📘 হে যুবক! ফিরে এসো রবের দিকে > 📄 নামাজের প্রতি যুবকদের যত্নবান হতে হবে

📄 নামাজের প্রতি যুবকদের যত্নবান হতে হবে


একবার আমি রাতের শেষ প্রহরে গাড়িতে চড়ে দূরে কোথাও যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে তিনজন যুবককে দেখতে পেলাম তারা রাতের অন্ধকারে হাঁটছে। তাদের দেখে আমি গাড়ি থামালাম। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তারা কোথায় যাবে? দাম্মামে যাবে, একজন উত্তর দিলো। বললাম, আমিও সেদিকেই যাব, চাইলে তোমরা আমার সাথে গাড়িতে উঠতে পারো। আমি তোমাদের গন্তব্যস্থলে নামিয়ে দেব। তারা গাড়িতে উঠল। বয়সে তারা ছিল সদ্য তরুণ। সকলের বয়স একুশ-বাইশ হবে। চলতে চলতে আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা দাম্মামে কেনো যাচ্ছ? তারা বলল, চাকরির জন্য।
চাকরির জন্য তারা এতদূর পথ পাড়ি দিচ্ছে। এ নিন্দনীয় কিছু নয়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সকলকে রিজিক অনুসন্ধান করতে আদেশ করেছেন। তাই চাকরির অনুসন্ধানে বহুদূর পাড়ি দেওয়া দোষের কিছু নয়। কিন্তু দোষের বিষয় হলো, রিজিকের জন্য এত দূর পাড়ি দিচ্ছে, সীমাহীন কষ্ট সহ্য করছে, কিন্তু আল্লাহ তায়ালার হক পালনের ব্যাপারে তাদের মাঝে কোনো প্রকার আগ্রহ উদ্দীপনা নেই। রিজিকের তালাশে পাড়ি দিচ্ছে এক শহর থেকে আরেক শহর, কিন্তু আল্লাহর অপরিহার্য বিধান নামাজ পালনের জন্য তারা মসজিদে পর্যন্ত যায় না। রিজিক তালাশ করা দোষের কিছু নয়।
কিন্তু দোষের বিষয় হলো, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনে অমনোযোগী হওয়া। আমি তাদের বললাম, তোমরা আমাকে সত্য করে বলো তোমাদের সার্টিফিকেট এবং তোমাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কেমন? একজন মধ্যম স্তরের, বাকি দুজন এরও নিচে। এবার আমি তাদের বললাম, এ সমগ্র পৃথিবীর একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ তায়ালা। পৃথিবীল পূর্বাপর সবকিছু একমাত্র তার। রিজিক ও সফলতার চাবিকাঠি একমাত্র তার হাতে। তিনি যদি কাউকে সফলতা দান করেন তাহলে কেউ তাকে ফেরাতে পারবে না। আর তিনি যদি কাউকে ব্যর্থ করেন তাহলে কেউ তাকে সফল করতে পারবে না। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন। আল্লাহর সাথে যে আছে, আল্লাহর তার সাথে আছেন। আল্লাহ ও বান্দার সম্পর্ক হলো পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও দামি সম্পর্ক। মানুষের সফলতা ও ব্যর্থতা লুকিয়ে আছে এ সম্পর্কের গভীরে। জেনে রেখো! নামাজ হলো এমন ইবাদত যা আল্লাহ ও বান্দার মাঝে সম্পর্ক স্থাপন করে। নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সাথে বান্দা বিশেষ কথোপকথন করে। বান্দা আল্লাহর নিকট তার সাহায্যের কথা ব্যক্ত করে। আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন। সুতরাং আল্লাহ ও বান্দার সম্পর্কের সূচনা হয় নামাজের মাধ্যমে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى
'তোমার পরিবার-পরিজনকে নামাজের আদেশ করো এবং নিজে তাতে অবিচল থাকো। আমি তোমার কাছে কোনো জীবিকা চাচ্ছি না। আমিই তোমাকে জীবিকা দিয়ে থাকি। আর শুভ পরিণাম তো তাদের জন্য যারা আল্লাহকে ভয় করে।'⁷
নামাজ হলো ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। নামাজের মাধ্যমে নির্ধারণ হয় আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার সাথে কার কেমন সম্পর্ক। তাই আমি তাদের প্রথমে নামাজের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। আমার পাশে যে বসেছে তাকে সর্বাগ্রে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি নামাজ পড়? সে বলল, হে শাইখ! আমি কি সত্য বলব নাকি মিথ্যা বলব? আমি বললাম, তুমি যদি মিথ্যা বলো তাহলে মিথ্যার পরিণাম তোমার ওপরই পতিত হবে আর যদি সত্য বলো তাহলে যাবতীয় কল্যাণ তোমার জন্য। আমার কথা শুনে যুবকটি বলল, হে শাইখ! আমি সত্যই বলছি, আমি নামাজ পড়ি না। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি কাফের? সে বলল, না। আমি বললাম, তাহলে নামাজ পড় না কেন? অথচ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসে ইরশাদ করেছেন,
العهد الذي بيننا وبينهم الصلاة فمن تركها فقد كفر بين المرء وبين الكفر ترك الصلاة
'আমাদের মাঝে এবং তাদের মাঝে অঙ্গীকার হলো নামাজ। সুতরাং যে নামাজ ছেড়ে দিলো সে কাফের হয়ে গেল। মুসলমান ও কাফেরের মাঝে ব্যবধান হলো নামাজ ছেড়ে দেওয়া।৮
জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি চাও তোমাকে কাফের নামে সম্বোধন করা হোক? সে বলল, না। আমি বললাম, তাহলে নামাজ আদায়ের প্রতি যত্নবান হও। ঈমানের পর নামাজই হলো ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আমল।
দ্বিতীয় যুবকটি বলল, আমি তার চেয়ে ভালো আছি। আমি বললাম কীভাবে?
