চলতে থাকে তাহলে মুসলিম উম্মাহর আকাশ থেকে দূরীভূত হবে না বিপদের ঘনঘটা। যারা দুনিয়াকে নামাজের ওপর প্রাধান্য দেয় তাদের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা প্রস্তুত করে রেখেছেন সীমাহীন লাঞ্ছনা।
যারা দুনিয়াকে আল্লাহর আনুগত্যের ওপর অগ্রগণ্য করে। কোনোদিন তাদের ভাগ্য পরিবর্তন হবে না। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُمْ مُصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُمْ مِثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّى هَذَا قُلْ هُوَ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
'যখন তোমাদের ওপর একটি বিপর্যয় এলো; যার দ্বিগুণ বিপর্যয় ইতিপূর্বে তোমরা তোমাদের প্রতিপক্ষের জন্য ঘটিয়েছিলে, তখন তোমরা বললে, এটা কোথা থেকে এলো? হে নবী আপনি বলে দিন, এটা তোমাদের নিজেদের কৃতকর্মের ফল। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু করতে সক্ষম।'²⁵
উম্মাহর আজ বিপর্যয়ের প্রধান কারণ, তারা নামাজ পড়ে না। তারা তাদের নামাজের প্রতি প্রচণ্ড উদাসীন। আর এর মাধ্যমেই তাদের ঈমানের পরীক্ষাও হয়ে যায়। ঈমান তো নিছক মৌখিক স্বীকারোক্তির নাম নয়। ঈমান যেমন মৌখিক স্বীকারোক্তির নাম, তেমনি আমলে পরিণত করারও নাম। আর নামাজ হলো সর্বোত্তম ইবাদত। মুসলমান আজ নামাজকে পেছনে ফেলে দিনরাত মত্ত থাকে দুনিয়ার অন্বেষণে। সম্পদ আর টাকার নেশা তাদেরকে তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্যের কথা বেমালুম ভুলিয়ে দিয়েছে। জীবনের করণীয় সম্পর্কে তারা চূড়ান্ত বেখবর হয়ে পড়েছে।

টিকাঃ
২১ সুরা হিজর: ৩
২২ সুরা তহা: ১৩২
২৩. মুসনাদে আহমদ। এ হাদিসের মাধ্যমে নামাজের গুরুত্ব বর্ণনা করা উদ্দেশ্য। ঈমানের পর সর্বোত্তম ইবাদত হলো নামাজ। নামাজ পরিত্যাগকারীর ভয়াবহ পরিণাম ও ইসলামের ব্যাপারে তার ঈমানের দুর্বলতা বর্ণনা করতেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। যে মুসলমান নামাজ পড়বে না তার ঈমান পরিপূর্ণ নয়। এর দ্বারা সে কাফের হবে না। হ্যাঁ, কেউ যদি নামাজকে অস্বীকার করে তাহলে কাফের হয়ে যাবে।
২৪ সুরা আরাফ: ১৭৯
২৫ সুরা আলে ইমরান: ১৬৫

