📄 তর্কপণ
দুই ব্যক্তি কোন বিষয়ে মতভেদ করে তর্কের সাথে বলে, 'আমি যা বলছি তা যদি সত্য বা সঠিক হয়, তাহলে তোমাকে এই এই লাগবে।' এবং যা লাগবে তার নাম নেয়। (অর্থাৎ এত মিষ্টি খাওয়াতে হবে বা এত পয়সা দিতে হবে ইত্যাদি বলে)। 'আর তুমি যা বলছ তা যদি সত্য বা সঠিক হয়, তাহলে আমি এই এই দেব।' এবং যা দেবে তার নাম নেয়। এরূপ বাজি রাখা হারাম। কারণ এ কাজ জুয়ার পর্যায়ভুক্ত, যাকে আল্লাহ তাআলা মদের পাশাপাশি উল্লেখ করে বলেছেন, "হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য-নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর। এতে তোমরা সফলকাম হতে পারবে। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে ও নামাযে বাধা দিতে চায়। অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে?” (সূরা মা-য়েদাহ ৯০-৯১ আয়াত) (আসইলাতুম মুহিম্মাহ, ইবনে উসাইমীন, ১৪ পৃঃ)
বলাই বাহুল্য যে, এমন অর্থ গ্রহণ ও ভক্ষণ করা বৈধ নয়।
প্রকাশ থাকে যে, বাজি এক পক্ষভাবে হলে তা পুরস্কারের মত, জুয়ার মত নয়। যেমন, 'তোমার কথা যদি সত্য হয়, তাহলে তোমাকে এত টাকা দেব।' আর সত্য না হলে কেউ কিছু পাবে না। এমন বাজি রাখা বৈধ।
📄 ঘুস বা বখশিস
ঘুস খাওয়া একটি মহা অন্যায় ও বৃহৎ অপকর্ম। অসৎ উপায়ে অপরের অর্থ যে সব উপায়ে আত্মসাৎ করা হয়, তার মধ্যে ঘুস অন্যতম। ইসলামে এই ঘুসকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُواْ بِهَا إِلَى الْحُكَامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ ))
অর্থাৎ, তোমরা একে অন্যের ধন অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং লোকেদের ধন- সম্পদের কিয়দংশ জেনে-শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকগণকে ঘুস দিও না। (সূরা বাক্বারাহ ১৮৮ আয়াত)
يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تَجَرَةً عَن تَرَاضٍ مِنكُمْ وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا ( )
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। তবে তোমাদের পরস্পর রাজী হয়ে ব্যবসার মাধ্যমে (গ্রহণ করলে তা বৈধ)। আর আত্মহত্যা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। (সূরা নিসা ২৯ আয়াত)
আল্লাহর রসূল ঘুষখোর, ঘুষদাতা (উভয়কেই) অভিশাপ করেছেন। (আবু দাউদ ৩৫৮০, তিরমিযী ১৩৩৭, ইবনে মাজাহ ২৩১৩, ইবনে হিব্বান, হাকেম ৪/১০২-১০৩, সহী আবু দাউদ ৩০৫৫নং)
ঘুষকে বখশিস, পারিতোষিক, উৎকোচ, আউট ইনকাম, উপহার বা উপঢৌকন যাই বলুন না কেন, অবৈধ সম্পর্ক ও ব্যভিচারের নাম 'প্রেম' বা 'ভালোবাসা' রাখলে, সূদের নাম 'লভ্যাংশ' বা 'ইন্টারেষ্ট' রাখলে, মদের নাম 'সুরা' বা 'শারাব' রাখলে, গান-বাদ্যের নাম 'রূহের খোরাক' রাখলে, বেশ্যা ও কসবীর নাম 'যৌনকর্মী' রাখলে লোভনীয় ও পবিত্র নামে যেমন তা বৈধ হতে পারে না; তেমনিই ঘুসও নব ও সভ্য নামে সেই ঘুসই এবং তা সর্বনামে হারাম ও অবৈধ।
যে কাজ করা মানুষের কর্তব্য, সে কাজ পারিতোষিক ছাড়া না করলে ঘুস খাওয়া হয়। যে কাজ মানুষের করা অন্যায়, তা টাকার বিনিময়ে করলে ঘুস খাওয়া হয়। অর্থের লোভে পরের বাপ-মা বা দাদা-দাদী সেজে অভিভাবকত্ব করা কিছু লিখে দেওয়া।
টাকার বিনিময়ে অন্যায়ের সহযোগিতা করা এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা হতে না দেওয়া। মালের বদলে মিথ্যা সাক্ষী দেওয়া। অর্থের বিনিময়ে সত্য সাক্ষি গোপন করা। মালের বদলে সত্য গোপন করা।
মালের বদলে অপরাধী না ধরা, বরং অপরাধীর পৃষ্ঠপোষকতা বা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা; বিষধর সাপের মুখে জড়ি পড়লে যেমন সে শান্ত হয়ে যায়, জোঁকের মুখে লবণ পড়লে যেমন জোঁক গলে যায়, কুকুরের মুখে মাংস পড়লে যেমন সে চুপ হয়ে যায়, ঠিক সেই রকম শক্তিধর রক্ষকদের মুখে অর্থ পড়লে তারা শক্তিহীন হয়ে যায়। অনেক সময় রক্ষকই ভক্ষকরূপে সর্বনাশ করে দুর্বল জন-সাধারণের।
মালের বদলে অন্যায়ের প্রতিবাদ না করা। কর্মস্থলে নির্দিষ্ট বেতন আছে, তার পরেও বখশিস ছাড়া কর্তব্য পালন না করা। এ সকল কাজ হল ঘুসখোরদের। ইঙ্গিতে ভিক্ষা করে ঐ শ্রেণীর ভদ্র ভিখারীরা। সাধুর বেশে চুরি করে ঐ শ্রেণীর হারামখোরেরা। সাধারণ নাচার মানুষের নাচার অবস্থাকে সুবর্ণ সুযোগ হিসাবে ব্যবহার করে অর্থ ভক্ষণ করে ঐ শ্রেণীর হাঙ্গরেরা।
যেখানে ঘুস চলে, সেখানে আইন স্তব্ধ। যেখানে টাকা কথা বলে, সেখানে হক চুপ থাকে। যেখানে টাকার দাপ, সেখানে সাত খুন মাফ। যার আছে টাকা, তার সব পাপ ঢাকা! যার নাই টাকা, তার সব কথাই ঢাকা! টাকা যার, মামলা তার। ঘুসখোরদের শ্লোগান হল, 'ধনীর মাথায় ধর ছাতি, নির্ধনেরে মার লাথি।' পক্ষান্তরে বেতনভোগী কর্মচারীদের কাজের উপর কোন প্রকার উপহার ও হাদিয়া নেওয়া বৈধ নয়। যেহেতু তাতে উপহার-গ্রহীতার যেমন অর্থলোভ বৃদ্ধি পাবে, তেমনি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করায় মনে শিথিলতা আসবে।
মহানবী আযদের ইবনে লুতবিয়্যাহ নামক এক ব্যক্তিকে যাকাত আদায় করার কাজে কর্মচারী নিয়োগ করেছিলেন। সে ব্যক্তি (আদায়কৃত মাল সহ) ফিরে এসে বলল, 'এটা আপনাদের (বায়তুল মালের), আর এটা আমাকে উপহার স্বরূপ দেওয়া হয়েছে।' এ কথা শুনে আল্লাহর রসূল উঠে দন্ডায়মান হয়ে আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করে বললেন, "অতঃপর বলি যে, আল্লাহ আমাকে যে সকল কর্মের অধিকারী করেছেন তার মধ্য হতে কোনও কর্মের তোমাদের কাউকে কর্মচারী নিয়োগ করলে সে ফিরে এসে বলে কি না, 'এটা আপনাদের, আর এটা উপহার স্বরূপ আমাকে দেওয়া হয়েছে!' যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে তার বাপ-মায়ের ঘরে বসে থেকে দেখে না কেন, তাকে কোন উপহার দেওয়া হচ্ছে কিনা? আল্লাহর কসম! তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোন জিনিস অনধিকার গ্রহণ করবে সে কিয়ামতের দিন তা নিজ ঘাড়ে বহন করা অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে। অতএব আমি যেন অবশ্যই চিনতে না পারি যে, তোমাদের মধ্য হতে কেউ নিজ ঘাড়ে চিঁহি-রববিশিষ্ট উট, অথবা হাম্বা-রববিশিষ্ট গাই, অথবা মে-মে-রববিশিষ্ট ছাগল বহন করা অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করেছ।”
