📄 বক্তা
বক্তৃতা করে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া পারতপক্ষে সকল মুসলিমের জন্য ওয়াজেব। কিন্তু বক্তৃতাকে পেশা ও উপার্জনের মাধ্যম হিসাবে অবলম্বন করা এবং রেট বেঁধে তার বিনিময় গ্রহণ করা বৈধ নয়। (দ্বীনী ইলমের নৈতিকতা দ্রষ্টব্য) অবশ্য সমাজ খুশী হয়ে যদি বক্তাকে অনেক কিছু দেয়, তাহলে তা গ্রহণ করায় দোষ নেই। যেমন অসামর্থ্যবান বক্তার রাহাখরচ চেয়ে নেওয়াও দোষাবহ নয়। আর এতে তাঁর সমালোচনা হওয়া উচিত নয়। কারণ, দীপশিখা থেকে আমরা যদি কেবল আলো আশা করি এবং তাতে তেল ঢালার ব্যবস্থা না রাখি, তাহলে সে দীপ জ্বলবে কিভাবে?
অবশ্য বক্তাকে তাঁর বক্তৃতায় খেয়াল রাখতে হবে যে, মহান আল্লাহ বলেন, "সুতরাং যে ব্যক্তি বিনা ইলমে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে তার চেয়ে বড় যালিম আর কে? নিশ্চয় আল্লাহ সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। (সূরা আনআম ১৪৪ আয়াত) "বল যারা আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করে তারা পরিত্রাণ পাবে না।” (সূরা ইউনুস ৬৯ আয়াত)
আর মহানবী বলেন, "মানুষের মিথ্যাবাদিতার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে, তাই বলে বেড়ায়।" (সহীহুল জামে' ৪৩৫৮নং) "সর্বনাশ সেই ব্যক্তির, যে লোককে হাসাবার উদ্দেশ্যে মিথ্যা বলে। তার জন্য সর্বনাশ, তার জন্য সর্বনাশ।” (ঐ ৭০১৩নং)
প্রিয় নবী বলেন, "তোমরা আমার উপর মিথ্যা বলো না। যেহেতু যে আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করল, সে যেন দোযখে প্রবেশ করল।” (বুখারী, মুসলিম)
"যে ব্যক্তি আমি যা বলিনি তা বানিয়ে বলল, সে যেন নিজের ঠিকানা দোযখে বানিয়ে নিল। (বুখারী ১/২০১)
"যে ব্যক্তি আমার তরফ থেকে কোন হাদীস বর্ণনা করে অথচ সে জানে যে, তা মিথ্যা তবে সে মিথ্যুকদের অন্যতম।” (মুসলিম)
বনী ঈসরাঈল লিখিত গ্রন্থ নিয়ে ব্যস্ত ছিল এবং আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব তাওরাতকে বর্জন করে বসেছিল। (সহীহুল জামে' ২০৪৪নং)
তারা যখন আসল হেদায়াতের কিতাবের উপর আমল ত্যাগ করে বসল, তখন কেচ্ছা-কাহিনী বলতে শুরু করল। (ঐ ২০৪৫নং)
বলাই বাহুল্য যে, বর্তমান যুগেও এমন অনেক বক্তা, দ্বীনের দায়ী, উলামা ও সাধারণ মানুষ আছেন, যাঁরা কিতাব ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান অর্জন না করে যয়ীফ, জাল, মনগড়া কেচ্ছা-কাহিনী ও স্বপ্ন ইত্যাদি দ্বারা নিজেদের কিতাব ও মজলিস সরগরম করে রাখেন। সত্যই বলেছেন মহানবী, “অবশ্যই তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির পথ অনুসরণ করবে বিঘত-বিঘত এবং হাত-হাত (সম) পরিমাণ। এমনকি তারা যদি গো-সাপের (সান্ডা)র গর্তে প্রবেশ করে, তাহলে তোমরাও তাদের পিছনে পিছনে যাবে। (এবং তাদের কেউ যদি রাস্তার উপর প্রকাশ্যে সঙ্গম করে, তাহলে তোমরাও তা করবে!)" সাহাবাগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি কি ইয়াহুদ ও নাসারার অনুকরণ করার কথা বলছেন?' তিনি বললেন, "তবে আবার কার?" (বুখারী, মুসলিম ২৬৬৯, হাকেম, আহমাদ, সহীহুল জামে' ৫০৬৭ নং)
তিনি আরো বলেছেন, "পূর্ববর্তী জাতির সকল আচরণ এই উম্মত গ্রহণ করে নেবে।” (সহীহুল জামে' ৭২১৯ নং)