সে বলল, দৈনিক দুই ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। আমি বললাম, এ তো ভারি আশ্চর্যের কথা। তুমি কি নতুন কোনো শরিয়ত প্রবর্তন করেছ? আল্লাহ তায়ালা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আদেশ করেছেন। আর তুমি কিনা দিনে পড় মাত্র দুই ওয়াক্ত। হে আল্লাহর বান্দা! এ কেমন উদাসীনতা? ইসলামের ভিত্তি রাখা হয়েছে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ওপর। সে জিজ্ঞেস করল, আমার করণীয় কী? আমি বললাম, এখন থেকে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে।
তৃতীয় জনের ব্যাপার তো আরো ভারি আশ্চর্যের! সে বলল, আমি সাপ্তাহিক জুমার নামাজ পড়ি। প্রতি জুমায় একবার মসজিদে যাই।
এ হলো আজকের মুসলিম তরুণ প্রজন্মের অবস্থা। তারা সপ্তাহে একদিন মসজিদে যায়। আল্লাহ তায়ালার দেওয়া শরিয়তের পরিবর্তে তারা যেন মনগড়া নতুন শরিয়ত প্রবর্তন করেছে। তারা কেবল বিপদে পতিত হলেই আল্লাহকে স্মরণ করে। বিপদে পতিত হলে দৌড়ে মসজিদে যায়। আল্লাহকে ডাকে। আর যখন বিপদ কেটে যায় অমনি তারা ভুলে যায় আল্লাহকে। ভুলে যায় মসজিদ।
মৃত ব্যক্তিদের গোসল দেন এমন এক ব্যক্তি একটি করুণ কাহিনি শুনিয়েছেন। তিনি বলেন। এক যুবক। সুদর্শন। শারীরিক সক্ষমতায় ছিল পূর্ণ। হঠাৎ মৃত্যুবরণ করে। তাকে গোসল দেওয়ার জন্য আমাকে ডাকা হলো। আমি যখন গোসল দেওয়ার জন্য তার মুখমণ্ডল খুলেছি, দেখি-তার সুন্দর চেহারা অত্যন্ত কুৎসিত ও ভয়ংকর আকৃতি ধারণ করে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সত্যই বলেছেন,
وَلَوْ تَرَى إِذْ يَتَوَفَّى الَّذِينَ كَفَرُوا الْمَلَائِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَارَهُمْ وَذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ ذَلِكَ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيكُمْ وَأَنَّ اللَّهَ لَيْسَ بِظَلامِ لِلْعَبِيدِ
'ফেরেশতারা যখন কাফেরদের জান কবজ করে তখন তুমি যদি দেখতে, তারা তাদের মুখে ও পাছায় আঘাত করে আর বলে, জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি আস্বাদন করো। এটি তোমাদের কৃতকর্মের ফল। আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি জুলুম করেন না।'⁹
وَمَا ظَلَمَهُمُ اللَّهُ وَلَكِنْ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ .
'আল্লাহ তাদের প্রতি জুলুম করেননি, বরং তারা নিজেরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে।'¹⁰
লোকটি বলেন, এ দেখে আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যাই। ভয়ে আমি গোসলখানা থেকে দ্রুত বের হয়ে আসি। বাহিরে যুবকের পিতা দাঁড়নো ছিল। আমি তার পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম যুবকের ঈমান-আমল সম্পর্কে? কেন এমন পরিণতি হলো তার? তিনি আমাকে বললেন, সে নামাজ পড়ত না। আমল সম্পর্কে ছিল সম্পূর্ণ গাফেল ও উদাসীন।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! যুবকটি ছিল গাফেল। আমলের প্রতি ছিল তার চরম উদাসীনতা। তাই সে নামাজ পড়ত না। আর তাই তার পরিণতি কেমন নিদারুণ হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ اعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يُحْيِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ
'আল্লাহর স্মরণ ও তার অবর্তীর্ণ সত্যের কল্যাণে মুমিনদের জন্য কি সময় হয়নি যে, তাদের অন্তর বিনম্র হবে এবং তারা তাদের মতো হবে না যাদের ইতিপূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল? অতঃপর বহুকাল অতিক্রান্ত হওয়ায় তাদের অন্তর শক্ত হয়ে গিয়েছে। তাদের অনেকেই অবাধ্য। জেনে রেখো! আল্লাহ জমিনকে মৃত্যুর পর জীবিত করেন। আমি তোমাদের জন্য নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পারো।'¹¹
আমি সে তিন যুবককে বললাম, তোমরা কি জানো? আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে কতবার নামাজের কথা বলেছেন? নব্বই এবং তারও অধিকবার নামাজের কথা বলেছেন। নিশ্চয়ই তোমরা অনুধাবন করতে পারছ নামাজের গুরুত্ব কত সীমাহীন। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম বান্দার যে আমলের হিসাব চাইবেন তা হলো নামাজ। নামাজের হিসাবে যে ঠিক ঠিক উত্তীর্ণ হতে পারবে তার অন্যান্য হিসাব সহজ হয়ে যাবে। তাই নামাজের প্রতি উদাসীন হয়ো না। গুরুত্বের সাথে মসজিদে জামাতের সাথে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের রিজিকের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে তিনি তোমাদের রিজিকের ব্যবস্থা করবেন। জীবিকার ব্যাপারে তোমাদের পেরেশানি দূর হয়ে যাবে।
