📄 তহবিল তসরুফ ও পরের ধন আত্মসাৎ
নিজ হস্তগত অথবা আয়ত্তে থাকা পরের কোন জিনিসকে গোপনভাবে নিজের বানিয়ে নেওয়াকে তসরুফ (তাসারুফ) বা আত্মসাৎ করা বলে।
সাধারণতঃ হিসাব রক্ষা অথবা কোন জিনিসের ভাগবন্টনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হলে এই অপরাধ করে বসে বহু তাকব্রিয়াহীন মানুষ। সুযোগই মানুষকে চোর হতে সহযোগিতা করে। আর এই সুযোগের ফলেই লোকচক্ষুর অন্তরালে 'ঘরের পাছে মরাই, গুটি গুটি সরাই' নীতি গ্রহণ করে। অথচ সে জানে না অথবা মানে না যে, মহান আল্লাহ তাকে দেখছেন। এই পর্যায়ের কত শত হারামখোর রয়েছে সমাজে তার কিছু নিম্নরূপঃ-
১। জনসাধারণের নামে সরকারী অনুদান নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের আত্মসাৎ করা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ; বন্যা, ভূমিকম্প, ঘুর্ণিঝড় প্রভৃতির উপদ্রুত এলাকায় সরকারী অনুদান এলে, তা হতে বহু এমন লোক ঐ অনুদান আত্মসাৎ করে, যারা তার হকদার নয়। রাস্তা, ব্রিজ ইত্যাদি নির্মাণের জন্য যে টাকা সরকারের কোষাগার থেকে আসে, তার অনেকটাই নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা কুক্ষিগত করে।
২। কোন জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান (মসজিদ, মাদ্রাসা, এতীমখানা, বায়তুল মাল প্রভৃতি)র ক্যাশিয়ার, খাজাঞ্চী বা কোষাধ্যক্ষ হয়ে অনেক হতভাগা তলায় তলায় তহবিল তসরুফ করে।
৩। কোন ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষক হয়ে অনেকে অর্থভক্ষকের কাজ করে। ভুল হিসাব দিয়ে অথবা নকল ভাউচার বানিয়ে অর্থ কুক্ষিগত করে।
৪। মালিকের বিনা অনুমতিতে অনেক বেতনভোগী কর্মচারী দোকান থেকে বিভিন্ন জিনিস খায় ও বন্ধু-বান্ধবকে খাইয়ে থাকে। এমন খাবারে মালিকের অনুমতি না থাকলে, তা হারাম খাওয়া হবে। মালিকের দোকান থেকে বন্ধুর খাতির নয়, বরং নিজের হিসাবে তা করতে হবে।
৫। মালিক কর্তৃক নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশী দামে মাল বিক্রি করে বাড়তি পয়সা পকেটে ভরে অনেক বেতনভোগী কর্মচারী; অথচ তা হারাম। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৫৮৯পৃঃ)
৬। অনেক বেতনভোগী কর্মচারী দোকানে নিজে অতিরিক্ত মাল গোপনে রেখে ব্যবসা করে আর ওদিকে মালিকের মাল বিক্রয় না হয়ে পড়ে থাকে।
৭। মালিকের বিনা অনুমতিতে 'মাযরাআ' (শস্যক্ষেত বা বাগান) থেকে কিছু খাওয়া বা খাওয়ানোর অভ্যাস আছে অনেক বেতনভোগী কর্মচারীর। অথচ মালিকের অনুমতি ছাড়া একটি ফলও খাওয়া বৈধ নয় মালী বা কর্মচারীর।
৮। সরকারী গাড়ির তেল বিক্রয় করে খায় অনেক সরকারী ড্রাইভার, কয়লা- ইঞ্জিনের কয়লা বিক্রয় করে খায় অনেক পাইলট।
৯। অনেক অফিসার আছেন, যাঁরা নিজের ব্যক্তিগত কাজেও সরকারী গাড়ি, ফোন ইত্যাদি ব্যবহার করেন। তদনুরূপ অনেক কর্মচারী ও হাউস-ড্রাইভার আছে, যারা নিজের কাজে বিনা অনুমতিতে মালিকের গাড়ি ব্যবহার করে। অথচ তা তাদের জন্য বৈধ নয়।
১০। অনেক লেবারেই মাটি কাটার সময় মাটি চুরি করে থাকে। মাঝখানে ও চারিপাশে উঁচু জায়গাটি রেখে চৌকোর মাপ দেয়। তার ফলে যতটা পরিমাপ মাটি তারা কাটেনি, তার থেকে বেশী পরিমাপ দেখিয়ে তার দাম ধরে নেয়। ঐ বেশী পরিমাণের ধরা টাকাটি কিন্তু তাদের জন্য হারাম।
১১। অনেক জেলে আছে, যারা অপরের মাছ ধরার সময় নিজ পরিহিত কাপড়ে অথবা জালে মাছ চুরি করে ভরে রাখে। ঐ মাছ খাওয়া তাদের জন্য হারাম।