প্রিয় নবী বলেন, "অবশ্যই আল্লাহ এমন বাকপটু মানুষকে ঘৃণা করেন, যে জিহ্বা দ্বারা ভক্ষণ করে (এমন ঢঙে জিভ ঘুরিয়ে কথা বলে,) যেমন গাভী নিজ জিহ্বা দ্বারা সাপটে তৃণ ভক্ষণ করে।” (সহীহুল জামে' ১৮৭৫নং)
মহানবী বলেন, "এক সম্প্রদায় হবে, যারা নিজেদের জিহ্বা দ্বারা পেট চালাবে, যেমন গরু মাঠ থেকে (ঘাস) ভক্ষণ করে থাকে।” (আহমাদ, সহীহুল জামে' ৩৬৭০নং)
অর্থাৎ, তারা রুযী-রোযগারের জন্য নিজের জিহ্বাকে মাধ্যমরূপে ব্যবহার করবে, যেমন গরু তার একমাত্র অঙ্গ জিহ্বার সাহায্যে ঘাস বা লতাপাতা ভক্ষণ করে থাকে। গরু যেমন শুকনা ও ভিজা এবং তেঁতো-মিঠার মাঝে পার্থক্য করতে পারে না, বরং সামনে যা আসে তাই ভক্ষণ করে, অনুরূপ ঐ শ্রেণীর মানুষরা হক ও বাতিল এবং হালাল ও হারামের তমীয না করে নিজেদের জিহ্বায় যাচ্ছেতাই বলে শ্রোতাদের মন আবিষ্ট করে রুযী-রোযগার করে থাকে।
উল্লেখ্য যে, বক্তৃতার ডেট নেওয়ার সময় যে টাকা এ্যাডভান্স নেওয়া হয়, ডেট ফেল করলে সে টাকা বক্তার জন্য হালাল নয়। সে টাকা দাতাকে ফেরৎ দেওয়া জরুরী। অবশ্য দাতা মাফ করে দিলে সে কথা ভিন্ন।
📄 লেখক
লেখালেখির মাধ্যমে ইসলামী দাওয়াত দেওয়াও যাঁরা পারেন তাঁদের জন্য ওয়াজেব। ইসলামের সৌন্দর্য বর্ণনা এবং ইসলামের প্রতি আরোপিত অপবাদ খন্ডন করে প্রত্যেক লেখাই প্রশংসিত।
পক্ষান্তরে ইসলাম-বিরোধী লেখা, কুফরী ও তাগুতের সপক্ষে লেখা, অশ্লীল ও নোংরা কথা, নৈতিকতা-বিরোধী কথিকা, গল্প, উপন্যাস, (আরব্য ও পারস্য উপন্যাসের মত) রূপকথা, কৌতুক প্রভৃতি লেখা, কারো সমালোচনা করার সময়, তার নাম নিয়ে, গালি দিয়ে, ব্যঙ্গ ও কটাক্ষ করে লেখা অবশ্যই বৈধ নয়। জনৈক আরবী কবি কি সুন্দরই না বলেছেন,
وَمَا مِنْ كَاتِبٍ إِلا سَيَفْنَى وَيُبْقِي الدَّهْرُ مَا كَتَبَتْ يَدَاهُ فَلا تَكْتُبْ بِكَفَكَ غَيْرَ شَيْءٍ يَسُرُّكَ فِي الْقِيَامَةِ أَنْ تَرَاهُ
অর্থাৎ, প্রত্যেক লেখকই এ দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কিন্তু যুগ যুগ ধরে থেকে যাবে তা, যা তার হস্ত লিপিবদ্ধ করেছে। সুতরাং তুমি তোমার হস্ত দ্বারা এমন জিনিস ছাড়া অন্য কিছু লিপিবদ্ধ করবে না, যা দর্শন করে কিয়ামতে আনন্দবোধ করতে পার।
এক নিকৃষ্ট লিখা ও তার মাধ্যমে উপার্জনের কথা উল্লেখ করে মহান আল্লাহ বলেন,
((فَوَيْلٌ لِّلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِندِ الله لِيَشْتَرُواْ بِهِ ثَمَناً قَلِيلاً فَوَيْلٌ لَّهُم مِّمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَّهُمْ مِّمَّا يَكْسِبُونَ )) (৭৯) سورة البقرة
অর্থাৎ, সুতরাং তাদের জন্য দুর্ভোগ, যারা নিজ হাতে গ্রন্থ রচনা করে এবং অল্প মূল্য অর্জনের জন্য বলে, এটি আল্লাহর নিকট হতে এসেছে। তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য তাদের দুর্ভোগ এবং যা তারা উপার্জন করেছে তার জন্যও তাদের দুর্ভোগ (রয়েছে)। (সূরা বাকারাহ ৭৯ আয়াত)
কোন কোন লেখক নিজের কথা লিখে না, বরং তার বিক্রি করা কলম তাই লিখে যা ক্রেতা আদেশ করে। উৎকোচ, অনুগ্রহ বা কৃপাপ্রাপ্ত লেখক যেন মনে মনে বলে, 'দোষ-গুণ নাহি দেখি যে কিছু লেখাও লিখি, কলমে বসিয়া কৃপাময়।' এরা অন্যায়ে সহযোগিতাকারী এক শ্রেণীর সাহিত্য-ব্যবসায়ী। অপরাধে এরাও মূল অপরাধীর চাইতে কম নয়।
