📄 অগ্রিমক বা বায়না-চুক্তি
কোন জিনিস ক্রয় করার জন্য বিক্রেতাকে যে টাকা অগ্রিম এ্যাডভ্যান্স বা বায়না দেওয়া হয় এবং পরে সে জিনিস ক্রয় না করা হয়, তাহলে সেই বায়নার টাকা ফেরৎ নেওয়ার অধিকার ক্রেতার নেই। কারণ চুক্তি ভঙ্গ করেছে সেই।
তদনুরূপ কোন আসবাব-পত্র তৈরী করতে অর্ডার দেওয়ার সময় যে টাকা এ্যাভ্যাস্ দেওয়া হয় এবং পরে ঐ আসবাব-পত্র না নেওয়া হয়, তাহলে ঐ টাকা ফেরৎ নেওয়ার অধিকার অর্ডারদাতার নেই।
বক্তার রাহাখরচ বাবদ এ্যাডভ্যান্স নিয়ে ডেট ফেল করলে, বিবাহের কথাবার্তার পর মোহর বা পণ এ্যাডভ্যান্স নেওয়ার পর বিবাহ সম্পন্ন না হলে, জমি-জায়গা বা কোন কিছু কেনার কথাবার্তা চলার সময় কিছু মূল্য অগ্রিম দিয়ে তা নিতে না পারলে নেওয়া টাকা ফেরৎ দেওয়া জরুরী। অবশ্য দাতা মাফ করলে সে কথা ভিন্ন।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, যামানতের টাকা হালাল; যদি যামিনদার সেই জিনিস উপস্থিত করতে না পারে, যার উপর যামানত নেওয়া হয়েছে। যেমন একজন অপরিচিত ব্যক্তিকে আপনি আপনার একটি বই দিলেন এবং তা ফেরৎ না দেওয়া পর্যন্ত যামানত স্বরূপ তার নিকট থেকে ১০০ টাকা জমা রাখলেন। তারপর বইটি হারিয়ে গেলে বা ফেরৎ দিতে না পারলে আপনার জন্য ঐ জমা রাখা টাকা হালাল。
📄 ধোকামূলক ঝুঁকির ব্যবসা
ক্রেতা অথবা বিক্রেতা উভয়ের কিংবা একজনের ধোকায় পড়ার আশঙ্কা থাকে এমন ব্যবসা ও লেনদেন শরীয়তে বৈধ নয়। এই শ্রেণীর অতিরিক্ত কারবার নিম্নরূপঃ-
১। নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান বা দিক নিয়ে ভাগচাষ করা বৈধ নয়। যেমন মালিক বলে, 'প্রত্যেক মৌসমে আমাকে এই জমির পশ্চাতে এত কেজি ধান দিতে হবে অথবা আমার জমির পূর্ব দিকে বা নালার ধারে ধারে যে ফসল হবে সে ফসল আমার হবে।' অবশ্য এতে ফসলের পার্সেন্টেজ নেওয়া বৈধ।
২। ব্যাংকের ইন্টারেষ্ট, ফিক্সড ডিপোজিট ইত্যাদির ব্যাংকের সুদ লভ্যাংশ নয়। যেহেতু তাতে ধোকার আশঙ্কা বর্তমান।
৩। জীবন বা গাড়ির উপর বিমা বৈধ নয়। যেহেতু তাতে অনেক সময় অল্প দিয়ে অনেক পাওয়া যায়। আবার অনেক সময় প্রচুর জমা দিয়ে অল্প পাওয়া যায় অথবা কিছুই পাওয়া যায় না। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৬৩৩-৬৩৪পৃঃ, ৬৬০-৬৬১পৃঃ)
৪। নির্দিষ্ট টাকা নিয়ে গাড়ি ভাড়া দেওয়া; গাড়ি বা রিক্সা কোন ড্রাইভারকে দিয়ে দৈনিক বা মাসিক হারে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নেওয়া বৈধ নয়। যেহেতু তাতে ড্রাইভার কোনদিন গাড়ি বন্ধ রাখলে অথবা প্যাসেঞ্জার না পেলেও সেই নির্দিষ্ট টাকা মালিককে আদায় করতে বাধ্য থাকে। পক্ষান্তরে প্যাসেঞ্জার বেশী হলে মালিক উপার্জনের ভাগ কম পায়। অবশ্য এ ক্ষেত্রে দৈনিক উপার্জনের একটা পার্সেন্টেজ নেওয়া বৈধ।
৫। মাসিক হারে নির্দিষ্ট টাকা নিয়ে কোন কাফিল (স্পন্সরের) কাজ করানো বৈধ নয়। যেহেতু তাতে লেবার কাজ না পেলেও কাফিলকে ঐ নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা আদায় করতে বাধ্য হয়। পক্ষান্তরে উপার্জন বেশী হলে কাফিল উপার্জনের ভাগ কম পায়। অবশ্য এ ক্ষেত্রে একটা পার্সেন্টেজ নেওয়া বৈধ। (ঐ ৫৮৭, ৬০৩পৃঃ)
৬। আকাশে উড়ন্ত পাখী, পানিতে মাছ, মেষপালের পিঠে থাকা পশম, মুকুল অবস্থায় ফল, পেটে ভ্রূণ থাকা অবস্থায় পশু, স্তনে থাকা অবস্থায় দুধ, দুধ থাকা অবস্থায় ঘি ইত্যাদি ক্রয়-বিক্রয়ও ধোকার আশঙ্কায় বৈধ নয়।
