📄 বিবাহের পণ বা যৌতুক
পণ বা যৌতুক না নিয়ে বিয়ে না করা অথবা ছেলের বিয়ে না দেওয়া এক প্রকার ঘুস গ্রহণ করার নামান্তর। কন্যাদায়ে পড়া মানুষের নিকট থেকে ঘুস নিয়ে তাকে কন্যাদায় মুক্ত করা এবং বড় ঘর ঢোকার জন্য ঘোষিতভাবে বরপক্ষকে কন্যাপক্ষের ঘুস দেওয়া উভয় কাজই হারাম। হারাম সে মাল ব্যবহার ও ভক্ষণ।
পণপ্রথা শুধু শরীয়ত-বিরোধীই নয়, বরং তা বিবেক, মনুষত্ব, সমাজ ও আইন- বিরোধীও।
অর্থ প্রদান করে বিবাহ না করে, অর্থ গ্রহণ করে বিবাহ করা অবশ্যই কুরআন- বিরোধী। কেননা আল্লাহর কুরআন বলে,
{وَآتُوا النَّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً فَإِن طِبْنَ لَكُمْ عَن شَيْءٍ مِّنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَّرِيئًا } (٤) سورة النساء
অর্থাৎ, তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর সন্তুষ্ট মনে দিয়ে দাও, পরে তারা খুশী মনে ওর (মোহরের) কিয়দংশ ছেড়ে দিলে তোমরা তা স্বচ্ছন্দে ভোগ কর। (সূরা নিসা ৪ আয়াত)
{وَأُحِلَّ لَكُم مَّا وَرَاءَ ذَلِكُمْ أَن تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُم مُّحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ فَمَا اسْتَمْتَعْتُم بِهِ مِنْهُنَّ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَةً وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا تَرَاضَيْتُم بِهِ مِن بَعْدِ الْفَرِيضَةِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا } (٢٤) سورة النساء
অর্থাৎ, উল্লেখিত নারিগণ ব্যতীত আর সকলকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হল; এই শর্তে যে, তোমরা তাদেরকে নিজ সম্পদের বিনিময়ে বিবাহের মাধ্যমে গ্রহণ করবে, অবৈধ যৌন-সম্পর্কের মাধ্যমে নয়। অতঃপর তোমরা তাদের মধ্যে যাদের (মাধ্যমে দাম্পত্যসুখ) উপভোগ করবে, তাদেরকে নির্ধারিত মোহর অর্পণ কর। মোহর নির্ধারণের পর কোন বিষয়ে পরস্পর রাযী হলে তাতে তোমাদের কোন দোষ হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (ঐ ২৪ আয়াত)
{فَانكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ مُحْصَنَاتِ غَيْرَ مُسَافِحَاتِ وَلَا مُتَّخِذَاتِ أَخْدَانٍ} (٢٥) سورة النساء
অর্থাৎ, সুতরাং তারা (প্রকাশ্যে) ব্যভিচারিণী অথবা (গোপনে) উপপতি গ্রহণকারিণী না হয়ে সচ্চরিত্রা হলে তাদের মালিকের অনুমতিক্রমে তাদেরকে বিবাহ কর এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে তাদেরকে তাদের মোহর প্রদান কর। (ঐ ২৫ আয়াত)
পণগ্রহীতা সমাজ-বিরোধী লোক। যেহেতু পণের ছোবলে মেয়ের মা-বাবা নিঃস্ব হয়, পণ দিতে না পারলে সংসারে তাকে নানা গঞ্জনা ও অত্যাচার চোখ বুজে সহ্য করতে হয়। অনেক সময় অনেক বধূ আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে তাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয় অথবা খুন করা হয়।