📄 প্রকাশক, বই ব্যবসায়ী
যে বই শির্ক ও বিদআত সম্বলিত অথবা নোংরা ও অশ্লীল, সে বই প্রকাশ বা তার ব্যবসা করে অর্থ উপার্জন করা বৈধ নয়। যেহেতু তাতে হারামের সহযোগিতা হয়। বৈধ নয় কাউকে অন্যায় বা অবৈধ কিছু লিখে বা ছেপে দিয়ে কামানো অর্থ।
📄 বিচারক, উকিল
মহান আল্লাহ আমাদেরকে বলেছেন যে,
((فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ وَلَا تَشْتَرُواْ بِآيَاتِي ثَمَنًا قَلِيلاً وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ)) (٤٤) سورة المائدة
অর্থাৎ, সুতরাং মানুষকে ভয় করো না, আমাকেই ভয় কর এবং আমার আয়াত নগণ্য মূল্যে বিক্রয় করো না। এবং আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই অবিশ্বাসী। (সূরা মাইদাহ ৪৪ আয়াত)
((وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ)) (٤٥) سورة المائدة
অর্থাৎ, আর আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না তারাই যালেম (অত্যাচারী)। (সূরা মাইদাহ ৪৫ আয়াত)
((وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ)) (٤٧) سورة المائدة
অর্থাৎ, আর যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে বিধান দেয় না তারা ফাসেক (সত্যত্যাগী)। (সূরা মাইদাহ ৪৭ আয়াত)
সুতরাং কুরআন মাজীদের উক্ত বিধান অনুসারে কোন মুসলিমের জন্য মানব-রচিত আইন-কানুন দ্বারা বিচার-মীমাংসা করা বৈধ নয়। বৈধ নয় সে দেশ ও সে কোর্টের বিচারক ও উকিল হওয়া, যে দেশ ও যে কোর্টে আল্লাহর বিধান দ্বারা বিচার করা হয় না। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ২০/১৭৭)
জেনে রাখা ভালো যে, বিচারক বা উকিল ঐ পেশা বিভিন্ন উদ্দেশ্যে অবলম্বন করে থাকেন।
১। তিনি বিশ্বাস করেন যে, ইসলামী আইনের পরিবর্তে মানব-রচিত আইন উত্তম।
২। অথবা তিনি বিশ্বাস করেন যে, ইসলামী আইন অপেক্ষা মানব-রচিত আইন উত্তম নয়, তবে তার সমকক্ষ।
৩। অথবা তিনি বিশ্বাস করেন যে, ইসলামী আইন অপেক্ষা মানব-রচিত আইন উত্তম নয়, তবে বর্তমান যুগে তার প্রয়োগ যথার্থ নয়।
৪। অথবা তিনি বিশ্বাস করেন যে, ইসলামী আইন অপেক্ষা মানব-রচিত আইন উত্তম নয়, তবে মানব-রচিত আইন দিয়েও বিচার-মীমাংসা করা বৈধ।
উক্ত কোন এক প্রকার বিশ্বাস রাখাই একজন মুসলিমের কাফের হওয়ার জন্য যথেষ্ট। বলা বাহুল্য, সে লোকের উপার্জন যে হারাম তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
৫। অথবা তিনি বিশ্বাস করেন যে, ইসলামী আইন অপেক্ষা মানব-রচিত আইন উত্তম নয়, কিন্তু রুযী-রোযগারের জন্য উক্ত পেশা গ্রহণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি গোনাহগার হবেন এবং তাঁর উপার্জনও হারাম হবে।
৬। অথবা তিনি বিশ্বাস করেন যে, ইসলামী আইন অপেক্ষা মানব-রচিত আইন কোনরূপেই উত্তম নয় এবং তার প্রয়োগ কোন কালে বৈধ নয়। কিন্তু তিনি মুসলিমদের প্রয়োজনে মুসলিমদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য হক জেনে বাতিলের বিরুদ্ধে লড়ায়ের উদ্দেশ্যে এ পেশা অবলম্বন করে উক্তভাবেই অর্থোপার্জন করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে সম্ভবতঃ তা হারাম হবে না ইনশাআল্লাহ।
