📄 শৈশবে প্রাথমিক শিক্ষা
মুহাম্মদ তৃসীর ইন্তেকালের পর 'সূফী' দুই ছেলেকে স্থানীয় মক্তবে ভর্তি করান। মক্তবে প্রথমে কুরআন মজীদ, এরপর অন্যান্য বিষয় ও অংক শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। কিছুদিনের মধ্যে পিতার রেখে যাওয়া অর্থ শেষ হয়ে যায়। সূফী মুহাম্মদ ও আহমদকে মক্তবের লেখাপড়া শেষ করার পর মাদ্রাসায় ভর্তির ব্যবস্থা করেন।
📄 মাদ্রাসার জীবন
'মুহাম্মদ' ও 'আহমদ' দুই ভাই যে মাদ্রাসায় ভর্তি হলেন, সে মাদ্রাসার নিজস্ব ওয়াক্ফ সম্পত্তি ছিল। সেই তহবিলের ভাতা দিয়ে ছাত্ররা খাওয়া পরার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত মনে জ্ঞান চর্চায় মশগুল থাকতে পারতো। মাদ্রাসায় মুহাম্মদ প্রথম থেকেই অসাধারণ যোগ্যতা, প্রতিভা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দেয়। ফিকাহ, নাহু (আরবী ব্যাকরণ) ভাষাতত্ত্ব, কুরআন, হাদীস প্রভৃতি বিষয়ে খুব দ্রুত জ্ঞান অর্জন করে। তাছাড়া খুব শীঘ্রই নিজের মনের ভাব ও চিন্তাধারা আরবী ভাষায় লেখার ও বলার যোগ্যতা অর্জন করে। আসলে এসব বিষয়ে জ্ঞানার্জনের সাহায্যে মুহাম্মদ গায্যালী ছোটবেলা থেকেই মহাসত্যের সন্ধান করছিল।
📄 উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশে জুরজান যাত্রা
কিছুদিনের মধ্যে গায্যালীর জন্যে 'তৃস' নগরী ছোট হয়ে আসল। জ্ঞানের প্রবল আকর্ষণ তাকে বাইরের দুনিয়ার দিকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। তখনকার দিনে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্যে হয়ত নিশাপুর যেত, না হয় জুর্জানে। নিশাপুর বর্তমান খোরাসান প্রদেশের অন্তর্গত একটি শহর। আর জুর্জান বা 'গোরগান' ইরানের আরেকটি উত্তরাঞ্চলীয় শহর। জুর্জান যাবার পথ যেমন ছিল দূরের, তেমনি ছিল দুর্গম ও পাহাড়িয়া। আজকের দিনের যানবাহন তো তখন ছিলই না। তদুপরি জুর্জান শহরের আবহাওয়াও বহিরাগতদের জন্য অনুকূল ছিল না। মুহাম্মদ গায্যালীর বয়স তখনো ২০ বছর পার হয়নি। কিন্তু জ্ঞান অর্জনের প্রবল আকর্ষণে সকল দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে তিনি ৪৬৫/১০৭৩ সালে জুর্জান গিয়ে পৌঁছলেন। মেধাবী ও প্রতিভাবান ছাত্রকে সাদরে বরণ করে নিলেন জুর্জানের সুযোগ্য শিক্ষকগণ। জুর্জানে ইমাম আবু নসর ইসমাঈলীর কাছে পড়ার সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো খাতায় নোট করে নিতেন আর পাঠ্য জীবনের অমূল্য সম্পদ হিসেবে সযত্নে রাখতেন।
📄 ডাকাতের হাতে অমূল্য শিক্ষা
জুর্জানে শিক্ষা সমাপনের পর গায্যালী যখন মাতৃভূমি 'তুসে' ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন পাঠ্য জীবনের অমূল্য সঞ্চয় নোটখাতাগুলোও সঙ্গে নিলেন। তিনি খোরাসানগামী একটি কাফেলার সাথী হয়ে তৃসের উদ্দেশে রওনা হলেন। আসার পথে এমন এক ঘটনা ঘটল, যা আজীবন তিনি ভুলতে পারেন নি। পথিমধ্যে ডাকাত দল কাফেলার ওপর হামলা করে মুসাফিরদের সব মালামাল লুট করে নিল। গায্যালীর নোটখাতাগুলোও ছিনিয়ে নিল। গায্যালী তার মালপত্রের কথা ভুলে গেলেও নোটগুলোর কথা কিছুতেই ভুলতে পারলেন না। তাই ডাকাতদের অনুসরণ করে চললেন। ডাকাতদের সর্দার তাকে ধমক দিয়ে বললঃ "ভাগো, ফিরে যাও, নতুবা প্রাণ হারাবে।” তিনি কিন্তু নাছোড়-বান্দা। শত অনুনয়-বিনয় করে ডাকাত সর্দারকে বললেন: “অন্তত আমার নোটখাতাগুলো ফেরৎ দিন। আমার দীর্ঘ কয়েক বছরের জ্ঞান-সাধনার সঞ্চয় এগুলো”। ডাকাত সর্দার ঠাট্টার ছলে হেসে বললোঃ" তুমি এমন কিসের জ্ঞান অর্জন করলে যে, ডাকাতরা তোমার থেকে তা কেড়ে নিতে পারলো।” এই বলে সর্দার খাতাগুলো তরুণ শিক্ষার্থীকে ফেরৎ দিল। নোটখাতাগুলো ফেরৎ পেলেও ডাকাত সর্দারের জবাব শুনে গায্যালী ভাবনায় তলিয়ে গেলেন। মনে মনে বলতে লাগলেন- 'সত্যিই তো, বিদ্যা যদি কেবল খাতায় আর কিতাবেই থাকে, যদি ছাত্রের স্মরণ না থাকে, তাহলে সেই বিদ্যার কি দাম?' এই ভাবনার তন্ময়তায় তার মনে আরেকটি ভাবনার উদয় হলো। বললেন: 'হয়ত আমার ভাগ্যলিপিই ডাকাতদেরকে আমার যাত্রা পথে প্রেরণ করেছে, যাতে জ্ঞান আহরণের সঠিক পথ দেখাতে পারে।' সত্যিই ডাকাত দলের সর্দার মুহাম্মদ গায্যালীকে এমন এক মূল্যবান শিক্ষা দিয়েছিল, যার সুফল জুর্জানে সঞ্চিত জ্ঞানের চাইতে কোন অংশে কম ছিল না।