📄 আদম ব্যবসা
এ কথা বিদিত যে, মানুষকে আল্লাহ সম্মানিতরূপে সৃষ্টি করে এ পৃথিবীর বুকে স্থান দিয়েছেন। সে সম্মানিত মানুষের ব্যবসা ইসলামে হারাম। হারাম তার যে কোন অঙ্গ বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করা।
স্বাধীন মানুষকে বিক্রয় করে তার মূল্য ভক্ষণ করা হারাম খাওয়ারই শামিল। মহানবী বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা বলেন, 'কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির প্রতিবাদী। আর আমি যার প্রতিবাদী হব অবশ্যই তাকে পরাজিত করব। তন্মধ্যে প্রথম হল সেই ব্যক্তি, যে আমার নামে কিছু দেওয়ার প্রতিশ্রুতি করল অতঃপর তা ভঙ্গ করল। দ্বিতীয় হল সেই ব্যক্তি, যে কোন স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রয় করে তার মূল্য ভক্ষণ করল। আর তৃতীয় হল সেই ব্যক্তি, যে কোন মজুর খাটিয়ে তার নিকট থেকে পুরোপুরি কাজ নিল; অথচ সে তার মজুরী (পূর্ণরূপে) আদায় করল না।” (আহমদ ২/৩৫৮, বুখারী ২২২৭ ও ২২৭০নং, ইবনে মাজাহ ২৪৪২নং)
বলা বাহুল্য, মানুষ (পুরুষ, নারী বা শিশু) অপহরণ করে বিদেশে, বেশ্যাকোঠায় অথবা অন্য কোথাও বিক্রয় করা, ভালোবাসার ফাঁদে বন্দী করে অবলা নারীকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে দূরে কোথাও বিক্রয় করা, এক দেশে কোন যুবতীর অভিভাবককে কিছু অর্থ দিয়ে অথবা ভালোবাসার নামে বিবাহ করে ভিন দেশে নারী পাচার করা এবং তার মাধ্যমে মোটা টাকা ইনকাম করা হারাম। হারাম সে টাকা ভক্ষণ ও ব্যবহার।
আল্লাহর রসূল-এর নিকট এক ব্যক্তিকে ধরে আনা হল। সে শিশু চুরি করে ভিন দেশে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করত। তিনি তার হাত কেটে ফেলতে আদেশ করেছিলেন। (দারাকুত্বনী, ইরওয়াউল গালীল ২৪০৭নং)
মৃত মানুষের লাশ বিক্রি করাও হারাম, হারাম তার মাথা বা অন্য কোন অঙ্গ কেটে বিক্রি করা। যেহেতু পিয়ারা নবী বলেন, "মৃত মুমিনের হাড় ভাঙ্গা জীবিতের হাড় ভাঙ্গার সমান।” (আবু দাউদ ৩২০৭, ইবনে মাজাহ ১৬১৬ নং আহমাদ ৬/৫৮, বাইহাকী ৪/৫৮ প্রমুখ, সহীহ আবু দাউদ ২৭৪৬নং) বৈধ নয় রক্ত বিক্রয় ও তার ব্যবসা। (সহীহুল জামে' ৬৯৪৯নং)
ভিসা ব্যবসাও হারাম। কারণ, তাতে একটি মানুষ গোলামের মতই নাজেহাল হয়। কোন কোন মানুষ বিদেশ আসার জন্য ত্রিশ হাজারের জায়গায় দুই লক্ষ টাকা ব্যয় করতে বাধ্য হয়। এজেন্টের ভাঁওতাবাজির শিকার হয়ে বিদেশে এসে বেতন পায় মাত্র ৩০০০ থেকে ৫০০০ টাকার মত। ফলে সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার বাড়ির লোক, যারা সুখে-দুঃখে রুযী-রুটির জন্য তার দিকে তাকিয়ে থাকে। ডানাকাটা পাখির মত দিনরাত করে। আসল টাকা কি করে তুলবে এবং সূদের উপর নেওয়া ঋণের টাকা কিভাবে পরিশোধ করবে সেই চিন্তায় তার মাথার চুল পেকে যায়, দেহ কৃশ হয়ে যায়। বিদেশে এসে এমন এক দলদলে ফেঁসে যায় যে, সে সেখান থেকে না আগাতে পারে, আর না পিছাতে। অনেকে এই দুশ্চিন্তা করতে করতে অথবা ঋণের বোঝার কথা স্মরণ করতে করতে আত্মহত্যাও করে বসে। ইসলাম কি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে অনুমতি দিতে পারে?