কিন্তু মুসলিমদের প্রয়োজনে উকিল হলেও সে পেশায় শরীয়ত-বিরোধী কোন ফায়সালা দেওয়া বৈধ নয়। যেমন অন্যায়ের ঠিকেদারী করাও তাঁর জন্য অবৈধ। মুআক্কেল হকের উপর হলে তিনি তাকে সাহায্য করবেন। তা না হলে হক প্রকাশ করে তাকে হারাম হতে রক্ষা করে সাহায্য করবেন। (ফাতাওয়া ইবনে উষাইমীন ২/৭০৪)
মহানবী বলেন, "তুমি তোমার অত্যাচারিত ও অত্যাচারী ভায়ের সাহায্য কর।” বলা হল, (হে আল্লাহর রসূল!) অত্যাচারীকে সাহায্য কিভাবে করব? তিনি বললেন, "তাকে অত্যাচার করা হতে বিরত রাখবে; তাহলেই তাকে সাহায্য করা হবে।” (আহমাদ, বুখারী, তিরমিযী, সহীহুল জামে' ১৫০২নং)
মুসলিম উকীলের জন্য বৈধ নয় কোন অপরাধ বা কুফরের পৃষ্ঠপোষকতা করা। মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে সম্বোধন করে বলেন,
((وَلَا تُجَادِلْ عَنِ الَّذِينَ يَخْتَانُونَ أَنفُسَهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَن كَانَ خَوَّانًا أَثِيمًا))
অর্থাৎ, আর তুমি তাদের পক্ষে কথা বল না যারা নিজেদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে। নিশ্চয় আল্লাহ বিশ্বাসঘাতক পাপিষ্ঠকে ভালবাসেন না। (সূরা নিসা ১০৭ আয়াত)
((فَلَا تَكُونَنَّ ظَهِيرًا لِّلْكَافِرِينَ)) (٨٦) سورة القصص
অর্থাৎ, সুতরাং তুমি কখনও সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীদের সহায় হয়ো না। (সূরা কাসাস ৮৬)
আল্লাহর নবী মূসা যা বলেছিলেন, তার উল্লেখ করে তিনি বলেন,
((قَالَ رَبِّ بِمَا أَنْعَمْتَ عَلَيَّ فَلَنْ أَكُونَ ظَهِيرًا لِّلْمُجْرِمِينَ)) (۱۷) سورة القصص
অর্থাৎ, সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছ, আমি এরপর আর কখনো অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষক হব না। (সূরা কাসাস ১৭ আয়াত)
আমাদের মহানবী বলেন, “যে ব্যক্তি নিজ বাতিলের মাধ্যমে হককে খন্ডন করে কোন যালেমকে সাহায্য করে, সে ব্যক্তির নিকট থেকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দায়িত্ব উঠে যায়।” (সহীহুল জামে' ৬০৪৮/১নং)
তিনি আরো বলেন, “যে ব্যক্তি বিবাদের সময় অন্যায় দ্বারা অথবা কোন অত্যাচারীকে সাহায্য করে, সে ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর রোষে অবস্থান করে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে তা থেকে বিরত না হয়।” (ইবনে মাজাহ ২৩২০, হাকেম, সহীহুল জামে' ৬০৪৯নং)
বলাই বাহুল্য যে, বিচারক বা উকিল যদি তাঁদের পেশায় শরীয়ত অনুসারে হককে হক ও বাতিলকে বাতিলরূপে প্রতিষ্ঠা করার এবং প্রকৃত হকদারকে তার হক ফিরিয়ে দেওয়ার ও মযলুমকে সাহায্য করার নিয়ত রাখেন, তাহলে তা বিধেয় কাজ। যেহেতু তা সৎ ও আল্লাহভীতির কাজে সহযোগিতার পর্যায়ভুক্ত। অন্যথা ঐ পেশা বৈধ নয়। যেহেতু তাতে পাপ ও অন্যায় কাজে সহযোগিতা হয়। আর ইসলামের একটি মৌলিক মহান নীতি হল মহান আল্লাহর এই বাণী,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبَرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ العقاب (۲) سورة المائدة
অর্থাৎ, তোমরা সৎকার্য ও আল্লাহভীতির ব্যাপারে একে অপরকে সাহায্য কর এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা। (সূরা মাইদাহ ২ আয়াত)
এ ছাড়া ইনসাফ ও ন্যায়সঙ্গত বিচার অবশ্যই করতে হবে উকিল ও বিচারককে। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَابٍ ذِي الْقُرْبَى )