পণের অভিশাপে অনেক যুবতীর বিবাহ যথাসময়ে হয় না, ফলে সমাজে ব্যভিচার বৃদ্ধি পায়, বৃদ্ধি পায় জারজ সন্তান ও ভ্রূণ হত্যা। আর তার জন্যই তা আইন-বিরোধীও।
পণপ্রথার কারণেই সমাজে নারী অবহেলিতা। সন্তানের আশাধারী অধিকাংশ পিতামাতাই কন্যাসন্তান চায় না। অনেকে পরীক্ষা করিয়ে ভ্রূণ অবস্থাতেই তাকে হত্যা করে ফেলে! আর এ অবস্থায় সে জাহেলী যুগের বর্বর মানুষদের মত জাহেলী কাজ করে।
মেয়ে উপহার দিয়ে উপকারের বিনিময়ে শ্বশুর তার জামায়ের নিকট থেকে প্রাপ্ত হয় যৌতুকের বিষফুল! অথচ আল্লাহর কুরআন বলে, "উপকারের বিনিময় উপকার ব্যতীত আর কি হতে পারে?” (সূরা রাহমান ৬০ আয়াত)
পণের প্ররোচনায় পড়ে মেয়ে বাবার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিতা হয়।
অনেক ক্ষেত্রে পণ গ্রহণ করে স্বামী তার বিবির গোলাম হয়।
অতএব পণ ও যৌতুকে নেওয়া আসবাব-পত্র, টাকা, জমি ইত্যাদি কি মুসলিমদের জন্য বৈধ হতে পারে?
পক্ষান্তরে যে নিরুপায় সে কি করবে? পণ না দিয়ে যদি বিয়ে না-ই হয়, তাহলে ঘুসদাতার পাপ না হলেও পণ ও ঘুসগ্রহীতার পাপ তো হবেই।
📄 হারাম বস্তুর ব্যবসা
ইসলামের একটি চিরন্তন নীতি এই যে, যে জিনিস খাওয়া ও ব্যবহার হারাম, সে জিনিসের ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবসা হারাম। মহানবী বলেন, “অবশ্যই আল্লাহ যখন কোন জিনিসকে হারাম করেন, তখন তিনি তার মূল্যও হারাম করেন।” (মুসলিম ১৫৭৯নং)
আর এই ভিত্তিতেই যাবতীয় হারাম জিনিসের মূল্য ও মুনাফা ভক্ষণ করা হারাম। বলা বাহুল্য, কুকুর, বিড়াল প্রভৃতি হারাম পশু ও বস্তুর মূল্য হারাম। মহানবী (শিকারী বা শিক্ষাপ্রাপ্ত কুকুর ছাড়া অন্য) কুকুর, শূকর, মদ, রক্ত ইত্যাদির মূল্যকে হারাম ঘোষণা করেছেন। (সহীহুল জামে' ৬৯৪৭-৬৯৪৯নং)
তিনি বলেন, “যখন কেউ কুকুরের মূল্য চাইতে আসবে, তখন তার হাতে মাটি ভরে দাও।” (আবু দাউদ, প্রমুখ, সহীহুল জামে' ৪৬৫নং)
অবশ্য প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রাপ্ত ও শিকারী কুকুর ক্রয়-বিক্রয় করা যায়। (সহীহুল জামে' ৬৯৪৬-৬৯৪৭নং)
তদনুরূপ যে হারাম প্রাণী উপকারে আসে; যেমন হাতি, গৃহপালিত গাধা ইত্যাদি ক্রয়-বিক্রয় করা অবৈধ নয়。
একদা এক সম্প্রদায় ইবনে আব্বাস-কে মদ ক্রয়-বিক্রয় ও তার ব্যবসা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে তিনি বললেন, 'তোমরা কি মুসলমান?' তারা বলল, জী হ্যাঁ। তিনি বললেন, 'তাহলে তার ক্রয়-বিক্রয় ও তার ব্যবসা শুদ্ধ নয়। (মুসলিম ২০০৪নং)
