📄 (৩) অবৈধ কাজে সহায়তা করে ব্যবসা
ইসলামের একটি নীতিগত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এই যে, যা হারাম, তার ব্যবসা হারাম; যা খাওয়া ও ব্যবহার করা হারাম তার ব্যবসা করা হারাম। যেহেতু সেই হারাম বস্তু নিজে ভক্ষণ না করলেও অপরকে ভক্ষণ করতে সাহায্য করা হয়। অথচ মহান আল্লাহ বলেন,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبَرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ )
অর্থাৎ, তোমরা সৎকার্য ও আল্লাহভীতির ব্যাপারে একে অপরকে সাহায্য কর এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা। (সূরা মাইদাহ ২ আয়াত)
বলা বাহুল্য, এটি একটি চিরন্তন নীতি, আর তা হল এই যে, ন্যায় ও সওয়াবের কাজে সহযোগিতা করতে হবে এবং অন্যায় ও গোনাহর কাজে কোন প্রকার সহযোগিতা করা যাবে না। অর্থাৎ, ন্যায় ও সওয়াবের কাজে সহযোগিতা করলে সওয়াব হবে এবং অন্যায় ও গোনাহর কাজে কোন প্রকার সহযোগিতা করলে গোনাহ হবে।
সুতরাং উক্ত বিধানের পরিপ্রেক্ষিতে প্রচলিত যে সকল ব্যবসা ও উপার্জন হারাম তার কিছু নিম্নরূপঃ-
📄 (৪) আমানতে খেয়ানত করে উপার্জন
আমানত নষ্ট করা বা আমানতে খেয়ানত করা মুসলিমদের আচরণ নয়; বরং এ আচরণ মুনাফিকদের। মুসলিম বা মুমিনদের আচরণ সম্বন্ধে মহান আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ هُمْ لأَ مَنَتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ ))
অর্থাৎ, (সফলকাম মু'মিন তারা) যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। (সূরা মু'মিনুন ৮, সূরা মাআরিজ ৩২ আয়াত)
আমানত রক্ষার ব্যাপারে মহান আল্লাহর ঘোষণা হল,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا (5)
অর্থাৎ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমানত তার মালিককে প্রত্যর্পণ কর এবং তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচার কর, তখন ন্যায় বিচার কর। অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে উত্তম উপদেশ দান করেন, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা। (সূরা নিসা ৫৮ আয়াত)
فَإِنْ أَمِنَ بَعْضُكُم بَعْضًا فَلْيُؤَدِ الَّذِي اؤْتُمِنَ أَمَنَتَهُ، وَلْيَتَّقِ اللَّهَ رَبَّهُ وَلَا تَكْتُمُوا الشَّهَادَةَ وَمَن يَكْتُمْهَا فَإِنَّهُ وَاثِمٌ قَلْبُهُ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ )
অর্থাৎ, ---অনন্তর যদি তোমাদের একে অন্যকে বিশ্বাস করে, তাহলে যাকে বিশ্বাস করা হয় তার উচিত, অন্যের গচ্ছিত (প্রাপ্য) প্রত্যর্পণ করা এবং স্বীয় প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করা ও সাক্ষী গোপন না করা। আর যে কেউ তা (সাক্ষ্য) গোপন করবে, তার অন্তর পাপপূর্ণ হবে। তোমরা যা কর সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত। (সূরা বাক্বারাহ ২৮৩ আয়াত)
يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَخُونُواْ اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَنَتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ )
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা জেনে-শুনে আল্লাহ ও রসূলের সাথে বিশ্বাসভঙ্গ করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানত (গচ্ছিত দ্রব্যের) খেয়ানত করো না। (সূরা আনফাল ২৭ আয়াত)
আমানতে খেয়ানত করে কেউ পরিত্রাণ পেয়ে যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন,
(( وَمَن يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ))
অর্থাৎ, যে কেউ আত্মসাৎ করবে সে তার আত্মসাৎ করা (মাল) সহ কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তি যা অর্জন করেছে তা পূর্ণরূপে প্রদত্ত হবে এবং তাদের প্রতি অন্যায় করা হবে না। (সূরা আলে ইমরান ১৬১ আয়াত)
মহানবী বলেন, "তোমার কাছে যে আমানত রেখেছে, তা তাকে প্রত্যর্পণ কর এবং যে তোমার খেয়ানত করেছে, তার খেয়ানত করো না।” (সিলসিলাহ সহীহাহ ৪২৩নং)
আমানতে খেয়ানত করা হল মুনাফিকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ও গুণ। নবী করীম বলেন, 'মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি; কথা বললে মিথ্যা বলে, প্রতিশ্রুতি দিলে ভঙ্গ করে এবং আমানত রাখলে খেয়ানত করে।” (বুখারী, মুসলিম)
আল্লাহর রসূল প্রায় খুতবাতে বলতেন, "যার আমানতদারী নেই, তার ঈমান নেই। আর যে অঙ্গীকার পালন করে না, তার দ্বীন নেই।” (আহমদ, বাইহাকী, সহীহুল জামে' ৭১৭৯নং)
উবাদাহ বিন সামেত হতে বর্ণিত, আল্লাহর রসূল যখন তাঁকে (যাকাত) সদকাহ আদায় করার জন্য প্রেরণ করলেন, তখন বললেন, "হে আবু অলীদ! তুমি আল্লাহকে ভয় কর। তুমি যেন কিয়ামতের দিন (নিজ ঘাড়ে) কোন চিঁহি-রববিশিষ্ট উট, অথবা হাম্বা-রববিশিষ্ট গাই অথবা মে-মে রববিশিষ্ট ছাগল বহন করা অবস্থায় উপস্থিত হয়ো না। (উবাদাহ) বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! ব্যাপার কি সত্যই তাই?' বললেন, "হ্যাঁ, তাই। সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে।” (উবাদাহ) বললেন, 'তাহলে সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যের সাথে প্রেরণ করেছেন! আমি আপনার (বাইতুল মালের) কোন ব্যাপারে কখনো চাকুরী করব না।' (ত্বাবারানীর কাবীর, সহীহ তারগীব ৭৭৫নং)
