📄 রচনার সময়কাল অনুসারে তার রচনাবলীর সংক্ষিপ্ত পরিচয়
৪৯৮ ও ৪৮৭ হিজরীর মধ্যবর্তী সময়ে নিযামুল মুল্ক তুসীর সংস্পর্শে এবং বাগদাদের নিযামিয়া মাদরাসায় থাকাকালীন সময়ে লেখা গ্রন্থাবলী:
১. আল-বাসীত (البسيط) ইমাম গাযযালীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ কিতাব। ফিকাহ্ শাস্ত্রের এই কিতাবটি ইমামুল হারামাইনের একটি গ্রন্থের সার সংক্ষেপের মতো।
২. আল-ওয়াসীত (الوسيط) ফিকাহ্ শাস্ত্রের ওপর লেখা।
৩. আল-ওয়াজীয় (الوجيز) শাফী মাযহাবের ফিকাহ্ শাস্ত্রের ওপর ছাত্র সমাজে বিপুলভাবে সমাদৃত। একটি গুরুত্বপূর্ণ কিতাব।
৪. মাকাসেদুল ফালাসিফা (مقاصد الفلاسفه) [দার্শনিকদের উদ্দেশ্যসমূহ] দার্শনিকদের মতবাদসমূহ সংকলন করেছেন এই কিতাবে। দর্শন শাস্ত্রে ইমাম গাযযালীর অসাধারণ পাণ্ডিত্যের প্রমাণ এই গ্রন্থ। রচনাকাল ৪৮৭ হিজরী।
৫. তাহাফাতুল ফালাসিফা (تهافت الفلاسفه) [দার্শনিকদের ভ্রান্তি] মাকাসেদুল ফালাসিফা রচনার অল্প দিনের ব্যবধানে লেখা। এতে তিনি দার্শকিদের তীব্র সমালোচনা এবং তাদের মতবাদসমূহ খন্ডন করেন। ইসলামী জাহানে দর্শন চিন্তায় এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর, ব্যাপক ও যুগান্তকরি।
৬. মুহিক্কুন্ নযর (محك النظر) যুক্তিশাস্ত্র সম্পর্কিত।
৭. মি'য়ারুল ইলম (معيار العلم) যুক্তিশাস্ত্র সম্পর্কিত।
৮. মিযানুল আমল (میزان العمل) যুক্তিশাস্ত্র সম্পর্কিত।
৯. আল-মুস্তাযহার (المستظهر) কালামশাস্ত্র বিষয়ক।
১০. হুজ্জাতুল হক (حجة الحق) কালামশাস্ত্র বিষয়ক। ৫-১০নং কিতাবের রচনাকাল ৪৮৮।
১১. আল-একতেসাদ ফিল এ'তেকাদ (الاقتصاد في الاعتقاد)
১২. কাওয়ায়েদুল আকায়েদ (قواعد العقايد)
১৩. আর-রিসালাতুল কুদসিয়া (الرسالة القدسية) উপরোক্ত তিনটি কিতাব কাلام শাস্ত্র বিষয়ক এবং ৪৮৯ সালে দামেস্কে লেখা।
১৪. এহয়াউ উলূমুদ্দীন (إحياء علوم الدين) [ধর্মীয় জ্ঞানের পুনরুজ্জীবন] তাসাওফ সম্বন্ধীয়। ৪৯০-৪৯৫এর মধ্যবর্তী সময়ে এবং সিরিয়া, বায়তুল মুকাদ্দাস, হেজাজ ও তৃসে অবস্থানকালে রচনা করেন। ইমাম গায্যলীর চিন্তাধারার ব্যাপক প্রতিফলনে লেখা এই গ্রন্থ ফিক্বাহর কিতাব সমূহের মতো ৪ ভাগে বিভক্ত। যেমন: (১) ইবাদাত (২) 'মুআমেলাত' বা মানুষে-মানুষে সম্পর্ক। (৩) 'মুনজিয়াত'- পরিত্রাণের বিষয়াদি সম্পর্কিত এবং (৪) 'মুহলিকাত'- ধ্বংসকারী বিষয়াদি সম্পর্কিত। প্রথম দুই ভাগ মানব জীবনের বাহ্যিক আচার অনুষ্ঠানের সাথে সম্পর্কযুক্ত আর শেষের দুই ভাগ আধ্যাত্মিক ও মানবাত্মা সম্পর্কিত।
১৫. বিদায়াতুল্ হিদায়া (بداية الهداية) নৈতিক চরিত্র সম্বন্ধীয়।
১৬. আল- মুকসেদুল আসনা (المقصد الاسنی) ১৫ ও ১৬নং কিতাব দু'টির রচনাকাল ৪৯৫ সাল। হিজরী ৪৯৫ হতে ৪৯৮ সালের মধ্যে লেখা হয় নিম্নের তিনটি কিতাব:
১৭. জাওয়াহেরুল কুরআন (جواهر القرآن)
১৮. কিতাবুল আরবায়ীন (كتاب الاربعين) নৈতিক চরিত্র সম্বন্ধীয়।
