📄 তরুণ প্রজন্মকে ভ্রষ্টতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে
উম্মাহর অবস্থা পরিবর্তনে মুসলিম যুবকদের অজ্ঞতা ও ভ্রষ্টতার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আল্লাহর নাফরমানি ও অবাধ্যতা থেকে ফিরে আসতে হবে সঠিক পথে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার রজ্জুকে আঁকড়ে ধরতে হবে সুদৃঢ়ভাবে। মুসলিম তরুণ প্রজন্মের নিজেদের পরিবর্তনের সকল উপায় তাদের নিকটই রয়েছে। তারা যদি আন্তরিকভাবে চায় তবেই তারা সরল ও সঠিক পথে ফিরে আসবে।
আজ মুসলিম তরুণ প্রজন্মের অবস্থা খুবই মন্দ। তাদের চারিত্রিক অবনতি ঘটেছে অত্যন্ত করুণভাবে। তাদের চলনে-বলনে নেই ইসলামের ন্যূনতম নিদর্শন। বাহ্যিকভাবে তাদের সুখী দেখালেও ভেতরে তারা যাপন করছে অতি কষ্টের জীবন। তাদের যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কেমন আছে? তাহলে জবাবে তারা বলে, সুখে ও আনন্দে আছে। কিন্তু বাস্তবে তারা সুখে নেই। তাদের পার্থিব জীবনকে ঘিরে রেখেছে কঠিন যন্ত্রণা।
আমি আমার নিজ অভিজ্ঞতা থেকে একটি ঘটনা বলছি। একবার আমি জরুরি প্রয়োজনে রিয়াদে যাচ্ছিলাম। বিমানে আমার এক পূর্ব-পরিচিত বন্ধুর সাথে দেখা। একসময় আমাদের মাঝে খুবই আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তারপর জীবন ও জীবিকার ব্যস্ততায় পরস্পরে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। দীর্ঘ দশ বছর আমাদের সাক্ষাৎ হয়নি। সেদিন বিমানে তার সাথে আমার আচমকা সাক্ষাৎ ঘটে। দীর্ঘ বিরতির পর আকস্মিক এ সাক্ষাতে আমরা উভয়ে যারপরনাই আনন্দিত হয়েছি। উষ্ণ আলিঙ্গনে আমরা জড়িয়ে ধরি একে অপরকে। বিমানে আমরা পাশাপাশি বসি। নিজেদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দীর্ঘ কথা হয়। প্রথম যখন তার সাথে দেখা হয়, আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, কেমন আছে? সে অভ্যাস অনুযায়ী জটপট উত্তর দিলো, খুবই ভালো আছে এবং পরিবার নিয়ে সুখে শান্তি আছে। ইতোমধ্যে বিয়েও করেছে। একটি ফুটফুটে পুত্রসন্তানও জন্ম নিয়েছে তাদের সংসারে। তার জীবনের সুখময় ঘটনাগুলো শোনে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হচ্ছি। কিন্তু এ সবকিছুই ছিল মিথ্যা। মিষ্টি কথার আড়ালে লুকিয়ে ছিল নীল যন্ত্রণা। সুন্দর হাসির পেছনে লুকিয়ে আছে দীঘল দুঃখের সাতকাহন। বাস্তবিক অর্থে সে সুখী ছিল না। তার জীবনে কোনো প্রশান্তি ও স্থিরতা ছিল না। তার পরিবার আছে, স্ত্রী সন্তান আছে কিন্তু সুখ নেই। কথায় কথায় যখন আমরা জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করছি তখন সে তার জীবনের প্রকৃত অবস্থা আর লুকিয়ে রাখেনি আমার নিকট। আর যেহেতু আমি তার বাল্যবন্ধু তাই অন্য সবার মতো আমাকে শেষ পর্যন্ত ধোঁকা দেয়নি।
সে বলতে লাগল তার জীবনের দীর্ঘ কাহিনি। আমি দেখি তার জীবন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নাফরমানি ও অবাধ্যতায় পূর্ণ। গোনাহ ও পাপাচারের কাহিনিতে ভরপুর। সে বলল, 'আমি আজ এক বছর আমার পরিবার থেকে দূরে। দীর্ঘ এ সময় আমার স্ত্রী সন্তানের সাথে কোনো প্রকার দেখাসাক্ষাৎ নেই। আমাদের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়। ঝগড়া করে আমার স্ত্রী একদিন তার পিতৃগৃহে চলে যায়। আমার সংসার যেন একটি জাহান্নাম। যেখানে সর্বদা অশান্তির আগুন জ্বলছে। প্রকৃতার্থে এ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার ওপর শান্তি। আমি বহু অন্যায় ও পাপাচারে লিপ্ত হয়েছি। আমার ব্যক্তিগত জীবনে নেই ইসলামের অনুশাসন। আল্লাহর আদেশ- নিষেধের পরোয়া করি না। তার আনুগত্য করি না। এর মধ্যে একটি ঘটনা আমার জীবনে দারুন প্রভাব ফেলেছে। একবার আমি জরুরি ভ্রমণে দেশের বাহিরে যাই। এক সপ্তাহের একটি ব্যাবসায়িক ভ্রমণ ছিল।
ঘটনাক্রমে সেখানে একটি খারাপ মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়। ক্রমান্বয়ে সে পরিচয় অধিক ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। শয়তান আমাকে প্ররোচনা দিতে থাকে। তাছাড়া আমার জীবনে তো ইসলামের বিধি-নিষেধের কোনো প্রভাব ছিল না। একরাতে আমি সে মেয়েটিকে নিয়ে হোটেলে ওঠি। অথচ আমি বিবাহিত। আমার সুন্দরী স্ত্রী আছে। তথাপিও আমি তার পেছনে লেলিয়ে পড়ি। আমি যখন আমার ও মেয়েটির শরীর থেকে সমস্ত কাপড় খুলে ফেলি তখন মসজিদের মিনার থেকে আজান ভেসে আসে। আমি তখন দেখি, আজান ও আল্লাহর নামের অপূর্ব ধ্বনি মেয়েটির মধ্যে এক আশ্চর্য পরিবর্তন সৃষ্টি করে। সে দ্রুত নিজেকে আমার বাধন থেকে মুক্ত করে নেয়। কাপড় পরিধান করে বাথরুমে চলে যায়। তারপর অতি উত্তমরূপে সে অজু করে। আজান শেষ হলে রুমে এসে নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। এবং আল্লাহর নিকট তার কৃত পাপের জন্য কান্নাকাটি করতে থাকে। আমি আশ্চর্য হয়ে তার অবস্থা প্রত্যক্ষ করছি। কিন্তু তার এমন বিস্ময়কর পরিবর্তন দেখেও আমার মাঝে কোনো প্রকার পরিবর্তন আসেনি। আমার মন পূর্বের মতোই কদর্যতায় ভরপুর ছিল। আমি মেয়েটির সাথে আর কোনো কথা না বলে হোটেল থেকে বের হয়ে চলে আসি। আর ভাবতে থাকি, আমার নোংরা জীবন সম্পর্কে। আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানি করতে করতে আমি কোন পর্যায়ে চলে গেছি যে, আজানের ধ্বনি একজন বেশ্যা মেয়ের মাঝে পরিবর্তন এনেছে কিন্তু আমার হৃদয়ে কোনো প্রকার ভাবান্তর সৃষ্টি করেনি। আমি বুঝতে পারি, আমার দীর্ঘ জীবনের পাপ আমাকে নষ্ট ও ভ্রষ্টতার চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। আমি আর কতকাল এ অবস্থায় অবিচল থাকব? আমি এর থেকে বের হয়ে আসতে চাই।'