৭। কোন শরীকানা ব্যবসা-চুক্তিতে নির্দিষ্ট লাভ গ্রহণ করা বৈধ নয়। যেমন একজনকে অর্থ দিয়ে ব্যবসা করতে দিয়ে এই বলে ব্যবসা-চুক্তি করা যে, 'আমার টাকা, তোমার মেহনত। আমাকে প্রত্যেক মাসে এত টাকা লাভ দিতে হবে।' দ্বিতীয় পক্ষ তত পরিমাণের লাভ না করলেও সেই নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থ আদায় করতে বাধ্য থাকে। অন্য দিকে লাভ বেশী হলে প্রথম পক্ষ ভাগে কম পায়। পক্ষান্তরে লাভের একটা পার্সেন্টেজ নেওয়া অবৈধ নয়。
টিকাঃ
(১) বীমা ও ব্যাংকের সুদ সম্পর্কে জানতে 'ব্যাংকের সুদ কি হালাল?' বইটি অবশ্যই পড়ুন।
📄 ধর্মব্যবসা
ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করার মত ধর্মব্যবসায়ী সত্য মিথ্যা সব ধর্মেই এবং সর্বযুগে বর্তমান। যেমন সে যুগের ধর্মব্যবসায়ীরা আল্লাহর আয়াত নিয়ে ব্যবসা করত। অনেকে তা গোপন করে অর্থ উপার্জন করত। মহান আল্লাহ তাদের ব্যাপারে কুরআনে বলেছেন,
((إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنزَلَ اللهُ مِنَ الْكِتَابِ وَيَشْتَرُونَ بِهِ ثَمَنًا قَلِيلاً أُولَئِكَ مَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ إِلَّا النَّارَ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ)) (١٧٤) أُولَئِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الضَّلَالَةَ بِالْهُدَى وَالْعَذَابَ بِالْمَغْفِرَةِ فَمَا أَصْبَرَهُمْ عَلَى النَّارِ)) (١٧٥)
অর্থাৎ, আল্লাহ যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন যারা তা গোপন করে ও তার বিনিময়ে স্বল্প মূল্য গ্রহণ করে, তারা কেবল আগুন দিয়ে আপন পেট পূর্ণ করে। শেষ বিচারের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদের পবিত্রও করবেন না; আর তাদের জন্য রয়েছে দুঃখজনক শাস্তি। তারাই সুপথের বদলে কুপথ এবং ক্ষমার বদলে শাস্তি ক্রয় করেছে, (নরকের) আগুনে তারা কতই না ধৈর্যশীল! (সূরা বাকারাহ ১৭৪-১৭৫ আয়াত)
তিনি আরো বলেছেন,
((وَإِذَ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنَنَّهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ فَنَبَذُوهُ وَرَاء ظُهُورِهِمْ وَاشْتَرَوْاْ بِهِ ثَمَناً قَلِيلاً فَبِئْسَ مَا يَشْتَرُونَ)) (۱۸۷) سورة آل عمران
অর্থাৎ, (স্মরণ কর) যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল আল্লাহ তাদের নিকট প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন, তোমরা তা (কিতাব) স্পষ্টভাবে মানুষের কাছে প্রকাশ করবে এবং তা গোপন করবে না। এর পরও তারা তা পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে (অগ্রাহ্য করে) ও স্বল্পমূল্যে বিক্রয় করে। সুতরাং তারা যা ক্রয় করে তা কত নিকৃষ্ট। (সূরা আলে ইমরান ১৮৭ আয়াত)
অনেকে আল্লাহর আয়াত নকল বানিয়ে অর্থ উপার্জন করত। মহান আল্লাহ তাদের ব্যাপারে কুরআনে বলেছেন,
(( وَمِنْهُمْ أُمِّيُّونَ لَا يَعْلَمُونَ الْكِتَابَ إِلا أَمَانِيَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ (۷۸) فَوَيْلٌ لِّلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِندِ اللَّهِ لِيَشْتَرُواْ بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَّهُم مِّمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَّهُمْ مِّمَّا يَكْسِبُونَ)) (۷۹) سورة البقرة
