📘 হে যুবক! ফিরে এসো রবের দিকে > 📄 তরুণ সাহাবি হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের রা.

📄 তরুণ সাহাবি হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের রা.


কোন সে যুবক যে শত্রুর সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে? কোন সে যুবক যে শত্রুর চোখ রাঙানিতে ভীত হবে না? কোন সে যুবক যার হৃদয় ভরপুর ইসলামের শাশ্বত আলোয়? হ্যাঁ, তিনি হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের! রাসুল সাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সর্বপ্রথম মদিনায় হিজরত করতে আদেশ করেছেন। প্রাণাধিক প্রিয় রাসুলের আদেশে তাৎক্ষণিক তিনি রাজি হয়ে গেছেন মক্কার আবেগ ও ভালোবাসা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করার জন্য। তখন মক্কা নগরীতে ইসলাম ও মুসলমানদের ওপর চলছে অমানবিক অত্যাচার। কাফেররা ঝাঁপিয়ে পড়েছে নবাগত মুসলমানদের ওপর। উত্তপ্ত মরুবালিতে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখছে তাদের। পিঠে চাপা দিয়ে দিচ্ছে রোদে পোড়া ভারী পাথর। আহ! সে কী বর্বরতা ছিল মুসলমানদের ওপর। পৃথিবী প্রত্যক্ষ করেছে পাষবিকতার সে করুণ দৃশ্য। ইতিহাস লিখে রেখেছে অত্যাচার নিপীড়নের প্রতিটি বর্ণনা। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের রা.-কে আদেশ করলেন মদিনায় হিজরত করার জন্য। মদিনার লোকদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য। মদিনার যে কয়জন নতুন মুসলমান রয়েছে তাদের নামাজ, কুরআনসহ ইসলামের প্রাথমিক বিষয়াদি শিক্ষা দিতে। বিশেষত তাদের কুরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য নবীজি হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের রা.-কে মদিনায় প্রেরণ করেছেন। নবীজির আদেশ সে তো অলঙ্ঘনীয়। জীবনবাজি রেখে হলেও তা বাস্তবায়ন করতে হবে। শরীরের শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো আদেশ অমান্য করেননি সাহাবায়ে কেরাম। আর এজন্যই তারা এ উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ।
মুসআব ইবনে উমায়র রা. তখন বিশ না পেরুনো এক টগবগে যুবক। মক্কার সুদর্শন ও আত্মমর্যাদাশীল যুবকদের একজন। জন্মগ্রহণ করেছেন আরবের অভিজাত এক পরিবারে। বংশ ছিল সম্ভ্রান্ত। সম্পদ ও ধনে তার গোত্র ছিল প্রাচুর্যময়। তার জীবন ছিল বিলাসিতা ও ভোগ-বিলাসে ভরপুর। আরবের সবচেয়ে মূল্যবান সুগন্ধি তিনি ব্যবহার করতেন। এমন কোনো মূল্যবান রেশম নেই যা তিনি পরিধান করেননি। জীবনের অগাধ সুখ ও শান্তির মাঝে কাটছিল হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের রা.-এর যৌবন। কিন্তু যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন তখনই পাল্টে গেল তার সমস্ত জীবনাচার। তিনি হয়ে গেলেন অন্য এক মুসআব। এক অন্য যুবক। আগে যিনি পরিধান করতেন আরবের শ্রেষ্ঠ রেশমি পোশাক এখন তিনি পরিধান করেন অতিশয় পুরাতন ছিন্ন ও মলিন কাপড়। আগে যিনি আহার করতেন আরবের শ্রেষ্ঠ সব খাবার এখন তিনি একদিন খেলে আরেকদিন থাকেন উপোস। জীবনে যার শরীরে লাগেনি এক চিলতে আঁচড় এখন তিনি সহ্য করেন স্বগোত্রীয়দের অবর্ণনীয় অত্যাচার। সম্পূর্ণ পাল্টে গেলেন তিনি। এক আরবীয় যুবকের যৌবনের সকল উন্মাদনা বন্ধ হয়ে গেল। ইসলাম তাকে পাল্টে দিয়েছে। রাসুলের চেতনা তাকে বদলে দিয়েছে।
মুসআব ইবনে উমায়ের রা. মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র আমানত নিয়ে তিনি মদিনার পানে রওনা করেন। মক্কায় রেখে গেলেন তার পরিবার পরিজন। সকল মায়া ও ভালোবাসা তুচ্ছ করে তিনি মদিনায় চলে গেলেন। হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের রা. যখন হিজরত করেন মদিনায় তখন মাত্র বারজন মুসলমান। তাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি মদিনার সর্বত্র ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। ইহুদিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি মদিনার লোকদের মাঝে ঈমানের আলো ছড়াতে থাকেন। তার দাওয়াত এবং অক্লান্ত চেষ্টার ফলে একদিন মদিনার ঘরে ঘরে ইসলামের আলো প্রবেশ করে। হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের রা.-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন উসায়দ ইবনে হুযাইর, যার কুরআন তিলাওয়াত শোনার জন্য আকাশ থেকে নেমে এসেছিল ঝাঁকে ঝাঁকে ফেরেশতা। তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন মুয়াজ ইবনে জাবাল রা., যার মৃত্যুতে কেঁপে উঠেছিল আল্লাহর আরশ। হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের রা.-এর উত্তম আদর্শ ও জীবনাচার দেখে মদিনার লোকেরা তার দাওয়াত কবুল করতে লাগল। মদিনার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল ইসলামের শাশ্বত আলো।
