📘 আইয়ুহাল ওয়ালাদ ! হে বৎস > 📄 আইয়ুহাল ওয়ালাদ রেসালার ভূমিকা

📄 আইয়ুহাল ওয়ালাদ রেসালার ভূমিকা


الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ وَالعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ وَالصَّلُوةُ وَالسَّلَامُ عَلَى نَبِيِّهِ مُحَمَّدٍ وَالِهِ وَأَصْحَابِهِ أَجْمَعِينَ -
সমস্ত তারিফ আল্লাহ্ তা'আলার জন্য, যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক। পরকালীন সৌভাগ্য মুত্তাকীনদের জন্যই নির্ধারিত। দরূদ ও সালাম আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার আহলে বাইত ও সকল সাহাবায়ে কেরামের প্রতি।
শেখ আবু হামেদ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ গায্যালী কাদ্দাসাল্লাহু রুহাহু (আল্লাহ্ তা'আলা তার রূহকে পবিত্রতা দান করুন)-এর জনৈক শাগরেদ-যিনি বহু বছর তার খেদমতে থেকে ইল্ম হাসিল করেন, সব ধরনের জ্ঞানে ভাগ্যবান হয়েছিলেন এবং আত্মিক কামালিয়াতের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন গুঢ়তত্ত্ব আহরণ করেছিলেন, তিনি একদিন মনে মনে চিন্তা করেন যে, আমি বহু বছর ধরে দুঃখ-কষ্ট বরণ করেছি এবং সব ধরনের জ্ঞান ভাণ্ডার হতে বহু কিছু আহরণ করেছি, আমার জীবনের সর্বোত্তম দিনগুলোকে জ্ঞান আহরণ ও সাধনার মধ্যে অতিবাহিত করেছি; এখন এ কথা জানার সময় হয়েছে যে, এ সব জ্ঞানের মধ্যে কোনটি কাল কেয়ামতে আমার উপকারে আসবে এবং কবরে আমার সাথী ও সহমর্মী হবে? সেই সাথে কোন জ্ঞানটি আমার জন্য কোনো রূপ ফায়দা দেবেনা ? কেননা হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ -
হে আল্লাহ্! যে জ্ঞানের দ্বারা কোনো উপকার হয়না, তা থেকে আমি তোমার কাছে পানাহ্ চাই।
বেশ কয়দিন এই চিন্তায় মগ্ন থাকার পর তিনি হুজ্জাতুল ইসলাম মুহাম্মদ গায্যালী (রহ)-এর খেদমতে বিষয়টি লিখিতভাবে উত্থাপন করেন, যাতে এ বিষয়ে তাঁর ফতোয়া (ও সিদ্ধান্তমূলক মতামত) জানতে সক্ষম হয়। এরপর তাঁর কাছে আরো কিছু বিষয়ে (মাসআলা) জিজ্ঞাসা করেন এবং উপদেশ, নসীহত ও দো'আর দরখাস্ত পেশ করেন। ছাত্রটি আরো বলেন: যদিও মাননীয় শায়খ এসব দরখাস্ত ও অনুরোধের জবাবে বহু কিতাব লিখেছেন; যেমন- এহয়াউ উলূমুদ্দীন, কিমিয়ায়ে সাআদাত, জাওয়াহিরুল কুরআন, মিনহাযুস্ সুন্নাহ্ প্রভৃতি। কিন্তু যে বিষয়টি জানা আমার উদ্দেশ্য, তা হচ্ছে, মাননীয় শায়খ যেন আমার আবেদনের জবাব কয়েক পাতার মধ্যে লিখে দেন, যাতে সবসময় সাথে রাখতে পারি এবং জীবনভর যেন তাঁর ওপর আমল করতে পারি- ইনশাআল্লাহ্ তা'আলা। অত:পর মহান শায়খ হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযযালী (রহ) তাঁর জবাবে এই রেসালাটি লিপিবদ্ধ করেন।

📘 আইয়ুহাল ওয়ালাদ ! হে বৎস > 📄 হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নসীহত শোনা ও তার ওপর আমল করা প্রসঙ্গে

📄 হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নসীহত শোনা ও তার ওপর আমল করা প্রসঙ্গে


ওহে প্রিয় বৎস! হে আমার সম্মানিত বন্ধু!
