📄 মুর্শিদের গুণাবলী
আল্লাহ্ পথের প্রত্যেক সাধকের জন্য একজন শায়খ, মুর্শিদ ও মুরব্বী থাকা উচিৎ। যিনি সঠিক দীক্ষা দিয়ে তার অপছন্দনীয় স্বভাব চরিত্রগুলো দূর করবেন এবং পরিবর্তে পছন্দনীয় স্বভাব চরিত্রের উন্মেষ ঘটাবেন। এই দীক্ষাদানের বিষয়টির কৃষকের কাজের সাথে মিল আছে। কৃষক জমি থেকে প্রথমে কাঁটা, পাথর তুলে নেয়, আগাছা পরিস্কার করে বাইরে ফেলে দেয়, যাতে শস্য ভালোভাবে জন্মায় এবং ভালো ফসল ফলে। আল্লাহর পথে যে সাধনা করবে, তারও একজন পীরের দরকার। যিনি তাকে আদব শিক্ষা দেবেন, আল্লাহর পথে হেদায়াত করবেন। কেননা, আল্লাহ্ তার বান্দাদের জন্য রাসূল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদেরকে সীরাতুল মুস্তাকীমে পরিচালনা করবেন। হযরত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ওফাত লাভ করেন, তখন তার স্থলাভিষিক্ত খলীফাদের রেখে যান, যাতে আল্লাহ্ দিকে মানুষের দিশারী হন।
শায়খ বা পীর হবার শর্ত হচ্ছে, তিনি রাসূলে খোদার নায়েব (স্থালাভিষিক্ত) বলে গণ্য হবেন, তাকে আলেম হতে হবে। তবে সব আলেম রাসূলে খোদা (স)-এর প্রতিনিধি হবার যোগ্যতা রাখেনা। আমি খুব সংক্ষেপে তাদের কিছু লক্ষণ বলে দিচ্ছি, যাতে যে কোনো উদ্ভ্রান্ত এসে রাসূলে পাক (স) এর নায়েব হবার আকাংখা পোষণ করতে না পারে।
তিনি সেই আলেম, যিনি দুনিয়ার মহব্বত ও দুনিয়ার মান-সম্মান পদমর্যাদা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। যিনি এমন দৃষ্টিমান, বিচক্ষণ ব্যক্তির অনুসরণ করবেন, যার প্রতি আনুগত্যের সিলসিলা (ধারাবাহিকতা) অব্যাহতভাবে সাইয়েদুল মুরসালীন হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
তিনি এমন নেককার লোকের আনুগত্য করে থাকবেন, যার নির্দেশে সব ধরনের রেয়াযাত ও কৃচ্ছ সাধনা আঞ্জাম দিয়েছেন। যেমন কম খাওয়া, কম ঘুমানো, কম কথা বলা, বেশি বেশি নামায পড়া, বেশি পরিমাণে রোযা রাখা, অধিক পরিমাণে সদকা করা।
এছাড়াও চরিত্রের সৌন্দর্যসমূহ তার স্বভাবে পরিণত হবে। যেমন, ধৈর্য, শোকর (সর্বাবস্থায় আল্লাহর কৃতজ্ঞ থাকা), তাওয়াক্কুল, একীন, অল্পেতুষ্টি, প্রশস্ত চিন্তা, সহনশীলতা, বিনয়, জ্ঞান, সততা, লজ্জাশীলতা, ওয়াদাপূরণ, সম্ভ্রম, ভাবগাম্ভীর্য, স্থিরতা এবং এ জাতীয় গুণাবলী। হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নূরসমূহ থেকে একটি নূর (আলোকশিখা) তিনি লাভ করে থাকবেন এবং হযরতের প্রতি একতেদার ছায়াতলেই সংশোধন হয়ে থাকবেন। কিন্তু এ ধরনের মুর্শিদ দুর্লভ, প্রিয়ভাজন, অত্যন্ত দামী ও মূল্যবান। যে লোককে সৌভাগ্য হাতছানি দেয় এবং উল্লেখিত জ্ঞান ও লক্ষণযুক্ত পীর পেয়ে যায়, আর পীরও তাকে শিক্ষাদীক্ষা দিতে রাজি হয়, তার ওপর কর্তব্য হচ্ছে এই পীরকে গোপনে প্রকাশ্যে (সামনে পেছনে) সম্মান করা। প্রকাশ্যে সম্মান দেখানো বলতে বুঝায়, তার সাথে ঝগড়া করবে না, যে কোনো মাসআলায় তার সাথে তর্ক করবেনা। এমনকি তার (পীরের) ভুল বুঝতে পারলেও না।
