📄 অপরের ব্যবসার উপর ব্যবসা
কোন পণ্যের উপর ক্রেতা-বিক্রেতার দর-দাম চললে তৃতীয় ব্যক্তির বিক্রেতার কাছে উপস্থিত হয়ে দাম বেশী দিয়ে ক্রয় করা অথবা ক্রেতার কাছে উপস্থিত হয়ে তার থেকে কম দামে পণ্য বিক্রয় করা এবং পূর্বের ঐ চুক্তি ভঙ্গ করা ইসলামে বৈধ নয়।
যেমন শামসুল জমি বিক্রয় করবে কামরুলকে। দাম-দর ও কথাবার্তা এক রকম পাকাপাকি। মাঝখান থেকে বদরুল শামসুলের কাছে গিয়ে বলল, তুমি যে দামে জমিটা দিচ্ছ, আমি তার থেকে ১০ হাজার টাকা বেশী দেব। আর তার ফলে শামসুল কামরুলের সাথে কথা ভঙ্গ করে বদরুলকে জমিটা বিক্রয় করে বসল।
অথবা শামসুল ধান বিক্রয় করবে কামরুলকে। দাম-দর ও কথাবার্তা এক রকম পাকাপাকি। মাঝখান থেকে বদরুল কামরুলের কাছে গিয়ে বলল, তুমি যে দামে ধান নিচ্ছ, আমি তার থেকে ১০ টাকা রেট কম নেব। আমার কাছ থেকে ধান নাও। আর তার ফলে কামরুল শামসুলের সাথে কথা ভঙ্গ করে বদরুলের কাছে ধান ক্রয় করে বসল।
অথবা কারীমুল আরিফুলের কাছে একটি জিনিস কেনার জন্য দাম-দর করছে। মাঝখান থেকে হাফিযুল বলল, এই দামে এর চাইতে ভালো জিনিস আমি তোমাকে দিতে পারি। ফলে কারীমুল সেই ভাঙ্গানিতে কান দিয়ে আরিফুলের নিকট সেই জিনিস না নিয়ে হাফিযুলের নিকটেই নিল।
এমন ধরনের ব্যবসা ও খদ্দের ভাঙ্গানো ইসলামে বৈধ নয়। প্রিয় নবী বলেন, "এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সুতরাং তার জন্য তার ভায়ের ক্রয়-বিক্রয়ের উপর ক্রয়-বিক্রয় এবং বিবাহ-প্রস্তাবের উপর বিবাহ প্রস্তাব-তার ছেড়ে না দেওয়া পর্যন্ত- হালাল নয়। (বুখারী, মুসলিম ১৪১৪নং)
📄 (২) মিথ্যা বলে কামাই
মিথ্যা বলা মানুষের একটি কদর্য ও ঘৃণ্য আচরণ। মিথ্যার মাধ্যমে মানুষের হক নষ্ট করা হয়। মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে মানুষকে ধোকা দিয়ে বোকা বানিয়ে নাহক অর্থ হরণ করা হয়। এমন উপার্জন যে হারাম তা বলাই বাহুল্য।
মিথ্যুক ব্যক্তি যে ঘৃণ্য ও তুচ্ছ সে ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন,
(( إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ كَذَّابٌ)) (۲۸) سورة غافر
অর্থাৎ, নিশ্চয় আল্লাহ সীমালংঘনকারী ও মিথ্যাবাদীকে সৎপথে পরিচালিত (হেদায়াত) করেন না। (সূরা মু'মিন ২৮ আয়াত)
আবু বাকরাহ বলেন, একদা আমরা আল্লাহর রসূল -এর নিকট (বসে) ছিলাম। তিনি বললেন, "তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় (কাবীরা) গোনাহর কথা বলে দেব না কি?” এরূপ তিনবার বলার পর তিনি বললেন, "আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। শোনো! আর মিথ্যা সাক্ষি দেওয়া ও মিথ্যা কথা বলা।"
ইতিপূর্বে তিনি হেলান দিয়ে বসেছিলেন, কিন্তু শেষোক্ত কথাটি বলার সময় হেলান ছেড়ে উঠে বসলেন। অতঃপর এ কথা তিনি বারবার পুনরাবৃত্তি করতে লাগলেন, শেষ অবধি আমরা বললাম, 'হায় যদি তিনি চুপ হতেন!' (বুখারী ৫৯৭৬, মুসলিম ৮৭নং, তিরমিযী)