অর্থাৎ, আল্লাহ অবশ্যই ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন। (সূরা নাহল ৯০ আয়াত)
يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَانُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ )
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায় সাক্ষ্যদানে অবিচল থাক। কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে কখনও সুবিচার না করাতে প্ররোচিত না করে। সুবিচার কর, এটা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন। (সূরা মাইদাহ ৮ আয়াত)
وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى )
অর্থাৎ, আর তোমরা যখন কথা বলবে, তখন তা আত্মীয়ের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায্যভাবে বলবে। (সূরা আনআম ১৫২ আয়াত)
يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَى بِهِمَا فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَى أَن تَعْدِلُوا وَإِن تَلْوُا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا ))
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায় বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাক, আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দাও; যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়; সে বিত্তবান হোক অথবা বিত্তহীনই হোক আল্লাহ উভয়েরই যোগ্যতম অভিভাবক। সুতরাং তোমরা ন্যায় বিচার করতে খেয়াল-খুশীর অনুগামী হয়ো না। যদি তোমরা প্যাঁচালো কথা বল অথবা পাশ কেটে চল, তবে (জেনে রাখ) যে, তোমরা যা কর আল্লাহ তার সম্যক খবর রাখেন। (সূরা নিসা ১৩৫ আয়াত)
فَإِن فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ))
অর্থাৎ, (বিবদমান দুই গোষ্ঠী) যদি আত্মসমর্পণ করে, তাহলে তাদের মধ্যে ন্যায়ের সঙ্গে মীমাংসা কর এবং সুবিচার কর। আল্লাহ ন্যায় বিচারকদেরকে ভালোবাসেন। (সূরা হুজুরাত ৯ আয়াত)
((إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤدُّواْ الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا)) (৫৮) سورة النساء
অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমানত তার মালিককে প্রত্যর্পণ করবে। আর যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার-কার্য পরিচালনা করবে তখন ন্যায় পরায়ণতার সাথে বিচার করবে। আল্লাহ তোমাদেরকে যে উপদেশ দেন তা কত উৎকৃষ্ট! নিশ্চয়, আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (সূরা নিসা ৫৮ আয়াত)
মহানবী বলেন, “কাযী (বিচারক) তিন প্রকার। এদের মধ্যে একজন জান্নাতী এবং অপর দু'জন জাহান্নামী। জান্নাতী হল সেই বিচারক যে 'হক' (সত্য) জানল এবং সেই অনুযায়ী বিচার করল। আর যে বিচারক 'হক' জানা সত্ত্বেও অবিচার করল সে জাহান্নামী এবং যে বিচারক না জেনে (বিনা ইলমে) লোকেদের বিচার করল সেও জাহান্নামী।” (আবু দাউদ ৩৫৭৩, তিরমিযী ১৩২২, ইবনে মাজাহ ২৩১৫, সহীহুল জামে' ৪৪৪৬নং)
প্রকাশ থাকে যে, অন্যায়ের সাহায্য অন্যায় দিয়ে, মিথ্যা মামলা সাজিয়ে, মিথ্যা সার্টিফিকেট বা দলীল বানিয়ে, মিথ্যা সাক্ষী ও জাল স্বাক্ষর উপস্থিত করে একজন অপরাধীর সহযোগিতা কোন মুসলিম করতে পারে না।