📄 উপার্জিত হারাম থেকে বাঁচার উপায়
যাঁরা হারাম উপার্জনের মাধ্যমে বহু কিছু করে ফেলেছেন; বাড়ি-গাড়ি, জমি-জায়গা ও ব্যাংক্ ব্যালেন্স করে ফেলেছেন এবং হারাম জ্ঞান হওয়ার পর বিবেকের কামড়ে সেই হারাম থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা পোষণ করছেন, তাদের জন্য এই শিরোনামের অবতারণা।
এ দুনিয়াতে বহু মানুষই আছেন, যাঁরা ভুল করার পর ভুল স্বীকার করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। বরং এ দুনিয়ার কষ্ট থেকে পরকালের আযাবকে অধিক কঠিন জ্ঞান করেই তাঁরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে সাথে সাথে তওবা করেন। আর এ তওবা সকলের জন্য ওয়াজেব। পবিত্র-পরিচ্ছন্ন হয়ে তাঁরা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে চান। ধন তো দূরের কথা, নিজের জীবন দ্বারাও ত্যাগ স্বীকার করে পবিত্র হয়ে ইহকাল ত্যাগ করেছেন। অতএব সুসংবাদ তাঁদের জন্যই। যেহেতু আল্লাহ তাঁদের গোনাহর পর্বতসমূহকে নেকীর পর্বতসমূহে পরিবর্তন করে দেবেন।
পক্ষান্তরে মহান আল্লাহ তাঁদের এই প্রত্যাবর্তনের ফলে খুশীও হবেন। (বিস্তারিত জানতে 'সুখের সন্ধান' দ্রষ্টব্য)
সাধারণভাবে এই তওবার রয়েছে কয়েকটি শর্ত; সে শর্ত পূরণ না হলে তওবা কবুল হয় নাঃ-
১। তওবা হবে আন্তরিকভাবে একমাত্র আল্লাহর জন্য বিশুদ্ধ। অর্থাৎ অন্য কাউকে খোশ করার জন্য অথবা কোন স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তওবা হলে চলবে না।
২। সাথে সাথে পাপ (হারাম উপার্জন) বর্জন করতে হবে। পাপে লিপ্ত থাকা অবস্থায় তওবা গ্রাহ্য নয়।
৩। বিগত (পাপের) উপর লাঞ্ছনা ও অনুশোচনা প্রকাশ করতে হবে। লজ্জিত না হলে উন্নাসিকতার সাথে তওবা গ্রহণীয় নয়। হযরত আলী বলেন, 'পাপের কাজ করে লজ্জিত হলে পাপ কমে যায়। আর পুণ্য কাজ করে গর্ববোধ করলে পুণ্য বরবাদ হয়ে যায়।'
৪। পুনরায় মরণ পর্যন্ত তার প্রতি না ফেরার দৃঢ় সঙ্কল্প করতে হবে। তা না হলে তওবা বা প্রত্যাবর্তনের অর্থ কি?
৫। কোন মানুষের অধিকার হরণ করে পাপ করলে সে অধিকার আদায় করে তবে তওবা করতে হবে। তা না হলে কুঁয়োতে মরা বিড়াল ফেলে রেখে পানি তুলে পানি পাক করার ব্যবস্থা নিলে কি হবে?