আল্লাহর রসূল বলেন, অবশ্যই সত্যবাদিতা পুণ্যের প্রতি পথপ্রদর্শন করে এবং পুণ্য পথপ্রদর্শন করে বেহেশ্বের প্রতি। আর মানুষ সত্য বলতে থাকে, পরিশেষে সে আল্লাহর নিকট দারুন সত্যবাদী হয়ে যায়। পক্ষান্তরে মিথ্যাবাদিতা পাপের প্রতি পথপ্রদর্শন করে এবং পাপ পথপ্রদর্শন করে দোযখের প্রতি। আর মানুষ মিথ্যা বলতে থাকলে অবশেষে সে আল্লাহর নিকট ভীষণ মিথ্যাবাদী বলে লিখিত হয়।” (বুখারী ৬০৯৪ নং, মুসলিম ২৬০৭ নং, আবু দাউদ, তিরমিযী)
মিথ্যা বলার অভ্যাস কোন মুসলিমের হতে পারে না। তার কর্ম ও পেশা যাই হোক, কোন ক্ষেত্রেই সে মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারে না। আসলে মিথ্যা বলা মুনাফিকদের হীন চরিত্রের একটি নিকৃষ্ট গুণ।
আল্লাহর নবী বলেন, "মুনাফিকের লক্ষণ হল তিনটি; কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা দিলে খেলাপ করে এবং চুক্তি করলে ভঙ্গ করে।” (বুখারী ৩৩, মুসলিম ৫৯নং) মুসলিমের এক বর্ণনায় এ কথা বেশী আছে, "যদিও সে ব্যক্তি নামায পড়ে রোযা রাখে এবং নিজেকে মুসলিম মনে করে।"
বহু উকীল আছেন, যাঁরা মুআক্কেলকে কেসে জিতাবার উদ্দেশ্যে মিথ্যা ব্যবহার করেন। বহু লেখক আছেন, যাঁরা মিথ্যা কথা বানিয়ে বানিয়ে লিখে লোককে হাসিয়ে অর্থ উপার্জন করে থাকেন। বহু ব্যবসায়ী আছে, যারা মিথ্যা বলে নিজেদের পণ্য বিক্রয় করে থাকে। এরা বলে 'মিথ্যা না বললে কি ব্যবসা চলে নাকি?' আসলে মিথ্যা বলাটা এদের নিকট ব্যবসার একটা 'টেকনিক।'
বহু ব্যবসায়ী পণ্যের মিথ্যা গুণ বর্ণনা করে পণ্য বাজারে চালু ও প্রসিদ্ধ করে। বাণিজ্য-বিজ্ঞাপনে অতিরঞ্জিত মিথ্যা উপকারিতার কথা প্রচার করে জন-সাধারণের দৃষ্টি ও মন আকর্ষণ করে। সকল কোম্পানীর পণ্যের চাইতে তার কোম্পানীরই পণ্য শ্রেষ্ঠ বলে দাবী করে অনেক সময় মিথ্যা বলে। ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তির সময় মিথ্যা বলে লাভ করে এরা। মিথ্যা করে বলে, আমার ১০ টাকায় কেনা, আপনি আমাকে ১ টাকা লাভ দিয়ে ১১ টাকা দিন। এর দাম ২৫ টাকা, শুধু আপনাকে ২০ টাকায় দিচ্ছি। (অথচ ২০ টাকায় অনেককেই দেয়।) অমুক বা অমুকের মাল অপেক্ষা আমার মাল বেশী ভালো। আমার মালে কোন প্রকার ভেজাল নেই। ইত্যাদি।
অনেক সময় ক্রেতাও বিক্রেতাকে মিথ্যা বলে চমক ধরিয়ে দেয়। বলে, ওমুক দোকানে সস্তা, অথচ আপনার দোকানে আক্রা। এই জিনিসই অমুক দোকানে ১০ টাকায় দেয়, আর আপনি ১৫ টাকা বলছেন? আমরা আপনার দোকান ছাড়া অন্য দোকানে মাল নিই না। ইত্যাদি।
আল্লাহর রসূল বলেন, "ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ে পৃথক না হওয়া পর্যন্ত (ক্রয়-বিক্রয়ে তাদের) এখতিয়ার থাকে। সুতরাং তারা যদি (ক্রয়-বিক্রয়ে) সত্য বলে এবং (পণ্যদ্রব্যের দোষ-গুণ) খুলে বলে, তাহলে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে বর্কত দেওয়া হয়। অন্যথা যদি (পণ্যদ্রব্যের দোষ-ত্রুটি) গোপন করে এবং মিথ্যা বলে, তাহলে বাহ্যতঃ তারা লাভ করলেও তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের বর্কত বিনাশ করে দেওয়া হয়।---” (বুখারী ২১১४, মুসলিম ১৫৩২, আবুদাউদ ৩৪৫৯, তিরমিযী ১২৪৬নং, নাসাঈ)
