📘 হে যুবক! ফিরে এসো রবের দিকে > 📄 নামাজের প্রতি যত্নবান না হওয়ার কারণ

📄 নামাজের প্রতি যত্নবান না হওয়ার কারণ


নামাজের প্রতি যত্নবান না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, অসৎ ও মন্দ লোকদের সংস্পর্শ। যুবকদের চরিত্র ও মানস গঠনে সংস্পর্শ ও সান্নিধ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভালো ব্যক্তিদের সংস্পর্শে মানুষ ভালো ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী হয়। মন্দ ও খারাপ ব্যক্তিদের সংস্পর্শে মানুষ নষ্ট ও দুশ্চরিত্রের অধিকারী হয়। বর্তমান মুসলিম যুব ও তরুণ প্রজন্মের নষ্ট ও চরিত্রহীন হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো, অসৎ ও মন্দ লোকদের সংস্পর্শ। সংস্পর্শ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে সৎ ব্যক্তিদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে আদেশ করেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনদের সৎ বন্ধু নির্বাচন করতে বলেছেন। মন্দ ও অসৎ বন্ধুদের থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। সংস্পর্শের রয়েছে আশ্চর্য প্রভাব। সৎ ব্যক্তির সংস্পর্শে খারাপ মানুষ ভালো হয়ে যায়। পক্ষান্তরে অসৎ ব্যক্তির সংস্পর্শে ভালো মানুষ খারাপ হয়ে যায়। বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক রচিত হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। মুমিনের সকল কাজের লক্ষ্য হবে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি। কারো সাথে সম্পর্ক তৈরি হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আবার সম্পর্ক ছিন্ন হবে আল্লাহর জন্য। সৎ ও নামাজি ব্যক্তির সংস্পর্শে যে নামাজ পড়ে না সেও নামাজের প্রতি যত্নবান হবে। আল্লাহর বিধি-বিধান পালনের প্রতি সচেষ্ট হবে। আজ কোন জিনিস আমাদের নামাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে। মুমিন কেন নামাজের প্রতি যত্নবান হচ্ছে না? এর কারণ হলো, অসৎ ও মন্দ লোকদের সংস্পর্শ। আমরা তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করছি যারা নামাজ পড়ে না। যারা আল্লাহর আদেশ পালন করে না। নিষেধ থেকে বেঁচে থাকে না। যাদের অন্তরে নেই আল্লাহ ও তার রাসুলের ভালোবাসা। ইসলামের বিধি-বিধান পালনের প্রতি যারা চূড়ান্ত উদাসীন। আমরা বন্ধু বানাচ্ছি তাদের যাদের অন্তর মৃত। যারা প্রবৃত্তির পূজা করছে।
হে মুসলিম যুবক! আমি তোমাদের সতর্ক করছি যেন তোমরা অসৎ সংস্পর্শ ত্যাগ করো। যেন তোমরা মন্দ লোকদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করো। তুমি যার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করছ তার প্রভাব তোমার ওপর অবশ্যই পড়বে। এ কথা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। অনেক ব্যক্তিকে বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত ভালো মনে হয়। তার বাহ্যত চালচলন চলাফেরা দেখে মনে হয় অনেক সুন্দর। তার স্বভাব-চরিত্রকে ধারণা করা হয় নিষ্কলুশ। কিন্তু প্রকৃতার্থে তারা ভালো মানুষ নয়। এক ব্যক্তি আমাকে একটি ঘটনা শুনিয়েছেন। তিনি ছিলেন একটি কোম্পানির মালিক। তিনি বলেন, আমার একজন কর্মচারী রয়েছে যার চলাফেরা অত্যন্ত মার্জিত। তার স্বভাব-চরিত্র উন্নত। কিন্তু তার একটি সমস্যা রয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম কী সমস্যা? তিনি বললেন, সে মসজিদে যায় না এবং নামাজ পড়ে না। আমি বললাম, এ তো খুব খারাপ একটি গুণ। এটি এমন একটি মন্দ অভ্যাস যার কারণে সে আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তিদের নাম থেকে তার নাম বাদ পড়ে যায়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সে-সমস্ত লোকদের প্রকৃত রিজাল তথা ব্যক্তি বলে মনোনীত করেছেন যারা নামাজ আদায় করে। কিছুক্ষণ পর সে কর্মচারী শরীরচর্চা করে জিম থেকে বেরিয়েছে। মালিক আমাকে ইশারা করে তাকে দেখালেন। আল্লাহ তায়ালা এমন লোকদের লক্ষ্য করেই পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন,
وَإِذَا رَأَيْتَهُمْ تُعْجِبُكَ أَجْسَامُهُمْ وَإِن يَقُولُوا تَسْمَعْ لِقَوْلِهِمْ كَأَنَّهُمْ خُشُبُ مُسَنَّدَةٌ يَحْسَبُونَ كُلَّ صَيْحَةٍ عَلَيْهِمْ هُمُ الْعَدُوُّ فَاحْذَرْهُمْ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ أَنَّى يُؤْفَكُونَ
'তুমি যখন তাদের দেখো তাদের দেহ তোমাকে মুগ্ধ করে এবং তারা যদি কথা বলে তুমি তাদের কথা শোনো। তারা দেয়ালে ঠেকানো কাঠের মতো। তারা প্রতিটি আওয়াজকে তাদের বিরুদ্ধে মনে করে। তারাই শত্রু; অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক হও। আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন, তারা কীভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছে।' ¹⁴
আমি তাকে সালাম দিয়ে বললাম, হে যুবক! তোমার মালিক আমার নিকট তোমার অনেক প্রশংসা করেছে। এ শুনে সে বেশ খুশি হলো। তার চেহারায় আনন্দের আভা ছড়িয়ে পড়ল। অতঃপর আমি বললাম, তবে একটি দোষের কথা বলেছে। এ কথা শুনে সে ভারি চমকে উঠল। বলল, কী সে দোষ? আপনি বলুন আমি তা সংশোধন করে নেব। তখন আমি তার অবস্থা দেখে আশ্চর্য হলাম। মালিকের সামনে মাত্র একটি দোষ সংশোধন করার জন্য সে কত পাগলপ্রায় হয়ে উঠল। তার মধ্যে কত সচেতনতা পরিলক্ষিত হলো। কিন্তু প্রকৃত মালিক যিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন, প্রতিনিয়ত যিনি তার খাদ্য- পানীর ব্যবস্থা করছেন সে মালিকের সামনে তার বহু দোষ রয়েছে, সেগুলো সংশোধনের প্রতি তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। আমি তাকে বললাম, তুমি নাকি মসজিদে যাও না এবং নামাজ পড় না? সে বলল, হে শাইখ! আপনি সত্য বলেছেন। আমি মসজিদে যাই না এবং নামাজ পড়ি না। এটি আমার ব্যর্থতা। আমি বললাম, না, এটি তোমার ব্যর্থতা নয়। ব্যর্থতা ও ক্ষতির মাঝে পার্থক্য রয়েছে। তুমি স্পষ্ট ক্ষতি ও ধ্বংসের মাঝে রয়েছ। ব্যর্থতা তো সেটি যে, আমি তাকবিরে তাহরিমা পেলাম না। জামাতের সাথে ফজরের নামাজ পড়তে পারলাম না, তারপর একাকী পড়ে নিলাম। ব্যর্থতা হলো সেটি যে, কোনো কারণে সময়মতো নামাজ পড়তে পারলাম না, পরে তার কাজা আদায় করে নিলাম। এর নাম ব্যর্থতা। কিন্তু তুমি তো মসজিদেই যাও না, নামাজই পড় না। এর অর্থ তো ব্যর্থতা নয়। এ হলো ধ্বংস। তুমি স্পষ্ট ধ্বংসের মাঝে আছ। জেনে রেখো! তোমার ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী।
বর্তমানে অধিকাংশ মানুষের অবস্থাই এমন। তাদের ভালো মনে করা হচ্ছে কিন্তু তাদের প্রকৃত অবস্থা হলো এই যুবকের মতো। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ * وَإِنَّهُمْ لَيَصُدُّونَهُمْ عَنِ السَّبِيلِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُم مُّهْتَدُونَ
