📄 ইমাম গাযযালীর মতে যেসব বিষয় মকতবে পাঠ্য সূচিতে থাকতে হবে
পড়া-লেখা, কুরআন মজীদ, আখবার (ইতিহাস), বুযুর্গানে দ্বীনের জীবন কথা, সাহাবা ও পূর্ববর্তীগণের জীবন চরিত, যৌন উত্তেজক নয় এমন কবিতা, চরিত্র, আদব-কায়দা, দৈনিক এক ঘন্টা খেলাধুলা। ইমাম গাযযালী আখলাক বা চরিত্রকে উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন। যেমন- বিনয়: অন্য শিশু-কিশোরদের ওপর বড়াই না করা, গালগল্প-আস্ফালন না করা, অন্যের সম্পদের প্রতি লোভ না করা, বড়দের সম্মান করা, গালমন্দ না করা, শপথ না করা, আদবের সাথে বসা ইত্যাদি। শিশু কিশোরদের শিক্ষা-দীক্ষা দানের ক্ষেত্রে তিনি তিনটি স্তরের কথা বলেছেন। শিশুরা যখন সাত বছর বয়সের হবে তখন তার মন জয়ের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন ও নামায পড়ার হুকুম দেবে। এটি প্রথম স্তর।
কিশোরের বয়স যখন ১০ বছর হবে, তখন দ্বিতীয় স্তর শুরু হবে। এ স্তরে কোনো কিশোর যদি অন্যায় করে, তার জন্য শাসন করতে হবে। মিথ্যা বলা, চুরি ও হারাম খাওয়া প্রভৃতিকে তার সামনে ঘৃণ্য হিসেবে তুলে ধরে তিরস্কার করতে হবে।
তৃতীয় স্তর হচ্ছে, বালেগ হওয়ার সময়কাল। এ স্তরে তাকে এ পর্যন্ত যে সব নিয়ম, আদাব কায়দা শিখানো হয়েছে তার রহস্য ও তত্ত্বগুলো সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে।
📄 শিক্ষা পদ্ধতি
শিক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে ইমাম গায্যালী নিম্নের বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন:
১. শিশু-কিশোরদের মন্দ সাথীদের থেকে দূরে রাখতে হবে। কারণ, অধিকাংশ নষ্টামী আসে খারাপ সঙ্গী-সাথীদের সাহচর্য থেকে।
২. তাদেরকে সাদাসিধা জীবনে অভ্যস্ত করতে হবে। পোষাক-আসাক, খাওয়া-দাওয়া, ঘুম ও বিশ্রামের আসবাবপত্র প্রভৃতির ব্যাপারে সহজ সরল জীবনের অভ্যাস করতে হবে।
৩. বারবার বলার মাধ্যমে জরুরী ও উপকারী কথাবার্তাগুলো শিশু কিশোরদের মন ও মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিতে হবে।
৪. উৎসাহদান শিশু-কিশোরদের শিক্ষার অন্যতম উপকরণ হতে হবে। ইমাম গায্যালীর এই শেষোক্ত পদ্ধতিটি আজকের শিক্ষাবিদগণ শিক্ষাদানের সর্বোত্তম পন্থা হিসেবে বিবেচনা করছেন এবং পরীক্ষাগারে অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে তারা তা প্রমাণ করেছেন। এ পর্যায়ে ইমাম গায্যালী পরামর্শগুলো সত্যিই হৃদয়গ্রাহী।
"শিশু যদি কোনো ভাল কাজ করে এবং কোনো সুন্দর চরিত্র তার মধ্যে ফুটে ওঠে (পিতা-মাতা বা শিক্ষক) সে জন্য তার প্রশংসা করবেন। তাকে এমন কিছু দেবেন, যা পেয়ে সে খুশী হবে। লোকদের সামনে তার প্রশংসা করবেন। যদি কোনো দোষ-খাতা করে, দুই একবার না দেখার ভান করে এড়িয়ে যাবেন, যাতে সে কোনো তুচ্ছার্থক কথা কানে শুনতে না পায়; বিশেষতঃ সে নিজেই যদি বিষয়টি লুকিয়ে রাখে। কেননা দোষ-খাতার কথা যদি বেশি বলা হয়, তাহলে সাহস বেড়ে যাবে এবং প্রকাশ্যে করবে। যদি দোষটি বারবার করতে থাকে, তাকে একলা গোপনে ডেকে তিরষ্কার করবে এবং বলবে যে, খবরদার কেউ যাতে তোমার ব্যাপারে এসব না জানে। তাহলে লোকদের সামনে তুমি লজ্জিত হবে এবং তোমাকে নিয়ে তাচ্ছিল্য করা হবে।
