📘 আইয়ুহাল ওয়ালাদ ! হে বৎস > 📄 খাজা নিযামুল মুলকের দফতরে গাযযালী

📄 খাজা নিযামুল মুলকের দফতরে গাযযালী


বিতর্ক সভায় ছাত্রদের আনাগোনার সূত্র ধরে গায্যালীও সেনা ছাউনীতে যাতায়াত শুরু করেন। নিয়ম ছিল বিতর্কে কেউ জিতলে চারদিকে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ত, মুখে মুখে চর্চিত হতো তার নাম ধام। স্বাভাবিকভাবেই এই বিতর্ক সভার মাধ্যমে গায্যালীও পরিচিত হয়ে ওঠলেন। খাজা নিজামুল মুল্কের বয়স তখন ৭০ বছর। আলেমদের প্রতি তার ভক্তি ও ভালবাসা ছিল অতুলনীয়। সফরে যেতে তিনি আলেমদেরও সঙ্গী করে নিতেন। দেখতে দেখতে গায্যালীও নিজামুল মুল্কের কাফেলার আলেমদের মধ্যে শামিল হলেন। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী ও কাফেলার সাথী হয়ে নিশাপুর, ইস্পাহান ও বাগদাদে বেশ কয়েক বার সফর করেন।

📘 আইয়ুহাল ওয়ালাদ ! হে বৎস > 📄 খাজা নিযামুল মুলকের পরিচয়

📄 খাজা নিযামুল মুলকের পরিচয়


খাজা নিযামুল মুল্ক ছিলেন তৎকালীন সালজুক বংশীয় তুর্কীরাজ মালেক শাহের প্রধানমন্ত্রী। বাগদাদে তখন সালজুক বংশীয় তুর্কী রাজাদের আধিপত্য ছিল আর ইরান তথা নিশাপুর ছিল বাগদাদের শাসনাধীন। খাজা নিযামুল মুল্ক অসাধারণ জ্ঞানী ও বিদ্যানুরাগী ব্যক্তি ছিলেন। তার প্রকৃত নাম ছিল হাসান ইবনে আলী। তার নাম অনুসারেই বাগদাদে বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্র নিযামিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ঐ মাদ্রাসার পাঠ্য তালিকা পরবর্তিতে 'দরসে নিজামী' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। তুর্কী সুলতানের সেনা ছাউনীর বিতর্ক সভায় অংশ গ্রহণ এবং খাজা নিযামুল মুল্কের সফরসঙ্গী হবার সূত্র ধরে ক্রমান্বয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে ইমাম গাযযালীর দায়িত্ব বৃদ্ধি পায়। অবশেষে তার অসাধারণ প্রতিভা, জ্ঞান-গরীমা ও যোগ্যতা দেখে খাজা সাহেব তাকে বাগদাদের 'নিযামিয়া মাদরাসা'র অধ্যক্ষের পদে নিযুক্ত করেন।

📘 আইয়ুহাল ওয়ালাদ ! হে বৎস > 📄 বাগদাদে নিযামিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে

📄 বাগদাদে নিযামিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে


তৎকালীন ইসলামী জাহানের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্র বাগদাদের নিযামিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত হয়ে ইমাম গায্যালী ৪৮৩/১০৯০ সালে মহা শান-শওকতে বাগদাদে প্রবেশ করেন। তখন তার বয়স ছিল ৩৪ বছর। যৌবন আর জ্ঞানের জোয়ারে তার চালচলন ও শৌর্যবীর্য ছিল মন্ত্রীদের মতো। পরনের পোষাক পরিচ্ছদ ছিল অতিশয় দামী নজর কাড়া।
অসাধারণ বাকশক্তি ও ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ খুব শীঘ্রই গায্যালীকে বাগদাদে প্রসিদ্ধ ও সর্বজনপ্রিয় করে তোলে। নিযামিয়া মাদ্রাসায় তার অধ্যাপনা ও পরিচালনা সবার প্রশংসা অর্জন করে। অল্পদিন যেতে না যেতেই চারশ'র অধিক ছাত্র তার দরসে হাযির হতে শুরু করে। এমনকি বিভিন্ন মাযহাবের নেতৃস্থানীয় লোকেরাও তার দরসের আসরে বসতেন। তার জ্ঞানের বিশালতা ও অনুপম বর্ণনাশৈলী দেখে সবাই অবাক হতেন।

📘 আইয়ুহাল ওয়ালাদ ! হে বৎস > 📄 রাজ দরবারে ইমাম গাযযালীর সম্মান

📄 রাজ দরবারে ইমাম গাযযালীর সম্মান


বাগদাদের রাজ প্রাসাদসমূহে এ সময় এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা ইমাম গায্যালীকে চিন্তার সাগরে নিক্ষেপ করে। ৪৮৫ হিজরীতে প্রধানমন্ত্রী খাজা নিজামুল মুল্ক নিহত হন। গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, মালেক শাহের ইঙ্গিতে খাজা সাহেব নিহত হয়েছেন। ৪০ দিন পর মালেক শাহ্ মারা যান। বলা হয় যে, এ ঘটনায় খলিফা মুক্তাদিরের হাত ছিল এবং তাকে বিষ পানে হত্যা করা হয়েছে।
মালেক শাহ ও খাজা নিযামুল মুল্কের প্রাণ বিয়োগের পর মালেক শাহের স্ত্রী 'তুর্কান খাতুন' রাষ্ট্রের সর্বেসর্বা হয়ে বসে। আগে থেকে মহিলার সাধ ছিল, তার ছোট ছেলে 'মাহমুদ'কে মালেক শাহের যুবরাজ হিসেবে ঘোষণা করবে। কিন্তু নিজামুল মুল্ক এর বিরোধী ছিলেন। কাজেই প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার চক্রান্ত্রে মহিলা সহযোগিতা করে। মহিলার আরো আরজু ছিল, আব্বাসীয় খলীফা আল মুক্তাদির যেন পুত্র জাফরকে খলীফা পদে আসীন করেন- যাতে মাহমুদ ও জাফরের মাধ্যমে রাজত্ব ও খেলাফত এই দু'টিকে দুই হাতে নিয়ে খেলতে পারে। এই ঘটনা প্রবাহে ইমাম গাযযালী নিকট থেকে দেখতে পান যে, খেলাফত ও রাজত্বের ভাগ্য কখনো এর, কখনো ওর হাতে খেলনায় পরিণত হয়েছে এবং মানুষের শান-শওকত, প্রভাব-প্রতিপত্তি, সুনাম- সুখ্যাতি অতি তুচ্ছ ও অর্থহীন।
জ্ঞানী মনীষীদের অবস্থা দেখেও তার মনে সন্দেহ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। তার দারসে যেসব জ্ঞানী মনীষী হাজির হতেন, তাদের অনেকেই পার্থিব শান-শওকত, প্রতিপত্তি লাভের জন্য জ্ঞান চর্চা করতেন। আল্লাহকে পাওয়া বা। সত্য অনুসন্ধানের প্রতি খুব কম লোকেরই আগ্রহ ছিল। ধন ও পদের কুমন্ত্রণা এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার ইমাম গাযযালীকেও ধোকা দিয়েছে। জ্ঞানী মনীষীদের সাধারণ অবস্থা ছিল, তারা খুবই জনপ্রিয় ও নন্দিত ছিলেন। কিন্তু তাদের জীবন ছিল লোক দেখানো আচার আচরণে পরিপূর্ণ।
এসব দুনিয়া পূজারী আলেমের সাহচর্য ইমাম গাযযালীকে ব্যথিত করতো। তখনকার দিনে বিভিন্ন মাযহাব ও মতের আলেমদের মধ্যে তুমুল বিতর্ক অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করাই ছিল প্রত্যেকের লক্ষ্য। আল্লাহকে রাজি করা বা সত্য উদঘাটন করা থেকে তারা ছিল অনেক দূরে। তিনি চিন্তা করতে লাগলেন, বাহাস বা বিতর্কের মাধ্যমে কি আল্লাহকে রাজি করানো যাবে? বিতর্কের জন্যে কি মানুষের সারা জীবন উজাড় করে দেয়া সাজে? এই বিতর্কের জন্যে তো রাত-দিন চিন্তা ভাবনায় ব্যস্ত থাকতে হয়। এভাবেই রাজকীয় শান-শওকত আর জ্ঞান-মনীষার অহংকারের প্রতি তার বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হয়। পরিণামে আধ্যাত্মিক সাধনা ও কৃচ্ছতার জীবনের দিকে মন আকৃষ্ট হতে থাকে এবং ক্রমান্বয়ে অধ্যাপনার কাজে শিথিলতা দেখা দেয়। নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব, অধ্যবসায় ও চিন্তাভাবনার দিকে মন দিনের পর দিন অধিকতর ঝুঁকে পড়ে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00