আল্লাহ্ তোমাকে দীর্ঘ হায়াত দান করুন। যাতে তুমি তার বন্দেগীতে চেষ্টা করো আর তোমাকে তার ওলীদের পথে হেদায়াত দান করেন। জেনে রেখো যে, উপদেশের উৎস ও ভাণ্ডার হচ্ছে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম। (যে উপদেশ ও দিক-নির্দেশনা তাঁর পক্ষ থেকে হবে না, তার দ্বারা কোনো উপকার হাসিল হবে না।) কাজেই হযরতের উপদেশমালা থেকে যদি তোমার কাছে কিছু পৌঁছে থাকে, তাহলে আমার নসীহতের তোমার কী দরকার? আর যদি সেই নসীহতসমূহ থেকে তুমি কিছু লাভ করতে না পার, তাহলে আমাকে এ কথাটি বলো যে, বিগত বছর গুলোতে তুমি (তাহলে) কি হাসিল করেছ? হে বৎস! হযরত আপন উম্মতের প্রতি যে উপদেশ দিয়েছেন তার মধ্যে রয়েছে:
عَلَامَةُ إِعْرَاضِ اللَّهِ تَعَالَى عَنِ الْعَبْدِ اشْتِغَالُهُ بِمَا لَا يَعْنِيهِ وَإِنْ إِمْرَا ذَهَبَتْ سَاعَةً مِنْ عُمْرِهِ فِي غَيْرِ مَا خُلِقَ لَهُ مِنَ الْعِبَادَةِ لَجَدِيرٌ أَنْ تَطُولَ عَلَيْهِ حَسْرَتُهُ وَمَنْ جَاوَزَ الْأَرْبَعِينَ وَلَمْ يَغْلِبُ خَيْرُهُ عَلَى شَرِّهِ فَلْيَتَجَهَّرْ إِلَى النَّارِ -
বান্দার দিক থেকে আল্লাহ্ তা'আলা মুখ ফিরিয়ে নেয়ার, বান্দার প্রতি আল্লাহ্ তাআলা নাখোশ হবার একটি আলামত হচ্ছে, বান্দা এমন সব বিষয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে, যা তার উপকারে আসবে না। বাস্তবিকই মানুষ যদি তার জীবনের একটি ঘন্টা আল্লাহ্ ইবাদত ব্যতীত অন্য কোনো কাজে ব্যয় করে, তাহলে তার জন্য অনেক অনুতাপ অনুশোচনা করা উচিৎ। আর যে ব্যক্তির বয়স চল্লিশ পার হয়েছে, অথচ তার ভালো কাজ মন্দ কাজের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করেনি, তার দোযখে যাবার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিৎ।
আলেমদের জন্য এই নসীহতই যথেষ্ট।
হে বৎস!
উপদেশ দেয়া সহজ। উপদেশ গ্রহণ করাই কঠিন। কারণ, যারা প্রবৃত্তির পূজারী, বিশেষত যারা সনদ লাভের জন্য জ্ঞানার্জন অথবা পার্থিব মান-সম্মান ও পদমর্যাদা লাভের জ্ঞান চর্চায় মশগুল, তাদের কাছে উপদেশ বড়ই তিতা। তাদের কাছে প্রিয় হলো, শরীয়তে নিষিদ্ধ বিষয় ও ভোগের সামগ্রীসমূহ। কেননা, এ ধরনের জ্ঞান অন্বেষণকারীরা মনে করে যে, নিছক জ্ঞানই তাদের মুক্তির উপায় হবে। তাদের সাফল্যের চাবিকাঠি জ্ঞান অর্জন। আমলের (ইল্ম অনুযায়ী জীবনকে সাজানোর) প্রয়োজন নেই। এটা হচ্ছে দর্শনশাস্ত্র চর্চাকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাস। সুবহানাল্লাহিল আযীম (তারা যা ধারণা করে, তা থেকে আল্লাহ্ তা'আলা অতিশয় পবিত্র)।
এই দাম্ভিক লোকটি কি এ কথা বুঝেনা যে, সে যখন ইল্ম (জ্ঞান) অর্জন করলো, এরপর তদনুযায়ী আমল করলো না, তখন তার ওপর তো হুজ্জাত পুরোপুরিই কায়েম হবে (তাকে পাকড়াও করার চূড়ান্ত যুক্তি শক্ত ও মজবুত হবে)। যেমন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন:
أَشَدُّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَالِمٌ لَا يَنْفَعُهُ اللهُ بِعِلْمِهِ -
কেয়ামতের দিন ঐ আলেমই সবচাইতে বেশি শাস্তি ভোগ করবে, যার জ্ঞান দ্বারা আল্লাহ্ তা'আলা তাকে লাভবান করেন নি। বর্ণিত আছে যে, জনৈক বুযুর্গ হযরত জুনাইদ (বাগদাদী) (রহ)-কে স্বপ্নে দেখেন। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আবুল কাসেম (জুনাইদ)!কি খবর, কেমন আছেন আপনি? তিনি বললেনঃ
طَاحَتْ تِلْكَ الْعِبَارَاتُ وَفَنِيَتْ تِلْكَ الْإِشَارَاتُ، وَمَا نَفَعَنَا إِلَّا رُكَيْعَاتٌ رَكَعْنَاهَا فِي جَوْفِ اللَّيْلِ -
ঐ সমস্ত সাজানো কথা তিরোহিত হয়ে গেছে, ঐসব আধ্যাত্মিকতার ইঙ্গিত-ইশারা ধ্বংসে তলিয়ে গেছে। কেবল সেই কয় রাকাত নামায - যা গভীর রাতে ওঠে পড়তাম, তাছাড়া অন্য কিছুই আমার উপকারে আসে নি।
ওহে বৎস!