অর্থাৎ, তাদের মধ্যে এমন কিছু নিরক্ষর লোক আছে, মিথ্যা আকাঙ্ক্ষা ছাড়া যাদের কিতাব (ঐশীগ্রন্থ) সম্বন্ধে কোন জ্ঞান নেই, তারা শুধু কল্পনা করে মাত্র। সুতরাং তাদের জন্য দুর্ভোগ যারা নিজ হাতে গ্রন্থ রচনা করে এবং অল্প মূল্য পাবার জন্য বলে, এটি আল্লাহর নিকট হতে এসেছে। তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য তাদের শাস্তি এবং যা তারা উপার্জন করেছে তার জন্যও তাদের শাস্তি (রয়েছে)। (সূরা বাকারাহ ৭৮-৭৯ আয়াত)
ধর্ম পালন অথবা প্রচার করার প্রধান উদ্দেশ্য অর্থোপার্জন হলে উপার্জিত সেই অর্থ হারামে পরিণত হয়। ধর্ম হৃদয় থেকে পালন না করে কেবল অর্থকরী ব্যবসার পণ্য হিসাবে তা ব্যবহার করা অবশ্যই বৈধ নয়। বৈধ নয় অর্থ কামানোর উদ্দেশ্যে কুরআন-হাদীস শিক্ষা করা ও দেওয়া।
মহানবী বলেন, "তোমরা কুরআন শিক্ষা কর এবং তার দ্বারা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা কর, তাদের পূর্বে পূর্বে যারা কুরআন শিক্ষা করে তার দ্বারা দুনিয়া যাচনা করবে। যেহেতু কুরআন তিন ব্যক্তি শিক্ষা করে; প্রথমতঃ সেই ব্যক্তি যে তার দ্বারা বড়াই করবে। দ্বিতীয়তঃ সেই ব্যক্তি যে তার দ্বারা উদরপূর্তি করবে এবং তৃতীয়তঃ সেই ব্যক্তি যে কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে তেলাওয়াত করবে।' (আবু উবাইদ, হাকেম)
"যে ব্যক্তি কুরআন শিক্ষাদানের উপর একটি ধনুকও গ্রহণ করবে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার পরিবর্তে জাহান্নামের আগুনের ধনুক তার গলায় লটকাবেন।" (সহীহুল জামে' ৫৯৮২নং)
"যে ব্যক্তি আখেরাতের কর্ম দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে করবে তার জন্য আখেরাতের কোন ভাগ থাকবে না।” (আহমদ)
মহানবী বলেন, "যে ব্যক্তি কোন এমন ইল্ম অন্বেষণ করে যার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশা করা হয়, যদি সে তা কেবলমাত্র পার্থিব সম্পদলাভের উদ্দেশ্যেই অন্বেষণ করে তবে সে কিয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না।” (আবু দাউদ, আহমদ, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান)
মালেক বিন দীনার হাসান (রঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আলেমের শাস্তি কি? তিনি উত্তরে বললেন, 'হৃদয়ের মৃত্যু।' বললেন, 'হৃদয়ের মৃত্যু কি?' হাসান বললেন, 'পরকালের কর্ম দ্বারা ইহকাল অন্বেষণ করা।'
মায়মুন বিন মিহরান বলেন, 'হে কুরআন ওয়ালারা! তোমরা কুরআনকে বেসাতিরূপে গ্রহণ করো না; যার দ্বারা দুনিয়াতে লাভ ও স্বার্থ খুঁজে বেড়াবে। বরং দুনিয়া দ্বারা দুনিয়াকে এবং আখেরাত দ্বারা আখেরাতকে অন্বেষণ কর। কেউ তো বিতর্ক করার জন্য কুরআন শিক্ষা করে, কেউ বা লোকে তার দিকে ইঙ্গিত করবে (প্রসিদ্ধ হবে) এই লোভে শিক্ষা করে। আর সেই ব্যক্তি উত্তম যে তা শিক্ষা করে এবং তাতে আল্লাহর আনুগত্য করে।'
এক অন্ধ ব্যক্তি সুফিয়ান সওরীর সাহচর্যে বসত। রমযান মাস এলে গ্রামাঞ্চলে বের হয়ে যেত। সেখানে লোকেদের ইমামতি করে বস্ত্রাহার উপার্জন করত। একদা সুফিয়ান তাকে বললেন, 'কিয়ামতের দিন আহলে কুরআনকে কিরাআতের বিনিময়ে প্রতিদান দেওয়া হবে আর এই রকম লোকের জন্য বলা হবে, তুমি তোমার প্রতিদান পৃথিবীতেই সত্বর নিয়ে ফেলেছ।' অন্ধ লোকটি বলল, 'আপনি আমার জন্য একথা বলছেন? অথচ আমি আপনার সহচর?' বললেন, 'আমি ভয় করছি যে, কিয়ামতে আমাকে বলা হবে, এ তো তোমার সহচর ছিল, কেন ওকে উপদেশ দাওনি?'