১৯. কিমিয়ায়ে সাআদাত (کیمیای سعادت) তাসাওফ সম্বন্ধীয়। ফার্সী ভাষার এই গ্রন্থটি ফার্সী সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
২০. আদ্ দুররাতুল ফাখেরা (الدرة الفاخرة)
২১. আল-কিসতাসুল মুস্তাকীম (القسطاس المستقيم) উপদেশ ও নসীহত সম্বন্ধীয়।
২২. ফায়সালুত্ তাফরাকা বাইনাল ইসলাম ওয়ায যান্দেক্বা (فيصل التفرقة بين الاسلام والزندقة) কালাম শাস্ত্র বিষয়ক, ৪৯৭ হিজরীতে লেখা।
২৩. আইয়ুহাল ওয়ালাদ, তাসাওফ সম্বন্ধীয়। নিশাপুরে শিক্ষকতার সময়ে লেখা (৫০০ হিজরী)। ৫০০ হিজরীতে নিশাপুরে শিক্ষকতার সময় আরো লিখেছেন-
২৪. আল-মুনকিয মিনাদ্দালাল (المنقذ من الضلال) - আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ। তাতে তাঁর চিন্তাধারায় বিবর্তন ও পরিশেষে আধ্যাত্মিকতার সঠিক পথ লাভের বিবরণ রয়েছে।
২৫. আল-মুস্তাসফা মিন উসুলিল ফিক্বহ্ (المستصفى من اصول الفقه) ফিকাহ শাস্ত্র বিষয়ক। রচনা ৫০৩ সাল।
২৬. মিশকাতুল আনোয়ার (مشكواة الانوار) তাসাওফ সম্বন্ধীয়। শেষবারে তুসে ফিরে আসার পর ৫০৩-৫০৫ সালে লিখেন।
২৭. আল-জামুল আওয়াম মিন ইল্মিল কালাম (الجام العوام من علم الكلام) ইমাম গায্যালী এই কিতাবটি একদম শেষ বয়সে লিখেন। বিষয়: তাসাওফ।
২৮. তোহফাতুল মুলুক (تحفة الملوك) ৪৯২ হিজরীর পর এই কিতাবটি লেখেন। ক্রুসেড যুদ্ধে ইউরোপীয় খ্রিস্টানরা বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালানোর খবর পাওয়ার পর তিনি এ কিতাবটি লেখেন এবং মুসলিম শাসকদেরকে ইউরোপীয় আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্যে উদ্বুদ্ধ করেন।
২৯. নাসীহাতুল মুলূল (نصيحة الملوك) ৫০৩ হিজরীতে রাজা বাদশাহদের উদ্দেশ্যে উপদেশমূলক নৈতিক চরিত্র সম্বন্ধীয় এই কিতাবটি লেখেন। ইমাম গায্যালী আরো কিছু কিতাব আছে, যেগুলোর রচনাকাল জানা নেই, তবে ৪৮৯ সালের পরে লেখা। যেমন:
৩০. আল-আদাব ফিদ্ দ্বীন (الادب في الدين)
৩১. আল-কাওয়ায়েদুল আশারা (القواعد العشرة)
৩২. আর-রিসালাতুল ওয়াযিয়া (الرسالة الوعظية)
৩৩. রিসালাতুত্ তাই (رسالة الطير)
৩৪. আর-রিসালাতুল লাদুনিয়া (الرسالة اللدنية) —আল্লাহ্র সন্নিধান বিষয়ক পুস্তিকা।
৩৫. মিনহাজুল আবেদীন (منهاج العابدين) তাসাওফ বিষয়ক।
৩৬. রওযাতুত্ তালেবীন (روضة الطالبين) তাসাওফ বিষয়ক।
৩৭. আজায়বুল মাখলুকাত ওয়া আসরারুল কায়েনাত (عجایب المخلوقات واسرار الكائنات), কিতাবটি আল হিকমাতু ফী মাখলুকাতিল্লাহ্ নামে প্রসিদ্ধ।
📄 ইমাম গাযযালীর শিক্ষা-দীক্ষা বিষয়ক রচনাবলী