'করুণাময় আল্লাহর স্মরণ থেকে যে বিরত থাকে তার জন্য আমি শয়তানকে নিয়োজিত করি। অতঃপর সেই হয় তার সহচর। শয়তানেরাই মানুষকে সৎপথ থেকে বিরত রাখে; আর মানুষেরা মনে করে যে, তারা সৎপথে আছে।'¹⁵
মসজিদে যায় না, নামাজ পড়ে না, তবুও মানুষ তাকে ভালো মনে করছে। এ কেমন গুণ যে তাকে ভালো বলা হবে। অতঃপর তাকে বললাম, হে যুবক! তুমি ধ্বংসের মধ্যে আছ। তুমি মসজিদে যাও, নামাজ পড়ো। সৎ লোকদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করো। অসৎ লোকদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করো। তুমি তোমার নিজেকে জিজ্ঞেস করো, তুমি কোন পথে আছ। তুমি কি কল্যাণের পথে আছ নাকি ক্ষতি ও ধ্বংসের মাঝে আছ? সে আমার থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। আল্লাহু আকবার! পরবর্তী নামাজের জন্য মুয়াজ্জিন আজান দিলেন। নামাজিগণ মসজিদের দিকে ছুটে আসছেন। আমি দেখি, সে যুবক যাকে কিছুক্ষণ পূর্বে নামাজের প্রতি আহ্বান করেছি, ধ্বংসের পথ থেকে কল্যাণের পথে ফিরে আসতে বলেছি, সে সুন্দর ও শুভ্র পোশাক পরিধান করে মসজিদের দিকে ছুটে আসছে। প্রকৃত জ্ঞানী তো তারাই, যাদের সতর্ক করা হলে তারা নিজেদের সংশোধনে ব্রতী হয়।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! আমরা কেউ জানি না, কখন আমাদের মৃত্যু হবে। কখন দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাবো আখেরাতে। জানি না, কখন জীবনে দুয়ারে এসে দাঁড়াবে মৃত্যুর ফেরেশতা। একদিন আকস্মিক মৃত্যু এসে কড়া নাড়বে দুয়ারে। হে নামাজের প্রতি উদাসীন ব্যক্তি! তুমি কি চাও, নামাজের প্রতি উদাসীন অবস্থায় তোমার মৃত্যু হোক? তুমি কি চাও, আল্লাহর আদেশ-নিষেধের প্রতি গাফেল অবস্থায় তোমার জীবনের অবসান হোক? না, কেউই চায় না এমতাবস্থায় তার মৃত্যু হোক। সুতরাং করণীয় হলো অবস্থার পরিবর্তন করা। নিজেকে সংশোধন করা। নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া। এক ব্যক্তি যে নামাজের প্রতি উদাসীন ছিল, তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তুমি কি চাও, এমতাবস্থায় তোমার মৃত্যু হোক? সে বলল, না। তারপর তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তুকি কি চাও তোমার এ অবস্থার পরিবর্তন হোক তারপর তোমার মৃত্যু হোক? সে বলল, এখনো আমার মন তৈরি হয়নি। তারপর জিজ্ঞেস করা হলো, তুমি কি জানো যে, এমতাবস্থায় তোমার মৃত্যু আসবে না? সে বলল, না। আল্লাহর শপথ! কোনো জ্ঞানী চাইবে না যে, এমতাবস্থায় তার মৃত্যু হোক। সুতরাং তুমি তোমার বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন করো। নামাজের প্রতি যত্নবান হও। উপদেশ গ্রহণ করো এবং সে অনুযায়ী আমল করো। উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। যারা উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাদের সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেছেন,
فَمَا لَهُمْ عَنِ التَّذْكِرَةِ مُعْرِضِينَ * كَأَنَّهُمْ حُمُرٌ مُّسْتَنفِرَةٌ . فَرَّتْ مِن قَسْوَرَةٍ 'তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়? যেন তারা ভয় পেয়ে পলায়নকারী গাধা। যারা কোনো সিংহের ভয়ে পালিয়ে এসেছে।' ¹⁶
এর থেকে উত্তরণ ও পরিত্রাণের উপায় হলো, বেশি বেশি মৃত্যুকে স্মরণ করা। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ألا إني نهيتكم عن زيارة القبور فزوروها فإنها تذكركم الآخرة 'জেনো! আমি তোমাদের কবর জিয়ারত থেকে নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু এখন তোমরা কবর জিয়ারত করো। কেননা, কবর জিয়ারত তোমাদের আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেবে।'
আজ মানুষের গাফলত ও উদাসীনতার অন্যতম কারণ হলো, মৃত্যুকে ভুলে যাওয়া। মানুষ মৃত্যুর কথা ভুলে গেছে। জেনে রাখো! প্রত্যেককেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। প্রত্যেকের জন্যই অপেক্ষা করছে মৃত্যু। আকস্মিক একদিন মৃত্যু এসে দুয়ারে হাজির হবে। যখন মৃত্যু চলে আসবে তখন যতই চিৎকার করে আল্লাহকে ডাকা হোক না কেন তিনি তখন সাড়া দেবেন না। তাই মৃত্যুর ফেরেশতা আসার পূর্বেই তোমরা তোমাদের রবের দিকে ফিরে এসো। নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করো। আর অবস্থার পরিবর্তনের জন্য অন্যতম মাধ্যম হলো, মৃত্যুর কথা স্মরণ করা। মৃত্যুর কথা তখনই বেশি স্মরণ হবে যখন কবর জিয়ারত করবে। মৃত ব্যক্তির কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়াবে। তখন হৃদয়ে জাগ্রত হবে এ কথা, একদিন যে ব্যক্তি দুনিয়াতে ছিল আজ সে অন্ধকার কবরে। তার ন্যায় একদিন আমাকেও চলে যেতে হবে। হে যুবক! আজ তুমি অন্যের কবর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো, একদিন মানুষ তোমার কবর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার পূর্বে।
অসুস্থ ব্যক্তিদের দেখতে যাও। দেখো, তাদের কোন কোন নেয়ামত ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। দেখো, তাদের কারো চোখ নেই। কারো পা নেই। কেউ শুনতে পায় না। তারপর নিজের দিকে তাকাও। আল্লাহ তায়ালার অশেষ কৃতজ্ঞতা আদায় করো।
এক ছিল কুলি। বাজারে লোকদের ভারী ভারী বস্তু মাথায় বহন করে নিয়ে যেত। বিনিময়ে তাদের থেকে কিছু অর্থকড়ি পেত; তা দিয়ে তার সংসার চলত। সে মসজিদে যেত না। নামাজ পড়ত না। একদিন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তুমি কেন নামাজ পড় না? সে বলল, আমি আমার মন অনুযায়ী চলি। আমার নামাজ পড়তে ইচ্ছে করে না তাই নামাজ পড়ি না। এই ছিল তার ঔদ্ধত্যপূর্ণ জবাব।
একদিনের ঘটনা। খুব ভারী এক বস্তু মাথায় নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। হঠাৎ সে পা পিছলে পড়ে যায়। তৎক্ষণাৎ তার একটি পা ভেঙে যায়। তারপর দীর্ঘদিন অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকে। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তোমার এখন কী করতে ইচ্ছে করে? সে বলল, আমার নামাজ পড়তে ইচ্ছে করে। মুয়াজ্জিন আজান দিলে আমার মসজিদে যেতে ইচ্ছে করে। সে যখন সুস্থ ছিল তখন নামাজ পড়েনি। আজ যখন অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে তখন তার নামাজ পড়তে ইচ্ছে করছে। তখন সুযোগ ছিল কিন্তু নামাজ পড়েনি। মসজিদে যায়নি। আজ ইচ্ছে করলেও সে মসজিদে যেতে পারছে না। সুতরাং হে যুবক! সময় থাকতেই নিজেকে পরিবর্তন করো। নামাজের প্রতি যত্নবান হও। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার পূর্বেই সময়ের সৎ ব্যবহার করো। মৃত্যু আসার পূর্বেই মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণ করো।