হে যুবক! মুসআব ইবনে উমায়ের ছিলেন তোমার মতো একজন যুবক। বিশ বছরের এক সুদর্শন যুবক। একজন মুসআব ইবনে উমায়ের পরিবর্তন করে দিয়েছেন গোটা মদিনা। মদিনাকে তিনি আলোকিত করে তুলেছেন কুরআনের আলোয়। হে যুবক! তিনিও তোমার মতো একজন যুবক ছিলেন। যে ইসলাম মুসআব ইবনে উমায়ের তৈরি করেছে সে ইসলাম আজও আছে। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মুসআব ইবনে উমায়ের কিছুই ছিলেন না। ইসলাম তাকে দিয়েছে শ্রেষ্ঠত্বের আসন। সম্মান ও মর্যাদার সুউচ্চ চূড়ায় আসীন করেছে। আল্লাহর কসম! আজও রয়েছে সে ইসলাম। ইসলামের সে আদর্শ ও চেতনা আজও রয়েছে। হে যুবক! শুধু পরিবর্তনের ইচ্ছে করো। নিজেকে ইসলামের আলোয় আলোকিত করার স্বপ্ন দেখো। ইসলামের রঙে রঙিন করো। তাহলে ইসলাম তোমাকে কালের মুসআব ইবনে উমায়ের হিসেবে তৈরি করবে। প্রয়োজন কেবল পরিবর্তনের অদম্য ইচ্ছা।
হে যুবক! তোমার কি এখনো সময় হয়নি নিজেকে পরিবর্তন করার? হে যুবক! তুমি যদি মুসলমান হয়ে থাকো তাহলে নিজেকে জিজ্ঞেস করো যে, তুমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসো কি না? যদি তোমার উত্তর হয় হ্যাঁ, তাহলে পার্থিব খেল-তামাশা পরিত্যাগ করার সময় কি তোমার এখনো হয়নি? হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের রা. কেন ছেড়ে দিয়েছেন পূর্বপুরুষের সকল রীতি-নীতি? কেন ছেড়ে দিয়েছেন ভোগের জীবন? আয়েশি নরম বিছানা ত্যাগ করে তিনি কেন পছন্দ করলেন পাথুরে বিছানা? কেন হযরত মুসআব পরিত্যাগ করলেন সবকিছু? শুধুমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবেসেছেন বলে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে পার্থিব জীবনের সকল মোহ ত্যাগ করতে। হে যুবক! তুমি যদি সত্যিই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসো তাহলে কেন নিজেকে পরিবর্তন করো না? কেন নিজের অবাধ্য ও নাফরমানির জীবন পরিত্যাগ করো না? আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেছেন,
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ
'আল্লাহর স্মরণ এবং তিনি যে সত্য অবতীর্ণ করেছেন তার কল্যাণে মুমিনদের জন্য কি সময় হয়নি যে, তাদের অন্তর বিনম্র হবে এবং তারা তাদের মতো হবে না যাদের ইতিপূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল অতঃপর বহুকাল অতিক্রান্ত হওয়ায় তাদের অন্তর শক্ত হয়ে গিয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই অবাধ্য।"⁵
সুতরাং হে যুবক! ফিরে এসো তোমার রবের দিকে। ফিরে এসো তোমার রবের দেওয়া প্রতিশ্রুতির দিকে। ছেড়ে দাও সকল অবাধ্যতা। প্রবৃত্তির অনুসরণ ছেড়ে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রণীত জীবনের দিকে ফিরে এসো। নাফরমানিতে ডুবে থাকবে আর কতকাল? আর কতকাল উপেক্ষা করবে তোমার রবের আহ্বান? অবাধ্যতার পিঞ্জর ভেঙে ফিরে এসো কল্যাণ ও সফলতার পথে।
হে আল্লাহ! হে রাহমানুর রাহিম! আপনি মুসলিম যুব ও তরুণ প্রজন্মকে কবুল করে নিন। তাদেরকে পরিপূর্ণরূপে ইসলামের প্রবেশ করার তাওফিক দান করুন। তাদের অন্তরকে ইসলামের সৌন্দর্য দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত করে দিন। তাদের অন্তরকে ঈমানের আলোয় আলোকিত করে দিন। আপনার রাসুলের আদর্শে তাদের আদর্শবান বানিয়ে দিন। হে আল্লাহ! আপনি যুবকদের অন্তরে ইসলামের জন্য ভালোবাসা ও আবেগ সৃষ্টি করে দিন। ইসলামের জন্য নিজেদের জান ও মাল ব্যয় করার তাওফিক দান করুন। তাদের অন্তর থেকে সকল প্রকার নাফরমানি দূর করে দিন। তাদের আপনার পূর্ণ আনুগত্য করার তাওফিক দান করুন। তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে হেফাজত করুন। তাদের অন্তর থেকে সকল প্রকার মন্দ কামনা-বাসনা দূর করে দিন। হে আল্লাহ! আপনি মুসলিম যুবকদের আপনার দ্বীনের প্রাণশক্তি হিসেবে কবুল করে নিন। আপনার দ্বীনের বিজয়ের জন্য তাদের আপনি সৈনিক হিসেবে কবুল করে নিন। হে আল্লাহ! মুসলিম যুবকদের মাঝে আপনি হযরত উসামা এবং হযরত মুসআব ইবনে উমায়ের রা.-এর মতো যুবক তৈরি করে দিন।

টিকাঃ
৫ সুরা হাদিদ: ১৬

📘 হে যুবক! ফিরে এসো রবের দিকে > 📄 তারুণ্য উম্মাহর আশার প্রদীপ

📄 তারুণ্য উম্মাহর আশার প্রদীপ


এ আলোচনার সারমর্ম হলো ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর মুক্তি লাভ এবং হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে উপযুক্ত করণীয় সম্পর্কে আলোকপাত করা। উম্মাহ কীভাবে মুক্তি পাবে? কোন পথে রয়েছে উম্মাহর কাঙ্ক্ষিত সফলতা? কীভাবে আমরা একে অপরকে সৎকাজ এবং তাকওয়া অর্জনে সহযোগিতা করতে পারি? এবং কীভাবে আমরা নিজেদের এবং আমাদের পরিবার- পরিজনকে আল্লাহর শান্তি থেকে রক্ষা করতে পারি? সে সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করা।
তরুণ ও যুব প্রজন্ম একটি জাতির মেরুদণ্ড। সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রাণ। তাদের রক্ত ও ঘামের ওপর নির্মিত হয় জাতির সফলতা ও ব্যর্থতা। চলমান নৈরাজ্য এবং পতনের অতল গহ্বর থেকে কোনো জাতিকে টেনে তুলে এনে সফলতার সুউচ্চ চূড়ায় আরোহণ করায় যারা তারা সে জাতির তরুণ প্রজন্ম। পক্ষান্তরে কোনো জাতির তরুণ প্রজন্ম যদি শৃঙ্খলা ও নিজেদের কর্তব্যের কথা ভুলে যায় তাহলে সে জাতির পতন অবশ্যম্ভাবী। ধ্বংস ও পরাজয়ের হাত থেকে আর কোনো মন্ত্রই তাদের রক্ষা করতে পারে না।