এক যুবক আমাকে একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা শুনিয়েছে। যুবকটি বলল, আমার এক বন্ধু ছিল। আমি ও সে কখনো নামাজ পড়তাম না। নামাজের সময় আমরা খেল-তামাশায় মত্ত থাকতাম। বরং যারা নামাজ পড়ত আমরা তাদের নিয়ে বিদ্রূপ করতাম। একদিন রাতভর আমরা খেল-তামাশায় মত্ত থেকে সকালে যার যার বাড়ি এসে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। কিছুক্ষণ পর আমার বড় ভাই আমাকে তাড়াহুড়ো করে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলল। এবং বলল, আমার বন্ধুটি মারা গেছে। প্রথমে আমি তার কথা বিশ্বাস করিনি। ভেবেছি দুষ্টুমি করছে হয়তো। কেননা, কিছুক্ষণ পূর্বেই আমি ও সে একসঙ্গে ছিলাম। কিন্তু আমার ভাই অত্যন্ত জোরগলায় বলতে লাগল। আমি আমার বন্ধুর বাড়ির দিকে রওনা হই। পথে তার পিতার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলো। তিনি কাঁদতে কাঁদতে আমাকে তার মৃত্যুর সংবাদ দিলেন। ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি অব্যাহত ঘৃণাচর্চার কারণে আমার সে বন্ধুকে গোসল দেওয়া হয়নি। মুসলমানদের কবরে তাকে দাফন করা হয়নি। সে নামাজ পড়ত না। বরং যারা নামাজ পড়ত তাদেরকে ঠাট্টাবিদ্রুপ করত। তার কৃতকর্মের ফলস্বরূপ তাকে গোসল ও মুসলমানদের কবরে দাফন করা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তারপর তিনি বললেন, আমি কতবার তোমাদের দুজনকে পাপ ও অন্যায় কাজ ছেড়ে দিতে বলেছি। নামাজ পড়তে বলেছি। কিন্তু তোমরা কখনো আমার কথায় কর্ণপাত করোনি।
এ ঘটনা আমার জীবনকে দারুণ প্রভাবিত করেছে। আমি সেদিন উপলব্ধি করতে পারি, আমি আসলে জঘন্য অন্যায় ও ভুলের ওপর আছি। একদিন আমাকেও তার মতো মৃত্যুবরণ করতে হবে। প্রতিটি মানুষকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। চাই সে আকাশে থাকুক কিবা জমিনে। যেখানেই থাকুক মৃত্যু তাকে গ্রাস করবেই। এ অবশ্যম্ভাবী। সেদিনই আমার পিতা আমাকে সতর্ক করে বললেন, তুমি যদি নামাজ না-পড় তাহলে লোকেরা তোমাকেও মুসলমানদের কবরে দাফন করতে দেবে না। তাই তুমি ফিরে এসো সঠিক পথে। তিনি আমাকে নিয়মিত নামাজ আদায় করতে বললেন। মানুষের সাথে সদাচরণ করতে বললেন। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার প্রতি গুরুত্বারোপ করলেন। পার্থিব জীবনের অসারতার কথা তুলে ধরলেন আমার সামনে। তুলে ধরলেন মৃত্যু-পরবর্তী অসীম জীবনের কথা। যেখানে রয়েছে কঠিন কঠিন ঘাটি। রয়েছে বিভীষিকাময় জাহান্নাম। যা প্রস্তুত করা হয়েছে گنهگارদের জন্য। তাদের জন্য যারা নামাজ পড়ে না। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলে না। পিতার কথা আমার হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করল। আর যেহেতু আজ সকালেই আমার প্রিয় বন্ধু আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেছে এবং তার সাথে ঘটে গেছে হৃদয়বিদারক ঘটনা তাই আমার হৃদয় ছিল অত্যধিক আর্দ্র ও আবেগতাড়িত। এরপর আমার জীবনে পরিবর্তন আসে। আমি নিজেকে পরিবর্তনের প্রতি বিশেষ মনোযোগী হই। আমি অনুভব করি, হায়াতের অফুরন্ত সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু পরকালের জন্য সঞ্চয় করতে পারিনি কিছুই। আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি ছিলাম উদাসীন। সেদিন থেকেই আমি মসজিদে যেতে শুরু করি। অবশিষ্ট জীবন সরল ও সঠিক পথে চলার শপথ গ্রহণ করি।'
আল্লাহর শপথ! মুসলিম যুবকরা আজ বিচ্যুতি ও ভ্রষ্টতার চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করেছে। তাদের মাঝে নেই ইসলামি বিধি-নিষেধের ন্যূনতম দায়িত্ববোধ। প্রবৃত্তির অনুসরণ তাদের ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। বস্তুবাদ ও দুনিয়ার নেশায় আজ তারা অন্ধ। প্রতিটি পাড়া-মহল্লার মসজিদে মুসলিম যুবকদের উপস্থিতি সবচেয়ে কম। অথচ উম্মাহর ভাগ্য পরিবর্তনের নেতৃত্ব ছিল তাদেরই হাতে। উম্মাহর দুর্দশা ও অবনতির পেছনে প্রধানত দায়ী মুসলিম যুব ও তরুণ প্রজন্ম ইসলামের সরল-সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া। তারা যদি মনে-প্রাণে কামনা করে মুসলিম জাতি তার পুরনো গৌরব অর্জন করুক তাহলে সর্বপ্রথম তাদের নিজেদের পরিবর্তন করতে হবে। তারা যদি ধ্বংসের গর্ত থেকে উঠে আসে তবেই মুসলিম জাতি উঠে আসবে পতনের অতল গহ্বর থেকে।
মৃত ব্যক্তিদের গোসল দেন এমন ব্যক্তি একটি অতি আশ্চর্যজনক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এক যুবককে গোসল দেওয়ার জন্য আমি ভেতরে প্রবেশ করি। আমার সাথে ছিল আরো একজন। আমরা যখন মৃত ব্যক্তিকে গোসল দিচ্ছি তখন পুরো গোসলখানায় এক আশ্চর্য সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ে। অপূর্ব সুঘ্রাণে চারপাশ সুরভিত ও মোহিত হয়ে যায়। বর্ণনাকারী বলেন, আমি আমার সহকারীকে বললাম, তুমি কি সুঘ্রাণ পাচ্ছ? সে বলল, হ্যাঁ। বর্ণনাকারী বলেন, ইতিপূর্বে আমি কখনো এমন সুঘ্রাণ পাইনি। এবং তার মুখমণ্ডল অতি উজ্জ্বলতায় ফকফক করছিল। আমি অসংখ্য ব্যক্তিকে গোসল দিয়েছি কিন্তু এমন সুন্দর চেহারা কোনো মৃত ব্যক্তির দেখিনি। আমি অত্যন্ত আগ্রহ উদ্দীপনার সাথে যুবককে গোসল দিলাম। পরবর্তীতে আমি জানতে পারি, যুবকটি ছিল অত্যন্ত সৎ ও পরহেজগার। তাকওয়া ও খোদাভীতিতে তার অন্তর ছিল পরিপূর্ণ। সৎকাজের আদেশ করত, অসৎকাজ থেকে লোকদের বিরত রাখত। তার জীবন ছিল সততা ও উত্তম আদর্শে মোড়ানো।
