📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 নিষিদ্ধ ব্যবসা

📄 নিষিদ্ধ ব্যবসা


মহান আল্লাহ সুদকে হারাম করেছেন এবং ব্যবসাকে করেছেন হালাল। কিন্তু প্রত্যেক ব্যবসাই যে হালাল তা নয়। বরং তার পদ্ধতি ভিন্ন হওয়ার জন্য কোন কোন ব্যবসা হারাম। সুতরাং হারাম থেকে বাঁচার জন্য প্রত্যেক ব্যবসায়ীকে হালাল ব্যবসার পদ্ধতি ও শর্তাবলী জানা আবশ্যক।

ব্যবসা শুদ্ধ ও হালাল হওয়ার জন্য শর্তাবলী নিম্নরূপঃ-
১। পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারে ক্রেতা ও বিক্রেতার পরস্পর সন্তুষ্টি ও সম্মতি থাকতে হবে। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন,
((يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُوْنَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مَّنْكُمْ))
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অন্যের ধন-সম্পত্তি অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না; তবে তোমাদের পরস্পরের সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা করে খেতে পার। (সূরা নিসা ২৯ আয়াত) সুতরাং জোরপূর্বক ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। অবশ্য কারো ঋণ পরিশোধের জন্য সরকার কর্তৃক সম্পত্তি বিক্রি করতে বাধ্য করার কথা স্বতন্ত্র।

২। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই (অর্থাদির ব্যাপারে) ইচ্ছা অনুযায়ী ব্যবহারের বা নিয়ন্ত্রণের অধিকারপ্রাপ্ত হতে হবে। অর্থাৎ উভয়কেই স্বাধীন, জ্ঞান-বিবেকসম্পন্ন মানুষ হতে হবে। সুতরাং কোন ক্রীতদাস তার প্রভুর অনুমতি ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় করতে পারে না। যেমন কোন শিশু, পাগল বা অর্বাচীন (অপরিপক্কবুদ্ধি) ব্যক্তির ক্রয়-বিক্রয় শুদ্ধ নয়।

৩। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই অর্থ ও পণ্যের মালিক অথবা তার প্রতিনিধি হতে হবে। মূল্য ও মালের মালিক অথবা তার প্রতিনিধি না হওয়া পর্যন্ত ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়।

৪। ক্রয়-বিক্রয়ের পণ্য হালাল ব্যবহার-যোগ্য হতে হবে। যেহেতু হারাম জিনিসের ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়।

৫। ক্রয়-বিক্রয়ের পণ্য ও মূল্য ক্রেতা ও বিক্রেতার নিয়ন্ত্রণাধীন হতে হবে। যাতে যথাসময়ে সমর্পণ করা সম্ভব হয়।
বলা বাহুল্য, পালিয়ে বা হারিয়ে যাওয়া পশু, ছেড়ে রাখা মুরগী বা পাখী, চুরি হয়ে যাওয়া কোন মাল ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়।

৬। ক্রয়-বিক্রয়ের পণ্য ও মূল্য ক্রেতা ও বিক্রেতার নিকট বিদিত ও পরিচিত হতে হবে। নচেৎ অজান্তে না দেখে আন্দাজে ক্রয়-বিক্রয়ে ধোকার আশঙ্কা থাকবে, ফলে তা অবৈধ হবে।

৭। পণ্য ক্রেতার আয়ত্ত ও হস্তগত হতে হবে। অর্থাৎ, কেনা মাল তুলে নিয়ে নিজের তত্ত্বাবধানে করে নিতে হবে। মাল কিনে সেখানেই বিক্রেতার তত্ত্বাবধানে ছেড়ে রাখা বৈধ নয়। যেহেতু তাতে পরে বিবাদ সৃষ্টি হতে পারে। মাল নষ্ট হলে অথবা বিক্রেতা অন্যের নিকট দর বেশী পেলে ক্রেতার সাথে কলহ বাধার আশঙ্কা আছে। তাই শরীয়তের নীতি হল, অস্থাবর পণ্য ক্রয়ের পর বিক্রেতা নিজের আয়ত্তাধীন করে নেবে। স্থাবর সম্পত্তি জমি, জায়গা বাড়ি ইত্যাদি দখলের মাধ্যমে নিজের অধিকারভুক্ত করে নেবে।

উপর্যুক্ত শর্তাবলী পূরণ না হওয়ার দরুন যে সকল ব্যবসা-বাণিজ্য বৈধ নয় তার কিছু নিম্নরূপঃ-