তার কাছে জায়নামায বিছাবে না। হ্যাঁ নামাজের সময় হলে বিছাবে। নামায যখন শেষ হবে জায়নামায গুটিয়ে নেবে। তার সামনে অধিক নফল নামায আদায় করবে না। পীর যা আদেশ করবেন, নিজের সাধ্য ও শক্তি অনুযায়ী তা পালন করবে। আর ভেতরে বা পেছনে সম্মান প্রদর্শনের অর্থ হচ্ছে, প্রকাশ্যে তার কাছ থেকে যা গ্রহণ করবে, পেছনে বা মনে মনে তাকে ঘৃণা বা প্রত্যাখ্যান করবে না। কাজেও না, কথায়ও না। অন্যথায় তার কপালে মুনাফেকীর দাগ পড়ে যাবে। যদি এগুলো মেনে চলতে না পারে, তাহলে তার সাহচর্য ত্যাগ করবে, যতক্ষণ না তার ভেতরটা বাইরের মতো (ভেতরে ও বাইরের অবস্থা এক রকম) হয়। এই লোকের ওপর আরো ফরয হলো, মন্দ সঙ্গীর সাথে ওঠা বসা ত্যাগ করতে হবে। যাতে মানুষ ও জ্বীন শয়তান তার জ্বলবের রাজ্যে হস্তক্ষেপ করতে না পারে। তার অন্তর যেন শয়তানের ময়লা কদর্যতা থেকে পাক-পবিত্র হয়। একই সাথে সর্বাবস্থায় সম্পদের প্রতি ভালোবাসার ওপর সংসারত্যাগী মনোভাবকে প্রাধান্য দিতে হবে।
📄 তাসাওয়াফের দুটি বৈশিষ্ট
জেনে রেখো যে, তাসাওফের দুটি বৈশিষ্ট্য আছে। যথাঃ
১. মহান রাব্বুল আলামীনের সাথে হিসাব-নিকাশ ঠিক থাকা।
২. সৃষ্টির ব্যপারে নিশ্চিন্ত হওয়া।
আল্লাহ্ তা'আলার সাথে যে ব্যাক্তির হিসাব-নিকাশ ঠিক থাকে এবং মানুষের সাথে সহনশীলতা ও সুন্দর আচরণ দেখায়, সে ব্যক্তি সূফী। আল্লাহ্র সাথে ঠিক থাকার মানে হলো, তার হুকুমের সামনে নিজের স্বার্থ ও ইচ্ছাকে কোরবান করে দেবে। মানুষের সাথে সুন্দর আচরণের তাৎপর্য হলো, মানুষের ওপর যেন নিজের স্বার্থ চাপিয়ে না দেয়, বরং তার উল্টা মানুষের স্বার্থ ও লাভকে নিজের ওপর প্রাধান্য দিয়ে গ্রহণ করে। অবশ্য যতক্ষণ মানুষের ইচ্ছা ও স্বার্থ শরীয়ত মাফিক হয়, ততক্ষণ।
📄 এখলাস সম্পর্কে জ্ঞাতব্য বিষয়
তুমি আল্লাহর দাসত্ব বলতে কি বুঝায় জানতে চেয়েছ দাসত্ব হচ্ছে, প্রথমতঃ শরীয়তের আদেশ নিষেধকে সমীহ করা। দ্বিতীয়তঃ আল্লাহর নির্ধারিত তকদীরের ওপর রাযী থাকা। তৃতীয়তঃ আল্লাহ্র ইচ্ছা ও সন্তুষ্টিকে গ্রহণ করা আর নিজের ইচ্ছা ও সন্তুষ্টিকে পরিত্যাগ করা।
তুমি জানতে চেয়েছ, তাওয়াক্কুল কি? তাওয়াক্কুল হচ্ছে আল্লাহ্ তাআলা যে বিষয়ে ওয়াদা করেছেন সে বিষয়ে তার ওপর পুরোপুরি ভরসা রাখা। অর্থাৎ দৃঢ় প্রত্যয় হাসিল করবে যে, আল্লাহ্ তা'আলা তোমার জন্য যা নির্ধারিত করেছেন, অবশ্যই তা তোমার কাছে পৌঁছবে। এর থেকে পালিয়ে যাবার উপায় নেই। এমন কি দুনিয়ার সমস্ত মানুষ যদি তকদীরের নির্ধারিত বিষয়টিকে ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টাও করে। অনুরূপভাবে যে বিষয় তোমার ভাগ্যে নির্ধারিত হয়নি, তার হুকুমও ঐ রকমই।