হে আল্লাহর বান্দা! গাফলতের কতিপয় নিদর্শন রয়েছে, যা দেখে নির্ধারণ করা যায়, কে গাফেল আর কে সতর্ক। হে যুবক! তুমি তাকিয়ে দেখো তোমার নিজের দিকে, খুঁজে পাও কিনা গাফলতের কোনো একটি প্রমাণ। গাফলতের প্রথম নিদর্শন হলো, নামাজ না-পড়া। নামাজের প্রতি যত্নবান না-হওয়া। নামাজের সময় অলসতা ও অবহেলার ঘুমে বিভোর থাকা। মসজিদ থেকে যখন আল্লাহু আকবারের স্বরে মধুর আজান ভেসে আসে তখনও দুনিয়াবি কাজে মশগুল থাকা। খেল-তামাশায় ডুবে থাকা। হাটে- বাজারে, পথে-ঘাটে উদাসীন হয়ে ঘুরতে থাকা। কিন্তু দুনিয়ায় আজ কত অগণিত মুসলমান। কিন্তু মসজিদে আসে কতজন? মসজিদের মিনার থেকে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয় তখন কয়জন ছুটে আসে মসজিদের দিকে? হ্যাঁ! তাদের সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য।
মসজিদ আজ শূন্য পড়ে আছে। দীর্ঘ কাতারগুলো পড়ে থাকে নামাজিবিহীন ফাঁকা। আল্লাহু আকবারের ধ্বনি তাদেরকে গাফলতের ঘুম থেকে জাগ্রত করতে পারে না। মিনারের আজান তাদের কর্মের আসর থেকে তুলে আনতে পারে না। রাতের নিদ্রা ভেঙে তারা আসে না কল্যাণের দিকে। তাদের সংখ্যা আজ অনেক। তাদের সংখ্যা বেড়ে চলছে প্রতিনিয়ত।
একটি দুঃখজনক ঘটনা বলি। কিছুদিন আগে একজন লোক এলো আমার নিকট। জিজ্ঞেস করল, হে শাইখ! যে ব্যক্তি নামাজ পড়ে না তার হুকুম কী? আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ঘটনা কী, খুলে বলো। সে তখন বলল, কিছুদিন পূর্বে এক ব্যক্তি মারা গেছে। তার বয়স ছিল সত্তর। কিন্তু সে নামাজ পড়ত না। তার দীর্ঘ জীবনে আমি কখনো তাকে মসজিদে আসতে দেখিনি। কোনোদিন তাকে নামাজের কাতারে দাঁড়ানো দেখিনি।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! এ হলো আজকে আমাদের অবস্থা! সত্তর বছর বয়সে একজন মুসলমান ইন্তেকাল করেছে। কিন্তু কোনোদিন সে মুসলমানদের মসজিদে আসেনি। কোনোদিন তার সৌভাগ্য হয়নি হাত বেঁধে আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়ার। তার সৌভাগ্য হয়নি আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালাকে একটি রুকু করার। একবারও সে রবের সামনে নত করেনি তার মাথা। এর চেয়ে আফসোস আর কি হতে পারে। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এমনই দুর্ভাগ্যের জীবনযাপন করছে আজ অগণিত মানুষ। আফসোসের মৃত্যু নিয়ে তারা চলে যাচ্ছে দুনিয়া ছেড়ে। পরকালে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে নিদারুণ অসহায়ত্ব। কঠিন আজাব তাদের জন্য রব প্রস্তুত করে রেখেছেন। জীবনে একবারও মসজিদে আসার তাওফিক হয়নি। হ্যাঁ, এটিই গাফলতের জিন্দেগি। উদাসীনতার চাদরে ঢাকা এক অভিশপ্ত জীবন।
জনৈক ব্যক্তি প্রত্যহ শেষ রাত্রিতে গ্রামের একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে নামাজের জন্য লোকদেরকে ডাকত। আর তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিত মৃত্যুর কথা। পরকালের কথা। লোকটি তাদেরকে ঘুম ছেড়ে নামাজের জন্য জাগ্রত হওয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান করত। কিন্তু প্রতিদিনের ন্যায় একদিন সে ডাক ভেসে আসছে না। রাতের শেষ তখন। পেরিয়ে যাচ্ছে পবিত্র সুবহে সাদিক। ভোর সমাগত। কিন্তু প্রতিদিনের মতো লোকটি গ্রামবাসীকে ডাকছে না। তাদের নামাজের জন্য জাগ্রত হতে প্রেমার্ত আহ্বান জানাচ্ছে না। তার সে হৃদয়বিদারক ডাক গ্রামের ঘরবাড়ি, গাছপালার উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে না সুকরুণ আবেদন জানিয়ে। গ্রামের সর্দারকে বিষয়টি ভাবিয়ে তুলল। কিছুটা বিচলিত হলো সর্দার। খবর আনতে পাঠাল তার এক সিপাহিকে। সিপাহি এসে গ্রামের সর্দারকে শোকার্ত কণ্ঠে বলল, লোকটি গতকাল মারা গেছে। গ্রামের সর্দার তখন নিদারুণ আক্ষেপের স্বরে বলল, যে আমাদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দিত আজ সেই চলে গেছে দুনিয়া ছেড়ে।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! পবিত্র সেই সত্তার শপথ যিনি সৃজন করেছেন তাবৎ কিছু! এটিই বাস্তবতা। চিরসত্য বাস্তবতা। এখানে যে আসবে সেই চলে যাবে। কেউ থাকতে পারেনি কখনো। পারবেও না কেউ। এটি থাকার জায়গা নয়। দুনিয়া প্রস্থানের জায়গা। দুনিয়াতে কেউ চিরদিন থাকতে পারবে না। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনে তার ওইসব বান্দাদের নিন্দা করেছেন যারা দুনিয়াতে দীর্ঘদিন থাকার স্বপ্ন পোষণ করে।
ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الأَمَلُ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ
'তাদের আহার করতে, ভোগ করতে আর আশায় ভুলে থাকতে দাও। অচিরেই তারা জানতে পারবে।'²¹
দুনিয়াতে যারা দীর্ঘদিন থাকার আশা করে, দুনিয়ার প্রতি যাদের লালসা ও মোহ তীব্র তারা উদাসীন। তারা নামাজ পড়ে না। রুকু করে না। নত হয় না আল্লাহর সম্মুখে। সেজদা করে না। মসজিদে তাদের আগমন হয় না। দুনিয়ার মায়ায় তারা এত মত্ত থাকে যে, মসজিদের ঘোষণা তাদের টেনে আনতে পারে না। সম্পদের লালসা তাদের এতই গ্রাস করে রাখে যে, কাজ- কর্ম রেখে নামাজের জন্য মসজিদে ছুটে আসতে তাদের সময় হয় না।
একদিন আমি পথ চলছিলাম। পথে অনেকগুলো তরুণ বয়সি ছেলের সাথে আমার দেখা হলো। আমি তাদের কাছে ডাকলাম। তাদের সাথে আমার যে কথা হলো তা আমি আপনাদের বলছি।
আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কী করছ এখানে? তারা বলল, আমরা এখানে কাজের তালাশে এসেছি।
তারপর আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কি নিয়মিত নামাজ পড়? আমি আল্লাহর কিতাব ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর প্রতি আস্থা রেখে এ কথা বলতে পারি, নামাজ হলো সকল বরকতের মূল। যে নামাজ পড়ে তার জন্য আল্লাহ তায়ালা উত্তম রিজিকের ব্যবস্থা করে দেন। অকল্পনীয় জায়গা থেকে আল্লাহ তায়ালা তার রিজিকের বন্দোবস্ত করে দেন। এবং দুনিয়া আখেরাতে সম্মানিত করেন তাকে। নামাজ হলো বরকতের চাবিকাঠি।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى
'তোমার পরিবার-পরিজনকে নামাজের আদেশ দাও এবং নিজে তাতে অটল থাকো। আমি তোমার কাছে কোনো জীবিকা চাচ্ছি না। আমিই তোমাকে জীবিকা দিয়ে থাকি। আর শুভ পরিণাম তাদের জন্য যাদের হৃদয়ে আছে তাকওয়া-খোদাভীতি।' ²²
যুবকদের মধ্যে প্রথমজন বলল, হে শাইখ! আমি কি সত্য বলব নাকি মিথ্যা বলব? আমি বললাম, যদি মিথ্যা বলো তাহলে এর পরিণাম তোমাকেই ভোগ করতে হবে।
এ শুনে যুবকটি বলল, হে শাইখ! সত্য বলছি আমি নামাজ পড়ি না! আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি কাফের? যুবকটি বলল, না, আমি মুসলমান। আমি বললাম, তাহলে তুমি মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও নামাজ পড় না কেন? তুমি কি জানো না রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমান ও কাফেরের মাঝে পার্থক্য করেছেন নামাজের মাধ্যমে?
العهد الذي بيننا وبينهم الصلاة، فمن تركها فقد كفر
'আমাদের মাঝে এবং তাদের মাঝে অঙ্গীকার হচ্ছে নামাজ। সুতরাং যে নামাজ ছেড়ে দিয়েছে সে কাফের হয়ে গেছে।'²³
এবার দ্বিতীয় যুবকটি বলল, হে শাইখ! আমি তার চেয়ে ভালো।
আমি বললাম, কীভাবে?
সে বলল, আমি দৈনিক দুই ওয়াক্ত নামাজ পড়ি।
আমি বললাম, এ তো ভারি আশ্চর্যের কথা যে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের ওপর দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। আর তুমি কিনা দিনে পড় মাত্র দুই ওয়াক্ত! এ কেমন উদাসীনতা? হে যুবক! তুমি কি জানো না ইসলামের ভিত্তি রাখা হয়েছে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ওপর?
তৃতীয়জনের অবস্থা তো আর ভারি আশ্চর্যের! সে বলল, আমি নিয়মিত সাপ্তাহিক জুমার নামাজ পড়ি। প্রতি জুমায় নিয়ম করে একবার মসজিদে যাই। আমি বললাম, ইন্নালিল্লাহি...
এই হলো আজ মুসলিম যুবকদের অবস্থা। ছোট-বড়, যুবক-বৃদ্ধ সকলের অবস্থা এর চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কি হতে পারে যে, মুসলমান অথচ নামাজের ব্যাপারে গাফেল। আল্লাহর কসম! এর চেয়ে বড় গাফলত আর হতে পারে না। নামাজের মাধ্যমে পার্থক্য করা যাবে, কে গাফেল আর কে সতর্ক। কে উদাসীন কে জাগ্রত। হে যুবক! তুমি নিজেকে যাচাই করে নাও। তুমি তোমার ঈমান ও আমলের ব্যাপারে গাফেল নাকি জাগ্রত? ভেবে দেখো! আজকের ফজরের নামাজের সময় তুমি কোথায় ছিলে? মসজিদের প্রথম কাতারে নাকি উদাসীনতার চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমের ঘোরে?
মসজিদের মিনার থেকে প্রতিদিন পাঁচবার আজান ভেসে আসে আমাদের কর্ণকোহরে। কিন্তু আমাদের অন্তরে কোনো প্রকার বোধোদয় ঘটে না। দৈনিক পাঁচবার মুয়াজ্জিন আল্লাহর নামে ডেকে ডেকে বলে, এসো কল্যাণের পথে! এসো কল্যাণের পথে! কিন্তু কল্যাণের ডাক আমাদেরকে আমাদের গাফলত থেকে টলাতে পারে না। আমরা নামাজ থেকে যত দূরে সরে যাচ্ছি আমাদের পরিণাম তত খারাপ হচ্ছে। আমাদের ভাগ্য তত মন্দ হচ্ছে। আমাদের ঈমান তত দুর্বল হচ্ছে। ফজরের সময় যখন মসজিদ থেকে আজান ভেসে আসে আমরা তখন অলস ঘুমের ঘোরে মৃত হয়ে পড়ে থাকি।
মধ্য দিবসে যখন জোহরের জন্য মুয়াজ্জিন মসজিদের মিনার থেকে আমাদের ডাকেন। তখন আমরা কর্মের ব্যস্ততায় ডুবে থাকি। এভাবে বিকেল, সন্ধ্যা এবং রাতের প্রথম প্রহরেও আমরা পরিবার-পরিজনকে নিয়ে মত্ত থাকি আরাম-আয়েশে। এসবই আমাদের গাফলতের নিদর্শন। গাফলত আমাদের জীবনের চূড়ান্ত মাকসাদকে পুড়িয়ে ফেলছে। ধ্বংস করে দিচ্ছে আখেরাতকে। তাদের দিকে লক্ষ্য করেই আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ
'আমি জাহান্নামের জন্য অনেক জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি।' ²⁴
কত আফসোস! মুসলমান আজ নামাজ পড়ে না। মুসলমানদের মসজিদগুলো পড়ে আছে রিক্ত হয়ে। বিরান হয়ে যাচ্ছে কত মসজিদ। মসজিদের কাতারগুলো ফাঁকা। হৃদয় সীমাহীন যন্ত্রণায় আহ করে ওঠে। চোখ ফেটে যেন অশ্রু বেরিয়ে আসতে চায়। প্রতিনিয়ত নামাজের মতো মহান আমল থেকে দূরে সরে যাচ্ছি আমরা। আমরা আমাদের মুসলমান বলে দাবি করি অথচ নামাজ হলো মুসলমানদের প্রতীক। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমান ও কাফেরের মাঝে পার্থক্যের মাপকাঠি নির্ধারণ করেছেন নামাজকে। নামাজের মাধ্যমে নির্ণিত হয় কে মুসলমান আর কে কাফের। আজ মুসলমান ঈমান ও কুফরের পার্থক্যের সে রেখা মুছে দিচ্ছে। তাহলে উম্মাহর ভাগ্য কীভাবে পরিবর্তন হবে? কে পরিবর্তন করবে উম্মাহর নিপীড়িত ভাগ্য? যদি এভাবেই চলতে থাকে তাহলে মুসলিম উম্মাহর আকাশ থেকে দূরীভূত হবে না বিপদের ঘনঘটা। যারা দুনিয়াকে নামাজের ওপর প্রাধান্য দেয় তাদের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা প্রস্তুত করে রেখেছেন সীমাহীন লাঞ্ছনা।
যারা দুনিয়াকে আল্লাহর আনুগত্যের ওপর অগ্রগণ্য করে। কোনোদিন তাদের ভাগ্য পরিবর্তন হবে না। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُمْ مُصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُمْ مِثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّى هَذَا قُلْ هُوَ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
'যখন তোমাদের ওপর একটি বিপর্যয় এলো; যার দ্বিগুণ বিপর্যয় ইতিপূর্বে তোমরা তোমাদের প্রতিপক্ষের জন্য ঘটিয়েছিলে, তখন তোমরা বললে, এটা কোথা থেকে এলো? হে নবী আপনি বলে দিন, এটা তোমাদের নিজেদের কৃতকর্মের ফল। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু করতে সক্ষম।'²⁵
উম্মাহর আজ বিপর্যয়ের প্রধান কারণ, তারা নামাজ পড়ে না। তারা তাদের নামাজের প্রতি প্রচণ্ড উদাসীন। আর এর মাধ্যমেই তাদের ঈমানের পরীক্ষাও হয়ে যায়। ঈমান তো নিছক মৌখিক স্বীকারোক্তির নাম নয়। ঈমান যেমন মৌখিক স্বীকারোক্তির নাম, তেমনি আমলে পরিণত করারও নাম। আর নামাজ হলো সর্বোত্তম ইবাদত। মুসলমান আজ নামাজকে পেছনে ফেলে দিনরাত মত্ত থাকে দুনিয়ার অন্বেষণে। সম্পদ আর টাকার নেশা তাদেরকে তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্যের কথা বেমালুম ভুলিয়ে দিয়েছে। জীবনের করণীয় সম্পর্কে তারা চূড়ান্ত বেখবর হয়ে পড়েছে।