১। ফল-ফসল পাকার আগে এবং দুর্যোগমুক্ত হওয়ার পূর্বে ক্রয়-বিক্রয় হারাম। (বুখারী, মুসলিম প্রমুখ)
অতএব ধান, গম, খেজুর প্রভৃতি পাকার আগে জমিতেই এবং আম, লিচু প্রভৃতি ধরার পর ফুল অবস্থাতেই গোটা বাগান বিক্রি করা বৈধ নয়। কারণ তাতে ক্রেতা অথবা বিক্রেতা কারো না কারো ধোকায় পড়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রকাশ থাকে যে, পাকার পর গাছে থাকা অবস্থায় কোন ফল-ফসল বিক্রি হওয়ার পর যদি কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের (ঝড়-বৃষ্টি-শিলাবৃষ্টির) ফলে তা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে ক্ষতি কার হবে; ক্রেতার না বিক্রেতার?
এ ব্যাপারে মহানবী বলেন, "যে ব্যক্তি ফল বিক্রি করে, অতঃপর তা প্রাকৃতিক দুর্যোগগ্রস্ত হয়ে যায়, তাহলে সে যেন তার ভায়ের মাল থেকে কিছুও গ্রহণ না করে। তোমাদের কেউ কিসের বিনিময়ে নিজ মুসলিম ভায়ের মাল ভক্ষণ করবে?” (সহীহুল জামে' ৬১১৭নং)
অবশ্য বিক্রয়ের পর তা যদি ক্রেতার অবহেলা ও ত্রুটির কারণে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে সে কথা ভিন্ন।

২। বাগান বা ক্ষেতের কয়েক বছরের ফল-ফসলকে বিক্রয় করা হারাম। (মুসলিম ১৫৩৬নং) যেহেতু পূর্বের তুলনায় এই ব্যবসাতে অধিক ধোকার আশঙ্কা আছে।

৩। এক পশুর বিনিময়ে অপর পশু ধারে ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। অবশ্য নগদ নগদ একটির বিনিময়ে দুটি ক্রয়-বিক্রয়ও বৈধ। (সিলসিলাহ সহীহাহ ২৪১৬নং)

৪। পশুর গর্ভস্থিত ভ্রূণের বিনিময়ে পশু ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। (বুখারী, মুসলিম ১৫১৪নং)

৫। জীবিত পশুর বিনিময়ে গোশু বিক্রয় করা বৈধ নয়। (সহীহুল জামে' ৬৯৩৬নং) যেহেতু তাতে ধোকার আশঙ্কা রয়েছে।

৬। খেজুরের বিনিময়ে গাছপাকা খেজুর, কিশমিশের বিনিময়ে আঙ্গুর, পুরাতন গমের বিনিময়ে নতুন গম ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। (বুখারী, মুসলিম ১৫৪২নং) কারণ, তাতে ধোকা ও সূদের গন্ধ আছে।

৭। নির্দিষ্ট পরিমাণ খেজুরের পরিবর্তে এক রাশ খেজুর ক্রয়-বিক্রয় হারাম; যার পরিমাণ অজানা। (আহমাদ, মুসলিম, নাসাঈ, সহীহুল জামে' ৩৯৩৪নং)

৮। এক স্তূপ খাদ্যের বিনিময়ে এক স্তূপ খাদ্য অথবা নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যের বিনিময়ে এক স্তূপ খাদ্য ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। (নাসাঈ, সহীহুল জামে' ৭১৯৮-নং) যেহেতু তাতেও ধোকার আশঙ্কা বর্তমান।

৯। কিছু ছুঁড়ে নির্দিষ্ট করে ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। যেমন: আমি এই টাকার বিনিময়ে যে কাপড়ের উপর আমার ছুঁড়া এই পাথর পড়বে, সেটা তোমাকে বিক্রি করলাম। অথবা এখান থেকে যতদূর পর্যন্ত আমার ছুঁড়া এই ঢিল যাবে, ততদূর পর্যন্ত জমি তোমাকে বিক্রি করলাম। অথবা আমার পাথর ছুঁড়া পর্যন্ত তোমার মাল ফেরতের এখতিয়ার থাকবে। অথবা এই পাথর ছুঁড়লেই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি কার্যকর হয়ে যাবে। এই শ্রেণীর কথা বলে ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। (শারহুন নাওয়াবী ১০/১৫৬) সম্ভবতঃ রিং ছুঁড়ে নির্দিষ্ট করা মাল ক্রয়-বিক্রয় করা এই ব্যবসারই পর্যায়ভুক্ত। আর সেটা এক শ্রেণীর জুয়া।

১০। কেবল পণ্য স্পর্শ করেই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি কার্য করা বৈধ নয়। যেমন এক অপরের পণ্য বস্ত্র স্পর্শ করে বলে, ছোঁয়া মাত্র আমার কাপড়ের বিনিময়ে তোমার কাপড় ক্রয় অথবা বিক্রয় করলাম। আর তারা এক অপরের কাপড় পরীক্ষা করেও দেখে না। যেহেতু এই শ্রেণীর স্পর্শ ব্যবসাতেও ধোকার আশঙ্কা আছে।