আমরা তাকে গোসল, কাফন ও জানাজা শেষে কবরস্থানে নিয়ে গেলাম। আমি নিজেই যুবককে কবরস্থ করি। আল্লাহর কসম! আমি দেখি, কবরে রাখার পর তার লাশ কেমন নড়ে উঠল। অথচ কেউ তাকে স্পর্শ করেনি। আমি আশ্চর্য হয়ে আমার সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করলাম। তারাও এমনটি অনুভব করল। তার চেহারা আপনা থেকেই কেবলামুখি হয়ে গেল। আমি আশ্চর্য-হয়ে যুবকের মুখমণ্ডলের দিকে তাকালাম। দেখি সে হাসছে। অতি উজ্জ্বল তার চেহারার রঙ। যেন আকাশ থেকে পূর্ণিমার চাঁদ নেমে এসেছে কবরে। আমি ধারণা করলাম, সত্যিই সে মৃত্যুবরণ করেছে কি না। কিন্তু পরক্ষণেই আমার সন্দেহ দূর হয়ে গেল। কারণ, আমিই তো তাকে গোসল দিয়েছি আর আমি জানি সে ছিল একজন আদর্শবান যুবক। মসজিদের সাথে ছিল তার সুদৃঢ় সম্পর্ক। আনুগত্যের শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল তার জীবন। কখনো আল্লাহর অবাধ্যতা করেনি। আমরা যুবককে কবরস্থ করে ফিরে এলাম।'
এ তো আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার ঘোষিত বাণীর বাস্তব রূপ। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ
'যারা বলে আমাদের প্রভু আল্লাহ অতঃপর সত্যের ওপর অবিচল থাকে (মৃত্যুর সময়) তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না ও চিন্তিত হয়ো না। আর তোমাদের যে জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হতো তা শুনে নাও।' ¹²

টিকাঃ
৭ সুরা তহা: ১৩২
৮ এ হাদিসের মাধ্যমে নামাজের গুরুত্ব বর্ণনা করা উদ্দেশ্য। ঈমানের পর সর্বোত্তম ইবাদত হলো নামাজ। নামাজ পরিত্যাগকারীর ভয়াবহ পরিণাম ও ইসলামের ব্যাপারে তার ঈমানের দুর্বলতা বর্ণনা করতেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। যে মুসলমান নামাজ পড়বে না তার ঈমান পরিপূর্ণ নয়। এর দ্বারা সে কাফের হবে না। হ্যাঁ, কেউ যদি নামাজকে অস্বীকার করে তাহলে কাফের হয়ে যাবে।
৯ সুরা আনফাল: ৫০-৫১
১০ সুরা আলে ইমরান: ১১৭
১১ সুরা হাদিদ: ১৬-১৭
১২ সুরা হা মিম সিজদাহ: ৩০

📘 হে যুবক! ফিরে এসো রবের দিকে > 📄 জীবনের প্রকৃত মাকসাদ

📄 জীবনের প্রকৃত মাকসাদ


মুসলিম যুব ও তরুণ প্রজন্মের গন্তব্য কোথায়? কী তাদের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য? আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য দিয়ে মানুষকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন, কাঙ্ক্ষিত সে লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য রয়েছে কতিপয় নীতিমালা। আল্লাহ তায়ালা তার কোনো বান্দাকে ভ্রষ্টতার দিকে পরিচালিত করেন না। কোনো বান্দার ওপর তিনি জুলুম করেন না। তিনি মানুষদের সামনে উন্মোচন করে দিয়েছেন এক সরল-সঠিক পথ। যে পথের ডানে-বায়ে নেই কোনো বক্রতা। আল্লাহ তায়ালা মানুষের ওপর অনেক বড় অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের জন্য তৈরি করেছেন এক সরল-সঠিক পথ। মানুষের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য হলো, সে পথে চলা। কোনো ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত বিচ্যুত হবে না যতক্ষণ সে আল্লাহর দেওয়া সরল-সঠিক পথের ওপর অটল ও অবিচল থাকবে। কিন্তু যখনই আল্লাহ তায়ালার মনোনিত সরল-সঠিক পথ ছেড়ে শয়তানের তৈরি অবাধ্যতা, নাফরমানি ও বক্রতার পথ অবলম্বন করবে তখনই সে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য থেকে ছিটকে পড়বে। তাই প্রত্যেককে ইসলামের সরল-সঠিক পথে অটল ও সুদৃঢ় থাকার জন্য আল্লাহ তায়ালার নিকট বিশেষ প্রার্থনা করতে হবে। কেননা, শয়তান চারদিকে ভ্রষ্টতা ও বক্রতার অসংখ্য পথ তৈরি করে রেখেছে। যে-কোনো মূল্যে শয়তান মানুষকে সিরাতে মুস্তাকিম থেকে বিচ্যুত করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে।
আমি এক যুবককে চিনি। তার যাবতীয় বিষয়াদি সম্পর্কে আমি অবগত। শৈশব থেকেই ছিল সে অত্যন্ত ভদ্র ও নম্র প্রকৃতির মানুষ। ছিল আমলের প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী। মসজিদের সাথে ছিল তার গভীর সম্পর্ক। আমার বিশ্বাস আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন তাকে আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন। শৈশব কৈশোর পেরিয়ে পরিণত বয়সে পৌঁছার পর মসজিদের সাথে সম্পর্ক আরো দ্বিগুণ হলো। পড়ালেখা সমাপ্ত করে সে চাকরি গ্রহণের বয়সে উপনীত হলো। তার চাকরি গ্রহণের একটি মনোমুগ্ধকর ঘটনা রয়েছে। সে সৈনিক পদে চাকরি গ্রহণের ইচ্ছা করল। যখন সে চাকরির জন্য দরখাস্ত দিতে গেল তাকে ছবি তুলতে বলা হলো। তখন তার মুখমণ্ডলে ছিল সুন্নতি দাড়ি। আর দাড়িতে তাকে খুবই সুন্দর দেখাত। তার চেহারার সৌন্দর্যকে দ্বিগুণ করে দিয়েছে দাড়ি। তখন চাকরিদাতা তাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি যদি দাড়ি মুখে ছবি তুলতে চাও তাহলে চাকরির শেষ পর্যন্ত তোমাকে দাড়ি রাখতে হবে। কখনো কাটতে পারবে না। কেননা, এখানে এটাই সিস্টেম। তাই তুমি ভেবেচিন্তে দেখো, দাড়ি কাটবে না রাখবে?' এ কথা শোনে যুবকটি বলল, মৃত্যু পর্যন্ত আমি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের মাঝে কোনো প্রকার পরিবর্তন করব না। তারপর দাড়ি রেখেই সে ছবি তুলল এবং সৈনিকের চাকরি গ্রহণ করল। ইসলামের সকল অনুশাসন মেনেই সে চাকরি করতে লাগল। তার মাঝে ছিল দাওয়াতের স্পৃহা। দিন-রাত সে যুবকদের সৎপথের দাওয়াত দিতে লাগল। যে কেউ তার নিকট কোনো কাজ নিয়ে এলে কোনো প্রকার বিরক্তি ও টালবাহানা ছাড়াই সে তাদের কাজ করে দিত। মানুষের উপকারের প্রতি সে ছিল আন্তরিক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, এক ব্যক্তি লোকদের সাথে মিশে এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করে, তাদের কষ্টকে লাঘব করে এবং এক ব্যক্তি লোকদের সাথে মিশে না, তাদের কষ্টকে লাঘব করে না, তাদের মধ্যে কে উত্তম? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে লোকদের সাথে মিশে এবং তাদের কষ্টকে লাঘব করে।