১২। আটা বা চালকলের কর্মচারী পরিশেষে কিছু আটা বা চাল মেশিনের ভিতরে লুকিয়ে রেখে চুরি করে। ঐ আটা বা চাল খাওয়া তাদের জন্য হারাম।
১৩। তদনুরূপ ঘানি-ওয়ালা কর্মচারী কিছু তেল ঘানিতে ভরে রেখে তেল চুরি করে। অথচ ঐ তেল খাওয়া তার জন্য বৈধ নয়।
১৪। কিছু হোটেল আছে, যেখানে খরচ দিয়ে খানা পাকানো যায়। কিন্তু সে হোটেল- ওয়ালাদের ভাত-মাংস চুরি করে খাওয়া হারাম।
১৫। কোন কোন জায়গায় কসাইখানায় আছে, যেখানে পশু নিয়ে গিয়ে খরচ দিয়ে গোশু বানিয়ে আনা যায়। সেখানকার কর্মচারী কসাইদের জন্য গোশু চুরি করে রাখা ও পরে তা খাওয়া বা বিক্রি করা হারাম।
১৬। অনেক দর্জি আছে, যারা মাপ নেওয়ার সময় বেশী মাপ ধরে কাপড় চুরি করে। এমন চুরি অবশ্যই হারাম।
১৭। অনেক কামার (কর্মকার) আছে, যাদেরকে কিছু গড়তে লোহা দিলে তা হতে কিছু লোহা চুরি করে। আর সেই লোহা বিক্রি করে অথবা তার দ্বারা অন্য কিছু গড়ে বিক্রি করে হারাম খায়।
১৮। অনেক স্বর্ণকার আছে, যাদেরকে কিছু গড়তে সোনা-রূপা দিলে তা থেকে কিছু অংশ চুরি করে এবং তার জায়গায় খাদ ভরে দিয়ে ওজন পূর্ণ করে। আর তা অথবা তা দিয়ে অন্য কিছু গড়ে বিক্রি করে হারাম খায়।
১৯। লাইব্রেরী বা অফিসের বই, কলম ইত্যাদি নিজের কাজে ব্যবহার করা এক প্রকার চুরি।
২০। আদায়কারীর নয়কে ছয় করে চুরি; ৫০ কে ৫ বানিয়ে অথবা ৫ কেজিকে ৫ টাকা বানিয়ে, মিথ্যা খরচ দেখিয়ে কেটে রাখা টাকা তার জন্য হালাল নয়।
২১। কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস তার মালিক জানা সত্ত্বেও গোপন করে ভক্ষণ হারাম।
২২। চাষ করতে করতে গোপনে জমি নিজের নামে রেকর্ড করে নেওয়া, হকদারের হক মেরে নিজের নামে করা অবশ্যই অবৈধ।
২৩। পশুরক্ষক রাখালের গোপনে কোন পশু বিক্রি করা এবং বাঘের নামে চাপিয়ে দেওয়া নিশ্চয়ই হারাম।
২৪। নাবালকের প্রতিনিধিত্ব করতে করতে তার জমি-জায়গা বা পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্য চাকরী নিজের নামে করে নেওয়া মহা অন্যায়।
২৫। ভাগচাষের ভাগ ঠিকমত না দেওয়া, কুটুরির নিচে রাশ চুরি করা বৈধ নয়।
২৬। মালিকের গাড়ির ভাড়া গোপন করে ভক্ষণ করা হারাম।
২৭। ট্রিপ চুরি করে অতিরিক্ত ট্রিপের ভাড়া নিজের পকেটে ভরা হারাম।
২৮। পার্টনারশিপ ব্যবসায় পার্টনারের টাকা গোপন করে ঠিকমত ভাগ না দেওয়া এবং নিজে বেশী নিয়ে তা খাওয়া হারাম।
২৯। একটি জিনিস কয়েকবার বিক্রি, একটি জমি, জায়গা বা পুকুর কয়েক জনকে বিক্রি করে উধাও হওয়া। পায়রা, গরু, ছাগল প্রভৃতি বিক্রির পর তা বাড়িতে ফিরে এলে ক্রেতাকে খবর না করে পুনরায় অন্য জনকে বিক্রি করা এবং সে টাকা খাওয়া হারাম।
৩০। চাকরিস্থলে যথাকর্তব্য সঠিকভাবে পালন না করা, গাফলতি করা, অফিসে ঘুমানো এক এক প্রকার খেয়ানত। সুতরাং তার ফলেও চাকরির কিছু বেতন হারাম হতে পারে। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৫৫২পৃঃ)
৩১। কর্তব্যে নিজ আত্মীয়, বন্ধু বা পরিচিতকে প্রাধান্য দেওয়া, আইন বাইরে সুযোগ দেওয়া, লাইনে আগে জায়গা দেওয়া, জরুরী কাগজ-পত্র বিনা কিছু দেওয়া ইত্যাদিও খেয়ানত। (ঐ ৫৫১পৃঃ)
৩২। আমানত স্বরূপ রাখা টাকা ব্যবসায় খাটিয়ে লাভ ভোগ করাও বৈধ নয়। যদি কেউ আপনার কাছে কিছু টাকা বা সম্পদ আমানত রাখে, তাহলে তার বিনা অনুমতিতে সেই টাকা বা সম্পদ কোন কাজে লাগাতে পারেন না। প্রয়োজনে ঋণস্বরূপও নিতে পারেন না। কারণ, তা আমানত। আর যার আমানত তার অনুমতি ছাড়া আমানত ব্যবহার করাই হল আমানতের এক প্রকার খেয়ানত। সুতরাং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার মতোয়াল্লী, সেক্রেটারী, ক্যাশিয়ার প্রভৃতি যাঁরা টাকা-পয়সা গচ্ছিত রাখার দায়িত্ব পালন করে থাকেন, তাঁরাও ঐ ফান্ড বা মাল থেকে কিছু ঋণস্বরূপ নিয়েও নিজের কাজে লাগাতে পারেন না। (ফাতাওয়াল বুয়ু' ৬৮পৃঃ) তদনুরূপ কেউ যদি আপনার মাধ্যমে কিছু অর্থ-সম্পদ কোথাও প্রেরণ করে, তাহলে প্রেরণে দেরী করে তার দ্বারা উপকৃত হওয়া আপনার জন্য হারাম। সুতরাং মানি-অর্ডার, হুন্ডি প্রভৃতি এক্সচেঞ্জ কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে সতর্ক হয়ে যথা সময়ে যথাস্থানে অর্থের আমানত পৌঁছে দেওয়া জরুরী।
আমানতে খেয়ানত ছাড়া এর অবৈধতার একটা কারণ এও হতে পারে যে, আমানতদাতা তার নিজ প্রয়োজনে যথাসময়ে আমানত ফিরে পাবে না।
শরীক হঠাৎ মারা গেলে তার শরীকানার কথা গোপন থাকলে তার ওয়ারেসদেরকে তার মাল ফেরৎ না দেওয়া আমানতে খেয়ানত। এ ক্ষেত্রে লাভ সহ শরীকের অর্থ ফেরৎ দেওয়া ওয়াজেব।
অপরের একাউন্টে টাকা রেখে অথবা কাউকে 'নমিনি' করে মারা গেলে তার টাকা গোপন করে নিজে আত্মসাৎ করা বৈধ নয়। বরং যার টাকা তার ওয়ারেসদেরকে ফেরৎ দেওয়া জরুরী।
অনুরূপ স্ত্রীর নামে টাকা জমা রেখে অথবা তাকে 'নমিনি' করে হঠাৎ স্বামী মারা গেলে সেই টাকা গোপন করে স্ত্রীর বগল বাজানো উচিত নয়। বরং তার যা অংশ তা নিয়ে বাকী অর্থ স্বামীর ওয়ারেসদেরকে ফেরৎ দেওয়া জরুরী।
তদনুরূপ বাপ যদি কোন ছেলের নামে টাকা জমা রাখে অথবা কাউকে 'নমিনি' করে মারা যায়, তাহলে কেবল ঐ ছেলের সমস্ত টাকা ভক্ষণ করা বৈধ নয়। বরং গোপন না করে বাপের সকল ওয়ারেসকে ঐ টাকা ভাগ দেওয়া জরুরী।
এই মত কত শত চুরির মাঝে পরের মাল আত্মসাৎ করার পদ্ধতি আছে, তার ইয়ত্তা নেই। চোরের শুধু চৌষট্টি বুদ্ধিই নয়; বরং তার থেকেও বেশী বুদ্ধি আছে তার। ফাল্লাহুল মুস্তাআন।
মহানবী বলেন, “অনেক লোক আছে, যারা আল্লাহর মালে নাহক তসরুফ (তাসারুফ) করে থাকে। তাদের জন্য কিয়ামতে জাহান্নাম অপেক্ষা করছে।” (বুখারী) তিনি আরো বলেন, “তোমাদের মধ্যে যাকে আমরা কোন চাকরী দান করলাম, অতঃপর সে একটি সুচ বা তার থেকে বড় কিছু গোপন (করে আত্মসাৎ) করল, সে আসলে খেয়ানত করল এবং কিয়ামতের দিন সে তা নিয়ে উপস্থিত হবে।” (মুসলিম, আবু দাউদ, সহীহুল জামে' ৬০২৪নং)
📄 (৫) জালিয়াতির কামাই
কৃত্রিম বা নকল দলীল, সার্টিফিকেট, ভাউচার প্রভৃতি বানিয়ে জালিয়াতি করে অর্থ উপার্জন হারাম এবং তা ভক্ষণ করলে হারাম ভক্ষণ করা হয়। যেহেতু তাতে অপর পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রকৃত হকদার নিজ হক থেকে বঞ্চিত হয়। দুঃখের বিষয় যে, এমন জাল-জুয়াচুরি করে খাওয়ার লোকও সমাজে বর্তমান।
১। মাদ্রাসার সদকাহ-যাকাত আদায়কারীর আদায় করতে গিয়ে ৫০ টাকাকে ৫ টাকা অথবা ৫ কেজিকে ৫ টাকা করে খাবার মত লোক যদি যাকাত খাওয়ার হকদার না হয়, তাহলে ডবল হারাম খায়; চুরি ও যাকাত।
২। দলীল নকল করে পরের জমি-জায়গা জবর-দখল করে চাষ-বাস করা জালিয়াতি করে খাওয়ার শামিল।
৩। নকল সার্টিফিকেট বানিয়ে 'শো' করে চাকরি নেওয়া বৈধ নয়। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৬১৭পৃঃ)