বিশ্ব বিন হারেস (রঃ) বলেন, 'পূর্বের উলামাগণ তিন গুণে গুণান্বিত ছিলেন। সত্যবাদিতা, হালালখোরী এবং পার্থিব বিষয়ের প্রতি অতিশয় বিরাগ। আর আজ আমি ওদের একজনের মধ্যেও এই সব গুণের একটাও দেখতে পাই না। তাহলে তাদেরকে কি করে গ্রাহ্য করব বা কি করে তাদেরকে দেখে হাসিমুখে সাক্ষাত করব? কেমন করে তারা ইলমের দাবী করে অথচ তারা পার্থিব বিষয়ের উপর একে অপরের ঈর্ষা ও হিংসা করে। আমীর ও নেতৃবর্গের নিকট সমশ্রেণীর ওলামার নিন্দা ও গীবত করে। এসব এই জন্য করে যাতে তাদের অবৈধ অর্থ নিয়ে অপরদের প্রতি ঝুঁকে না যায়। ধিক্ তোমাদের প্রতি হে ওলামাদল! তোমরা যে আম্বিয়ার উত্তরাধিকারী! তাঁরা তো তোমাদেরকে ইল্মের ওয়ারেস বানিয়েছেন। যা তোমরা বহন করেছ, কিন্তু তার উপর আমল করতে অনীহা প্রকাশ করেছ। তোমাদের ইল্মকে এক পেশা বানিয়ে নিয়েছ; যার দ্বারা তোমরা রুজী-রুটী কামাচ্ছ। তোমরা কি সে ভয় কর না যে, তোমাদের উপরেই সর্বপ্রথম দোযখের অগ্নি প্রজ্বালিত করা হবে?'
অতএব কোন মুসলিমের জন্য হালাল নয় যে, সে দ্বীনের কোন কর্মকে অর্থোপার্জনের মাধ্যম ও সুযোগ বানিয়ে নেয় এবং কেবল অর্থোপার্জনের উদ্দেশ্যে দ্বীনী কর্তব্য পালন করে। উদ্দেশ্য এই হলে অবশ্যই তার জন্য আখেরাতে কোন অংশ নেই। এ সম্বন্ধে আল্লাহ তাআলা বলেন,
((مَّن كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ، أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ))
অর্থাৎ, যদি কেউ পার্থিব জীবন ও তার শোভা কামনা করে তবে পৃথিবীতে আমি ওদের কর্মের পরিমিত ফল দান করি এবং পৃথিবীতে ওরা কম পাবে না। ওদেরই জন্য পরলোকে আগুন ব্যতীত অন্য কিছুই নেই এবং তারা যা করে পরলোকে তা নিষ্ফল হবে। আর ওরা যা করে থাকে (নিয়তে খারাবির জন্য) তা নিরর্থক হবে। (সূরা হুদ ১৫-১৬ আয়াত)
অতীব দুঃখের বিষয় যে, যে সকল ইসলামী ও আরবী মাদ্রাসা মুসলিমদের ওশর-যাকাৎ, ফিৎরা ও কুরবানীর চামড়ার অর্থ দ্বারা পরিচালিত, সেখানেও বহু ছাত্র সেসব খেয়ে দ্বীনী ও আরবী তালীম গ্রহণ করে থাকে নিছক দুনিয়া কামাবার উদ্দেশ্যে। যাদের অনেকের ইল্মের বহর তো থাকে, কিন্তু আমলের বহর থাকে না। যেহেতু তারা আমলের উদ্দেশ্যে পড়ে না; পড়ে একটি চাকরী লাভের উদ্দেশ্যে। এই শ্রেণীর আলেম ও তালেবে ইল্মকে সতর্ক করে বলি যে, নিয়ত যদি প্রথম, শেষ ও প্রধান দুনিয়া কামানোই হয়, তাহলে তাঁরা যেন ওশর-যাকাত দ্বারা পরিচালিত ঐ প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার না করেন। নচেৎ তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে ঐ শাস্তি। ফাল্লাহুল মুস্তাআন।