'মিথ্যা না বললে কি ব্যবসা চলে নাকি?'-এ কথা ওদের নিকট ঋব ও চিরন্তন সত্য বলেই আমাদের মহানবী আমাদের ব্যবসায়ীদেরকে সতর্ক করে বলেছেন, "ব্যবসায়ীরাই 'ফাজের' (পাপাচারী)।” সাহাবাগণ বললেন, 'আল্লাহ কি ব্যবসাকে হালাল করেননি?' তিনি বললেন, "অবশ্যই। কিন্তু তারা কসম করে পাপ করে এবং কথা বলতে মিথ্যা বলে।” (আহমাদ, হাকেম, সহীহ তারগীব ১৭৮৬নং)
তিনি আরো বলেন, "ব্যবসায়ীরা কিয়ামতের দিন ফাজের (পাপাচারী) হয়ে (কবর থেকে) উঠবে। তবে সে নয়, যে (তার ব্যবসায়) আল্লাহকে ভয় করে, (লোকের প্রতি) এহসানী করে এবং সত্য কথা বলে।” (তিরমিযী, হাকেম প্রমুখ, সিলসিলাহ সহীহাহ ৯৯৪নং)
লক্ষ্যণীয় যে, মহান আল্লাহ আল-কুরআনে এক শ্রেণীর অসৎ ব্যবসায়ীর কথা উল্লেখ করে বলেন,
((أَلَا يَظُنُّ أُولَئِكَ أَنَّهُم مَّبْعُوثُونَ (٤) لِيَوْمٍ عَظِيمٍ (٥) يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ (٦) كَلَّا إِنَّ كِتَابَ الفُجَّارِ لَفِي سِجِّين)) (۷) سورة المطففين
অর্থাৎ, ওরা কি বিশ্বাস করে না যে, ওরা পুনরুত্থিত হবে, সে মহান দিবসে? যেদিন সকল মানুষ সারা জাহানের প্রতিপালকের সামনে দন্ডায়মান হবে। না, কক্ষনই না! পাপাচারী (ফাজের) দের আমলনামা নিশ্চয়ই সিজ্জীনে--। (সূরা মুত্বাফফিফীন ৪-৭ আয়াত)
📄 কসম খেয়ে পণ্য বিক্রয়
সাধারণতঃ সকল মানুষই জানে যে, ব্যবসায়ীরা বিনা লাভে কোন পণ্য ক্রেতাকে দিতে পারে না। কথায় বলে, পাইকার বাপের কাছেও লাভ নেয়। তাদের মধ্যে কেউ কম নেয়, কেউ বেশী। সুতরাং ব্যবসায়ী সাধারণতঃ সমাজে অবিশ্বস্ত। আর সেই জন্য দরকার পরে মানুষের মনে বিশ্বাস সৃষ্টি করার। অন্য দিকে প্রত্যেক মুসলিমই কসমের মান জানে। কোন কথা বিশ্বাস না হলে তা যদি কসম করে বলা হয়, তাহলে শ্রোতা তা নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করে নেয়। আর সেই জন্যই বহু অসৎ ব্যবসায়ী আছে, যারা কসম খেয়ে পণ্য বিক্রি করে। নিজের ধান্দা চালাবার জন্য কসমের ধাঁধাঁয় ফেলে ক্রেতাকে অনায়াসে শিকার করে। সামান্য দুনিয়ার ফায়দা লুটার জন্য মহান আল্লাহর নামকে ব্যবহার করে।
মহানবী বলেন, “যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের মাল অনধিকার আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে কসম করে, সে ব্যক্তি এমন অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, যখন তিনি তার উপর ক্রোধান্বিত থাকবেন।” আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন, অতঃপর আল্লাহর রসূল এ কথার সমর্থনে আল্লাহর কিতাব থেকে এই আয়াত আমাদের জন্য পাঠ করলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَأَيْمَنِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلاً أُوْلَئِبِكَ لَا خَلَقَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ وَلَا يَنظُرُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ )
অর্থাৎ, যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথকে স্বল্পমূল্যে বিক্রয় করে পরকালে তাদের কোন অংশ নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকিয়ে দেখবেন না এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা আ-লি ইমরান ৭৭ আয়াত) (বুখারী ৬৬৭৬, ৬৬৭৭, মুসলিম ১১০নং, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