যুবকটি পণ করেছিল, মৃত্যু পর্যন্ত সে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের মাঝে কোনো প্রকার পরিবর্তন করবে না। আমৃত্যু সে তার মুখে দাড়ি রাখবে। আল্লাহু আকবার! প্রকৃত ঘটনা তাই ছিল, যা সে বলেছিল। একদিন সে অনেক অসুস্থ হয়ে পড়ল। তার পেটে দেখা দিলো কঠিন পীড়া। যা ছিল অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। সুস্থতার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হলো। কিছুদিন চিকিৎসা গ্রহণ করার পর মারা যায়। সে যখন মারা যায় তখন তার মুখে জ্বলজ্বল করছিল সুন্নতি দাড়ি, তার চোখে-মুখে যেন নুর চমকাচ্ছে। হাসপাতালের ডাক্তারগণ বলেন, আমরা যখন তাকে চিকিৎসা দিচ্ছিলাম তখন বারবার সে আল্লাহর নিকট এ প্রার্থনা করছিল, 'হে আল্লাহ! তুমি আমাকে দ্বীনের ওপর অটল ও অবিচল রাখো। সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর সুদৃঢ় রাখো। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের ওপর স্থির রাখো।'
এ ঘটনা ওইসব যুবকদের জন্য শিক্ষা যারা বলে নিজেকে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এ ঘটনা ওইসব যুবকদের জন্য শিক্ষা যারা বলে ইসলামের অনুশাসন মেনে চাকরি করা কঠিন। এ ঘটনা ওইসব যুবকদের জন্য শিক্ষা যারা বলে মুখে দাড়ি রেখে মর্যাদাকর পদে আসীন হওয়া যায় না। এ ঘটনা ওইসব যুবকদের জন্য শিক্ষা যারা বলে ধর্ম পালন করে দুনিয়া উপার্জন করা অত্যন্ত কঠিন। আমি বলি, মুসলিম যুবকদের জন্য কিছুই অসম্ভব ও কঠিন নয়, যদি তারা নিজেদের পরিবর্তনে আগ্রহী হয়। প্রথমে নিজেকে পরিবর্তনের সদিচ্ছা গ্রহণ করতে হবে। ইসলামের অনুশাসন পালনে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হতে হবে। আল্লাহ তায়ালা ততক্ষণ পর্যন্ত কারো অবস্থার পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না সে নিজেকে পরিবর্তনের ইচ্ছে করে। সুতরাং হে মুসলিম যুব ও তরুণ প্রজন্ম! ফিরে এসো আল্লাহর নির্দেশিত পথে। ফিরে এসো সিরাতের মুস্তাকিমের ওপর। নিজেদের পরিবর্তনের অঙ্গীকার করো। নিজেদের যাপিত জীবন ও চরিত্রের সংশোধন করো। দুনিয়াকে আখেরাতের ওপর প্রাধান্য দিয়ো না। দুনিয়াতে ততটুকুই গ্রহণ করো যতটুকু তোমার প্রয়োজন। আর পরকালের জন্য ততটুকু গ্রহণ করো যতদিন তুমি সেখানে থাকবে। আর এ কথা তো সর্বাধিক সত্য যে, পরকাল এমন এক জীবন যার কোনো সমাপ্তি নেই। যার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। সুতরাং অনন্তকালের জন্য যথোপযুক্ত পাথেয় গ্রহণ করো। মনে রেখো, দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী আর আখেরাত চিরস্থায়ী।

📘 হে যুবক! ফিরে এসো রবের দিকে > 📄 প্রয়োজন আত্মজিজ্ঞাসা

📄 প্রয়োজন আত্মজিজ্ঞাসা


মুসলিম যুব ও তরুণ প্রজন্মের আজ প্রয়োজন আত্মজিজ্ঞাসা। বারবার নিজেকে জিজ্ঞেস করা নিজের ঈমান সম্পর্কে, সালাত সম্পর্কে। বারবার নিজেকে বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। নিজেই নিজের কাছে জানতে চাইবে ঈমান-আমল সম্পর্কে। আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যমে হৃদয়ে গভীর অনুশোচনা জাগ্রত হয়। যার ফলে আল্লাহর অবাধ্যতা ও گناه থেকে ফিরে আসা অত্যন্ত সহজ হয়।
হে যুবক! আমি তোমাকে কয়েকটি প্রশ্ন করছি। তুমি সেসব প্রশ্নের সত্য ও ঠিক ঠিক জবাব দাও। তুমি যদি সত্য বলো তাহলে জেনে রাখো, সত্য তোমাকে মুক্তি দেবে। আর যদি মিথ্যা বলো তাহলে মিথ্যা তোমার ওপরই ডেকে আনবে ঘোরতর শান্তি। সুতরাং আমার করা প্রশ্নসমূহের ঠিক ঠিক জবাব দাও। তুমি কি নামাজ পড়? তুমি কি নিয়মিত দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়? নামাজের মাঝে তোমার অন্তরের অবস্থা কেমন হয়? তুমি কি আজ ফজরের নামাজ মসজিদে জামাতের সাথে পড়েছ নাকি একাকী? নাকি তুমি সেসব হতভাগা লোকদের অন্তর্ভুক্ত যারা আল্লাহকে রুকু করে না, সিজদা করে না? হে যুবক! তোমার বয়স কত? বিশ? ত্রিশ? নাকি চল্লিশ? আমি তোমাকে তোমার বিগত বিশ, ত্রিশ কিংবা চল্লিশ বছরের নামাজের হিসাব জিজ্ঞেস করছি না। আমি জানতে চাচ্ছি, তোমার চলতি বছরের বিগত মাসগুলোর কথা। এ দিনগুলোতে তুমি কত ওয়াক্ত নামাজ পড়েছ? কত ওয়াক্ত নামাজ ছেড়েছ? আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করছি, তুমি সত্য বলো কত ওয়াক্ত নামাজ তুমি মুসলমানদের সাথে মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করেছ? হে যুবক! তুমি বলো, মসজিদের মিনার থেকে কতবার তোমাকে নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়েছে এবং তুমি কতবার সে ডাকে সাড়া দিয়েছ? হে যুবক! মসজিদের মিনার থেকে কতবার ভেসে এসেছে এ কথা, ঘুমের চেয়ে নামাজ ভালো? তুমি কি আজান শুনে ঘুম থেকে উঠে মসজিদের দিকে ছুটে গিয়েছ নাকি আলস্যের চাদরে মুড়িয়ে ছিলে? হে যুবক! তুমি বলো তুমি কি সত্যিই নামাজের প্রতি যত্নবান?