তার জীবনের বৃত্তান্ত শুনে আমি খানিক স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। আমার মনোজগতে ভাসতে থাকে তার নিদারুণ যন্ত্রণায়ময় জীবনের ছবি। আমি কল্পনা করতে থাকি, অশান্তির অনলে পুড়তে থাকা আমার বন্ধুর যাপিত জীবন। তার বাহির ও ভেতরের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাহিরে তাকে দেখা যায় একজন সুখী ও প্রশান্তচিত্তের মানুষ। এবং লোকজন জিজ্ঞেস করলে সে এমনই বলে। কিন্তু প্রকৃতার্থে সে চরম অসুখী ও অশান্তির অনলে প্রজ্জ্বলিত। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, নামাজে দাঁড়ালে তোমার অবস্থা কেমন হয়? সে বলল, আমি নামাজ পড়ি না। আমি আশ্চর্য হয়ে তাকে বললাম, কেন তুমি নামাজ পড় না? আল্লাহর আদেশ-নিষেধের ব্যাপারে তোমার কি কোনো জ্ঞান নেই? তুমি কি জানো না আল্লাহর পরিচয়? আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার সকল বান্দাকে নামাজের আদেশ করেছেন। নামাজের মাধ্যমেই সম্ভব জীবনের পরিবর্তন। যার নামাজ যত সুন্দর তার জীবন ঠিক তত সুন্দর। সুতরাং নামাজ আদায়ে সচেষ্ট হও। নামাজে স্থির হও। সর্বদা নামাজ আদায় করো। মসজিদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করো। হৃদয়কে মসজিদের সাথে বেঁধে নাও শক্তভাবে। তবেই জীবনে পরিবর্তন আসবে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ততক্ষণ পর্যন্ত কারো জীবন পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না সে নিজে তার জীবন পরিবর্তনের ইচ্ছে করে। আমার সাথে সামান্য সময়ের অবস্থানে তার মধ্যে অভাবনীয় পরিবর্তন সৃষ্টি হলো। তার চোখে-মুখে আমি পরিবর্তনের ঝিলিক প্রত্যক্ষ করছিলাম। আমার যুবক বন্ধুটি আমার সাথে থেকে যেতে চাইল এবং তার জীবন পরিবর্তন করার আগ্রহ পেশ করল। কিন্তু আমি একটি জরুরি কাজে যাচ্ছিলাম। তাই আমি তাকে সাময়িক বিদায় জানিয়ে পুনরায় সাক্ষাতের আশাবাদ ব্যক্ত করে বিমান থেকে অবতরণ করে তার থেকে বিদায় নিলাম। কদিন পর পুনরায় তার সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। সে আমাকে দেখে দ্রুত এগিয়ে এলো। তার বর্তমান অবস্থার কথা জানাল। সে বলল, আমি নামাজ পড়ছি। আমি যখন প্রথম নামাজ পড়ি তখন হৃদয়ে অন্যরকম এক প্রশান্তি অনুভব করি। আমার তখন অনুভব হয় যে, আমি আল্লাহর অতি নিকটে দাঁড়িয়ে আছি। আল্লাহ ও আমার মাঝে দ্বিতীয় কোনো প্রতিবন্ধকতা আমি অনুভব করিনি। এভাবেই তার জীবন পরিবর্তনের সূচনা হলো। নামাজের মাধ্যমে সে আল্লাহর পরিচয় লাভ করতে থাকে। এবং নিজের অতীত পাপেভরা জীবন পরিত্যাগ করে সত্য ও সুন্দরের পথে ফিরে আসে।
মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত ধ্বংস ও ক্ষতির মাঝে ডুবে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না হৃদয়ে আল্লাহর পরিচয় লাভ করবে। আল্লাহর বড়ত্ব ও মাহাত্ম্যের মারেফত অর্জন করা ব্যতীত মানুষ তার জীবনের পরিবর্তন সাধিত করতে পারবে না। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ 'আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদত করার জন্য।' ⁶
এ আয়াতের একটি ব্যাখ্যা হলো, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি তোমরা আমার পরিচয় জানার জন্য। সুতরাং যদি তুমি নামাজ আদায় না করো, আল্লাহর সামনে নিজেকে নত না করো তাহলে কীভাবে আল্লাহর পরিচয় লাভ করবে? যদি আল্লাহর আদেশসমূহ পালন না করো, নিষেধসমূহ থেকে বিরত না থাকো তাহলে কীভাবে তুমি তোমার রবের পরিচয় অর্জন করবে? তুমি আল্লাহর বান্দা। তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। তোমার প্রয়োজনীয় সকল জিনিস তিনি তোমাকে দান করেছেন। তাই অত্যাবশ্যক হলো, আল্লাহর পরিচয় হৃদয়ে ধারণ করা। আল্লাহর আনুগত্যশীল বান্দা হয়ে জীবনযাপন করা। নচেৎ জীবনে নেমে আসবে অসহনীয় দুর্যোগ। অশান্তি ও অস্থিরতা ঘিরে ধরবে জীবনকে। তুমি যদি অন্যায় ও পাপকর্ম থেকে ফিরে না আসো তাহলে তোমার স্ত্রী তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে। তোমার পরিবার-পরিজন তোমাকে পরিত্যাগ করবে। পৃথিবীর সকল মানুষ তোমাকে অবজ্ঞা করবে। এর কারণ তোমার পাপ ও আল্লাহর অবাধ্যতা। স্রষ্টার অবাধ্যতা ও নাফরমানি তোমার জীবনে ডেকে নিয়ে আসবে সমূহ অশান্তি। প্রবল ঐশ্বর্যের ভেতর থেকেও তুমি খুঁজে পাবে না শান্তির দেখা। আর যদি আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার পরিচয় লাভ করতে পারো, হৃদয়ে ধারণ করতে পারো মহান সে রবের সন্তুষ্টি, তাহলে বিত্ত-বৈভবহীন জীবনেও দেখা পাবে সুখের অঢেল প্রাচুর্য। মূলত আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তার নির্দেশিত জীবন পরিচালনাই জীবনে আনতে পারে সুখ।