টিকাঃ
২১ সুরা হিজর: ৩
২২ সুরা তহা: ১৩২
২৩. মুসনাদে আহমদ। এ হাদিসের মাধ্যমে নামাজের গুরুত্ব বর্ণনা করা উদ্দেশ্য। ঈমানের পর সর্বোত্তম ইবাদত হলো নামাজ। নামাজ পরিত্যাগকারীর ভয়াবহ পরিণাম ও ইসলামের ব্যাপারে তার ঈমানের দুর্বলতা বর্ণনা করতেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। যে মুসলমান নামাজ পড়বে না তার ঈমান পরিপূর্ণ নয়। এর দ্বারা সে কাফের হবে না। হ্যাঁ, কেউ যদি নামাজকে অস্বীকার করে তাহলে কাফের হয়ে যাবে।
২৪ সুরা আরাফ: ১৭৯
২৫ সুরা আলে ইমরান: ১৬৫

📘 হে যুবক! ফিরে এসো রবের দিকে > 📄 সালাফদের সতর্কতা

📄 সালাফদের সতর্কতা


আমরা দিন ও রাতকে যে অর্থে গ্রহণ করেছি এবং যেভাবে এর খসরা সাজিয়েছি, পূর্ববর্তী মনীষীদের নিকট রাত ও দিনের অর্থ ছিল ভিন্ন। আমরা রাতকে নিছক ঘুম আর দিনকে বানিয়েছি পার্থিব সঞ্চয়ের মাধ্যম। আমাদের জীবন যেন একটি ছকবাঁধা নিয়মে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। যার একমাত্র আয়োজন হলো দুনিয়া, দুনিয়া এবং দুনিয়া। কিন্তু আমাদের পূর্ববর্তী মনীষীদের জীবন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। খলিফাতুল মুসলিমিন হযরত উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ. বলেন, রাত ও দিন তোমাদের জন্য কাজ করে, সুতরাং তোমরাও রাত-দিনের কাজ করো। রাত-দিনের কতিপয় হক রয়েছে সেগুলো যথাযথ আদায় করো।
হযরত আবু বকর রা. একদা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-কে বললেন, রাত-দিনের কতিপয় হক রয়েছে। দিনের হক আদায় করার দ্বারা রাতের হক আদায় হবে না। তেমনিভাবে রাতের হক আদায় করার দ্বারা দিনের হক আদায় হবে না।'
হযরত আবু জর রা. ছিলেন দুনিয়াবিমুখ সাহাবি। দুনিয়ার প্রতি তার ছিল না ন্যূনতম আকর্ষণ। লোকালয় ছেড়ে তিনি এক নির্জন উপত্যকায় বসবাস করতেন। অনেকদিন পর তিনি একদিন মক্কায় আগমন করেন। এসে দেখেন মক্কার লোকজন বসবাসের জন্য বিশাল বিশাল পাকা গৃহ নির্মাণ করছে। খাদ্য-পানীয়ের প্রতি তাদের লালসা পূর্বের চেয়ে ঢের বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দেখে তিনি ভারি আশ্চর্য হলেন। হৃদয়ে তার নিদারুণ বেদনা জাগ্রত হলো। তাদের পরিণতির কথা ভেবে তিনি প্রচণ্ড আহত হলেন। মনের এ কষ্ট তিনি লুকিয়ে রাখতে পারেননি। মক্কার লোকদের ডেকে উচ্চৈস্বরে ও তেজোদীপ্ত কণ্ঠে বলেন, 'হে মক্কাবাসী! আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি। আর আমি তোমাদের প্রতি দয়ালু ও বিশ্বস্ত। তোমরা আমার কথা হৃদয়ের কান দিয়ে শ্রবণ করো। দুনিয়াতে কেউ যদি কোথাও সফরে বের হয় তাহলে সফরের যতটুকু পাথেয় দরকার কেবল ততটুকু সঙ্গে বহন করে। এর বেশি যে নেয় সে বোকা। কেননা, কোনো বুদ্ধিমান কখনো অযথা বোঝা বহনের কষ্টে নিজেকে পতিত করে না। জেনে রেখো! এ দুনিয়াতে তোমরা সকলেই মুসাফির। তোমাদের এ সফরের পরিসমাপ্তি ঘটবে মৃত্যুর মাধ্যমে। আখেরাত হবে চিরস্থায়ী বাসস্থান। ক্ষণকাল দুনিয়াতে তোমরা বসবাস করবে। তারপর ফিরে যেতে হবে চিরস্থায়ী গন্তব্য আখেরাতে। সুতরাং দুনিয়াতে থাকার জন্য যে পরিমাণ পাথেয় প্রয়োজন কেবল সে পরিমাণই গ্রহণ করো। এর বেশি তোমরা গ্রহণ করো না। আখেরাতের অনন্ত জীবনের পাথেয় সংগ্রহ করো। যার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই।
হযরত আবু জর রা.-এর কথা শুনে মক্কার লোকেরা বলল, আখেরাতের পাথেয় কী যা আমরা দুনিয়া থেকে আখেরাতে প্রেরণ করব?