মহানবী বলেন, "কেউ অপরের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এবং কেউ অপরকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।” (অথবা কেউ অপরের ক্ষতি করবে না এবং অপরের ক্ষতি করার পরিবর্তেও ক্ষতি করবে না।) (আহমাদ, ইবনে মাজাহ, সহীহুল জামে' ৭৫১৭নং)
তাছাড়া দেশের আইনে ভিসা ব্যবসা অবৈধ। অতএব কেউ ভিসার ব্যবসা করলে সে সরকারী আইনের বিরোধিতা করে। অথচ ইসলামী সরকারের বিরোধিতা করাও ইসলামে বৈধ নয়।
📄 নারীদেহের মাধ্যমে অর্থোপার্জন
ইসলামে নারীর মর্যাদা রয়েছে বিশাল। কিন্তু অর্থলোভে বহু মুসলমানও নারীর কদর করে না। ব্যবহার করে নারী, তার দেহ, সৌন্দর্য ও যৌবনকে অর্থলাভের মাধ্যম ও অসীলারূপে। হীন চরিত্রের নীচ মনের ঐ নোংরা মানুষরা নারীকে পণ্য বানিয়ে অর্থ উপার্জন করে। চুক্তিবদ্ধ মালিক হয়ে, (আসল বা নকল) স্বামী অথবা ভাই হয়ে, এমনকি পিতামাতা হয়েও নারীকে ব্যবসায় নামাতে এতটুকু লজ্জাবোধ করে না। ইসলামে পর্দা ফরয। নারীদেহ প্রদর্শন হারাম। নারীর প্রতি কাম নজরে দৃষ্টিপাত হারাম। ব্যভিচার হারাম। কিন্তু তা হলে কি হয়? অর্থলোভ যে বড় ব্যারাম!
আমাদের প্রিয় নবী কুকুরের মূল্য, বেশ্যাবৃত্তির কামাই ও গণকের উপার্জন গ্রহণ ও ভক্ষণ করতে নিষেধ করেছেন। (সহীহুল জামে' ৬৯৫১নং) তিনি বেশ্যাবৃত্তির মাধ্যমে কামানো অর্থকে 'খাবীষ' বা অপবিত্র বলেছেন। (সহীহুল জামে' ৩০৭৭নং) কখনো বলেছেন ঐ উপার্জন হল হারাম। (সহীহুল জামে' ৩০৭৬নং) কখনো বলেছেন, “দেহব্যবসার অর্থ হালাল নয়।” (আবু দাউদ ৩৪৮৪নং)
বলা বাহুল্য, নারীর গুপ্তাঙ্গ ব্যবহার করে অর্থ হারাম তো বটেই, হারাম তার অন্যান্য অঙ্গ ব্যবহার করেও।
নারী নিজে দেহ-ব্যবসা করুক অথবা কারো সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে করুক, সমাজ বা সরকার তাকে ঘৃণা করুক অথবা 'যৌনকর্মী' বলে সুন্দর নাম দিয়ে সমাদর করুক, সে ব্যবসা হারাম, হারাম তার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ।
হারাম কোন মুসলিমের পতিতালয় চালানো।
হারাম নারীর নগ্ন দেহ দিয়ে ফিল্ম, ব্লু ফিল্ম প্রস্তুত।
হারাম পুরুষমহলে নৃত্য করে পয়সা কামানো এবং হারাম যুবতী নর্তকী দিয়ে সংস্কৃতি (?) বার বা নৃত্যশালা চালানো।
হারাম সুন্দরী সেজে (চা, পান, মিষ্টি বা অন্য কোন) দোকান চালানো অথবা সুন্দরীকে বসিয়ে দোকান চালানো।
হারাম রূপসীকে পরিচারিকা রেখে হোটেল চালানো।
হারাম নারীর পুরুষের চুল কেটে সেলুন চালানো অথবা তাকে সেলুনে রেখে পুরুষের চুল কাটানো।
হারাম সুন্দরীর মুখশ্রী ও সুঠাম রম্য আবেদনময়ী দেহ প্রদর্শন করে কোন বাণিজ্য-বিজ্ঞাপন।
হারাম ব্যবসায় উন্নতির জন্য সুন্দরী যুবতীকে ম্যানেজার বানানো।
হারাম যে কোন ব্যবসায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে সুন্দরীকে পাঠানো।
হারাম কোন অফিসে কার্যসিদ্ধির জন্য নিজে না গিয়ে নিজের আধুনিকা 'মিসেস'কে পাঠানো।
হারাম যুবতীর দর্জি হয়ে সরাসরি পুরুষ দেহের মাপ নিয়ে জামা-প্যান্ট প্রস্তুত।
হারাম পত্রিকায় মডেল যুবতী বা হিরোইনের ছবি ছেপে পত্রিকার গ্রাহক-সংখ্যা বাড়ানো।
মুতা (বা সাময়িক) বিবাহের মোহর মহিলার জন্য হারাম। যেহেতু ঐ বিবাহই ইসলামে অবৈধ।
কোন মুসলিম নারীর জন্য বৈধ নয় নিজের রেহেম (গর্ভাশয়) ভাড়া দেওয়া। সন্তানকামী পুরুষের সাথে সহবাস বা ব্যভিচার করে, তার জন্য সন্তান পেটে ধরা ও ভূমিষ্ঠ করা অথবা সন্তানকামী পুরুষের বীর্যপাত করে সেই বীর্য সিরিঞ্জের মাধ্যমে গর্ভাশয়ে স্থাপন করে তার জন্য সন্তান জন্ম দেওয়া বৈধ নয়। বৈধ নয় তার বিনিময়ে নেওয়া অর্থ ভক্ষণ করা।
মহানবী বলেন, তোমরা গায়িকা (ক্রীতদাসী) ক্রয়-বিক্রয় করো না এবং তাদেরকে (গান) শিক্ষা দিও না। গায়িকা দাসী ব্যবসায় কোন মঙ্গল নেই এবং তার মূল্য হারাম। আর অনুরূপ কারণে অবতীর্ণ হয়েছে (কুরআন মাজীদের) এই আয়াতঃ-
( (وَمِنَ النَّاسِ مَن يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِين)) (٦) سورة لقمان
অর্থাৎ, এক শ্রেণীর লোক আছে, যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে অন্ধভাবে অসার বাক্য ক্রয় করে (বেছে নেয়) এবং আল্লাহর প্রদর্শিত পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি। (সূরা লুকুমান ৬ আয়াত, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৯২২নং)
টিকাঃ
(*) বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য 'আদর্শ পরিবার ও পরিবেশ'।
📄 মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রয়
মানুষ বড় সম্মানিত জীব। মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে বড় সম্মানের অধিকারী করে সৃষ্টি করেছেন এবং সারা বিশ্বের সমস্ত জিনিসকে তারই খিদমতের জন্য অধীন করে দিয়েছেন। অতএব তার কেনা-বেচায় তার সম্মানহানি হওয়ার কথা অবশ্যই বটে। অনুরূপভাবে মানুষের কোন অঙ্গ ও অংশ বিক্রয় করাও বৈধ নয়। বৈধ নয় লাশ ও ভ্রূণ বিক্রয়। মানুষের রক্ত, চুল, চোখ, কিডনী প্রভৃতিও বিক্রয় করা হারাম।
তবে হ্যাঁ, রক্ত বা অঙ্গ দান করার পর যদি কোন পক্ষ খুশী হয়ে উপহার স্বরূপ দাতাকে কিছু দেয়, তাহলে তা গ্রহণ করায় দোষ নেই। যেহেতু তা বিক্রয়ের পর্যায়ভুক্ত নয়। (মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ ৩৫/৩৪৩-৩৪৪)
📄 বীর্য বিক্রয়
এ কথা বিদিত যে, মানুষের কোন কিছু বিক্রয় বৈধ নয়; অতএব তার বীর্যও নয়। তাছাড়া তার বীর্য নিজ স্ত্রী ছাড়া অন্যের গর্ভে প্রক্ষেপ হারাম। সুতরাং তা কোন পর- মহিলার গর্ভের জন্য বিক্রয় করা হারাম।
গৃহপালিত পশুর বীর্যও বিক্রি করা বৈধ নয়। উট, ঘোড়া, ষাঁড় বা পাঁঠার বীর্য বিক্রি করে অর্থ বৈধ নয়। কোন মুসলিম ভাই তার গাভী বা ছাগীর মিলন সাধনের জন্য এলে বিনা পয়সায় ষাঁড় বা পাঁঠা ছেড়ে দেওয়া উচিত। যেহেতু আমাদের নবী ﷺ প্রজননের জন্য ষাঁড় ভাড়ায় দিতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী, মুসলিম ১৫৬৫নং) ষাঁড় বা পাঁঠা মিলন ও প্রজনেনর জন্য কাউকে (পাল ধরাতে) দিয়ে তার মূল্য নিতে নিষেধ করেছেন। (সহীহুল জামে' ৬৯৪৮-নং)
অবশ্য যদি কেউ স্বেচ্ছায় কেউ উপহার স্বরূপ কিছু দেয়, তাহলে ষাঁড় মালিকের তা গ্রহণ করায় কোন দোষ নেই। (তিরমিযী ১২৭৪, নাসাঈ, মিশকাত ২৮৬৬নং)