আইয়ুহাল ওয়ালাদ পুস্তিকাটি ছোট্ট হলেও আল্লাহর সান্নিধ্য ও আখেরাতের সন্ধানীদের জন্যে মহামূল্যবান রত্নভাণ্ডার। আখেরাতের মুক্তি ও সৌভাগ্যের সম্বল হবে না, এমন জ্ঞান চর্চা এড়িয়ে চলার উপদেশ দেয়া হয়েছে এই পুস্তিকায়। বিভিন্ন ধরনের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ একজন ছাত্রকে দেয়া রত্নতুল্য উপদেশমালার সাথে পরিচিত হবার আগে এখানে সামগ্রিক শিক্ষানীতি সম্পর্কে ইমাম গায্যালীর (রহ) দৃষ্টিভঙ্গির ওপর সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা প্রাসঙ্গিক হবে। ইমাম গায্যালীর শিক্ষাদীক্ষা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ফার্সী ভাষায় লিখিত দুটি গ্রন্থ 'কিমিয়ায়ে সাআদাত' ও 'নাসীহাতুল মুলুক' এবং আরবী ভাষায় লিখিত তিনটি পুস্তকে বর্ণনা করেছেন।
📄 কিমিয়ায়ে সাআদাত
ইহয়াউ উলূমুদ্দীন রচনার পর ইমাম গায্যালী কিমিয়ায়ে সাআদাত লিখেন। ফার্সী ভাষায় ছোট ছোট বাক্যে সহজ, সাবলীল ভঙ্গিতে রচিত কিতাবটি চারটি পর্ব ও চারটি রোকনে বিন্যস্ত।
প্রথম পর্ব- আত্মপরিচয় লাভ বা নিজেকে চেনা।
দ্বিতীয় পর্ব- আল্লাহর পরিচয় লাভ বা আল্লাহকে চেনা।
তৃতীয় পর্ব- দুনিয়ার হাকীকত সম্পর্কে জ্ঞান লাভ।
চতুর্থ পর্ব- আখেরাতের হাকীকত সম্পর্কে জ্ঞান লাভ।
চারটি পর্বের পর রয়েছে চারটি রোকন বা অধ্যায়। প্রত্যেকটি রোকন দশটি আসল বা ধারায় বিভক্ত।
প্রথম রোকন- আল্লাহর আদেশ পালন বা ইবাদত।
দ্বিতীয় রোকন আচার-আচরণ ও জীবন যাপনের ক্ষেত্রে আদব রক্ষা করা বা মুআমেলাত।
এ দু'টি রোকন বাহ্যিক আচরণের সাথে সম্পর্কিত।
আভ্যন্তরীণ অবস্থার সাথে সম্পর্কিত দুটি হচ্ছে:
তৃতীয় রোকন - অপছন্দনীয় স্বভাব-চরিত্র থেকে অন্তরকে পবিত্র করা। যেমন: ক্রোধ, কৃপণতা, হিংসা, অহংকার ও নিজেকে উত্তম মনে করা।
চতুর্থ রোকন- সুন্দর ও পছন্দনীয় চরিত্রে অন্তরকে সজ্জিত করা প্রসঙ্গে। যেমন: সবর, শোকর, ভালবাসা, আল্লাহর প্রতি আশা পোষণ ও ভরসা।
শিক্ষা-দীক্ষা প্রসঙ্গে ইমাম গাযযালীর দৃষ্টিভঙ্গি প্রধানতঃ দ্বিতীয় ও তৃতীয় রোকনে উল্লেখিত হয়েছে। কাজেই এর ধারাগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করা এখানে সমীচীন হবে।
দ্বিতীয় রোকনের ১০টি উসূল বা ধারা হচ্ছে, নিম্নোক্ত ১০টি বিষয়ের নিয়মাবলী: (১) আহার করা (২) বিয়ে-শাদী (৩) উপার্জন ও ব্যবসা (৪) হালাল রিজিক তালাশ করা (৫) মানুষের সাথে মেলামেশা (৬) নির্জনতা (৭) সফর (৮) সামা (ধর্মীয় গান) ও মত্ততা (৯) সৎকাজের আদেশ দান ও অসৎ কাজে নিষেধ করা এবং (১০) শাসনকার্য পরিচালনা।
তৃতীয় রোকনের ১০টি উসূলের শিরোনাম: (১) নফসের শুদ্ধি ও কৃচ্ছতা (২) ক্ষুধা ও লজ্জাস্থানের শাহওয়াত (৩) কথা বলার বিপদাপদ (৪) ক্রোধ, হিংসা-বিদ্বেষ (৫) দুনিয়ার ভালবাসা (৬) সম্পদের লোভ ও কৃপণতা (৭) ক্ষমতার লোভ (৮) ইবাদতে রিয়ার চিকিৎসা (৯) অহংকার ও আত্মপ্রশংসার চিকিৎসা এবং (১০) গাফলতি, গোমরাহী ও আত্মম্ভরিতার বিপদাপদ।
📄 নসীহাতুল মুলূক
কিতাবটির রচনাকাল ৪৯৮ হিজরীর পরে। একটি ভূমিকা, পাঁচটি অধ্যায় ও একটি উপসংহার সম্বলিত কিতাবটির শিক্ষা সম্পর্কিত বিষয়গুলোতে রয়েছে: তৃতীয় অধ্যায়ঃ দবীরদের (সচিব) জীবনচরিত, পঞ্চম অধ্যায়ঃ জ্ঞানী মনীষীদের তত্ত্বকথা ও ষষ্ঠ অধ্যায়ঃ জ্ঞানী লোকদের গুণাবলী ।