📄 ইল্ম আমল সহকারে হলেই উপকারী
ওহে বৎস!
যদি শুধু জ্ঞানই তোমার জন্য যথেষ্ট হতো আমলের (জ্ঞান অনুযায়ী কাজ করার) যদি দরকার না হতো, তাহলে আল্লাহ্র পক্ষ হতে এসব আহবান অনর্থক বলে সাব্যস্ত হতো
هَلْ مِنْ سَائِلِ )হাল্ মিন সায়েলিন?) আমার কাছে কি কিছু প্রার্থনাকারী আছো?
وَهَلَ مِنْ تَائِبٍ )ওয়া হাল মিন তায়েবিন?) আমার কাছে তওবাকারী কি কেউ আছো?
وَهَلْ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ )ওয়া হাল মিন মুস্তাগফেরিন ?) গোনাহ্ মাফ চাওয়ার কোনো লোক কি আছো?
বর্ণিত আছে যে, একদিন সাহাবায়ে কেরামের একটি দল হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র দরবারে উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় অব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমরের (রা) প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা হয়। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:
نِعْمَ الرَّجُلُ هُوَ لَوْ كَانَ يُصَلَّى بِاللَّيْلِ
সে খুব ভালো মানুষ, তবে যদি রাতে তাহাজ্জুদের নামায আদায় করে।
অনুরূপভাবে হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি একজন সাহাবীকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
يَا فَلَانُ لَا تُكْثِرِ النَّوْمَ بِاللَّيْلِ فَإِنْ كَثرَةَ النَّوْمِ بِاللَّيْلِ يَدَعُ صَاحِبَهُ فَقِيرًا يَوْمَ القيامة
হে অমুক! লক্ষ্য কর, রাতে বেশি ঘুমাইওনা। কারণ, রাতের অতিরিক্ত ঘুম ঐ লোককে কেয়ামতের দিন ভিখারীতে পরিণত করবে।
হে বৎস!
وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَكَ .
রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদের নামায আদায় করুন, যা আপনার জন্যে (বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ) অতিরিক্ত কাজ। (সূরা-বনী ইসরাঈল: ৭৯)
আর وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
শেষ রাতে ওঠে তারা (আল্লাহর দরবারে) মাগফেরাত কামনা করে। (সূরা আয-যারিয়াত:১৮)
রাসূলে খোদা-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন :
ثَلْثَةُ أَصْواتِ يُحِبُّهَا اللهُ تَعَالَى صَوْتُ الدِّيكِ وَصَوْتُ الَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَصَوْتُ الْمُسْتَغْفِرِينَ بِاالْأَسْحَارِ -
তিন ধরনের আওয়াযকে আল্লাহ্ তা'আলা ভালোবাসেন, মোরগের ডাক, কুরআন তেলাওয়াতকারীর আওয়ায এবং শেষরাতে উঠে گোনাহের মাগফেরাত কামনাকারীর আওয়ায।
হযরত সুফিয়ান সাওরী-রাহমতুল্লাহ্ আলাইহ্ বলেনঃ
إِنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى خَلَقَ رِيحًا تَهُنَّ بِالْأَسْحَارِ تَحْمِلُ الْأَذْكَارَ وَالْإِسْتِغْفَارَ إِلَى الْمَلِكِ الْجَبَّارِ
আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা এমন এক বাতাস সৃষ্টি করেছেন, যা শেষ রাতে প্রবাহিত হয় এবং যিকির ও এস্তেগফারসমূহ মহামহীম আল্লাহর দরবারে নিয়ে যায়।
অনুরূপভাবে বর্ণিত আছেঃ
إِذَا كَانَ أَوَّلُ اللَّيْلِ يُنَادِي مُنَادٍ مِنْ تَحْتِ الْعَرْشِ الْالِيَقُمِ الْعَابِدُونَ فَيَقُومُونَ وَيُصَلُّوْنَ مَا شَاءَ اللهُ ثُمَّ يُنَادِي مُنَادٍ فِي شَطْرٍ اللَّيْلِ الْالِيَقُمِ الْقَانِتُونَ فَيَقُومُونَ وَيُصَلُّونَ إِلَى السَّحَرِ فَإِذَا كَانَ السَّحَرُ نَادَى مُنَادٍ الْالِيَقُمِ الْمُسْتَغْفِرُونَ فَيَقُومُونَ وَيَسْتَغْفِرُ ونَ فَإِذَا طَلَعَ الْفَجْرُ نَادَى مُنَادٍ الْالِيَقُمِ الْغَافِلُونَ فَيَقُومُونَ مِنْ فُرُوشِهِمْ كَالْمَوْ نَي نُشِرُ وا مِنْ قُبُورِ هِمْ -
যখন রাতের প্রথম ভাগ আসে, আরশের নিচ থেকে একজন আহবানকারী ডাক দিয়ে বলেন : ওহে ইবাদতকারীরা! জাগ্রত হও। সে ডাক শুনে তারা জাগ্রত হয়ে আল্লাহ্ যতখানি ইচ্ছা (যতখানি তওফীক দেন), নামায আদায় করেন। অতপর মধ্যরাতে ডাক দিয়ে বলেন : আল্লাহকে ভয়কারী, পরহেযগাররা জাগ্রত হও। সে ডাক শুনে ঐ দলটি জাগ্রত হয় এবং শেষ রাত পর্যন্ত নামায আদায় করেন। যখন রাতের শেষভাগ হয়, আহবানকারী ডাক দিয়ে বলেন, গোনাহ্ মাফ চাওয়ার লোকেরা জাগ্রত হও। তখন ঐ দলটি জাগ্রত হয়ে আল্লাহর দরবারে মাগফেরাত কামনা করেন। অতঃপর যখন ভোর হয়ে যায়, তখন আহবানকারী ডাক দিয়ে বলেন : ওহে অলসরা! ওঠো। তখন তারা মৃত লোকদের কবর থেকে ওঠার মতো বিছানা ত্যাগ করে।
হযরত লোকমান হাকীম তার সন্তানদের যে ওসিয়ত করে যান, তার অন্যতম হচ্ছেঃ
يَا بُنَيَّ لَا يَكُونَنَّ الدِّيْكَ أَكْبَسُ مِنْكَ يُنَادِي بِالْأَسْحَارِ وَأَنْتَ نَائِمٌ -
হে আমার সন্তান! খবরদার মোরগ যেন তোমার চাইতে চালাক না হয়, মোরগ শেষ রাতে ডাক দেবে; অথচ তুমি ঘুমিয়ে থাকবে (এমন যেন না হয়)।
কবি কত সুন্দর বলেছেন:
لَقَدْ هَتَفَتْ فِي جُنْحِ اللَّيْلِ حَمَامَةٌ عَلَى فَنَنِ وَهَنَّا وَإِنِّي لَنَائِمٌ كذبتُ، وَبَيْتِ اللهِ لَوْ كُنْتُ عَاشِقًا لَمَّا سَبَقَتْنِي بِالْبُكَاءِ الْحَمَائِمُ وَأَزْعُمُ أَنِّي هَانِمْ ذُو صَبَابَةٍ لِرَبِّي فَلَا ابْكِي وَتَبْكِي الْبَهَائِمُ -
কবুতর রাতে গাছের ডালে বেদনায় ভরা কন্ঠে ডাকে
অথচ আমি ঘুমিয়ে কাটাই বিছানার পরে।
আল্লাহ্র ঘরের কসম, মিথ্যা বলেছি; যদি বলি-আমি প্রেমিক
কেননা কবুতররা তাহলে কান্নায় ছাড়িয়ে যেতে পারত না আমাকে।
আমি কিনা ভাবি, আমি আল্লাহ্ প্রেমিক, কিন্তু কাঁদি না।
অথচ পশু-পক্ষীরা কাঁদে তার জন্য নিরবাধি।
হে বৎস!