৪। বৈধ নয় নকল সার্টিফিকেট বানিয়ে নিজ আত্মীয়কে মর্যাদায় উচ্চ করে স্কলারশিপ দিয়ে বিদেশ পাঠানো এবং আসল হকদার ও যোগ্য ছাত্রকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানো।
৫। অপরকে নিজের নামে পরীক্ষায় বসিয়ে পাশ করে সার্টিফিকেট অর্জন করে তার মাধ্যমে চাকরি নেওয়া বৈধ নয়।
৬। পরীক্ষায় চিট (নকল) করে পাস করে সার্টিফিকেট অর্জন করে তার মাধ্যমে চাকরি নেওয়া বৈধ নয়। কোন শিক্ষকের জন্যও বৈধ নয় নকল করা দেখে চুপ থাকা।
৭। অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে ইন্টারভিউ-এ বসিয়ে চাকরি নেওয়া বৈধ নয়। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৬/১৬পৃঃ)
৮। অনেক সময় স্কুল-কলেজ বা মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে এক একটি বিষয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ বা বই লিখতে আদেশ করা হয়। অনেকে তা নিজে লিখতে না পেরে অর্থের বিনিময়ে অপরের নিকট থেকে লিখিয়ে নেয়। যারা লিখে দেয়, তারা ঐ ছাত্রদের ক্ষতি করে এবং কর্তৃপক্ষকে ধোকা দেয়। আর তার জন্যই এটিও অন্যায় কাজে সহযোগিতার শামিল। সুতরাং তাদের ঐ অর্থ হালাল নয়।
৯। স্কুল বা মাদ্রাসার অর্গানাইজ করতে গিয়ে পুরনো ১০ বছরের হাজরীর নকল খাতা তৈরী করে তা 'শো' করে সরকারকে ধোকা দিয়ে স্কুল বা মাদ্রাসা অনুমোদন করা ও তাতে চাকরি নেওয়া হারাম।
১০। প্রতিষ্ঠানের বা মালিকের মাল কিনতে গিয়ে রশিদে বেশী লিখিয়ে কম অর্থ দিয়ে বাকী নিজে মারা হারাম।
১১। কর্মবিষয়ে দুর্ঘটনা ঘটলে, তার চিকিৎসার দায়িত্ব কোম্পানী নিয়ে থাকে, গাড়ি দুর্ঘটনাগ্রস্ত হলে তার খরচ কোম্পানী বহন করে থাকে। কিন্তু কারো যদি কর্মের বাইরে দুর্ঘটনা ঘটে এবং কর্মের ভিতরে বলে চালিয়ে দেয়। আর সেই সাথে খরচ নেয় কোম্পানীর কাছে, তাহলে তা হারাম। (ঐ ৫৫৯পৃঃ)
১২। দুই জায়গা বা দুই সময়ের কর্মদায়িত্ব নিয়ে চুক্তি করে, তা যথার্থরূপে পালন না করে পূর্ণ বেতন খাওয়া হারাম। (ঐ ৫৫৮পৃঃ)
১৩। দুই মালিক বা কোম্পানীর কাজ নিয়ে একের কাজ অন্যের ডিউটিতে করা হারাম। (ঐ ৫৫৭-৫৫৮পৃঃ)
১৪। ডিউটিতে দেরী করে এসে সময় পিছিয়ে সাইন করা এবং আগে বেরিয়ে গিয়ে ঠিক সময় লিখে সাইন করা হারাম। তাতে কিছু বেতন হারাম হবে। অবশ্য ১০/১৫ মিনিট আগে বেরিয়ে যাওয়ার অনুমতি থাকলে ভিন্ন কথা। (ঐ ৫৫৬পৃঃ)
আল্লাহর রসূল বলেন, "যে আমাদেরকে ধোকা দেয় সে আমার দলভুক্ত নয়।” (মুসলিম ১০২, ইবনে মাজাহ ২২২৪, তিরমিযী ১৩১৫, আবু দাউদ ৩৪৫২নং)
তিনি আরো বলেন, "যে ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয় এবং যে (মানুষকে) ধোকা দেয়, সেও আমাদের দলভুক্ত নয়।” (মুসলিম ১০১নং)
তিনি আরো বলেন, "যে ব্যক্তি আমাদেরকে ধোকা দেয় সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। ধোকা ও চালবাজ জাহান্নামে যাবে।” (ত্বাবারানীর কাবীর ও সাগীর, ইবনে হিব্বান ৫৫৩৩, সহীহুল জামে' ৬৪০৮ নং)
প্রকাশ থাকে যে, নকল পাশপোর্ট-ভিসা করে বিদেশ এসে উপার্জন করা টাকা হারাম নয়। যেমন অনুরূপভাবে সফর করে হজ্জ করলে হজ্জ অশুদ্ধ নয়। অবশ্য পাশপোর্ট- ভিসা নকল করার জন্য সে গোনাহগার হবে।
প্রকাশ থাকে যে, কাস্টম ফাঁকি দিয়ে ব্যবসা বা শুল্কাদি ফাঁকি দিয়ে (বেআইনী) চোরাকারবার বৈধ নয়。
📄 (৬) ধোকা ও ফাঁকি দিয়ে অর্থ সঞ্চয়
মানুষকে ধোকা দেওয়া হারাম ইসলামে। যারা অপরকে ধোকা দিয়ে বোকা বানিয়ে ঠকিয়ে পয়সা রোযগার করে, তাদের রোযগার হালাল নয়। মানুষকে নানান প্রবঞ্চনায় ফেলে তার নিকট থেকে অর্থ লুটে যে চালাক ও ধরিবাজ মানুষ, সে আসলে একজন হারামখোর।