বাদ্যযন্ত্র ইসলামে হারাম। হারাম তার মূল্যও। সুতরাং গান-বাজনার সাজ-সরঞ্জামের ব্যবসা করা কোন মুসলিমের জন্য বৈধ নয়।
বৈধ নয় হারাম করা জিনিসকে 'ঘুরিয়ে নাক দেখানো'র মত হালাল করার চেষ্টা করা। মহানবী মক্কা বিজয়ের সময় মক্কায় ঘোষণা করেন যে, "অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রসূল মদ, মৃত প্রাণী, শূকর ও মূর্তির ব্যবসাকে হারাম ঘোষণা করেছেন।” বলা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! মৃত প্রাণীর চর্বি সম্বন্ধে আপনার অভিমত কি? যেহেতু তা দিয়ে পানি-জাহাজ ও চামড়া তেলানো হয় এবং লোকেরা বাতি জ্বালায়?' উত্তরে তিনি বললেন, “না, তা হারাম।" আর এই সময় তিনি বললেন, "আল্লাহ ইয়াহুদ জাতিকে ধ্বংস করুন। আল্লাহ যখন তাদের উপর মৃত প্রাণীর চর্বি হারাম করলেন, তখন তারা তা গলিয়ে বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষণ করল!” (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ২৭৬৬নং)
প্রকাশ থাকে যে, যে জিনিস মুসলিমদের কারো জন্য ব্যবহার বৈধ অথবা যা হারাম ও হালাল উভয় কাজে ব্যবহার করা যায় তার ব্যবসা অবৈধ নয়। যেমন স্বর্ণ, রেশমী কাপড়, ভিডিও, টেপ ইত্যাদি। অবশ্য যদি সুনিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, ক্রেতা তা হারাম কাজে ব্যবহার করবে, তাহলে তাকে তা বিক্রয় করা বৈধ নয়।
যেমন আপনাকে যদি কেউ স্বর্ণ উপহার দেয়, তাহলে তা বিক্রয় করে তার মূল্য ভক্ষণ করা অথবা তা কোন মহিলাকে দান বা উপহার দেওয়া হারাম নয়। (দ্রষ্টব্য সহীহ মুসলিম ২০৬৮-২০৭১নং)
📄 মৃত প্রাণীর ব্যবসা
মহান আল্লাহ (মাছ ও পঙ্গপাল ছাড়া) যে সকল পশু আমাদের জন্য হালাল করেছেন, তা মারা গেলে হারাম হয়ে যায়। সুতরাং সে মৃত প্রাণী বিক্রয় করাও আমাদের জন্য হারাম।
উপরোক্ত হাদীসে মদ, মৃত প্রাণী, শূকর ও মূর্তির ব্যবসাকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণীর চর্বি বিক্রয়কেও। মহানবী আরো বলেছেন, "অবশ্যই আল্লাহ মদ ও তার মূল্য, মৃত ও তার মূল্য এবং শূকর ও তার মূল্যকে হারাম ঘোষণা করেছেন।” (আবু দাউদ ৩৪৮৫নং)
মমি করা পশু-পক্ষীও ক্রয়-বিক্রয় করে ব্যবসা বৈধ নয়। যেহেতু তা মৃত-ব্যবসারই শামিল। (ফাতাওয়াল্লাজনাহ ৫৩৫০নং)
কিন্তু অনেক হারামখোর মানুষ মৃত পশুর গোশ্ত বা কাঁচা চামড়া বিক্রয় করে পয়সা খায়। যা নেহাতই দুঃখজনক ব্যাপার।
তবে হ্যাঁ, মরা পশুর চামড়াকে দাবাগত দিলে (নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পবিত্র করলে) তা পাক হয়ে যায়। আর তখন তা ব্যবহার করা বৈধ হয়। ইবনে আব্বাস বলেন, একদা উম্মুল মুমিনীন মাইমুনাহ (রাঃ) এর স্বাধীন করা দাসীকে একটি বকরী দান করা হলে সেটা পরবর্তীতে মারা যায়। আল্লাহর রসূল তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় বললেন, "তোমরা এর চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে উপকৃত হলে না?” বলা হল, এটা তো মৃত। তিনি বললেন, “একে ভক্ষণ করাই কেবল হারাম করা হয়েছে।” (বুখারী, মুসলিম)
