📘 আইয়ুহাল ওয়ালাদ ! হে বৎস 📄 ফাতেহাতুল উলুম

📄 ফাতেহাতুল উলুম


জীবনের শেষ বছরে তিনি আরবী ভাষায় এটি লিপিবদ্ধ করেন। কিতাবের আটটি অধ্যায়ের মধ্যে রয়েছে, ইলমের ফযিলত, নিয়তের শুদ্ধতা, জ্ঞান অনুসন্ধান, দুনিয়াদার ও পরকাল সন্ধানী আলেমের মাঝে তফাৎ, জ্ঞানের প্রকারভেদ, তর্ক বাহাসের শর্তাবলী, শিক্ষক ও ছাত্রের শিষ্টাচার, আমীর ওমরাদের সম্পদ থেকে জ্ঞানীদের ভোগ ব্যবহারের পরিমাণ।

📘 আইয়ুহাল ওয়ালাদ ! হে বৎস 📄 শিক্ষাপদ্ধতি সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি

📄 শিক্ষাপদ্ধতি সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি


শিক্ষা-দীক্ষা সম্পর্কে ইমাম গায্যালীর (রহ) সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে কিমিয়ায়ে সাআদাতে। বিশেষ করে এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় রোকনে। এছাড়াও উপরে উল্লেখিত কিতাবগুলোর আলোকে তার সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সার সংক্ষেপ এভাবে তুলে ধরা যায়।
ইমাম গায্যালী বলেছেন যে, জ্ঞানার্জন সকল মুসলমানের ওপর ফরয। এ পর্যায়ে তিনি কোন ধরণের জ্ঞান অর্জন করতে হবে, তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। বলেছেনঃ "জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরয।" কেননা, জ্ঞান অর্জন থেকে কোনো মুসলমান বিমুখ থাকতে পারে না। কিন্তু জ্ঞান বলতে সবার জন্য এক রকম জ্ঞানকেই বুঝায় না। বরং তা ব্যক্তি, অবস্থা ও সময়ের ওপর নির্ভর করে। (প্রথম রোকন, ধারা-২)
তিনি মনে করেন যে, শিশুর অন্তর নাফীস (পরিছন্ন) রত্নের মতো এবং তা সহজে নকশা গ্রহণ করে। যে কোনো বড় কাজের জন্য শৈশবেই তার বীজ বপন করতে হবে। (তৃতীয় রোকন, ধারা-১)
শিক্ষা-দীক্ষার কাজটি চাষাবাদের মতোই করতে হবে। শিশুদের খারাপ ও মন্দ ঝোঁক প্রবণতাগুলো ক্ষেতের আগাছার মতো উপড়ে বাইরে ফেলে দিতে হবে। -আইয়ুহাল ওয়ালাদ।
কাজেই শুরু থেকেই শিশুর শিক্ষা-দীক্ষায় গভীর মনোনিবেশ করতে হবে। তাকে আদব-কায়দা শিষ্টাচার শিখাতে হবে। পাথরের ওপর খোদাই করা নকশার মতো তার অন্তরে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের কথাগুলো রেখাপাত করানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
ইমাম গায্যালী অপর যে বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তা হচ্ছে, শিশু-কিশোরদের মধ্যে অনুকরণ প্রিয়তা খুব প্রবল। তাদের চোখ শিক্ষকদের চালচলন আর কান শিক্ষকদের কথাবার্তার প্রতি নিবদ্ধ থাকে। শিক্ষকরা যা ভাল মনে করেন, তারাও তাকে ভাল মনে করে। শিক্ষকরা যা অপছন্দ করেন, তারাও তা-ই অপছন্দ করে- (আল আদাব ফিদ্দীন)। কাজেই শিক্ষকদেরকে নিজেদের আচার-আচরণ ও কথাবার্তা সম্পর্কে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। শিশু কিশোরদের সাথে অনর্থক কথা বলা যাবে না। তাদের সামনে কারো সাথে ঠাট্টা মশকরা করবে না। সম্ভ্রম ও ভাবগাম্ভির্য বজায় রাখতে হবে।
ইমাম গায্যালী দুনিয়ার সমস্ত কাজকে ২৫ ভাগে ভাগ করেছেন। তন্মধ্যে প্রতি পাঁচ ভাগ একটি করে কার্যকারণের ওপর নির্ভরশীল। ৫টি ভাগ হচ্ছে, তকদীর বা নিয়তি, চেষ্টা, সাধনা, অভ্যাস ও উত্তরাধিকার। চেষ্টা ও সাধনার সাথে যুক্ত বিষয়গুলো হচ্ছে- জ্ঞান, চাকরি, অশ্বারোহন (বা সফর-ব্যবসা ইত্যাদি), বেহেশত এবং দোযখ থেকে মুক্তি। উত্তরাধিকার-নির্ভর বিষয়গুলো হচেছ কথাবার্তার সৌন্দর্য্য, আচরণগত সৌন্দর্য্য, উচ্চতর হিম্মত (সাহসিকতা), ক্ষমতা চর্চা ও নীচতা। (নসীহাতুল মুলুক, অনুচ্ছেদ-৬)
ইমাম গায্যালী আরো মনে করেন যে, জ্ঞানের চেয়ে প্রজ্ঞার গুরুত্ব অধিক। প্রজ্ঞা জন্মগত। প্রজ্ঞার উদাহরণ আমীরের ন্যায়, যার সৈনিক হচ্ছে ভালো মন্দের বিচার ক্ষমতা, বিচক্ষণতা, স্মৃতি ও চিন্তাশক্তি। আলেম যদি প্রজ্ঞাবান হন, তিনি ইসলামকে বাস্তবায়ন করেন। (নাসীহাতুল মুলুক, অনুচ্ছেদ-৬)
ইমাম গায্যালী মনে করেন যে, যে মহিলা শিশুকে দুধ খাওয়াবে; তাকে নেককার সুন্দর স্বভাবের এবং হালাল ভোজনকারী হতে হবে। কেননা, মন্দ স্বভাব দুধের মধ্য দিয়ে শিশুর মধ্যে সংক্রমিত হয়। বালেগ হওয়ার পর তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায়। শিশু যদি লাজুক হয়, বুঝতে হবে যে, তার ওপর আকলের (প্রজ্ঞার) নূর পতিত হয়েছে। শিশুর মধ্যে প্রথম যে জিনিষটি দেখা যায় তা হলো, খাওয়ার প্রতি প্রবল ঝোঁক। কাজেই তাকে এর নিয়মাবলী শিখাতে হবে। এ প্রসঙ্গে ইমাম গায্যালী পানাহারের নিয়মাবলীর বিশদ বিবরণ উল্লেখ করেছেন।

