📄 অবতরণিকা
ইসলামী জাহানের বিস্ময়কর প্রতিভা ইমাম আবু হামেদ মুহাম্মদ গায্যালী (রহ)। তার জীবনধারাও ছিল বিস্ময়কর। তিনি কুরআন, হাদীস, ফিকাহ, দর্শন, তর্কশাস্ত্র প্রভৃতিতে পাণ্ডিত্য অর্জন করে প্রখ্যাত আলেম হিসেবে জগৎ জোড়া স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। এরপর তৎকালীন দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ বাগদাদের নিযামিয়া মাদ্রাসার অধ্যাপনা আর বাগদাদের খলীফা ও সুলতানের শ্রদ্ধাভাজন হিসেবে পার্থিব জীবনে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী হয়েছিলেন।
কিন্তু এরপরও তার অশান্ত প্রেমাসক্ত আত্মা পরিতৃপ্ত হয়নি। মহান আল্লাহ্ মারেফাত লাভে তিনি এই জ্ঞান, পাণ্ডিত্য ও সম্মান-খ্যাতিকে তুচ্ছ জ্ঞান করেন। একদিন ছদ্মবেশে বাগদাদ থেকে বেরিয়ে পড়েন আধ্যাত্মিক সাধনার পথে। দীর্ঘ ১০ বছর সিরিয়া, বায়তুল মুকাদ্দাস, মক্কা ও মদীনা শরীফ এবং মিসর সফরে কাটানোর পর অন্তর জগতের বিস্ময়কর রহস্য উদঘাটন করে, সাধনার পথে আল্লাহকে পাওয়ার বিরাট সাফল্য ও পুঁজি নিয়ে পুণরায় ফিরে আসেন কর্মজীবনে। কিন্তু এবার সরকারী পদ বা দয়া দাক্ষিণ্যে নয়, দুনিয়া পুজারীদের সংস্রব ত্যাগ করে স্বাধীন মুক্ত বিহঙ্গের মতো জ্ঞান ও আল্লাহ্ মারেফাতের আকাশে পাড়ি জমান। এ সময় তিনি যেসব অমূল্য গ্রন্থ রচনা করে গেছেন, তা যুগের পর যুগ ইসলামী জাহানের জ্ঞান, চিন্তা ও জীবন পথের আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। এ শতাব্দীর প্রাচ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা ইকবাল ইমাম গায্যালীর এসব দিক-নির্দেশনা বা তালক্বীনের বিরাট অভাববোধ করেছেন আজকের দর্শন ও বিজ্ঞান চর্চায়। বলেছেন:
ره گیا رسم اذان روح بلالی نه رهی فلسفه ره گیا تلقین غزالی نه رهی
'রেহ্ গেয়া রমে আযান রূহে বেলালী ন রহী ফালসাফা রেহ্ গেয়া তালকীনে গায্যালী ন রহী'
"মসজিদে মসজিদে আযানের রসম-রেয়াজ তো জারি আছে। কিন্তু ইসলামের প্রথম মুয়ায্যিন হযরত বেলাল (রা)-র [যে আত্মা ছিল, তার আযানের যে প্রাণ ও আবেদন ছিল, যে আযান শোনার জন্যে আসমানের ফেরেশতারাও অপেক্ষায় থাকত। আযানের সেই প্রাণরস এখন নেই। আর ফিলোসোফি বা দর্শনের চর্চা তো হচ্ছে; কিন্তু [দর্শন দিয়ে আল্লাহকে পাওয়ার, পরম সত্যে উপনীত হবার] যে দিক-নির্দেশনা বা তালক্বীন ইমাম গায্যালী দিয়ে গেছেন সে 'তালকীন' আজ অনুপস্থিত।"
ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ে ইমাম গাযযালী (রহ) ইসলামী জাহানকে যে হেদায়াত দিয়ে গেছেন তার আলোকবর্তিকা অনন্তকাল চলবে। তার অসাধারণ পাণ্ডিত্য ও অবদানের কথা অমুসলিম মনীষীরাও স্বীকার করেছেন অকপটে। মি:। ব্রাউন ইরানের সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন: "প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা জালালুদ্দীন সুয়ূতী গায্যালী সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন: যদি হযরত মুহাম্মদ (স) এর পরে কোনো নবী আসতেন তাহলে অবশ্যই তিনি হতেন গায্যালী। -ইরানের সাহিত্যের ইতিহাস: ২য় খণ্ড, পৃ. ২৯৬।
📄 জন্ম
বিশ্ববিখ্যাত আল্লাহ্ প্রেমিক দার্শনিক ইমাম আবু হামেদ মুহাম্মদ গায্যালী ৪৫০ হিজরীতে (১০৫৮ খ্রীস্টাব্দে) ইরানের খোরাসান প্রদেশের তুস নগরীর 'তাবেরানে' জন্মগ্রহণ করেন। বিশ্ব নন্দিত ইরানী কবি ফেরদৌসীর জন্মস্থানও ঐ তাবেরান। 'তুস' নগরী এবং তাবেরানের ধ্বংসাবশেষ এখনো খোরাসানের প্রাদেশিক কেন্দ্র মাশহাদের অদূরে বিদ্যমান।
📄 পিতৃ পরিচয়
ইমাম গায্যালীর পিতার নাম ছিল 'মুহাম্মদ তৃসী'। 'তৃস' নগরের অধিবাসী হিসেবে তাকে বলা হতো 'তৃসী'। তার একটি ছোট্ট দোকান ছিল পশমী সুতার। সেখানে তিনি পশমী সুতা বুননের কাজ করতেন। এই সূত্রে তাকে বলা হতো গায্যালী। ইমাম গায্যালীর পিতা লেখাপড়া জানতেন না। কিন্তু আলেম, ফকীহ ও সুফী সাধকদের প্রতি তার অসাধারণ ভক্তি ও ভালবাসা ছিল। তাদের মজলিসে তিনি যাতায়াত করতেন। আসলে তিনি ছিলেন একজন দরিদ্র দ্বীনদার লোক। তার স্বভাব ছিল, কষ্ট করে নিজ হাতে যা রোজগার করতেন তা দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করতেন। অন্য কোনো খাবার তিনি গ্রহণ করতেন না। হয়ত এই দুটি মহৎ গুণের কারণেই আল্লাহ্ পাক তাকে দু'জন বিশ্বনন্দিত সুপুত্র দান করেছিলেন। 'মুহাম্মদ' ছাড়া তার অপর ছেলের নাম ছিল 'আহমদ'।
📄 পিতার ইন্তিকাল
পুত্র 'মুহাম্মদ' ও 'আহমদ'-কে শিক্ষাদীক্ষা দেয়াই ছিল 'মুহাম্মদ তুসী'র জীবনের স্বপ্ন। কিন্তু সে স্বপ্ন বাস্তবে রূপায়িত হবার পূর্বে দুই ছেলেকে প্রাথমিক মক্তবে ভর্তি করানোর আগেই তাকে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হয়। তার হাতে অর্থ-কড়ি বলতে তেমন কিছু ছিল না। এরপরও তার স্বপ্ন ছিল, হাতে টাকা কড়ি যা আছে তা দুই সন্তানের শিক্ষাদীক্ষার জন্যে ব্যয় করবেন। তার একজন বন্ধু ছিলেন সূফী। নাম, আবু হামেদ আহমদ ইবনে মুহাম্মদ রাযেকানী। ইমাম গায্যালীর (রহ) পিতা যখন বুঝতে পারলেন যে, হায়াত তাকে দুনিয়াতে আর বেশি দিন থাকার সুযোগ দেবে না, তখন দরবেশ বন্ধুকে ডেকে বললেন, আমার সামান্য অর্থকড়ি আর এই দুই সন্তান আপনার হাতে সোপর্দ করলাম। আমার অন্তিম ইচ্ছা হলো, এই অর্থকড়ি তাদের লেখাপড়ায় ব্যয় করবেন। যেভাবে হোক তারা ইল্ম হাসিল করে মানুষ হোক- এটাই আমার অন্তিম কামনা।