টিকাঃ
১৪ সুরা মুনাফিকুন: ৪
১৫ সুরা যুখরুফ: ৩৬
১৬ সুরা মুদ্দাছছির: ৪৯

📘 হে যুবক! ফিরে এসো রবের দিকে > 📄 তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে ঈমানের পরিচর্যা

📄 তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে ঈমানের পরিচর্যা


আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন, إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ آمَنُوا بِرَبِّهِمْ 'তারা ছিল কয়েকজন যুবক; যারা তাদের প্রভুর প্রতি ঈমান এনেছিল। '³¹
কারা ছিল সে-সমস্ত যুবক যারা তাদের প্রভুর প্রতি ঈমান এনেছিল? কারা ছিল তারা, যাদের কথা আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে আলোচনা করেছেন? আর এর পেছনে কী ছিল সে কারণ? কেন তারা তাদের পরিবার-পরিজন ছেড়ে চলে গিয়েছিল? কেন তারা ছেড়ে চলে গিয়েছিল নিজেদের সম্প্রদায়? কেন তারা মাতৃভূমি ত্যাগ করে হিজরত করেছিল দূর পাহাড়ে? কেন তারা দুনিয়ার মোহ-মায়া পরিত্যাগ করেছিল? কেন তারা নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ করে গৃহ ও পরিবারহীন হয়েছিল?
হে মুসলিম যুব ও তরুণ প্রজন্ম! শোনো হৃদয়ের দুয়ার উন্মোচন করে। শোনো অন্তর্চক্ষু দিয়ে তাদের বর্ণনা। সে-সমস্ত যুবকরা ছিল তাদের আনীত ঈমানের ওপর অত্যন্ত সুদৃঢ়। তাদের অন্তরে ঈমান এতই বদ্ধমূল ছিল যে, তারা ঈমানের জন্য পৃথিবীর সকল কিছু বিসর্জন দিতে মোটেও কুণ্ঠিত হয়নি। তাদের ঈমান ছিল এতই মজবুত যে, ঈমানের সামনে দুনিয়ার কোনো বস্তুই টিকতে পারেনি। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার প্রতি তাদের বিশ্বাস ছিল অগাধ। পূর্ণ আস্থা ও ইয়াকিনের ওপর তারা ছিল অটুট। তাদের সামনে দুটি সুযোগ ছিল। হয়তো তারা আল্লাহর প্রতি আনীত ঈমান পরিত্যাগ করবে অথবা বিসর্জন দেবে জীবনের প্রতি ভালোবাসা। পালিয়ে যাবে পরিবার-পরিজন ও মাতৃভূমির ভালোবাসা ত্যাগ করে। আল্লাহু আকবার! তারা দ্বিতীয়টিই বেছে নিল। দুনিয়ার ওপর আখেরাতকে প্রাধান্য দিলো। মূর্তিপূজার ওপর আল্লাহর একনিষ্ঠ আনুগত্যকে প্রাধান্য দিলো। কুফরির ওপর ঈমানকে অগ্রগামী করল। ঈমানের প্রশ্নে তারা ছিল সুদৃঢ় ও অটুট। দুনিয়ার সুশোভিত সৌন্দর্য, জীবনের মায়া, পরিবার-পরিজনের ভালোবাসাকে ঈমানের জন্য কুরবানি করল। রাতের অন্ধকারে তারা দেশ ছেড়ে চলে গেছে কোনো এক অজানার উদ্দেশ্যে। তারা জানে না কোথায় যাবে। কিন্তু তারা এতটুকু জানে যে, তাদের ঈমান বাঁচাতে হবে। ঈমান বাঁচানোর জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে তারা বেরিয়ে পড়ল।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদের প্রশংসা করে বলেন, إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ آمَنُوا بِرَبِّهِمْ 'তারা ছিল কয়েকজন যুবক; যারা তাদের প্রভুর প্রতি ঈমান এনেছিল।' ³²
হে মুসলিম তরুণ প্রজন্ম! ঈমান এক মূল্যবান জিনিস। দুনিয়া ও আখেরাতে ঈমানের চেয়ে মূল্যবান কোনো বস্তু নেই। ঈমান মানুষকে নবজীবন দান করে। নতুন প্রেরণায় উজ্জীবিত করে।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন, أَوَمَنْ كَانَ مَيْتًا فَأَحْيَيْنَاهُ 'যে ব্যক্তি মৃত ছিল, তারপর আমি তাকে জীবিত করেছি এবং একটি আলো দান করেছি যার সাহায্যে সে মানুষের মধ্যে চলতে পারে, সে কি ওই ব্যক্তির মতো হতে পারে যে অন্ধকারের মধ্যে আছে?'³³
ঈমান এমন এক জিনিস যা মানুষকে লাঞ্ছনার পর দান করে সম্মান। অপদস্থতার পর দান করে মর্যাদা। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন, وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ 'শত্রুর সামনে তোমরা দুর্বল কিংবা বিষণ্ণ হয়ো না। ঈমানদার হলে তোমরাই বিজয়ী হবে।' ³⁴
ঈমান এমন এক জিনিস যা বান্দার হৃদয়ে শঙ্কা ও ভয়ের পর দান করে সাহসীকতা। ব্যর্থতার পর দান করে সফলতা। পরাজয়ের পর দান করে বিজয়। দুর্বল ঈমান ও ভীত ব্যক্তিকে করে অধিকতর সাহসী। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
'লোকেরা যাদের বলেছিল, শত্রুপক্ষের মানুষেরা তোমাদের মোকাবেলার জন্য সৈন্য সমাবেশ করেছে। অতএব তাদের ভয় করো। এ কথায় তাদের ঈমান আরো বেড়ে গিয়েছিল এবং তারা বলেছিল, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনিই উত্তম কর্মনির্ধারক। '³⁵
ঈমান এমন এক মূল্যবান জিনিস ও পরশপাথর, যা জীবনকে করে স্বার্থক ও আনন্দময়। অন্তরকে করে সুদৃঢ়। হৃদয়কে করে প্রশস্ত ও উদার। ঈমান আনুগত্যে মিষ্টতা এনে দেয়। অবাধ্যতা ও নাফরমানিতে ঘৃণা তৈরি করে। ঈমান মানুষকে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যের প্রতি ধাবিত করে। তার ওপর ভরসা করে। ঈমান আল্লাহর সাথে বান্দার অন্তরঙ্গতা ও গভীর সম্পর্ক তৈরি করে। ঈমান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অবারিত রহমতস্বরূপ।
হে মুসলিম তরুণ! ভেবে দেখো আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে আসহাবে কাহফের যুবকদের সম্পর্কে যা বলেছেন সে সম্পর্কে। গভীর অর্থে চিন্তা করো পবিত্র কুরআনের এই আয়াতে, যেখানে তোমাদের মতোই একদল যুবকের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন আমাদের রব।
وَإِذِ اعْتَزَلْتُمُوهُمْ وَمَا يَعْبُدُونَ إِلَّا اللَّهَ فَأْوُوا إِلَى الْكَهْفِ يَنشُرْ لَكُمْ رَبُّكُمْ مِنْ رَحْمَتِهِ وَيُهَيِّئْ لَكُمْ مِنْ أَمْرِكُمْ مِرفَقًا
'যখন তোমরা তাদের এবং তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছ তখন গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করেছ। তোমাদের প্রভু তোমাদের জন্য তার করুণা ছড়িয়ে দেবেন এবং তোমাদের জন্য তোমাদের কাজ সহজ করে দেবেন।' ³⁶
ঈমানের মর্যাদা ও সুফল হলো, আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঈমানদারদের জন্য সর্বদা সঠিক ও উপযুক্ত পথ তৈরি করে দেন। তাদের অন্তরকে আল্লাহ অত্যন্ত মজবুত ও সুদৃঢ় করে দেন। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন। 'তাদের অন্তরে আমি দৃঢ়তা এনে দিয়েছিলাম যখন তারা দীর্ঘ নিদ্রার পর উঠেছিল এবং বলেছিল, আসমান জমিনের প্রভুই আমাদের প্রভু। আমরা তাকে ছাড়া অন্য কোনো উপাস্যকে ডাকব না। যদি ডাকি তাহলে অবশ্যই আমরা এক অন্যায় কথা বলব। ³⁷