হযরত আবু জর রা. বললেন, তোমরা অন্ধকার কবরের পাথেয় হলো রাতের অন্ধকারে নামাজ আদায় করা। বেশি বেশি হজ করো। কাবাগৃহের তাওয়াফ করো। হে মক্কাবাসী! তোমরা তোমাদের জীবনকে দুটি ভাগে ভাগ করো। এক ভাগ হবে আখেরাতের জন্য। আখেরাতের জন্য ততটুকুই করো যতটুকু প্রয়োজন। আরেক ভাগ দুনিয়ার জন্য। দুনিয়ার জন্য ততটুকু করো যতটুকু প্রয়োজন; এর বেশি নয়। তেমনিভাবে তোমাদের সম্পদকে দুটি ভাগে ভাগ করো। এক ভাগ আল্লাহর রাস্তায় খরচ করো এবং আরেক ভাগ খরচ করো তোমাদের পরিবার পরিজনের জন্য। দুর্ভাগ্য তোমাদের জন্য, তোমরা কেন বসবাসের জন্য বিশাল এ উঁচু উঁচু গৃহ নির্মাণ করছ; অথচ এখানে তোমরা চিরদিন বসবাস করতে পারবে না। তোমরা কেন অগুনতি সম্পদ জমা করছ; যা তোমরা নিজেরা খেতে পারবে না। আমি দেখতে পাচ্ছি, দুনিয়ার প্রতি তোমাদের লোভ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পার্থিব জীবনের ধন-সম্পদের প্রতি তোমাদের আশা দীর্ঘায়ত হচ্ছে।'
হে আল্লাহর বান্দাগণ! আজ কী হতো যদি আবু জর রা. আমাদের কাছে আসতেন? আজ কী হতো যদি আবু জর রা. এসে আমাদেরকে বিশাল বিশাল আকাশছোঁয়া দালান-অট্টালিকা নির্মাণ করতে দেখতেন? আজ কী হতো যদি আবু জর রা. আমাদের কাছে এসে দেখতেন, আমরা অজস্র টাকা ব্যাংকে জমা করছি? আজ কী হতো যদি আবু জর রা. আমাদের নিকট এসে দেখতেন, আমাদের স্ত্রী-সন্তানগণ অশ্লীলতা আর গানবাদ্যে আকণ্ঠ ডুবে আছে? আজ কী হতো যদি আবু জর রা. এসে দেখতেন, যুবকরা নাইটক্লাব আর খেলার স্টেডিয়ামে পড়ে আছে? আজ কী হতো যদি আবু জর রা. এসে দেখতেন, মদের বারগুলো জীবন্ত আর মসজিদগুলো পড়ে আছে বিরান হয়ে? আজ কী হতো? আজ কী হতো যদি আবু জর রা. এসে আমাদের দেখতেন? আল্লাহর কসম! আজ কী হতো আমি জানি না।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! আজ পৃথিবীব্যাপী মুসলমানরা নির্যাতিত। দেশে দেশে মুসলমানরা আজ লাঞ্ছিত। নিপীড়িত। কেন আজ মুসলমানদের এ করুণ পরিণতি? আমাদের এমন পরিণতির কারণ কী? এর কারণ হলো, আমরা আমাদের ঈমানের প্রতি গাফেল হয়ে আছি। আল্লাহর আনুগত্য থেকে আমরা বহু দূরে সরে আছি। পৃথিবীতে নিজেদের করণীয় সম্পর্কে গাফেল হয়ে আছি। আমরা আমাদের কর্তব্যের প্রতি সীমাহীন বেখবর। জেনে রেখো! আমাদের পূর্বে আরো বহু শক্তিশালী জনগোষ্ঠী পৃথিবীতে আগমন করেছিল। তাদের শক্তি-সামর্থ্য ও ধন-সম্পদ আমাদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি ছিল। কিন্তু তাদের কেউ পৃথিবীতে থাকতে পারেনি। বিশাল এ পৃথিবীতে আজ তাদের কেউ নেই। সবাইকে চলে যেতে হয়েছে কবরে। সবাইকে আস্বাদন করতে হয়েছে মৃত্যুর স্বাদ।
জেনে রেখো! ছোট-বড়, ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ সকলকে মৃত্যুর স্বাদ পেতে হবে। সকলকে যেতে হবে ঐ অন্ধকার কবরগৃহে। অতঃপর সকলের নিকট আগমন করবে ফেরেশতা। এসে জিজ্ঞেস করবে তিনটি মহা প্রশ্ন।
তোমার রব কে? তোমার ধর্ম কী? তোমার নবী কে?
আল্লাহর কসম! এ প্রশ্নের সম্মুখীন সকলকেই হতে হবে। কেউ এর ব্যতিক্রম হবে না। চাই সে যতই ক্ষমতাবান হোক না কেন। দুনিয়াতে তার সম্পদের যত বড় পাহাড় থাকুন না কেন।
ভেবো না এ কথা যে, এগুলো তো ভারি সহজ প্রশ্ন। বেশ মামুলি কথাবার্তা। নিমিষেই উত্তর দিয়ে দেব। ঐ সত্তার কসম যিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান- জমিন, সৃষ্টি করেছেন সমস্ত নিখিল, দুনিয়াতে যারা গাফেল তারা কিছুতেই তিন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। তাদের কাছে সেদিন অত্যন্ত কঠিন ও ভারী মনে হবে। তাদের যখন কবরে রাখা হবে তখনই তারা ভুলে যাবে সবকিছু। প্রচণ্ড ভয়ে তাদের মুখ থেকে কোনো কথাই বের হবে না তখন। একমাত্র ব্যতিক্রম হবে তারা যারা দুনিয়ায় আল্লাহর আনুগত্য করেছে। মহা তিন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে কেবল আল্লাহর সেসব প্রিয় বান্দাগণ যাদের অন্তর ছিল সদা জাগ্রত। যারা দুনিয়াতে ছিল পরকালের প্রতি সতর্ক। দুনিয়ার গাফলত যাদের কখনো স্পর্শ করেনি।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الآخِرَةِ وَيُضِلُّ اللَّهُ الظَّالِمِينَ وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ
'আল্লাহ সুদৃঢ় কথা দ্বারা মুমিনদের পার্থিব জীবন ও পরকালে অটল ও অবিচল রাখেন। আল্লাহ জালেমদের বিপথগামী করেন। আল্লাহ যা চান তাই করে থাকেন।' ²⁶