১১। ক্রেতা-বিক্রেতার উভয়ের নিজ নিজ পণ্য ফেলে ব্যবসা চুক্তি বহাল করা বৈধ নয়। যেমন: আমার কাছে যা আছে তা এখানে রাখছি, তোমার কাছে যা আছে তুমিও এখানে রাখ। অতঃপর আমার পণ্যের বিনিময়ে তোমার পণ্য আমি ক্রয় করব। অথচ তারা উভয়েই একে অন্যের পণ্য (তার পরিমাণ ও গুণ) সম্পর্কে কোন ধারণা রাখে না। (বুখারী, মুসলিম ১৫১১নং)

১২। কোন পণ্য নিজের আয়ত্তে বা মালিকানায় না আনা পর্যন্ত বিক্রি করা অবৈধ। (আবু দাউদ ৩৪৯৫নং, তিরমিযী, নাসাঈ, ইরওয়া ১৩৮৬নং)
অতএব আরতদারদের ধানের গোলা কিনে বিক্রেতার বাড়িতে থাকা অবস্থাতেই মিলকে বিক্রি করা বৈধ ব্যবসা নয়।
তদনুরূপ কোন দোকানে কোন পণ্য ক্রয় করার পর তা নিজের আয়ত্তে না নিয়ে গুদামে বা দোকানে পড়ে থাকা অবস্থাতেই অন্য কাউকে বিক্রয় করা বা করতে বলা বৈধ নয়।
অনুরূপভাবে আপনার দোকানে মাল নেই। আপনি অর্ডার নিয়ে মাল আনিয়ে বিক্রি করতে পারেন। কিন্তু মাল দোকানে না আনিয়ে তার দাম নিয়ে সরাসরি সেই দোকান থেকে ক্রেতাকে নিতে বলা যে দোকান থেকে আপনি মাল তোলেন অথবা সেই দোকান থেকে আপনার দোকানে বা আয়ত্তে মাল না এনেই সরাসরি সেখান থেকে ক্রেতার হাওয়ালা করা বৈধ নয়।

১৩। একটি ব্যবসা-চুক্তির ভিতরে অন্য একটি চুক্তি সংযোগ করে ব্যবসা করা বৈধ নয়। (তিরমিযী, নাসাঈ, সহীহুল জামে' ৬৯৪৩নং) যেমন: আমি এই পণ্য এই শর্তে বিক্রি করছি যে, তুমি আমাকে তোমার অমুক বাড়িটা ভাড়া দেবে। অথবা আমি এই পণ্য এই শর্তে বিক্রি করছি যে, তুমি আমাকে তোমার অমুক কাজে অংশী করবে। অথবা আমি এই পণ্য এই শর্তে বিক্রি করছি যে, তুমি আমাকে এত টাকা ঋণদান করবে। অথবা এই দুটি গরুর মধ্যে একটিকে এত টাকায় বিক্রি করলাম। অতঃপর চুক্তি পাকা হয়ে যাবে অথচ দুটি গরুর কোন্‌ন্টি তা নির্ধারিত হবে না। অথবা এই জিনিসটি নগদে এত টাকায় এবং ধারে এত টাকায় বিক্রি করলাম। অতঃপর চুক্তি হয়ে যাবে অথচ দুটি অবস্থার একটিও নির্ধারিত করা হবে না। এ সকল দ্বিচুক্তিমূলক ব্যবসা ধোকার জন্য বৈধ নয়।

১৪। ব্যবসার সাথে ঋণ চুক্তি বৈধ নয়। (তিরমিযী, সিলসিলাহ সহীহাহ ১২১২নং) যেমন এই বলে চুক্তি করা যে, এই জিনিস তোমাকে এক হাজার টাকায় বিক্রি করব এই শর্তে যে, তুমি আমাকে ৫০০ টাকা ঋণদান করবে। যেহেতু বিক্রেতাকে ঋণ দেওয়ার ফলে ক্রেতা কম দামে মাল পাচ্ছে, তাই তা সূদের পর্যায়ভুক্ত হয়ে পড়বে।

১৫। নিজের কুঁয়ো, ঝরনা, পুকুর ইত্যাদির অতিরিক্ত পানি বিক্রি করা বৈধ নয়। (মুসলিম ১৫৬৫নং) যেহেতু পানি হল সাধারণী জিনিস। নির্দিষ্ট কেউ তার মালিক হয় না। জন সাধারণ সকলে তাতে শরীক থাকে। (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ সহীহুল জামে' ৬৭১৩নং)