আজ সূর্যের আলোর ন্যায় এ কথা সুস্পষ্ট যে, মুসলিম জাতি ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ সময় অতিক্রম করছে। গোলামির শিকলে আজ তারা আবদ্ধ। পৃথিবীর দিকে দিকে তাকালে দেখা যায় মুসলমানদের নিদারুণ অসহায়ত্বের মর্মন্তুদ দৃশ্য। আজ অত্যাচার ও নিপীড়নের খড়গ নেমে এসেছে তাদের ওপর। দেশে দেশে নির্যাতিত অসহায় মুসলমান নারী পুরুষদের আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে উঠেছে পৃথিবীর আকাশ বাতাস। সাগরে ভেসে বেড়াচ্ছে মুসলমান শিশু ও বৃদ্ধের লাশ। সামগ্রিকভাবে মুসলিম উম্মাহ আজ ইতিহাসের সর্বাধিক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি।
এ নিদারুণ ক্রান্তি ও অচল অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে, লজ্জাস্কর এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হলে উম্মাহর তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন তরুণ ও যুব প্রজন্মের হাতেই পরিবর্তন ঘটবে অধুনা মুসলমানদের করুণ পরিস্থিতির। তাদের হাতেই রচিত হবে আগামীর বিজয়। তবে এর জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু কর্মপন্থা ও উত্তম কতিপয় করণীয়। যা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। নিম্নে মুসলিম তরুণ ও যুব প্রজন্মের করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করা হলো, যার মাধ্যমে উম্মাহর অবস্থার পরিবর্তন সাধিত হবে।

📘 হে যুবক! ফিরে এসো রবের দিকে > 📄 তরুণ প্রজন্মকে ভ্রষ্টতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে

📄 তরুণ প্রজন্মকে ভ্রষ্টতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে


উম্মাহর অবস্থা পরিবর্তনে মুসলিম যুবকদের অজ্ঞতা ও ভ্রষ্টতার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আল্লাহর নাফরমানি ও অবাধ্যতা থেকে ফিরে আসতে হবে সঠিক পথে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার রজ্জুকে আঁকড়ে ধরতে হবে সুদৃঢ়ভাবে। মুসলিম তরুণ প্রজন্মের নিজেদের পরিবর্তনের সকল উপায় তাদের নিকটই রয়েছে। তারা যদি আন্তরিকভাবে চায় তবেই তারা সরল ও সঠিক পথে ফিরে আসবে।
আজ মুসলিম তরুণ প্রজন্মের অবস্থা খুবই মন্দ। তাদের চারিত্রিক অবনতি ঘটেছে অত্যন্ত করুণভাবে। তাদের চলনে-বলনে নেই ইসলামের ন্যূনতম নিদর্শন। বাহ্যিকভাবে তাদের সুখী দেখালেও ভেতরে তারা যাপন করছে অতি কষ্টের জীবন। তাদের যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কেমন আছে? তাহলে জবাবে তারা বলে, সুখে ও আনন্দে আছে। কিন্তু বাস্তবে তারা সুখে নেই। তাদের পার্থিব জীবনকে ঘিরে রেখেছে কঠিন যন্ত্রণা।
আমি আমার নিজ অভিজ্ঞতা থেকে একটি ঘটনা বলছি। একবার আমি জরুরি প্রয়োজনে রিয়াদে যাচ্ছিলাম। বিমানে আমার এক পূর্ব-পরিচিত বন্ধুর সাথে দেখা। একসময় আমাদের মাঝে খুবই আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তারপর জীবন ও জীবিকার ব্যস্ততায় পরস্পরে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। দীর্ঘ দশ বছর আমাদের সাক্ষাৎ হয়নি। সেদিন বিমানে তার সাথে আমার আচমকা সাক্ষাৎ ঘটে। দীর্ঘ বিরতির পর আকস্মিক এ সাক্ষাতে আমরা উভয়ে যারপরনাই আনন্দিত হয়েছি। উষ্ণ আলিঙ্গনে আমরা জড়িয়ে ধরি একে অপরকে। বিমানে আমরা পাশাপাশি বসি। নিজেদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দীর্ঘ কথা হয়। প্রথম যখন তার সাথে দেখা হয়, আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, কেমন আছে? সে অভ্যাস অনুযায়ী জটপট উত্তর দিলো, খুবই ভালো আছে এবং পরিবার নিয়ে সুখে শান্তি আছে। ইতোমধ্যে বিয়েও করেছে। একটি ফুটফুটে পুত্রসন্তানও জন্ম নিয়েছে তাদের সংসারে। তার জীবনের সুখময় ঘটনাগুলো শোনে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হচ্ছি। কিন্তু এ সবকিছুই ছিল মিথ্যা। মিষ্টি কথার আড়ালে লুকিয়ে ছিল নীল যন্ত্রণা। সুন্দর হাসির পেছনে লুকিয়ে আছে দীঘল দুঃখের সাতকাহন। বাস্তবিক অর্থে সে সুখী ছিল না। তার জীবনে কোনো প্রশান্তি ও স্থিরতা ছিল না। তার পরিবার আছে, স্ত্রী সন্তান আছে কিন্তু সুখ নেই। কথায় কথায় যখন আমরা জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করছি তখন সে তার জীবনের প্রকৃত অবস্থা আর লুকিয়ে রাখেনি আমার নিকট। আর যেহেতু আমি তার বাল্যবন্ধু তাই অন্য সবার মতো আমাকে শেষ পর্যন্ত ধোঁকা দেয়নি।