টিকাঃ
২৬ সুরা ইবরাহিম: ২৭

আমরা দিন ও রাতকে যে অর্থে গ্রহণ করেছি এবং যেভাবে এর খসরা সাজিয়েছি, পূর্ববর্তী মনীষীদের নিকট রাত ও দিনের অর্থ ছিল ভিন্ন। আমরা রাতকে নিছক ঘুম আর দিনকে বানিয়েছি পার্থিব সঞ্চয়ের মাধ্যম। আমাদের জীবন যেন একটি ছকবাঁধা নিয়মে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। যার একমাত্র আয়োজন হলো দুনিয়া, দুনিয়া এবং দুনিয়া। কিন্তু আমাদের পূর্ববর্তী মনীষীদের জীবন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। খলিফাতুল মুসলিমিন হযরত উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ. বলেন, রাত ও দিন তোমাদের জন্য কাজ করে, সুতরাং তোমরাও রাত-দিনের কাজ করো। রাত-দিনের কতিপয় হক রয়েছে সেগুলো যথাযথ আদায় করো।
হযরত আবু বকর রা. একদা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-কে বললেন, রাত-দিনের কতিপয় হক রয়েছে। দিনের হক আদায় করার দ্বারা রাতের হক আদায় হবে না। তেমনিভাবে রাতের হক আদায় করার দ্বারা দিনের হক আদায় হবে না।'
হযরত আবু জর রা. ছিলেন দুনিয়াবিমুখ সাহাবি। দুনিয়ার প্রতি তার ছিল না ন্যূনতম আকর্ষণ। লোকালয় ছেড়ে তিনি এক নির্জন উপত্যকায় বসবাস করতেন। অনেকদিন পর তিনি একদিন মক্কায় আগমন করেন। এসে দেখেন মক্কার লোকজন বসবাসের জন্য বিশাল বিশাল পাকা গৃহ নির্মাণ করছে। খাদ্য-পানীয়ের প্রতি তাদের লালসা পূর্বের চেয়ে ঢের বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দেখে তিনি ভারি আশ্চর্য হলেন। হৃদয়ে তার নিদারুণ বেদনা জাগ্রত হলো। তাদের পরিণতির কথা ভেবে তিনি প্রচণ্ড আহত হলেন। মনের এ কষ্ট তিনি লুকিয়ে রাখতে পারেননি। মক্কার লোকদের ডেকে উচ্চৈস্বরে ও তেজোদীপ্ত কণ্ঠে বলেন, 'হে মক্কাবাসী! আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি। আর আমি তোমাদের প্রতি দয়ালু ও বিশ্বস্ত। তোমরা আমার কথা হৃদয়ের কান দিয়ে শ্রবণ করো। দুনিয়াতে কেউ যদি কোথাও সফরে বের হয় তাহলে সফরের যতটুকু পাথেয় দরকার কেবল ততটুকু সঙ্গে বহন করে। এর বেশি যে নেয় সে বোকা। কেননা, কোনো বুদ্ধিমান কখনো অযথা বোঝা বহনের কষ্টে নিজেকে পতিত করে না। জেনে রেখো! এ দুনিয়াতে তোমরা সকলেই মুসাফির। তোমাদের এ সফরের পরিসমাপ্তি ঘটবে মৃত্যুর মাধ্যমে। আখেরাত হবে চিরস্থায়ী বাসস্থান। ক্ষণকাল দুনিয়াতে তোমরা বসবাস করবে। তারপর ফিরে যেতে হবে চিরস্থায়ী গন্তব্য আখেরাতে। সুতরাং দুনিয়াতে থাকার জন্য যে পরিমাণ পাথেয় প্রয়োজন কেবল সে পরিমাণই গ্রহণ করো। এর বেশি তোমরা গ্রহণ করো না। আখেরাতের অনন্ত জীবনের পাথেয় সংগ্রহ করো। যার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই।
হযরত আবু জর রা.-এর কথা শুনে মক্কার লোকেরা বলল, আখেরাতের পাথেয় কী যা আমরা দুনিয়া থেকে আখেরাতে প্রেরণ করব?
হযরত আবু জর রা. বললেন, তোমরা অন্ধকার কবরের পাথেয় হলো রাতের অন্ধকারে নামাজ আদায় করা। বেশি বেশি হজ করো। কাবাগৃহের তাওয়াফ করো। হে মক্কাবাসী! তোমরা তোমাদের জীবনকে দুটি ভাগে ভাগ করো। এক ভাগ হবে আখেরাতের জন্য। আখেরাতের জন্য ততটুকুই করো যতটুকু প্রয়োজন। আরেক ভাগ দুনিয়ার জন্য। দুনিয়ার জন্য ততটুকু করো যতটুকু প্রয়োজন; এর বেশি নয়। তেমনিভাবে তোমাদের সম্পদকে দুটি ভাগে ভাগ করো। এক ভাগ আল্লাহর রাস্তায় খরচ করো এবং আরেক ভাগ খরচ করো তোমাদের পরিবার পরিজনের জন্য। দুর্ভাগ্য তোমাদের জন্য, তোমরা কেন বসবাসের জন্য বিশাল এ উঁচু উঁচু গৃহ নির্মাণ করছ; অথচ এখানে তোমরা চিরদিন বসবাস করতে পারবে না। তোমরা কেন অগুনতি সম্পদ জমা করছ; যা তোমরা নিজেরা খেতে পারবে না। আমি দেখতে পাচ্ছি, দুনিয়ার প্রতি তোমাদের লোভ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পার্থিব জীবনের ধন-সম্পদের প্রতি তোমাদের আশা দীর্ঘায়ত হচ্ছে।'
হে আল্লাহর বান্দাগণ! আজ কী হতো যদি আবু জর রা. আমাদের কাছে আসতেন? আজ কী হতো যদি আবু জর রা. এসে আমাদেরকে বিশাল বিশাল আকাশছোঁয়া দালান-অট্টালিকা নির্মাণ করতে দেখতেন? আজ কী হতো যদি আবু জর রা. আমাদের কাছে এসে দেখতেন, আমরা অজস্র টাকা ব্যাংকে জমা করছি? আজ কী হতো যদি আবু জর রা. আমাদের নিকট এসে দেখতেন, আমাদের স্ত্রী-সন্তানগণ অশ্লীলতা আর গানবাদ্যে আকণ্ঠ ডুবে আছে? আজ কী হতো যদি আবু জর রা. এসে দেখতেন, যুবকরা নাইটক্লাব আর খেলার স্টেডিয়ামে পড়ে আছে? আজ কী হতো যদি আবু জর রা. এসে দেখতেন, মদের বারগুলো জীবন্ত আর মসজিদগুলো পড়ে আছে বিরান হয়ে? আজ কী হতো? আজ কী হতো যদি আবু জর রা. এসে আমাদের দেখতেন? আল্লাহর কসম! আজ কী হতো আমি জানি না।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! আজ পৃথিবীব্যাপী মুসলমানরা নির্যাতিত। দেশে দেশে মুসলমানরা আজ লাঞ্ছিত। নিপীড়িত। কেন আজ মুসলমানদের এ করুণ পরিণতি? আমাদের এমন পরিণতির কারণ কী? এর কারণ হলো, আমরা আমাদের ঈমানের প্রতি গাফেল হয়ে আছি। আল্লাহর আনুগত্য থেকে আমরা বহু দূরে সরে আছি। পৃথিবীতে নিজেদের করণীয় সম্পর্কে গাফেল হয়ে আছি। আমরা আমাদের কর্তব্যের প্রতি সীমাহীন বেখবর। জেনে রেখো! আমাদের পূর্বে আরো বহু শক্তিশালী জনগোষ্ঠী পৃথিবীতে আগমন করেছিল। তাদের শক্তি-সামর্থ্য ও ধন-সম্পদ আমাদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি ছিল। কিন্তু তাদের কেউ পৃথিবীতে থাকতে পারেনি। বিশাল এ পৃথিবীতে আজ তাদের কেউ নেই। সবাইকে চলে যেতে হয়েছে কবরে। সবাইকে আস্বাদন করতে হয়েছে মৃত্যুর স্বাদ।
জেনে রেখো! ছোট-বড়, ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ সকলকে মৃত্যুর স্বাদ পেতে হবে। সকলকে যেতে হবে ঐ অন্ধকার কবরগৃহে। অতঃপর সকলের নিকট আগমন করবে ফেরেশতা। এসে জিজ্ঞেস করবে তিনটি মহা প্রশ্ন।
তোমার রব কে? তোমার ধর্ম কী? তোমার নবী কে?
আল্লাহর কসম! এ প্রশ্নের সম্মুখীন সকলকেই হতে হবে। কেউ এর ব্যতিক্রম হবে না। চাই সে যতই ক্ষমতাবান হোক না কেন। দুনিয়াতে তার সম্পদের যত বড় পাহাড় থাকুন না কেন।
ভেবো না এ কথা যে, এগুলো তো ভারি সহজ প্রশ্ন। বেশ মামুলি কথাবার্তা। নিমিষেই উত্তর দিয়ে দেব। ঐ সত্তার কসম যিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান- জমিন, সৃষ্টি করেছেন সমস্ত নিখিল, দুনিয়াতে যারা গাফেল তারা কিছুতেই তিন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। তাদের কাছে সেদিন অত্যন্ত কঠিন ও ভারী মনে হবে। তাদের যখন কবরে রাখা হবে তখনই তারা ভুলে যাবে সবকিছু। প্রচণ্ড ভয়ে তাদের মুখ থেকে কোনো কথাই বের হবে না তখন। একমাত্র ব্যতিক্রম হবে তারা যারা দুনিয়ায় আল্লাহর আনুগত্য করেছে। মহা তিন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে কেবল আল্লাহর সেসব প্রিয় বান্দাগণ যাদের অন্তর ছিল সদা জাগ্রত। যারা দুনিয়াতে ছিল পরকালের প্রতি সতর্ক। দুনিয়ার গাফলত যাদের কখনো স্পর্শ করেনি।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الآخِرَةِ وَيُضِلُّ اللَّهُ الظَّالِمِينَ وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ
'আল্লাহ সুদৃঢ় কথা দ্বারা মুমিনদের পার্থিব জীবন ও পরকালে অটল ও অবিচল রাখেন। আল্লাহ জালেমদের বিপথগামী করেন। আল্লাহ যা চান তাই করে থাকেন।' ²⁶