একদা আল্লাহর রসূল (বাজারে) এক রাশীকৃত খাদ্য (শস্যের) কাছে গিয়ে তার ভিতরে হাত প্রবেশ করালেন। তিনি আঙ্গুল দ্বারা অনুভব করলেন যে, ভিতরের শস্য ভিজে আছে। বললেন, "ওহে ব্যাপারী! এ কি ব্যাপার?" ব্যাপারী বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! বৃষ্টিতে ভিজে গেছে।' তিনি বললেন, "ভিজেগুলোকে শস্যের উপরে রাখলে না কেন, যাতে লোকে দেখতে পেত? যে আমাদেরকে ধোকা দেয় সে আমার দলভুক্ত নয়।” (মুসলিম ১০২, ইবনে মাজাহ ২২২৪, তিরমিযী ১৩১৫, আবু দাউদ ৩৪৫২নং)
প্রিয় নবী বলেছেন, "যে ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয় এবং যে (মানুষকে) ধোকা দেয়, সেও আমাদের দলভুক্ত নয়।” (মুসলিম ১০১নং)
আল্লাহর রসূল বলেন, "যে ব্যক্তি আমাদেরকে ধোকা দেয় সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। ধোকা ও চালবাজ জাহান্নামে যাবে।” (ত্বাবারানীর কাবীর ও সাগীর, ইবনে হিব্বান ৫৫৩৩, সহীহুল জামে' ৬৪০৮ নং)
মহানবী বলেন, “তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত (পূর্ণ) মুমিন হতে পারে না; যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার (মুসলিম) ভায়ের জন্য সেই জিনিস পছন্দ করেছে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।” (বুখারী ১৩, মুসলিম ৪৫, ইবনে হিব্বান ২৩৫নং)
তিনি আরো বলেন, “দ্বীন হল হিতাকাঙ্ক্ষার নাম।" আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, 'কার জন্য হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "আল্লাহ, তাঁর কিতাব, তাঁর রসূল, মুসলিমদের নেতৃবর্গ এবং তাদের জনসাধারণের জন্য।” (মুসলিম ৫৫নং)
তিনি আরো বলেন, "মুসলিম মুসলিমের ভাই। কোন মুসলিমের জন্য বৈধ নয় যে, সে তার ভাইকে কোন জিনিস বিক্রয় করার সময় তার কোন ত্রুটি বয়ান না করে (গোপন করে রাখে)।” (ইবনে মাজাহ, সহীহুল জামে' ৬৭০৫নং)
আল্লাহর রসূল বলেন, “(বিক্রয়-স্থল হতে) ক্রেতা-বিক্রেতা পৃথক না হওয়া পর্যন্ত (উক্ত ক্রয়-বিক্রয়ে) উভয়ের এখতিয়ার রয়েছে। সুতরাং যদি উভয়ে (ক্রয়-বিক্রয়ে) সত্য বলে ও (পণদ্রব্যের দোষ-গুণ) প্রকাশ করে বলে, তাহলে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে বর্কত লাভ হয়। অন্যথা যদি তারা মিথ্যা বলে ও (পণ্যদ্রব্যের দোষ-গুণ) গোপন করে, তাহলে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের বর্কত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।” (বুখারী ২০৭৯ নং, মুসলিম ১৫৩২ নং)
উক্ত বিধানের পরিপ্রেক্ষিতে প্রচলিত নিম্নের কারবার দ্বারা অর্থোপার্জন হারাম উপার্জন:-
ভেজাল দিয়ে কোন জিনিস বিক্রয়। ওষুধে ভেজাল, দুধে পানির ভেজাল, ধানে ধুলোর ভেজাল, ধানে পানি বা ভিজে তুষ মিশিয়ে ওজন বাড়িয়ে বিক্রয়, শাকে পানি দিয়ে ওজন বৃদ্ধি করে বিক্রয়। আটাতে কম দামী কোন শস্যের আটা মিশিয়ে বিক্রয়। খেজুর গুড়ের সাথে আখের গুড় মিশিয়ে বিক্রয়। তেলে অন্য সস্তা তেল ভেজাল দিয়ে বিক্রয়। আতরে তেল মিশিয়ে বিক্রয়। কাঁসা-পিতল বা সোনা-রূপায় অন্য ধাতুর খাদ মিশিয়ে বিক্রয়।
ফলের কার্টুনে উপরে ভালো এবং নিচে খারাপ ভরে বিক্রয়। শস্যের উপর ভাগে ভালো এবং নিচের ভাগে খারাপ ভরে বিক্রয়।
ভুয়া ডিস্কাউন্টের লোভ দেখিয়ে, দাম বাড়িয়ে বলে বা লিখে পরে মোটা টাকা কম করা।
কম দাম বলে খাইয়ে টেষ্ট করিয়ে নেওয়ার পর জোর করে বেশী দাম নেওয়া।
ভালো জিনিস টেষ্ট করিয়ে খারাপ জিনিস বিক্রয় করা। যেমন মিষ্ট আম, তরমুজ প্রভৃতি টেষ্ট করিয়ে অমিষ্ট বিক্রয় করা। ভালো জিনিসের নমুনা দেখিয়ে খারাপ জিনিস প্যাকেটে দেওয়া।
এক সেন্টের নমুনা শুঁকিয়ে অন্য খারাপ সেন্ট বিক্রয় করা।
গিফটের লোভ দেখিয়ে মাল বিক্রয় করা, মালের ভিতরে নগদ টাকা বা সোনা আছে এই লোভ দেখিয়ে ক্রেতা আকৃষ্ট করা। এতে অনেক সময় অনেকে ১০ টাকার সস্তা উট কিনতে গিয়ে তার সাথে ১০ হাজার টাকার বিড়ালটা কিনতে বাধ্য হয়।
যবেহর পর রক্ত বন্ধ করে গোশ্ত লাল করে বিক্রয়, খাসির মাথা দেখিয়ে মাদির গোশু বিক্রয়, বাঁঝ গায়ের মাথা দেখিয়ে বুড়ো গরুর মাংস বিক্রয়।
কয়েক দিন দুধ না দুইয়ে হঠাৎ দুইয়ে অনেক দুধ দেখিয়ে চড়া দামে গাভী বিক্রয়।
নিস্তেজ গরুর নাকে দুর্গন্ধময় কোন জিনিস দিয়ে সতেজ স্ফূর্তিময় দেখিয়ে তা বিক্রয়।
বিদেশী লেবেলে দেশী জিনিস অথবা উচ্চ মানের পণ্যের প্যাকেটে নিম্ন মানের পণ্য ভরে বিক্রয়।
উচ্চমানের চালু পণ্যের কাছাকাছি নাম দিয়ে নিম্নমানের পণ্য বিক্রয়।
পুরাতন মালের উপর রঙ চড়িয়ে নতুন বলে বিক্রয়।
ক্রেতাদের যৌথ ফন্দিতে নিলামের মাল কম দামে ক্রয়।
বাজারের বাইরে কোন লোক পণ্য আনলে বিক্রেতা-কমিটির কৌশলে একজন ছাড়া অন্য কেউ সেই পণ্যের দাম-দর না করে (দাম না বাড়িয়ে বিক্রেতাকে বাধ্য করে) কেবল তাদের মধ্যে একজন কম দামে তা ক্রয় করে পরে সকলের সেই পণ্যে শরীক হওয়া।
পণ্যের ঝুটা দোষ বর্ণনা করে বিক্রেতার কাছ থেকে ক্রেতা ভাঙ্গিয়ে নিজে তা ক্রয় করা।
মিথ্যা ওষুধ বানিয়ে বিক্রয় করা, ভুয়া চিকিৎসা করে পয়সা নেওয়া, মিথ্যা জিনের ভয় দেখিয়ে, বেবর্কতি বা বেরোযগারির ভয় দেখিয়ে, বালা-মসীবত আসার ভয় দেখিয়ে দুআ-তাবীয করে অর্থ উপার্জন।
আন্দাজে গায়বী খবর বলে, হাত গণনা করে, ফালনামা খুলে চিকিৎসা করে পয়সা কামাই।
ট্রেনে-বাসে টিকিট না কেটে ফাঁকি দিয়ে বিনা পয়সায় যাতায়াত করে বাঁচানো অর্থ।
ওভার টাইম, খাওয়া ফ্রি ইত্যাদির লোভ দেখিয়ে ভিসা ব্যবসা।
অনেক চাকরিজীবী মানুষ আছে যারা ডিউটিতে ফাঁকি দিয়ে পয়সা কামাই করে। চাকুরিস্থলে এসে সাইন করে নিজের কাজ করে অথবা অন্য কারো ওভার টাইম করে। এরা আসলে আমানতের খেয়ানত করে, কর্তৃপক্ষকে ধোকা দেয়; ফলে তাদের বেতন হারাম।
একটি লোকের বেতন যদি ২৪০০ টাকা হয় এবং চাকুরির ডিউটি হয় মোট ৮ ঘন্টা, তাহলে সে (ছুটি বা অনুমতি না নিয়ে) মাসে একদিন ফাঁকি দিলে বা কামাই করলে ৮০ টাকা তার হারাম ঢোকে এবং এক ঘন্টা কাজে ফাঁকি দিলে ১০ টাকা হারাম তার পকেটে অনুপ্রবেশ করে।
কাজ ফেলে রেখে পেপার পড়তে থাকা অথবা অন্য কোন খেলা বা কাজে ব্যস্ত হওয়া এবং লোকের আজকের কাজকে কালকের জন্য পিছিয়ে দেওয়া অবশ্যই বৈধ নয়।
প্রকাশ থাকে যে, চাকুরিস্থলে কাজ বাদ দিয়ে কুরআন পড়াও বৈধ নয়। যেহেতু যার জন্য আপনি বেতন নিচ্ছেন, তা পালন করা আপনার জন্য ওয়াজেব। আর কুরআন পড়া আপনার জন্য নফল। সুতরাং ওয়াজেব ছেড়ে নফল পালন করলে গোনাহগার হতে হয় এবং পকেটে হারামও অনুপ্রবেশ করে।
তদনুরূপ মাদ্রাসার মুদার্রেসী বা মসজিদের ইমামতির কর্তব্য বাদ দিয়ে ছুটি না নিয়ে দাওয়াত ও তবলীগের মত ভালো কাজও করা বৈধ নয়। কারণ বেতনভোগী যে কাজে বেতন নেয়, তা পালন করা ফরয। পক্ষান্তরে নিজের সাংসারিক কাজ অথবা অন্য কোন দ্বীনের কাজ করার জন্য কর্তৃপক্ষের নিকট হতে অনুমতি জরুরী।