১৬। কোন বাজারবাসী লোকের বহিরাগত লোকের মাল বিক্রয় করে দেওয়া বৈধ নয়। যেমন কোন গ্রাম্য চাষী বা বাইরের লোক মাল নিয়ে বাজারে এল। উচিত ও নিয়ম হল সেই লোক আজকের বাজার দর অনুপাতে সেই মাল আজই বিক্রি করবে। কিন্তু কোন বাজারবাসী তাকে বলল, তুমি তোমার মাল আমার কাছে ছেড়ে যাও। ২/১ দিন পর এর চাইতে বেশী দরে তোমার মাল বিক্রয় করে দেব। অথচ সাধারণ লোক ঐ মালের মুখাপেক্ষী। সুতরাং জনসাধারণ যাতে অসুবিধায় না পড়ে তার জন্য মহানবী বলেন, “কোন বাজারবাসী যেন মরুবাসীর জন্য বিক্রয় না করে। লোকেদের ছেড়ে দাও, আল্লাহ তাদের কিছুকে কিছুর নিকট থেকে রুযী দান করবেন।” (বুখারী, মুসলিম) অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, বহিরাগত লোক যদি বাজারবাসীর নিজের বাপ-ভাইও হয়, তবুও সে যেন তার তরফ থেকে তার পণ্য বিক্রয় না করে দেয়। (নাসাঈ ৪৪৯২নং)

১৭। বাজারে মাল আসার আগেই বাজারের বাইরে গিয়ে বহিরাগত বিক্রেতাদের নিকট থেকে মাল ক্রয় করা। (বুখারী, মুসলিম) এতে বিক্রেতা বাজার দর বুঝতে পারে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ধোকায় পড়ে সে ন্যায্য মূল্য পেতে পারে না। অপর দিকে বাজারে মালের আমদানী ব্যাহত হয়, আর তার ফলে মুনাফাখোরদের ঐ চালাকীর কারণে বাজারদর বৃদ্ধি পেতে থাকে।

১৮। গাভীর দুধ না দুইয়ে কিছুদিন জমা রেখে বিক্রির সময় দুইয়ে দেখিয়ে অনেক দুধ দেয় বলে বিক্রি করা। এমন বিক্রয় ও তার টাকা হারাম। যেহেতু তাতে ক্রেতাকে ধোকা দেওয়া হয় তাই। (বুখারী ২১৪৮নং, মুসলিম)

১৯। কাউকে ধারে কোন মাল বিক্রি করে সেই মাল কম দামে তারই নিকট থেকে ক্রয় করা হারাম। যেমন এক ব্যক্তির অর্থের প্রয়োজন হল। ঋণ কোথাও না পেয়ে এক গাড়ির ডিলারের নিকট গেল। ডিলারের নিকট থেকে ধারে ৫০ হাজার টাকায় একটি গাড়ি কিনল। অতঃপর সেই গাড়িকেই ঐ ডিলারের নিকট নগদ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে বিক্রি করল। যার ফলে ১০ হাজার টাকা ডিলারের পকেটে অনায়াসে এসে গেল। এই ব্যবসাকে শরীয়তে 'ঈনাহ' ব্যবসা বলা হয়। সত্যানুসন্ধানী উলামাগণ এই প্রকার ক্রয়-বিক্রয়কে সূদী কারবার বলে আখ্যায়ন করেছেন।
আল্লাহর রসূল বলেন, "যখন তোমরা 'ঈনাহ' ব্যবসা করবে এবং গরুর লেজ ধরে কেবল চাষ-বাস নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে, আর জিহাদ ত্যাগ করে বসবে, তখন আল্লাহ তোমাদের উপর এমন হীনতা চাপিয়ে দেবেন; যা তোমাদের হৃদয় থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত দূর করবেন না; যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের দ্বীনের প্রতি প্রত্যাবর্তন করেছ।” (মুসনাদে আহমদ ২/২৮,৪২, ৮৪, আবু দাউদ ৩৪৬২, বাইহাকী ৫/৩১৬)
প্রকাশ থাকে যে, মাল বিক্রয়ের পর প্রয়োজনে যদি ঐ মালই ক্রেতার নিকট থেকে ক্রয় করতে হয়, তাহলে যে দামে বিক্রয় করেছিল সেই দামেই অথবা তার থেকে বেশী দামে ক্রয় করাতে দোষ নেই। পক্ষান্তরে তার থেকে কম দামে নিলে সূদী কারবারের পর্যায়ভুক্ত হয়ে যাবে। (বাইউস স্বাবুন ৩৬পৃঃ)

২০। বাগান বিক্রি করার সময় নির্দিষ্ট না করে, অনির্দিষ্টভাবে ২/১টি গাছ বিক্রয় না করে ছেড়ে রাখা বৈধ নয়। (তিরমিযী ১২৯০নং, নাসাঈ) কারণ তাতে ধোকা ও ঝগড়ার আশঙ্কা থাকে।

