📄 আল আদাব ফিদ্দীন
আরবী ভাষার এই রেসালায় ৭৫টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা আছে। প্রাত্যহিক জীবন যাপন ও মানুষের সাথে মেলামেশার নিয়মাবলী এবং আলেম, পেশাজীবী, সরকারী কর্মচারী প্রভৃতি শ্রেণীর লোকদের অনুসরণীয় নীতিমালা বিষয়ক পুস্তক। এসব নির্দেশনার মধ্যে ৫টি বিশেষ করে শিক্ষা-দীক্ষা সম্পর্কিত। যেমন: আলেমের শিষ্টাচার, শিক্ষকের শিষ্টাচার এবং সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার শিষ্টাচার প্রভৃতি।
📄 ফাতেহাতুল উলুম
জীবনের শেষ বছরে তিনি আরবী ভাষায় এটি লিপিবদ্ধ করেন। কিতাবের আটটি অধ্যায়ের মধ্যে রয়েছে, ইলমের ফযিলত, নিয়তের শুদ্ধতা, জ্ঞান অনুসন্ধান, দুনিয়াদার ও পরকাল সন্ধানী আলেমের মাঝে তফাৎ, জ্ঞানের প্রকারভেদ, তর্ক বাহাসের শর্তাবলী, শিক্ষক ও ছাত্রের শিষ্টাচার, আমীর ওমরাদের সম্পদ থেকে জ্ঞানীদের ভোগ ব্যবহারের পরিমাণ।
📄 শিক্ষাপদ্ধতি সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি
শিক্ষা-দীক্ষা সম্পর্কে ইমাম গায্যালীর (রহ) সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে কিমিয়ায়ে সাআদাতে। বিশেষ করে এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় রোকনে। এছাড়াও উপরে উল্লেখিত কিতাবগুলোর আলোকে তার সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সার সংক্ষেপ এভাবে তুলে ধরা যায়।
ইমাম গায্যালী বলেছেন যে, জ্ঞানার্জন সকল মুসলমানের ওপর ফরয। এ পর্যায়ে তিনি কোন ধরণের জ্ঞান অর্জন করতে হবে, তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। বলেছেনঃ "জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরয।" কেননা, জ্ঞান অর্জন থেকে কোনো মুসলমান বিমুখ থাকতে পারে না। কিন্তু জ্ঞান বলতে সবার জন্য এক রকম জ্ঞানকেই বুঝায় না। বরং তা ব্যক্তি, অবস্থা ও সময়ের ওপর নির্ভর করে। (প্রথম রোকন, ধারা-২)
তিনি মনে করেন যে, শিশুর অন্তর নাফীস (পরিছন্ন) রত্নের মতো এবং তা সহজে নকশা গ্রহণ করে। যে কোনো বড় কাজের জন্য শৈশবেই তার বীজ বপন করতে হবে। (তৃতীয় রোকন, ধারা-১)
শিক্ষা-দীক্ষার কাজটি চাষাবাদের মতোই করতে হবে। শিশুদের খারাপ ও মন্দ ঝোঁক প্রবণতাগুলো ক্ষেতের আগাছার মতো উপড়ে বাইরে ফেলে দিতে হবে। -আইয়ুহাল ওয়ালাদ।
কাজেই শুরু থেকেই শিশুর শিক্ষা-দীক্ষায় গভীর মনোনিবেশ করতে হবে। তাকে আদব-কায়দা শিষ্টাচার শিখাতে হবে। পাথরের ওপর খোদাই করা নকশার মতো তার অন্তরে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের কথাগুলো রেখাপাত করানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
ইমাম গায্যালী অপর যে বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তা হচ্ছে, শিশু-কিশোরদের মধ্যে অনুকরণ প্রিয়তা খুব প্রবল। তাদের চোখ শিক্ষকদের চালচলন আর কান শিক্ষকদের কথাবার্তার প্রতি নিবদ্ধ থাকে। শিক্ষকরা যা ভাল মনে করেন, তারাও তাকে ভাল মনে করে। শিক্ষকরা যা অপছন্দ করেন, তারাও তা-ই অপছন্দ করে- (আল আদাব ফিদ্দীন)। কাজেই শিক্ষকদেরকে নিজেদের আচার-আচরণ ও কথাবার্তা সম্পর্কে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। শিশু কিশোরদের সাথে অনর্থক কথা বলা যাবে না। তাদের সামনে কারো সাথে ঠাট্টা মশকরা করবে না। সম্ভ্রম ও ভাবগাম্ভির্য বজায় রাখতে হবে।