সে বলতে লাগল তার জীবনের দীর্ঘ কাহিনি। আমি দেখি তার জীবন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নাফরমানি ও অবাধ্যতায় পূর্ণ। গোনাহ ও পাপাচারের কাহিনিতে ভরপুর। সে বলল, 'আমি আজ এক বছর আমার পরিবার থেকে দূরে। দীর্ঘ এ সময় আমার স্ত্রী সন্তানের সাথে কোনো প্রকার দেখাসাক্ষাৎ নেই। আমাদের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়। ঝগড়া করে আমার স্ত্রী একদিন তার পিতৃগৃহে চলে যায়। আমার সংসার যেন একটি জাহান্নাম। যেখানে সর্বদা অশান্তির আগুন জ্বলছে। প্রকৃতার্থে এ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার ওপর শান্তি। আমি বহু অন্যায় ও পাপাচারে লিপ্ত হয়েছি। আমার ব্যক্তিগত জীবনে নেই ইসলামের অনুশাসন। আল্লাহর আদেশ- নিষেধের পরোয়া করি না। তার আনুগত্য করি না। এর মধ্যে একটি ঘটনা আমার জীবনে দারুন প্রভাব ফেলেছে। একবার আমি জরুরি ভ্রমণে দেশের বাহিরে যাই। এক সপ্তাহের একটি ব্যাবসায়িক ভ্রমণ ছিল।
ঘটনাক্রমে সেখানে একটি খারাপ মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়। ক্রমান্বয়ে সে পরিচয় অধিক ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। শয়তান আমাকে প্ররোচনা দিতে থাকে। তাছাড়া আমার জীবনে তো ইসলামের বিধি-নিষেধের কোনো প্রভাব ছিল না। একরাতে আমি সে মেয়েটিকে নিয়ে হোটেলে ওঠি। অথচ আমি বিবাহিত। আমার সুন্দরী স্ত্রী আছে। তথাপিও আমি তার পেছনে লেলিয়ে পড়ি। আমি যখন আমার ও মেয়েটির শরীর থেকে সমস্ত কাপড় খুলে ফেলি তখন মসজিদের মিনার থেকে আজান ভেসে আসে। আমি তখন দেখি, আজান ও আল্লাহর নামের অপূর্ব ধ্বনি মেয়েটির মধ্যে এক আশ্চর্য পরিবর্তন সৃষ্টি করে। সে দ্রুত নিজেকে আমার বাধন থেকে মুক্ত করে নেয়। কাপড় পরিধান করে বাথরুমে চলে যায়। তারপর অতি উত্তমরূপে সে অজু করে। আজান শেষ হলে রুমে এসে নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। এবং আল্লাহর নিকট তার কৃত পাপের জন্য কান্নাকাটি করতে থাকে। আমি আশ্চর্য হয়ে তার অবস্থা প্রত্যক্ষ করছি। কিন্তু তার এমন বিস্ময়কর পরিবর্তন দেখেও আমার মাঝে কোনো প্রকার পরিবর্তন আসেনি। আমার মন পূর্বের মতোই কদর্যতায় ভরপুর ছিল। আমি মেয়েটির সাথে আর কোনো কথা না বলে হোটেল থেকে বের হয়ে চলে আসি। আর ভাবতে থাকি, আমার নোংরা জীবন সম্পর্কে। আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানি করতে করতে আমি কোন পর্যায়ে চলে গেছি যে, আজানের ধ্বনি একজন বেশ্যা মেয়ের মাঝে পরিবর্তন এনেছে কিন্তু আমার হৃদয়ে কোনো প্রকার ভাবান্তর সৃষ্টি করেনি। আমি বুঝতে পারি, আমার দীর্ঘ জীবনের পাপ আমাকে নষ্ট ও ভ্রষ্টতার চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। আমি আর কতকাল এ অবস্থায় অবিচল থাকব? আমি এর থেকে বের হয়ে আসতে চাই।'
তার জীবনের বৃত্তান্ত শুনে আমি খানিক স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। আমার মনোজগতে ভাসতে থাকে তার নিদারুণ যন্ত্রণায়ময় জীবনের ছবি। আমি কল্পনা করতে থাকি, অশান্তির অনলে পুড়তে থাকা আমার বন্ধুর যাপিত জীবন। তার বাহির ও ভেতরের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাহিরে তাকে দেখা যায় একজন সুখী ও প্রশান্তচিত্তের মানুষ। এবং লোকজন জিজ্ঞেস করলে সে এমনই বলে। কিন্তু প্রকৃতার্থে সে চরম অসুখী ও অশান্তির অনলে প্রজ্জ্বলিত। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, নামাজে দাঁড়ালে তোমার অবস্থা কেমন হয়? সে বলল, আমি নামাজ পড়ি না। আমি আশ্চর্য হয়ে তাকে বললাম, কেন তুমি নামাজ পড় না? আল্লাহর আদেশ-নিষেধের ব্যাপারে তোমার কি কোনো জ্ঞান নেই? তুমি কি জানো না আল্লাহর পরিচয়? আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তার সকল বান্দাকে নামাজের আদেশ করেছেন। নামাজের মাধ্যমেই সম্ভব জীবনের পরিবর্তন। যার নামাজ যত সুন্দর তার জীবন ঠিক তত সুন্দর। সুতরাং নামাজ আদায়ে সচেষ্ট হও। নামাজে স্থির হও। সর্বদা নামাজ আদায় করো। মসজিদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করো। হৃদয়কে মসজিদের সাথে বেঁধে নাও শক্তভাবে। তবেই জীবনে পরিবর্তন আসবে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ততক্ষণ পর্যন্ত কারো জীবন পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না সে নিজে তার জীবন পরিবর্তনের ইচ্ছে করে। আমার সাথে সামান্য সময়ের অবস্থানে তার মধ্যে অভাবনীয় পরিবর্তন সৃষ্টি হলো। তার চোখে-মুখে আমি পরিবর্তনের ঝিলিক প্রত্যক্ষ করছিলাম। আমার যুবক বন্ধুটি আমার সাথে থেকে যেতে চাইল এবং তার জীবন পরিবর্তন করার আগ্রহ পেশ করল। কিন্তু আমি একটি জরুরি কাজে যাচ্ছিলাম। তাই আমি তাকে সাময়িক বিদায় জানিয়ে পুনরায় সাক্ষাতের আশাবাদ ব্যক্ত করে বিমান থেকে অবতরণ করে তার থেকে বিদায় নিলাম। কদিন পর পুনরায় তার সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। সে আমাকে দেখে দ্রুত এগিয়ে এলো। তার বর্তমান অবস্থার কথা জানাল। সে বলল, আমি নামাজ পড়ছি। আমি যখন প্রথম নামাজ পড়ি তখন হৃদয়ে অন্যরকম এক প্রশান্তি অনুভব করি। আমার তখন অনুভব হয় যে, আমি আল্লাহর অতি নিকটে দাঁড়িয়ে আছি। আল্লাহ ও আমার মাঝে দ্বিতীয় কোনো প্রতিবন্ধকতা আমি অনুভব করিনি। এভাবেই তার জীবন পরিবর্তনের সূচনা হলো। নামাজের মাধ্যমে সে আল্লাহর পরিচয় লাভ করতে থাকে। এবং নিজের অতীত পাপেভরা জীবন পরিত্যাগ করে সত্য ও সুন্দরের পথে ফিরে আসে।
মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত ধ্বংস ও ক্ষতির মাঝে ডুবে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না হৃদয়ে আল্লাহর পরিচয় লাভ করবে। আল্লাহর বড়ত্ব ও মাহাত্ম্যের মারেফত অর্জন করা ব্যতীত মানুষ তার জীবনের পরিবর্তন সাধিত করতে পারবে না। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ 'আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদত করার জন্য।' ⁶
এ আয়াতের একটি ব্যাখ্যা হলো, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি তোমরা আমার পরিচয় জানার জন্য। সুতরাং যদি তুমি নামাজ আদায় না করো, আল্লাহর সামনে নিজেকে নত না করো তাহলে কীভাবে আল্লাহর পরিচয় লাভ করবে? যদি আল্লাহর আদেশসমূহ পালন না করো, নিষেধসমূহ থেকে বিরত না থাকো তাহলে কীভাবে তুমি তোমার রবের পরিচয় অর্জন করবে? তুমি আল্লাহর বান্দা। তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। তোমার প্রয়োজনীয় সকল জিনিস তিনি তোমাকে দান করেছেন। তাই অত্যাবশ্যক হলো, আল্লাহর পরিচয় হৃদয়ে ধারণ করা। আল্লাহর আনুগত্যশীল বান্দা হয়ে জীবনযাপন করা। নচেৎ জীবনে নেমে আসবে অসহনীয় দুর্যোগ। অশান্তি ও অস্থিরতা ঘিরে ধরবে জীবনকে। তুমি যদি অন্যায় ও পাপকর্ম থেকে ফিরে না আসো তাহলে তোমার স্ত্রী তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে। তোমার পরিবার-পরিজন তোমাকে পরিত্যাগ করবে। পৃথিবীর সকল মানুষ তোমাকে অবজ্ঞা করবে। এর কারণ তোমার পাপ ও আল্লাহর অবাধ্যতা। স্রষ্টার অবাধ্যতা ও নাফরমানি তোমার জীবনে ডেকে নিয়ে আসবে সমূহ অশান্তি। প্রবল ঐশ্বর্যের ভেতর থেকেও তুমি খুঁজে পাবে না শান্তির দেখা। আর যদি আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার পরিচয় লাভ করতে পারো, হৃদয়ে ধারণ করতে পারো মহান সে রবের সন্তুষ্টি, তাহলে বিত্ত-বৈভবহীন জীবনেও দেখা পাবে সুখের অঢেল প্রাচুর্য। মূলত আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তার নির্দেশিত জীবন পরিচালনাই জীবনে আনতে পারে সুখ।
আজ মুসলিম তরুণদের হৃদয়ে আল্লাহর পরিচয় নেই। তারা জানে না আল্লাহর আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে। সর্বদা তারা বহু অন্যায় ও পাপকর্মে নিমজ্জিত। তারা চলছে, ফিরছে ও হাসছে। কিন্তু প্রকৃতার্থে তাদের জীবন বিষাদে ভরপুর। তাদের সে জীবনে নেই শান্তি ও সুখের পরশ। বাহ্যিকভাবে তাদের হাসতে দেখা গেলেও তাদের হৃদয় যন্ত্রণার অশ্রুতে ভরপুর। তাদের জীবনের খাঁচা থেকে সুখপাখি উড়ে গেছে। আর এসব কিছুই তাদের পাপ ও গোনাহের ফসল। সুতরাং তুমি তোমার পাপী ও গোনাহগার বন্ধুদের বলো, তারা যেন ফিরে আসে। পরিত্যাগ করে আল্লাহর অবাধ্যতা ও নাফরমানি। প্রকৃত শান্তি ও সুখের জীবনে তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা ও শ্রম অব্যাহত রাখো।

টিকাঃ
৬ সুরা যারিয়াত: ৫৬

📘 হে যুবক! ফিরে এসো রবের দিকে > 📄 নামাজের প্রতি যুবকদের যত্নবান হতে হবে

📄 নামাজের প্রতি যুবকদের যত্নবান হতে হবে


একবার আমি রাতের শেষ প্রহরে গাড়িতে চড়ে দূরে কোথাও যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে তিনজন যুবককে দেখতে পেলাম তারা রাতের অন্ধকারে হাঁটছে। তাদের দেখে আমি গাড়ি থামালাম। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তারা কোথায় যাবে? দাম্মামে যাবে, একজন উত্তর দিলো। বললাম, আমিও সেদিকেই যাব, চাইলে তোমরা আমার সাথে গাড়িতে উঠতে পারো। আমি তোমাদের গন্তব্যস্থলে নামিয়ে দেব। তারা গাড়িতে উঠল। বয়সে তারা ছিল সদ্য তরুণ। সকলের বয়স একুশ-বাইশ হবে। চলতে চলতে আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা দাম্মামে কেনো যাচ্ছ? তারা বলল, চাকরির জন্য।
চাকরির জন্য তারা এতদূর পথ পাড়ি দিচ্ছে। এ নিন্দনীয় কিছু নয়। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সকলকে রিজিক অনুসন্ধান করতে আদেশ করেছেন। তাই চাকরির অনুসন্ধানে বহুদূর পাড়ি দেওয়া দোষের কিছু নয়। কিন্তু দোষের বিষয় হলো, রিজিকের জন্য এত দূর পাড়ি দিচ্ছে, সীমাহীন কষ্ট সহ্য করছে, কিন্তু আল্লাহ তায়ালার হক পালনের ব্যাপারে তাদের মাঝে কোনো প্রকার আগ্রহ উদ্দীপনা নেই। রিজিকের তালাশে পাড়ি দিচ্ছে এক শহর থেকে আরেক শহর, কিন্তু আল্লাহর অপরিহার্য বিধান নামাজ পালনের জন্য তারা মসজিদে পর্যন্ত যায় না। রিজিক তালাশ করা দোষের কিছু নয়।