আবু হুমাইদ বলেন, অতঃপর নবী তাঁর উভয় হাতকে উপর দিকে এতটা তুললেন যে, তাঁর উভয় বগলের শুভ্রতা দেখা গেল। অতঃপর বললেন, “হে আল্লাহ! আমি কি পৌঁছে দিলাম?” (বুখারী ৬৯৭৯, মুসলিম ১৮৩২নং, আবু দাউদ)
যাকাত আদায়কারী কর্মচারীকে উপহার দেওয়ার পিছনে উপহারদাতাদের এই স্বার্থ ছিল যে, তাদের যাকাতের হিসাব গ্রহণে সে সরলতা বা শিথিলতা অবলম্বন করবে। ফলে তাদের অনেক সম্পদ রক্ষা পেয়ে যাবে। আসলে এটা যে ঘুস তাতে কোন সন্দেহ নেই। আর সেই জন্য এ কাজ উপহার দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের জন্য ক্ষতিকর ও হারাম।
তদনুরূপ কোন নেতা, পদস্থ অফিসার, ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী, প্রশাসন বিভাগের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাকে কার্যোদ্ধারের জন্য যে হাদিয়া বা উপহার দেওয়া হয়, তা আসলে খেয়ানতের মাল। তা তাঁদের জন্য গ্রহণ করা বৈধ নয়। মহানবী বলেন, "রাষ্ট্রনেতাকে দেওয়া হাদিয়া হল খেয়ানত (করা মাল)।” (সহীহুল জামে' ৭০৫৪নং)
তিনি আরো বলেন, “যাকে আমরা বেতন দিয়ে কর্মচারী নিযুক্ত করেছি, সে যদি তার পরেও কোন কিছু গ্রহণ করে, তাহলে তা হবে খেয়ানত।” (আবু দাউদ, হাকেম, সহীহুল জামে' ৬০২৩নং)
একটি লোক চাকরি করে এবং মাসিক হারে বেতনও পায়। এখন কোন কাজে খুশ হয়ে যদি কোন ব্যক্তি তাকে অতিরিক্ত বখশিস দেয়, তাহলে তাও নিজের জন্য গ্রহণ করা বৈধ নয়। কাজ সুন্দর দেখে বেতনভোগী কর্মচারীকে দেওয়া অতিরিক্ত বখশিস মালিকের প্রাপ্য। অবশ্য মালিক গ্রহণে অনুমতি দিলে কর্মচারীর জন্য তা হালাল। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৫৬৫পৃঃ)
তদনুরূপ কারো কোন কাজে সুপারিশ করে তার নিকট থেকে উপহার গ্রহণ করলেও এক প্রকার ঘুস খাওয়াই হয়। বরং হাদীস শরীফে এই উপহারকে এক প্রকার বৃহৎ সূদ বলে আখ্যায়ন করা হয়েছে। মহানবী বলেন, "যে ব্যক্তি নিজ ভায়ের জন্য কোন সুপারিশ করল, অতঃপর তাকে কোন উপহার প্রদান করা হল এবং সে তা গ্রহণ করল, সে ব্যক্তি আসলে সূদের দরজাসমূহের এক বড় দরজায় উপস্থিত হল।” (আবু দাউদ ৩৫৪১, সিলসিলাহ সহীহাহ ৩৪৬৫নং)
ঘুস দানে ও গ্রহণে অনেক সময় অপরের হক নষ্ট হয়। সরকারী হক, জনসাধারণের হক অথবা কোন ব্যক্তি বিশেষের হক।
বহু লোক কিছু পাওয়ার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একজন পরে এসে ঘুস দিয়ে তা আগে পেয়ে গেল। ক্ষতিগ্রস্ত হল তারা, যারা ঘুস দিতে পারল না।
একজন সরকারী কোন মাল পাবে ৫ কেজি। কিন্তু ঘুসের বর্কতে অনেকে পেল ১০ কেজি। ক্ষতিগ্রস্ত হল সরকার এবং অনেক জনসাধারণও।