যেমন নিজের কর্তব্য উপেক্ষা করে হজ্জ-উমরা পালন করতে যাওয়াও বৈধ নয়। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ১৩/৬৭)
সঠিক ভাড়া বা বেতন না দিয়ে অর্থ কামাই। মালিককে দোকানের ভাড়া না দিয়ে দোকানদারির অর্থ হারাম।
তদনুরূপ যারা চুক্তির বাইরে লেবারকে অতিরিক্ত ডিউটি বা কাজ করিয়ে নেয়, তাদেরও অর্থে হারাম প্রবেশ করে।
মহানবী বলেন, "আল্লাহর নিকট সব চাইতে বড় পাপিষ্ঠ সেই ব্যক্তি, যে কোন মহিলাকে বিবাহ করে, অতঃপর তার নিকট থেকে মজা লুটে নিয়ে তাকে তালাক দেয় এবং তার মোহরও আত্মসাৎ করে। (দ্বিতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে কোন লোককে মজুর খাটায়, অতঃপর তার মজুরী আত্মসাৎ করে এবং (তৃতীয় হল) সেই ব্যক্তি, যে খামাকা পশু হত্যা করে।” (হাকেম, বাইহাকী, সহীহুল জামে' ১৫৬৭ নং)
রাহমাতুল লিল-আ'লামীন বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, "কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির প্রতিবাদী হব; তন্মধ্যে প্রথম হল সেই ব্যক্তি, যে আমার নামে কিছু দেওয়ার প্রতিশ্রুতি করল অতঃপর তা ভঙ্গ করল। দ্বিতীয় হল সেই ব্যক্তি, যে কোন স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রয় করে তার মূল্য ভক্ষণ করল। আর তৃতীয় হল সেই ব্যক্তি, যে কোন মজুর খাটিয়ে তার নিকট থেকে পুরোপুরি কাজ নিল অথচ সে তার মজুরী (পূর্ণরূপে) আদায় করল না।” (বুখারী ২২২৭,২২৭০নং)
তিনি আরো বলেন, "মজুরকে তার ঘাম শুকাবার পূর্বে তোমরা তার মজুরী দিয়ে দাও।” (সহীহুল জামে' ১০৫৫নং)
সুতরাং সেই কাজের মালিক সম্বন্ধে আপনার ধারণা কি যার নিকট বেতন চাইতে গেলে বলে, 'পরে পরে।' কর্মচারী যদি বলে, 'খাব কি?' বলে, 'মাটি খা।' বলে, 'আমার স্ত্রী বা মায়ের অসুখ, টাকার দরকার।' বলে, 'মরুক সে!' এতে কি সেই মালিকের প্রতি গরীব মানুষের ঘৃণা ও হিংসা সৃষ্টি হবে না? এই মযলুম মানুষদের বদ্দুআ কি ঐ মালিকের সর্বনাশ ডেকে আনবে না?
গাড়ি, ঘড়ি, টেপ, টিভি, কম্পিউটার, মোবাইল, এসি, ফ্রিজ প্রভৃতির মেকানিক্যাল কাজে ৫ টাকার কাজে ৫০ টাকা নেওয়া। পার্টস চেঞ্জ না করে পার্টসের দাম নেওয়া, 'সময়ের দরকার আছে ও মেহনতের কাজ আছে' বলে ভাঁওতা দিয়ে মেকানিকদের তার জুড়ে অথবা এদিক-সেদিক করে মোটা পয়সা নেওয়া, নিজের পার্টস বিক্রয়ের জন্য খারাপ পার্টস না সেরে পরিবর্তন করা, ভালো পার্টস খুলে নিয়ে চলার মত লাগিয়ে দেওয়া ইত্যাদি হারাম।
ঠিকেদারির কাজে ফাঁকি, প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্র না দিয়ে অল্পে কাজ সেরে বাঁচানো এবং প্রয়োজনীয় সময় না দিয়ে অল্প সময়ে কাজ সেরে বাঁচানো পয়সা হারাম পয়সা।
বড় আশ্চর্যের কথা যে, একদা ইন্টারনেটে ঘোষণা দেওয়া হল, অল্প দিনের ভিতরে যাঁরা মিলিয়ন ডলার উপার্জন করে মিলিওনিয়ার কিভাবে হওয়া যায় তা জানতে চায়, তারা নিম্নের ঠিকানায় মাত্র এক ডলার পাঠিয়ে সত্বর জেনে নিন। কিছু দিনের ভিতরে প্রায় মিলিয়ন জন মানুষ সেই ঠিকানায় ডলার পাঠায়। পরিশেষে ইন্টারনেটে জবাব আসে, 'এইভাবে!'
বলা বাহুল্য, চাকরী দেওয়ার লোভ দেখিয়ে, বিয়ে দেওয়ার কথা দিয়ে বা অন্য প্রকার ধোকা দিয়ে পরের অর্থ লুটা হারাম হওয়ার ব্যাপারে কি সন্দেহ থাকতে পারে?