টিকাঃ
২৬ সুরা ইবরাহিম: ২৭

📘 হে যুবক! ফিরে এসো রবের দিকে > 📄 উদাসীনতা মানুষকে সঠিক পথ থেকে বিরত রাখে

📄 উদাসীনতা মানুষকে সঠিক পথ থেকে বিরত রাখে


গাফলত তথা উদাসীনতা মানুষকে ইসলামের সরল-সঠিক পথ থেকে বিরত রাখে। গাফেল ব্যক্তি দুনিয়া-আখেরাতের চিরস্থায়ী সফলতা থেকে বঞ্চিত হয়। কুরআন-হাদিসের শাশ্বত কল্যাণ থেকে বহু দূরে অবস্থান করে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
سَأَصْرِفُ عَنْ آيَاتِيَ الَّذِينَ يَتَكَبَّرُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَإِنْ يَرَوْا كُلَّ آيَةٍ لَا يُؤْمِنُوا بِهَا وَإِنْ يَرَوْا سَبِيلَ الرُّشْدِ لَا يَتَّخِذُوهُ سَبِيلًا وَإِنْ يَرَوْا سَبِيلَ الغَيِّ يَتَّخِذُوهُ سَبِيلًا ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَكَانُوا عَنْهَا غَافِلِينَ
যারা অন্যায়ভাবে পৃথিবীতে দাম্ভিক আচরণ করে আমি তাদের আমার নিদর্শনসমূহ থেকে ফিরিয়ে রাখব। তারা প্রতিটি নিদর্শন দেখলেও তা বিশ্বাস করে না। তারা সৎপথ দেখলেও তাকে পথ হিসেবে গ্রহণ করে না। কিন্তু ভ্রান্ত পথ দেখলেই তাকে পথ হিসেবে গ্রহণ করে। এটা এজন্য যে, তারা আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা বলেছে এবং সে সম্বন্ধে তারা গাফেল ও অমনোযোগী। ²⁷
হে আল্লাহর বান্দাগণ! পরকালের জন্য কী পাথেয় গ্রহণ করেছ? কবরের অন্ধকার গৃহের জন্য তোমার প্রস্তুতি কী? কবরের সেই তিন প্রশ্নে জবাব কি তুমি দিতে পারবে? আল্লাহ তায়ালা যখন তোমার প্রতি ওয়াক্ত নামাজের হিসাব চাইবেন তখন তোমার উত্তর কী হবে? কী বলবে সেদিন রাজাধিরাজ মহাশক্তিধর আল্লাহকে?
জেনে রেখো! আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে তোমার প্রতিটি কর্মের যথোচিত হিসাব চাইবেন। পার্থিব জীবনে তোমার মুখ থেকে নির্গত প্রতিটি শব্দ ও বাক্যের হিসাব সেদিন দিতে হবে। ছোট বড় কোনো আমলই আল্লাহর নিকট অজানা নয়। সেদিন কেউ এক পা অগ্রসর হতে পারবে না যতক্ষণ না সে তার প্রতিটি কথা ও আমলের হিসাব দেবে।
একদা হযরত হাসান আল বসরি রহ. পথ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। রাস্তার পাশে অনেকগুলো তরুণ দাড়িয়ে খোশগল্প করছে। তাদের মধ্যে একজন এমন অট্টহাসি দিলো যে, তার হাসিতে চারপাশ কলরিত হয়ে উঠল। হযরত হাসান বসরি রহ. ডাকলেন তাকে। জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এভাবে হাসছ কেন? তুমি কি পুলসিরাত অতিক্রম করে ফেলেছ? যুবক জবাব দিলো, না।
হাসানা বসরি রহ. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জানো পুলসিরাত যে অতিক্রম করতে পারবে সে জান্নাতে যাবে, আর যে তা অতিক্রম করতে পারবে না সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে? যুবক পুনরায় জবাব দিলো, না।
অতঃপর হযরত হাসান বসরি রহ. যুবককে বললেন, তাহলে তুমি উন্মাদের মতো এভাবে হাসছ কেন? তোমার চূড়ান্ত সফলতা তো এখনো নির্ধারণ হয়নি। তবুও তুমি হাসছ এভাবে? কোন জিনিস তোমাকে আখেরাত সম্পর্কে উদাসীন করে রেখেছে যার ফলে এমনভাবে হাসছ তুমি?
হে আল্লাহর বান্দাগণ! এর কারণ হলো গাফলত। আর কত? আর কত গাফলতের চাদরে মুড়িয়ে থাকবে? উদাসীনতার উপত্যকায় আর কতদিন উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরতে থাকবে? তুমি কি দেখো না, প্রতিনিয়ত আমাদের মধ্য থেকে কেউ না কেউ মৃত্যুবরণ করছে? চলে যাচ্ছে জীবনের সকল পাঠ চুকিয়ে। সকল স্বপ্ন সকল আশা তার পেছনে পড়ে থাকে তখন। আমরা নিজহাতে তাদের কাফন-দাফন দিই। তাদের রেখে আসি একাকী অন্ধকার নির্জন কবরগৃহে। তবুও কেন আমাদের বোধ জাগ্রত হয় না? আমাদের জীবন থেকে গাফলতি দূর হয় না? জীবনের সকাল-সন্ধ্যাগুলো কেটে যাচ্ছে একে একে। হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের একের-পর-এক বসন্ত। তবুও আমরা ফিরে আসছি না আমাদের রবের দিকে।