আল্লাহ তায়ালাকে রব এবং নিজেদের তার বান্দা স্বীকার করার মাঝে রয়েছে প্রকৃত সফলতা। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালাকে যারা একমাত্র ইলাহ হিসেবে বেছে নিয়েছে তাদের জন্যই প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদা। পবিত্র কুরআনে আসহাফে কাহফের যুবকদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
إِذْ قَامُوا فَقَالُوا رَبُّنَا رَبُّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ
'যখন তারা তাদের দীর্ঘ নিদ্রা থেকে উঠেছিল এবং বলেছিল, আসমান জমিনের প্রভুই আমাদের প্রভু। আমরা তাকে ছাড়া অন্য কোনো উপাস্যকে ডাকব না।' ³⁸
পক্ষান্তরে যারা আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অন্যদের নিজেদের ইলাহ ও উপাস্যরূপে গ্রহণ করে তারা হয় চূড়ান্ত ব্যর্থ। দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের জন্য নেই কোনো সম্মান ও মর্যাদা। তারা তো মিথ্যে মরীচিকার পেছনে ছুটছে। হ্যাঁ, একদিন তাদের মোহ ভাঙবে। সেদিন তারা আফসোস ও অনুশোচনা করলেও কোনো লাভ হবে না।
তাদের সম্পর্কে আসহাবে কাহফের যুবকদের ভাষায় আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,
هَؤُلَاءِ قَوْمُنَا اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ آلِهَةً
'এরাই আমাদের স্বজাতি। এরা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যান্য উপাস্য গ্রহণ করেছে।' ³⁹
আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াকে বানিয়েছেন পরীক্ষার স্থান। বান্দাকে তিনি নানা বিপদ-আপদ দ্বারা পরীক্ষা করেন। এর মাধ্যমে তিনি তার বান্দার ঈমান যাচাই করেন। তার অন্তরে আল্লাহ ও ঈমানের জন্য কী পরিমাণ ভালোবাসা রয়েছে তা পরখ করেন। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَإِنَّا لَجَاعِلُونَ مَا عَلَيْهَا صَعِيدًا جُرُزًا
'পৃথিবীর সবকিছু আমি তার সৌন্দর্যে পরিণত করেছি, যাতে লোকদের পরীক্ষা করতে পারি, কে তাদের মধ্যে উত্তম আমলকারী। আবার তার সবকিছু আমি শুকনো মাটিতে পরিণত করে দেব।' ⁴⁰
পূর্বসূরি উলামায়ে কেরামের অনেকেই বলেছেন, আসহাবে কাহফের যুবকরা ছিল সেকালের বাদশাহ, গভর্নর ও মন্ত্রীদের ছেলে। তারা ছিল অত্যন্ত অভিজাত বংশের সন্তান। সামাজিকভাবে তাদের ছিল বিরাট মর্যাদা। কিন্তু এসবের চেয়েও তাদের অন্তরে ঈমান ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও মজবুত। তাদের ঈমান এতই সুদৃঢ় ছিল যে, তাদের বাদশাহি স্বভাব, উন্নত জীবন এবং সম্মানজনক সামাজিক মর্যাদা তাদের ঈমানের সামনে টিকতে পারেনি। দুনিয়ার চাকচিক্য ও মোহ তাদের ঈমানের সামনে ছিল অতি তুচ্ছ। ঈমান বাঁচানোর জন্য তারা এমনকি মাতৃভূমি পর্যন্ত ছেড়ে দিলো। কারণ, আশঙ্কা ছিল, তাদের পিতারা, তাদের বংশ-গোত্র তাদের ঈমান থেকে বিচ্যুত করে ফেলবে।
হে যুবক! আসহাবে কাহফের যুবকরা যদি ঈমানের জন্য সকল কিছু পরিত্যাগ করতে পারে তাহলে আজকের যুবকরা কেন পারবে না? তারা যদি ঈমানের জন্য দুনিয়ার চাকচিক্য ও অশোভন সৌন্দর্য ছেড়ে দিতে পারে তাহলে আজকের যুবকরা কেন তা পারবে না? আমাদের অন্তরে যে ঈমান রয়েছে আসহাবে কাহফের যুবকদের অন্তরেও একই ঈমান ছিল। আমরা যে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি তারাও সে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল। তাদের ঈমান যদি তাদের অন্যায় ও অপকর্ম থেকে বিরত রাখতে পারে তাহলে আমাদের ঈমান কেন আমাদের অন্যায় ও অপকর্ম থেকে বিরত রাখতে পারে না? আসহাবে কাহফের যুবকরা যদি ঈমানের জন্য সকল আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিতে পারে তাহলে হে যুবক! তুমি কেন পারবে না? শিক্ষা গ্রহণ করো তাদের থেকে।
দেখো কেমন ছিল তাদের ঈমান। নিজেদের ঈমানকে তাদের ঈমানের মতো বানাও। তাহলে দুনিয়া ও আখেরাতে অর্জন করবে অসামান্য মর্যাদা। ঈমান গ্রহণের পূর্বে আসহাবে কাহফের যুবকদের ছিল না কোনো মর্যাদা। আল্লাহ তায়ালার নিকট তাদের জন্য ছিল না কোনো প্রকার সম্মান। কিন্তু ঈমান তাদের নিয়ে গেছে সম্মান ও মর্যাদার সুউচ্চ চূড়ায়। হে যুবক! তোমার ঈমানকেও বানাও তাদের মতো। তাহলে রবের নিকট পাবে তুমিও মর্যাদার সুউচ্চ আসন। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
إِنَّ هَذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاعْبُدُونِ
'এই হলো তোমাদের ধর্ম, এক ধর্ম; আর আমি হলাম তোমাদের প্রভু, অতএব তোমরা আমার ইবাদত করো।' ⁴¹
আল্লাহ তায়ালাকে সবচেয়ে বিশ্বাস করে তরুণরা। যুবকদের অন্তর ঈমান ও ইয়াকিনের জন্য অধিক উপযুক্ত। তারা সত্যকে দ্রুত চিনতে পারে এবং তাকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে। তারা হেদায়েতের ওপর অটুট থাকে। ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখো, আল্লাহ ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ডাকে যারা সাড়া দিয়েছে তাদের অধিকাংশ ছিল যুবক ও তরুণ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যারা ওহির লেখক ছিলেন তারা ছিলেন যুবক। যারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অধিক হাদিস মুখস্থ করেছেন তারা ছিলেন যুবক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম যাদের বিভিন্ন রাষ্ট্রে দূত হিসেবে প্রেরণ করেছেন তারা ছিলেন যুবক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যারা কবি ছিলেন তারা ছিলেন যুবক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ডানে ও বামে যারা যুদ্ধ করেছেন তারা ছিলেন যুবক। যুবকদের হাতেই রচিত হয়েছে ইসলামের ইতিহাস। রণাঙ্গনে তারাই উড্ডীন করেছে ইসলামের ঝান্ডা। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করেছে ইসলামের যুব ও তরুণ প্রজন্ম। তারাই উম্মাহর অতন্ত্র প্রহরী। ইসলামের শক্তিশালী সৈনিক।
আজকের মুসলিম যুব ও তরুণ প্রজন্মের অবস্থার পরিবর্তন এবং তাদের করণীয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করব। যুবকদের চিন্তা চেতনা ও মানস গঠনে যা বিশেষ ভূমিকা রাখবে, ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
৩১ সুরা কাহফ: ১৩
৩২ সুরা কাহফ: ১৩
৩৩ সুরা আনআম: ১২২
৩৪ সুরা আলে ইমরান: ১৩৯
৩৫ সুরা আলে ইমরান: ১৭৩
৩৬ সুরা কাহফ: ১৬
৩৭ সুরা কাহফ: ১৪
৩৮ সুরা কাহফ: ১৪
৩৯ সুরা কাহফ: ১৫
৪০ সুরা কাহফ: ৭-৮
৪১ সুরা আম্বিয়া: ৯২