পরিশেষে ফাঁকিবাজদেরকে একটি সত্বর শাস্তির প্রচলিত কথা মনে করিয়ে সতর্ক করে দিই,
'ফাঁকি দিলে ফাঁকে পড়ে, মারা পয়সা যায় ডাক্তার ঘরে।'
📄 দাঁড়ি মেরে জিনিস বিক্রয়
ইসলাম আমাদেরকে দাঁড়ি মেরে জিনিস বিক্রয় করতে নিষেধ করেছে। যারা এ ধোকাবাজির কাজ করে, কুরআন কারীমে তাদেরকে ভীতি-প্রদর্শন ও সতর্ক করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُواْ عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ (3) وَإِذَا كَالُوهُمْ أَو وَزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ (3) أَلَا يَظُنُّ أُوْلَئِكَ أَنَّهُم مَّبْعُوثُونَ ) لِيَوْمٍ عَظِيمٍ (4) يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ ﴾ (المطففين ١-٦)
অর্থাৎ, দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়; যারা লোকের নিকট হতে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় নেয় এবং যখন তাদেরকে (কিছু) মেপে বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে। সে মহান দিবসে; যেদিন সমস্ত মানুষ সারা জগতের প্রতিপালকের সামনে খাড়া হবে। (সূরা মুত্বাফফিফীন ১-৬ আয়াত)
ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ স্রষ্টা মানুষের জন্য "আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং স্থাপন করেছেন তুলাদন্ড। যাতে তোমরা সীমালংঘন না কর। ওজনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠা কর এবং ওজনে কম না দাও।” (সূরা রহমান ৭-৯ আয়াত)
মহান আল্লাহ আরো বলেন, ج وَأَوْفُوا الْكَيْلَ إِذَا كِلْتُمْ وَزِنُوا الْمُسْتَقِيمِ بِالْقِسْطَاسِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا )
অর্থাৎ, মেপে দেওয়ার সময় পূর্ণমাপে দাও এবং ওজন কর সঠিক দাঁড়িপাল্লায়, এটাই উত্তম ও পরিণামে উৎকৃষ্ট। (সূরা ইসরা ৩৫ আয়াত)
পৃথিবীর আইকাহ ও মাদইয়ান শহরে এক জাতি ছিল; যে জাতি এই প্রকার নিকৃষ্ট কাজে ব্যাপক আকারে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। মহান আল্লাহ সেই জাতির মাঝে নবী শুআইব-কে প্রেরণ করলেন। কিন্তু তারা নবীর কথা প্রত্যাখ্যান করে তাদের সেই হীন আচরণ চালিয়ে যেতে লাগল। নবী তাদেরকে বুঝাতে লাগলেন, "তোমরা ওজন ও মাপ পূর্ণ মাত্রায় দাও। সঠিক মাপযন্ত্র দিয়ে মাপ-ওজন কর। লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিয়ে তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করো না এবং পৃথিবীতে ঝগড়া-ফাসাদ ও বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।”
কিন্তু তারা আপোসে বলল, "আমরা যদি শুআইবের কথা মেনে নিই, তাহলে অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হব।” তারা নবীকে বলল, "আমরা নিজেদের মধ্যে তোমাকে দুর্বল দেখছি। যদি তোমার স্বজনবর্গ না থাকত, তাহলে আমরা তোমাকে প্রস্তরাঘাতে চূর্ণ করে ফেলতাম। আর আমাদের নিকট তোমার কোন মর্যাদা নেই।” মোট কথা তারা নবীকে মিথ্যায়ন করল এবং তাঁর বিরুদ্ধে নানা সমালোচনা ও ষড়যন্ত্র শুরু করল। পরিশেষে মহান আল্লাহ বিকট গর্জন ও ভূ-কম্পন দিয়ে তাদেরকে ধ্বংস করলেন। (সূরা আ'রাফ ৮৫-৯৩, সূরা হূদ ৮৪-৯৫, সূরা শুআরা ১৭৬-১৯০ আয়াত)
সে কাজ করলে তার সত্বর শাস্তির কথাও ঘোষণা করা হয়েছে:-
আল্লাহর রসূল বলেন, "---- যে জাতি দাঁড়ি-মারা শুরু করবে, সে জাতি ফসল থেকে বঞ্চিত হবে এবং দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হবে।” (ত্বাবারানীর কাবীর, সহীহ তারগীব ৭৬০নং)
তিনি আরো বলেন, "--- যে জাতিই মাপ ও ওজনে কম দেবে, সে জাতিই দুর্ভিক্ষ, কঠিন খাদ্য-সংকট এবং শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারের শিকার হবে।” (বাইহাকী, ইবনে মাজাহ ৪০১৯নং, সহীহ তারগীব ৭৫৯নং)
দাঁড়ি মারারও বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে হারামখোরদের; যেমন পাল্লা হিলিয়ে ওজনে কম দেওয়া। কাঁটা অথবা বাটখারা কমিয়ে রাখা অথবা যে পাল্লায় জিনিস রাখা হয়, সেই পাল্লার নিচে এমন ভারী জিনিস রাখা; যাতে ধরা পড়লে সহজে তা সরিয়ে ফেলা যায়। চোখে ধুলো দিয়ে দাঁড়ি মারা বা জিনিস পাল্টে দেওয়া। যুবতীদের নিজ ইজ্জত দেখিয়ে ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করে দাঁড়ি মারা। পায়ের দিকে অথবা অন্য কোন দিকে ইঙ্গিত করে ক্রেতার দৃষ্টি ফিরিয়ে দাঁড়ি মারা বা জিনিস পাল্টে দেওয়া।