আজ মুসলিম তরুণদের হৃদয়ে আল্লাহর পরিচয় নেই। তারা জানে না আল্লাহর আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে। সর্বদা তারা বহু অন্যায় ও পাপকর্মে নিমজ্জিত। তারা চলছে, ফিরছে ও হাসছে। কিন্তু প্রকৃতার্থে তাদের জীবন বিষাদে ভরপুর। তাদের সে জীবনে নেই শান্তি ও সুখের পরশ। বাহ্যিকভাবে তাদের হাসতে দেখা গেলেও তাদের হৃদয় যন্ত্রণার অশ্রুতে ভরপুর। তাদের জীবনের খাঁচা থেকে সুখপাখি উড়ে গেছে। আর এসব কিছুই তাদের পাপ ও গোনাহের ফসল। সুতরাং তুমি তোমার পাপী ও গোনাহগার বন্ধুদের বলো, তারা যেন ফিরে আসে। পরিত্যাগ করে আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানি। প্রকৃত শান্তি ও সুখের জীবনে তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা ও শ্রম অব্যাহত রাখো।
টিকাঃ
৬ সুরা যারিয়াত: ৫৬
📄 নামাজের প্রতি যুবকদের যত্নবান হতে হবে
একবার আমি রাতের শেষ প্রহরে গাড়িতে চড়ে দূরে কোথাও যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে তিনজন যুবককে দেখতে পেলাম তারা রাতের অন্ধকারে হাঁটছে। তাদের দেখে আমি গাড়ি থামালাম। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তারা কোথায় যাবে? দাম্মামে যাবে, একজন উত্তর দিলো। বললাম, আমিও সেদিকেই যাব, চাইলে তোমরা আমার সাথে গাড়িতে উঠতে পারো। আমি তোমাদের গন্তব্যস্থলে নামিয়ে দেব। তারা গাড়িতে উঠল। বয়সে তারা ছিল সদ্য তরুণ। সকলের বয়স একুশ-বাইশ হবে। চলতে চলতে আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা দাম্মামে কেনো যাচ্ছ? তারা বলল, চাকরির জন্য।
চাকরির জন্য তারা এতদূর পথ পাড়ি দিচ্ছে। এ নিন্দনীয় কিছু নয়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সকলকে রিজিক অনুসন্ধান করতে আদেশ করেছেন। তাই চাকরির অনুসন্ধানে বহুদূর পাড়ি দেওয়া দোষের কিছু নয়। কিন্তু দোষের বিষয় হলো, রিজিকের জন্য এত দূর পাড়ি দিচ্ছে, সীমাহীন কষ্ট সহ্য করছে, কিন্তু আল্লাহ তায়ালার হক পালনের ব্যাপারে তাদের মাঝে কোনো প্রকার আগ্রহ উদ্দীপনা নেই। রিজিকের তালাশে পাড়ি দিচ্ছে এক শহর থেকে আরেক শহর, কিন্তু আল্লাহর অপরিহার্য বিধান নামাজ পালনের জন্য তারা মসজিদে পর্যন্ত যায় না। রিজিক তালাশ করা দোষের কিছু নয়।
কিন্তু দোষের বিষয় হলো, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনে অমনোযোগী হওয়া। আমি তাদের বললাম, তোমরা আমাকে সত্য করে বলো তোমাদের সার্টিফিকেট এবং তোমাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কেমন? একজন মধ্যম স্তরের, বাকি দুজন এরও নিচে। এবার আমি তাদের বললাম, এ সমগ্র পৃথিবীর একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ তায়ালা। পৃথিবীল পূর্বাপর সবকিছু একমাত্র তার। রিজিক ও সফলতার চাবিকাঠি একমাত্র তার হাতে। তিনি যদি কাউকে সফলতা দান করেন তাহলে কেউ তাকে ফেরাতে পারবে না। আর তিনি যদি কাউকে ব্যর্থ করেন তাহলে কেউ তাকে সফল করতে পারবে না। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন। আল্লাহর সাথে যে আছে, আল্লাহর তার সাথে আছেন। আল্লাহ ও বান্দার সম্পর্ক হলো পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও দামি সম্পর্ক। মানুষের সফলতা ও ব্যর্থতা লুকিয়ে আছে এ সম্পর্কের গভীরে। জেনে রেখো! নামাজ হলো এমন ইবাদত যা আল্লাহ ও বান্দার মাঝে সম্পর্ক স্থাপন করে। নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সাথে বান্দা বিশেষ কথোপকথন করে। বান্দা আল্লাহর নিকট তার সাহায্যের কথা ব্যক্ত করে। আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন। সুতরাং আল্লাহ ও বান্দার সম্পর্কের সূচনা হয় নামাজের মাধ্যমে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى
'তোমার পরিবার-পরিজনকে নামাজের আদেশ করো এবং নিজে তাতে অবিচল থাকো। আমি তোমার কাছে কোনো জীবিকা চাচ্ছি না। আমিই তোমাকে জীবিকা দিয়ে থাকি। আর শুভ পরিণাম তো তাদের জন্য যারা আল্লাহকে ভয় করে।'⁷
নামাজ হলো ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। নামাজের মাধ্যমে নির্ধারণ হয় আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার সাথে কার কেমন সম্পর্ক। তাই আমি তাদের প্রথমে নামাজের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। আমার পাশে যে বসেছে তাকে সর্বাগ্রে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি নামাজ পড়? সে বলল, হে শাইখ! আমি কি সত্য বলব নাকি মিথ্যা বলব? আমি বললাম, তুমি যদি মিথ্যা বলো তাহলে মিথ্যার পরিণাম তোমার ওপরই পতিত হবে আর যদি সত্য বলো তাহলে যাবতীয় কল্যাণ তোমার জন্য। আমার কথা শুনে যুবকটি বলল, হে শাইখ! আমি সত্যই বলছি, আমি নামাজ পড়ি না। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি কাফের? সে বলল, না। আমি বললাম, তাহলে নামাজ পড় না কেন? অথচ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসে ইরশাদ করেছেন,
العهد الذي بيننا وبينهم الصلاة فمن تركها فقد كفر بين المرء وبين الكفر ترك الصلاة
'আমাদের মাঝে এবং তাদের মাঝে অঙ্গীকার হলো নামাজ। সুতরাং যে নামাজ ছেড়ে দিলো সে কাফের হয়ে গেল। মুসলমান ও কাফেরের মাঝে ব্যবধান হলো নামাজ ছেড়ে দেওয়া।৮
জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি চাও তোমাকে কাফের নামে সম্বোধন করা হোক? সে বলল, না। আমি বললাম, তাহলে নামাজ আদায়ের প্রতি যত্নবান হও। ঈমানের পর নামাজই হলো ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আমল।
দ্বিতীয় যুবকটি বলল, আমি তার চেয়ে ভালো আছি। আমি বললাম কীভাবে?