চাকরির জন্য ইন্টারভিউ কল করা হল। চাকরি হবে যোগ্যতার বলে। যার যোগ্যতা বেশী, সেই চাকরির বেশী যোগ্য। কিন্তু যে ঘুস দিতে পারল, চাকরি তারই হল। ক্ষতিগ্রস্ত হল যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ।
বলা বাহুল্য, ঘুস দিয়ে চাকরি নেওয়া বৈধ নয়। যেহেতু তাতে অপেক্ষাকৃত যোগ্য লোক বঞ্চিত থেকে যায়।
তদনুরূপ বৈধ নয় কারো ব্যাকিং নিয়ে চাকরী গ্রহণ করা; যদি বুঝা যায় যে, এই ব্যাকিং ও সুপারিশের ফলে সে অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও চাকরী পেয়ে যাবে এবং তার থেকে অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন লোক ঐ চাকরী থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৫৬৮পৃঃ)
ঘুস যেমন খাওয়া হারাম, তেমনি তা দেওয়াও হারাম। কিন্তু নিজ অধিকার আদায় করতে অন্য কোন উপায় না পেয়ে ঘুস দিতে নিরুপায় হলে, বিনা দোষে কারো পক্ষ থেকে আগত যুগ্ম বন্ধ করার জন্য ঘুস দেওয়া ছাড়া অন্য উপায় না থাকলে, নিজের প্রাপ্য হক আদায়ের জন্য ঘুস দিতে বাধ্য হলে, সে ঘুস নিরুপায়ে দেওয়া বৈধ, কিন্তু নেওয়া হারাম।
আমার প্রাপ্য অধিকার আমাকে দেবে না, বদমাশি ও পয়সা খাবার মন। সে ক্ষেত্রে আমি নিরুপায়। পাপী হবে গ্রহীতা। আমি কোন কলেজে ভর্তি নেব, ঘুস ছাড়া উপায় নেই। আমিই ইন্টারভিউ-এর পর চাকরির সর্বাধিক বেশী যোগ্য, কিন্তু বখশিস (ডোনেশন) ছাড়া বহাল হওয়া মুশকিল। এখন কেউ যদি এমনই অনন্যোপায় হয়, তাহলে নিজের ন্যায় সঙ্গত অধিকার আদায় করার উদ্দেশ্যে ঘুস দিতে হলেও দাতা গোনাহগার হবে না; গোনাহগার হবে গ্রহীতা। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৫৭০পৃঃ) অতএব এ চাকরির বেতনও হারাম হবে না।
ঘুস একটি নোংরা ব্যাধি। ঘুস সৃষ্টি করে যুলম। ঘুসের ফলে সমাজে বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি হয়। ঘুস আনয়ন করে আরো আরো অর্থলোলুপতা। এ ঘুসের টাকা কি হালাল হতে পারে? কোন ঘুসবাবুর দুআ কি কবুল হতে পারে?
📄 বিবাহের পণ বা যৌতুক
পণ বা যৌতুক না নিয়ে বিয়ে না করা অথবা ছেলের বিয়ে না দেওয়া এক প্রকার ঘুস গ্রহণ করার নামান্তর। কন্যাদায়ে পড়া মানুষের নিকট থেকে ঘুস নিয়ে তাকে কন্যাদায় মুক্ত করা এবং বড় ঘর ঢোকার জন্য ঘোষিতভাবে বরপক্ষকে কন্যাপক্ষের ঘুস দেওয়া উভয় কাজই হারাম। হারাম সে মাল ব্যবহার ও ভক্ষণ।
পণপ্রথা শুধু শরীয়ত-বিরোধীই নয়, বরং তা বিবেক, মনুষত্ব, সমাজ ও আইন- বিরোধীও।
অর্থ প্রদান করে বিবাহ না করে, অর্থ গ্রহণ করে বিবাহ করা অবশ্যই কুরআন- বিরোধী। কেননা আল্লাহর কুরআন বলে,
{وَآتُوا النَّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً فَإِن طِبْنَ لَكُمْ عَن شَيْءٍ مِّنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَّرِيئًا } (٤) سورة النساء
অর্থাৎ, তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর সন্তুষ্ট মনে দিয়ে দাও, পরে তারা খুশী মনে ওর (মোহরের) কিয়দংশ ছেড়ে দিলে তোমরা তা স্বচ্ছন্দে ভোগ কর। (সূরা নিসা ৪ আয়াত)
{وَأُحِلَّ لَكُم مَّا وَرَاءَ ذَلِكُمْ أَن تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُم مُّحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ فَمَا اسْتَمْتَعْتُم بِهِ مِنْهُنَّ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَةً وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا تَرَاضَيْتُم بِهِ مِن بَعْدِ الْفَرِيضَةِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا } (٢٤) سورة النساء
অর্থাৎ, উল্লেখিত নারিগণ ব্যতীত আর সকলকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হল; এই শর্তে যে, তোমরা তাদেরকে নিজ সম্পদের বিনিময়ে বিবাহের মাধ্যমে গ্রহণ করবে, অবৈধ যৌন-সম্পর্কের মাধ্যমে নয়। অতঃপর তোমরা তাদের মধ্যে যাদের (মাধ্যমে দাম্পত্যসুখ) উপভোগ করবে, তাদেরকে নির্ধারিত মোহর অর্পণ কর। মোহর নির্ধারণের পর কোন বিষয়ে পরস্পর রাযী হলে তাতে তোমাদের কোন দোষ হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (ঐ ২৪ আয়াত)
{فَانكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ مُحْصَنَاتِ غَيْرَ مُسَافِحَاتِ وَلَا مُتَّخِذَاتِ أَخْدَانٍ} (٢٥) سورة النساء
অর্থাৎ, সুতরাং তারা (প্রকাশ্যে) ব্যভিচারিণী অথবা (গোপনে) উপপতি গ্রহণকারিণী না হয়ে সচ্চরিত্রা হলে তাদের মালিকের অনুমতিক্রমে তাদেরকে বিবাহ কর এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে তাদেরকে তাদের মোহর প্রদান কর। (ঐ ২৫ আয়াত)
পণগ্রহীতা সমাজ-বিরোধী লোক। যেহেতু পণের ছোবলে মেয়ের মা-বাবা নিঃস্ব হয়, পণ দিতে না পারলে সংসারে তাকে নানা গঞ্জনা ও অত্যাচার চোখ বুজে সহ্য করতে হয়। অনেক সময় অনেক বধূ আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে তাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয় অথবা খুন করা হয়।
পণের অভিশাপে অনেক যুবতীর বিবাহ যথাসময়ে হয় না, ফলে সমাজে ব্যভিচার বৃদ্ধি পায়, বৃদ্ধি পায় জারজ সন্তান ও ভ্রূণ হত্যা। আর তার জন্যই তা আইন-বিরোধীও।
পণপ্রথার কারণেই সমাজে নারী অবহেলিতা। সন্তানের আশাধারী অধিকাংশ পিতামাতাই কন্যাসন্তান চায় না। অনেকে পরীক্ষা করিয়ে ভ্রূণ অবস্থাতেই তাকে হত্যা করে ফেলে! আর এ অবস্থায় সে জাহেলী যুগের বর্বর মানুষদের মত জাহেলী কাজ করে।
মেয়ে উপহার দিয়ে উপকারের বিনিময়ে শ্বশুর তার জামায়ের নিকট থেকে প্রাপ্ত হয় যৌতুকের বিষফুল! অথচ আল্লাহর কুরআন বলে, "উপকারের বিনিময় উপকার ব্যতীত আর কি হতে পারে?” (সূরা রাহমান ৬০ আয়াত)
পণের প্ররোচনায় পড়ে মেয়ে বাবার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিতা হয়।
অনেক ক্ষেত্রে পণ গ্রহণ করে স্বামী তার বিবির গোলাম হয়।
অতএব পণ ও যৌতুকে নেওয়া আসবাব-পত্র, টাকা, জমি ইত্যাদি কি মুসলিমদের জন্য বৈধ হতে পারে?
