📄 হযরত আবূ বকর শিবলী (রহ)
নাফাহাতুল উন্ন্স-এ মওলানা আব্দুর রহমান জামী (রহ) হযরত শিবলীর (রহ) নাম উল্লেখ করেছেন আবু বকর জাফর ইবনে ইউনুস হিসেবে। হাজবীরী 'কাশফুল মাজুব'-এ বলেছেন তার নাম 'দালফ ইবনে জাহদার'। তিনি সূফী ও আরেফদের শিরোমণি এবং তাসাওফের পুরোধা বুজর্গগণের অতিশয় শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। শেখ ফরীদুদ্দীন আত্তার (রহ) তাজকিরাতুল আউলিয়ায় আরো বলেছেন: আধ্যাত্মিক হাল ও জ্ঞানে তার সমকক্ষ ছিল না। তিনি রহস্যজ্ঞান, তত্ত্বকথা, ইঙ্গিতবহ ভাষা ও বক্তব্য, কৃচ্ছসাধনা ও কারামত প্রভৃতি ক্ষেত্রে উন্নতির এতখানি উচ্চমার্গে ছিলেন যে, ভাষা ও বর্ণনায় তার গণনা অসম্ভব। তিনি বহু হাদীস লিখেছিলেন আর শুনেছিলেন। ফিকাহতে তিনি ইমাম মালেকের অনুসারী ছিলেন এবং মানুষের জন্য ছিলেন আল্লাহ্র সাক্ষ্য প্রমাণ- 'হুজ্জাত'।
শেখ ফরীদুদ্দীন আত্তার (রহ) আরো লিখেছেন যে, শিবলী (রহ) প্রথম জীবনে দামাভান্দ এর আমীর ছিলেন। ও সময় বাগদাদ থেকে তাঁর কাছে খলীফার একটি পত্র আসে। তিনি একদল সঙ্গি নিয়ে খলীফার দরবারে হাজির হন।
খলীফা একটি খেলাত- (রাজকীয় উপাধির জামা) দান করেন। ফেরার সময় হঠাৎ আমীরের হাঁচি পায়। তখন তিনি খেলাত এর জামার আস্তীন নিয়ে মুখ ও নাকের পানি মোছেন। তৎক্ষণাৎ কথাটি খলীফার কানে পৌঁছে গেল। বলা হলো যে, রাজকীয় খেলাতের সাথে আমীর শিবলী এমন আচরণটি করেছেন। খলীফা হুকুম দিলে তার খেলাত কেড়ে নেয়া হল। আমীরের পদ থেকে তাকে অপসারণ করা হলো। এ ঘটনায় শিবলী যেন সম্বিত ফিরে পান। চিন্তা করতে লাগলেন যে, একজন মাখলুকের দেয়া খেলাতকে হাতের রুমাল হিসেবে ব্যবহার করলে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়, পদমর্যাদা থাকে না। আমীরের পদ চলে যায়। এখন কোনো লোক যদি জগতের বাদশাহ্ খেলাতকে রুমাল বানায়, তার সাথে কি আচরণ করা হবে? ঐ অবস্থায় তিনি খলীফার দরবারে ফিরে আসেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো- ব্যাপার কি, কেন আসলেন? তিনি বললেন: ওহে আমীর! আপনি তো আল্লাহ্ সৃষ্টজীব। আপনি পছন্দ করেন না যে, আপনার খেলাতের অমর্যাদা করা হোক। এখান থেকেই বুঝা যায় আপনার খেলাতের মূল্য কতখানি ছিল? জগতের যিনি বাদশাহ্, তিনি তো আমাকে খেলাত দিয়েছেন, আপন ভালবাসা ও পরিচয় আমাকে দিয়েছেন। কাজেই কে পছন্দ করবে যে, আমি একজন মাখলুকের খেদমত করার জন্য মহান খালেকের খেলাতের অমর্যাদা করি? একথা বলে তিনি বেরিয়ে আসেন এবং নাসসাজের মজলিসে গমণ করেন। নাসসাজ তাকে হযরত জুনাইদ বাগদাদীর খেদমতে প্রেরণ করেন। সেখানে কঠিন সাধনার মধ্য দিয়ে তিনি আধ্যাত্মিক দীক্ষা ও সিদ্ধি লাভ করেন। তরীকত সম্বন্ধে প্রথমে যিনি ইঙ্গিত ইশারায় কথা বলেন, তিনি ছিলেন যুন্নুন মিসরী (রহ)। জুনাইদ বাগদাদী (রহ) এসে তাসাওফ-বিজ্ঞান বিন্যস্ত করেন। শিবলী (রহ) তা জনসমক্ষে প্রকাশ্য রূপ দেন।
শিবলী ৩২৪ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। তবে, নাফাহাতুল উন্ন্স-এ হযরত জামী (রহ) তার মৃতু সাল ৩৩৪ হিজরীর যিলহজ্ব মাস বলে উল্লেখ করেছেন।
📄 হযরত হাতেম আসেম (রহ)
আসল নাম আবু আব্দুর রহমান হাতেম ইবনে ইউসুফ। ২৩৭ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। তিনি হিজরী তৃতীয় শতকের খোরাসানের বিখ্যাত সূফী এবং হযরত শাক্বীকু বালখীর সমসাময়িক ও বন্ধু ছিলেন। সূফীয়ায়ে কেরামদের জীবনী গ্রন্থে তার বহু গুরুত্বপূর্ণ উক্তি ও মতামত বিধৃত হয়েছে। মানুষের প্রতি তার সম্মান বোধ, কারো মনে কষ্ট না দেয়া সম্পর্কে একটি ঘটনা প্রসিদ্ধ।
একদিন এক বৃদ্ধা মহিলা তার খেদমতে এসে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করেন। এসময় হঠাৎ পেটের বায়ু নির্গত হলে মহিলা লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে পড়ে। হাতেম তখন বললেন: তুমি বড় করে বলো- আমি শুনতে পাচ্ছিনা। আমার কান বধির। যাতে, বৃদ্ধ মহিলা লজ্জিত না হয়। এরপর তিনি মাসআলাটির জবাব দেন। এর ফলে মহিলা বুঝতে পারল যে; (আগের কিছুই) তিনি শোনেন নি। মহিলা যতদিন জীবিত ছিলেন, হাতেম আসম নিজেকে বধির বানিয়ে রেখেছিলেন। এ জন্যেই তাকে আসম বা বধির বলা হয়।