টিকাঃ
২৭ সুরা আরাফ: ১৪৬

গাফলত তথা উদাসীনতা মানুষকে ইসলামের সরল-সঠিক পথ থেকে বিরত রাখে। গাফেল ব্যক্তি দুনিয়া-আখেরাতের চিরস্থায়ী সফলতা থেকে বঞ্চিত হয়। কুরআন-হাদিসের শাশ্বত কল্যাণ থেকে বহু দূরে অবস্থান করে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
سَأَصْرِفُ عَنْ آيَاتِيَ الَّذِينَ يَتَكَبَّرُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَإِنْ يَرَوْا كُلَّ آيَةٍ لَا يُؤْمِنُوا بِهَا وَإِنْ يَرَوْا سَبِيلَ الرُّشْدِ لَا يَتَّخِذُوهُ سَبِيلًا وَإِنْ يَرَوْا سَبِيلَ الغَيِّ يَتَّخِذُوهُ سَبِيلًا ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَكَانُوا عَنْهَا غَافِلِينَ
যারা অন্যায়ভাবে পৃথিবীতে দাম্ভিক আচরণ করে আমি তাদের আমার নিদর্শনসমূহ থেকে ফিরিয়ে রাখব। তারা প্রতিটি নিদর্শন দেখলেও তা বিশ্বাস করে না। তারা সৎপথ দেখলেও তাকে পথ হিসেবে গ্রহণ করে না। কিন্তু ভ্রান্ত পথ দেখলেই তাকে পথ হিসেবে গ্রহণ করে। এটা এজন্য যে, তারা আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা বলেছে এবং সে সম্বন্ধে তারা গাফেল ও অমনোযোগী। ²⁷
হে আল্লাহর বান্দাগণ! পরকালের জন্য কী পাথেয় গ্রহণ করেছ? কবরের অন্ধকার গৃহের জন্য তোমার প্রস্তুতি কী? কবরের সেই তিন প্রশ্নে জবাব কি তুমি দিতে পারবে? আল্লাহ তায়ালা যখন তোমার প্রতি ওয়াক্ত নামাজের হিসাব চাইবেন তখন তোমার উত্তর কী হবে? কী বলবে সেদিন রাজাধিরাজ মহাশক্তিধর আল্লাহকে?
জেনে রেখো! আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে তোমার প্রতিটি কর্মের যথোচিত হিসাব চাইবেন। পার্থিব জীবনে তোমার মুখ থেকে নির্গত প্রতিটি শব্দ ও বাক্যের হিসাব সেদিন দিতে হবে। ছোট বড় কোনো আমলই আল্লাহর নিকট অজানা নয়। সেদিন কেউ এক পা অগ্রসর হতে পারবে না যতক্ষণ না সে তার প্রতিটি কথা ও আমলের হিসাব দেবে।
একদা হযরত হাসান আল বসরি রহ. পথ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। রাস্তার পাশে অনেকগুলো তরুণ দাড়িয়ে খোশগল্প করছে। তাদের মধ্যে একজন এমন অট্টহাসি দিলো যে, তার হাসিতে চারপাশ কলরিত হয়ে উঠল। হযরত হাসান বসরি রহ. ডাকলেন তাকে। জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এভাবে হাসছ কেন? তুমি কি পুলসিরাত অতিক্রম করে ফেলেছ? যুবক জবাব দিলো, না।
হাসানা বসরি রহ. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জানো পুলসিরাত যে অতিক্রম করতে পারবে সে জান্নাতে যাবে, আর যে তা অতিক্রম করতে পারবে না সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে? যুবক পুনরায় জবাব দিলো, না।
অতঃপর হযরত হাসান বসরি রহ. যুবককে বললেন, তাহলে তুমি উন্মাদের মতো এভাবে হাসছ কেন? তোমার চূড়ান্ত সফলতা তো এখনো নির্ধারণ হয়নি। তবুও তুমি হাসছ এভাবে? কোন জিনিস তোমাকে আখেরাত সম্পর্কে উদাসীন করে রেখেছে যার ফলে এমনভাবে হাসছ তুমি?
হে আল্লাহর বান্দাগণ! এর কারণ হলো গাফলত। আর কত? আর কত গাফলতের চাদরে মুড়িয়ে থাকবে? উদাসীনতার উপত্যকায় আর কতদিন উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরতে থাকবে? তুমি কি দেখো না, প্রতিনিয়ত আমাদের মধ্য থেকে কেউ না কেউ মৃত্যুবরণ করছে? চলে যাচ্ছে জীবনের সকল পাঠ চুকিয়ে। সকল স্বপ্ন সকল আশা তার পেছনে পড়ে থাকে তখন। আমরা নিজহাতে তাদের কাফন-দাফন দিই। তাদের রেখে আসি একাকী অন্ধকার নির্জন কবরগৃহে। তবুও কেন আমাদের বোধ জাগ্রত হয় না? আমাদের জীবন থেকে গাফলতি দূর হয় না? জীবনের সকাল-সন্ধ্যাগুলো কেটে যাচ্ছে একে একে। হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের একের-পর-এক বসন্ত। তবুও আমরা ফিরে আসছি না আমাদের রবের দিকে।

টিকাঃ
২৭ সুরা আরাফ: ১৪৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00