তুমি এখলাস সম্পর্কেও জানতে চেয়েছ 'এক্লাস' এর তাৎপর্য হলো, তোমার সমস্ত কাজকর্ম শুধু আল্লাহ্ জন্য হবে। মানুষের প্রশংসায় তোমার মন প্রফুল্ল হবে না। তাদের তিরস্কারে, সমালোচনায় তুমি মনক্ষুন্নও হবে না। জেনে রেখো যে, মানুষ সম্মান করতে করতেই রিয়া বা বাহ্যিক প্রদর্শনেচ্ছার জন্ম নেয়। 'রিয়া'র চিকিৎসা হচ্ছে, সৃষ্টজীবকে আল্লাহর বাধ্যগত বলে মনে করবে। তাদেরকে অক্ষমতায় বা কারো ক্ষতি বা লাভ করার ব্যাপারে জড় পদার্থের মতো বলে গণ্য করবে। তাহলেই রিয়া ও ভনিতা থেকে মুক্তি পাবে। যতদিন পর্যন্ত মানুষকে ক্ষমতাবান মনে করবে ততদিন তোমার কাছ থেকে রিয়া দূর হবে না।
📄 পরিত্যজ্য বিষয়সমূহ
প্রথমত
যতদূর পার কারো সাথে কোনো তর্ক বাহাসে জড়াইওনা। কারণ, এর দ্বারা অনেক ক্ষতি ও আপদ আপত্তিত হয়। এর গোনাহ্ লাভের চাইতে অনেক বেশি। কারণ হচ্ছে, তর্ক বাহাস প্রত্যেক বদ-স্বভাবের উৎস। রিয়া, প্রদর্শনেচ্ছা, ভনিতা, বিদ্বেষ, গর্ব-অহংকার, শত্রুতা, হিংসা, বন্ধু মহল ও সমগোত্রীয়দের ওপর বড়াই করা প্রভৃতি স্বভাব এর থেকেই জন্ম নেয়।
যদি তোমার ও অন্য কারো মধ্যে অথবা কোনো সম্প্রদায়ের সাথে তোমার কোনো সমস্যা দেখা দেয় এবং সত্য বিষয়টি উদঘাটিত হওয়া তোমার উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এই নিয়তে ঐ বিষয়ে বাহাস জায়েয। নিয়ত সহীহ শুদ্ধ আছে কিনা তার দুটি আলামত আছে।
প্রথম আলামত: সত্য কথাটি তোমার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হোক বা অন্যের মুখ দিয়ে, তাতে মনে কোনো তারতম্য অনুভব করবে না।
দ্বিতীয় আলামত: জনসমক্ষে বাহাস করার চাইতে নিরিবিলিতে একাকী বাহাস করা তোমার কাছে অধিক পছন্দনীয় হবে।
শোনো, এখানে তোমার কাছে কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় ব্যক্ত করছি।
জেনে রেখো যে, কোনো সমস্যা সম্পর্কে প্রশ্ন করার উদাহরণ হচ্ছে, ডাক্তারের কাছে অন্তরের রোগের কথা ব্যক্ত করা। আর প্রশ্নের জবাব দেয়ার মানে, রোগের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা। এ কথা তুমি নিশ্চিত জেনে রেখো যে, মূর্খ লোকের অন্তরে রোগ আছে। আলেমরা তাদের সামনে ডাক্তারের ন্যায়। যে আলেম অপরিপক্ক হবে, তার চিকিৎসায় কাজ হবে না। আবার কামিল আলেমও যে-কোন রোগের চিকিৎসা করেন না। তারা এমন রোগীর চিকিৎসা করেন, যাদের আরোগ্য লাভ বা ভালো এবং সংশোধন হবার আশা আছে। যদি অবস্থা এমন হয় যে, রোগ খুব জটিল অথবা চিকিৎসা ব্যর্থ হবে, রোগীর ভালো হবার আশা নেই; এমন পরিস্থিতিতে ডাক্তারের দক্ষতার অন্যতম প্রমাণ হচ্ছে, তিনি বলে দেবেন যে, এই রোগীর চিকিৎসা সম্ভব নয়। তার চিকিৎসায় তিনি আর সময় নষ্ট করবেন না। কারণ, তিনি জানেন যে, এমন রোগীর চিকিৎসায় ব্যস্ত থাকা জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করার সমান। মনে রাখবে যে, অজ্ঞতা ও মূর্খতার রোগ চার প্রকারের হয়ে থাকে।