ইল্ম বা জ্ঞানের সার কথা হলো, আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের স্বরূপ তোমাকে জানতে হবে। জেনে রেখো যে, উভয়ের মর্মার্থ হচ্ছে, শরীয়তের আদেশ ও নিষেধসমূহের বেলায়, কথা ও কাজের মধ্য দিয়ে তুমি শরীয়তের অনুসরণ করবে। অর্থাৎ তুমি যে কাজ সম্পাদন করবে বা করবে না, মুখে বলবে অথবা বলবে না, তা যেন পবিত্র শরীয়ত অনুযায়ী হয়। (যদি শরীয়তের আদেশ অনুযায়ী আমল করো তাহলেই ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে, অন্যথায় নয়।) তুমি তো দেখতেই পাচ্ছ যে, ঈদুল ফিত্র বা আইয়ামে তাশরীক (কোরবানীর ঈদের তিনদিন) রোযা রাখা গোনাহ। অনুরূপভাবে কেউ যদি চুরি-ডাকাতি করা কাপড় পরে নামায পড়ে (সওয়াব তো হবে না; বরং) গোনাহগার হবে। যদিও তা দেখতে ইবাদতের মতো দেখায়। (কাজেই শরীয়তের ওপর আমল করাই হচ্ছে মূল কথা; আসল ইবাদত।)
হে বৎস!
তোমার কথা ও কাজ পবিত্র শরীয়ত মোতাবেক হওয়া চাই। কারণ, ইল্ম ও আমল যদি শরীয়তের অনুগামী না হয়, তাহলে গোমরাহী ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনে না।
অনুরূপভাবে সূফীগণ মাঝে মধ্যে বাহ্যত শরীয়ত পরিপন্থ যেসব উক্তি করেন বা অগোছালো হাকডাক করেন, তাতে প্রতারিত হওয়া তোমার উচিৎ নয়। কারণ, সূফী সাধনার কঠিন পথ অতিক্রম করাটা, কঠোর সাধনা, নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা, নফসের কামনা বাসনা দমন এবং কৃচ্ছতার তরবারী দিয়ে কুপ্রবৃত্তিকে হত্যা করা ছাড়া অন্য কোনো পথে সম্ভব নয়, আবোল তাবোল কথাবার্তা দিয়ে তো নয়ই। তুমি মনে রাখবে যে, লাগামহীন মুখ, অলসতা ও নফসের খায়েসে পরিপূর্ণ মন, দুর্ভাগ্য ও নাফরমানীরই লক্ষণ। কৃচ্ছ সাধনার সততা দিয়ে যদি নফসের কামনা বাসনাকে হত্যা করা না হয়, তাহলে অন্তর মারেফাতের আলোতে জীবন্ত হবে না।
📄 আধ্যাত্মিকতার জ্ঞান শেখার বিষয় নয়, উপলব্ধির বিষয়
হে বৎস!
যেসব বিষয় তুমি আমার কাছে জানতে চেয়েছ, তন্মধ্যে কতিপয় বিষয় কথা ও লেখার আকারে আসে না। তুমি যদি ঐ অবস্থায় উপনীত হও, পৌছে যাও, তাহলে তুমি নিজেই জানতে পারবে। নচেৎ ঐগুলো জানার চেষ্টা করা অনর্থক ও বাতুলতা। কারণ, ওগুলো সম্পূর্ণ আবেগ অনুভূতি ও প্রেরণা সম্পর্কিত বিষয়। আবেগ ও প্রেরণা সঞ্জাত বিষয়, কথা ও লেখায় আনা যায়না। যেমন মিষ্টি বা তিতা যতক্ষণ স্বয়ং নিজে তার স্বাদ অনুভব করতে না পারে, ততক্ষণ তিতা বা মিষ্টি কি জিনিষ জানা সম্ভব নয়। একটি গল্প আছে যে, জনৈক নপুংসক তার বন্ধুর কাছে পত্র লিখে সহবাসের স্বাদ কি রকম জানতে চাইল। বন্ধু জবাবে লিখল, আমি এতকাল মনে করেছিলাম যে, তুমি কেবলই নপুংসক। এখন বুঝতে পেরেছি যে, তার সাথে তুমি আস্ত আহাম্মকও। সত্যিই এই স্বাদ অনুভবের জিনিষ। এই স্বাদ তখনই বুঝতে পারবে, যখন তুমি তাতে উপনীত হবে। অন্যথায় মুখের কথা বা কলমের লেখা দিয়ে ঐ স্বাদের স্বরূপ বর্ণনা সম্ভব নয়।