ইবনে আব্বাস বলেন, 'মরা পশুর গোশ্ত খাওয়া হারাম। কিন্তু তার চামড়া, দাঁত, হাড়, চুল ও পশম ব্যবহার করা হালাল।' (ফিকহুস সুন্নাহ ১/২৪)
বলা বাহুল্য, নির্দিষ্ট পদ্ধতি মতে এ সব পবিত্র করে ব্যবহার করায় দোষ নেই। দোষ নেই পবিত্র করার পর সেসব বিক্রয় করে তার মূল্য ভক্ষণ করায়। অবশ্য পশু মরার পর তার চামড়া ছাড়িয়ে তা পবিত্র না করে বিক্রয় করা ও তার মূল্য ব্যবহার করা হারাম। উল্লেখ্য যে, মৃত পশু কোন মড়াখেকো জাত কাফেরকে কোন বিনিময় ছাড়া দিয়ে দেওয়া দূষণীয় নয়।
📄 নিষিদ্ধ ব্যবসা
মহান আল্লাহ সুদকে হারাম করেছেন এবং ব্যবসাকে করেছেন হালাল। কিন্তু প্রত্যেক ব্যবসাই যে হালাল তা নয়। বরং তার পদ্ধতি ভিন্ন হওয়ার জন্য কোন কোন ব্যবসা হারাম। সুতরাং হারাম থেকে বাঁচার জন্য প্রত্যেক ব্যবসায়ীকে হালাল ব্যবসার পদ্ধতি ও শর্তাবলী জানা আবশ্যক।
ব্যবসা শুদ্ধ ও হালাল হওয়ার জন্য শর্তাবলী নিম্নরূপঃ-
১। পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারে ক্রেতা ও বিক্রেতার পরস্পর সন্তুষ্টি ও সম্মতি থাকতে হবে। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেন,
((يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُوْنَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مَّنْكُمْ))
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অন্যের ধন-সম্পত্তি অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না; তবে তোমাদের পরস্পরের সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা করে খেতে পার। (সূরা নিসা ২৯ আয়াত) সুতরাং জোরপূর্বক ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। অবশ্য কারো ঋণ পরিশোধের জন্য সরকার কর্তৃক সম্পত্তি বিক্রি করতে বাধ্য করার কথা স্বতন্ত্র।
২। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই (অর্থাদির ব্যাপারে) ইচ্ছা অনুযায়ী ব্যবহারের বা নিয়ন্ত্রণের অধিকারপ্রাপ্ত হতে হবে। অর্থাৎ উভয়কেই স্বাধীন, জ্ঞান-বিবেকসম্পন্ন মানুষ হতে হবে। সুতরাং কোন ক্রীতদাস তার প্রভুর অনুমতি ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় করতে পারে না। যেমন কোন শিশু, পাগল বা অর্বাচীন (অপরিপক্কবুদ্ধি) ব্যক্তির ক্রয়-বিক্রয় শুদ্ধ নয়।
৩। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই অর্থ ও পণ্যের মালিক অথবা তার প্রতিনিধি হতে হবে। মূল্য ও মালের মালিক অথবা তার প্রতিনিধি না হওয়া পর্যন্ত ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়।