নেক আমলের প্রতি উদাসীন এবং আধ্যাত্মিক চেতনা ও হাল থেকে বিচ্ছিন্ন হইও না। এ কথা নিশ্চিত জেনে রেখো যে, শুধুমাত্র ইল্ম ও জ্ঞান তোমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবে না। একটি মেসাল দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। কেউ যদি দশটি ভারতীয় তলোয়ার পিঠে বহন করে, আরো অনেক কার্যকর হাতিয়ারও যোগাড় করে, নিজে যদি বীর কেশরি লড়াকু হয়, ঐ সময় যদি তার ওপর কোনো বন্য বাঘ হামলা করে, তখন অবস্থা কি দাঁড়াবে বলে তুমি মনে কর? যদি তার কাছে রক্ষিত অস্ত্র সে ব্যবহার না করে, তাহলে কি অস্ত্রগুলো নিজে নিজেই বাঘের আক্রমণ প্রতিহত করবে? একথা স্বতঃসিদ্ধ যে, লোকটি অস্ত্রগুলো ব্যবহার না করলে অস্ত্রের কোনো প্রভাব বা প্রতিক্রিয়াই সে লাভ করতে পারবে না। যে লোক ইলম সম্পর্কিত হাজারো মাসআলা আয়ত্ব করেছে তার অবস্থাও একই রকম। যদি সে ইল্ম অনুযায়ী আমল না করে, জ্ঞানকে কাজে না লাগায়, তাহলে সে জ্ঞান তাকে কোনো ফায়দা দেবে না। এই একই দৃষ্টান্ত হচ্ছে সেই রোগীর উদাহরণ, যার রোগ তাপ ও উষ্ণতা থেকে উৎপত্তি হয় এবং শরীরে পিত্তরসের মাত্রা বেড়ে যায়, আর সে মনে করে যে, সাকানযাবীন (যবের পানি ও মধু সির্কা মিশ্রিত সিরাপ) সেবন করলে এই রোগের উপশম হবে। লোকটি যদি ঐ নির্দিষ্ট ওষুধ সেবন না করে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই বলা যাবে যে, ঐ লোকের অসুখ ভালো হবে না, হতে পারে না।
জনৈক কবি বলেছেন:
گرمی دو هزار رطل همی پیائی تامی نخوری نباشدت شیدائی
দুই হাজার রিতিল মদ যদি অবিরাম মাপতে থাকো,
যদি নিজে পান না করো, তোমার মত্ততা আসবে নাকো।
যদি শত বছর ধরে লেখাপড়া করো আর হাজার হাজার কিতাব জোগাড় করো, তাতে আল্লাহর রহমতের উপযুক্ত হবে না, যতক্ষণ না তুমি যা শিখেছ সে অনুযায়ী আমল করো। আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেছেন-
وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَى -.
আর মানুষ যা চেষ্টা করে, তার বাইরে সে কিছুই পাবে না। (সূরা নাজম: ৩৯)
তিনি আরো এরশাদ করেছেন:
فَمَنْ كَانَ يَرْجُو القَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا -
যে ব্যক্তি আপন পারওয়ারদেগার আল্লাহ্র সাক্ষাত পাবার আশা রাখে, তাকে অবশ্যই সৎকর্ম আঞ্জাম দিতে হবে। (সূরা-কাহাফ : ১১০)
جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ -
"এ হচ্ছে সেই আমলের প্রতিদান, যা তারা আনজাম দিয়েছে। (সূরা-তাওবা : ৯৫)
তিনি আরো এরশাদ করেন :
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا خَالِدِينَ فِيهَا لَا يَبْغُونَ عَنْهَا حِوَلًا -
যারা আল্লাহ্র প্রতি ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, জান্নাতুল ফেরদৌস হবে তাদের মেহমানদারীর স্থান। তারা সেখানে অনন্তকাল থাকবে এবং সেখান থেকে অন্য কোথাও যেতে চাইবে না। (সূরা-কাহাফ : ১০৭, ১০৮)
অন্যত্র এরশাদ করেন :
فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَوةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقُونَ غَيَّا إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُولَئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَ لَا يُظْلَمُونَ شَيْئًا -
অতঃপর তাদের পরে এমন নালায়েক লোক জন্মাল, যারা নামায নষ্ট করে দিলো। নফসের কামনা-বাসনার অনুসরণ করলো। অতএব শীঘ্রই তারা তাদের গোমরাহীর শাস্তি ভোগ করবে। তবে যারা তওবা করেছে এবং ঈমান এনেছে আর সৎকর্ম সম্পাদন করেছে; বস্তুত তারাই বেহেস্তে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি সামান্যতম অবিচার করা হবে না। (সূরা মরিয়ম : ৫৯,৬০)
এই হাদীস সম্পর্কে তুমি কি বলো? যার মূলনীতির ওপর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত।
بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ وَإِقَامِ الصلوةِ وَأَبْنَاءِ الزَّكَوةَ وَصَوْمِ رَمَضَانَ وَحَجَّ الْبَيْتِ لِمَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا -
ইসলাম পাঁচটি বুনিয়াদের উপর প্রতিষ্ঠিত। এ কথা সাক্ষ্য দেয়া যে, একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই আর মুহাম্মদ (স) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। নামায কায়েম করা, যাকাত দেয়া, রমযান মাসের রোযা রাখা আর হজ্বে যাবার সামর্থ আছে এমন ব্যক্তির হজ্ব আদায় করা।
অনুরূপভাবে বর্ণিত আছে:
الْإِيْمَانُ قَوْلُ بِالنِّسَانِ وَتَصْدِيقُ بِالْجِنَانِ وَعَمَلَ بِالْأَرْكَانِ -
ঈমান হচ্ছে মুখে স্বীকার করা, অন্তরে সত্য বলে বিশ্বাস করা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে কাজে পরিণত করা।
আমল করা বা বাস্তবে কাজ করার কি গুরুত্ব ও ফযিলত এবং তার কারণ কি এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচনা সম্ভবপর নয়।
অবশ্য (এ কথাও ঠিক যে) বান্দাহ আল্লাহ্ দয়া, রহমত ও অনুগ্রহের মাধ্যমেই বেহেশতে গমন করে। কিন্তু তা তখনই হবে, যখন আল্লাহ্ ইবাদত ও আনুগত্যের মাধ্যমে নিজেকে আল্লাহ্র রহমতের উপযুক্ত করে গড়ে তুলবে। কেননা আল্লাহ্ তাআলা ফরমায়েছেন:
إِنَّ رَحْمَةَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِنَ الْمُحْسِنِينَ -
নিশ্চয়ই আল্লাহ্র রহমত নিষ্ঠাবান সৎকর্মশীলদের নিকটেই আছে। (সূরা-আরাফ: ৫৬)
যদি কেউ বলে যে, শুধু আল্লাহর ওপর ঈমান আনলেই মানুষ বেহেস্তে প্রবেশ করবে। আমি বলব হ্যাঁ, প্রবেশ করবে। তবে প্রবেশ করার জন্য ততদূর কোন ব্যক্তিটি পৌছতে পারবে? সেখানে পৌছতে হলে তো অনেক কঠিন প্রান্তর পার হতে হবে। প্রথম প্রান্তর বা পারাপার হচ্ছে, ঈমান সালামতে যাওয়া। মৃত্যুর দুয়ার পর্যন্ত যদি ঈমানের হেফাযত করে নিয়ে যেতে পারে, তারপর যদি বাকী ঘাটগুলো অতিক্রম না করে, তাহলে বেহেশতে গেলেও তো শূণ্য বেহেস্তই পাবে। হযরত হাসান বসরী বলেছেন- আল্লাহ্ তা'আলা কেয়ামতের দিন আপন বান্দাদের বলবেন:
ادْخُلُوا يَا عِبَادِيَ الْجَنَّةَ بِرَحْمَتِي وَاقْتَسِمُوْ هَا بِأَعْمَالِكُمْ -
হে আমার বান্দারা! আমার দয়া ও রহমতের বদৌলতে তোমরা বেহেশতে প্রবেশ কর আর তোমাদের আমল অনুপাতে নিজেদের মাঝে তা ভাগ করে নাও।
হে বৎস!
যতক্ষণ কোনো কাজ না করবে ততক্ষণ কাজের পারিশ্রমিক পাবে না। বর্ণিত আছে যে, বনি ইসরাঈলের এক ব্যক্তি সত্তর বছর আল্লাহর ইবাদত করে।
অত:পর আল্লাহ্ চাইলেন যে, তার এখলাসের গুরুত্ব ও মর্যাদা ফেরেশতাদের সামনে প্রকাশ করবেন। তখন একজন ফেরেশতা তার কাছে পাঠালেন। যেন তাকে এ কথা বলে যে, এই ইবাদত তাকে বেহেশতে প্রবেশের উপযুক্ত করবে না। ফেরেশতা যখন কথাটি আবেদ লোকটির কাছে গিয়ে বললেন, তখন লোকটি জবাব দিলেন-“ আমাদেরকে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীর জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। কাজেই তার ইবাদত করে যাওয়াই আমাদের উচিৎ।" ফেরেশতা ফিরে গিয়ে মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে আরয করলেন: ইয়া আল্লাহ্! ঐ ব্যক্তি কি বলেছে তা তুমি ভাল জানো। আল্লাহ্ তা'আলা ফরমালেন: লোকটি যখন বেহেশতে প্রবেশ করবে না বলে জানার পরও আমার ইবাদত বন্দেগী ত্যাগ করছে না, তখন আমার অসীম দয়া ও রহমতের জন্য মোটেও শোভনীয় নয় যে, আমি সে বান্দাকে ত্যাগ করব। হে আমার ফেরেশতারা! তোমরা সাক্ষী থাকো যে, আমি তার গোনাহ-খাতা মাফ করে দিলাম। রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:
حَاسِبُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوا وَزِنُوا أَعْمَالَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُوزَنُوا -
মৃত্যুর পর তোমাদের হিসাব নেবার পূর্বেই তোমরা নিজেদের হিসাব নিজেরা নাও। আর তোমাদের আমলসমূহ (পরকালে) দাঁড়িপাল্লায় ওজন করার আগে নিজেরা ওজন করে দেখো।
হযরত আলী (রা:) ফরমায়েছেন:
مَنْ ظَنَّ أَنَّهُ بِدُونِ الْجَهْدِ يَصِلُ فَهُوَ مُتَمَنٍّ وَمَنْ ظَنَّ أَنَّهُ بِبَدْلِ الْجَهْدِ يَصِلُ فَهُوَ مُسْتَغْنٍ -