১. এর মধ্যে একটি রোগ আরোগ্য লাভের উপযুক্ত। বাকীগুলো দুরারোগ্য ব্যাধি। দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত একটি শ্রেণী হচ্ছে, সেই লোক যার প্রশ্ন ও আপত্তিগুলো হিংসা বিদ্বেষ ও শত্রুতা থেকে সৃষ্টি হয়।
অতএব তার জবাব যতই সুন্দর, শুদ্ধ ও পরিস্কারভাবে দেয়া হোক না কেন, তার হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা সে অনুপাতে আরো বৃদ্ধি পাবে। এ ক্ষেত্রে সবচে' উত্তম পন্থা হচ্ছে, ঐ লোকের জবাব দানে নিজেকে ব্যস্ত না করা। বলা হয়েছে যেঃ
كُلُّ الْعَدَاوَةِ قَدْ تُرْجِي إِزَالَتُهَا إِلَّا عَدَاوَةَ مَنْ عَادَاكَ عَنْ حَسَدٍ
যে কোনো শত্রুতা দূর হয়ে যাবার আশা থাকে।
কিন্তু, যে হিংসার বশে তোমার শত্রুতায় লিপ্ত, তা দূর হবার নয়।
কাজেই বিচক্ষণতা হলো, হিংসুককে তার রোগের মধ্যে ছেড়ে দেবে এবং তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখবে। আল্লাহ্ তাআলা এরশাদ করেন:
فَأَعْرِضْ عَمَّنْ تَوَلَّى عَنْ ذِكْرِنَا وَلَمْ يُرِدْ إِلَّا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا -
হে রাসূল! যে ব্যক্তি আমার (স্মরণ) থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, যে এই দুনিয়ার জীবন ছাড়া আর কিছু কামনা করে না, তার থেকে আপনি মুখ ফিরিয়ে নিন (তাকে পরিত্যাগ করুন)। (সূরা নাজম: ২৯)
হিংসুক ব্যক্তি যা কিছু বলে এবং যে কাজই করে তা দ্বারা সে তার আমলের ক্ষেতে আগুন ধরিয়ে দেয়। যেমন, হযরত নবীয়ে করীম (স) এরশাদ করেছেনঃ
الْحَسَدُ يَأْكُلُ الْحَسَنَاتِ كَمَا تَأْكُلُ النَّارُ الْحَطَبَ -
হিংসা নেক আমলসমূহ এমনভাবে খেয়ে ফেলে যেমন করে আগুন লাকড়ি (জ্বালিয়ে) খেয়ে ফেলে।
২. দ্বিতীয় যে রোগটির চিকিৎসা নেই তা হচ্ছে, আহাম্মকি-বোকামী। যেমন হযরত ঈসা (আ:) বলেছেন যেঃ
إِنِّي مَا عَجَرْتُ عَنْ إِحْيَاءِ الْمَوْتَى وَقَدْ عَجَزْتُ عَنْ مَعَالَجَةِ الْأَحْمَقِ -
আমি মৃত লোককে জীবিত করতে ব্যর্থ হই নি, বরং আহাম্মক লোকের চিকিৎসা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছি।