৪। ক্রয়-বিক্রয়ের পণ্য হালাল ব্যবহার-যোগ্য হতে হবে। যেহেতু হারাম জিনিসের ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়।
৫। ক্রয়-বিক্রয়ের পণ্য ও মূল্য ক্রেতা ও বিক্রেতার নিয়ন্ত্রণাধীন হতে হবে। যাতে যথাসময়ে সমর্পণ করা সম্ভব হয়।
বলা বাহুল্য, পালিয়ে বা হারিয়ে যাওয়া পশু, ছেড়ে রাখা মুরগী বা পাখী, চুরি হয়ে যাওয়া কোন মাল ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়।
৬। ক্রয়-বিক্রয়ের পণ্য ও মূল্য ক্রেতা ও বিক্রেতার নিকট বিদিত ও পরিচিত হতে হবে। নচেৎ অজান্তে না দেখে আন্দাজে ক্রয়-বিক্রয়ে ধোকার আশঙ্কা থাকবে, ফলে তা অবৈধ হবে।
৭। পণ্য ক্রেতার আয়ত্ত ও হস্তগত হতে হবে। অর্থাৎ, কেনা মাল তুলে নিয়ে নিজের তত্ত্বাবধানে করে নিতে হবে। মাল কিনে সেখানেই বিক্রেতার তত্ত্বাবধানে ছেড়ে রাখা বৈধ নয়। যেহেতু তাতে পরে বিবাদ সৃষ্টি হতে পারে। মাল নষ্ট হলে অথবা বিক্রেতা অন্যের নিকট দর বেশী পেলে ক্রেতার সাথে কলহ বাধার আশঙ্কা আছে। তাই শরীয়তের নীতি হল, অস্থাবর পণ্য ক্রয়ের পর বিক্রেতা নিজের আয়ত্তাধীন করে নেবে। স্থাবর সম্পত্তি জমি, জায়গা বাড়ি ইত্যাদি দখলের মাধ্যমে নিজের অধিকারভুক্ত করে নেবে।
উপর্যুক্ত শর্তাবলী পূরণ না হওয়ার দরুন যে সকল ব্যবসা-বাণিজ্য বৈধ নয় তার কিছু নিম্নরূপঃ-
১। ফল-ফসল পাকার আগে এবং দুর্যোগমুক্ত হওয়ার পূর্বে ক্রয়-বিক্রয় হারাম। (বুখারী, মুসলিম প্রমুখ)
অতএব ধান, গম, খেজুর প্রভৃতি পাকার আগে জমিতেই এবং আম, লিচু প্রভৃতি ধরার পর ফুল অবস্থাতেই গোটা বাগান বিক্রি করা বৈধ নয়। কারণ তাতে ক্রেতা অথবা বিক্রেতা কারো না কারো ধোকায় পড়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রকাশ থাকে যে, পাকার পর গাছে থাকা অবস্থায় কোন ফল-ফসল বিক্রি হওয়ার পর যদি কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের (ঝড়-বৃষ্টি-শিলাবৃষ্টির) ফলে তা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে ক্ষতি কার হবে; ক্রেতার না বিক্রেতার?
এ ব্যাপারে মহানবী বলেন, "যে ব্যক্তি ফল বিক্রি করে, অতঃপর তা প্রাকৃতিক দুর্যোগগ্রস্ত হয়ে যায়, তাহলে সে যেন তার ভায়ের মাল থেকে কিছুও গ্রহণ না করে। তোমাদের কেউ কিসের বিনিময়ে নিজ মুসলিম ভায়ের মাল ভক্ষণ করবে?” (সহীহুল জামে' ৬১১৭নং)
অবশ্য বিক্রয়ের পর তা যদি ক্রেতার অবহেলা ও ত্রুটির কারণে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে সে কথা ভিন্ন।
২। বাগান বা ক্ষেতের কয়েক বছরের ফল-ফসলকে বিক্রয় করা হারাম। (মুসলিম ১৫৩৬নং) যেহেতু পূর্বের তুলনায় এই ব্যবসাতে অধিক ধোকার আশঙ্কা আছে।