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 অগ্রিমক বা বায়না-চুক্তি

📄 অগ্রিমক বা বায়না-চুক্তি


কোন জিনিস ক্রয় করার জন্য বিক্রেতাকে যে টাকা অগ্রিম এ্যাডভ্যান্স বা বায়না দেওয়া হয় এবং পরে সে জিনিস ক্রয় না করা হয়, তাহলে সেই বায়নার টাকা ফেরৎ নেওয়ার অধিকার ক্রেতার নেই। কারণ চুক্তি ভঙ্গ করেছে সেই।
তদনুরূপ কোন আসবাব-পত্র তৈরী করতে অর্ডার দেওয়ার সময় যে টাকা এ্যাভ্যাস্ দেওয়া হয় এবং পরে ঐ আসবাব-পত্র না নেওয়া হয়, তাহলে ঐ টাকা ফেরৎ নেওয়ার অধিকার অর্ডারদাতার নেই।
বক্তার রাহাখরচ বাবদ এ্যাডভ্যান্স নিয়ে ডেট ফেল করলে, বিবাহের কথাবার্তার পর মোহর বা পণ এ্যাডভ্যান্স নেওয়ার পর বিবাহ সম্পন্ন না হলে, জমি-জায়গা বা কোন কিছু কেনার কথাবার্তা চলার সময় কিছু মূল্য অগ্রিম দিয়ে তা নিতে না পারলে নেওয়া টাকা ফেরৎ দেওয়া জরুরী। অবশ্য দাতা মাফ করলে সে কথা ভিন্ন।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, যামানতের টাকা হালাল; যদি যামিনদার সেই জিনিস উপস্থিত করতে না পারে, যার উপর যামানত নেওয়া হয়েছে। যেমন একজন অপরিচিত ব্যক্তিকে আপনি আপনার একটি বই দিলেন এবং তা ফেরৎ না দেওয়া পর্যন্ত যামানত স্বরূপ তার নিকট থেকে ১০০ টাকা জমা রাখলেন। তারপর বইটি হারিয়ে গেলে বা ফেরৎ দিতে না পারলে আপনার জন্য ঐ জমা রাখা টাকা হালাল。

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 ধোকামূলক ঝুঁকির ব্যবসা

📄 ধোকামূলক ঝুঁকির ব্যবসা


ক্রেতা অথবা বিক্রেতা উভয়ের কিংবা একজনের ধোকায় পড়ার আশঙ্কা থাকে এমন ব্যবসা ও লেনদেন শরীয়তে বৈধ নয়। এই শ্রেণীর অতিরিক্ত কারবার নিম্নরূপঃ-

১। নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান বা দিক নিয়ে ভাগচাষ করা বৈধ নয়। যেমন মালিক বলে, 'প্রত্যেক মৌসমে আমাকে এই জমির পশ্চাতে এত কেজি ধান দিতে হবে অথবা আমার জমির পূর্ব দিকে বা নালার ধারে ধারে যে ফসল হবে সে ফসল আমার হবে।' অবশ্য এতে ফসলের পার্সেন্টেজ নেওয়া বৈধ।

২। ব্যাংকের ইন্টারেষ্ট, ফিক্সড ডিপোজিট ইত্যাদির ব্যাংকের সুদ লভ্যাংশ নয়। যেহেতু তাতে ধোকার আশঙ্কা বর্তমান।

৩। জীবন বা গাড়ির উপর বিমা বৈধ নয়। যেহেতু তাতে অনেক সময় অল্প দিয়ে অনেক পাওয়া যায়। আবার অনেক সময় প্রচুর জমা দিয়ে অল্প পাওয়া যায় অথবা কিছুই পাওয়া যায় না। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৬৩৩-৬৩৪পৃঃ, ৬৬০-৬৬১পৃঃ)

৪। নির্দিষ্ট টাকা নিয়ে গাড়ি ভাড়া দেওয়া; গাড়ি বা রিক্সা কোন ড্রাইভারকে দিয়ে দৈনিক বা মাসিক হারে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নেওয়া বৈধ নয়। যেহেতু তাতে ড্রাইভার কোনদিন গাড়ি বন্ধ রাখলে অথবা প্যাসেঞ্জার না পেলেও সেই নির্দিষ্ট টাকা মালিককে আদায় করতে বাধ্য থাকে। পক্ষান্তরে প্যাসেঞ্জার বেশী হলে মালিক উপার্জনের ভাগ কম পায়। অবশ্য এ ক্ষেত্রে দৈনিক উপার্জনের একটা পার্সেন্টেজ নেওয়া বৈধ।

৫। মাসিক হারে নির্দিষ্ট টাকা নিয়ে কোন কাফিল (স্পন্সরের) কাজ করানো বৈধ নয়। যেহেতু তাতে লেবার কাজ না পেলেও কাফিলকে ঐ নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা আদায় করতে বাধ্য হয়। পক্ষান্তরে উপার্জন বেশী হলে কাফিল উপার্জনের ভাগ কম পায়। অবশ্য এ ক্ষেত্রে একটা পার্সেন্টেজ নেওয়া বৈধ। (ঐ ৫৮৭, ৬০৩পৃঃ)