আরো এক শ্রেণীর মানুষ আছে, যারা ধার্মিক নয় অথচ ধর্মীয় কোন কোন প্রতীককে (যেমনঃ দাড়ি, টুপী, লম্বা পিরহান প্রভৃতিকে) নিজের ব্যবসার টেকনিক হিসাবে ব্যবহার করে অর্থ কামায়। এরাও যে ধর্মকে ধামা বানিয়ে সরল মানুষের অর্থ লুটে জমা করে, তা বলাই বাহুল্য。
📄 শির্ক ও বিদআত অবলম্বন করে অর্থোপার্জন
বহু মানুষ আছে, বহু উলামা আছেন, বহু ইমাম ও মোল্লা আছেন, যাঁরা অর্থ উপার্জনের সহজ পথ হিসাবে শির্ক ও বিদআতকে অবলম্বন হিসাবে গ্রহণ করে বসেছেন। অনেক ক্ষেত্রে না জেনে এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রে জেনেশুনেই শির্ককে শির্ক এবং বিদআতকে বিদআত বলে মানতে রাযী হন না, শুধু এই জন্য যে, তাতে তাঁদের স্বার্থে আঘাত লাগবে, আঁতে ঘা পড়বে এবং পেটে ছুরি মারা যাবে। যদিও তাঁরা না খেতে পেয়ে মারা যাবেন না।
কিন্তু তাঁরা মানুন চাহে না মানুন, তবুও এ ফতোয়া জেনে রাখা দরকার যে, শির্ক ও বিদআতকে অবলম্বন করে যাবতীয় উপার্জন হারাম। যেহেতু ধর্মের নামে সাধারণ মানুষকে ধোকা দিয়ে তাদের অর্থ লুটে খাওয়া ছোট পাপ নয়। মহান আল্লাহ এক শ্রেণীর ধর্মব্যবসায়ীদের কথা উল্লেখ করে বলেন,
((يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيرًا مِّنَ الأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ الله )) (٣٤) سورة التوبة
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! অনেক পাদরী ও ধর্মযাজকই অসৎ উপায়ে মানুষের ধন-সম্পদ কুক্ষিগত করে এবং আল্লাহর পথ হতে বিরত রাখে।” (সূরা তাওবাহ ৩৪ আয়াত)
তাঁরা সাধারণ মানুষকে শির্কের কুফল জানান না, বিদআতের অনিষ্টকারিতার কথা বলেন না। কেউ বললে, তার কথায় কান দিতে নিষেধ করেন এবং এইভাবে মানুষকে আল্লাহর পথ হতে বিরত রাখেন। যাতে তাঁদের গদি ও রুযী বহাল থাকে।
অবশ্য গাফেল জনসাধারণও এ ব্যাপারে অনেকাংশে দায়ী। তারাও সস্তায় বস্তাবন্দি লাভ নেওয়ার জন্য ঐ শ্রেণীর হুযুরদের শরণাপন্ন হয়। বিলাত-ফিরতা ডাক্তারকে হাজার হাজার টাকা দিয়ে যা ভালো না হয়, তা যদি ১০/২০ টাকায় ভালো হয়ে যায়, তাহলে কেনই বা যাবে ১০/২০এর জায়গায় হাজার হাজার খরচ করতে? তাছাড়া বহু ডাক্তার দেখিয়ে, বহু ওষুধ খেয়ে, বহু পয়সা খরচ করে যখন রোগ না সারে তখন আর কি করার আছে? আর সেই সময় ঐ সস্তা চিকিৎসা আসলে চিকিৎসা কি না, শির্ক অথবা বিদআত কি না, তাই বা তলিয়ে দেখার কি প্রয়োজন আছে? কাঠের বিড়াল হলেও ইঁদুর তো ধরছে! ঐ চিকিৎসায় তাদের কাজ তো হচ্ছে।
তওহীদের জ্ঞান না থাকার ফলে কত শত মানুষ অবৈধ চিকিৎসার সাহারা নিয়ে ঈমানের বিনিময়ে সুস্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনছে। আর উনারা ঈমানের বিনিময়ে পাচ্ছেন অল্প-বিস্তর টাকার ভেট!
আসুন! আমরা বাতিল উপায়ে কামিয়ে খাওয়া কিছু মানুষের বাতিল ব্যবসার কথা এখানে আলোচনা করি, যাতে সচেতন মানুষ সতর্ক হতে পারেন।