এই আহাম্মক হচ্ছে ঐ ব্যাক্তি, যে কিছু দিন জ্ঞান চর্চা করে শরীয়ত ও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের যৎসামান্য শিক্ষা করে আর আহাম্মকির পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে এমন লোকের বিরুদ্ধে নানা আপত্তি তোলে ও সমালোচনা করতে থাকে, যিনি নিজের সারাটা জীবন শরীয়ত ও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান সাধনায় অতিবাহিত করেছেন। অথচ এই আহাম্মক না জেনে ধারণা করে যে, যে সব বিষয় তার কাছে কঠিন ও বোধগম্য নয়; বুযর্গ আলেমটির জন্যেও কিনা তা কঠিন এবং তার সমাধান নেই। যে ব্যক্তি এতখানি বোকামী ও আহাম্মকীতে ডুবে থাকে, তার প্রশ্নগুলো আহাম্মকি থেকেই জন্ম নেয়। কাজেই নিজেকে ঐ লোকের প্রশ্নের জবাব দানে ব্যস্ত না রাখাই বিজ্ঞতার পরিচায়ক।
৩. তৃতীয় রোগ হলো, যদি প্রশ্নকারী কোনো ছাত্র হয় বা সত্য পথের সন্ধানী হয়, যে বড়দের বক্তব্য ও উক্তিগুলো বুঝতে না পারলে মনে করে যে, আমার দুর্বলতা এর জন্য দায়ী। এমন ছাত্র নিজে উপকৃত হবার জন্যেই প্রশ্ন করে। কিন্তু তার বুঝ ও বোধশক্তি যদি গুঢ়তত্ত বুঝতে অক্ষম হয় তাহলে উচিৎ হবে, ঐ ছাত্র বা শিষ্যের প্রশ্নের জবাব দানে নিজেকে ব্যস্ত না করা। যেমন, হযরত নবী করীম (স) এরশাদ করেছেনঃ
نَحْنُ مَعَاشِرَ الْأَنْبِيَاءِ أُمِرْنَا أَنْ تُكَلِّمَ النَّاسَ عَلَى قَدْرِ عُقُولِهِمْ -
আমরা পয়গাম্বররা, আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যাতে মানুষের আকল ও বোধশক্তি অনুপাতে তাদের সাথে কথা বলি।
৪. চতুর্থ রোগ: যে রোগটি চিকিৎসাযোগ্য তা হচ্ছে, কোনো ছাত্র বা শিষ্য যদি সত্যের সন্ধানী হয়, নিজে জ্ঞানী ও বুদ্ধিমানও হয়, যে হিংসা, ক্রোধ, নফসের কামনা-বাসনা, ধন-সম্পদ ও ক্ষমতার লোভের কাছে পরাস্ত না হয়, সত্য ও সঠিক পথের সন্ধানকারী হয়, তার প্রশ্নও হিংসার বশে বা পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে কিংবা কষ্ট দেয়া অথবা জটিলতা সৃষ্টির নিয়তে না হয়, তাহলে এ ধরনের লোকের চিকিৎসা সম্ভব। এমন লোকের জিজ্ঞাসার জবাব দেয়া শুধু যে উচিৎ তাই নয়, বরং তার প্রশ্নের জবাব দেয়া ও সঠিক পথ দেখানো ওয়াজিব।
দ্বিতীয়ত
যেসব বিষয় ত্যাগ করা উচিৎ তন্মধ্যে বর্জনীয় দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, ওয়াজ করা বা উপদেশ দেয়ার পেশা থেকে বিরত থাকা। কারণ, তাতে অনেক আপদ ও মুসিবত নিহিত। হ্যাঁ, তবে শর্ত হচ্ছে, প্রথমে, যেন তুমি যা বলছো সে অনুযায়ী আমল করো। এরপর নিজের আমল দ্বারা মানুষকে উপদেশ প্রদান করবে। হযরত ঈসাকে (আ) যে কথাটি বলা হয়েছে, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করে দেখঃ
يَا ابْنَ مَرْيَمَ عِظْ نَفْسَكَ فَإِنِ اتَّعَظَتَ فَعِظِ النَّاسَ وَإِلَّا فَاسْتَحْيِ مِنْ رَبِّكَ -
হে মরিয়মের ছেলে! তোমার নক্সকে নসীহত করো। অতঃপর নিজে যখন নসীহত কবুল করবে, তখন লোকদেরকে নসীহত করো। অন্যথায় তোমার পারওয়াদেগারকে লজ্জা করো।