৬। আকাশে উড়ন্ত পাখী, পানিতে মাছ, মেষপালের পিঠে থাকা পশম, মুকুল অবস্থায় ফল, পেটে ভ্রূণ থাকা অবস্থায় পশু, স্তনে থাকা অবস্থায় দুধ, দুধ থাকা অবস্থায় ঘি ইত্যাদি ক্রয়-বিক্রয়ও ধোকার আশঙ্কায় বৈধ নয়।

৭। কোন শরীকানা ব্যবসা-চুক্তিতে নির্দিষ্ট লাভ গ্রহণ করা বৈধ নয়। যেমন একজনকে অর্থ দিয়ে ব্যবসা করতে দিয়ে এই বলে ব্যবসা-চুক্তি করা যে, 'আমার টাকা, তোমার মেহনত। আমাকে প্রত্যেক মাসে এত টাকা লাভ দিতে হবে।' দ্বিতীয় পক্ষ তত পরিমাণের লাভ না করলেও সেই নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থ আদায় করতে বাধ্য থাকে। অন্য দিকে লাভ বেশী হলে প্রথম পক্ষ ভাগে কম পায়। পক্ষান্তরে লাভের একটা পার্সেন্টেজ নেওয়া অবৈধ নয়。

টিকাঃ
(১) বীমা ও ব্যাংকের সুদ সম্পর্কে জানতে 'ব্যাংকের সুদ কি হালাল?' বইটি অবশ্যই পড়ুন।

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 ধর্মব্যবসা

📄 ধর্মব্যবসা


ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করার মত ধর্মব্যবসায়ী সত্য মিথ্যা সব ধর্মেই এবং সর্বযুগে বর্তমান। যেমন সে যুগের ধর্মব্যবসায়ীরা আল্লাহর আয়াত নিয়ে ব্যবসা করত। অনেকে তা গোপন করে অর্থ উপার্জন করত। মহান আল্লাহ তাদের ব্যাপারে কুরআনে বলেছেন,
((إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنزَلَ اللهُ مِنَ الْكِتَابِ وَيَشْتَرُونَ بِهِ ثَمَنًا قَلِيلاً أُولَئِكَ مَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ إِلَّا النَّارَ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ)) (١٧٤) أُولَئِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الضَّلَالَةَ بِالْهُدَى وَالْعَذَابَ بِالْمَغْفِرَةِ فَمَا أَصْبَرَهُمْ عَلَى النَّارِ)) (١٧٥)
অর্থাৎ, আল্লাহ যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন যারা তা গোপন করে ও তার বিনিময়ে স্বল্প মূল্য গ্রহণ করে, তারা কেবল আগুন দিয়ে আপন পেট পূর্ণ করে। শেষ বিচারের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদের পবিত্রও করবেন না; আর তাদের জন্য রয়েছে দুঃখজনক শাস্তি। তারাই সুপথের বদলে কুপথ এবং ক্ষমার বদলে শাস্তি ক্রয় করেছে, (নরকের) আগুনে তারা কতই না ধৈর্যশীল! (সূরা বাকারাহ ১৭৪-১৭৫ আয়াত)

তিনি আরো বলেছেন,
((وَإِذَ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنَنَّهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ فَنَبَذُوهُ وَرَاء ظُهُورِهِمْ وَاشْتَرَوْاْ بِهِ ثَمَناً قَلِيلاً فَبِئْسَ مَا يَشْتَرُونَ)) (۱۸۷) سورة آل عمران
অর্থাৎ, (স্মরণ কর) যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল আল্লাহ তাদের নিকট প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন, তোমরা তা (কিতাব) স্পষ্টভাবে মানুষের কাছে প্রকাশ করবে এবং তা গোপন করবে না। এর পরও তারা তা পৃষ্ঠের পিছনে নিক্ষেপ করে (অগ্রাহ্য করে) ও স্বল্পমূল্যে বিক্রয় করে। সুতরাং তারা যা ক্রয় করে তা কত নিকৃষ্ট। (সূরা আলে ইমরান ১৮৭ আয়াত)