📘 হে যুবক! ফিরে এসো রবের দিকে > 📄 রাতের বেলা ইবাদত করা

📄 রাতের বেলা ইবাদত করা


যদি তুমি দিনের বেলা আল্লাহর নিকট প্রিয় হতে চাও তাহলে তোমাকে রাতের বেলা আল্লাহর নিকট প্রিয় হতে হবে। রাতের অন্ধকার আল্লাহর নিকট প্রিয় হওয়ার সর্বোত্তম ও সুবর্ণ সুযোগ। যুবকদের জন্য করণীয় হলো, রাতের অন্ধকারে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করা। বিগলিতচিত্তে রবের সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা। বিনয়াবনত হয়ে নামাজ পড়া। পরম ভালোবাসার সাথে রুকু করা। অত্যন্ত ভক্তি ও আবেগের সাথে আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হওয়া। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْئًا وَأَقْوَمُ قِيلًا
'রাতে (ইবাদতের জন্য) ওঠা (প্রবৃত্তিকে) শক্তভাবে দমনে এবং (কথা) সঠিকভাবে উচ্চারণে অত্যন্ত সহায়ক।'⁵⁰
অন্য আয়াতে ইরশাদ করেন,
تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا
'তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে পৃথক হয়। আশা নিয়ে তারা তাদের প্রভুকে ডাকে এবং তাদের যা দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে।'⁵¹
রাতের অন্ধকারে নামাজ পড়া শ্রেষ্ঠ ইবাদতসমূহের একটি। ফরজ ইবাদতের পর এটি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে অধিক সহায়ক। যাকে কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের নামাজ বলা হয়। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে অধিক নামাজ পড়তেন; এমনকি নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার পা মুবারক ফুলে যেত। যখন এ ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, তখন তিনি বলেছেন,
أفلا أكون عبداً شكوراً؟
অর্থাৎ, 'আমি কি আমার প্রভুর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না?'
রাতের গভীরে আল্লাহর সম্মুখে নামাজে দণ্ডায়মান হওয়া শ্রেষ্ঠ ও আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় ইবাদতসমূহের একটি। যে যুবক রাতে তার রবের সামনে নামাজে দাঁড়াবে তার যৌবনকাল অতিবাহিত হবে উত্তমভাবে। আল্লাহ তায়ালার সাথে তার সম্পর্ক হবে সুদৃঢ়। তার অন্তর হবে প্রশস্ত। তার ঈমান হবে শক্তিশালী। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের নামাজ সম্পর্কে ইরশাদ করেন,
أفضل الصلاة بعد المكتوبة الصلاة في جوف الليل
'ফরজ নামাজের পর সর্বশ্রেষ্ট নামাজ হলো ওই নামাজ যা রাতের গভীরে আদায় করা হয়। '⁵²
হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন ব্যক্তির কথা বলেছেন যাদের আল্লাহ তায়ালা ভালোবাসেন। উক্ত তিন ব্যক্তির মধ্যে এক প্রকার হলো তারা, যারা রাতে তাদের রবের সামনে নামাজের জন্য দাঁড়ায়। যাদের নিকট ঘুমের চেয়ে নামাজ প্রিয়। এবং দীর্ঘক্ষণ তারা এভাবে নামাজে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের রবকে স্মরণ করে।
রাতে কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করার গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে সকলেই অবগত। বান্দা যখন রাতের আরাম-আয়েশকে বিসর্জন দিয়ে গোপনে তার রবের সামনে নামাজে দাঁড়ায় তখন আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কেউ তাকে দেখতে পায় না। ফলে তখন তার মাঝে ইখলাস ও নিষ্ঠা থাকে পূর্ণমাত্রায়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা অত্যধিক পছন্দ করেন যে, বান্দা কেবল আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে আর কাউকে শরিক করবে না। এ জন্যই যারা মুনাফিক তারা রাতের গভীরে নামাজ পড়ে না। কারণ, তারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে না। আল্লাহ তায়ালার একনিষ্ঠ বান্দাগণই কেবল রাতে ইবাদত করে।
রাতের ইবাদতের মাঝে লুকিয়ে আছে মুমিনের শক্তি। মুমিনগণ এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সাহায্য কামনা করে। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে, মুমিনদের বিজয়ের পেছনে রয়েছে রাতের নামাজ ও চোখের বিগলিত অশ্রু। বদর যুদ্ধ সম্পর্কে হযরত আলি রা. বর্ণনা করেছেন যে, যুদ্ধের আগের দিন রাতে আমরা ভোর পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদত, দোয়া ও কান্নাকাটিতে কাটিয়ে দিই। যার ফলশ্রুতিতে পরদিন যুদ্ধের রণাঙ্গনে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের সাহায্যের জন্য আসমান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ফেরেশতা প্রেরণ করেছেন এবং মুসলমানদের বিজয় দান করেছেন। শুধু বদর যুদ্ধ নয়, ইসলামের সকল যুদ্ধের চিত্রই এমন। রাতের ইবাদতের মাঝে আল্লাহ তায়ালা বিশেষ একটি পাওয়ার দান করেছেন যা অন্যান্য ইবাদতে দান করেননি। এর কারণ তো এই যে, তখন বান্দা কেবল আল্লাহর জন্য ইবাদত করে। তার সাথে কাউকে শরিক করে না। আর না কাউকে দেখানোর জন্য ইবাদত করে। জেনে রেখো! মুমিনের শক্তির রহস্য লুকিয়ে আছে কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের মাঝে। বান্দা যখন অত্যন্ত কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয় তখন রাতের গভীরে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে। বান্দার ওপর আরোপিত কঠিন মুহূর্তে রাতের ইবাদতের প্রতি ধাবিত হয়। আল্লাহ তখন বান্দাকে সাহায্য করেন। আল্লাহ তখন বান্দার কঠিনকে করে দেন সহজ। আল্লাহ তায়ালা বদরে মুসলমানদের সেই কঠিন সময়ের কথা বর্ণনা করে ইরশাদ করেন,
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنِّي مُمِدُّكُمْ بِأَلْفٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُرْدِفِينَ
'যখন তোমরা তোমাদের প্রভুর নিকট সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছিলে এবং তিনি তোমাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে বলেছিলেন, আমি তোমাদের এক হাজার ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্য করব; যারা একজনের পেছনে আরেকজন ক্রমান্বয়ে আসতে থাকবে।' ⁵³
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় সাহাবি এবং ইসলামের সোনালি যুগের যুবকদের নিকট রাতের ইবাদত ছিল অত্যন্ত প্রিয়। রাতের গভীরে অত্যধিক নামাজ ও অশ্রুপাত তাদের আসীন করেছে সর্বোচ্চ চূড়ায়। ইমাম যাহাবি রহ. বলেন, হযরত আলি ইবনে হুসাইন ইবনে যাইনুল আবেদিন রাতভর ইবাদতে কাটিয়ে দিতেন। যখন দিন ফুরিয়ে যেত এবং রাত আগমন করত তখন তিনি অজু করে বিছানায় যেতেন। আর বলতেন, 'কতই-না উত্তম এ রাত্রি। জান্নাতে রয়েছে এর চেয়েও উত্তম। এর চেয়ে অধিক প্রশান্তি। আর বলতেন, সকাল পর্যন্ত আমি ইবাদত করব।' হ্যাঁ, তিনি ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন। যখন সকাল হতো তখন চেহারায় নূর চমকাতো। একটি উজ্জ্বল আলো তার মুখমণ্ডলে জ্বলজ্বল করত।
হযরত হাসান বসরি রহ. বলেন, 'যারা রাতে ইবাদত করে তাদের নূরের পোশাক পরিধান করানো হয়। নুর তাদের সর্বদা বেষ্টন করে রাখে।'
বিনিদ্র রজনী যারা ইবাদত করতেন তাদের মধ্যে একজন হলেন, হযরত রাবি ইবনে হায়সাম রহ.। তিনি রাতভর ইবাদত, নামাজ, জিকির ও কান্নাকাটিতে কাটিয়ে দিতেন। এবং এর পরিণাম এতই অধিক ছিল যে, তার মা তাকে একদিন জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কেন রাতভর না ঘুমিয়ে এত ইবাদত করো? তুমি কি কাউকে হত্যা করেছ যে আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না?' জবাবে রাবি ইবনে হায়সাম বলেন, 'হ্যাঁ, আমি নিজেকে গোনাহ ও অবাধ্যতা দ্বারা হত্যা করেছি।' হযরত রাবি ইবনে হায়সাম ছিলেন সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর শিষ্য। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. তার সম্পর্কে বলেন, 'যদি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে দেখতেন, তাহলে অবশ্যই তিনি তোমাকে ভালোবাসতেন।'

টিকাঃ
৫০ সুরা মুজাম্মিল: ৬
৫১ সুরা সিজদা: ১৬
৫২ সহিহ মুসলিম: ২০৬৯
৫৩ সুরা আনফাল: ৯