৩। এক পশুর বিনিময়ে অপর পশু ধারে ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। অবশ্য নগদ নগদ একটির বিনিময়ে দুটি ক্রয়-বিক্রয়ও বৈধ। (সিলসিলাহ সহীহাহ ২৪১৬নং)
৪। পশুর গর্ভস্থিত ভ্রূণের বিনিময়ে পশু ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। (বুখারী, মুসলিম ১৫১৪নং)
৫। জীবিত পশুর বিনিময়ে গোশু বিক্রয় করা বৈধ নয়। (সহীহুল জামে' ৬৯৩৬নং) যেহেতু তাতে ধোকার আশঙ্কা রয়েছে।
৬। খেজুরের বিনিময়ে গাছপাকা খেজুর, কিশমিশের বিনিময়ে আঙ্গুর, পুরাতন গমের বিনিময়ে নতুন গম ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। (বুখারী, মুসলিম ১৫৪২নং) কারণ, তাতে ধোকা ও সূদের গন্ধ আছে।
৭। নির্দিষ্ট পরিমাণ খেজুরের পরিবর্তে এক রাশ খেজুর ক্রয়-বিক্রয় হারাম; যার পরিমাণ অজানা। (আহমাদ, মুসলিম, নাসাঈ, সহীহুল জামে' ৩৯৩৪নং)
৮। এক স্তূপ খাদ্যের বিনিময়ে এক স্তূপ খাদ্য অথবা নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যের বিনিময়ে এক স্তূপ খাদ্য ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। (নাসাঈ, সহীহুল জামে' ৭১৯৮-নং) যেহেতু তাতেও ধোকার আশঙ্কা বর্তমান।
৯। কিছু ছুঁড়ে নির্দিষ্ট করে ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। যেমন: আমি এই টাকার বিনিময়ে যে কাপড়ের উপর আমার ছুঁড়া এই পাথর পড়বে, সেটা তোমাকে বিক্রি করলাম। অথবা এখান থেকে যতদূর পর্যন্ত আমার ছুঁড়া এই ঢিল যাবে, ততদূর পর্যন্ত জমি তোমাকে বিক্রি করলাম। অথবা আমার পাথর ছুঁড়া পর্যন্ত তোমার মাল ফেরতের এখতিয়ার থাকবে। অথবা এই পাথর ছুঁড়লেই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি কার্যকর হয়ে যাবে। এই শ্রেণীর কথা বলে ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। (শারহুন নাওয়াবী ১০/১৫৬) সম্ভবতঃ রিং ছুঁড়ে নির্দিষ্ট করা মাল ক্রয়-বিক্রয় করা এই ব্যবসারই পর্যায়ভুক্ত। আর সেটা এক শ্রেণীর জুয়া।
১০। কেবল পণ্য স্পর্শ করেই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি কার্য করা বৈধ নয়। যেমন এক অপরের পণ্য বস্ত্র স্পর্শ করে বলে, ছোঁয়া মাত্র আমার কাপড়ের বিনিময়ে তোমার কাপড় ক্রয় অথবা বিক্রয় করলাম। আর তারা এক অপরের কাপড় পরীক্ষা করেও দেখে না। যেহেতু এই শ্রেণীর স্পর্শ ব্যবসাতেও ধোকার আশঙ্কা আছে।
১১। ক্রেতা-বিক্রেতার উভয়ের নিজ নিজ পণ্য ফেলে ব্যবসা চুক্তি বহাল করা বৈধ নয়। যেমন: আমার কাছে যা আছে তা এখানে রাখছি, তোমার কাছে যা আছে তুমিও এখানে রাখ। অতঃপর আমার পণ্যের বিনিময়ে তোমার পণ্য আমি ক্রয় করব। অথচ তারা উভয়েই একে অন্যের পণ্য (তার পরিমাণ ও গুণ) সম্পর্কে কোন ধারণা রাখে না। (বুখারী, মুসলিম ১৫১১নং)