অনেকে আল্লাহর আয়াত নকল বানিয়ে অর্থ উপার্জন করত। মহান আল্লাহ তাদের ব্যাপারে কুরআনে বলেছেন,
(( وَمِنْهُمْ أُمِّيُّونَ لَا يَعْلَمُونَ الْكِتَابَ إِلا أَمَانِيَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ (۷۸) فَوَيْلٌ لِّلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِندِ اللَّهِ لِيَشْتَرُواْ بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَّهُم مِّمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَّهُمْ مِّمَّا يَكْسِبُونَ)) (۷۹) سورة البقرة
অর্থাৎ, তাদের মধ্যে এমন কিছু নিরক্ষর লোক আছে, মিথ্যা আকাঙ্ক্ষা ছাড়া যাদের কিতাব (ঐশীগ্রন্থ) সম্বন্ধে কোন জ্ঞান নেই, তারা শুধু কল্পনা করে মাত্র। সুতরাং তাদের জন্য দুর্ভোগ যারা নিজ হাতে গ্রন্থ রচনা করে এবং অল্প মূল্য পাবার জন্য বলে, এটি আল্লাহর নিকট হতে এসেছে। তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য তাদের শাস্তি এবং যা তারা উপার্জন করেছে তার জন্যও তাদের শাস্তি (রয়েছে)। (সূরা বাকারাহ ৭৮-৭৯ আয়াত)

ধর্ম পালন অথবা প্রচার করার প্রধান উদ্দেশ্য অর্থোপার্জন হলে উপার্জিত সেই অর্থ হারামে পরিণত হয়। ধর্ম হৃদয় থেকে পালন না করে কেবল অর্থকরী ব্যবসার পণ্য হিসাবে তা ব্যবহার করা অবশ্যই বৈধ নয়। বৈধ নয় অর্থ কামানোর উদ্দেশ্যে কুরআন-হাদীস শিক্ষা করা ও দেওয়া।

মহানবী বলেন, "তোমরা কুরআন শিক্ষা কর এবং তার দ্বারা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা কর, তাদের পূর্বে পূর্বে যারা কুরআন শিক্ষা করে তার দ্বারা দুনিয়া যাচনা করবে। যেহেতু কুরআন তিন ব্যক্তি শিক্ষা করে; প্রথমতঃ সেই ব্যক্তি যে তার দ্বারা বড়াই করবে। দ্বিতীয়তঃ সেই ব্যক্তি যে তার দ্বারা উদরপূর্তি করবে এবং তৃতীয়তঃ সেই ব্যক্তি যে কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে তেলাওয়াত করবে।' (আবু উবাইদ, হাকেম)

"যে ব্যক্তি কুরআন শিক্ষাদানের উপর একটি ধনুকও গ্রহণ করবে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার পরিবর্তে জাহান্নামের আগুনের ধনুক তার গলায় লটকাবেন।" (সহীহুল জামে' ৫৯৮২নং)

"যে ব্যক্তি আখেরাতের কর্ম দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে করবে তার জন্য আখেরাতের কোন ভাগ থাকবে না।” (আহমদ)

মহানবী বলেন, "যে ব্যক্তি কোন এমন ইল্ম অন্বেষণ করে যার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশা করা হয়, যদি সে তা কেবলমাত্র পার্থিব সম্পদলাভের উদ্দেশ্যেই অন্বেষণ করে তবে সে কিয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না।” (আবু দাউদ, আহমদ, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান)

মালেক বিন দীনার হাসান (রঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আলেমের শাস্তি কি? তিনি উত্তরে বললেন, 'হৃদয়ের মৃত্যু।' বললেন, 'হৃদয়ের মৃত্যু কি?' হাসান বললেন, 'পরকালের কর্ম দ্বারা ইহকাল অন্বেষণ করা।'

মায়মুন বিন মিহরান বলেন, 'হে কুরআন ওয়ালারা! তোমরা কুরআনকে বেসাতিরূপে গ্রহণ করো না; যার দ্বারা দুনিয়াতে লাভ ও স্বার্থ খুঁজে বেড়াবে। বরং দুনিয়া দ্বারা দুনিয়াকে এবং আখেরাত দ্বারা আখেরাতকে অন্বেষণ কর। কেউ তো বিতর্ক করার জন্য কুরআন শিক্ষা করে, কেউ বা লোকে তার দিকে ইঙ্গিত করবে (প্রসিদ্ধ হবে) এই লোভে শিক্ষা করে। আর সেই ব্যক্তি উত্তম যে তা শিক্ষা করে এবং তাতে আল্লাহর আনুগত্য করে।'

এক অন্ধ ব্যক্তি সুফিয়ান সওরীর সাহচর্যে বসত। রমযান মাস এলে গ্রামাঞ্চলে বের হয়ে যেত। সেখানে লোকেদের ইমামতি করে বস্ত্রাহার উপার্জন করত। একদা সুফিয়ান তাকে বললেন, 'কিয়ামতের দিন আহলে কুরআনকে কিরাআতের বিনিময়ে প্রতিদান দেওয়া হবে আর এই রকম লোকের জন্য বলা হবে, তুমি তোমার প্রতিদান পৃথিবীতেই সত্বর নিয়ে ফেলেছ।' অন্ধ লোকটি বলল, 'আপনি আমার জন্য একথা বলছেন? অথচ আমি আপনার সহচর?' বললেন, 'আমি ভয় করছি যে, কিয়ামতে আমাকে বলা হবে, এ তো তোমার সহচর ছিল, কেন ওকে উপদেশ দাওনি?'