সে বলল, দৈনিক দুই ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। আমি বললাম, এ তো ভারি আশ্চর্যের কথা। তুমি কি নতুন কোনো শরিয়ত প্রবর্তন করেছ? আল্লাহ তায়ালা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আদেশ করেছেন। আর তুমি কিনা দিনে পড় মাত্র দুই ওয়াক্ত। হে আল্লাহর বান্দা! এ কেমন উদাসীনতা? ইসলামের ভিত্তি রাখা হয়েছে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ওপর। সে জিজ্ঞেস করল, আমার করণীয় কী? আমি বললাম, এখন থেকে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে।
তৃতীয় জনের ব্যাপার তো আরো ভারি আশ্চর্যের! সে বলল, আমি সাপ্তাহিক জুমার নামাজ পড়ি। প্রতি জুমায় একবার মসজিদে যাই।
এ হলো আজকের মুসলিম তরুণ প্রজন্মের অবস্থা। তারা সপ্তাহে একদিন মসজিদে যায়। আল্লাহ তায়ালার দেওয়া শরিয়তের পরিবর্তে তারা যেন মনগড়া নতুন শরিয়ত প্রবর্তন করেছে। তারা কেবল বিপদে পতিত হলেই আল্লাহকে স্মরণ করে। বিপদে পতিত হলে দৌড়ে মসজিদে যায়। আল্লাহকে ডাকে। আর যখন বিপদ কেটে যায় অমনি তারা ভুলে যায় আল্লাহকে। ভুলে যায় মসজিদ।
মৃত ব্যক্তিদের গোসল দেন এমন এক ব্যক্তি একটি করুণ কাহিনি শুনিয়েছেন। তিনি বলেন। এক যুবক। সুদর্শন। শারীরিক সক্ষমতায় ছিল পূর্ণ। হঠাৎ মৃত্যুবরণ করে। তাকে গোসল দেওয়ার জন্য আমাকে ডাকা হলো। আমি যখন গোসল দেওয়ার জন্য তার মুখমণ্ডল খুলেছি, দেখি-তার সুন্দর চেহারা অত্যন্ত কুৎসিত ও ভয়ংকর আকৃতি ধারণ করে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সত্যই বলেছেন,
وَلَوْ تَرَى إِذْ يَتَوَفَّى الَّذِينَ كَفَرُوا الْمَلَائِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَارَهُمْ وَذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ ذَلِكَ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيكُمْ وَأَنَّ اللَّهَ لَيْسَ بِظَلامِ لِلْعَبِيدِ
'ফেরেশতারা যখন কাফেরদের জান কবজ করে তখন তুমি যদি দেখতে, তারা তাদের মুখে ও পাছায় আঘাত করে আর বলে, জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি আস্বাদন করো। এটি তোমাদের কৃতকর্মের ফল। আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি জুলুম করেন না।'⁹
وَمَا ظَلَمَهُمُ اللَّهُ وَلَكِنْ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ .
'আল্লাহ তাদের প্রতি জুলুম করেননি, বরং তারা নিজেরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে।'¹⁰
লোকটি বলেন, এ দেখে আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যাই। ভয়ে আমি গোসলখানা থেকে দ্রুত বের হয়ে আসি। বাহিরে যুবকের পিতা দাঁড়নো ছিল। আমি তার পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম যুবকের ঈমান-আমল সম্পর্কে? কেন এমন পরিণতি হলো তার? তিনি আমাকে বললেন, সে নামাজ পড়ত না। আমল সম্পর্কে ছিল সম্পূর্ণ গাফেল ও উদাসীন।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! যুবকটি ছিল গাফেল। আমলের প্রতি ছিল তার চরম উদাসীনতা। তাই সে নামাজ পড়ত না। আর তাই তার পরিণতি কেমন নিদারুণ হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ اعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يُحْيِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ
'আল্লাহর স্মরণ ও তার অবর্তীর্ণ সত্যের কল্যাণে মুমিনদের জন্য কি সময় হয়নি যে, তাদের অন্তর বিনম্র হবে এবং তারা তাদের মতো হবে না যাদের ইতিপূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল? অতঃপর বহুকাল অতিক্রান্ত হওয়ায় তাদের অন্তর শক্ত হয়ে গিয়েছে। তাদের অনেকেই অবাধ্য। জেনে রেখো! আল্লাহ জমিনকে মৃত্যুর পর জীবিত করেন। আমি তোমাদের জন্য নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পারো।'¹¹
আমি সে তিন যুবককে বললাম, তোমরা কি জানো? আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে কতবার নামাজের কথা বলেছেন? নব্বই এবং তারও অধিকবার নামাজের কথা বলেছেন। নিশ্চয়ই তোমরা অনুধাবন করতে পারছ নামাজের গুরুত্ব কত সীমাহীন। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম বান্দার যে আমলের হিসাব চাইবেন তা হলো নামাজ। নামাজের হিসাবে যে ঠিক ঠিক উত্তীর্ণ হতে পারবে তার অন্যান্য হিসাব সহজ হয়ে যাবে। তাই নামাজের প্রতি উদাসীন হয়ো না। গুরুত্বের সাথে মসজিদে জামাতের সাথে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের রিজিকের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে তিনি তোমাদের রিজিকের ব্যবস্থা করবেন। জীবিকার ব্যাপারে তোমাদের পেরেশানি দূর হয়ে যাবে।
এক যুবক আমাকে একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা শুনিয়েছে। যুবকটি বলল, আমার এক বন্ধু ছিল। আমি ও সে কখনো নামাজ পড়তাম না। নামাজের সময় আমরা খেল-তামাশায় মত্ত থাকতাম। বরং যারা নামাজ পড়ত আমরা তাদের নিয়ে বিদ্রূপ করতাম। একদিন রাতভর আমরা খেল-তামাশায় মত্ত থেকে সকালে যার যার বাড়ি এসে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। কিছুক্ষণ পর আমার বড় ভাই আমাকে তাড়াহুড়ো করে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলল। এবং বলল, আমার বন্ধুটি মারা গেছে। প্রথমে আমি তার কথা বিশ্বাস করিনি। ভেবেছি দুষ্টুমি করছে হয়তো। কেননা, কিছুক্ষণ পূর্বেই আমি ও সে একসঙ্গে ছিলাম। কিন্তু আমার ভাই অত্যন্ত জোরগলায় বলতে লাগল। আমি আমার বন্ধুর বাড়ির দিকে রওনা হই। পথে তার পিতার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলো। তিনি কাঁদতে কাঁদতে আমাকে তার মৃত্যুর সংবাদ দিলেন। ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি অব্যাহত ঘৃণাচর্চার কারণে আমার সে বন্ধুকে গোসল দেওয়া হয়নি। মুসলমানদের কবরে তাকে দাফন করা হয়নি। সে নামাজ পড়ত না। বরং যারা নামাজ পড়ত তাদেরকে ঠাট্টাবিদ্রুপ করত। তার কৃতকর্মের ফলস্বরূপ তাকে গোসল ও মুসলমানদের কবরে দাফন করা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তারপর তিনি বললেন, আমি কতবার তোমাদের দুজনকে পাপ ও অন্যায় কাজ ছেড়ে দিতে বলেছি। নামাজ পড়তে বলেছি। কিন্তু তোমরা কখনো আমার কথায় কর্ণপাত করোনি।
এ ঘটনা আমার জীবনকে দারুণ প্রভাবিত করেছে। আমি সেদিন উপলব্ধি করতে পারি, আমি আসলে জঘন্য অন্যায় ও ভুলের ওপর আছি। একদিন আমাকেও তার মতো মৃত্যুবরণ করতে হবে। প্রতিটি মানুষকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। চাই সে আকাশে থাকুক কিবা জমিনে। যেখানেই থাকুক মৃত্যু তাকে গ্রাস করবেই। এ অবশ্যম্ভাবী। সেদিনই আমার পিতা আমাকে সতর্ক করে বললেন, তুমি যদি নামাজ না-পড় তাহলে লোকেরা তোমাকেও মুসলমানদের কবরে দাফন করতে দেবে না। তাই তুমি ফিরে এসো সঠিক পথে। তিনি আমাকে নিয়মিত নামাজ আদায় করতে বললেন। মানুষের সাথে সদাচরণ করতে বললেন। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার প্রতি গুরুত্বারোপ করলেন। পার্থিব জীবনের অসারতার কথা তুলে ধরলেন আমার সামনে। তুলে ধরলেন মৃত্যু-পরবর্তী অসীম জীবনের কথা। যেখানে রয়েছে কঠিন কঠিন ঘাটি। রয়েছে বিভীষিকাময় জাহান্নাম। যা প্রস্তুত করা হয়েছে گنهگارদের জন্য। তাদের জন্য যারা নামাজ পড়ে না। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলে না। পিতার কথা আমার হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করল। আর যেহেতু আজ সকালেই আমার প্রিয় বন্ধু আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেছে এবং তার সাথে ঘটে গেছে হৃদয়বিদারক ঘটনা তাই আমার হৃদয় ছিল অত্যধিক আর্দ্র ও আবেগতাড়িত। এরপর আমার জীবনে পরিবর্তন আসে। আমি নিজেকে পরিবর্তনের প্রতি বিশেষ মনোযোগী হই। আমি অনুভব করি, হায়াতের অফুরন্ত সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু পরকালের জন্য সঞ্চয় করতে পারিনি কিছুই। আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি ছিলাম উদাসীন। সেদিন থেকেই আমি মসজিদে যেতে শুরু করি। অবশিষ্ট জীবন সরল ও সঠিক পথে চলার শপথ গ্রহণ করি।'