যে ব্যক্তি মনে করে যে, চেষ্টা সাধনা ছাড়া আপন লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে, সে তার আশা নিয়েই বসে থাকবে (সে আশা পূর্ণ হবে না)। আর যে মনে করে যে, নিরন্তর চেষ্টার মাধ্যমে লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে, সে (লক্ষ্যে পৌঁছার ব্যাপারে) নিশ্চিন্ত থাকবে।
হযরত হাসান বসরী (রহ) বলেছেন:
طَلَبُ الْجَنَّةِ بَلَا عَمَلٍ ذَنْبٌ مِنَ الذُّنُوبِ -
আমল ব্যতিরেকে বেহেস্ত তালাশ করা এক ধরনের গোনাহ্।
তিনি আরো বলেছেন:
عَلَامَةُ الْحَقِيقَةِ تَرْكُ مُلَاحَظَةِ الْعَمَلِ لَا تَرْكُ الْعَمَلِ -
হাকীকতে পৌঁছে যাবার চিহ্ন হচ্ছে আমল নিয়ে প্রলুব্ধ না হওয়া, আমল ত্যাগ করা নয়।
হযরত নবী করীম-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেনঃ
الْكَيْسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْأَحْمَقُ مَنْ اتَّبَعَ هَوَاهُ وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ تَعَالَى الْأَمَانِي -
ঐ ব্যক্তিই বিচক্ষণ যে নিজের নফসকে অপদস্থ করেছে এবং মৃত্যুর পরের শান্তির জন্য আমল করেছে। আর আহাম্মক ঐ ব্যক্তি, যে নফসের কামনা বাসনার অনুসরণ করে আর আল্লাহ্র কাছে বড় বড় আশা নিয়ে বসে থাকে।
হে সন্তান!
তুমি কত রাতই না কিতাবপত্র অধ্যয়ন ও জ্ঞান গবেষণায় বিনিদ্রা কাটিয়েছ। নিজের জন্য আরামের ঘুম হারাম করেছ? আমি জানি না, এভাবে বিনিদ্র রাত জাগার কারণ কি ছিল। এ কাজের পেছনে উদ্দেশ্য যদি বস্তুগত লক্ষ্য হয়ে থাকে, যদি দুনিয়ার ধন-সম্পদ, বড় বড় চাকরি ও পদমর্যাদা লাভ করা এবং সহপাঠী ও সমগোত্রীয়দের ওপর বড়াই করা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে তোমার জন্য বড়ই আফসোস (তুমি বড় ক্ষতির মধ্যে নিপতিত)। হ্যাঁ, এই পরিশ্রমের পেছনে তোমার উদ্দেশ্য যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীয়তকে জীবিত করা, নিজের চরিত্র, আচার ব্যবহার সংশোধন ও শুদ্ধ করা এবং নফসে আম্মারাকে (যে কুপ্রবৃত্তি মানুষকে মন্দের দিকে ধাবিত করে) দমন করা হয়, তাহলে তোমার জন্য তা মোবারক হোক, শুভ হোক। সৌভাগ্য তোমাকে হাতছানি দিচ্ছে। জনৈক কবি কতইনা সুন্দর গেয়েছেন:
سَهَرُ الْعُيُونِ لِغَيْرِ وَجْهِكَ ضَائِعُ وَبُكَا وَهُنَّ لِغَيْرِ فَقْدِكَ بَاطِلٌ
তোমার আনন ছাড়া অন্য কিছুর জন্য চোখের বিনিদ্রা ধ্বংসের সমার্থক,
তোমাকে হারানো ব্যতীত নয়নের কান্না বৃথা অনর্থক।
হে বৎস!
তুমি যেভাবে পছন্দ করো জীবন যাপন করো। তবে মনে রেখে যে, শেষ পর্যন্ত মৃত্যু তোমার অপেক্ষায় আছে। তুমি যাকে চাও ভালোবাস, তবে জেনে রেখো যে, তার থেকে একদিন বিচ্ছিন্ন হবেই। আর যেভাবে ইচ্ছা ভোগ ব্যবহার কর; তবে মনে রাখবে যে, তোমার মন্দ কাজের সাজা তোমাকে অবশ্যই ভোগ করতে হবে।

📘 আইয়ুহাল ওয়ালাদ ! হে বৎস > 📄 উপকারী জ্ঞান কোনটি?

📄 উপকারী জ্ঞান কোনটি?


ওহে সন্তান!
কালামশাস্ত্র, তর্কবিদ্যা, চিকিৎসা বিজ্ঞান, কবিদের দিওয়ান (কাব্যগ্রন্থ), জোতির্বিদ্যা, অলংকার শাস্ত্র এবং ব্যাকরণ পড়ে তোমার কি অর্জন হবে? (আখেরাতের জন্য না হলে) তোমার মূল্যবান জীবনটা আল্লাহ্-যুল্ জালালের রাস্তার উল্টা পথে নষ্ট ও ধ্বংস করারই শামিল হবে। হযরত ঈসা (আ:) এর ইঞ্জিলে দেখেছি যে:
'মৃত্যুর পর লাশ কফিনে রাখার পর থেকে কবরে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ে আল্লাহ্ তাআলা বান্দার কাছে চল্লিশটি প্রশ্ন করেন। প্রথম প্রশ্নটি হল, আল্লাহ্ তাআলা বলেন- হে বান্দা! বছরের পর বছর তুমি লোকদের সামনে নিজেকে পরিপাটি ও সজ্জিত করেছ, অথচ আমার সামনে এক ঘন্টাও নিজেকে সজ্জিত করোনি। প্রতিদিন আল্লাহ্ তোমার জ্বলবে দৃষ্টি দেন এবং বলেন, কেন তুমি অন্যদের দেখানোর জন্য কষ্ট করছ? অথচ তুমি আমার দয়া ও অনুগ্রহের মধ্যেই ডুবে আছ (আমার জন্য তো কষ্ট স্বীকার করছো না); কিন্তু তুমি বধির, কিছুই শুনতে পাওনা।'
হে বৎস!