আর যদি তুমি এই কাজে (ওয়াজ নসীহত ও উপদেশ দানের কাজে) জড়িয়ে পড়, তাহলে দুটি জিনিষ থেকে বিরত থাক।
১. প্রথমত: নানান ভাষা ও অলংকার, উপমা ব্যবহার, কোনো কোনো সূফী দরবেশের ভাষায় শরীয়ত পরিপন্থি আস্ফালন, বড় বড় কথা বলা, কবিতা, ছন্দ প্রভৃতি নিয়ে ভনিতা দেখানো প্রভৃতি থেকে অবশ্যই বিরত থাকবে। কেননা, আল্লাহ্ তা'আলা ভনিতা প্রদর্শনকারীদের সাথে শত্রুতা পোষণ করেন। ভনিতা যখন সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন অন্তর নষ্ট হয়ে যায়, কুলবে গাফিলতি সৃষ্টি হয়। এর কারণ হলো, নসীহত ও উপদেশ দানের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ্র বান্দারা যাতে পরকালের আগুনের কথা স্মরণ করে এবং নিজেকে আল্লাহর ধ্যানে ও দাসত্বে নিবেদিত রাখে আর জীবনের হারানো দিনগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে। তাদের সামনে যে সব বিরাট বিরাট গিরি সংকট আছে এবং ঈমান সালামতে পার হওয়ার পথে যা হুমকির সৃষ্টি করে তা নিয়ে যেন চিন্তা করে। মালেকুল মাওত যে রূহ্ কবজ করবেন, তখনকার অবস্থার কথা যেন স্মরণ করে। এ কথাও যেন তাদের চিন্তায় আসে যে, তারা কি মুনকির নাকিরের প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে? কিয়ামতে কি অবস্থা হবে, বিভিন্ন গিরিসংকট কিভাবে অতিক্রম করবে, পুলসিরাতের ওপর দিয়ে কি সহী সালামতে পার হতে পারবে? নাকি হাবিয়া দোযখে পড়ে যাবে? সেখানেই কি তাকে থেকে যেতে হবে? এগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়াই নসীহতের উদ্দেশ্য। এসব বিষয় তাদের অন্তরে সদা স্মরণ রাখা আখেরাতের চিন্তায় তাদের মনের স্বস্তি ও স্থিরতা রহিত করা, মনে সেই আগুনের স্ফুলিঙ্গ আর দুঃখ মুসিবতের ক্রন্দন আহাজারী সৃষ্টি করা এগুলোকেই বলা হয় দীক্ষা। এসব বিষয়ে মানুষকে সজাগ ও নফসের দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে সতর্ক করা এর অন্তর্ভূক্ত। ওয়াজের মজলিসে যারা বসা থাকে, তাদের অন্তরে অনুতাপের আগুন প্রজ্জলিত করা, যাতে যতখানি সম্ভব অতীত জীবনের ক্ষতি পূরণ করে এবং আল্লাহ্র বন্দেগীতে কাটায়নি এমন দিনগুলোর জন্য হাহুতাশ আফসোস করে। আমি যেভাবে বললাম, এই পদ্ধতির উপদেশ দানকেই বলা হয় ওয়াজ। তুমি যদি দেখো যে, হঠাৎ বন্যার পানি কারো ঘরে ঢুকে পড়েছে আর ঐ ঘরের ভেতর বাড়িওয়ালা ও অন্যান্য লোকেরা বসা থাকে, তখন তুমি ভেসে গেল ভেসে গেল, বিপদ বিপদ বলে বন্যার স্রোত থেকে বাঁচার জন্য চিৎকার দাও। আচ্ছা, ঠিক এই পরিস্থিতিতে বাড়ির ভেতরের লোকদেরকে ভাষার মারপ্যাঁচ, উপমা উৎপ্রেক্ষা দিয়ে ভনিতা করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে বলার জন্য কি তোমার মন চাইবে? নিশ্চয় তোমার মন রাজি হবে না যে, এমন পরিস্থিতিতে বাক্যবিলাস করে বিপদগ্রস্থ মানুষদের ডাকাডাকি করবে। ওয়ায়েজের (উপদেশদানকারীর) দৃষ্ঠান্তও অনুরূপ। কাজেই তোমার উচিৎ ওয়াজের সময় কথায় রং চড়ানো ও কৃত্রিমতা থেকে বেঁচে থাকা।