বিশ্ব বিন হারেস (রঃ) বলেন, 'পূর্বের উলামাগণ তিন গুণে গুণান্বিত ছিলেন। সত্যবাদিতা, হালালখোরী এবং পার্থিব বিষয়ের প্রতি অতিশয় বিরাগ। আর আজ আমি ওদের একজনের মধ্যেও এই সব গুণের একটাও দেখতে পাই না। তাহলে তাদেরকে কি করে গ্রাহ্য করব বা কি করে তাদেরকে দেখে হাসিমুখে সাক্ষাত করব? কেমন করে তারা ইলমের দাবী করে অথচ তারা পার্থিব বিষয়ের উপর একে অপরের ঈর্ষা ও হিংসা করে। আমীর ও নেতৃবর্গের নিকট সমশ্রেণীর ওলামার নিন্দা ও গীবত করে। এসব এই জন্য করে যাতে তাদের অবৈধ অর্থ নিয়ে অপরদের প্রতি ঝুঁকে না যায়। ধিক্ তোমাদের প্রতি হে ওলামাদল! তোমরা যে আম্বিয়ার উত্তরাধিকারী! তাঁরা তো তোমাদেরকে ইল্মের ওয়ারেস বানিয়েছেন। যা তোমরা বহন করেছ, কিন্তু তার উপর আমল করতে অনীহা প্রকাশ করেছ। তোমাদের ইল্মকে এক পেশা বানিয়ে নিয়েছ; যার দ্বারা তোমরা রুজী-রুটী কামাচ্ছ। তোমরা কি সে ভয় কর না যে, তোমাদের উপরেই সর্বপ্রথম দোযখের অগ্নি প্রজ্বালিত করা হবে?'

অতএব কোন মুসলিমের জন্য হালাল নয় যে, সে দ্বীনের কোন কর্মকে অর্থোপার্জনের মাধ্যম ও সুযোগ বানিয়ে নেয় এবং কেবল অর্থোপার্জনের উদ্দেশ্যে দ্বীনী কর্তব্য পালন করে। উদ্দেশ্য এই হলে অবশ্যই তার জন্য আখেরাতে কোন অংশ নেই। এ সম্বন্ধে আল্লাহ তাআলা বলেন,
((مَّن كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ، أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ))
অর্থাৎ, যদি কেউ পার্থিব জীবন ও তার শোভা কামনা করে তবে পৃথিবীতে আমি ওদের কর্মের পরিমিত ফল দান করি এবং পৃথিবীতে ওরা কম পাবে না। ওদেরই জন্য পরলোকে আগুন ব্যতীত অন্য কিছুই নেই এবং তারা যা করে পরলোকে তা নিষ্ফল হবে। আর ওরা যা করে থাকে (নিয়তে খারাবির জন্য) তা নিরর্থক হবে। (সূরা হুদ ১৫-১৬ আয়াত)

অতীব দুঃখের বিষয় যে, যে সকল ইসলামী ও আরবী মাদ্রাসা মুসলিমদের ওশর-যাকাৎ, ফিৎরা ও কুরবানীর চামড়ার অর্থ দ্বারা পরিচালিত, সেখানেও বহু ছাত্র সেসব খেয়ে দ্বীনী ও আরবী তালীম গ্রহণ করে থাকে নিছক দুনিয়া কামাবার উদ্দেশ্যে। যাদের অনেকের ইল্‌মের বহর তো থাকে, কিন্তু আমলের বহর থাকে না। যেহেতু তারা আমলের উদ্দেশ্যে পড়ে না; পড়ে একটি চাকরী লাভের উদ্দেশ্যে। এই শ্রেণীর আলেম ও তালেবে ইল্‌মকে সতর্ক করে বলি যে, নিয়ত যদি প্রথম, শেষ ও প্রধান দুনিয়া কামানোই হয়, তাহলে তাঁরা যেন ওশর-যাকাত দ্বারা পরিচালিত ঐ প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার না করেন। নচেৎ তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে ঐ শাস্তি। ফাল্লাহুল মুস্তাআন।
আরো এক শ্রেণীর মানুষ আছে, যারা ধার্মিক নয় অথচ ধর্মীয় কোন কোন প্রতীককে (যেমনঃ দাড়ি, টুপী, লম্বা পিরহান প্রভৃতিকে) নিজের ব্যবসার টেকনিক হিসাবে ব্যবহার করে অর্থ কামায়। এরাও যে ধর্মকে ধামা বানিয়ে সরল মানুষের অর্থ লুটে জমা করে, তা বলাই বাহুল্য。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00