আমল বিহীন ইল্ল্ম হচ্ছে পাগলামী, আবার বিনা ইল্মে আমল সম্ভব নয়। যে জ্ঞান তোমাকে গোনাহ ও পাপকর্ম থেকে বিরত না রাখে এবং মাবুদ মাওলার ইবাদতে বাধ্য না করে, সে জ্ঞান তোমাকে কাল কেয়ামতে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করতে পারবে না। আজকেই যদি তোমার জ্ঞান মোতাবেক আমল না কর এবং হারানো দিনগুলোর ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য উদ্যোগী না হও, তাহলে কেয়ামতের দিন ঐসব লোকদের দলে অন্তর্ভূক্ত হতে হবে, যারা বলবে
فَارْجِعْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا
'প্রভু হে! আমাদেরকে দুনিয়াতে ফিরিয়ে নাও, আমরা সেখানে সৎকর্ম সম্পাদন করব।' তখন তোমাকে বলে দেয়া হবে- আহাম্মক! তুমি তো সেখান থেকেই এসেছ।
হে বৎস!
কূলবে শক্তি ও বল বৃদ্ধি করতে হবে আর নক্সকে পর্যুদস্ত করতে হবে। দেহকে মৃত্যুর জন্য তৈরি করতে হবে। কেননা, আসল ঠিকানা তো কবরস্থান। কবরবাসীরা, তুমি কখন তাদের সাথে মিলিত হবে তার অপেক্ষায় আছেন। খবরদার! সম্বলহীনভাবে যেন তুমি সেখানে না যাও। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) বলেনঃ
هَذِهِ الْأَجْسَادُ قَفَصُ الطُّيُورِ أَوْ اصْطَبُلُ الدَّوَابِ -
এই যে দেহ, এগুলো হয়ত পাখিদের খাঁচা অথবা গবাদি পশুর আস্তাবল। এখন নিজের দিকে তাকিয়ে দেখ; চিন্তা করে দেখ যে, তুমি এর কোনটি? যদি তুমি উর্ধ্বলোকের পাখি হয়ে থাক, তাহলে ارجعى إِلَى رَبِّد (তোমার প্রভুর পানে ফিরে এসো) '-এর ডাক শোনার সাথে সাথে আরশের সর্বোচ্চ স্থানের পানে উড়াল দাও।
হযরত নবী করীম-(স) এরশাদ করেন:
اهتز عرش الرَّحْمَنِ مِنْ مَوْتِ سَعَدِ بْنِ مَعَادٍ -
সাআদ ইবনে মাআয এর মৃত্যুর পর আল্লাহ্র আরশ প্রকম্পিত হয়। (কারণ, আরশের সাথে ছিল তার সম্পর্ক)।
আল্লাহ্ না করুন, তুমি যদি চতুষ্পদ জন্তুর অন্তর্ভূক্ত হয়ে থাক, তাহলে ঘরের কোণা থেকে হাবিয়া দোযখেই তুমি পাড়ি জমাবে। আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন:
أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ -
ওরা হচ্ছে চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তার চাইতেও অধিক গোমরাহ। (সূরা আরাফ: ১৭৯)
বর্ণিত আছে যে, হযরত হাসান বসরীর (রহ) কাছে একবার সামান্য ঠান্ডা পানি আনা হয়। তিনি পাত্রটি হাতে নেয়ার সাথে সাথে বেহুশ হয়ে পড়েন এবং তার হাত থেকে পাত্রটি পড়ে যায়। হুঁশ ফিরে পাবার পর এ অবস্থার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি বলেন, দোযখের বাসিন্দারা বেহেশতের বাসিন্দাদের কাছে যে আরজু পেশ করবে, সে কথাটি আমার মনে পড়েছিল।
أَنْ أَفِيضُوا عَلَيْنَا مِنَ الْمَاءِ أَوْمِمَا رَزَقَكُمُ اللهُ -
আল্লাহ্ তাআলা আপনাদেরকে বেহেস্তে যে পানীয় দিয়েছেন অথবা যে রিযিক দান করেছেন, তা থেকে সামান্যটুকুন কি আমাদের দান করবেন? (সূরা-আ'রাফ: ৫৭)

📘 আইয়ুহাল ওয়ালাদ ! হে বৎস > 📄 ইল্ম আমল সহকারে হলেই উপকারী

📄 ইল্ম আমল সহকারে হলেই উপকারী


ওহে বৎস!