৬। তওবা কবুল হওয়ার নির্ধারিত সময়ে (মরণ নিকটবর্তী হওয়ার আগে এবং পশ্চিমাকাশে সূর্য উদয় হওয়ার পূর্বে) তওবা করতে হবে।
যাঁরা হারাম মাল ও উপার্জন থেকে তওবা করতে চান, তাঁদের জন্য উক্ত শর্তাবলীর মধ্যে পঞ্চম শর্তটি অতি কঠিন। কিন্তু নাজাতকামীদের জন্য নিজের প্রাণদানও কঠিন নয়।
বলাই বাহুল্য যে, যদি আপনি আপনার হারাম উপায়ে কামানো টাকা ইসলাম আনার পূর্বে উপার্জন করেছেন, তাহলে ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পর সে সমূহ মাল আপনার জন্য হালাল। কিন্তু যে মাল আপনি মুসলিম হয়ে হারাম উপায়ে উপার্জন করেছেন, তা থেকে অব্যাহতি পাওয়া কঠিন হলেও পেতে হবে।
সূদী ব্যাংক অথবা বিমা কোম্পানী থেকে সূদে যে অর্থ আসে আপনার হিসাবের খাতায় এসে গেছে কিংবা ফিক্সড ডিপোজিটের মাধ্যমে যে টাকা আপনি সঞ্চয় করেছেন, তা থেকে আপনি পবিত্র হন। অবশ্য নাপাক বলে না নিয়ে ব্যাংকওয়ালাদের কাছেই ফেলে আসা ঠিক নয়। কারণ ছেড়ে আসা টাকা উক্ত সূদী কারবারে অতিরিক্ত সহায়তা ছাড়া আরো বহু অজানা অঘটন ও পাপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। (আর আল্লাহ বলেন, "পাপ ও অন্যায় কাজে তোমরা কেউ কারো সহায়তা করো না।” (সূরা মায়েদাহ ২ আয়াত) সুতরাং এর জন্য সঠিক পথ এই যে, তা ব্যাংক থেকে তুলে এনে সেই নিঃস্ব অভাবী, অসহায় প্রভৃতি গরীব মানুষদের মাঝে বিতরণ করে দিন যাদের অবস্থা সেই নিরুপায় লোকদের মত যারা হারাম খেতে পারে। অথবা এমন জনকল্যাণমূলক কাজের খাতে ব্যয় করে দিন, যাতে যাকাত ব্যয় করা চলে। খেয়াল রাখবেন যে, তাতে কোন সওয়াবের নিয়ত রাখলে চলবে না।
বেশ্যাবৃত্তি, গান-বাজনা প্রভৃতির মাধ্যমে কামানো টাকাও অনুরূপ খাতে দান করে দিতে হবে এবং তাতেও কোন সওয়াবের নিয়ত রাখলে চলবে না।
হারাম মাল কামিয়ে যদি হালালের সাথে মিশ্রিত হয়ে থাকে, তাহলে হারাম মালের পরিমাণ অনুমান করে অনুরূপ খাতে ব্যয় করে দিতে হবে এবং তাতেও কোন সওয়াবের নিয়ত রাখলে চলবে না। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ১৬/২৩৬, ২৫৬)
চুরি, ডাকাতি, ছিন্তাই, সূদ, ঘুস, ঋণ প্রভৃতির মাধ্যমে হরফ করা মাল হলে, তা যে কোন প্রকারে তার আসল মালিক অথবা তার ওয়ারেসকে ফেরৎ দিতে হবে। লজ্জা লাগলে অথবা ধরা পড়ার ভয় থাকলে গোপনভাবে তার ব্যাংক একাউন্টে জমা দিয়ে অথবা থলেয় পুরে তার বাড়ি অথবা ঘেরা-বেড়া বাগানের ভিতর ফেলে এসে অব্যাহতি লাভ করতে হবে। পক্ষান্তরে একান্তই যদি মালের মালিক চেনা না যায় অথবা সে মারা যায় এবং তার ওয়ারেস কেউ না থাকে, তাহলে সে ক্ষেত্রে ঐ মাল মালিকের তরফ থেকে উক্তভাবে দান করে দিতে হবে।
অনুরূপ দান করে দিতে হবে অসৎ উপায়ে ব্যবসা করার টাকা।
কারো জমি জবরদখল বা বর্গাদারি করে থাকলে অথবা কৌশল করে নিজের নামে লিখিয়ে নিয়ে থাকলে তাও তার আসল মালিককে ফেরৎ দিতে হবে।
বাঁচার উপায় কঠিন মনে হলেও, তাই অবলম্বন করে বাঁচতে হবে। আর যদি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করতে গরম লাগে, তাহলে জেনে রাখুন যে, জাহান্নামের আগুন তার চাইতে অনেক গুণ বেশী গরম।
هذا ، وصلى الله على نبينا محمد، وعلى آله وصحبه أجمعين.
সমাপ্তি