কিন্তু দোষের বিষয় হলো, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনে অমনোযোগী হওয়া। আমি তাদের বললাম, তোমরা আমাকে সত্য করে বলো তোমাদের সার্টিফিকেট এবং তোমাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কেমন? একজন মধ্যম স্তরের, বাকি দুজন এরও নিচে। এবার আমি তাদের বললাম, এ সমগ্র পৃথিবীর একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ তায়ালা। পৃথিবীল পূর্বাপর সবকিছু একমাত্র তার। রিজিক ও সফলতার চাবিকাঠি একমাত্র তার হাতে। তিনি যদি কাউকে সফলতা দান করেন তাহলে কেউ তাকে ফেরাতে পারবে না। আর তিনি যদি কাউকে ব্যর্থ করেন তাহলে কেউ তাকে সফল করতে পারবে না। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন। আল্লাহর সাথে যে আছে, আল্লাহর তার সাথে আছেন। আল্লাহ ও বান্দার সম্পর্ক হলো পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও দামি সম্পর্ক। মানুষের সফলতা ও ব্যর্থতা লুকিয়ে আছে এ সম্পর্কের গভীরে। জেনে রেখো! নামাজ হলো এমন ইবাদত যা আল্লাহ ও বান্দার মাঝে সম্পর্ক স্থাপন করে। নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সাথে বান্দা বিশেষ কথোপকথন করে। বান্দা আল্লাহর নিকট তার সাহায্যের কথা ব্যক্ত করে। আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন। সুতরাং আল্লাহ ও বান্দার সম্পর্কের সূচনা হয় নামাজের মাধ্যমে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى
'তোমার পরিবার-পরিজনকে নামাজের আদেশ করো এবং নিজে তাতে অবিচল থাকো। আমি তোমার কাছে কোনো জীবিকা চাচ্ছি না। আমিই তোমাকে জীবিকা দিয়ে থাকি। আর শুভ পরিণাম তো তাদের জন্য যারা আল্লাহকে ভয় করে।'⁷
নামাজ হলো ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। নামাজের মাধ্যমে নির্ধারণ হয় আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার সাথে কার কেমন সম্পর্ক। তাই আমি তাদের প্রথমে নামাজের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। আমার পাশে যে বসেছে তাকে সর্বাগ্রে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি নামাজ পড়? সে বলল, হে শাইখ! আমি কি সত্য বলব নাকি মিথ্যা বলব? আমি বললাম, তুমি যদি মিথ্যা বলো তাহলে মিথ্যার পরিণাম তোমার ওপরই পতিত হবে আর যদি সত্য বলো তাহলে যাবতীয় কল্যাণ তোমার জন্য। আমার কথা শুনে যুবকটি বলল, হে শাইখ! আমি সত্যই বলছি, আমি নামাজ পড়ি না। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি কাফের? সে বলল, না। আমি বললাম, তাহলে নামাজ পড় না কেন? অথচ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসে ইরশাদ করেছেন,
العهد الذي بيننا وبينهم الصلاة فمن تركها فقد كفر بين المرء وبين الكفر ترك الصلاة
'আমাদের মাঝে এবং তাদের মাঝে অঙ্গীকার হলো নামাজ। সুতরাং যে নামাজ ছেড়ে দিলো সে কাফের হয়ে গেল। মুসলমান ও কাফেরের মাঝে ব্যবধান হলো নামাজ ছেড়ে দেওয়া।৮
জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি চাও তোমাকে কাফের নামে সম্বোধন করা হোক? সে বলল, না। আমি বললাম, তাহলে নামাজ আদায়ের প্রতি যত্নবান হও। ঈমানের পর নামাজই হলো ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আমল।
দ্বিতীয় যুবকটি বলল, আমি তার চেয়ে ভালো আছি। আমি বললাম কীভাবে?
সে বলল, দৈনিক দুই ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। আমি বললাম, এ তো ভারি আশ্চর্যের কথা। তুমি কি নতুন কোনো শরিয়ত প্রবর্তন করেছ? আল্লাহ তায়ালা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আদেশ করেছেন। আর তুমি কিনা দিনে পড় মাত্র দুই ওয়াক্ত। হে আল্লাহর বান্দা! এ কেমন উদাসীনতা? ইসলামের ভিত্তি রাখা হয়েছে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ওপর। সে জিজ্ঞেস করল, আমার করণীয় কী? আমি বললাম, এখন থেকে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে।
তৃতীয় জনের ব্যাপার তো আরো ভারি আশ্চর্যের! সে বলল, আমি সাপ্তাহিক জুমার নামাজ পড়ি। প্রতি জুমায় একবার মসজিদে যাই।
এ হলো আজকের মুসলিম তরুণ প্রজন্মের অবস্থা। তারা সপ্তাহে একদিন মসজিদে যায়। আল্লাহ তায়ালার দেওয়া শরিয়তের পরিবর্তে তারা যেন মনগড়া নতুন শরিয়ত প্রবর্তন করেছে। তারা কেবল বিপদে পতিত হলেই আল্লাহকে স্মরণ করে। বিপদে পতিত হলে দৌড়ে মসজিদে যায়। আল্লাহকে ডাকে। আর যখন বিপদ কেটে যায় অমনি তারা ভুলে যায় আল্লাহকে। ভুলে যায় মসজিদ।
মৃত ব্যক্তিদের গোসল দেন এমন এক ব্যক্তি একটি করুণ কাহিনি শুনিয়েছেন। তিনি বলেন। এক যুবক। সুদর্শন। শারীরিক সক্ষমতায় ছিল পূর্ণ। হঠাৎ মৃত্যুবরণ করে। তাকে গোসল দেওয়ার জন্য আমাকে ডাকা হলো। আমি যখন গোসল দেওয়ার জন্য তার মুখমণ্ডল খুলেছি, দেখি-তার সুন্দর চেহারা অত্যন্ত কুৎসিত ও ভয়ংকর আকৃতি ধারণ করে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সত্যই বলেছেন,
وَلَوْ تَرَى إِذْ يَتَوَفَّى الَّذِينَ كَفَرُوا الْمَلَائِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَارَهُمْ وَذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ ذَلِكَ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيكُمْ وَأَنَّ اللَّهَ لَيْسَ بِظَلامِ لِلْعَبِيدِ
'ফেরেশতারা যখন কাফেরদের জান কবজ করে তখন তুমি যদি দেখতে, তারা তাদের মুখে ও পাছায় আঘাত করে আর বলে, জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি আস্বাদন করো। এটি তোমাদের কৃতকর্মের ফল। আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি জুলুম করেন না।'⁹
وَمَا ظَلَمَهُمُ اللَّهُ وَلَكِنْ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ .
'আল্লাহ তাদের প্রতি জুলুম করেননি, বরং তারা নিজেরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে।'¹⁰
লোকটি বলেন, এ দেখে আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যাই। ভয়ে আমি গোসলখানা থেকে দ্রুত বের হয়ে আসি। বাহিরে যুবকের পিতা দাঁড়নো ছিল। আমি তার পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম যুবকের ঈমান-আমল সম্পর্কে? কেন এমন পরিণতি হলো তার? তিনি আমাকে বললেন, সে নামাজ পড়ত না। আমল সম্পর্কে ছিল সম্পূর্ণ গাফেল ও উদাসীন।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! যুবকটি ছিল গাফেল। আমলের প্রতি ছিল তার চরম উদাসীনতা। তাই সে নামাজ পড়ত না। আর তাই তার পরিণতি কেমন নিদারুণ হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ اعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يُحْيِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ
'আল্লাহর স্মরণ ও তার অবর্তীর্ণ সত্যের কল্যাণে মুমিনদের জন্য কি সময় হয়নি যে, তাদের অন্তর বিনম্র হবে এবং তারা তাদের মতো হবে না যাদের ইতিপূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল? অতঃপর বহুকাল অতিক্রান্ত হওয়ায় তাদের অন্তর শক্ত হয়ে গিয়েছে। তাদের অনেকেই অবাধ্য। জেনে রেখো! আল্লাহ জমিনকে মৃত্যুর পর জীবিত করেন। আমি তোমাদের জন্য নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পারো।'¹¹
আমি সে তিন যুবককে বললাম, তোমরা কি জানো? আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে কতবার নামাজের কথা বলেছেন? নব্বই এবং তারও অধিকবার নামাজের কথা বলেছেন। নিশ্চয়ই তোমরা অনুধাবন করতে পারছ নামাজের গুরুত্ব কত সীমাহীন। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম বান্দার যে আমলের হিসাব চাইবেন তা হলো নামাজ। নামাজের হিসাবে যে ঠিক ঠিক উত্তীর্ণ হতে পারবে তার অন্যান্য হিসাব সহজ হয়ে যাবে। তাই নামাজের প্রতি উদাসীন হয়ো না। গুরুত্বের সাথে মসজিদে জামাতের সাথে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের রিজিকের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে তিনি তোমাদের রিজিকের ব্যবস্থা করবেন। জীবিকার ব্যাপারে তোমাদের পেরেশানি দূর হয়ে যাবে।
এক যুবক আমাকে একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা শুনিয়েছে। যুবকটি বলল, আমার এক বন্ধু ছিল। আমি ও সে কখনো নামাজ পড়তাম না। নামাজের সময় আমরা খেল-তামাশায় মত্ত থাকতাম। বরং যারা নামাজ পড়ত আমরা তাদের নিয়ে বিদ্রূপ করতাম। একদিন রাতভর আমরা খেল-তামাশায় মত্ত থেকে সকালে যার যার বাড়ি এসে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। কিছুক্ষণ পর আমার বড় ভাই আমাকে তাড়াহুড়ো করে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলল। এবং বলল, আমার বন্ধুটি মারা গেছে। প্রথমে আমি তার কথা বিশ্বাস করিনি। ভেবেছি দুষ্টুমি করছে হয়তো। কেননা, কিছুক্ষণ পূর্বেই আমি ও সে একসঙ্গে ছিলাম। কিন্তু আমার ভাই অত্যন্ত জোরগলায় বলতে লাগল। আমি আমার বন্ধুর বাড়ির দিকে রওনা হই। পথে তার পিতার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলো। তিনি কাঁদতে কাঁদতে আমাকে তার মৃত্যুর সংবাদ দিলেন। ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি অব্যাহত ঘৃণাচর্চার কারণে আমার সে বন্ধুকে গোসল দেওয়া হয়নি। মুসলমানদের কবরে তাকে দাফন করা হয়নি। সে নামাজ পড়ত না। বরং যারা নামাজ পড়ত তাদেরকে ঠাট্টাবিদ্রুপ করত। তার কৃতকর্মের ফলস্বরূপ তাকে গোসল ও মুসলমানদের কবরে দাফন করা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তারপর তিনি বললেন, আমি কতবার তোমাদের দুজনকে পাপ ও অন্যায় কাজ ছেড়ে দিতে বলেছি। নামাজ পড়তে বলেছি। কিন্তু তোমরা কখনো আমার কথায় কর্ণপাত করোনি।
এ ঘটনা আমার জীবনকে দারুণ প্রভাবিত করেছে। আমি সেদিন উপলব্ধি করতে পারি, আমি আসলে জঘন্য অন্যায় ও ভুলের ওপর আছি। একদিন আমাকেও তার মতো মৃত্যুবরণ করতে হবে। প্রতিটি মানুষকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। চাই সে আকাশে থাকুক কিবা জমিনে। যেখানেই থাকুক মৃত্যু তাকে গ্রাস করবেই। এ অবশ্যম্ভাবী। সেদিনই আমার পিতা আমাকে সতর্ক করে বললেন, তুমি যদি নামাজ না-পড় তাহলে লোকেরা তোমাকেও মুসলমানদের কবরে দাফন করতে দেবে না। তাই তুমি ফিরে এসো সঠিক পথে। তিনি আমাকে নিয়মিত নামাজ আদায় করতে বললেন। মানুষের সাথে সদাচরণ করতে বললেন। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার প্রতি গুরুত্বারোপ করলেন। পার্থিব জীবনের অসারতার কথা তুলে ধরলেন আমার সামনে। তুলে ধরলেন মৃত্যু-পরবর্তী অসীম জীবনের কথা। যেখানে রয়েছে কঠিন কঠিন ঘাটি। রয়েছে বিভীষিকাময় জাহান্নাম। যা প্রস্তুত করা হয়েছে گنهگارদের জন্য। তাদের জন্য যারা নামাজ পড়ে না। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলে না। পিতার কথা আমার হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করল। আর যেহেতু আজ সকালেই আমার প্রিয় বন্ধু আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেছে এবং তার সাথে ঘটে গেছে হৃদয়বিদারক ঘটনা তাই আমার হৃদয় ছিল অত্যধিক আর্দ্র ও আবেগতাড়িত। এরপর আমার জীবনে পরিবর্তন আসে। আমি নিজেকে পরিবর্তনের প্রতি বিশেষ মনোযোগী হই। আমি অনুভব করি, হায়াতের অফুরন্ত সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু পরকালের জন্য সঞ্চয় করতে পারিনি কিছুই। আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি ছিলাম উদাসীন। সেদিন থেকেই আমি মসজিদে যেতে শুরু করি। অবশিষ্ট জীবন সরল ও সঠিক পথে চলার শপথ গ্রহণ করি।'
আল্লাহর শপথ! মুসলিম যুবকরা আজ বিচ্যুতি ও ভ্রষ্টতার চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করেছে। তাদের মাঝে নেই ইসলামি বিধি-নিষেধের ন্যূনতম দায়িত্ববোধ। প্রবৃত্তির অনুসরণ তাদের ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। বস্তুবাদ ও দুনিয়ার নেশায় আজ তারা অন্ধ। প্রতিটি পাড়া-মহল্লার মসজিদে মুসলিম যুবকদের উপস্থিতি সবচেয়ে কম। অথচ উম্মাহর ভাগ্য পরিবর্তনের নেতৃত্ব ছিল তাদেরই হাতে। উম্মাহর দুর্দশা ও অবনতির পেছনে প্রধানত দায়ী মুসলিম যুব ও তরুণ প্রজন্ম ইসলামের সরল-সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া। তারা যদি মনে-প্রাণে কামনা করে মুসলিম জাতি তার পুরনো গৌরব অর্জন করুক তাহলে সর্বপ্রথম তাদের নিজেদের পরিবর্তন করতে হবে। তারা যদি ধ্বংসের গর্ত থেকে উঠে আসে তবেই মুসলিম জাতি উঠে আসবে পতনের অতল গহ্বর থেকে।
মৃত ব্যক্তিদের গোসল দেন এমন ব্যক্তি একটি অতি আশ্চর্যজনক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এক যুবককে গোসল দেওয়ার জন্য আমি ভেতরে প্রবেশ করি। আমার সাথে ছিল আরো একজন। আমরা যখন মৃত ব্যক্তিকে গোসল দিচ্ছি তখন পুরো গোসলখানায় এক আশ্চর্য সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ে। অপূর্ব সুঘ্রাণে চারপাশ সুরভিত ও মোহিত হয়ে যায়। বর্ণনাকারী বলেন, আমি আমার সহকারীকে বললাম, তুমি কি সুঘ্রাণ পাচ্ছ? সে বলল, হ্যাঁ। বর্ণনাকারী বলেন, ইতিপূর্বে আমি কখনো এমন সুঘ্রাণ পাইনি। এবং তার মুখমণ্ডল অতি উজ্জ্বলতায় ফকফক করছিল। আমি অসংখ্য ব্যক্তিকে গোসল দিয়েছি কিন্তু এমন সুন্দর চেহারা কোনো মৃত ব্যক্তির দেখিনি। আমি অত্যন্ত আগ্রহ উদ্দীপনার সাথে যুবককে গোসল দিলাম। পরবর্তীতে আমি জানতে পারি, যুবকটি ছিল অত্যন্ত সৎ ও পরহেজগার। তাকওয়া ও খোদাভীতিতে তার অন্তর ছিল পরিপূর্ণ। সৎকাজের আদেশ করত, অসৎকাজ থেকে লোকদের বিরত রাখত। তার জীবন ছিল সততা ও উত্তম আদর্শে মোড়ানো।
আমরা তাকে গোসল, কাফন ও জানাজা শেষে কবরস্থানে নিয়ে গেলাম। আমি নিজেই যুবককে কবরস্থ করি। আল্লাহর কসম! আমি দেখি, কবরে রাখার পর তার লাশ কেমন নড়ে উঠল। অথচ কেউ তাকে স্পর্শ করেনি। আমি আশ্চর্য হয়ে আমার সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করলাম। তারাও এমনটি অনুভব করল। তার চেহারা আপনা থেকেই কেবলামুখি হয়ে গেল। আমি আশ্চর্য-হয়ে যুবকের মুখমণ্ডলের দিকে তাকালাম। দেখি সে হাসছে। অতি উজ্জ্বল তার চেহারার রঙ। যেন আকাশ থেকে পূর্ণিমার চাঁদ নেমে এসেছে কবরে। আমি ধারণা করলাম, সত্যিই সে মৃত্যুবরণ করেছে কি না। কিন্তু পরক্ষণেই আমার সন্দেহ দূর হয়ে গেল। কারণ, আমিই তো তাকে গোসল দিয়েছি আর আমি জানি সে ছিল একজন আদর্শবান যুবক। মসজিদের সাথে ছিল তার সুদৃঢ় সম্পর্ক। আনুগত্যের শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল তার জীবন। কখনো আল্লাহর অবাধ্যতা করেনি। আমরা যুবককে কবরস্থ করে ফিরে এলাম।'
এ তো আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার ঘোষিত বাণীর বাস্তব রূপ। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ
'যারা বলে আমাদের প্রভু আল্লাহ অতঃপর সত্যের ওপর অবিচল থাকে (মৃত্যুর সময়) তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না ও চিন্তিত হয়ো না। আর তোমাদের যে জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হতো তা শুনে নাও।' ¹²

টিকাঃ
৭ সুরা তহা: ১৩২
৮ এ হাদিসের মাধ্যমে নামাজের গুরুত্ব বর্ণনা করা উদ্দেশ্য। ঈমানের পর সর্বোত্তম ইবাদত হলো নামাজ। নামাজ পরিত্যাগকারীর ভয়াবহ পরিণাম ও ইসলামের ব্যাপারে তার ঈমানের দুর্বলতা বর্ণনা করতেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। যে মুসলমান নামাজ পড়বে না তার ঈমান পরিপূর্ণ নয়। এর দ্বারা সে কাফের হবে না। হ্যাঁ, কেউ যদি নামাজকে অস্বীকার করে তাহলে কাফের হয়ে যাবে।
৯ সুরা আনফাল: ৫০-৫১
১০ সুরা আলে ইমরান: ১১৭
১১ সুরা হাদিদ: ১৬-১৭
১২ সুরা হা মিম সিজদাহ: ৩০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00