আল্লাহর রসূল বলেন, "তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব-বিষয়ে (কিয়ামতে) কৈফিয়ত করা হবে। ইমাম (রাষ্ট্রনায়ক তার রাষ্ট্রের) একজন দায়িত্বশীল, সে তার দায়িত্ব-সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। পুরুষ তার পরিবারে দায়িত্বশীল, সে তার দায়িত্ব-বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। মহিলা তার স্বামী-গৃহের দায়িত্বশীলা, সে তার দায়িত্ব-বিষয়ে জিজ্ঞাসিতা হবে। চাকর তার মুনিবের অর্থের দায়িত্বশীল, সে তার দায়িত্ব-বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। তোমাদের প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব-বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে।” (বুখারী ৮৯৩, ৫১৮৮ প্রভৃতি, মুসলিম ১৮২৯নং)
📄 তহবিল তসরুফ ও পরের ধন আত্মসাৎ
নিজ হস্তগত অথবা আয়ত্তে থাকা পরের কোন জিনিসকে গোপনভাবে নিজের বানিয়ে নেওয়াকে তসরুফ (তাসারুফ) বা আত্মসাৎ করা বলে।
সাধারণতঃ হিসাব রক্ষা অথবা কোন জিনিসের ভাগবন্টনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হলে এই অপরাধ করে বসে বহু তাকব্রিয়াহীন মানুষ। সুযোগই মানুষকে চোর হতে সহযোগিতা করে। আর এই সুযোগের ফলেই লোকচক্ষুর অন্তরালে 'ঘরের পাছে মরাই, গুটি গুটি সরাই' নীতি গ্রহণ করে। অথচ সে জানে না অথবা মানে না যে, মহান আল্লাহ তাকে দেখছেন। এই পর্যায়ের কত শত হারামখোর রয়েছে সমাজে তার কিছু নিম্নরূপঃ-
১। জনসাধারণের নামে সরকারী অনুদান নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের আত্মসাৎ করা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ; বন্যা, ভূমিকম্প, ঘুর্ণিঝড় প্রভৃতির উপদ্রুত এলাকায় সরকারী অনুদান এলে, তা হতে বহু এমন লোক ঐ অনুদান আত্মসাৎ করে, যারা তার হকদার নয়। রাস্তা, ব্রিজ ইত্যাদি নির্মাণের জন্য যে টাকা সরকারের কোষাগার থেকে আসে, তার অনেকটাই নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা কুক্ষিগত করে।
২। কোন জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান (মসজিদ, মাদ্রাসা, এতীমখানা, বায়তুল মাল প্রভৃতি)র ক্যাশিয়ার, খাজাঞ্চী বা কোষাধ্যক্ষ হয়ে অনেক হতভাগা তলায় তলায় তহবিল তসরুফ করে।
৩। কোন ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষক হয়ে অনেকে অর্থভক্ষকের কাজ করে। ভুল হিসাব দিয়ে অথবা নকল ভাউচার বানিয়ে অর্থ কুক্ষিগত করে।
৪। মালিকের বিনা অনুমতিতে অনেক বেতনভোগী কর্মচারী দোকান থেকে বিভিন্ন জিনিস খায় ও বন্ধু-বান্ধবকে খাইয়ে থাকে। এমন খাবারে মালিকের অনুমতি না থাকলে, তা হারাম খাওয়া হবে। মালিকের দোকান থেকে বন্ধুর খাতির নয়, বরং নিজের হিসাবে তা করতে হবে।
৫। মালিক কর্তৃক নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশী দামে মাল বিক্রি করে বাড়তি পয়সা পকেটে ভরে অনেক বেতনভোগী কর্মচারী; অথচ তা হারাম। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৫৮৯পৃঃ)
