📄 নিশাপুরে শোকের ছায়া
গায্যালীর বয়স ৩০ বছর পূর্ণ না হতেই ইমামুল হারামাইন ইহলোক ত্যাগ করলেন ৪৭৮হিঃ/১০৮৫ খ্রীঃ সালে। তার ইন্তিকালে নিশাপুরে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে এলো। এবার নিশাপুরের পরিবেশ যেন গায্যালীর জন্যে অপর্যাপ্ত হয়ে উঠল। ইমামের ইন্তেকালের পর অন্যান্য ওস্তাদদের যোগ্যতা এতদূর ছিলনা যে, গায্যালী তাদের দরসে হাজির হয়ে উপকৃত হতে পারবেন। তাছাড়া ওস্তাদের খালি স্থান পূরণ করার জন্যে গায্যালী ছিলেন যোগ্যতম উত্তরসূরী। নিশাপুরের বাইরে ছিল তুর্কীরাজ মালেক শাহের সেনা ছাউনী। সেনা ছাউনীতে প্রধানমন্ত্রী খাজা নিজামুল মুল্কের দপ্তর ছিল সবার আকর্ষণ। খাজা নিজামুল মুল্কের উদ্যোগেই সেনা ছাউনীতে বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক সভার আয়োজন হতো। বিতর্ক সভা কেবল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যালোচনার মাধ্যমেই ছিল না; বরং তা যে কোনো জ্ঞানী মনীষীর পান্ডিত্য যাঁচাইয়ের কষ্টিপাথর ছিল। সবার মতো নিশাপুরের বিজ্ঞ আলেমরাও সেই বিতর্ক সভায় অংশ নিতেন।
📄 খাজা নিযামুল মুলকের দফতরে গাযযালী
বিতর্ক সভায় ছাত্রদের আনাগোনার সূত্র ধরে গায্যালীও সেনা ছাউনীতে যাতায়াত শুরু করেন। নিয়ম ছিল বিতর্কে কেউ জিতলে চারদিকে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ত, মুখে মুখে চর্চিত হতো তার নাম ধام। স্বাভাবিকভাবেই এই বিতর্ক সভার মাধ্যমে গায্যালীও পরিচিত হয়ে ওঠলেন। খাজা নিজামুল মুল্কের বয়স তখন ৭০ বছর। আলেমদের প্রতি তার ভক্তি ও ভালবাসা ছিল অতুলনীয়। সফরে যেতে তিনি আলেমদেরও সঙ্গী করে নিতেন। দেখতে দেখতে গায্যালীও নিজামুল মুল্কের কাফেলার আলেমদের মধ্যে শামিল হলেন। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী ও কাফেলার সাথী হয়ে নিশাপুর, ইস্পাহান ও বাগদাদে বেশ কয়েক বার সফর করেন।
📄 খাজা নিযামুল মুলকের পরিচয়
খাজা নিযামুল মুল্ক ছিলেন তৎকালীন সালজুক বংশীয় তুর্কীরাজ মালেক শাহের প্রধানমন্ত্রী। বাগদাদে তখন সালজুক বংশীয় তুর্কী রাজাদের আধিপত্য ছিল আর ইরান তথা নিশাপুর ছিল বাগদাদের শাসনাধীন। খাজা নিযামুল মুল্ক অসাধারণ জ্ঞানী ও বিদ্যানুরাগী ব্যক্তি ছিলেন। তার প্রকৃত নাম ছিল হাসান ইবনে আলী। তার নাম অনুসারেই বাগদাদে বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্র নিযামিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ঐ মাদ্রাসার পাঠ্য তালিকা পরবর্তিতে 'দরসে নিজামী' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। তুর্কী সুলতানের সেনা ছাউনীর বিতর্ক সভায় অংশ গ্রহণ এবং খাজা নিযামুল মুল্কের সফরসঙ্গী হবার সূত্র ধরে ক্রমান্বয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে ইমাম গাযযালীর দায়িত্ব বৃদ্ধি পায়। অবশেষে তার অসাধারণ প্রতিভা, জ্ঞান-গরীমা ও যোগ্যতা দেখে খাজা সাহেব তাকে বাগদাদের 'নিযামিয়া মাদরাসা'র অধ্যক্ষের পদে নিযুক্ত করেন।
📄 বাগদাদে নিযামিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে
তৎকালীন ইসলামী জাহানের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্র বাগদাদের নিযামিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত হয়ে ইমাম গায্যালী ৪৮৩/১০৯০ সালে মহা শান-শওকতে বাগদাদে প্রবেশ করেন। তখন তার বয়স ছিল ৩৪ বছর। যৌবন আর জ্ঞানের জোয়ারে তার চালচলন ও শৌর্যবীর্য ছিল মন্ত্রীদের মতো। পরনের পোষাক পরিচ্ছদ ছিল অতিশয় দামী নজর কাড়া।
অসাধারণ বাকশক্তি ও ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ খুব শীঘ্রই গায্যালীকে বাগদাদে প্রসিদ্ধ ও সর্বজনপ্রিয় করে তোলে। নিযামিয়া মাদ্রাসায় তার অধ্যাপনা ও পরিচালনা সবার প্রশংসা অর্জন করে। অল্পদিন যেতে না যেতেই চারশ'র অধিক ছাত্র তার দরসে হাযির হতে শুরু করে। এমনকি বিভিন্ন মাযহাবের নেতৃস্থানীয় লোকেরাও তার দরসের আসরে বসতেন। তার জ্ঞানের বিশালতা ও অনুপম বর্ণনাশৈলী দেখে সবাই অবাক হতেন।