১২। কোন পণ্য নিজের আয়ত্তে বা মালিকানায় না আনা পর্যন্ত বিক্রি করা অবৈধ। (আবু দাউদ ৩৪৯৫নং, তিরমিযী, নাসাঈ, ইরওয়া ১৩৮৬নং)
অতএব আরতদারদের ধানের গোলা কিনে বিক্রেতার বাড়িতে থাকা অবস্থাতেই মিলকে বিক্রি করা বৈধ ব্যবসা নয়।
তদনুরূপ কোন দোকানে কোন পণ্য ক্রয় করার পর তা নিজের আয়ত্তে না নিয়ে গুদামে বা দোকানে পড়ে থাকা অবস্থাতেই অন্য কাউকে বিক্রয় করা বা করতে বলা বৈধ নয়।
অনুরূপভাবে আপনার দোকানে মাল নেই। আপনি অর্ডার নিয়ে মাল আনিয়ে বিক্রি করতে পারেন। কিন্তু মাল দোকানে না আনিয়ে তার দাম নিয়ে সরাসরি সেই দোকান থেকে ক্রেতাকে নিতে বলা যে দোকান থেকে আপনি মাল তোলেন অথবা সেই দোকান থেকে আপনার দোকানে বা আয়ত্তে মাল না এনেই সরাসরি সেখান থেকে ক্রেতার হাওয়ালা করা বৈধ নয়।
১৩। একটি ব্যবসা-চুক্তির ভিতরে অন্য একটি চুক্তি সংযোগ করে ব্যবসা করা বৈধ নয়। (তিরমিযী, নাসাঈ, সহীহুল জামে' ৬৯৪৩নং) যেমন: আমি এই পণ্য এই শর্তে বিক্রি করছি যে, তুমি আমাকে তোমার অমুক বাড়িটা ভাড়া দেবে। অথবা আমি এই পণ্য এই শর্তে বিক্রি করছি যে, তুমি আমাকে তোমার অমুক কাজে অংশী করবে। অথবা আমি এই পণ্য এই শর্তে বিক্রি করছি যে, তুমি আমাকে এত টাকা ঋণদান করবে। অথবা এই দুটি গরুর মধ্যে একটিকে এত টাকায় বিক্রি করলাম। অতঃপর চুক্তি পাকা হয়ে যাবে অথচ দুটি গরুর কোন্ন্টি তা নির্ধারিত হবে না। অথবা এই জিনিসটি নগদে এত টাকায় এবং ধারে এত টাকায় বিক্রি করলাম। অতঃপর চুক্তি হয়ে যাবে অথচ দুটি অবস্থার একটিও নির্ধারিত করা হবে না। এ সকল দ্বিচুক্তিমূলক ব্যবসা ধোকার জন্য বৈধ নয়।
১৪। ব্যবসার সাথে ঋণ চুক্তি বৈধ নয়। (তিরমিযী, সিলসিলাহ সহীহাহ ১২১২নং) যেমন এই বলে চুক্তি করা যে, এই জিনিস তোমাকে এক হাজার টাকায় বিক্রি করব এই শর্তে যে, তুমি আমাকে ৫০০ টাকা ঋণদান করবে। যেহেতু বিক্রেতাকে ঋণ দেওয়ার ফলে ক্রেতা কম দামে মাল পাচ্ছে, তাই তা সূদের পর্যায়ভুক্ত হয়ে পড়বে।
১৫। নিজের কুঁয়ো, ঝরনা, পুকুর ইত্যাদির অতিরিক্ত পানি বিক্রি করা বৈধ নয়। (মুসলিম ১৫৬৫নং) যেহেতু পানি হল সাধারণী জিনিস। নির্দিষ্ট কেউ তার মালিক হয় না। জন সাধারণ সকলে তাতে শরীক থাকে। (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ সহীহুল জামে' ৬৭১৩নং)
১৬। কোন বাজারবাসী লোকের বহিরাগত লোকের মাল বিক্রয় করে দেওয়া বৈধ নয়। যেমন কোন গ্রাম্য চাষী বা বাইরের লোক মাল নিয়ে বাজারে এল। উচিত ও নিয়ম হল সেই লোক আজকের বাজার দর অনুপাতে সেই মাল আজই বিক্রি করবে। কিন্তু কোন বাজারবাসী তাকে বলল, তুমি তোমার মাল আমার কাছে ছেড়ে যাও। ২/১ দিন পর এর চাইতে বেশী দরে তোমার মাল বিক্রয় করে দেব। অথচ সাধারণ লোক ঐ মালের মুখাপেক্ষী। সুতরাং জনসাধারণ যাতে অসুবিধায় না পড়ে তার জন্য মহানবী বলেন, “কোন বাজারবাসী যেন মরুবাসীর জন্য বিক্রয় না করে। লোকেদের ছেড়ে দাও, আল্লাহ তাদের কিছুকে কিছুর নিকট থেকে রুযী দান করবেন।” (বুখারী, মুসলিম) অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, বহিরাগত লোক যদি বাজারবাসীর নিজের বাপ-ভাইও হয়, তবুও সে যেন তার তরফ থেকে তার পণ্য বিক্রয় না করে দেয়। (নাসাঈ ৪৪৯২নং)