যদি তুমি দিনের বেলা আল্লাহর নিকট প্রিয় হতে চাও তাহলে তোমাকে রাতের বেলা আল্লাহর নিকট প্রিয় হতে হবে। রাতের অন্ধকার আল্লাহর নিকট প্রিয় হওয়ার সর্বোত্তম ও সুবর্ণ সুযোগ। যুবকদের জন্য করণীয় হলো, রাতের অন্ধকারে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করা। বিগলিতচিত্তে রবের সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা। বিনয়াবনত হয়ে নামাজ পড়া। পরম ভালোবাসার সাথে রুকু করা। অত্যন্ত ভক্তি ও আবেগের সাথে আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হওয়া। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْئًا وَأَقْوَمُ قِيلًا
'রাতে (ইবাদতের জন্য) ওঠা (প্রবৃত্তিকে) শক্তভাবে দমনে এবং (কথা) সঠিকভাবে উচ্চারণে অত্যন্ত সহায়ক।'⁵⁰
অন্য আয়াতে ইরশাদ করেন,
تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا
'তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে পৃথক হয়। আশা নিয়ে তারা তাদের প্রভুকে ডাকে এবং তাদের যা দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে।'⁵¹
রাতের অন্ধকারে নামাজ পড়া শ্রেষ্ঠ ইবাদতসমূহের একটি। ফরজ ইবাদতের পর এটি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে অধিক সহায়ক। যাকে কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের নামাজ বলা হয়। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে অধিক নামাজ পড়তেন; এমনকি নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার পা মুবারক ফুলে যেত। যখন এ ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, তখন তিনি বলেছেন,
أفلا أكون عبداً شكوراً؟
অর্থাৎ, 'আমি কি আমার প্রভুর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না?'
রাতের গভীরে আল্লাহর সম্মুখে নামাজে দণ্ডায়মান হওয়া শ্রেষ্ঠ ও আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় ইবাদতসমূহের একটি। যে যুবক রাতে তার রবের সামনে নামাজে দাঁড়াবে তার যৌবনকাল অতিবাহিত হবে উত্তমভাবে। আল্লাহ তায়ালার সাথে তার সম্পর্ক হবে সুদৃঢ়। তার অন্তর হবে প্রশস্ত। তার ঈমান হবে শক্তিশালী। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের নামাজ সম্পর্কে ইরশাদ করেন,
أفضل الصلاة بعد المكتوبة الصلاة في جوف الليل
'ফরজ নামাজের পর সর্বশ্রেষ্ট নামাজ হলো ওই নামাজ যা রাতের গভীরে আদায় করা হয়। '⁵²
হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন ব্যক্তির কথা বলেছেন যাদের আল্লাহ তায়ালা ভালোবাসেন। উক্ত তিন ব্যক্তির মধ্যে এক প্রকার হলো তারা, যারা রাতে তাদের রবের সামনে নামাজের জন্য দাঁড়ায়। যাদের নিকট ঘুমের চেয়ে নামাজ প্রিয়। এবং দীর্ঘক্ষণ তারা এভাবে নামাজে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের রবকে স্মরণ করে।
রাতে কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করার গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে সকলেই অবগত। বান্দা যখন রাতের আরাম-আয়েশকে বিসর্জন দিয়ে গোপনে তার রবের সামনে নামাজে দাঁড়ায় তখন আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কেউ তাকে দেখতে পায় না। ফলে তখন তার মাঝে ইখলাস ও নিষ্ঠা থাকে পূর্ণমাত্রায়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা অত্যধিক পছন্দ করেন যে, বান্দা কেবল আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে আর কাউকে শরিক করবে না। এ জন্যই যারা মুনাফিক তারা রাতের গভীরে নামাজ পড়ে না। কারণ, তারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে না। আল্লাহ তায়ালার একনিষ্ঠ বান্দাগণই কেবল রাতে ইবাদত করে।
রাতের ইবাদতের মাঝে লুকিয়ে আছে মুমিনের শক্তি। মুমিনগণ এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সাহায্য কামনা করে। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে, মুমিনদের বিজয়ের পেছনে রয়েছে রাতের নামাজ ও চোখের বিগলিত অশ্রু। বদর যুদ্ধ সম্পর্কে হযরত আলি রা. বর্ণনা করেছেন যে, যুদ্ধের আগের দিন রাতে আমরা ভোর পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদত, দোয়া ও কান্নাকাটিতে কাটিয়ে দিই। যার ফলশ্রুতিতে পরদিন যুদ্ধের রণাঙ্গনে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের সাহায্যের জন্য আসমান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ফেরেশতা প্রেরণ করেছেন এবং মুসলমানদের বিজয় দান করেছেন। শুধু বদর যুদ্ধ নয়, ইসলামের সকল যুদ্ধের চিত্রই এমন। রাতের ইবাদতের মাঝে আল্লাহ তায়ালা বিশেষ একটি পাওয়ার দান করেছেন যা অন্যান্য ইবাদতে দান করেননি। এর কারণ তো এই যে, তখন বান্দা কেবল আল্লাহর জন্য ইবাদত করে। তার সাথে কাউকে শরিক করে না। আর না কাউকে দেখানোর জন্য ইবাদত করে। জেনে রেখো! মুমিনের শক্তির রহস্য লুকিয়ে আছে কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের মাঝে। বান্দা যখন অত্যন্ত কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয় তখন রাতের গভীরে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে। বান্দার ওপর আরোপিত কঠিন মুহূর্তে রাতের ইবাদতের প্রতি ধাবিত হয়। আল্লাহ তখন বান্দাকে সাহায্য করেন। আল্লাহ তখন বান্দার কঠিনকে করে দেন সহজ। আল্লাহ তায়ালা বদরে মুসলমানদের সেই কঠিন সময়ের কথা বর্ণনা করে ইরশাদ করেন,
إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنِّي مُمِدُّكُمْ بِأَلْفٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُرْدِفِينَ
'যখন তোমরা তোমাদের প্রভুর নিকট সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছিলে এবং তিনি তোমাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে বলেছিলেন, আমি তোমাদের এক হাজার ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্য করব; যারা একজনের পেছনে আরেকজন ক্রমান্বয়ে আসতে থাকবে।' ⁵³
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় সাহাবি এবং ইসলামের সোনালি যুগের যুবকদের নিকট রাতের ইবাদত ছিল অত্যন্ত প্রিয়। রাতের গভীরে অত্যধিক নামাজ ও অশ্রুপাত তাদের আসীন করেছে সর্বোচ্চ চূড়ায়। ইমাম যাহাবি রহ. বলেন, হযরত আলি ইবনে হুসাইন ইবনে যাইনুল আবেদিন রাতভর ইবাদতে কাটিয়ে দিতেন। যখন দিন ফুরিয়ে যেত এবং রাত আগমন করত তখন তিনি অজু করে বিছানায় যেতেন। আর বলতেন, 'কতই-না উত্তম এ রাত্রি। জান্নাতে রয়েছে এর চেয়েও উত্তম। এর চেয়ে অধিক প্রশান্তি। আর বলতেন, সকাল পর্যন্ত আমি ইবাদত করব।' হ্যাঁ, তিনি ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন। যখন সকাল হতো তখন চেহারায় নূর চমকাতো। একটি উজ্জ্বল আলো তার মুখমণ্ডলে জ্বলজ্বল করত।
হযরত হাসান বসরি রহ. বলেন, 'যারা রাতে ইবাদত করে তাদের নূরের পোশাক পরিধান করানো হয়। নুর তাদের সর্বদা বেষ্টন করে রাখে।'
বিনিদ্র রজনী যারা ইবাদত করতেন তাদের মধ্যে একজন হলেন, হযরত রাবি ইবনে হায়সাম রহ.। তিনি রাতভর ইবাদত, নামাজ, জিকির ও কান্নাকাটিতে কাটিয়ে দিতেন। এবং এর পরিণাম এতই অধিক ছিল যে, তার মা তাকে একদিন জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কেন রাতভর না ঘুমিয়ে এত ইবাদত করো? তুমি কি কাউকে হত্যা করেছ যে আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না?' জবাবে রাবি ইবনে হায়সাম বলেন, 'হ্যাঁ, আমি নিজেকে গোনাহ ও অবাধ্যতা দ্বারা হত্যা করেছি।' হযরত রাবি ইবনে হায়সাম ছিলেন সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর শিষ্য। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. তার সম্পর্কে বলেন, 'যদি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে দেখতেন, তাহলে অবশ্যই তিনি তোমাকে ভালোবাসতেন।'

টিকাঃ
৫০ সুরা মুজাম্মিল: ৬
৫১ সুরা সিজদা: ১৬
৫২ সহিহ মুসলিম: ২০৬৯
৫৩ সুরা আনফাল: ৯