৫. শিশু-কিশোররা যা কিছু শিখে, সে অনুযায়ী আমল করে। 'আইয়ুহাল ওয়ালাদ' রেসালায় তিনি বলেন- হে বৎস! নিশ্চিত জেনে রেখো যে, নিছক বুদ্ধিগত বিদ্যা মানুষকে সাহায্য করে না। এর উদাহরণ হলো, যদি উন্মুক্ত প্রান্তরে কারো হাতে দশটি ভারতীয় তরবারী আর অন্য ধরনের অস্ত্র থাকে, নিজেও বীর পাহলোয়ান লড়াকু হয়, তখন কোনো বড় হিংস্র বাঘ যদি তার ওপর হামলা করে আর এসব অস্ত্র সে ব্যবহার না করে, তাহলে কি তাকে বিপদ থেকে বাঁচাতে পারবে? এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, ঐ ব্যক্তি যদি অস্ত্র ব্যবহার না করে এবং হিংস্র জন্তুকে আঘাত না করে তাহলে বিপদ আপনি দূর হয়ে যাবে না। এটা হচ্ছে সেই ব্যক্তির উদাহরণ, যে হাজারো রকমের জ্ঞানগত বিষয় আয়ত্ব করে, অথচ সে অনুযায়ী আমল করে না। সে ঐ জ্ঞানের দ্বারা লাভবান হবে না, যতক্ষণ না ঐ জ্ঞানকে বাস্তবে কাজে লাগায়।
৬. কিশোরদেরকে মেরে শাসন করা সম্পর্কে ইমাম গাযযালী বলেন : "কিশোরদের বয়স যখন দশ বছর হবে তখন যদি অন্যায় কাজ করে, (শিক্ষক) তাকে শাসন করবে।” শিক্ষককে যতদূর সম্ভব ভয় দেখানোর মাধ্যমে শিশু-কিশোরদেরকে শাসন করতে হবে। -(আল আদাব ফিদ্দীন)
যদি তাতে কাজ না হয়, মারা জায়েয হিসেবে গণ্য করেছেন। এ ক্ষেত্রে ইমাম গাযযালী বলেন: যখন মারবে তখন ছাত্রকে বলবে যে, চিৎকার বা হৈচৈ করবে না, কাউকে সুপারিশ করতে ডাকবে না। বলবে যে, ব্যক্তিত্বশালী লোকদের কাজ হলো সহ্য করা। - (রোকন-৩ঃ ধারা-১)।
এ উপদেশ থেকে বুঝা যায়, প্রয়োজনে ছাত্রকে মারার অনুমতি শর্ত সাপেক্ষ। অর্থাৎ ছাত্রের প্রতি প্রাণভরা দরদ থাকতে হবে, মারার একটি সীমা থাকতে হবে, সহনীয় সীমা লংঘন করা যাবে না।
৭. শিশু-কিশোরদের প্রতি দয়া দেখাবে, হাসিখুশি আচরণ করবে, তাদের সাথে খেলাধুলার মাধ্যমে তাদের মনে আনন্দ দেবে। কেননা ইমাম গাযযালীর মতে, গোমড়া মুখো, মুখ ভার ভার থাকা ও খোলামেলা আচরণ থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখা দ্বীনদারী নয়। বিশেষতঃ শিশু-কিশোরদের বেলায়।-(রোকন-২ঃ ধারা-৮)।
📄 পিতাকে তার সন্তানদের কাছে নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে হবে
ইমাম গায্যালী কিমিয়ায়ে সাআদাতের দ্বিতীয় রোকনের নবম ধারায় 'সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ' সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। শরীয়তের দৃষ্টিতে এ কাজকে তিনি ফরয বলে মনে করেন। মানুষকে ভালো কাজের প্রতি আহবান জানানো এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার কাজও বয়স্কদের শিক্ষাদানের মধ্যে শামিল। কোনো একদল যদি এই ধর্মীয় দায়িত্বটি পালন করেন, তাহলে রক্ষা পাওয়া যাবে। কেননা, আল্লাহ্ তা'আলা নিরপরাধ লোকদেরকে সাধারণ লোকদের অন্যায়ের কারণে আযাব দেন না, তবে যখন তারা অন্যায় দেখবে আর নিষেধ করার ক্ষমতা রাখা সত্ত্বেও নীরবতা পালন করবে (তখন সাধারণের পাপের কারণে তাদেরকেও আযাব দেবেন)।