হে বৎস! তোমার কোনো কোনো প্রশ্ন ঐরকমই। তবে বাদবাকী প্রশ্নের উত্তর দেয়া যায়। আমি এহয়াউ উলূম ও অন্যান্য কিতাবে তার ব্যাখ্যা দিয়েছি। এখানেও কিছু ইঙ্গিত দিচ্ছি।
📄 নির্ভেজাল তরিকতপন্থী সাধকের তিনটি কর্তব্য
১. সহীহ্ শুদ্ধ বিশ্বাস, যাতে কোনো বেদাত থাকবে না।
২. তওবায়ে নাসূহ (নিখুঁত নিখাদ তওবা); এরপরে যেন পদস্খলন না হয়।
৩. দুশমনকেও সন্তুষ্ট করা, যাতে সৃষ্টিজগতে কারো হক তার ওপর না থাকে।
৪. শরীয়তের ইল্ম এতখানি অর্জন করা, যদ্ধারা আল্লাহর হুকুম-আহকাম পালন করা হয়। অন্যান্য জ্ঞান এতখানি অর্জন করা, যার মধ্যে ব্যক্তির নিজের মুক্তি ও নাজাত নিহিত।
📄 মুক্তির জন্যে আটটি উপদেশ
এখন আরেকটি ঘটনা মনোযোগের সাথে শোনো। হাতেম আসম ছিলেন শাক্বীক বালখীর মুরিদ ও শিষ্য। একদিন শাক্বীকু তার কাছে জানতে চাইলেন: তুমি দীর্ঘ ত্রিশ বছর আমার সাহচর্যে আছো। এখন বলো যে, এই দীর্ঘ সময়ে তুমি কি হাসিল করেছ। বললেন: আপনার জ্ঞান থেকে আটটি বিষয় (ফায়দা) হাসিল করেছি। এগুলোই আমার জন্য যথেষ্ট। আমি আশা করি যে, এর মধ্যেই আমার মুক্তি নিহিত। শাক্বীক্ব বললেন: ওগুলো কি কি? হাতেম জবাবে বললেনঃ
১. প্রথম শিক্ষা: আমি মানুষের দিকে তাকালাম এবং দেখলাম যে, প্রত্যেকে একেক জনকে বন্ধু ও ভালবাসার পাত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং তার প্রতি তারা ভালোবাসা পোষণ করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বন্ধুকে ধ্বংসাত্মক রোগ বালাইতেও সঙ্গ দেয়। কেউ কেউ কবরের পাড় পর্যন্ত বন্ধুত্ব রাখে, অথচ এরপর তাকে ছেড়ে আসে। কবরের অন্ধকারে একলাই রেখে দেয়। (কোন বন্ধুই বন্ধুর সাথে কবরে নিঃসঙ্গতার সাথী হয়না।) অতএব আমি চিন্তা করে দেখলাম যে, মানুষের সর্বোত্তম বন্ধু তো সে-ই হবে, যে তার সাথে কবরে যাবে আর তার দুঃখের সাথী হবে। ভেবে দেখলাম যে, সেই বন্ধু নেক আমল ছাড়া আর কিছুই নয়। কাজেই একেই আমার বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছি। হয়ত তা আমার আঁধার কবরে চেরাগ হবে। চির নিঃসঙ্গতায় আমার ব্যাথার সাথী হবে।
২. দ্বিতীয় শিক্ষা: আমি মানুষকে দেখতে পেলাম, তারা নিজের নফসের কামনা বাসনার অনুসরণ করছে। নফসের মর্জি মাফিক চলছে। অতপর আমি কুরআন মজীদের এই আয়াতটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলাম, যেখানে আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেছেনঃ
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى -
আর যে ব্যক্তি আপন প্রভুর মহানত্বকে ভয় করে এবং নিজের নফসের কামনা-বাসনা থেকে বিরত থাকে, নিশ্চিতভাবে জান্নাত হচ্ছে তার ঠিকানা। (সূরা-নাযেআতঃ ৪০)
আমি একীন হাসিল করেছি যে, কুরআন সত্য ও সত্যবাদী। কাজেই আমার নফসের কামনা-বাসনার বিরোধিতা করলাম। নক্সের সাথে অবিরাম জিহাদের জন্য প্রস্তুত হলাম। নফসকে কামনা-বাসনা থেকে বাধা দিলাম। অবশেষে সে আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে প্রশান্ত হলো; আল্লাহর একান্ত অনুগত ও বশীভূত হলো।
৩. তৃতীয় শিক্ষা: দুনিয়াতে প্রত্যেকে সম্পদ আহরণের চেষ্টায় নিয়োজিত, তার জন্য অহর্নিশ চিন্তামগ্ন। আমি মহান আল্লাহ্ তা'আলার এই উক্তি নিয়ে চিন্তা করলাম। তিনি বলেছেন যে:
وَمَا عِنْدَكُمْ يَنْفَدُ وَمَا عِنْدَ اللَّهِ بَاقٍ -
তোমাদের কাছে যা আছে, ধ্বংস হয়ে যাবে আর আল্লাহ্র কাছে যা আছে, চিরস্থায়ী হবে। (সূরা-নাহল: ৯৬)
কাজেই দুনিয়াতে ভোগের যেসব সামগ্রী সংগ্রহ করেছিলাম তা আল্লাহ্ রাস্তায় অভাবী অনাথদের মাঝে বন্টন করে দিলাম, যাতে আল্লাহ্র কাছে আমার জন্য সঞ্চয় হয়ে থাকে।
৪. চতুর্থ শিক্ষা: আমি দেখলাম যে, কিছু সংখ্যক লোক নিজের আত্মীয় স্বজন বেশি হওয়াকেই সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক বলে মনে করে, এ নিয়ে মাতোয়ারা হয়ে থাকে। আর এক শ্রেণীর লোককে দেখলাম যে, তারা বেশি বেশি সম্পদ অর্জন এবং সন্তান-সন্ততি অধিক হওয়াকেই মর্যাদার বিষয় বলে মনে করে। আর এক শ্রেণীর লোক জনসাধারণের সম্পদ আত্মসাৎ, জুলম ও রক্তপাত ঘটাতে পারলেই নিজেকে সম্মানী হিসেবে গণ্য করে। আর কিছু লোক মনে করে যে, সম্পদের অপচয় ও অপব্যয় করাই সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। এ ক্ষেত্রে আমি আল্লাহ্ তা'আলার এই বাণী নিয়ে চিন্তা করলাম:
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ -
তোমাদের মধ্যে যে অধিক খোদাভীরু, আল্লাহ্র দরবারে সে-ই অধিক সম্মানী। (সূরা-হুজরাত : ১৩)
কাজেই আমি তাকওয়া (খোদাভীরুতা) অবলম্বন করলাম এবং এই প্রত্যয় অর্জন করলাম যে, আল্লাহ্র কুরআনই হক্ব, মানুষের ধারণা- অনুমান বাতিল ও ধ্বংসশীল।
৫. পঞ্চম শিক্ষা: আমি দেখলাম যে, এক শ্রেণীর লোক আরেক শ্রেণীর লোককে ঘৃণা করছে, তাদের গীবতে (নিন্দা চর্চায়) ব্যস্ত। আমি এর কারণ অনুসন্ধান করে জানলাম যে, পরস্পরের সম্পদ, পদমর্যাদা জ্ঞান নিয়ে হিংসা-বিদ্বেষের কারণেই এমনটি হচ্ছে। কাজেই আমি আল্লাহ্ তা'আলার এই ঘোষণাটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলাম:
نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُمْ مَعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا .
আমি (হেকমত ও কল্যাণের খাতিরে) দুনিয়ার জীবনে মানুষের মধ্যে তাদের জীবিকাকে ভাগ-বন্টন করে দিয়েছি। (সূরা-যুখরুফ: ৩২)
অতএব বুঝতে পারলাম যে, দুনিয়ার জীবনে এই যে জীবিকা, তা আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত। তখনই আমি আল্লাহর ইবাদতে নিবেদিত হলাম এবং কারো প্রতি হাসদ (হিংসা বিদ্বেষ) পোষণ করলাম না।
৬. ষষ্ঠ শিক্ষা: মানুষকে দেখতে পেলাম যে, দুনিয়াবী স্বার্থে ও কারণে পরস্পরের সাথে শত্রুতা করছে। তখন আমি আল্লাহর এই বাণীতে মনোযোগ নিবদ্ধ করলাম। তিনি এরশাদ করেছেনঃ
إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا
নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু, কাজেই তোমরাও তার সাথে শত্রুতা করো। (সূরা-ফাতির: ৬)
আমি বুঝতে পারলাম যে, শয়তান ছাড়া অন্য কারো সাথে শত্রুতা করা, কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা উচিৎ নয়।
৭. সপ্তম শিক্ষা: আমি দেখতে পেলাম যে, লোকেরা প্রত্যেকেই রুটি রুজি যোগাড় করার জন্যে প্রচুর চেষ্টা চালাচ্ছে। এ কারণে এমনকি হারাম ও সন্দেহযুক্ত বিষয়েও পতিত হচ্ছে। বাছ-বিচার না করে নিজেকে অপদস্থ ও মূল্যহীন করে ফেলছে। তখন আমি আল্লাহ্ এই বাণীতে মনোনিবেশ করলাম, যেখানে তিনি এরশাদ করেছেন:
وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا.
পৃথিবীতে কোনো প্রাণী নেই; বরং তার রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহ্র ওপর। (সূরা-হুদ: ৬)
আমি বুঝতে পারলাম যে, আমার রিযিকের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ্ ওপর। আল্লাহ্ তা'আলা সে রিযিক পৌঁছে দেয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছেন। কাজেই আমি তার ইবাদতে মশগুল হলাম। তিনি ছাড়া আর কারো প্রতি আমার চাওয়া-পাওয়া ত্যাগ করলাম।
৮. অষ্টম শিক্ষা: আমি দেখতে পেলাম যে, প্রত্যেকে কোনো না কোনো সৃষ্টির প্রতি আস্থা ও ভরসা রাখে। এক শ্রেণী পার্থিব জগৎ ও টাকা-পয়সার প্রতি, এক শ্রেণী সম্পদ ও পদমর্যাদার প্রতি। কেউ কেউ পেশা ও চাকুরীর প্রতি, আরেক শ্রেণী তাদেরই মতো মানুষের প্রতি ভরসা করে থাকে। এ ব্যাপারে আমি আল্লাহ্ এই বাণী নিয়ে অনুধ্যান করলাম যেঃ
وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللهِ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا -
যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্র আদেশ সর্বত্র বিরাজমান, নিশ্চয়ই তিনি প্রত্যেক কিছুর জন্য একটি পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন। (সূরা তালাক: ৩)
অতএব আমি আল্লাহ্ তা'আলার উপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করলাম। আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট। তিনি আমার জন্য উত্তম কার্য সম্পাদনকারী।
শাক্বীকু বললেন : আল্লাহ্ তোমাকে সফলকাম করুন। বাস্তবিকই আমি তাওরাত, ইঞ্জিল, যবুর ও ফুরকান (কুরআন)-এ গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখেছি যে, এই চারটি কিতাবে উল্লেখিত আটটি বিষয়ই বারবার বলা হয়েছে। যে কেউ এই আটটি বিষয় বাস্তবায়ন করবে, সে ঐ চারটি (আসমানী) কিতাবের আদেশ নিষেধের অনুসরণ করবে।
হে বৎস! উল্লেখিত দুটি হেকায়াত থেকে তুমি জানতে পেরেছ যে, তোমার প্রচুর জ্ঞানের প্রয়োজন নেই। এখন আল্লাহর সাধকের জন্য যা কর্তব্য, তোমার কাছে তা বর্ণনা করছি।