আল্লাহর শপথ! মুসলিম যুবকরা আজ বিচ্যুতি ও ভ্রষ্টতার চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করেছে। তাদের মাঝে নেই ইসলামি বিধি-নিষেধের ন্যূনতম দায়িত্ববোধ। প্রবৃত্তির অনুসরণ তাদের ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। বস্তুবাদ ও দুনিয়ার নেশায় আজ তারা অন্ধ। প্রতিটি পাড়া-মহল্লার মসজিদে মুসলিম যুবকদের উপস্থিতি সবচেয়ে কম। অথচ উম্মাহর ভাগ্য পরিবর্তনের নেতৃত্ব ছিল তাদেরই হাতে। উম্মাহর দুর্দশা ও অবনতির পেছনে প্রধানত দায়ী মুসলিম যুব ও তরুণ প্রজন্ম ইসলামের সরল-সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া। তারা যদি মনে-প্রাণে কামনা করে মুসলিম জাতি তার পুরনো গৌরব অর্জন করুক তাহলে সর্বপ্রথম তাদের নিজেদের পরিবর্তন করতে হবে। তারা যদি ধ্বংসের গর্ত থেকে উঠে আসে তবেই মুসলিম জাতি উঠে আসবে পতনের অতল গহ্বর থেকে।
মৃত ব্যক্তিদের গোসল দেন এমন ব্যক্তি একটি অতি আশ্চর্যজনক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এক যুবককে গোসল দেওয়ার জন্য আমি ভেতরে প্রবেশ করি। আমার সাথে ছিল আরো একজন। আমরা যখন মৃত ব্যক্তিকে গোসল দিচ্ছি তখন পুরো গোসলখানায় এক আশ্চর্য সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ে। অপূর্ব সুঘ্রাণে চারপাশ সুরভিত ও মোহিত হয়ে যায়। বর্ণনাকারী বলেন, আমি আমার সহকারীকে বললাম, তুমি কি সুঘ্রাণ পাচ্ছ? সে বলল, হ্যাঁ। বর্ণনাকারী বলেন, ইতিপূর্বে আমি কখনো এমন সুঘ্রাণ পাইনি। এবং তার মুখমণ্ডল অতি উজ্জ্বলতায় ফকফক করছিল। আমি অসংখ্য ব্যক্তিকে গোসল দিয়েছি কিন্তু এমন সুন্দর চেহারা কোনো মৃত ব্যক্তির দেখিনি। আমি অত্যন্ত আগ্রহ উদ্দীপনার সাথে যুবককে গোসল দিলাম। পরবর্তীতে আমি জানতে পারি, যুবকটি ছিল অত্যন্ত সৎ ও পরহেজগার। তাকওয়া ও খোদাভীতিতে তার অন্তর ছিল পরিপূর্ণ। সৎকাজের আদেশ করত, অসৎকাজ থেকে লোকদের বিরত রাখত। তার জীবন ছিল সততা ও উত্তম আদর্শে মোড়ানো।
আমরা তাকে গোসল, কাফন ও জানাজা শেষে কবরস্থানে নিয়ে গেলাম। আমি নিজেই যুবককে কবরস্থ করি। আল্লাহর কসম! আমি দেখি, কবরে রাখার পর তার লাশ কেমন নড়ে উঠল। অথচ কেউ তাকে স্পর্শ করেনি। আমি আশ্চর্য হয়ে আমার সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করলাম। তারাও এমনটি অনুভব করল। তার চেহারা আপনা থেকেই কেবলামুখি হয়ে গেল। আমি আশ্চর্য-হয়ে যুবকের মুখমণ্ডলের দিকে তাকালাম। দেখি সে হাসছে। অতি উজ্জ্বল তার চেহারার রঙ। যেন আকাশ থেকে পূর্ণিমার চাঁদ নেমে এসেছে কবরে। আমি ধারণা করলাম, সত্যিই সে মৃত্যুবরণ করেছে কি না। কিন্তু পরক্ষণেই আমার সন্দেহ দূর হয়ে গেল। কারণ, আমিই তো তাকে গোসল দিয়েছি আর আমি জানি সে ছিল একজন আদর্শবান যুবক। মসজিদের সাথে ছিল তার সুদৃঢ় সম্পর্ক। আনুগত্যের শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল তার জীবন। কখনো আল্লাহর অবাধ্যতা করেনি। আমরা যুবককে কবরস্থ করে ফিরে এলাম।'
এ তো আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার ঘোষিত বাণীর বাস্তব রূপ। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ
'যারা বলে আমাদের প্রভু আল্লাহ অতঃপর সত্যের ওপর অবিচল থাকে (মৃত্যুর সময়) তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না ও চিন্তিত হয়ো না। আর তোমাদের যে জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হতো তা শুনে নাও।' ¹²
টিকাঃ
৭ সুরা তহা: ১৩২
৮ এ হাদিসের মাধ্যমে নামাজের গুরুত্ব বর্ণনা করা উদ্দেশ্য। ঈমানের পর সর্বোত্তম ইবাদত হলো নামাজ। নামাজ পরিত্যাগকারীর ভয়াবহ পরিণাম ও ইসলামের ব্যাপারে তার ঈমানের দুর্বলতা বর্ণনা করতেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। যে মুসলমান নামাজ পড়বে না তার ঈমান পরিপূর্ণ নয়। এর দ্বারা সে কাফের হবে না। হ্যাঁ, কেউ যদি নামাজকে অস্বীকার করে তাহলে কাফের হয়ে যাবে।
৯ সুরা আনফাল: ৫০-৫১
১০ সুরা আলে ইমরান: ১১৭
১১ সুরা হাদিদ: ১৬-১৭
১২ সুরা হা মিম সিজদাহ: ৩০
📄 জীবনের প্রকৃত মাকসাদ