১৭। বাজারে মাল আসার আগেই বাজারের বাইরে গিয়ে বহিরাগত বিক্রেতাদের নিকট থেকে মাল ক্রয় করা। (বুখারী, মুসলিম) এতে বিক্রেতা বাজার দর বুঝতে পারে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ধোকায় পড়ে সে ন্যায্য মূল্য পেতে পারে না। অপর দিকে বাজারে মালের আমদানী ব্যাহত হয়, আর তার ফলে মুনাফাখোরদের ঐ চালাকীর কারণে বাজারদর বৃদ্ধি পেতে থাকে।
১৮। গাভীর দুধ না দুইয়ে কিছুদিন জমা রেখে বিক্রির সময় দুইয়ে দেখিয়ে অনেক দুধ দেয় বলে বিক্রি করা। এমন বিক্রয় ও তার টাকা হারাম। যেহেতু তাতে ক্রেতাকে ধোকা দেওয়া হয় তাই। (বুখারী ২১৪৮নং, মুসলিম)
১৯। কাউকে ধারে কোন মাল বিক্রি করে সেই মাল কম দামে তারই নিকট থেকে ক্রয় করা হারাম। যেমন এক ব্যক্তির অর্থের প্রয়োজন হল। ঋণ কোথাও না পেয়ে এক গাড়ির ডিলারের নিকট গেল। ডিলারের নিকট থেকে ধারে ৫০ হাজার টাকায় একটি গাড়ি কিনল। অতঃপর সেই গাড়িকেই ঐ ডিলারের নিকট নগদ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে বিক্রি করল। যার ফলে ১০ হাজার টাকা ডিলারের পকেটে অনায়াসে এসে গেল। এই ব্যবসাকে শরীয়তে 'ঈনাহ' ব্যবসা বলা হয়। সত্যানুসন্ধানী উলামাগণ এই প্রকার ক্রয়-বিক্রয়কে সূদী কারবার বলে আখ্যায়ন করেছেন।
আল্লাহর রসূল বলেন, "যখন তোমরা 'ঈনাহ' ব্যবসা করবে এবং গরুর লেজ ধরে কেবল চাষ-বাস নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে, আর জিহাদ ত্যাগ করে বসবে, তখন আল্লাহ তোমাদের উপর এমন হীনতা চাপিয়ে দেবেন; যা তোমাদের হৃদয় থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত দূর করবেন না; যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের দ্বীনের প্রতি প্রত্যাবর্তন করেছ।” (মুসনাদে আহমদ ২/২৮,৪২, ৮৪, আবু দাউদ ৩৪৬২, বাইহাকী ৫/৩১৬)
প্রকাশ থাকে যে, মাল বিক্রয়ের পর প্রয়োজনে যদি ঐ মালই ক্রেতার নিকট থেকে ক্রয় করতে হয়, তাহলে যে দামে বিক্রয় করেছিল সেই দামেই অথবা তার থেকে বেশী দামে ক্রয় করাতে দোষ নেই। পক্ষান্তরে তার থেকে কম দামে নিলে সূদী কারবারের পর্যায়ভুক্ত হয়ে যাবে। (বাইউস স্বাবুন ৩৬পৃঃ)
২০। বাগান বিক্রি করার সময় নির্দিষ্ট না করে, অনির্দিষ্টভাবে ২/১টি গাছ বিক্রয় না করে ছেড়ে রাখা বৈধ নয়। (তিরমিযী ১২৯০নং, নাসাঈ) কারণ তাতে ধোকা ও ঝগড়ার আশঙ্কা থাকে।