ইমাম গায্যালী দুনিয়ার সমস্ত কাজকে ২৫ ভাগে ভাগ করেছেন। তন্মধ্যে প্রতি পাঁচ ভাগ একটি করে কার্যকারণের ওপর নির্ভরশীল। ৫টি ভাগ হচ্ছে, তকদীর বা নিয়তি, চেষ্টা, সাধনা, অভ্যাস ও উত্তরাধিকার। চেষ্টা ও সাধনার সাথে যুক্ত বিষয়গুলো হচ্ছে- জ্ঞান, চাকরি, অশ্বারোহন (বা সফর-ব্যবসা ইত্যাদি), বেহেশত এবং দোযখ থেকে মুক্তি। উত্তরাধিকার-নির্ভর বিষয়গুলো হচেছ কথাবার্তার সৌন্দর্য্য, আচরণগত সৌন্দর্য্য, উচ্চতর হিম্মত (সাহসিকতা), ক্ষমতা চর্চা ও নীচতা। (নসীহাতুল মুলুক, অনুচ্ছেদ-৬)
ইমাম গায্যালী আরো মনে করেন যে, জ্ঞানের চেয়ে প্রজ্ঞার গুরুত্ব অধিক। প্রজ্ঞা জন্মগত। প্রজ্ঞার উদাহরণ আমীরের ন্যায়, যার সৈনিক হচ্ছে ভালো মন্দের বিচার ক্ষমতা, বিচক্ষণতা, স্মৃতি ও চিন্তাশক্তি। আলেম যদি প্রজ্ঞাবান হন, তিনি ইসলামকে বাস্তবায়ন করেন। (নাসীহাতুল মুলুক, অনুচ্ছেদ-৬)
ইমাম গায্যালী মনে করেন যে, যে মহিলা শিশুকে দুধ খাওয়াবে; তাকে নেককার সুন্দর স্বভাবের এবং হালাল ভোজনকারী হতে হবে। কেননা, মন্দ স্বভাব দুধের মধ্য দিয়ে শিশুর মধ্যে সংক্রমিত হয়। বালেগ হওয়ার পর তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায়। শিশু যদি লাজুক হয়, বুঝতে হবে যে, তার ওপর আকলের (প্রজ্ঞার) নূর পতিত হয়েছে। শিশুর মধ্যে প্রথম যে জিনিষটি দেখা যায় তা হলো, খাওয়ার প্রতি প্রবল ঝোঁক। কাজেই তাকে এর নিয়মাবলী শিখাতে হবে। এ প্রসঙ্গে ইমাম গায্যালী পানাহারের নিয়মাবলীর বিশদ বিবরণ উল্লেখ করেছেন।
📄 ইমাম গাযযালীর মতে যেসব বিষয় মকতবে পাঠ্য সূচিতে থাকতে হবে
পড়া-লেখা, কুরআন মজীদ, আখবার (ইতিহাস), বুযুর্গানে দ্বীনের জীবন কথা, সাহাবা ও পূর্ববর্তীগণের জীবন চরিত, যৌন উত্তেজক নয় এমন কবিতা, চরিত্র, আদব-কায়দা, দৈনিক এক ঘন্টা খেলাধুলা। ইমাম গাযযালী আখলাক বা চরিত্রকে উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন। যেমন- বিনয়: অন্য শিশু-কিশোরদের ওপর বড়াই না করা, গালগল্প-আস্ফালন না করা, অন্যের সম্পদের প্রতি লোভ না করা, বড়দের সম্মান করা, গালমন্দ না করা, শপথ না করা, আদবের সাথে বসা ইত্যাদি। শিশু কিশোরদের শিক্ষা-দীক্ষা দানের ক্ষেত্রে তিনি তিনটি স্তরের কথা বলেছেন। শিশুরা যখন সাত বছর বয়সের হবে তখন তার মন জয়ের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন ও নামায পড়ার হুকুম দেবে। এটি প্রথম স্তর।
কিশোরের বয়স যখন ১০ বছর হবে, তখন দ্বিতীয় স্তর শুরু হবে। এ স্তরে কোনো কিশোর যদি অন্যায় করে, তার জন্য শাসন করতে হবে। মিথ্যা বলা, চুরি ও হারাম খাওয়া প্রভৃতিকে তার সামনে ঘৃণ্য হিসেবে তুলে ধরে তিরস্কার করতে হবে।
তৃতীয় স্তর হচ্ছে, বালেগ হওয়ার সময়কাল। এ স্তরে তাকে এ পর্যন্ত যে সব নিয়ম, আদাব কায়দা শিখানো হয়েছে তার রহস্য ও তত্ত্বগুলো সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে।