📄 ডাকাতের হাতে অমূল্য শিক্ষা
জুর্জানে শিক্ষা সমাপনের পর গায্যালী যখন মাতৃভূমি 'তুসে' ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন পাঠ্য জীবনের অমূল্য সঞ্চয় নোটখাতাগুলোও সঙ্গে নিলেন। তিনি খোরাসানগামী একটি কাফেলার সাথী হয়ে তৃসের উদ্দেশে রওনা হলেন। আসার পথে এমন এক ঘটনা ঘটল, যা আজীবন তিনি ভুলতে পারেন নি। পথিমধ্যে ডাকাত দল কাফেলার ওপর হামলা করে মুসাফিরদের সব মালামাল লুট করে নিল। গায্যালীর নোটখাতাগুলোও ছিনিয়ে নিল। গায্যালী তার মালপত্রের কথা ভুলে গেলেও নোটগুলোর কথা কিছুতেই ভুলতে পারলেন না। তাই ডাকাতদের অনুসরণ করে চললেন। ডাকাতদের সর্দার তাকে ধমক দিয়ে বললঃ "ভাগো, ফিরে যাও, নতুবা প্রাণ হারাবে।” তিনি কিন্তু নাছোড়-বান্দা। শত অনুনয়-বিনয় করে ডাকাত সর্দারকে বললেন: “অন্তত আমার নোটখাতাগুলো ফেরৎ দিন। আমার দীর্ঘ কয়েক বছরের জ্ঞান-সাধনার সঞ্চয় এগুলো”। ডাকাত সর্দার ঠাট্টার ছলে হেসে বললোঃ" তুমি এমন কিসের জ্ঞান অর্জন করলে যে, ডাকাতরা তোমার থেকে তা কেড়ে নিতে পারলো।” এই বলে সর্দার খাতাগুলো তরুণ শিক্ষার্থীকে ফেরৎ দিল। নোটখাতাগুলো ফেরৎ পেলেও ডাকাত সর্দারের জবাব শুনে গায্যালী ভাবনায় তলিয়ে গেলেন। মনে মনে বলতে লাগলেন- 'সত্যিই তো, বিদ্যা যদি কেবল খাতায় আর কিতাবেই থাকে, যদি ছাত্রের স্মরণ না থাকে, তাহলে সেই বিদ্যার কি দাম?' এই ভাবনার তন্ময়তায় তার মনে আরেকটি ভাবনার উদয় হলো। বললেন: 'হয়ত আমার ভাগ্যলিপিই ডাকাতদেরকে আমার যাত্রা পথে প্রেরণ করেছে, যাতে জ্ঞান আহরণের সঠিক পথ দেখাতে পারে।' সত্যিই ডাকাত দলের সর্দার মুহাম্মদ গায্যালীকে এমন এক মূল্যবান শিক্ষা দিয়েছিল, যার সুফল জুর্জানে সঞ্চিত জ্ঞানের চাইতে কোন অংশে কম ছিল না।
📄 কর্মজীবনে ইমাম গাযযালী
'তৃসে' এসে তিনি ইল্মের সেবায় নিয়োজিত হলেন। তার প্রধান কাজ ছিল, নিজে জ্ঞান চর্চা করা আর ছাত্রদেরও জ্ঞান শিক্ষা দেয়া। এছাড়া দ্বীনী মাদ্রাসাগুলোর হাদীস, ফিকাহ ও দর্শন শাস্ত্র এবং বিভিন্ন মাযহাবের আলোচনায় তিনি অংশ নিতেন। এভাবে ক্রমান্বয়ে তাকে কেন্দ্র করে তৃসে শিক্ষাদীক্ষা ও জ্ঞান চর্চার একটি পরিবেশ গড়ে উঠল।
📄 ইমামুল হারামাইনের আকর্ষণে আবার ছাত্র হলেন
কিন্তু অদূরে নিশাপুরের নিযামিয়া মাদ্রাসার খ্যাতি এবং ইমামুল হারামাইনের শিক্ষকতার সুনাম গাযযালীকে স্থায়ীভাবে তৃসে অবস্থান করতে দিল না। ইমামুল হারামাইনের আসল নাম ছিল আবুল মা'আলী যিয়াউদ্দীন আব্দুল মালিক জুঈনী (৪২০-৪৭৮ হিজরী)। তিনি ছিলেন সে যুগের বিশ্ববিখ্যাত মনীষী। তৎকালীন শাসক তুগরল বেগের চাপের সম্মুখীন হলে তিনি মক্কা ও মদীনায় হিজরত করেন। এ কারণে তাকে ইমামুল হারামাইন উপাধিতে ভূষিত করা হয়। পরবর্তীকালে নিশাপুরে ফিরে আসার পর প্রধানমন্ত্রী খাজা নিজামুল মুল্ক তার জন্যে নিশাপুরে নিজামিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে তিনি ঐ মাদ্রাসায় শিক্ষকতায় নিয়োজিত থাকেন। এ সময় ছাত্রদের লেখাপড়া, যিকির ও বিতর্কের মজলিস এবং মসজিদ ও জুমা পরিচালনার যাবতীয় দায়িত্ব ছিল ইমামুল হারামাইনের ওপর। ইমামুল হারামাইনের এই খ্যাতি ও আকর্ষণ গায্যালীকে তৃসে থাকতে দিল না। তিনি কিছু সংখ্যক ছাত্র সাথে নিয়ে ৪৭০ হিজরী সালে চলে আসলেন নিশাপুরে। জীবনের সাধ ছিল ফিকাহ শাস্ত্রে বিশারদ হবেন। তখনকার নিশাপুরই ছিল এর উত্তম স্থান। জ্ঞান চর্চা ও মারেফাতের কেন্দ্র ছিল নিশাপুর। অসংখ্য মাদ্রাসা, মসজিদ, খানকাহ্ ও জ্ঞানী মনীষীর সমাবেশ ছিল সেখানে। তন্মধ্যে খাজা নিজামুল মুল্কের প্রতিষ্ঠিত নিযামিয়া মাদ্রাসা সগৌরবে বিদ্যমান ছিল। ইমামুল হারামাইন ছিলেন সে মাদ্রাসার প্রধান এবং গোটা নিশাপুরের মধ্যমণি। তার ক্লাসে যে সব কৃতি ছাত্র ওস্তাদদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন তারা নির্ধারিত ক্লাস ছাড়াও রাত-দিন যে কোনো সুযোগে ওস্তাদদের খেদমতে হাজির হতেন। যে কোনো মাসআলা বা বিষয় নিয়ে ছাত্র শিক্ষকের মধ্যে প্রাণখোলা আলোচনা হতো। সত্যের সন্ধানী মুহাম্মদ গায্যালীর জন্যে এ ওস্তাদের সংসর্গই ছিল সবচে' আকর্ষণীয়। ওস্তাদের জ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা ও ব্যক্তিত্বের আকর্ষণই ছাত্রদেরকে জ্ঞান সাধনায় উদ্বুদ্ধ করতো। গায্যালী অল্পদিনের মধ্যে ইমামুল হারামাইনের ৪০০ ছাত্রের মধ্যে অগ্রগণ্য হয়ে ওঠেন এবং অচিরেই ইমামের বিশিষ্ট ছাত্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। কখনো কখনো ইমামের সহকারী হিসেবে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে দরস দিতে লাগলেন। বিতর্ক সভায় ছাত্রদের ওপর জয় লাভ তার জন্য এক প্রকার অবধারিত ছিল। ইমামুল হারামাইনের নিয়ম ছিল, ছাত্রদেরকে তিনি বিতর্ক সভায় পূর্ণ স্বাধীনতা দিতেন। এতে ছাত্রদের সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশ ঘটতো। ছাত্রদের যোগ্যতা ও প্রতিভার লালনাগার ছিল এই বিতর্ক সভা।
📄 নিশাপুরে শোকের ছায়া
গায্যালীর বয়স ৩০ বছর পূর্ণ না হতেই ইমামুল হারামাইন ইহলোক ত্যাগ করলেন ৪৭৮হিঃ/১০৮৫ খ্রীঃ সালে। তার ইন্তিকালে নিশাপুরে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে এলো। এবার নিশাপুরের পরিবেশ যেন গায্যালীর জন্যে অপর্যাপ্ত হয়ে উঠল। ইমামের ইন্তেকালের পর অন্যান্য ওস্তাদদের যোগ্যতা এতদূর ছিলনা যে, গায্যালী তাদের দরসে হাজির হয়ে উপকৃত হতে পারবেন। তাছাড়া ওস্তাদের খালি স্থান পূরণ করার জন্যে গায্যালী ছিলেন যোগ্যতম উত্তরসূরী। নিশাপুরের বাইরে ছিল তুর্কীরাজ মালেক শাহের সেনা ছাউনী। সেনা ছাউনীতে প্রধানমন্ত্রী খাজা নিজামুল মুল্কের দপ্তর ছিল সবার আকর্ষণ। খাজা নিজামুল মুল্কের উদ্যোগেই সেনা ছাউনীতে বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক সভার আয়োজন হতো। বিতর্ক সভা কেবল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যালোচনার মাধ্যমেই ছিল না; বরং তা যে কোনো জ্ঞানী মনীষীর পান্ডিত্য যাঁচাইয়ের কষ্টিপাথর ছিল। সবার মতো নিশাপুরের বিজ্ঞ আলেমরাও সেই বিতর্ক সভায় অংশ নিতেন।