মহানবী বলেন, "তোমরা ব্যবসা-বণিজ্যে অধিকাধিক কসম খাওয়া থেকে দূরে থেকো। কারণ, কসম পণ্যদ্রব্য চালু করে ঠিকই, কিন্তু তা উপার্জনের (বর্কত) বিনষ্ট করে দেয়।” (মুসলিম, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, সহীহ তারগীব ১৭৯৫নং)
আল্লাহর রসূল বলেন, "চার ব্যক্তিকে আল্লাহ ঘৃণা করেন; অত্যধিক কসম খেয়ে পণ্য বিক্রয়কারী ব্যবসায়ী, অহংকারী গরীব, ব্যভিচারী বৃদ্ধ এবং অত্যাচারী রাজা (শাসক)। (নাসাঈ, ইবনে হিব্বান, সহীহুল জামে' ৮৮০নং)
তিনি আরো বলেন, “যে ব্যক্তি নিজের কসম দ্বারা কোন মুসলিমের অধিকার হরণ করে, সে ব্যক্তির জন্য আল্লাহ দোযখ ওয়াজেব এবং বেহেশ্ হারাম করে দেন।” লোকেরা বলল, 'যদিও সামান্য কিছু হয় তাও, হে আল্লাহর রসূল?!' বললেন, "যদিও বা পিলু (গাছের) একটি ডালও হয়।” (মালেক, মুসলিম ১৩৭, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ ২৩২৪নং)
অনেক ব্যবসায়ী আবার মিথ্যা কসম খেয়ে মাল বিক্রি করে। মিথ্যা কসম করে বলে, আল্লাহর কসম! আমি এতে লাভ করছি না, অথচ সে করছে। বলে, আল্লাহর কসম! আমি এততে কিনেছি, অথচ সে কিনেছে তার কমে। বলে, আল্লাহর কসম! এ জিনিস বাজারের সেরা, অথচ তা সেরা নয়। বলে, আল্লাহর কসম! শুধু আপনার জন্য এই রেট, অথচ ঐ রেটে অনেককেই দেয়।
বলা বাহুল্য, অনেক মানুষ ব্যবসায়ীর কসমের চমক ও নিশ্চয়তায় বিশ্বাস করে পণ্য ক্রয় করে এবং অনেকে ধোকাও খায়। আসলে এই শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা স্বল্প পার্থিব লাভের জন্য আল্লাহর নামকে মিথ্যায় ব্যবহার করে এবং নিজেদের আখেরাত বরবাদ করে। এই পন্থায় যে অর্থ উপার্জন করে, তা হারাম অর্থ হয়। ব্যবসায়ীর ব্যবসা চলে, মাল কাটে ও লাভ হয় বটে, কিন্তু তার বর্কত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
আল্লাহর রসূল বলেন, "ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ে পৃথক না হওয়া পর্যন্ত (ক্রয়- বিক্রয়ে তাদের) এখতিয়ার থাকে। সুতরাং তারা যদি (ক্রয়-বিক্রয়ে) সত্য বলে এবং (পণ্যদ্রব্যের দোষ-গুণ) খুলে বলে, তাহলে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে বর্কত দেওয়া হয়। অন্যথা যদি (পণ্যদ্রব্যের দোষ-ত্রুটি) গোপন করে এবং মিথ্যা বলে তাহলে বাহ্যতঃ তারা লাভ করলেও তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের বর্কত বিনাশ করে দেওয়া হয়। আর মিথ্যা কসম পণ্যদ্রব্য চালু করে ঠিকই, কিন্তু তা উপার্জনের (বর্কত) বিনষ্ট করে দেয়।” (বুখারী ২১১৪, মুসলিম ১৫৩২, আবুদাউদ ৩৪৫৯, তিরমিযী ১২৪৬নং, নাসাঈ)