৬। অনেক বেতনভোগী কর্মচারী দোকানে নিজে অতিরিক্ত মাল গোপনে রেখে ব্যবসা করে আর ওদিকে মালিকের মাল বিক্রয় না হয়ে পড়ে থাকে।
৭। মালিকের বিনা অনুমতিতে 'মাযরাআ' (শস্যক্ষেত বা বাগান) থেকে কিছু খাওয়া বা খাওয়ানোর অভ্যাস আছে অনেক বেতনভোগী কর্মচারীর। অথচ মালিকের অনুমতি ছাড়া একটি ফলও খাওয়া বৈধ নয় মালী বা কর্মচারীর।
৮। সরকারী গাড়ির তেল বিক্রয় করে খায় অনেক সরকারী ড্রাইভার, কয়লা- ইঞ্জিনের কয়লা বিক্রয় করে খায় অনেক পাইলট।
৯। অনেক অফিসার আছেন, যাঁরা নিজের ব্যক্তিগত কাজেও সরকারী গাড়ি, ফোন ইত্যাদি ব্যবহার করেন। তদনুরূপ অনেক কর্মচারী ও হাউস-ড্রাইভার আছে, যারা নিজের কাজে বিনা অনুমতিতে মালিকের গাড়ি ব্যবহার করে। অথচ তা তাদের জন্য বৈধ নয়।
১০। অনেক লেবারেই মাটি কাটার সময় মাটি চুরি করে থাকে। মাঝখানে ও চারিপাশে উঁচু জায়গাটি রেখে চৌকোর মাপ দেয়। তার ফলে যতটা পরিমাপ মাটি তারা কাটেনি, তার থেকে বেশী পরিমাপ দেখিয়ে তার দাম ধরে নেয়। ঐ বেশী পরিমাণের ধরা টাকাটি কিন্তু তাদের জন্য হারাম।
১১। অনেক জেলে আছে, যারা অপরের মাছ ধরার সময় নিজ পরিহিত কাপড়ে অথবা জালে মাছ চুরি করে ভরে রাখে। ঐ মাছ খাওয়া তাদের জন্য হারাম।
১২। আটা বা চালকলের কর্মচারী পরিশেষে কিছু আটা বা চাল মেশিনের ভিতরে লুকিয়ে রেখে চুরি করে। ঐ আটা বা চাল খাওয়া তাদের জন্য হারাম।
১৩। তদনুরূপ ঘানি-ওয়ালা কর্মচারী কিছু তেল ঘানিতে ভরে রেখে তেল চুরি করে। অথচ ঐ তেল খাওয়া তার জন্য বৈধ নয়।
১৪। কিছু হোটেল আছে, যেখানে খরচ দিয়ে খানা পাকানো যায়। কিন্তু সে হোটেল- ওয়ালাদের ভাত-মাংস চুরি করে খাওয়া হারাম।
১৫। কোন কোন জায়গায় কসাইখানায় আছে, যেখানে পশু নিয়ে গিয়ে খরচ দিয়ে গোশু বানিয়ে আনা যায়। সেখানকার কর্মচারী কসাইদের জন্য গোশু চুরি করে রাখা ও পরে তা খাওয়া বা বিক্রি করা হারাম।
১৬। অনেক দর্জি আছে, যারা মাপ নেওয়ার সময় বেশী মাপ ধরে কাপড় চুরি করে। এমন চুরি অবশ্যই হারাম।
১৭। অনেক কামার (কর্মকার) আছে, যাদেরকে কিছু গড়তে লোহা দিলে তা হতে কিছু লোহা চুরি করে। আর সেই লোহা বিক্রি করে অথবা তার দ্বারা অন্য কিছু গড়ে বিক্রি করে হারাম খায়।
১৮। অনেক স্বর্ণকার আছে, যাদেরকে কিছু গড়তে সোনা-রূপা দিলে তা থেকে কিছু অংশ চুরি করে এবং তার জায়গায় খাদ ভরে দিয়ে ওজন পূর্ণ করে। আর তা অথবা তা দিয়ে অন্য কিছু গড়ে বিক্রি করে হারাম খায়।
১৯। লাইব্রেরী বা অফিসের বই, কলম ইত্যাদি নিজের কাজে ব্যবহার করা এক প্রকার চুরি।
২০। আদায়কারীর নয়কে ছয় করে চুরি; ৫০ কে ৫ বানিয়ে অথবা ৫ কেজিকে ৫ টাকা বানিয়ে, মিথ্যা খরচ দেখিয়ে কেটে রাখা টাকা তার জন্য হালাল নয়।
২১। কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস তার মালিক জানা সত্ত্বেও গোপন করে ভক্ষণ হারাম।