হে মুসলিম যুবক! এসব প্রশ্ন তুমি নিজেকে করো। জানতে চাও এসব প্রশ্নের উত্তর। অতঃপর শোনো, তোমার হৃদয়ের আর্তনাদ। দেখো, তোমার অবস্থা কোথায়? তুমি কি সরল সঠিক পথে আছ নাকি শয়তান এবং তোমার কুপ্রবৃত্তি তোমাকে বিচ্যুত করে ফেলেছে সিরাতে মুসতাকিম থেকে? হে যুবক! নামাজের ব্যাপারে সর্বাধিক যত্নবান হও। নামাজের প্রতি আন্তরিক হও। মসজিদের মিনার থেকে যখন আল্লাহর নামের আহ্বান ভেসে আসে তখন সে আহ্বানে সাড়া দাও। ধ্বংস ও পতনের গর্ত থেকে বের হয়ে আসার জন্য সর্বপ্রথম করণীয় হলো নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া। নামাজ মুমিনের জান্নাত ও জাহান্নামের পথ তৈরি করবে। আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট ভাষায় পবিত্র কুরআনে জান্নাত ও জাহান্নামে গমনের ভেদ উন্মোচন করে দিয়েছেন।
مَا سَلَكَكُمْ فِي سَقَرَ قَالُوا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ 'কোন কাজ তোমাদের জাহান্নামে নিয়ে এলো? তখন তারা বলবে, আমরা নামাজ পড়তাম না।' ¹⁰
সুতরাং প্রত্যেক যুবকের অপরিহার্য কর্তব্য হলো, নিজেকে নামাজের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা। বিবেকের আদালতে দাঁড় করানো নিজেকে। চাই সে বড় হোক কিবা ছোট হোক, চাই বৃদ্ধ হোক কিংবা যুবক। প্রত্যেকের হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে দেখো। কারো মন বলছে, সে পঞ্চাশ বছর নামাজ পড়ে না। কারো মন বলছে, সে চল্লিশ বছর নামাজ পড়ে না। কারো মন বলছে, সে ত্রিশ বছরে একদিনও মসজিদে যায়নি। একবারও দাঁড়ায়নি আল্লাহ তায়ালার সম্মুখে। হায়! কী করুণ পরিণতি আজ মুসলিম উম্মাহর সদস্যদের। ধ্বংস ও পতনের কোন অতল গহ্বরে তারা নিমজ্জিত হয়ে আছে।
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়ার তাওফিক দিন। মসজিদের সাথে আমাদের হৃদয়ের গভীর সম্পর্ক তৈরি করে দিন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের আপনার সেসব প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে দিন যারা নামাজের প্রতি যত্নবান। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের বর্তমান অবস্থা পরিবর্তন করে দিন। আপনি আমাদের সিরাতে মুসতাকিমের ওপর অটল ও অবিচল রাখুন।

টিকাঃ
১৩ সুরা মুদ্দাছছির: ৪২

📘 হে যুবক! ফিরে এসো রবের দিকে > 📄 নামাজের প্রতি যত্নবান না হওয়ার কারণ

📄 নামাজের প্রতি যত্নবান না হওয়ার কারণ


নামাজের প্রতি যত্নবান না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, অসৎ ও মন্দ লোকদের সংস্পর্শ। যুবকদের চরিত্র ও মানস গঠনে সংস্পর্শ ও সান্নিধ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভালো ব্যক্তিদের সংস্পর্শে মানুষ ভালো ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী হয়। মন্দ ও খারাপ ব্যক্তিদের সংস্পর্শে মানুষ নষ্ট ও দুশ্চরিত্রের অধিকারী হয়। বর্তমান মুসলিম যুব ও তরুণ প্রজন্মের নষ্ট ও চরিত্রহীন হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো, অসৎ ও মন্দ লোকদের সংস্পর্শ। সংস্পর্শ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে সৎ ব্যক্তিদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে আদেশ করেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনদের সৎ বন্ধু নির্বাচন করতে বলেছেন। মন্দ ও অসৎ বন্ধুদের থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। সংস্পর্শের রয়েছে আশ্চর্য প্রভাব। সৎ ব্যক্তির সংস্পর্শে খারাপ মানুষ ভালো হয়ে যায়। পক্ষান্তরে অসৎ ব্যক্তির সংস্পর্শে ভালো মানুষ খারাপ হয়ে যায়। বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক রচিত হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। মুমিনের সকল কাজের লক্ষ্য হবে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি। কারো সাথে সম্পর্ক তৈরি হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আবার সম্পর্ক ছিন্ন হবে আল্লাহর জন্য। সৎ ও নামাজি ব্যক্তির সংস্পর্শে যে নামাজ পড়ে না সেও নামাজের প্রতি যত্নবান হবে। আল্লাহর বিধি-বিধান পালনের প্রতি সচেষ্ট হবে। আজ কোন জিনিস আমাদের নামাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে। মুমিন কেন নামাজের প্রতি যত্নবান হচ্ছে না? এর কারণ হলো, অসৎ ও মন্দ লোকদের সংস্পর্শ। আমরা তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করছি যারা নামাজ পড়ে না। যারা আল্লাহর আদেশ পালন করে না। নিষেধ থেকে বেঁচে থাকে না। যাদের অন্তরে নেই আল্লাহ ও তার রাসুলের ভালোবাসা। ইসলামের বিধি-বিধান পালনের প্রতি যারা চূড়ান্ত উদাসীন। আমরা বন্ধু বানাচ্ছি তাদের যাদের অন্তর মৃত। যারা প্রবৃত্তির পূজা করছে।