📘 আইয়ুহাল ওয়ালাদ ! হে বৎস 📄 ইমাম গাযযালীর মতে যেসব বিষয় মকতবে পাঠ্য সূচিতে থাকতে হবে

📄 ইমাম গাযযালীর মতে যেসব বিষয় মকতবে পাঠ্য সূচিতে থাকতে হবে


পড়া-লেখা, কুরআন মজীদ, আখবার (ইতিহাস), বুযুর্গানে দ্বীনের জীবন কথা, সাহাবা ও পূর্ববর্তীগণের জীবন চরিত, যৌন উত্তেজক নয় এমন কবিতা, চরিত্র, আদব-কায়দা, দৈনিক এক ঘন্টা খেলাধুলা। ইমাম গাযযালী আখলাক বা চরিত্রকে উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন। যেমন- বিনয়: অন্য শিশু-কিশোরদের ওপর বড়াই না করা, গালগল্প-আস্ফালন না করা, অন্যের সম্পদের প্রতি লোভ না করা, বড়দের সম্মান করা, গালমন্দ না করা, শপথ না করা, আদবের সাথে বসা ইত্যাদি। শিশু কিশোরদের শিক্ষা-দীক্ষা দানের ক্ষেত্রে তিনি তিনটি স্তরের কথা বলেছেন। শিশুরা যখন সাত বছর বয়সের হবে তখন তার মন জয়ের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন ও নামায পড়ার হুকুম দেবে। এটি প্রথম স্তর।
কিশোরের বয়স যখন ১০ বছর হবে, তখন দ্বিতীয় স্তর শুরু হবে। এ স্তরে কোনো কিশোর যদি অন্যায় করে, তার জন্য শাসন করতে হবে। মিথ্যা বলা, চুরি ও হারাম খাওয়া প্রভৃতিকে তার সামনে ঘৃণ্য হিসেবে তুলে ধরে তিরস্কার করতে হবে।
তৃতীয় স্তর হচ্ছে, বালেগ হওয়ার সময়কাল। এ স্তরে তাকে এ পর্যন্ত যে সব নিয়ম, আদাব কায়দা শিখানো হয়েছে তার রহস্য ও তত্ত্বগুলো সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে।