২২। চাষ করতে করতে গোপনে জমি নিজের নামে রেকর্ড করে নেওয়া, হকদারের হক মেরে নিজের নামে করা অবশ্যই অবৈধ।
২৩। পশুরক্ষক রাখালের গোপনে কোন পশু বিক্রি করা এবং বাঘের নামে চাপিয়ে দেওয়া নিশ্চয়ই হারাম।
২৪। নাবালকের প্রতিনিধিত্ব করতে করতে তার জমি-জায়গা বা পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্য চাকরী নিজের নামে করে নেওয়া মহা অন্যায়।
২৫। ভাগচাষের ভাগ ঠিকমত না দেওয়া, কুটুরির নিচে রাশ চুরি করা বৈধ নয়।
২৬। মালিকের গাড়ির ভাড়া গোপন করে ভক্ষণ করা হারাম।
২৭। ট্রিপ চুরি করে অতিরিক্ত ট্রিপের ভাড়া নিজের পকেটে ভরা হারাম।
২৮। পার্টনারশিপ ব্যবসায় পার্টনারের টাকা গোপন করে ঠিকমত ভাগ না দেওয়া এবং নিজে বেশী নিয়ে তা খাওয়া হারাম।
২৯। একটি জিনিস কয়েকবার বিক্রি, একটি জমি, জায়গা বা পুকুর কয়েক জনকে বিক্রি করে উধাও হওয়া। পায়রা, গরু, ছাগল প্রভৃতি বিক্রির পর তা বাড়িতে ফিরে এলে ক্রেতাকে খবর না করে পুনরায় অন্য জনকে বিক্রি করা এবং সে টাকা খাওয়া হারাম।
৩০। চাকরিস্থলে যথাকর্তব্য সঠিকভাবে পালন না করা, গাফলতি করা, অফিসে ঘুমানো এক এক প্রকার খেয়ানত। সুতরাং তার ফলেও চাকরির কিছু বেতন হারাম হতে পারে। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৫৫২পৃঃ)
৩১। কর্তব্যে নিজ আত্মীয়, বন্ধু বা পরিচিতকে প্রাধান্য দেওয়া, আইন বাইরে সুযোগ দেওয়া, লাইনে আগে জায়গা দেওয়া, জরুরী কাগজ-পত্র বিনা কিছু দেওয়া ইত্যাদিও খেয়ানত। (ঐ ৫৫১পৃঃ)
৩২। আমানত স্বরূপ রাখা টাকা ব্যবসায় খাটিয়ে লাভ ভোগ করাও বৈধ নয়। যদি কেউ আপনার কাছে কিছু টাকা বা সম্পদ আমানত রাখে, তাহলে তার বিনা অনুমতিতে সেই টাকা বা সম্পদ কোন কাজে লাগাতে পারেন না। প্রয়োজনে ঋণস্বরূপও নিতে পারেন না। কারণ, তা আমানত। আর যার আমানত তার অনুমতি ছাড়া আমানত ব্যবহার করাই হল আমানতের এক প্রকার খেয়ানত। সুতরাং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার মতোয়াল্লী, সেক্রেটারী, ক্যাশিয়ার প্রভৃতি যাঁরা টাকা-পয়সা গচ্ছিত রাখার দায়িত্ব পালন করে থাকেন, তাঁরাও ঐ ফান্ড বা মাল থেকে কিছু ঋণস্বরূপ নিয়েও নিজের কাজে লাগাতে পারেন না। (ফাতাওয়াল বুয়ু' ৬৮পৃঃ) তদনুরূপ কেউ যদি আপনার মাধ্যমে কিছু অর্থ-সম্পদ কোথাও প্রেরণ করে, তাহলে প্রেরণে দেরী করে তার দ্বারা উপকৃত হওয়া আপনার জন্য হারাম। সুতরাং মানি-অর্ডার, হুন্ডি প্রভৃতি এক্সচেঞ্জ কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে সতর্ক হয়ে যথা সময়ে যথাস্থানে অর্থের আমানত পৌঁছে দেওয়া জরুরী।
আমানতে খেয়ানত ছাড়া এর অবৈধতার একটা কারণ এও হতে পারে যে, আমানতদাতা তার নিজ প্রয়োজনে যথাসময়ে আমানত ফিরে পাবে না।