আবু যার বলেন, একদা নবী বললেন, "তিন ব্যক্তির সাথে আল্লাহ কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাদের প্রতি তাকিয়েও দেখবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য হবে যন্ত্রণাপ্রদ শাস্তি।” তিনি এ কথাটি পুনঃপুনঃ তিনবার বললেন। আমি বললাম, 'ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তারা কারা হে আল্লাহর রসূল?' তিনি বললেন, "তারা হল, যে ব্যক্তি গাঁটের নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরে, দান করে যে 'দিয়েছি-দিয়েছি' বলে প্রচার করে বেড়ায় এবং মিথ্যা কসম করে যে তার পণ্যদ্রব্য বিক্রয় করে।” (মুসলিম ১০৬, আবু দাউদ ৪০৮৭, তিরমিযী ১২১১, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ ২২০৮নং)
মহানবী বলেন, "কাবীরা গোনাহ হল, আল্লাহর সাথে শরীক করা, পিতামাতার অবাধ্যাচরণ করা এবং মিথ্যা কসম করা।” (বুখারী ৬৬৭৫, তিরমিযী ৩০২১নং, নাসাঈ)
আল্লাহর রসূল বলেন, "যে ব্যক্তি কোন এমন বিষয়ে (জেনে-শুনে) মিথ্যা কসম খেল; যে বিষয়ে কাফফারা অথবা গোনাহ অনিবার্য, সে যেন নিজের ঠিকানা দোযখে বানিয়ে নিল।” (আবু দাউদ ৩২৪২নং, হাকেম ৪/২৯৪, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৩৩২নং)
অনেক বিক্রেতা আছে, যারা ক্রেতার মনে চমক ধরানোর জন্য কসম করে বলে, এ জিনিস এত দাম ছাড়া বিক্রি করব না। কিন্তু পরক্ষণে কসম ভঙ্গ করে তা তার থেকে কম দামে বিক্রি করে। কখনো কসম করে বলে, এই দামে বিক্রি করব না। কিন্তু পরক্ষণে সে সেই দামেই বিক্রি করে। এমন ব্যবসায়ীরা যে আল্লাহর মর্যাদা ও কসমের মান রক্ষা করে না এবং দুনিয়ার বদলে আখেরাতকে বিক্রি করে, তাতে কি কারো সন্দেহ থাকতে পারে?
আবু সাঈদ খুদরী বলেন, একদা এক বেদুঈন একটি বকরী নিয়ে (আমার) পাশ দিয়ে গেল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'তুমি এটাকে ৩ দিরহামে বিক্রি করবে?' উত্তরে সে বলল, 'না, আল্লাহর কসম!' অতঃপর সে সেটাকে (ঐ ৩ দিরহামেই) বিক্রি করল। আমি এ খবর আল্লাহর রসূল-এর কাছে উল্লেখ করলে তিনি বললেন, “সে তার দুনিয়ার বিনিময়ে আখেরাতকে বিক্রি করেছে।” (ইবনে হিব্বান, সিলসিলাহ সহীহাহ ৩৬৪নং)
গোদের উপর বিষফোঁড়া, অনেকে আবার গায়রুল্লাহর নামে কসম খেয়ে মাল বিক্রি করে। কেউ খায় কা'বার কসম। কেউ বলে কিবলার দিকে মুখ করে। কেউ করে ছেলের দিব্যি। কেউ খায় পীর বা মাযারের শপথ! সুতরাং এ ক্ষেত্রে এ আচরণ হারাম ও কাবীরা গোনাহ থেকে যে শির্কের পর্যায়ে পৌঁছে থাকে তা বলাই বাহুল্য।
মহানবী বলেন, "তোমরা তোমাদের বাপ-দাদা, মা-নানী বা গায়রুল্লাহর কসম খেয়ো না। আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে কসম খেয়ো না এবং সত্য ছাড়া (মিথ্যা কসম) খেয়ো না।” (আবু দাউদ, নাসাঈ, সহীহুল জামে' ৭২৪৯নং)
📄 দালালি করা
বিক্রেতার সাথে চুক্তি করে ক্রেতা ক্রয় করতে এলে পণ্যের ঝুটা প্রশংসা করে অথবা নিজে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করে এক শ্রেণীর দালাল। যার ফলে সে বিক্রেতার নিকট কমিশন বা বখশিস পায়। অথচ এমন দালালি আমাদের শরীয়তে নিষেধ। মহানবী দালালি করতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী)
বলা বাহুল্য, এমন কামাই যে হারাম, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, ব্যবসায়ীকে খদ্দের যোগাড় করে দিয়ে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক বা কমিশন নেওয়া হারাম নয়।