যদি শুধু জ্ঞানই তোমার জন্য যথেষ্ট হতো আমলের (জ্ঞান অনুযায়ী কাজ করার) যদি দরকার না হতো, তাহলে আল্লাহ্র পক্ষ হতে এসব আহবান অনর্থক বলে সাব্যস্ত হতো
هَلْ مِنْ سَائِلِ )হাল্ মিন সায়েলিন?) আমার কাছে কি কিছু প্রার্থনাকারী আছো?
وَهَلَ مِنْ تَائِبٍ )ওয়া হাল মিন তায়েবিন?) আমার কাছে তওবাকারী কি কেউ আছো?
وَهَلْ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ )ওয়া হাল মিন মুস্তাগফেরিন ?) গোনাহ্ মাফ চাওয়ার কোনো লোক কি আছো?
বর্ণিত আছে যে, একদিন সাহাবায়ে কেরামের একটি দল হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র দরবারে উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় অব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমরের (রা) প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা হয়। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:
نِعْمَ الرَّجُلُ هُوَ لَوْ كَانَ يُصَلَّى بِاللَّيْلِ
সে খুব ভালো মানুষ, তবে যদি রাতে তাহাজ্জুদের নামায আদায় করে।
অনুরূপভাবে হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি একজন সাহাবীকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
يَا فَلَانُ لَا تُكْثِرِ النَّوْمَ بِاللَّيْلِ فَإِنْ كَثرَةَ النَّوْمِ بِاللَّيْلِ يَدَعُ صَاحِبَهُ فَقِيرًا يَوْمَ القيامة
হে অমুক! লক্ষ্য কর, রাতে বেশি ঘুমাইওনা। কারণ, রাতের অতিরিক্ত ঘুম ঐ লোককে কেয়ামতের দিন ভিখারীতে পরিণত করবে।
হে বৎস!
وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَكَ .
রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদের নামায আদায় করুন, যা আপনার জন্যে (বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ) অতিরিক্ত কাজ। (সূরা-বনী ইসরাঈল: ৭৯)
আর وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
শেষ রাতে ওঠে তারা (আল্লাহর দরবারে) মাগফেরাত কামনা করে। (সূরা আয-যারিয়াত:১৮)
রাসূলে খোদা-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন :
ثَلْثَةُ أَصْواتِ يُحِبُّهَا اللهُ تَعَالَى صَوْتُ الدِّيكِ وَصَوْتُ الَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَصَوْتُ الْمُسْتَغْفِرِينَ بِاالْأَسْحَارِ -
তিন ধরনের আওয়াযকে আল্লাহ্ তা'আলা ভালোবাসেন, মোরগের ডাক, কুরআন তেলাওয়াতকারীর আওয়ায এবং শেষরাতে উঠে گোনাহের মাগফেরাত কামনাকারীর আওয়ায।
হযরত সুফিয়ান সাওরী-রাহমতুল্লাহ্ আলাইহ্ বলেনঃ
إِنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى خَلَقَ رِيحًا تَهُنَّ بِالْأَسْحَارِ تَحْمِلُ الْأَذْكَارَ وَالْإِسْتِغْفَارَ إِلَى الْمَلِكِ الْجَبَّارِ
আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা এমন এক বাতাস সৃষ্টি করেছেন, যা শেষ রাতে প্রবাহিত হয় এবং যিকির ও এস্তেগফারসমূহ মহামহীম আল্লাহর দরবারে নিয়ে যায়।
অনুরূপভাবে বর্ণিত আছেঃ
إِذَا كَانَ أَوَّلُ اللَّيْلِ يُنَادِي مُنَادٍ مِنْ تَحْتِ الْعَرْشِ الْالِيَقُمِ الْعَابِدُونَ فَيَقُومُونَ وَيُصَلُّوْنَ مَا شَاءَ اللهُ ثُمَّ يُنَادِي مُنَادٍ فِي شَطْرٍ اللَّيْلِ الْالِيَقُمِ الْقَانِتُونَ فَيَقُومُونَ وَيُصَلُّونَ إِلَى السَّحَرِ فَإِذَا كَانَ السَّحَرُ نَادَى مُنَادٍ الْالِيَقُمِ الْمُسْتَغْفِرُونَ فَيَقُومُونَ وَيَسْتَغْفِرُ ونَ فَإِذَا طَلَعَ الْفَجْرُ نَادَى مُنَادٍ الْالِيَقُمِ الْغَافِلُونَ فَيَقُومُونَ مِنْ فُرُوشِهِمْ كَالْمَوْ نَي نُشِرُ وا مِنْ قُبُورِ هِمْ -