পক্ষান্তরে যে নিরুপায় সে কি করবে? পণ না দিয়ে যদি বিয়ে না-ই হয়, তাহলে ঘুসদাতার পাপ না হলেও পণ ও ঘুসগ্রহীতার পাপ তো হবেই।
📄 হারাম বস্তুর ব্যবসা
ইসলামের একটি চিরন্তন নীতি এই যে, যে জিনিস খাওয়া ও ব্যবহার হারাম, সে জিনিসের ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবসা হারাম। মহানবী বলেন, “অবশ্যই আল্লাহ যখন কোন জিনিসকে হারাম করেন, তখন তিনি তার মূল্যও হারাম করেন।” (মুসলিম ১৫৭৯নং)
আর এই ভিত্তিতেই যাবতীয় হারাম জিনিসের মূল্য ও মুনাফা ভক্ষণ করা হারাম। বলা বাহুল্য, কুকুর, বিড়াল প্রভৃতি হারাম পশু ও বস্তুর মূল্য হারাম। মহানবী (শিকারী বা শিক্ষাপ্রাপ্ত কুকুর ছাড়া অন্য) কুকুর, শূকর, মদ, রক্ত ইত্যাদির মূল্যকে হারাম ঘোষণা করেছেন। (সহীহুল জামে' ৬৯৪৭-৬৯৪৯নং)
তিনি বলেন, “যখন কেউ কুকুরের মূল্য চাইতে আসবে, তখন তার হাতে মাটি ভরে দাও।” (আবু দাউদ, প্রমুখ, সহীহুল জামে' ৪৬৫নং)
অবশ্য প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রাপ্ত ও শিকারী কুকুর ক্রয়-বিক্রয় করা যায়। (সহীহুল জামে' ৬৯৪৬-৬৯৪৭নং)
তদনুরূপ যে হারাম প্রাণী উপকারে আসে; যেমন হাতি, গৃহপালিত গাধা ইত্যাদি ক্রয়-বিক্রয় করা অবৈধ নয়。
একদা এক সম্প্রদায় ইবনে আব্বাস-কে মদ ক্রয়-বিক্রয় ও তার ব্যবসা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে তিনি বললেন, 'তোমরা কি মুসলমান?' তারা বলল, জী হ্যাঁ। তিনি বললেন, 'তাহলে তার ক্রয়-বিক্রয় ও তার ব্যবসা শুদ্ধ নয়। (মুসলিম ২০০৪নং)
বাদ্যযন্ত্র ইসলামে হারাম। হারাম তার মূল্যও। সুতরাং গান-বাজনার সাজ-সরঞ্জামের ব্যবসা করা কোন মুসলিমের জন্য বৈধ নয়।
বৈধ নয় হারাম করা জিনিসকে 'ঘুরিয়ে নাক দেখানো'র মত হালাল করার চেষ্টা করা। মহানবী মক্কা বিজয়ের সময় মক্কায় ঘোষণা করেন যে, "অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রসূল মদ, মৃত প্রাণী, শূকর ও মূর্তির ব্যবসাকে হারাম ঘোষণা করেছেন।” বলা হল, 'হে আল্লাহর রসূল! মৃত প্রাণীর চর্বি সম্বন্ধে আপনার অভিমত কি? যেহেতু তা দিয়ে পানি-জাহাজ ও চামড়া তেলানো হয় এবং লোকেরা বাতি জ্বালায়?' উত্তরে তিনি বললেন, “না, তা হারাম।" আর এই সময় তিনি বললেন, "আল্লাহ ইয়াহুদ জাতিকে ধ্বংস করুন। আল্লাহ যখন তাদের উপর মৃত প্রাণীর চর্বি হারাম করলেন, তখন তারা তা গলিয়ে বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষণ করল!” (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ২৭৬৬নং)
প্রকাশ থাকে যে, যে জিনিস মুসলিমদের কারো জন্য ব্যবহার বৈধ অথবা যা হারাম ও হালাল উভয় কাজে ব্যবহার করা যায় তার ব্যবসা অবৈধ নয়। যেমন স্বর্ণ, রেশমী কাপড়, ভিডিও, টেপ ইত্যাদি। অবশ্য যদি সুনিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, ক্রেতা তা হারাম কাজে ব্যবহার করবে, তাহলে তাকে তা বিক্রয় করা বৈধ নয়।
যেমন আপনাকে যদি কেউ স্বর্ণ উপহার দেয়, তাহলে তা বিক্রয় করে তার মূল্য ভক্ষণ করা অথবা তা কোন মহিলাকে দান বা উপহার দেওয়া হারাম নয়। (দ্রষ্টব্য সহীহ মুসলিম ২০৬৮-২০৭১নং)