📘 হে যুবক! ফিরে এসো রবের দিকে > 📄 যুবকদের মর্যাদা

📄 যুবকদের মর্যাদা


আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعًا
'যে সম্মান চায় তার জানা উচিত, যাবতীয় সম্মান একমাত্র আল্লাহর জন্য।'⁵⁴
অপর আয়াতে ইরশাদ করেন,
وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ
'আসলে সম্মান তো আল্লাহর, তার রাসুলের এবং মুমিনদের। কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।'⁵⁵
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছেন এবং মদিনায় ইসলামের প্রচার-প্রসার করছেন। মদিনার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে ঈমানের আলো। মদিনার লোকেরা দলে দলে মুসলমান হতে লাগল। কিন্তু এ দৃশ্যে গাত্রদাহ শুরু হলো ইসলামের শত্রুদের। কাফের মুশরিকরা মুসলমানদের এ অগ্রযাত্রাকে যে-কোনো মূল্যে রুখে দিতে চাইল। আর এ জন্য তারা গ্রহণ করল একটি মাস্টারপ্ল্যান। মদিনার চারপাশের সকল গোত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হলো। তারা যে-কোনো মূল্যে ইসলামের আলোকে নিভিয়ে দিতে চায়। থামিয়ে দিতে চায় কালিমার অগ্রযাত্রাকে। মদিনায় ইসলাম ও মুসলমানদের তখন নিদারুণ ক্রান্তিকাল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মুসলমানদের সে অবস্থা বর্ণনা করে বলেন,
إِذْ جَاءُوكُم مِّن فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللَّهِ الظُّنُونَا هُنَالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْزَالًا شَدِيدًا
'যখন তোমাদের উপরের দিক থেকে ও নিচের দিক থেকে শত্রুরা তোমাদের দিকে এসেছিল, যখন ভয়ে তোমাদের দৃষ্টিসমূহ নিস্তেজ হয়ে এসেছিল ও হৃৎপিণ্ডগুলো গলার কাছে চলে এসেছিল এবং তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা রকম সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করেছিলে। সেখানেই মুমিনরা পরীক্ষায় নিপতিত হয়েছিল এবং দারুণভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল।’⁵⁶
মদিনায় মুসলমানদের তখন নিদারুণ ক্রান্তিকাল। দ্বীন ও জাতির এমন কঠিন মুহূর্তে এবং ঘোরতর বিপদের সময় ঈমানদার যুবকদের মর্যাদা পরিলক্ষিত হয়। প্রস্ফুটিত হয় মুসলিম যুবকদের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য। রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দেখলেন, মদিনা ও মদিনার আশপাশের ইহুদি- খ্রিষ্টান ও কাফের মুশরিকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সম্মিলিত জোট হয়ে তারা মুসলমানদের মদিনা থেকে বিতাড়িত করতে চাচ্ছে। নিভিয়ে দিতে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে আল্লাহর দ্বীনকে। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার গাতফান গোত্রের দুজন নেতার সাথে গোপনে সাক্ষাৎ করলেন এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গাতফান গোত্রের মনোভাব জানলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পারলেন, গাতফান গোত্রের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সম্পদ। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের কোনো প্রকার শত্রুতা নেই। তাদের উদ্দেশ্য ধন-সম্পদ। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সন্ধির প্রস্তাব দিলেন। যেন তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত জোটের অভিযানে অংশগ্রহণ না করে। এর মাধ্যমে মদিনাবাসীর ওপর শত্রুদের চাপ কিছুটা হলেও লাঘব হবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে মদিনার মুসলমানদের এক তৃতীয়াংশ ফসলের বিনিময়ে সন্ধি করলেন। তবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি শর্ত দিলেন। শর্তটি হলো, তিনি এ ব্যাপারে সাদ ইবনে মুয়াজ রা.-যিনি আউস সম্প্রদায়ের নেতা-এবং সাদ ইবনে উবাদা রা.-যিনি খাজরাজ গোত্রের নেতা-এ দুজনের সাথে পরামর্শ করে তবেই সন্ধিপত্র চূড়ান্ত করবেন।
হযরত সাদ ইবনে মুয়াজ এবং হযরত সাদ ইবনে উবাদা রা. দুজনই ছিলেন বয়সে পরিণত যুবক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় ইসলাম ও মুসলমানদের চরম সঙ্কটপূর্ণ দিনে দুজন যুবকের সাথে পরামর্শ করে গাতফান গোত্রের সাথে সন্ধিচুক্তি চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সকলের ওপর দুজন যুবক সাহাবিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। মদিনায় তখন আরো অনেক প্রবীণ সাহাবি ছিলেন। কিন্তু পরামর্শ ও সিদ্ধান্তের জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের মধ্যে কেবল দুজন যুবক সাহাবিকে নির্বাচন করলেন। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে পরামর্শ করে গাতফান গোত্রের সাথে সন্ধি চূড়ান্ত করলেন। ইসলাম ও মুসলমানদের কঠিনতম দিনে যুবকদের মর্যাদা পরিলক্ষিত হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ
'আসলে সম্মান তো আল্লাহর, তার রাসুলের এবং মুমিনদের। কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না। '⁵⁷
মুসলিম যুবকদের মর্যাদার কথা পবিত্র কুরআনেই বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন,
وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ إِن يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌ فَقَدْ مَسَّ الْقَوْمَ قَرْحٌ مِثْلُهُ ، وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَتَّخِذَ مِنكُمْ شُهَدَاءَ ، وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ وَلِيُمَحِّصَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَمْحَقَ الْكَافِرِينَ أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنكُم وَيَعْلَمَ الصَّابِرِينَ
'শত্রুর সামনে তোমরা দুর্বল ও বিষণ্ণ হয়ো না। ঈমানদার হলে তোমরাই বিজয়ী হবে। যদি তোমাদের কোনো আঘাত লাগে তাহলে মনে করবে অনুরূপ আঘাত তো অন্যদেরও লেগেছে। আর এই দিনগুলো আমি মানুষের মধ্যে অদলবদল করি; যাতে আল্লাহ মুমিনদের যাচাই করতে পারেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে শহিদদের গ্রহণ করতে পারেন। আল্লাহ জালেমদের ভালোবাসেন না। এবং যাতে তিনি মুমিনদের সংশোধন আর কাফেরদের নির্মূল করতে পারেন। আল্লাহ তোমাদের মধ্য থেকে জিহাদকারী ও ধৈর্যধারণকারীদের যাচাই করতে পারেন।' ⁵⁸
পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী কাফের মুশরিক, ইহুদি, খ্রিষ্টান তারা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মদিনায় আক্রমন করল। কিন্তু সেদিন ঈমানদার যুবকরা তাদের দ্বীনের ওপর ছিল অটল। তারা সেদিন সাহায্য করেছে ইসলামকে। মুসলিম যুবকদের সম্মিলিত প্রতিরোধ ও প্রচেষ্টায় শত্রুর বিশাল দল পলায়ন করতে বাধ্য হয়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَرَدَّ اللَّهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوا خَيْرًا وَكَفَى اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ الْقِتَالَ
'আল্লাহ কাফেরদের তাদের ক্রোধ নিয়েই ফিরিয়ে দিলেন। তারা কোনো কল্যাণ লাভ করতে পারেনি। যুদ্ধে মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ হলেন মহাশক্তিধর ও পরাক্রমশালী।'⁵⁹
মদিনায় তখন মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা ছিল নিতান্তই স্বল্প। কিন্তু আল্লাহ ঈমানদারদের সাহায্য করেছেন। ঈমানদারদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ স্বয়ং দিয়েছেন,
وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنْتُمْ أَذِلَّةٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
'তোমরা দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও বদরে আল্লাহ তোমাদেরকে বিজয়ী করেছিলেন। অতএব আল্লাহকে ভয় করো। যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পারো।'⁶⁰
সাহাবায়ে কেরام রাতের অন্ধকারে ছিলেন সাধক এবং দিনের আলোতে ছিলেন সাহসী ঘোরসওয়ার। আজ পৃথিবীতে মুসলমানরা একমাত্র লাঞ্ছিত, নির্যাতিত। দেশে দেশে আজ মুসলমানদের ওপর চলছে ইতিহাসের ভয়াবহ জুলুম। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে এবং কাঙ্ক্ষিত বিজয় ছিনিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন মুসলিম যুবকদের জাগরণ। মুসলিম যুবকদের সাহাবায়ে কেরামের আদর্শে আদর্শিত হতে হবে। সাহাবায়ে কেরামের মতো রাতের সাধক এবং দিনের ঘোরসওয়ার হতে হবে।

টিকাঃ
৫৪ সূরা ফাতির: ১০
৫৫ সুরা মুনাফিকুন: ৮
৫৬ সুরা আহযাব: ৯-১০
৫৭ সুরা মুনাফিকুন: ৮
৫৮ সুরা আলে ইমরান: ১৩৯-১৪২
৫৯ সুরা আহযাব: ২৫
৬০ সুরা আলে ইমরান: ১২৩