📘 আইয়ুহাল ওয়ালাদ ! হে বৎস 📄 শিক্ষা পদ্ধতি

📄 শিক্ষা পদ্ধতি


শিক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে ইমাম গায্যালী নিম্নের বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন:
১. শিশু-কিশোরদের মন্দ সাথীদের থেকে দূরে রাখতে হবে। কারণ, অধিকাংশ নষ্টামী আসে খারাপ সঙ্গী-সাথীদের সাহচর্য থেকে।
২. তাদেরকে সাদাসিধা জীবনে অভ্যস্ত করতে হবে। পোষাক-আসাক, খাওয়া-দাওয়া, ঘুম ও বিশ্রামের আসবাবপত্র প্রভৃতির ব্যাপারে সহজ সরল জীবনের অভ্যাস করতে হবে।
৩. বারবার বলার মাধ্যমে জরুরী ও উপকারী কথাবার্তাগুলো শিশু কিশোরদের মন ও মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিতে হবে।
৪. উৎসাহদান শিশু-কিশোরদের শিক্ষার অন্যতম উপকরণ হতে হবে। ইমাম গায্যালীর এই শেষোক্ত পদ্ধতিটি আজকের শিক্ষাবিদগণ শিক্ষাদানের সর্বোত্তম পন্থা হিসেবে বিবেচনা করছেন এবং পরীক্ষাগারে অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে তারা তা প্রমাণ করেছেন। এ পর্যায়ে ইমাম গায্যালী পরামর্শগুলো সত্যিই হৃদয়গ্রাহী।
"শিশু যদি কোনো ভাল কাজ করে এবং কোনো সুন্দর চরিত্র তার মধ্যে ফুটে ওঠে (পিতা-মাতা বা শিক্ষক) সে জন্য তার প্রশংসা করবেন। তাকে এমন কিছু দেবেন, যা পেয়ে সে খুশী হবে। লোকদের সামনে তার প্রশংসা করবেন। যদি কোনো দোষ-খাতা করে, দুই একবার না দেখার ভান করে এড়িয়ে যাবেন, যাতে সে কোনো তুচ্ছার্থক কথা কানে শুনতে না পায়; বিশেষতঃ সে নিজেই যদি বিষয়টি লুকিয়ে রাখে। কেননা দোষ-খাতার কথা যদি বেশি বলা হয়, তাহলে সাহস বেড়ে যাবে এবং প্রকাশ্যে করবে। যদি দোষটি বারবার করতে থাকে, তাকে একলা গোপনে ডেকে তিরষ্কার করবে এবং বলবে যে, খবরদার কেউ যাতে তোমার ব্যাপারে এসব না জানে। তাহলে লোকদের সামনে তুমি লজ্জিত হবে এবং তোমাকে নিয়ে তাচ্ছিল্য করা হবে।
৫. শিশু-কিশোররা যা কিছু শিখে, সে অনুযায়ী আমল করে। 'আইয়ুহাল ওয়ালাদ' রেসালায় তিনি বলেন- হে বৎস! নিশ্চিত জেনে রেখো যে, নিছক বুদ্ধিগত বিদ্যা মানুষকে সাহায্য করে না। এর উদাহরণ হলো, যদি উন্মুক্ত প্রান্তরে কারো হাতে দশটি ভারতীয় তরবারী আর অন্য ধরনের অস্ত্র থাকে, নিজেও বীর পাহলোয়ান লড়াকু হয়, তখন কোনো বড় হিংস্র বাঘ যদি তার ওপর হামলা করে আর এসব অস্ত্র সে ব্যবহার না করে, তাহলে কি তাকে বিপদ থেকে বাঁচাতে পারবে? এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, ঐ ব্যক্তি যদি অস্ত্র ব্যবহার না করে এবং হিংস্র জন্তুকে আঘাত না করে তাহলে বিপদ আপনি দূর হয়ে যাবে না। এটা হচ্ছে সেই ব্যক্তির উদাহরণ, যে হাজারো রকমের জ্ঞানগত বিষয় আয়ত্ব করে, অথচ সে অনুযায়ী আমল করে না। সে ঐ জ্ঞানের দ্বারা লাভবান হবে না, যতক্ষণ না ঐ জ্ঞানকে বাস্তবে কাজে লাগায়।
৬. কিশোরদেরকে মেরে শাসন করা সম্পর্কে ইমাম গাযযালী বলেন : "কিশোরদের বয়স যখন দশ বছর হবে তখন যদি অন্যায় কাজ করে, (শিক্ষক) তাকে শাসন করবে।” শিক্ষককে যতদূর সম্ভব ভয় দেখানোর মাধ্যমে শিশু-কিশোরদেরকে শাসন করতে হবে। -(আল আদাব ফিদ্দীন)
যদি তাতে কাজ না হয়, মারা জায়েয হিসেবে গণ্য করেছেন। এ ক্ষেত্রে ইমাম গাযযালী বলেন: যখন মারবে তখন ছাত্রকে বলবে যে, চিৎকার বা হৈচৈ করবে না, কাউকে সুপারিশ করতে ডাকবে না। বলবে যে, ব্যক্তিত্বশালী লোকদের কাজ হলো সহ্য করা। - (রোকন-৩ঃ ধারা-১)।
এ উপদেশ থেকে বুঝা যায়, প্রয়োজনে ছাত্রকে মারার অনুমতি শর্ত সাপেক্ষ। অর্থাৎ ছাত্রের প্রতি প্রাণভরা দরদ থাকতে হবে, মারার একটি সীমা থাকতে হবে, সহনীয় সীমা লংঘন করা যাবে না।
৭. শিশু-কিশোরদের প্রতি দয়া দেখাবে, হাসিখুশি আচরণ করবে, তাদের সাথে খেলাধুলার মাধ্যমে তাদের মনে আনন্দ দেবে। কেননা ইমাম গাযযালীর মতে, গোমড়া মুখো, মুখ ভার ভার থাকা ও খোলামেলা আচরণ থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখা দ্বীনদারী নয়। বিশেষতঃ শিশু-কিশোরদের বেলায়।-(রোকন-২ঃ ধারা-৮)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية