📄 ধর্মব্যবসা
ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করার মত ধর্মব্যবসায়ী সত্য মিথ্যা সব ধর্মেই এবং সর্বযুগে বর্তমান। যেমন সে যুগের ধর্মব্যবসায়ীরা আল্লাহর আয়াত নিয়ে ব্যবসা করত। অনেকে তা গোপন করে অর্থ উপার্জন করত। মহান আল্লাহ তাদের ব্যাপারে কুরআনে বলেছেন,
((إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنزَلَ اللهُ مِنَ الْكِتَابِ وَيَشْتَرُونَ بِهِ ثَمَنًا قَلِيلاً أُولَئِكَ مَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ إِلَّا النَّارَ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ)) (١٧٤) أُولَئِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الضَّلَالَةَ بِالْهُدَى وَالْعَذَابَ بِالْمَغْفِرَةِ فَمَا أَصْبَرَهُمْ عَلَى النَّارِ)) (١٧٥)
অর্থাৎ, আল্লাহ যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন যারা তা গোপন করে ও তার বিনিময়ে স্বল্প মূল্য গ্রহণ করে, তারা কেবল আগুন দিয়ে আপন পেট পূর্ণ করে। শেষ বিচারের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদের পবিত্রও করবেন না; আর তাদের জন্য রয়েছে দুঃখজনক শাস্তি। তারাই সুপথের বদলে কুপথ এবং ক্ষমার বদলে শাস্তি ক্রয় করেছে, (নরকের) আগুনে তারা কতই না ধৈর্যশীল! (সূরা বাকারাহ ১৭৪-১৭৫ আয়াত)
তিনি আরো বলেছেন,
((وَإِذَ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنَنَّهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ فَنَبَذُوهُ وَرَاء ظُهُورِهِمْ وَاشْتَرَوْاْ بِهِ ثَمَناً قَلِيلاً فَبِئْسَ مَا يَشْتَرُونَ)) (۱۸۷) سورة آل عمران
অর্থাৎ, (স্মরণ কর) যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল আল্লাহ তাদের নিকট প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন, তোমরা তা (কিতাব) স্পষ্টভাবে মানুষের কাছে প্রকাশ করবে এবং তা গোপন করবে না। এর পরও তারা তা পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে (অগ্রাহ্য করে) ও স্বল্পমূল্যে বিক্রয় করে। সুতরাং তারা যা ক্রয় করে তা কত নিকৃষ্ট। (সূরা আলে ইমরান ১৮৭ আয়াত)
অনেকে আল্লাহর আয়াত নকল বানিয়ে অর্থ উপার্জন করত। মহান আল্লাহ তাদের ব্যাপারে কুরআনে বলেছেন,
(( وَمِنْهُمْ أُمِّيُّونَ لَا يَعْلَمُونَ الْكِتَابَ إِلا أَمَانِيَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ (۷۸) فَوَيْلٌ لِّلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِندِ اللَّهِ لِيَشْتَرُواْ بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَّهُم مِّمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَّهُمْ مِّمَّا يَكْسِبُونَ)) (۷۹) سورة البقرة
অর্থাৎ, তাদের মধ্যে এমন কিছু নিরক্ষর লোক আছে, মিথ্যা আকাঙ্ক্ষা ছাড়া যাদের কিতাব (ঐশীগ্রন্থ) সম্বন্ধে কোন জ্ঞান নেই, তারা শুধু কল্পনা করে মাত্র। সুতরাং তাদের জন্য দুর্ভোগ যারা নিজ হাতে গ্রন্থ রচনা করে এবং অল্প মূল্য পাবার জন্য বলে, এটি আল্লাহর নিকট হতে এসেছে। তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য তাদের শাস্তি এবং যা তারা উপার্জন করেছে তার জন্যও তাদের শাস্তি (রয়েছে)। (সূরা বাকারাহ ৭৮-৭৯ আয়াত)
ধর্ম পালন অথবা প্রচার করার প্রধান উদ্দেশ্য অর্থোপার্জন হলে উপার্জিত সেই অর্থ হারামে পরিণত হয়। ধর্ম হৃদয় থেকে পালন না করে কেবল অর্থকরী ব্যবসার পণ্য হিসাবে তা ব্যবহার করা অবশ্যই বৈধ নয়। বৈধ নয় অর্থ কামানোর উদ্দেশ্যে কুরআন-হাদীস শিক্ষা করা ও দেওয়া।
মহানবী বলেন, "তোমরা কুরআন শিক্ষা কর এবং তার দ্বারা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা কর, তাদের পূর্বে পূর্বে যারা কুরআন শিক্ষা করে তার দ্বারা দুনিয়া যাচনা করবে। যেহেতু কুরআন তিন ব্যক্তি শিক্ষা করে; প্রথমতঃ সেই ব্যক্তি যে তার দ্বারা বড়াই করবে। দ্বিতীয়তঃ সেই ব্যক্তি যে তার দ্বারা উদরপূর্তি করবে এবং তৃতীয়তঃ সেই ব্যক্তি যে কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে তেলাওয়াত করবে।' (আবু উবাইদ, হাকেম)
"যে ব্যক্তি কুরআন শিক্ষাদানের উপর একটি ধনুকও গ্রহণ করবে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার পরিবর্তে জাহান্নামের আগুনের ধনুক তার গলায় লটকাবেন।" (সহীহুল জামে' ৫৯৮২নং)
"যে ব্যক্তি আখেরাতের কর্ম দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে করবে তার জন্য আখেরাতের কোন ভাগ থাকবে না।” (আহমদ)
মহানবী বলেন, "যে ব্যক্তি কোন এমন ইল্ম অন্বেষণ করে যার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশা করা হয়, যদি সে তা কেবলমাত্র পার্থিব সম্পদলাভের উদ্দেশ্যেই অন্বেষণ করে তবে সে কিয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না।” (আবু দাউদ, আহমদ, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান)
মালেক বিন দীনার হাসান (রঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আলেমের শাস্তি কি? তিনি উত্তরে বললেন, 'হৃদয়ের মৃত্যু।' বললেন, 'হৃদয়ের মৃত্যু কি?' হাসান বললেন, 'পরকালের কর্ম দ্বারা ইহকাল অন্বেষণ করা।'
মায়মুন বিন মিহরান বলেন, 'হে কুরআন ওয়ালারা! তোমরা কুরআনকে বেসাতিরূপে গ্রহণ করো না; যার দ্বারা দুনিয়াতে লাভ ও স্বার্থ খুঁজে বেড়াবে। বরং দুনিয়া দ্বারা দুনিয়াকে এবং আখেরাত দ্বারা আখেরাতকে অন্বেষণ কর। কেউ তো বিতর্ক করার জন্য কুরআন শিক্ষা করে, কেউ বা লোকে তার দিকে ইঙ্গিত করবে (প্রসিদ্ধ হবে) এই লোভে শিক্ষা করে। আর সেই ব্যক্তি উত্তম যে তা শিক্ষা করে এবং তাতে আল্লাহর আনুগত্য করে।'
এক অন্ধ ব্যক্তি সুফিয়ান সওরীর সাহচর্যে বসত। রমযান মাস এলে গ্রামাঞ্চলে বের হয়ে যেত। সেখানে লোকেদের ইমামতি করে বস্ত্রাহার উপার্জন করত। একদা সুফিয়ান তাকে বললেন, 'কিয়ামতের দিন আহলে কুরআনকে কিরাআতের বিনিময়ে প্রতিদান দেওয়া হবে আর এই রকম লোকের জন্য বলা হবে, তুমি তোমার প্রতিদান পৃথিবীতেই সত্বর নিয়ে ফেলেছ।' অন্ধ লোকটি বলল, 'আপনি আমার জন্য একথা বলছেন? অথচ আমি আপনার সহচর?' বললেন, 'আমি ভয় করছি যে, কিয়ামতে আমাকে বলা হবে, এ তো তোমার সহচর ছিল, কেন ওকে উপদেশ দাওনি?'
বিশ্ব বিন হারেস (রঃ) বলেন, 'পূর্বের উলামাগণ তিন গুণে গুণান্বিত ছিলেন। সত্যবাদিতা, হালালখোরী এবং পার্থিব বিষয়ের প্রতি অতিশয় বিরাগ। আর আজ আমি ওদের একজনের মধ্যেও এই সব গুণের একটাও দেখতে পাই না। তাহলে তাদেরকে কি করে গ্রাহ্য করব বা কি করে তাদেরকে দেখে হাসিমুখে সাক্ষাত করব? কেমন করে তারা ইলমের দাবী করে অথচ তারা পার্থিব বিষয়ের উপর একে অপরের ঈর্ষা ও হিংসা করে। আমীর ও নেতৃবর্গের নিকট সমশ্রেণীর ওলামার নিন্দা ও গীবত করে। এসব এই জন্য করে যাতে তাদের অবৈধ অর্থ নিয়ে অপরদের প্রতি ঝুঁকে না যায়। ধিক্ তোমাদের প্রতি হে ওলামাদল! তোমরা যে আম্বিয়ার উত্তরাধিকারী! তাঁরা তো তোমাদেরকে ইল্মের ওয়ারেস বানিয়েছেন। যা তোমরা বহন করেছ, কিন্তু তার উপর আমল করতে অনীহা প্রকাশ করেছ। তোমাদের ইল্মকে এক পেশা বানিয়ে নিয়েছ; যার দ্বারা তোমরা রুজী-রুটী কামাচ্ছ। তোমরা কি সে ভয় কর না যে, তোমাদের উপরেই সর্বপ্রথম দোযখের অগ্নি প্রজ্বালিত করা হবে?'
অতএব কোন মুসলিমের জন্য হালাল নয় যে, সে দ্বীনের কোন কর্মকে অর্থোপার্জনের মাধ্যম ও সুযোগ বানিয়ে নেয় এবং কেবল অর্থোপার্জনের উদ্দেশ্যে দ্বীনী কর্তব্য পালন করে। উদ্দেশ্য এই হলে অবশ্যই তার জন্য আখেরাতে কোন অংশ নেই। এ সম্বন্ধে আল্লাহ তাআলা বলেন,
((مَّن كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ، أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ))
অর্থাৎ, যদি কেউ পার্থিব জীবন ও তার শোভা কামনা করে তবে পৃথিবীতে আমি ওদের কর্মের পরিমিত ফল দান করি এবং পৃথিবীতে ওরা কম পাবে না। ওদেরই জন্য পরলোকে আগুন ব্যতীত অন্য কিছুই নেই এবং তারা যা করে পরলোকে তা নিষ্ফল হবে। আর ওরা যা করে থাকে (নিয়তে খারাবির জন্য) তা নিরর্থক হবে। (সূরা হুদ ১৫-১৬ আয়াত)
অতীব দুঃখের বিষয় যে, যে সকল ইসলামী ও আরবী মাদ্রাসা মুসলিমদের ওশর-যাকাৎ, ফিৎরা ও কুরবানীর চামড়ার অর্থ দ্বারা পরিচালিত, সেখানেও বহু ছাত্র সেসব খেয়ে দ্বীনী ও আরবী তালীম গ্রহণ করে থাকে নিছক দুনিয়া কামাবার উদ্দেশ্যে। যাদের অনেকের ইল্মের বহর তো থাকে, কিন্তু আমলের বহর থাকে না। যেহেতু তারা আমলের উদ্দেশ্যে পড়ে না; পড়ে একটি চাকরী লাভের উদ্দেশ্যে। এই শ্রেণীর আলেম ও তালেবে ইল্মকে সতর্ক করে বলি যে, নিয়ত যদি প্রথম, শেষ ও প্রধান দুনিয়া কামানোই হয়, তাহলে তাঁরা যেন ওশর-যাকাত দ্বারা পরিচালিত ঐ প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার না করেন। নচেৎ তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে ঐ শাস্তি। ফাল্লাহুল মুস্তাআন।