মুসলিম যুব ও তরুণ প্রজন্মের গন্তব্য কোথায়? কী তাদের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য? আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য দিয়ে মানুষকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন, কাঙ্ক্ষিত সে লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য রয়েছে কতিপয় নীতিমালা। আল্লাহ তায়ালা তার কোনো বান্দাকে ভ্রষ্টতার দিকে পরিচালিত করেন না। কোনো বান্দার ওপর তিনি জুলুম করেন না। তিনি মানুষদের সামনে উন্মোচন করে দিয়েছেন এক সরল-সঠিক পথ। যে পথের ডানে-বায়ে নেই কোনো বক্রতা। আল্লাহ তায়ালা মানুষের ওপর অনেক বড় অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের জন্য তৈরি করেছেন এক সরল-সঠিক পথ। মানুষের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য হলো, সে পথে চলা। কোনো ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত বিচ্যুত হবে না যতক্ষণ সে আল্লাহর দেওয়া সরল-সঠিক পথের ওপর অটল ও অবিচল থাকবে। কিন্তু যখনই আল্লাহ তায়ালার মনোনিত সরল-সঠিক পথ ছেড়ে শয়তানের তৈরি অবাধ্যতা, নাফরমানি ও বক্রতার পথ অবলম্বন করবে তখনই সে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য থেকে ছিটকে পড়বে। তাই প্রত্যেককে ইসলামের সরল-সঠিক পথে অটল ও সুদৃঢ় থাকার জন্য আল্লাহ তায়ালার নিকট বিশেষ প্রার্থনা করতে হবে। কেননা, শয়তান চারদিকে ভ্রষ্টতা ও বক্রতার অসংখ্য পথ তৈরি করে রেখেছে। যে-কোনো মূল্যে শয়তান মানুষকে সিরাতে মুস্তাকিম থেকে বিচ্যুত করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে।
আমি এক যুবককে চিনি। তার যাবতীয় বিষয়াদি সম্পর্কে আমি অবগত। শৈশব থেকেই ছিল সে অত্যন্ত ভদ্র ও নম্র প্রকৃতির মানুষ। ছিল আমলের প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী। মসজিদের সাথে ছিল তার গভীর সম্পর্ক। আমার বিশ্বাস আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন তাকে আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন। শৈশব কৈশোর পেরিয়ে পরিণত বয়সে পৌঁছার পর মসজিদের সাথে সম্পর্ক আরো দ্বিগুণ হলো। পড়ালেখা সমাপ্ত করে সে চাকরি গ্রহণের বয়সে উপনীত হলো। তার চাকরি গ্রহণের একটি মনোমুগ্ধকর ঘটনা রয়েছে। সে সৈনিক পদে চাকরি গ্রহণের ইচ্ছা করল। যখন সে চাকরির জন্য দরখাস্ত দিতে গেল তাকে ছবি তুলতে বলা হলো। তখন তার মুখমণ্ডলে ছিল সুন্নতি দাড়ি। আর দাড়িতে তাকে খুবই সুন্দর দেখাত। তার চেহারার সৌন্দর্যকে দ্বিগুণ করে দিয়েছে দাড়ি। তখন চাকরিদাতা তাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি যদি দাড়ি মুখে ছবি তুলতে চাও তাহলে চাকরির শেষ পর্যন্ত তোমাকে দাড়ি রাখতে হবে। কখনো কাটতে পারবে না। কেননা, এখানে এটাই সিস্টেম। তাই তুমি ভেবেচিন্তে দেখো, দাড়ি কাটবে না রাখবে?' এ কথা শোনে যুবকটি বলল, মৃত্যু পর্যন্ত আমি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের মাঝে কোনো প্রকার পরিবর্তন করব না। তারপর দাড়ি রেখেই সে ছবি তুলল এবং সৈনিকের চাকরি গ্রহণ করল। ইসলামের সকল অনুশাসন মেনেই সে চাকরি করতে লাগল। তার মাঝে ছিল দাওয়াতের স্পৃহা। দিন-রাত সে যুবকদের সৎপথের দাওয়াত দিতে লাগল। যে কেউ তার নিকট কোনো কাজ নিয়ে এলে কোনো প্রকার বিরক্তি ও টালবাহানা ছাড়াই সে তাদের কাজ করে দিত। মানুষের উপকারের প্রতি সে ছিল আন্তরিক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, এক ব্যক্তি লোকদের সাথে মিশে এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করে, তাদের কষ্টকে লাঘব করে এবং এক ব্যক্তি লোকদের সাথে মিশে না, তাদের কষ্টকে লাঘব করে না, তাদের মধ্যে কে উত্তম? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে লোকদের সাথে মিশে এবং তাদের কষ্টকে লাঘব করে।
যুবকটি পণ করেছিল, মৃত্যু পর্যন্ত সে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের মাঝে কোনো প্রকার পরিবর্তন করবে না। আমৃত্যু সে তার মুখে দাড়ি রাখবে। আল্লাহু আকবার! প্রকৃত ঘটনা তাই ছিল, যা সে বলেছিল। একদিন সে অনেক অসুস্থ হয়ে পড়ল। তার পেটে দেখা দিলো কঠিন পীড়া। যা ছিল অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। সুস্থতার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হলো। কিছুদিন চিকিৎসা গ্রহণ করার পর মারা যায়। সে যখন মারা যায় তখন তার মুখে জ্বলজ্বল করছিল সুন্নতি দাড়ি, তার চোখে-মুখে যেন নুর চমকাচ্ছে। হাসপাতালের ডাক্তারগণ বলেন, আমরা যখন তাকে চিকিৎসা দিচ্ছিলাম তখন বারবার সে আল্লাহর নিকট এ প্রার্থনা করছিল, 'হে আল্লাহ! তুমি আমাকে দ্বীনের ওপর অটল ও অবিচল রাখো। সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর সুদৃঢ় রাখো। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের ওপর স্থির রাখো।'
এ ঘটনা ওইসব যুবকদের জন্য শিক্ষা যারা বলে নিজেকে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এ ঘটনা ওইসব যুবকদের জন্য শিক্ষা যারা বলে ইসলামের অনুশাসন মেনে চাকরি করা কঠিন। এ ঘটনা ওইসব যুবকদের জন্য শিক্ষা যারা বলে মুখে দাড়ি রেখে মর্যাদাকর পদে আসীন হওয়া যায় না। এ ঘটনা ওইসব যুবকদের জন্য শিক্ষা যারা বলে ধর্ম পালন করে দুনিয়া উপার্জন করা অত্যন্ত কঠিন। আমি বলি, মুসলিম যুবকদের জন্য কিছুই অসম্ভব ও কঠিন নয়, যদি তারা নিজেদের পরিবর্তনে আগ্রহী হয়। প্রথমে নিজেকে পরিবর্তনের সদিচ্ছা গ্রহণ করতে হবে। ইসলামের অনুশাসন পালনে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হতে হবে। আল্লাহ তায়ালা ততক্ষণ পর্যন্ত কারো অবস্থার পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না সে নিজেকে পরিবর্তনের ইচ্ছে করে। সুতরাং হে মুসলিম যুব ও তরুণ প্রজন্ম! ফিরে এসো আল্লাহর নির্দেশিত পথে। ফিরে এসো সিরাতের মুস্তাকিমের ওপর। নিজেদের পরিবর্তনের অঙ্গীকার করো। নিজেদের যাপিত জীবন ও চরিত্রের সংশোধন করো। দুনিয়াকে আখেরাতের ওপর প্রাধান্য দিয়ো না। দুনিয়াতে ততটুকুই গ্রহণ করো যতটুকু তোমার প্রয়োজন। আর পরকালের জন্য ততটুকু গ্রহণ করো যতদিন তুমি সেখানে থাকবে। আর এ কথা তো সর্বাধিক সত্য যে, পরকাল এমন এক জীবন যার কোনো সমাপ্তি নেই। যার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। সুতরাং অনন্তকালের জন্য যথোপযুক্ত পাথেয় গ্রহণ করো। মনে রেখো, দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী আর আখেরাত চিরস্থায়ী।