যখন রাতের প্রথম ভাগ আসে, আরশের নিচ থেকে একজন আহবানকারী ডাক দিয়ে বলেন : ওহে ইবাদতকারীরা! জাগ্রত হও। সে ডাক শুনে তারা জাগ্রত হয়ে আল্লাহ্ যতখানি ইচ্ছা (যতখানি তওফীক দেন), নামায আদায় করেন। অতপর মধ্যরাতে ডাক দিয়ে বলেন : আল্লাহকে ভয়কারী, পরহেযগাররা জাগ্রত হও। সে ডাক শুনে ঐ দলটি জাগ্রত হয় এবং শেষ রাত পর্যন্ত নামায আদায় করেন। যখন রাতের শেষভাগ হয়, আহবানকারী ডাক দিয়ে বলেন, গোনাহ্ মাফ চাওয়ার লোকেরা জাগ্রত হও। তখন ঐ দলটি জাগ্রত হয়ে আল্লাহর দরবারে মাগফেরাত কামনা করেন। অতঃপর যখন ভোর হয়ে যায়, তখন আহবানকারী ডাক দিয়ে বলেন : ওহে অলসরা! ওঠো। তখন তারা মৃত লোকদের কবর থেকে ওঠার মতো বিছানা ত্যাগ করে।
হযরত লোকমান হাকীম তার সন্তানদের যে ওসিয়ত করে যান, তার অন্যতম হচ্ছেঃ
يَا بُنَيَّ لَا يَكُونَنَّ الدِّيْكَ أَكْبَسُ مِنْكَ يُنَادِي بِالْأَسْحَارِ وَأَنْتَ نَائِمٌ -
হে আমার সন্তান! খবরদার মোরগ যেন তোমার চাইতে চালাক না হয়, মোরগ শেষ রাতে ডাক দেবে; অথচ তুমি ঘুমিয়ে থাকবে (এমন যেন না হয়)।
কবি কত সুন্দর বলেছেন:
لَقَدْ هَتَفَتْ فِي جُنْحِ اللَّيْلِ حَمَامَةٌ عَلَى فَنَنِ وَهَنَّا وَإِنِّي لَنَائِمٌ كذبتُ، وَبَيْتِ اللهِ لَوْ كُنْتُ عَاشِقًا لَمَّا سَبَقَتْنِي بِالْبُكَاءِ الْحَمَائِمُ وَأَزْعُمُ أَنِّي هَانِمْ ذُو صَبَابَةٍ لِرَبِّي فَلَا ابْكِي وَتَبْكِي الْبَهَائِمُ -
কবুতর রাতে গাছের ডালে বেদনায় ভরা কন্ঠে ডাকে
অথচ আমি ঘুমিয়ে কাটাই বিছানার পরে।
আল্লাহ্র ঘরের কসম, মিথ্যা বলেছি; যদি বলি-আমি প্রেমিক
কেননা কবুতররা তাহলে কান্নায় ছাড়িয়ে যেতে পারত না আমাকে।
আমি কিনা ভাবি, আমি আল্লাহ্ প্রেমিক, কিন্তু কাঁদি না।
অথচ পশু-পক্ষীরা কাঁদে তার জন্য নিরবাধি।
হে বৎস!
ইল্ম বা জ্ঞানের সার কথা হলো, আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের স্বরূপ তোমাকে জানতে হবে। জেনে রেখো যে, উভয়ের মর্মার্থ হচ্ছে, শরীয়তের আদেশ ও নিষেধসমূহের বেলায়, কথা ও কাজের মধ্য দিয়ে তুমি শরীয়তের অনুসরণ করবে। অর্থাৎ তুমি যে কাজ সম্পাদন করবে বা করবে না, মুখে বলবে অথবা বলবে না, তা যেন পবিত্র শরীয়ত অনুযায়ী হয়। (যদি শরীয়তের আদেশ অনুযায়ী আমল করো তাহলেই ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে, অন্যথায় নয়।) তুমি তো দেখতেই পাচ্ছ যে, ঈদুল ফিত্র বা আইয়ামে তাশরীক (কোরবানীর ঈদের তিনদিন) রোযা রাখা গোনাহ। অনুরূপভাবে কেউ যদি চুরি-ডাকাতি করা কাপড় পরে নামায পড়ে (সওয়াব তো হবে না; বরং) গোনাহগার হবে। যদিও তা দেখতে ইবাদতের মতো দেখায়। (কাজেই শরীয়তের ওপর আমল করাই হচ্ছে মূল কথা; আসল ইবাদত।)
হে বৎস!
তোমার কথা ও কাজ পবিত্র শরীয়ত মোতাবেক হওয়া চাই। কারণ, ইল্ম ও আমল যদি শরীয়তের অনুগামী না হয়, তাহলে গোমরাহী ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনে না।
অনুরূপভাবে সূফীগণ মাঝে মধ্যে বাহ্যত শরীয়ত পরিপন্থ যেসব উক্তি করেন বা অগোছালো হাকডাক করেন, তাতে প্রতারিত হওয়া তোমার উচিৎ নয়। কারণ, সূফী সাধনার কঠিন পথ অতিক্রম করাটা, কঠোর সাধনা, নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা, নফসের কামনা বাসনা দমন এবং কৃচ্ছতার তরবারী দিয়ে কুপ্রবৃত্তিকে হত্যা করা ছাড়া অন্য কোনো পথে সম্ভব নয়, আবোল তাবোল কথাবার্তা দিয়ে তো নয়ই। তুমি মনে রাখবে যে, লাগামহীন মুখ, অলসতা ও নফসের খায়েসে পরিপূর্ণ মন, দুর্ভাগ্য ও নাফরমানীরই লক্ষণ। কৃচ্ছ সাধনার সততা দিয়ে যদি নফসের কামনা বাসনাকে হত্যা করা না হয়, তাহলে অন্তর মারেফাতের আলোতে জীবন্ত হবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00