২. দ্বিতীয় হচ্ছে: তুমি ওয়াজ করবার সময় এর জন্য লালায়িত হবে না যে, তোমার মজলিসের লোকেরা চিৎকার দেবে, ওয়াজের মধ্যে এসে বিহবলচিত্ত হয়ে যাবে, উত্তেজনায় জামা ছিঁড়ে ফেলবে, যার ফলে মানুষ বলবে যে, ইনি ভাল মজলিস জমাতে পারেন (দারূণ ওয়ায়েজ)। কারণ হচ্ছে, এ সব কিছু হলো দুনিয়ার আকর্ষণ। অন্তরে গাফিলতি (আল্লাহ্ থেকে বিস্মৃত হবার রোগ) থেকেই এ ধরণের ইচ্ছা জন্ম নেয়। বরং উচিৎ হবে, তোমার সকল উদ্যোগ ও উদ্যমের লক্ষ্য যেন হয় মানুষকে দুনিয়া থেকে আখেরাতের দিকে, নাফরমানী থেকে বন্দেগীর দিকে, কৃপণতা-বখিলী থেকে দানশীলতার পানে, সংশয় থেকে একীন আর গাফিলতি থেকে জাগৃতির দিকে আর গর্ব অহংকার থেকে তাকওয়া পরহেযগারীর দিকে আহবান; আখেরাতকে তাদের সামনে প্রিয় আর দুনিয়া (ভোগ-বিলাস)-কে অপ্রিয় করবে। তাদেরকে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী, তাকওয়া-পরহেযগারির জ্ঞান শিক্ষা দেবে। তাদেরকে আল্লাহ্ দয়া ও রহমতের প্রতি সীমাতিরিক্ত প্রলুব্ধ করবে না। কারণ হচ্ছে, মানুষের স্বভাবের মধ্যেই শরীয়তের পথ থেকে বিচ্যুত হবার প্রবণতা বিদ্যমান। আল্লাহ্ যাতে রাজি নেই, তার জন্য চেষ্টা এবং মন্দ চরিত্রের দিকে পদস্খলিত হবার স্বভাব তাদের ওপর ভর করে থাকে। তাদের অন্তরে ভয় ও সমীহ সৃষ্টি করো। তাদের সামনে যে সব ভয়ানক স্থান ও অবস্থা আছে, তার ব্যাপারে সতর্ক করো। হয়ত তাদের বাতেনী বৈশিষ্ট্যগুলোর পরিবর্তন হবে। তার ফলে তাদের বাহ্যিক আমলসমূহও পরিবর্তিত হবে। আল্লাহ্ বন্দেগীর প্রতি প্রবল আগ্রহ, অদম্য স্পৃহা ও লোভ তাদের মধ্যে ফুটে উঠবে। গোনাহ থেকে ফিরে আসবে। এটাই হচ্ছে, ওয়াজ করার নিয়ম ও প্রক্রিয়া। যে ওয়াজ ও উপদেশ এ ধরণের হবে না, তা ওয়াযকারী ও শ্রোতার জন্য ধ্বংস ডেকে আনবে। এমন কি বলা হয়েছে যে, এ ধরনের ওয়াজ ও নসীহতকারী (যার মধ্যে উপরোল্লেখিত বৈশিষ্ট্যগুলো পাওয়া যাবে না) দৈত্য ও শয়তান। কেননা সে মানুষকে পথহারা করে, তাদের ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। মানুষের উচিৎ এসব লোক থেকে পালিয়ে বাঁচা। কারণ এই ধরনের ওয়াজ ও বক্তৃতা প্রদানকারীর দ্বারা আল্লাহর দ্বীনের যে অনিষ্ট ও ফিতনার সৃষ্টি হয়; কোনো শয়তানের দ্বারা তেমনটি হয়না। সামর্থ আছে, শক্তির জোর আছে এমন লোকদের ওপর কর্তব্য হচ্ছে, এ ধরনের বক্তাকে ওয়াজের মিম্বর (মঞ্চ) থেকে নীচে নামিয়ে ফেলা এবং ওয়াজকে যে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে, তা থেকে বিরত রাখা। কেননা, এ ধরণের পদক্ষেপ 'আমর বিল্ মারুফ ও নাহী আনিল মুনকার' হিসেবে গণ্য।