শরীক হঠাৎ মারা গেলে তার শরীকানার কথা গোপন থাকলে তার ওয়ারেসদেরকে তার মাল ফেরৎ না দেওয়া আমানতে খেয়ানত। এ ক্ষেত্রে লাভ সহ শরীকের অর্থ ফেরৎ দেওয়া ওয়াজেব।
অপরের একাউন্টে টাকা রেখে অথবা কাউকে 'নমিনি' করে মারা গেলে তার টাকা গোপন করে নিজে আত্মসাৎ করা বৈধ নয়। বরং যার টাকা তার ওয়ারেসদেরকে ফেরৎ দেওয়া জরুরী।
অনুরূপ স্ত্রীর নামে টাকা জমা রেখে অথবা তাকে 'নমিনি' করে হঠাৎ স্বামী মারা গেলে সেই টাকা গোপন করে স্ত্রীর বগল বাজানো উচিত নয়। বরং তার যা অংশ তা নিয়ে বাকী অর্থ স্বামীর ওয়ারেসদেরকে ফেরৎ দেওয়া জরুরী।
তদনুরূপ বাপ যদি কোন ছেলের নামে টাকা জমা রাখে অথবা কাউকে 'নমিনি' করে মারা যায়, তাহলে কেবল ঐ ছেলের সমস্ত টাকা ভক্ষণ করা বৈধ নয়। বরং গোপন না করে বাপের সকল ওয়ারেসকে ঐ টাকা ভাগ দেওয়া জরুরী।
এই মত কত শত চুরির মাঝে পরের মাল আত্মসাৎ করার পদ্ধতি আছে, তার ইয়ত্তা নেই। চোরের শুধু চৌষট্টি বুদ্ধিই নয়; বরং তার থেকেও বেশী বুদ্ধি আছে তার। ফাল্লাহুল মুস্তাআন।
মহানবী বলেন, “অনেক লোক আছে, যারা আল্লাহর মালে নাহক তসরুফ (তাসারুফ) করে থাকে। তাদের জন্য কিয়ামতে জাহান্নাম অপেক্ষা করছে।” (বুখারী) তিনি আরো বলেন, “তোমাদের মধ্যে যাকে আমরা কোন চাকরী দান করলাম, অতঃপর সে একটি সুচ বা তার থেকে বড় কিছু গোপন (করে আত্মসাৎ) করল, সে আসলে খেয়ানত করল এবং কিয়ামতের দিন সে তা নিয়ে উপস্থিত হবে।” (মুসলিম, আবু দাউদ, সহীহুল জামে' ৬০২৪নং)
📄 (৫) জালিয়াতির কামাই
কৃত্রিম বা নকল দলীল, সার্টিফিকেট, ভাউচার প্রভৃতি বানিয়ে জালিয়াতি করে অর্থ উপার্জন হারাম এবং তা ভক্ষণ করলে হারাম ভক্ষণ করা হয়। যেহেতু তাতে অপর পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রকৃত হকদার নিজ হক থেকে বঞ্চিত হয়। দুঃখের বিষয় যে, এমন জাল-জুয়াচুরি করে খাওয়ার লোকও সমাজে বর্তমান।
১। মাদ্রাসার সদকাহ-যাকাত আদায়কারীর আদায় করতে গিয়ে ৫০ টাকাকে ৫ টাকা অথবা ৫ কেজিকে ৫ টাকা করে খাবার মত লোক যদি যাকাত খাওয়ার হকদার না হয়, তাহলে ডবল হারাম খায়; চুরি ও যাকাত।
২। দলীল নকল করে পরের জমি-জায়গা জবর-দখল করে চাষ-বাস করা জালিয়াতি করে খাওয়ার শামিল।
৩। নকল সার্টিফিকেট বানিয়ে 'শো' করে চাকরি নেওয়া বৈধ নয়। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৬১৭পৃঃ)
৪। বৈধ নয় নকল সার্টিফিকেট বানিয়ে নিজ আত্মীয়কে মর্যাদায় উচ্চ করে স্কলারশিপ দিয়ে বিদেশ পাঠানো এবং আসল হকদার ও যোগ্য ছাত্রকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানো।
৫। অপরকে নিজের নামে পরীক্ষায় বসিয়ে পাশ করে সার্টিফিকেট অর্জন করে তার মাধ্যমে চাকরি নেওয়া বৈধ নয়।
৬। পরীক্ষায় চিট (নকল) করে পাস করে সার্টিফিকেট অর্জন করে তার মাধ্যমে চাকরি নেওয়া বৈধ নয়। কোন শিক্ষকের জন্যও বৈধ নয় নকল করা দেখে চুপ থাকা।
