📄 ইমামুল হারামাইনের আকর্ষণে আবার ছাত্র হলেন
কিন্তু অদূরে নিশাপুরের নিযামিয়া মাদ্রাসার খ্যাতি এবং ইমামুল হারামাইনের শিক্ষকতার সুনাম গাযযালীকে স্থায়ীভাবে তৃসে অবস্থান করতে দিল না। ইমামুল হারামাইনের আসল নাম ছিল আবুল মা'আলী যিয়াউদ্দীন আব্দুল মালিক জুঈনী (৪২০-৪৭৮ হিজরী)। তিনি ছিলেন সে যুগের বিশ্ববিখ্যাত মনীষী। তৎকালীন শাসক তুগরল বেগের চাপের সম্মুখীন হলে তিনি মক্কা ও মদীনায় হিজরত করেন। এ কারণে তাকে ইমামুল হারামাইন উপাধিতে ভূষিত করা হয়। পরবর্তীকালে নিশাপুরে ফিরে আসার পর প্রধানমন্ত্রী খাজা নিজামুল মুল্ক তার জন্যে নিশাপুরে নিজামিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে তিনি ঐ মাদ্রাসায় শিক্ষকতায় নিয়োজিত থাকেন। এ সময় ছাত্রদের লেখাপড়া, যিকির ও বিতর্কের মজলিস এবং মসজিদ ও জুমা পরিচালনার যাবতীয় দায়িত্ব ছিল ইমামুল হারামাইনের ওপর। ইমামুল হারামাইনের এই খ্যাতি ও আকর্ষণ গায্যালীকে তৃসে থাকতে দিল না। তিনি কিছু সংখ্যক ছাত্র সাথে নিয়ে ৪৭০ হিজরী সালে চলে আসলেন নিশাপুরে। জীবনের সাধ ছিল ফিকাহ শাস্ত্রে বিশারদ হবেন। তখনকার নিশাপুরই ছিল এর উত্তম স্থান। জ্ঞান চর্চা ও মারেফাতের কেন্দ্র ছিল নিশাপুর। অসংখ্য মাদ্রাসা, মসজিদ, খানকাহ্ ও জ্ঞানী মনীষীর সমাবেশ ছিল সেখানে। তন্মধ্যে খাজা নিজামুল মুল্কের প্রতিষ্ঠিত নিযামিয়া মাদ্রাসা সগৌরবে বিদ্যমান ছিল। ইমামুল হারামাইন ছিলেন সে মাদ্রাসার প্রধান এবং গোটা নিশাপুরের মধ্যমণি। তার ক্লাসে যে সব কৃতি ছাত্র ওস্তাদদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন তারা নির্ধারিত ক্লাস ছাড়াও রাত-দিন যে কোনো সুযোগে ওস্তাদদের খেদমতে হাজির হতেন। যে কোনো মাসআলা বা বিষয় নিয়ে ছাত্র শিক্ষকের মধ্যে প্রাণখোলা আলোচনা হতো। সত্যের সন্ধানী মুহাম্মদ গায্যালীর জন্যে এ ওস্তাদের সংসর্গই ছিল সবচে' আকর্ষণীয়। ওস্তাদের জ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা ও ব্যক্তিত্বের আকর্ষণই ছাত্রদেরকে জ্ঞান সাধনায় উদ্বুদ্ধ করতো। গায্যালী অল্পদিনের মধ্যে ইমামুল হারামাইনের ৪০০ ছাত্রের মধ্যে অগ্রগণ্য হয়ে ওঠেন এবং অচিরেই ইমামের বিশিষ্ট ছাত্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। কখনো কখনো ইমামের সহকারী হিসেবে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে দরস দিতে লাগলেন। বিতর্ক সভায় ছাত্রদের ওপর জয় লাভ তার জন্য এক প্রকার অবধারিত ছিল। ইমামুল হারামাইনের নিয়ম ছিল, ছাত্রদেরকে তিনি বিতর্ক সভায় পূর্ণ স্বাধীনতা দিতেন। এতে ছাত্রদের সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশ ঘটতো। ছাত্রদের যোগ্যতা ও প্রতিভার লালনাগার ছিল এই বিতর্ক সভা।
📄 নিশাপুরে শোকের ছায়া
গায্যালীর বয়স ৩০ বছর পূর্ণ না হতেই ইমামুল হারামাইন ইহলোক ত্যাগ করলেন ৪৭৮হিঃ/১০৮৫ খ্রীঃ সালে। তার ইন্তিকালে নিশাপুরে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে এলো। এবার নিশাপুরের পরিবেশ যেন গায্যালীর জন্যে অপর্যাপ্ত হয়ে উঠল। ইমামের ইন্তেকালের পর অন্যান্য ওস্তাদদের যোগ্যতা এতদূর ছিলনা যে, গায্যালী তাদের দরসে হাজির হয়ে উপকৃত হতে পারবেন। তাছাড়া ওস্তাদের খালি স্থান পূরণ করার জন্যে গায্যালী ছিলেন যোগ্যতম উত্তরসূরী। নিশাপুরের বাইরে ছিল তুর্কীরাজ মালেক শাহের সেনা ছাউনী। সেনা ছাউনীতে প্রধানমন্ত্রী খাজা নিজামুল মুল্কের দপ্তর ছিল সবার আকর্ষণ। খাজা নিজামুল মুল্কের উদ্যোগেই সেনা ছাউনীতে বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক সভার আয়োজন হতো। বিতর্ক সভা কেবল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যালোচনার মাধ্যমেই ছিল না; বরং তা যে কোনো জ্ঞানী মনীষীর পান্ডিত্য যাঁচাইয়ের কষ্টিপাথর ছিল। সবার মতো নিশাপুরের বিজ্ঞ আলেমরাও সেই বিতর্ক সভায় অংশ নিতেন।
📄 খাজা নিযামুল মুলকের দফতরে গাযযালী
বিতর্ক সভায় ছাত্রদের আনাগোনার সূত্র ধরে গায্যালীও সেনা ছাউনীতে যাতায়াত শুরু করেন। নিয়ম ছিল বিতর্কে কেউ জিতলে চারদিকে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ত, মুখে মুখে চর্চিত হতো তার নাম ধام। স্বাভাবিকভাবেই এই বিতর্ক সভার মাধ্যমে গায্যালীও পরিচিত হয়ে ওঠলেন। খাজা নিজামুল মুল্কের বয়স তখন ৭০ বছর। আলেমদের প্রতি তার ভক্তি ও ভালবাসা ছিল অতুলনীয়। সফরে যেতে তিনি আলেমদেরও সঙ্গী করে নিতেন। দেখতে দেখতে গায্যালীও নিজামুল মুল্কের কাফেলার আলেমদের মধ্যে শামিল হলেন। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী ও কাফেলার সাথী হয়ে নিশাপুর, ইস্পাহান ও বাগদাদে বেশ কয়েক বার সফর করেন।
📄 খাজা নিযামুল মুলকের পরিচয়
খাজা নিযামুল মুল্ক ছিলেন তৎকালীন সালজুক বংশীয় তুর্কীরাজ মালেক শাহের প্রধানমন্ত্রী। বাগদাদে তখন সালজুক বংশীয় তুর্কী রাজাদের আধিপত্য ছিল আর ইরান তথা নিশাপুর ছিল বাগদাদের শাসনাধীন। খাজা নিযামুল মুল্ক অসাধারণ জ্ঞানী ও বিদ্যানুরাগী ব্যক্তি ছিলেন। তার প্রকৃত নাম ছিল হাসান ইবনে আলী। তার নাম অনুসারেই বাগদাদে বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্র নিযামিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ঐ মাদ্রাসার পাঠ্য তালিকা পরবর্তিতে 'দরসে নিজামী' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। তুর্কী সুলতানের সেনা ছাউনীর বিতর্ক সভায় অংশ গ্রহণ এবং খাজা নিযামুল মুল্কের সফরসঙ্গী হবার সূত্র ধরে ক্রমান্বয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে ইমাম গাযযালীর দায়িত্ব বৃদ্ধি পায়। অবশেষে তার অসাধারণ প্রতিভা, জ্ঞান-গরীমা ও যোগ্যতা দেখে খাজা সাহেব তাকে বাগদাদের 'নিযামিয়া মাদরাসা'র অধ্যক্ষের পদে নিযুক্ত করেন।