তৃতীয়ত
যে সমস্ত কাজ পরিত্যাগ করা উচিৎ, তন্মধ্যে তৃতীয় কাজ হচ্ছে: আমীর ওমরা-রাজা বাদশাহদের সাথে ওঠাবসা করবে না। তাদের সাথে মেলামেশায় বহু ধরনের আপদ ও ক্ষতি আছে। যদি তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে বাধ্য হও, তাহলে তাদের প্রশংসা ও গুণকীর্তন পরিহার করবে। কারণ হচ্ছে যখন কোন জালিম বা ফাসেকের প্রশংসা করা হয় তখন আল্লাহ্ তা'আলা ভীষণভাবে রাগান্বিত হন। যারা এদের হায়াত দীর্ঘ হবার জন্য দো'আ করে তারা নিশ্চিতভাবে এ কথাই পছন্দ করে যে, পৃথিবীর বুকে যেন আল্লাহ্ নাফরমানী করা হয়।
চতুর্থত
যে সব কাজ ত্যাগ করা উচিৎ তন্মধ্যে চতুর্থ কাজ হচ্ছে, আমীর ওমরা ও রাজা বাদশাহদের পক্ষ হতে হাদীয়া, উপহার-উপঢৌকন ধরণের কিছু গ্রহণ করবে না। যদিও তুমি জানো যে, তোমাকে যা দেয়া হচ্ছে তা হালাল। কারণ, তাদের সম্পদের প্রতি লোভ দ্বীনের কাজে ফাসাদ ও বিপর্যয় সৃষ্টি করে। এর ফলে চাটুকারিতা, ওদের পক্ষপাতিত্ব এবং তাদের জুলুম অত্যাচারে সম্মতি দানের মনোবৃত্তি জন্ম নেয়। এ সবই হচ্ছে, দ্বীনের ক্ষতি ও বিপর্যয়ের কারণ। যদি রাজা-বাদশাহদের উপহার গ্রহণ করো এবং তাদের পার্থিব সম্পদের অধিকারী হও তাহলে তোমার সর্বনিম্ন যে ক্ষতিটি হবে তা হচ্ছে, তুমি তাদের ভালোবাসবে। কেউ যদি কাউকে ভালোবাসে অবশ্যই তার দীর্ঘ জীবন ও স্থায়িত্ব কামনা করে। আর জালিমদের স্থায়িত্ব ও ঠিক থাকার ভালোবাসার মধ্যে আল্লাহ্ বান্দাদের ওপর জুলুম এবং বিশ্বে বিপর্যয় সৃষ্টির কামনা (নিহিত) থাকে। অতএব এর চাইতে (আল্লাহর বান্দাদের ওপর জুলুমের ইচ্ছার চাইতে) আর কোন জিনিসটি মানুষের দ্বীন ও পরকালের জন্য অধিক ক্ষতিকর? হ্যাঁ, সাবধান! শয়তান যেন তোমাকে পথহারা করতে না পারে অথবা এই শ্রেণীর লোকের কথা ও যুক্তি যেন তোমাকে প্রতারিত না করে-যারা বলে যে, রাজা-বাদশাহদের কাছ থেকে টাকা পয়সা নিয়ে তা গরীব মিসকিনদের মাঝে বন্টন করে দেয়াই উত্তম হবে। কারণ, রাজা বাদশাহরা আল্লাহর নাফরমানী, গোনাহ ও পাপকার্যে এ সব অর্থ খরচ করে। তুমি তা নিয়ে গরীব ও খাঁটি মানুষদের মধ্যে দান খয়রাত করবে। কাজেই তাদের হাতে খরচ করার চাইতে তোমার হাতে খরচ করাই অনেক উত্তম। (এই কু-যুক্তি যেন তোমাকে প্রতারিত না করে) কেননা, অভিশপ্ত শয়তান এই ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা) দিয়েই বহু লোকের গর্দান দ্বিখণ্ডিত করেছে। বহু মানুষের রক্ত প্রবাহিত করেছে। আমি এ বিষয়টি এহইয়াউ উলূমে বিষদভাবে আলোচনা করেছি। সেখানেই দেখে নিও।