৭। অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে ইন্টারভিউ-এ বসিয়ে চাকরি নেওয়া বৈধ নয়। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৬/১৬পৃঃ)
৮। অনেক সময় স্কুল-কলেজ বা মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে এক একটি বিষয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ বা বই লিখতে আদেশ করা হয়। অনেকে তা নিজে লিখতে না পেরে অর্থের বিনিময়ে অপরের নিকট থেকে লিখিয়ে নেয়। যারা লিখে দেয়, তারা ঐ ছাত্রদের ক্ষতি করে এবং কর্তৃপক্ষকে ধোকা দেয়। আর তার জন্যই এটিও অন্যায় কাজে সহযোগিতার শামিল। সুতরাং তাদের ঐ অর্থ হালাল নয়।
৯। স্কুল বা মাদ্রাসার অর্গানাইজ করতে গিয়ে পুরনো ১০ বছরের হাজরীর নকল খাতা তৈরী করে তা 'শো' করে সরকারকে ধোকা দিয়ে স্কুল বা মাদ্রাসা অনুমোদন করা ও তাতে চাকরি নেওয়া হারাম।
১০। প্রতিষ্ঠানের বা মালিকের মাল কিনতে গিয়ে রশিদে বেশী লিখিয়ে কম অর্থ দিয়ে বাকী নিজে মারা হারাম।
১১। কর্মবিষয়ে দুর্ঘটনা ঘটলে, তার চিকিৎসার দায়িত্ব কোম্পানী নিয়ে থাকে, গাড়ি দুর্ঘটনাগ্রস্ত হলে তার খরচ কোম্পানী বহন করে থাকে। কিন্তু কারো যদি কর্মের বাইরে দুর্ঘটনা ঘটে এবং কর্মের ভিতরে বলে চালিয়ে দেয়। আর সেই সাথে খরচ নেয় কোম্পানীর কাছে, তাহলে তা হারাম। (ঐ ৫৫৯পৃঃ)
১২। দুই জায়গা বা দুই সময়ের কর্মদায়িত্ব নিয়ে চুক্তি করে, তা যথার্থরূপে পালন না করে পূর্ণ বেতন খাওয়া হারাম। (ঐ ৫৫৮পৃঃ)
১৩। দুই মালিক বা কোম্পানীর কাজ নিয়ে একের কাজ অন্যের ডিউটিতে করা হারাম। (ঐ ৫৫৭-৫৫৮পৃঃ)
১৪। ডিউটিতে দেরী করে এসে সময় পিছিয়ে সাইন করা এবং আগে বেরিয়ে গিয়ে ঠিক সময় লিখে সাইন করা হারাম। তাতে কিছু বেতন হারাম হবে। অবশ্য ১০/১৫ মিনিট আগে বেরিয়ে যাওয়ার অনুমতি থাকলে ভিন্ন কথা। (ঐ ৫৫৬পৃঃ)
আল্লাহর রসূল বলেন, "যে আমাদেরকে ধোকা দেয় সে আমার দলভুক্ত নয়।” (মুসলিম ১০২, ইবনে মাজাহ ২২২৪, তিরমিযী ১৩১৫, আবু দাউদ ৩৪৫২নং)
তিনি আরো বলেন, "যে ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয় এবং যে (মানুষকে) ধোকা দেয়, সেও আমাদের দলভুক্ত নয়।” (মুসলিম ১০১নং)
তিনি আরো বলেন, "যে ব্যক্তি আমাদেরকে ধোকা দেয় সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। ধোকা ও চালবাজ জাহান্নামে যাবে।” (ত্বাবারানীর কাবীর ও সাগীর, ইবনে হিব্বান ৫৫৩৩, সহীহুল জামে' ৬৪০৮ নং)
প্রকাশ থাকে যে, নকল পাশপোর্ট-ভিসা করে বিদেশ এসে উপার্জন করা টাকা হারাম নয়। যেমন অনুরূপভাবে সফর করে হজ্জ করলে হজ্জ অশুদ্ধ নয়। অবশ্য পাশপোর্ট- ভিসা নকল করার জন্য সে গোনাহগার হবে।
প্রকাশ থাকে যে, কাস্টম ফাঁকি দিয়ে ব্যবসা বা শুল্কাদি ফাঁকি দিয়ে (বেআইনী) চোরাকারবার বৈধ নয়。