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعًا
'যে সম্মান চায় তার জানা উচিত, যাবতীয় সম্মান একমাত্র আল্লাহর জন্য।'⁵⁴
অপর আয়াতে ইরশাদ করেন,
وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ
'আসলে সম্মান তো আল্লাহর, তার রাসুলের এবং মুমিনদের। কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।'⁵⁵
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছেন এবং মদিনায় ইসলামের প্রচার-প্রসার করছেন। মদিনার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে ঈমানের আলো। মদিনার লোকেরা দলে দলে মুসলমান হতে লাগল। কিন্তু এ দৃশ্যে গাত্রদাহ শুরু হলো ইসলামের শত্রুদের। কাফের মুশরিকরা মুসলমানদের এ অগ্রযাত্রাকে যে-কোনো মূল্যে রুখে দিতে চাইল। আর এ জন্য তারা গ্রহণ করল একটি মাস্টারপ্ল্যান। মদিনার চারপাশের সকল গোত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হলো। তারা যে-কোনো মূল্যে ইসলামের আলোকে নিভিয়ে দিতে চায়। থামিয়ে দিতে চায় কালিমার অগ্রযাত্রাকে। মদিনায় ইসলাম ও মুসলমানদের তখন নিদারুণ ক্রান্তিকাল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মুসলমানদের সে অবস্থা বর্ণনা করে বলেন,
إِذْ جَاءُوكُم مِّن فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللَّهِ الظُّنُونَا هُنَالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْزَالًا شَدِيدًا
'যখন তোমাদের উপরের দিক থেকে ও নিচের দিক থেকে শত্রুরা তোমাদের দিকে এসেছিল, যখন ভয়ে তোমাদের দৃষ্টিসমূহ নিস্তেজ হয়ে এসেছিল ও হৃৎপিণ্ডগুলো গলার কাছে চলে এসেছিল এবং তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা রকম সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করেছিলে। সেখানেই মুমিনরা পরীক্ষায় নিপতিত হয়েছিল এবং দারুণভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল।’⁵⁶
মদিনায় মুসলমানদের তখন নিদারুণ ক্রান্তিকাল। দ্বীন ও জাতির এমন কঠিন মুহূর্তে এবং ঘোরতর বিপদের সময় ঈমানদার যুবকদের মর্যাদা পরিলক্ষিত হয়। প্রস্ফুটিত হয় মুসলিম যুবকদের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য। রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দেখলেন, মদিনা ও মদিনার আশপাশের ইহুদি- খ্রিষ্টান ও কাফের মুশরিকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সম্মিলিত জোট হয়ে তারা মুসলমানদের মদিনা থেকে বিতাড়িত করতে চাচ্ছে। নিভিয়ে দিতে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে আল্লাহর দ্বীনকে। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার গাতফান গোত্রের দুজন নেতার সাথে গোপনে সাক্ষাৎ করলেন এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গাতফান গোত্রের মনোভাব জানলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পারলেন, গাতফান গোত্রের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সম্পদ। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের কোনো প্রকার শত্রুতা নেই। তাদের উদ্দেশ্য ধন-সম্পদ। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সন্ধির প্রস্তাব দিলেন। যেন তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত জোটের অভিযানে অংশগ্রহণ না করে। এর মাধ্যমে মদিনাবাসীর ওপর শত্রুদের চাপ কিছুটা হলেও লাঘব হবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে মদিনার মুসলমানদের এক তৃতীয়াংশ ফসলের বিনিময়ে সন্ধি করলেন। তবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি শর্ত দিলেন। শর্তটি হলো, তিনি এ ব্যাপারে সাদ ইবনে মুয়াজ রা.-যিনি আউস সম্প্রদায়ের নেতা-এবং সাদ ইবনে উবাদা রা.-যিনি খাজরাজ গোত্রের নেতা-এ দুজনের সাথে পরামর্শ করে তবেই সন্ধিপত্র চূড়ান্ত করবেন।
হযরত সাদ ইবনে মুয়াজ এবং হযরত সাদ ইবনে উবাদা রা. দুজনই ছিলেন বয়সে পরিণত যুবক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় ইসলাম ও মুসলমানদের চরম সঙ্কটপূর্ণ দিনে দুজন যুবকের সাথে পরামর্শ করে গাতফান গোত্রের সাথে সন্ধিচুক্তি চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সকলের ওপর দুজন যুবক সাহাবিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। মদিনায় তখন আরো অনেক প্রবীণ সাহাবি ছিলেন। কিন্তু পরামর্শ ও সিদ্ধান্তের জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের মধ্যে কেবল দুজন যুবক সাহাবিকে নির্বাচন করলেন। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে পরামর্শ করে গাতফান গোত্রের সাথে সন্ধি চূড়ান্ত করলেন। ইসলাম ও মুসলমানদের কঠিনতম দিনে যুবকদের মর্যাদা পরিলক্ষিত হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ
'আসলে সম্মান তো আল্লাহর, তার রাসুলের এবং মুমিনদের। কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না। '⁵⁷
মুসলিম যুবকদের মর্যাদার কথা পবিত্র কুরআনেই বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন,
وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ إِن يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌ فَقَدْ مَسَّ الْقَوْمَ قَرْحٌ مِثْلُهُ ، وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَتَّخِذَ مِنكُمْ شُهَدَاءَ ، وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ وَلِيُمَحِّصَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَمْحَقَ الْكَافِرِينَ أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنكُم وَيَعْلَمَ الصَّابِرِينَ
'শত্রুর সামনে তোমরা দুর্বল ও বিষণ্ণ হয়ো না। ঈমানদার হলে তোমরাই বিজয়ী হবে। যদি তোমাদের কোনো আঘাত লাগে তাহলে মনে করবে অনুরূপ আঘাত তো অন্যদেরও লেগেছে। আর এই দিনগুলো আমি মানুষের মধ্যে অদলবদল করি; যাতে আল্লাহ মুমিনদের যাচাই করতে পারেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে শহিদদের গ্রহণ করতে পারেন। আল্লাহ জালেমদের ভালোবাসেন না। এবং যাতে তিনি মুমিনদের সংশোধন আর কাফেরদের নির্মূল করতে পারেন। আল্লাহ তোমাদের মধ্য থেকে জিহাদকারী ও ধৈর্যধারণকারীদের যাচাই করতে পারেন।' ⁵⁸
পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী কাফের মুশরিক, ইহুদি, খ্রিষ্টান তারা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মদিনায় আক্রমন করল। কিন্তু সেদিন ঈমানদার যুবকরা তাদের দ্বীনের ওপর ছিল অটল। তারা সেদিন সাহায্য করেছে ইসলামকে। মুসলিম যুবকদের সম্মিলিত প্রতিরোধ ও প্রচেষ্টায় শত্রুর বিশাল দল পলায়ন করতে বাধ্য হয়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَرَدَّ اللَّهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوا خَيْرًا وَكَفَى اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ الْقِتَالَ
'আল্লাহ কাফেরদের তাদের ক্রোধ নিয়েই ফিরিয়ে দিলেন। তারা কোনো কল্যাণ লাভ করতে পারেনি। যুদ্ধে মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ হলেন মহাশক্তিধর ও পরাক্রমশালী।'⁵⁹
মদিনায় তখন মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা ছিল নিতান্তই স্বল্প। কিন্তু আল্লাহ ঈমানদারদের সাহায্য করেছেন। ঈমানদারদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ স্বয়ং দিয়েছেন,
وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنْتُمْ أَذِلَّةٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
'তোমরা দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও বদরে আল্লাহ তোমাদেরকে বিজয়ী করেছিলেন। অতএব আল্লাহকে ভয় করো। যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পারো।'⁶⁰
সাহাবায়ে কেরام রাতের অন্ধকারে ছিলেন সাধক এবং দিনের আলোতে ছিলেন সাহসী ঘোরসওয়ার। আজ পৃথিবীতে মুসলমানরা একমাত্র লাঞ্ছিত, নির্যাতিত। দেশে দেশে আজ মুসলমানদের ওপর চলছে ইতিহাসের ভয়াবহ জুলুম। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে এবং কাঙ্ক্ষিত বিজয় ছিনিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন মুসলিম যুবকদের জাগরণ। মুসলিম যুবকদের সাহাবায়ে কেরামের আদর্শে আদর্শিত হতে হবে। সাহাবায়ে কেরামের মতো রাতের সাধক এবং দিনের ঘোরসওয়ার হতে হবে।

টিকাঃ
৫৪ সূরা ফাতির: ১০
৫৫ সুরা মুনাফিকুন: ৮
৫৬ সুরা আহযাব: ৯-১০
৫৭ সুরা মুনাফিকুন: ৮
৫৮ সুরা আলে ইমরান: ১৩৯-১৪২
৫৯ সুরা আহযাব: ২৫
৬০ সুরা আলে ইমরান: ১২৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00