নাসীহাতুল মুলুকের তৃতীয় অধ্যায়ে তিনি দবীরদের শিক্ষা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। দবীর বা সচিবগণ সে যুগে রাজদরবারের যাবতীয় যোগাযোগ, চুক্তিপত্র ও পত্রাদি লেখার দায়িত্ব পালন করতেন। বর্তমানে উচ্চ পর্যায়ের সরকারী কর্মচারী বা সচিবদের দবির হিসেবে গণ্য করা যায়।
ইমাম গাযযালীর মতে সচিবদের যে সব কাজে পারদর্শীতা অর্জন করতে হবে। তাতে রয়েছে- লেখা ও রচনার পদ্ধতি, ভূগোল, অংক, জ্যামিতি, জোতির্বিদ্যা, চিকিৎসা বিজ্ঞান, অলংকার শাস্ত্র এবং ঔষধ সম্পর্কে জ্ঞান, ভূগর্ভস্থ পানি সম্পর্কে তথ্য, কলম তৈরি, কলম চাঁছার নিয়ম (আগেকার দিনে কলম চেঁছে তৈরি করা হতো এবং দো'আতের কালিতে চুবিয়ে লেখা হতো)। তিনি আরো তাগাদা দিয়েছেন যে, বক্তব্য সংক্ষেপে অথচ অর্থপূর্ণ লিখতে হবে। ভারি ভারি শব্দ ব্যবহার পরিহার করতে হবে। বেশি বেশি পড়াশুনা করতে হবে, যাতে অন্যদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যায়। কেননা, মানুষের বয়সসীমা সংকীর্ণ। সবকিছু নিজের অভিজ্ঞতায় শিক্ষা করা সম্ভব নয়।
মুসলিম জাহানের কালজয়ী মহামনীষী ইমাম গায্যালীর অমূল্য উপদেশসমূহ আজকের আধুনিক যুগেও মানব সমাজ ও সভ্যতাকে মুক্তি ও সৌভাগ্যের পথ দেখাতে পারে। বিশেষতঃ বস্তুবাদ ও ভোগবাদী দর্শনে, স্বার্থ ও অশ্লীলতার সয়লাবে দিশেহারা বিপন্ন মানুষের মাঝে হৃদয়ের আলো জ্বালাতে সক্ষম।
📄 গ্রন্থসূত্র
ইমাম গায্যালী (রহ)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী রচনায় যেসব সূত্রের সাহায্য নেয়া হয়েছে:
১. তারিখুল ফালসাফাতিল আরাবিয়া, হানা আল ফাখুরী; খলীল আল জর, অনুবাদ: আবুল মুহাম্মদ আয়াতী, তেহরান ১৯৮৮।
২. আইয়ুহাল ওয়ালাদ, ইমাম মুহাম্মদ গায্যালী, অনুবাদ: বাকের গোবারী, তেহরান ১৯৮৫।
৩. বিজ্ঞান পত্রিকা দানেশমান্দ, ২৫তম বর্ষ, ২৮৯সংখ্যা; অক্টোবর-নভেম্বর ১৯৮৭ সংখ্যা, তেহরান, ইরান।
৪. মাদ্রাসা থেকে পলায়ন (ফেরার আয মাদরেসে) ডক্টর যাররীন কূব, তেহরান: আমীর কবির প্রকাশনী, ১৩৫৩ ফার্সী, ১৯৭৪ ইংরেজী।
৫. মুসলিম মনীষা, আব্দুল মওদুদ, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, তৃতীয় মুদ্রণ ১৯৮০।
৬. তারীখে ফালসাফা দার ইসলাম, (ইসলামী দর্শনের ইতিহাস) এম.এম, শরীফ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা কেন্দ্র, ১৯৮৬, তেহরান, ইরান।
৭. গায্যালী বিশেষ সংখ্যা, মাআরেফ ম্যাগাজিন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা কেন্দ্রের পত্রিকা, তৃতীয় সংখ্যা, ইসফান্দ মাস ১৩৬৩ ফার্সী, ১৯৮৪ ইংরেজী, তেহরান, ইরান।