হে মুসলিম যুবক! আমি তোমাদের সতর্ক করছি যেন তোমরা অসৎ সংস্পর্শ ত্যাগ করো। যেন তোমরা মন্দ লোকদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করো। তুমি যার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করছ তার প্রভাব তোমার ওপর অবশ্যই পড়বে। এ কথা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। অনেক ব্যক্তিকে বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত ভালো মনে হয়। তার বাহ্যত চালচলন চলাফেরা দেখে মনে হয় অনেক সুন্দর। তার স্বভাব-চরিত্রকে ধারণা করা হয় নিষ্কলুশ। কিন্তু প্রকৃতার্থে তারা ভালো মানুষ নয়। এক ব্যক্তি আমাকে একটি ঘটনা শুনিয়েছেন। তিনি ছিলেন একটি কোম্পানির মালিক। তিনি বলেন, আমার একজন কর্মচারী রয়েছে যার চলাফেরা অত্যন্ত মার্জিত। তার স্বভাব-চরিত্র উন্নত। কিন্তু তার একটি সমস্যা রয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম কী সমস্যা? তিনি বললেন, সে মসজিদে যায় না এবং নামাজ পড়ে না। আমি বললাম, এ তো খুব খারাপ একটি গুণ। এটি এমন একটি মন্দ অভ্যাস যার কারণে সে আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তিদের নাম থেকে তার নাম বাদ পড়ে যায়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সে-সমস্ত লোকদের প্রকৃত রিজাল তথা ব্যক্তি বলে মনোনীত করেছেন যারা নামাজ আদায় করে। কিছুক্ষণ পর সে কর্মচারী শরীরচর্চা করে জিম থেকে বেরিয়েছে। মালিক আমাকে ইশারা করে তাকে দেখালেন। আল্লাহ তায়ালা এমন লোকদের লক্ষ্য করেই পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন,
وَإِذَا رَأَيْتَهُمْ تُعْجِبُكَ أَجْسَامُهُمْ وَإِن يَقُولُوا تَسْمَعْ لِقَوْلِهِمْ كَأَنَّهُمْ خُشُبُ مُسَنَّدَةٌ يَحْسَبُونَ كُلَّ صَيْحَةٍ عَلَيْهِمْ هُمُ الْعَدُوُّ فَاحْذَرْهُمْ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ أَنَّى يُؤْفَكُونَ
'তুমি যখন তাদের দেখো তাদের দেহ তোমাকে মুগ্ধ করে এবং তারা যদি কথা বলে তুমি তাদের কথা শোনো। তারা দেয়ালে ঠেকানো কাঠের মতো। তারা প্রতিটি আওয়াজকে তাদের বিরুদ্ধে মনে করে। তারাই শত্রু; অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক হও। আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন, তারা কীভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছে।' ¹⁴
আমি তাকে সালাম দিয়ে বললাম, হে যুবক! তোমার মালিক আমার নিকট তোমার অনেক প্রশংসা করেছে। এ শুনে সে বেশ খুশি হলো। তার চেহারায় আনন্দের আভা ছড়িয়ে পড়ল। অতঃপর আমি বললাম, তবে একটি দোষের কথা বলেছে। এ কথা শুনে সে ভারি চমকে উঠল। বলল, কী সে দোষ? আপনি বলুন আমি তা সংশোধন করে নেব। তখন আমি তার অবস্থা দেখে আশ্চর্য হলাম। মালিকের সামনে মাত্র একটি দোষ সংশোধন করার জন্য সে কত পাগলপ্রায় হয়ে উঠল। তার মধ্যে কত সচেতনতা পরিলক্ষিত হলো। কিন্তু প্রকৃত মালিক যিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন, প্রতিনিয়ত যিনি তার খাদ্য- পানীর ব্যবস্থা করছেন সে মালিকের সামনে তার বহু দোষ রয়েছে, সেগুলো সংশোধনের প্রতি তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। আমি তাকে বললাম, তুমি নাকি মসজিদে যাও না এবং নামাজ পড় না? সে বলল, হে শাইখ! আপনি সত্য বলেছেন। আমি মসজিদে যাই না এবং নামাজ পড়ি না। এটি আমার ব্যর্থতা। আমি বললাম, না, এটি তোমার ব্যর্থতা নয়। ব্যর্থতা ও ক্ষতির মাঝে পার্থক্য রয়েছে। তুমি স্পষ্ট ক্ষতি ও ধ্বংসের মাঝে রয়েছ। ব্যর্থতা তো সেটি যে, আমি তাকবিরে তাহরিমা পেলাম না। জামাতের সাথে ফজরের নামাজ পড়তে পারলাম না, তারপর একাকী পড়ে নিলাম। ব্যর্থতা হলো সেটি যে, কোনো কারণে সময়মতো নামাজ পড়তে পারলাম না, পরে তার কাজা আদায় করে নিলাম। এর নাম ব্যর্থতা। কিন্তু তুমি তো মসজিদেই যাও না, নামাজই পড় না। এর অর্থ তো ব্যর্থতা নয়। এ হলো ধ্বংস। তুমি স্পষ্ট ধ্বংসের মাঝে আছ। জেনে রেখো! তোমার ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী।
বর্তমানে অধিকাংশ মানুষের অবস্থাই এমন। তাদের ভালো মনে করা হচ্ছে কিন্তু তাদের প্রকৃত অবস্থা হলো এই যুবকের মতো। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ * وَإِنَّهُمْ لَيَصُدُّونَهُمْ عَنِ السَّبِيلِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُم مُّهْتَدُونَ
'করুণাময় আল্লাহর স্মরণ থেকে যে বিরত থাকে তার জন্য আমি শয়তানকে নিয়োজিত করি। অতঃপর সেই হয় তার সহচর। শয়তানেরাই মানুষকে সৎপথ থেকে বিরত রাখে; আর মানুষেরা মনে করে যে, তারা সৎপথে আছে।'¹⁵
মসজিদে যায় না, নামাজ পড়ে না, তবুও মানুষ তাকে ভালো মনে করছে। এ কেমন গুণ যে তাকে ভালো বলা হবে। অতঃপর তাকে বললাম, হে যুবক! তুমি ধ্বংসের মধ্যে আছ। তুমি মসজিদে যাও, নামাজ পড়ো। সৎ লোকদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করো। অসৎ লোকদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করো। তুমি তোমার নিজেকে জিজ্ঞেস করো, তুমি কোন পথে আছ। তুমি কি কল্যাণের পথে আছ নাকি ক্ষতি ও ধ্বংসের মাঝে আছ? সে আমার থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। আল্লাহু আকবার! পরবর্তী নামাজের জন্য মুয়াজ্জিন আজান দিলেন। নামাজিগণ মসজিদের দিকে ছুটে আসছেন। আমি দেখি, সে যুবক যাকে কিছুক্ষণ পূর্বে নামাজের প্রতি আহ্বান করেছি, ধ্বংসের পথ থেকে কল্যাণের পথে ফিরে আসতে বলেছি, সে সুন্দর ও শুভ্র পোশাক পরিধান করে মসজিদের দিকে ছুটে আসছে। প্রকৃত জ্ঞানী তো তারাই, যাদের সতর্ক করা হলে তারা নিজেদের সংশোধনে ব্রতী হয়।