আরো এক শ্রেণীর মানুষ আছে, যারা ধার্মিক নয় অথচ ধর্মীয় কোন কোন প্রতীককে (যেমনঃ দাড়ি, টুপী, লম্বা পিরহান প্রভৃতিকে) নিজের ব্যবসার টেকনিক হিসাবে ব্যবহার করে অর্থ কামায়। এরাও যে ধর্মকে ধামা বানিয়ে সরল মানুষের অর্থ লুটে জমা করে, তা বলাই বাহুল্য。
📄 শির্ক ও বিদআত অবলম্বন করে অর্থোপার্জন
বহু মানুষ আছে, বহু উলামা আছেন, বহু ইমাম ও মোল্লা আছেন, যাঁরা অর্থ উপার্জনের সহজ পথ হিসাবে শির্ক ও বিদআতকে অবলম্বন হিসাবে গ্রহণ করে বসেছেন। অনেক ক্ষেত্রে না জেনে এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রে জেনেশুনেই শির্ককে শির্ক এবং বিদআতকে বিদআত বলে মানতে রাযী হন না, শুধু এই জন্য যে, তাতে তাঁদের স্বার্থে আঘাত লাগবে, আঁতে ঘা পড়বে এবং পেটে ছুরি মারা যাবে। যদিও তাঁরা না খেতে পেয়ে মারা যাবেন না।
কিন্তু তাঁরা মানুন চাহে না মানুন, তবুও এ ফতোয়া জেনে রাখা দরকার যে, শির্ক ও বিদআতকে অবলম্বন করে যাবতীয় উপার্জন হারাম। যেহেতু ধর্মের নামে সাধারণ মানুষকে ধোকা দিয়ে তাদের অর্থ লুটে খাওয়া ছোট পাপ নয়। মহান আল্লাহ এক শ্রেণীর ধর্মব্যবসায়ীদের কথা উল্লেখ করে বলেন,
((يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيرًا مِّنَ الأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ الله )) (٣٤) سورة التوبة
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! অনেক পাদরী ও ধর্মযাজকই অসৎ উপায়ে মানুষের ধন-সম্পদ কুক্ষিগত করে এবং আল্লাহর পথ হতে বিরত রাখে।” (সূরা তাওবাহ ৩৪ আয়াত)
তাঁরা সাধারণ মানুষকে শির্কের কুফল জানান না, বিদআতের অনিষ্টকারিতার কথা বলেন না। কেউ বললে, তার কথায় কান দিতে নিষেধ করেন এবং এইভাবে মানুষকে আল্লাহর পথ হতে বিরত রাখেন। যাতে তাঁদের গদি ও রুযী বহাল থাকে।
অবশ্য গাফেল জনসাধারণও এ ব্যাপারে অনেকাংশে দায়ী। তারাও সস্তায় বস্তাবন্দি লাভ নেওয়ার জন্য ঐ শ্রেণীর হুযুরদের শরণাপন্ন হয়। বিলাত-ফিরতা ডাক্তারকে হাজার হাজার টাকা দিয়ে যা ভালো না হয়, তা যদি ১০/২০ টাকায় ভালো হয়ে যায়, তাহলে কেনই বা যাবে ১০/২০এর জায়গায় হাজার হাজার খরচ করতে? তাছাড়া বহু ডাক্তার দেখিয়ে, বহু ওষুধ খেয়ে, বহু পয়সা খরচ করে যখন রোগ না সারে তখন আর কি করার আছে? আর সেই সময় ঐ সস্তা চিকিৎসা আসলে চিকিৎসা কি না, শির্ক অথবা বিদআত কি না, তাই বা তলিয়ে দেখার কি প্রয়োজন আছে? কাঠের বিড়াল হলেও ইঁদুর তো ধরছে! ঐ চিকিৎসায় তাদের কাজ তো হচ্ছে।
তওহীদের জ্ঞান না থাকার ফলে কত শত মানুষ অবৈধ চিকিৎসার সাহারা নিয়ে ঈমানের বিনিময়ে সুস্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনছে। আর উনারা ঈমানের বিনিময়ে পাচ্ছেন অল্প-বিস্তর টাকার ভেট!
আসুন! আমরা বাতিল উপায়ে কামিয়ে খাওয়া কিছু মানুষের বাতিল ব্যবসার কথা এখানে আলোচনা করি, যাতে সচেতন মানুষ সতর্ক হতে পারেন।
📄 তাবীয ব্যবসা
তাবীয ব্যবসা একটি বিনা পুঁজির ব্যবসা, তাতে সবটাই লাভ এবং তার পরিমাণও মন্দ নয়। কিন্তু তা যে বৈধ ও তার কামাই যে পবিত্র নয়, তা আমাদের অনেকেই মানতে রাযী নন।
তাবীয সাধারণতঃ ৩ প্রকার হয়ে থাকেঃ-
(ক) কিছু তাবীয নক্সা বানিয়ে সংখ্যা দ্বারা লিখা হয়, কোন ফিরিশ্তা, জিন কিংবা শয়তানের নাম দ্বারা তৈরী করা হয় অথবা কোন তেলেস্মাতি জাদুবিদ্যার সাহায্য নিয়ে অবোধগম্য বাক্য দ্বারা লিখা হয়। অনেক সময় তাতে হযরত আলীর মদদ চেয়ে, অনেক সময় পাক পাঞ্জন (মুহাম্মাদ, আলী, ফাতেমা, হাসান ও হুসাইন) কে অসীলা বানিয়ে, অনেক সময় আব্দুল কাদের জীলানীর অসীলা নিয়ে লিখা হয় বিভিন্ন তাবীয।
(খ) কিছু তাবীয কোন ধাতু, পশু-পাখীর হাড়, লোম বা পালক কিংবা গাছের শিকড় দিয়ে বানানো হয়, মসজিদ, পীরতলা, কবর বা মাযারের ধুলো দিয়ে, কোন বুযুর্গের মাথার পাগড়ী, কবরে চড়ানো চাদরের অংশ, কা'বাগৃহের গিলাফের সুতো, মক্কা-মদীনার মাটি ইত্যাদি দিয়ে বানানো হয়। কোন কোন তাবীয গাঁজাখোর ফকীরদের গাঁজার ছাই বা কোন নোংরা জিনিস দিয়ে তৈরী করা হয়।
উক্ত দুই প্রকার তাবীয লিখা ও ব্যবহার করা যে শির্ক তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
আর ঐ শ্রেণীর তাবীয ব্যবহার করে আসলে লাভ কিছু হয় না। মানুষ ধারণা করে যে, তার রোগ-বালা ঐ তাবীযে দূর হয়েছে; কিন্তু আসলে তা নয়। বরং রোগ-বালা দূর হওয়ার কারণ অন্য কিছু; হয় বৈজ্ঞানিক নতুবা শয়তানী।
আল্লাহর নবী বলেন, "কবজ, বালা, নোয়া ইত্যাদি ব্যবহারে লাভ তো কিছুই হয় না বরং ক্ষতিই হয়।” (আহমাদ ৪৪৫, ইবনে মাজাহ ৩৫৩১নং)
উকবাহ বিন আমের আল্লাহর রসূল-এর নিকট (বাইআত করার উদ্দেশ্যে) ১০ জন লোক উপস্থিত হল। তিনি ন'জনের নিকট থেকে বাইয়াত নিলেন। আর মাত্র একজন লোকের নিকট হতে বাইআত নিলেন না। সকলে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আপনি ন'জনের বাইআত গ্রহণ করলেন, কিন্তু এর করলেন না কেন?' উত্তরে তিনি বললেন, "ওর দেহে কবচ রয়েছে তাই।” অতঃপর তিনি নিজ হাতে তা ছিঁড়ে ফেললেন। তারপর তার নিকট থেকেও বাইআত নিলেন এবং বললেন, “যে ব্যক্তি কবচ লটকায়, সে ব্যক্তি শির্ক করে।” (আহমাদ, হাকেম, সিলসিলাহ সহীহাহ ৪৯২নং)
(গ) কুরআনী আয়াত দ্বারা লিখিত তাবীয প্রসঙ্গে উলামাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে তাও ব্যবহার না করাটাই সঠিক। কারণ, প্রথমতঃ আল্লাহর রসূল তাবীয ব্যবহারকে শির্ক বলেছেন। তাতে সমস্ত রকমেরই তাবীয উদ্দিষ্ট হতে পারে।
দ্বিতীয়তঃ, কুরআনী আয়াত দ্বারা লিখিত তাবীয ব্যবহারকারী গলায়, হাতে কিংবা কোমরে বেঁধেই প্রস্রাব-পায়খানা করবে, স্ত্রী-মিলন করবে, মহিলারা মাসিক অবস্থায় ও অন্যান্য অপবিত্রতায় ব্যবহার করবে। অনেক ক্ষেত্রে কাফের ব্যবহার করবে এবং তাতে কুরআন মাজীদের অসম্মান ও অমর্যাদা হবে।
আশ্চর্যের কথা যে, ওঁদের মতে তাবীয বেঁধে মড়াঘর বা আঁতুড়ঘর গেলে তাবীয ছুত হয়ে যায়। কিন্তু অদ্ভুতের গায়ে ঐ তাবীয ছুত না হয়ে যথার্থরূপে উপকার করতে থাকে!