📄 প্রয়োজন আত্মজিজ্ঞাসা
মুসলিম যুব ও তরুণ প্রজন্মের আজ প্রয়োজন আত্মজিজ্ঞাসা। বারবার নিজেকে জিজ্ঞেস করা নিজের ঈমান সম্পর্কে, সালাত সম্পর্কে। বারবার নিজেকে বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। নিজেই নিজের কাছে জানতে চাইবে ঈমান-আমল সম্পর্কে। আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যমে হৃদয়ে গভীর অনুশোচনা জাগ্রত হয়। যার ফলে আল্লাহর অবাধ্যতা ও گناه থেকে ফিরে আসা অত্যন্ত সহজ হয়।
হে যুবক! আমি তোমাকে কয়েকটি প্রশ্ন করছি। তুমি সেসব প্রশ্নের সত্য ও ঠিক ঠিক জবাব দাও। তুমি যদি সত্য বলো তাহলে জেনে রাখো, সত্য তোমাকে মুক্তি দেবে। আর যদি মিথ্যা বলো তাহলে মিথ্যা তোমার ওপরই ডেকে আনবে ঘোরতর শান্তি। সুতরাং আমার করা প্রশ্নসমূহের ঠিক ঠিক জবাব দাও। তুমি কি নামাজ পড়? তুমি কি নিয়মিত দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়? নামাজের মাঝে তোমার অন্তরের অবস্থা কেমন হয়? তুমি কি আজ ফজরের নামাজ মসজিদে জামাতের সাথে পড়েছ নাকি একাকী? নাকি তুমি সেসব হতভাগা লোকদের অন্তর্ভুক্ত যারা আল্লাহকে রুকু করে না, সিজদা করে না? হে যুবক! তোমার বয়স কত? বিশ? ত্রিশ? নাকি চল্লিশ? আমি তোমাকে তোমার বিগত বিশ, ত্রিশ কিংবা চল্লিশ বছরের নামাজের হিসাব জিজ্ঞেস করছি না। আমি জানতে চাচ্ছি, তোমার চলতি বছরের বিগত মাসগুলোর কথা। এ দিনগুলোতে তুমি কত ওয়াক্ত নামাজ পড়েছ? কত ওয়াক্ত নামাজ ছেড়েছ? আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করছি, তুমি সত্য বলো কত ওয়াক্ত নামাজ তুমি মুসলমানদের সাথে মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করেছ? হে যুবক! তুমি বলো, মসজিদের মিনার থেকে কতবার তোমাকে নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়েছে এবং তুমি কতবার সে ডাকে সাড়া দিয়েছ? হে যুবক! মসজিদের মিনার থেকে কতবার ভেসে এসেছে এ কথা, ঘুমের চেয়ে নামাজ ভালো? তুমি কি আজান শুনে ঘুম থেকে উঠে মসজিদের দিকে ছুটে গিয়েছ নাকি আলস্যের চাদরে মুড়িয়ে ছিলে? হে যুবক! তুমি বলো তুমি কি সত্যিই নামাজের প্রতি যত্নবান?
হে মুসলিম যুবক! এসব প্রশ্ন তুমি নিজেকে করো। জানতে চাও এসব প্রশ্নের উত্তর। অতঃপর শোনো, তোমার হৃদয়ের আর্তনাদ। দেখো, তোমার অবস্থা কোথায়? তুমি কি সরল সঠিক পথে আছ নাকি শয়তান এবং তোমার কুপ্রবৃত্তি তোমাকে বিচ্যুত করে ফেলেছে সিরাতে মুসতাকিম থেকে? হে যুবক! নামাজের ব্যাপারে সর্বাধিক যত্নবান হও। নামাজের প্রতি আন্তরিক হও। মসজিদের মিনার থেকে যখন আল্লাহর নামের আহ্বান ভেসে আসে তখন সে আহ্বানে সাড়া দাও। ধ্বংস ও পতনের গর্ত থেকে বের হয়ে আসার জন্য সর্বপ্রথম করণীয় হলো নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া। নামাজ মুমিনের জান্নাত ও জাহান্নামের পথ তৈরি করবে। আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট ভাষায় পবিত্র কুরআনে জান্নাত ও জাহান্নামে গমনের ভেদ উন্মোচন করে দিয়েছেন।
مَا سَلَكَكُمْ فِي سَقَرَ قَالُوا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ 'কোন কাজ তোমাদের জাহান্নামে নিয়ে এলো? তখন তারা বলবে, আমরা নামাজ পড়তাম না।' ¹⁰
সুতরাং প্রত্যেক যুবকের অপরিহার্য কর্তব্য হলো, নিজেকে নামাজের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা। বিবেকের আদালতে দাঁড় করানো নিজেকে। চাই সে বড় হোক কিবা ছোট হোক, চাই বৃদ্ধ হোক কিংবা যুবক। প্রত্যেকের হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে দেখো। কারো মন বলছে, সে পঞ্চাশ বছর নামাজ পড়ে না। কারো মন বলছে, সে চল্লিশ বছর নামাজ পড়ে না। কারো মন বলছে, সে ত্রিশ বছরে একদিনও মসজিদে যায়নি। একবারও দাঁড়ায়নি আল্লাহ তায়ালার সম্মুখে। হায়! কী করুণ পরিণতি আজ মুসলিম উম্মাহর সদস্যদের। ধ্বংস ও পতনের কোন অতল গহ্বরে তারা নিমজ্জিত হয়ে আছে।
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়ার তাওফিক দিন। মসজিদের সাথে আমাদের হৃদয়ের গভীর সম্পর্ক তৈরি করে দিন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের আপনার সেসব প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে দিন যারা নামাজের প্রতি যত্নবান। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের বর্তমান অবস্থা পরিবর্তন করে দিন। আপনি আমাদের সিরাতে মুসতাকিমের ওপর অটল ও অবিচল রাখুন।
টিকাঃ
১৩ সুরা মুদ্দাছছির: ৪২