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! আমরা কেউ জানি না, কখন আমাদের মৃত্যু হবে। কখন দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাবো আখেরাতে। জানি না, কখন জীবনে দুয়ারে এসে দাঁড়াবে মৃত্যুর ফেরেশতা। একদিন আকস্মিক মৃত্যু এসে কড়া নাড়বে দুয়ারে। হে নামাজের প্রতি উদাসীন ব্যক্তি! তুমি কি চাও, নামাজের প্রতি উদাসীন অবস্থায় তোমার মৃত্যু হোক? তুমি কি চাও, আল্লাহর আদেশ-নিষেধের প্রতি গাফেল অবস্থায় তোমার জীবনের অবসান হোক? না, কেউই চায় না এমতাবস্থায় তার মৃত্যু হোক। সুতরাং করণীয় হলো অবস্থার পরিবর্তন করা। নিজেকে সংশোধন করা। নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া। এক ব্যক্তি যে নামাজের প্রতি উদাসীন ছিল, তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তুমি কি চাও, এমতাবস্থায় তোমার মৃত্যু হোক? সে বলল, না। তারপর তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তুকি কি চাও তোমার এ অবস্থার পরিবর্তন হোক তারপর তোমার মৃত্যু হোক? সে বলল, এখনো আমার মন তৈরি হয়নি। তারপর জিজ্ঞেস করা হলো, তুমি কি জানো যে, এমতাবস্থায় তোমার মৃত্যু আসবে না? সে বলল, না। আল্লাহর শপথ! কোনো জ্ঞানী চাইবে না যে, এমতাবস্থায় তার মৃত্যু হোক। সুতরাং তুমি তোমার বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন করো। নামাজের প্রতি যত্নবান হও। উপদেশ গ্রহণ করো এবং সে অনুযায়ী আমল করো। উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। যারা উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাদের সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেছেন,
فَمَا لَهُمْ عَنِ التَّذْكِرَةِ مُعْرِضِينَ * كَأَنَّهُمْ حُمُرٌ مُّسْتَنفِرَةٌ . فَرَّتْ مِن قَسْوَرَةٍ 'তাদের কী হয়েছে যে, তারা উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়? যেন তারা ভয় পেয়ে পলায়নকারী গাধা। যারা কোনো সিংহের ভয়ে পালিয়ে এসেছে।' ¹⁶
এর থেকে উত্তরণ ও পরিত্রাণের উপায় হলো, বেশি বেশি মৃত্যুকে স্মরণ করা। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ألا إني نهيتكم عن زيارة القبور فزوروها فإنها تذكركم الآخرة 'জেনো! আমি তোমাদের কবর জিয়ারত থেকে নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু এখন তোমরা কবর জিয়ারত করো। কেননা, কবর জিয়ারত তোমাদের আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেবে।'
আজ মানুষের গাফলত ও উদাসীনতার অন্যতম কারণ হলো, মৃত্যুকে ভুলে যাওয়া। মানুষ মৃত্যুর কথা ভুলে গেছে। জেনে রাখো! প্রত্যেককেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। প্রত্যেকের জন্যই অপেক্ষা করছে মৃত্যু। আকস্মিক একদিন মৃত্যু এসে দুয়ারে হাজির হবে। যখন মৃত্যু চলে আসবে তখন যতই চিৎকার করে আল্লাহকে ডাকা হোক না কেন তিনি তখন সাড়া দেবেন না। তাই মৃত্যুর ফেরেশতা আসার পূর্বেই তোমরা তোমাদের রবের দিকে ফিরে এসো। নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করো। আর অবস্থার পরিবর্তনের জন্য অন্যতম মাধ্যম হলো, মৃত্যুর কথা স্মরণ করা। মৃত্যুর কথা তখনই বেশি স্মরণ হবে যখন কবর জিয়ারত করবে। মৃত ব্যক্তির কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়াবে। তখন হৃদয়ে জাগ্রত হবে এ কথা, একদিন যে ব্যক্তি দুনিয়াতে ছিল আজ সে অন্ধকার কবরে। তার ন্যায় একদিন আমাকেও চলে যেতে হবে। হে যুবক! আজ তুমি অন্যের কবর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো, একদিন মানুষ তোমার কবর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার পূর্বে।
অসুস্থ ব্যক্তিদের দেখতে যাও। দেখো, তাদের কোন কোন নেয়ামত ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। দেখো, তাদের কারো চোখ নেই। কারো পা নেই। কেউ শুনতে পায় না। তারপর নিজের দিকে তাকাও। আল্লাহ তায়ালার অশেষ কৃতজ্ঞতা আদায় করো।
এক ছিল কুলি। বাজারে লোকদের ভারী ভারী বস্তু মাথায় বহন করে নিয়ে যেত। বিনিময়ে তাদের থেকে কিছু অর্থকড়ি পেত; তা দিয়ে তার সংসার চলত। সে মসজিদে যেত না। নামাজ পড়ত না। একদিন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তুমি কেন নামাজ পড় না? সে বলল, আমি আমার মন অনুযায়ী চলি। আমার নামাজ পড়তে ইচ্ছে করে না তাই নামাজ পড়ি না। এই ছিল তার ঔদ্ধত্যপূর্ণ জবাব।
একদিনের ঘটনা। খুব ভারী এক বস্তু মাথায় নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। হঠাৎ সে পা পিছলে পড়ে যায়। তৎক্ষণাৎ তার একটি পা ভেঙে যায়। তারপর দীর্ঘদিন অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকে। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তোমার এখন কী করতে ইচ্ছে করে? সে বলল, আমার নামাজ পড়তে ইচ্ছে করে। মুয়াজ্জিন আজান দিলে আমার মসজিদে যেতে ইচ্ছে করে। সে যখন সুস্থ ছিল তখন নামাজ পড়েনি। আজ যখন অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে তখন তার নামাজ পড়তে ইচ্ছে করছে। তখন সুযোগ ছিল কিন্তু নামাজ পড়েনি। মসজিদে যায়নি। আজ ইচ্ছে করলেও সে মসজিদে যেতে পারছে না। সুতরাং হে যুবক! সময় থাকতেই নিজেকে পরিবর্তন করো। নামাজের প্রতি যত্নবান হও। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার পূর্বেই সময়ের সৎ ব্যবহার করো। মৃত্যু আসার পূর্বেই মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণ করো।

টিকাঃ
১৪ সুরা মুনাফিকুন: ৪
১৫ সুরা যুখরুফ: ৩৬
১৬ সুরা মুদ্দাছছির: ৪৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00