তৃতীয়তঃ, যদি এরূপ তাবীয ব্যবহার বৈধ করা যায়, তাহলে অকুরআনী তাবীযও ব্যবহার করতে দেখা যাবে। তাই এই শির্কের মূলোৎপাটন করার মানসে তার ছিদ্রপথ বন্ধ করতে কুরআনী তাবীয ব্যবহারও অবৈধ হবে।
চতুর্থতঃ, নবী করীম ঝাড়-ফুঁক করেছেন, করতে আদেশ ও অনুমতি দিয়েছেন এবং তাঁর নিজের উপরেও ঝাড়-ফুঁক করা হয়েছে। অতএব যদি কুরআনী তাবীয ব্যবহার জায়েয হত, তাহলে নিশ্চয় তিনি এ সম্পর্কে কোন নির্দেশ দিতেন। অথচ কুরআন ও সুন্নায় এ ধরনের কোন নির্দেশ পাওয়া যায় না। (ইবনে বায ২/৩৮৪)
অনুরূপভাবে কোন লকেটের উপর 'আল্লাহ' বা 'মুহাম্মাদ' বা কোন কুরআনী আয়াত বা দুআ লিখে ব্যবহার করাও এই পর্যায়ে পড়ে।
দেখা যায় যে, সাধারণ মানুষ আল্লাহর উপর আস্থা না রেখে তাবীয ও তাবীযদাতার উপর আস্থাশীল হয়ে পড়ে। আর তা শির্কের দিকে মানুষকে আকর্ষণ করে।
বলাই বাহুল্য যে, যা ব্যবহার করা হারাম তা ক্রয় করা, লিখা, প্রচার করা, তার দ্বারা অর্থ উপার্জন করা এবং তার ব্যবসা করাও হারাম।
হারাম মানুষকে অতিরিক্ত ও মিথ্যা ভয় দেখিয়ে অর্থ উপার্জন করা। 'তোমার ব্যাপারটা বড় শক্ত, অতএব তোমাকে শক্ত জিনিস দিতে হবে' বলে খদ্দেরকে আরো আকর্ষণ ও ভয় প্রদর্শন করা হয়। আর তখনই খদ্দের বুঝতে পারে যে, শক্ত জিনিস নিতে হলে শক্ত পয়সাও লাগবে। ফলে পাঁচের জায়গায় পঞ্চাশ দিতে বাধ্য হয় সে!
দুঃখের বিষয় ও হাস্যকর একটি উল্লেখ্য তাবীয ব্যবসা; যা আমার স্মৃতিপটে বারবার ভেসে ওঠে, আর তা এই যে, হঠাৎ একদিন আমার ছেলেবেলার এক সহপাঠীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হল। কুশলবাদ জিজ্ঞাসা করার পর, সে এখন কি করছে তা জানতে চাইলাম। মুচকি হেসে বলল, পড়াশোনা তো করতে পারলাম না। পেট চালাবার জন্য ট্রেনে হকারি করছি। আমি প্রশ্ন করলাম, কিসের? একটু উদাস হয়ে বলল, বিনা পুঁজির ব্যবসা; তাবীয বিক্রি করি। নাছোড় বান্দা হয়ে আমি আবার প্রশ্ন করলাম, কিসের তাবীয? সে বলতে না চেয়েও সরস মেজাজে বলল, হুদুল কুতকুতের বাচ্চার লোমের তাবীয। আমি অবাক হয়ে বললাম, লোকে ভালুক জ্বর দূর করতে ভালুকের লোমের তাবীয ব্যবহার করে শুনেছি। কিন্তু 'হুদুল কুতকুত' আবার কোন প্রাণী, যার লোম তাবীযে ব্যবহার হয়? এবার সে আর কিছুতেই সেই প্রাণীর খবর বলতে রাযী হল না। পরিশেষে আমার পীড়াপীড়িতে সত্য কথা বলেই ফেলল; বলল, ক্ষ্যাপা! ওটা একটা খেয়ালি নাম। আসলে আমি আমার বগলের লোম ছিঁড়েই তাবীয বানিয়ে বিক্রি করি। হিন্দু-মুসলমান সবাই কিনে আমার তাবীয!
আসলে যেখানকার পরিবেশ ও মনে-মগজে শির্কের বাসা আছে, সেখানে ঐ শ্রেণীর ব্যবসা চলা যে কত সহজ তা তো ব্যবসায়ীরা ভালোভাবেই জানে। আর সেই সুযোগ গ্রহণ করে কত যে ঐ শ্রেণীর ভন্ডরা ধর্ম-ব্যবসা করে খাচ্ছে, তা মূর্খ মানুষরা না জানলেও শিক্ষিত ও জ্ঞানীরা ভালোভাবেই জানেন।
মহান আল্লাহ বলেন,
((يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيرًا مِّنَ الأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ الله )) (٣٤) سورة التوبة
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! অনেক পাদরী ও ধর্মযাজকই অসৎ উপায়ে মানুষের ধন-সম্পদ কুক্ষিগত করে এবং আল্লাহর পথ হতে বিরত রাখে।” (সূরা তাওবাহ ৩৪ আয়াত)
ঐ শ্রেণীর পাদরী, পুরোহিত ও উলামা নিজেদের হাতে কিছু লিখে আল্লাহর নামে চালিয়ে দিত। তার উপর মানুষের নিকট থেকে অর্থ গ্রহণ করত, মানুষের নিকট ঘুস নিয়ে আল্লাহর বিধানে হেরফের করত এবং ইসলামে দীক্ষিত হতে সকলকে বাধা দিত।
আর মুসলিম সমাজে ঐ শ্রেণীর উলামা ও সূফীরা মানুষের নিকট থেকে অসৎ উপায়ে অর্থ গ্রহণ করছে এবং তওহীদের পথে আসতে তাদেরকে বাধা দিচ্ছে।
সুতরাং সমাজের মানুষকে বেবে দেখা দরকার। সমাজের চিন্তা ও চেতনার আমূল পরিবর্তন আসা দরকার। যে সমাজের মানুষের মনে তাবীযের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভরসা আছে সে সমাজে অসাধু তাবীয-ব্যবসায়ী থাকাটা কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। সুতরাং সমাজকে সচেতন না করে সে ব্যবসা বন্ধ হবে কিভাবে? প্রকাশ্যে না চললেও গোপনে চলার পথ বন্ধ করবে কে?!
তাঁরা বলেন, কাজ তো হয়?
কাজ তো হবেই। বাতিল মা'বুদ, গাছ-পাথর ও জন্তু-জানোয়ারের কাছে সন্তান লাভ হয়, রোগমুক্তি পাওয়া যায়। তা বলে বাতিলকে কি হক বলে স্বীকার করে নেবেন? অধিকাংশ যে সকল রোগ তাবীযে ভালো হয়, তা মানসিক রোগ। আর মানুষের মনছবি ও প্রত্যয় অনুযায়ী তা ঘটে থাকে। কাউকে যদি জিন পায় এবং তার দৃঢ় প্রত্যয়ে সে মনে করে যে, তাবীয ছাড়া তার জিন যাবে না বা ভয় দূর হবে না, তাহলে সত্যই তা হবে না। বলা বাহুল্য, রোগীর মনেও তওহীদ বদ্ধমূল করতে হবে, তবেই ফলবে বিশুদ্ধ আকীদার সুপক্ক ফল।
কিন্তু আসল কথায় বন্ধু বেজার। উক্ত ফতোয়া আমার দ্বারা প্রচার হতে শুনে অনেক হযরত মন্তব্য করেছেন, 'আরব গিয়ে ফেরেস্তা হয়ে গেছে!'
আসলে প্রত্যেক আলেমকেই ফেরেস্তার মত না হলেও যথাসাধ্য পরহেযগার হওয়া দরকার। আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল না রাখতে পারলেও রুযী-রুটির জন্য কোন হালাল পথ বেছে নেওয়া উচিত।
সমালোচনায় অনেকে বলেন, দেশে আমাদের মত অল্প বেতনে চাকরি করলে কি এ ফতোয়া দিত?
আল্লাহর কসম! আরব আসার আগে মাসিক মাত্র ১৫০ (দেড়শত) টাকা বেতনে চাকরি করেও এ ফতোয়া দিয়েছি। আর শুধু এই 'আরবের ফেরেশ্তা' কেন? তার মত কত শত ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানেরও ফেরেস্তা মজুদ রয়েছেন, যাঁরা ঐ ফতোয়া দিয়ে থাকেন এবং তাঁরা অর্থাভাবে মরেননি। আসলে ভাইজান! অর্থলোভ মানুষকে অন্ধ, বধির ও হিংসুক করে তোলে।
আল্লাহর রসূল বলেছেন, "--- আর যে ব্যক্তি পবিত্র থাকতে চেষ্টা করবে আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখবেন, যে ব্যক্তি (অপরের) অমুখাপেক্ষী থাকতে চেষ্টা করবে, আল্লাহ তাকে (সকল থেকে) অমুখাপেক্ষী করে দেবেন এবং যে ব্যক্তি ধৈর্য ধরতে চেষ্টা করবে আল্লাহ তাকে ধৈর্য ধরতে সাহায্য করবেন। আর ধৈর্যের চেয়ে অধিক উত্তম ও ব্যাপক দান কাউকে দেওয়া হয়নি।” (বুখারী ১৪৬৯ নং, মুসলিম ১০৫৩ নং)
📄 শির্কী ঝাড়ফুঁক ব্যবসা
তাবীযের বিকল্প ব্যবস্থা স্বরূপ কুরআনী আয়াত বা সহীহ দুআ ও যিক্র দ্বারা ঝাঁড়-ফুঁক করা জায়েয। তবে শিকী বাক্য-সম্বলিত ঝাঁড়-ফুঁক বা মন্ত্র দ্বারা রোগী ঝাড়া শির্ক। যেমন দেব-দেবী, ফিরিশ্তা, জিন, শয়তান, অলী-আওলিয়া প্রভৃতির নাম নিয়ে অথবা আবোল-তাবোল অবোধগম্য মনগড়া বাক্য দিয়ে ঝাঁড়-ফুঁক করা শির্ক। আর শিকী মন্ত্রে যে কাজ হয়, তা হল শয়তানের কারসাজি।
শরয়ী মতে ঝাড়ফুঁক করার উপর পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ। শরয়ী মতে জিন ছাড়িয়ে বিনিময় নেওয়া হালাল। যাঁরা মানুষের উপকার করতে চান তাঁদের উচিত, এই শরয়ী চিকিৎসা শিক্ষা করা। পক্ষান্তরে শিকী পদ্ধতিতে ঝাড়ফুঁক করে, বেগানা মহিলার গায়ে হাত দিয়ে তেল মালিশ করে ঝাড়ফুঁক করে, চেহারায় আঘাত করে বা আগুন দিয়ে, পশু বা পাখী যবাই করে জিন ছাড়িয়ে কামানো পয়সা হারাম পয়সা।