📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 জুয়া ও লটারী

📄 জুয়া ও লটারী


হারজিত খেলা জুয়া বা লটারীতে বহু মানুষ হারে, জিতে কম। পক্ষান্তরে খেলা কর্তৃপক্ষ সর্বদাই জিতে ও বহু মানুষের অর্থ লুটে থাকে।
জুয়া ইসলামে হারাম ঘোষণা হওয়ার পশ্চাতে যে যুক্তি ও মহান উদ্দেশ্য আছে তা জ্ঞানী মানুষের কাছে অজানা নয়।

১। মুসলমানের পক্ষে অর্থোপার্জনে আল্লাহর বেঁধে দেয়া নিয়ম ও পথ অনুসরণ করা একান্ত কর্তব্য। কার্যকারণের মাধ্যমে ফললাভ করতে চাওয়া উচিত। ঘরে তার দরজা দিয়েই প্রবেশ করতে হবে, অবলম্বিত কারণ বা কাজের ফল চাইতে হবে -এটাই ইসলামের লক্ষ্য। জুয়া-লটারী ও মানুষের মধ্যে ভাগ্য ও ভিত্তিহীন আশা-আকাঙ্ক্ষার উপর নির্ভরতা গ্রহণের প্রবণতা জাগায়। আল্লাহ অর্থোপার্জনের জন্যে যেসব চেষ্টা-প্রচেষ্টা, শ্রম ও কার্যকারণ অবলম্বনের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন ও আদেশ করেছেন, জুয়া তা গ্রহণের জন্যে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে না।

২। ইসলাম মুসলমানের জন্যে অপর লোকের মাল হারাম করে দিয়েছে। অতএব তার কাছ থেকে তা নেয়া যেতে পারে কেবলমাত্র শরীয়তসম্মত বিনিময় মাধ্যমে অথবা সে নিজের খুশিতে যদি দান করে বা হেবা উপহার দেয় তবেই তা নেয়া যেতে পারে। এ ছাড়া অন্য যে কোন উপায়ে তা নেয়া সম্পূর্ণ হারাম এ দৃষ্টিতেই বলা যায়, জুয়া হচ্ছে পরের ধন অপহরণের একটি বাতিল ও হারাম পদ্ধতি।

৩। জুয়া খেলা খোদ জুয়াড়ী ও খেলোয়াড়দের মধ্যে গভীর শত্রুতা ও হিংসা- প্রতিহিংসা সৃষ্টি করে দেয় অতি স্বাভাবিকভাবেই এবং এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। মুখের কথায় ও বাহ্যতঃ মনে হবে তারা পরস্পরের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন, কিন্তু আসলে তাদের মধ্যে জয়-পরাজয়ের দ্বন্দ্ব ও হিংসা-প্রতিহিংসার আগুন দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে প্রতি মুহূর্ত। আর বিজিত (পরাজিত) চুপ হয়ে থাকলেও ক্রোধ, আক্রোশ ও ব্যর্থতার প্রতিহিংসায় সে জ্বলতেই থাকে। কেননা সে বিজিত এবং তার সব কিছুই সে খুইয়েছে। আর যদি সে ঝগড়া ও বাগবিতন্ডা করতে শুরু করে, তাহলে তার অন্তরে সেই চাপা ক্ষোভ তাকে প্রতিশোধ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে তোলে।

৪। খেলায় বাজি হেরে গেলে বিজিত ব্যক্তি (ঋণ করে হলেও) আবার খেলতে শুরু করে। তখন সে আশা করতে থাকে যে, সে যা হারিয়েছে তা তো ফেরৎ পাবেই। সে সেই ধ্যানে মশগুল হয়। অপর দিকে বিজয়ী ব্যক্তির জিহবায় লোভ লেগে যায়, মুখে পানি টস্টস্ করতে থাকে। সে জন্যে সে বারবার খেলতে বাধ্য হয়। আরও বেশী বেশী অর্থ লুণ্ঠনের লোভ তাকে অন্ধ ও অপরিণামদর্শী বানিয়ে দেয়।
খেলার ধারাবাহিকতা এরূপেই অবিচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। জয়ী বা বিজিত কেউ কাউকে ছাড়তে প্রস্তুত হয় না।
এ কারণে জুয়া খেলার নেশা যেমন ব্যক্তির জন্যে বিপদ ডেকে আনে, তেমনি সমাজেও কঠিন বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে। এ নেশা মানুষের শুধু ধন সম্পদই হরণ করে না, তার জীবনটাও বরবাদ করে দেয়।

৫। এই খেলা খেলোয়াড়দেরকে সম্পূর্ণ অকর্মণ্য বানিয়ে দেয়। তারা জীবনে অনেক কিছুই গ্রহণ করে, কিন্তু জীবনকে দেয় না কিছুই। তারা ভোগ করে, উৎপাদন করে না। জুয়াড়ী জুয়া খেলায় এতই মত্ত হয়ে যায় যে, তার নিজস্ব দায়িত্ব-কর্তব্যের কথা সম্পূর্ণ ভুলে যায়। বান্দার প্রতি আল্লাহর আরোপিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। তার নিজের পরিবার, সমাজ ও জনগণের কথা স্মরণ আসা অসম্ভব থেকে যায়। এ ধরণের লোক নিজের স্বার্থের বিনিময়ে তার নিজের দ্বীন-ধর্ম, ইয্যত- হুরমত ও দেশকে বিক্রয় করে দিতেও কুণ্ঠিত হয় না। (এমনকি নিজ স্ত্রীর অলংকার ও ইয্যত বিক্রয় করতে দ্বিধাবোধ করে না।) কেননা, জুয়ার আকর্ষণ এতই তীব্র যে, তার সম্মুখে অন্য কোন আকর্ষণ মুহূর্তের তরেও টিকতে পারে না। উপরন্তু জুয়াড়ীর অন্তরে জুয়া খেলার প্রতি প্রেম ও আসক্তি এত অধিক ও তীব্র হয় যে, সে সব ব্যাপারে ও সব ক্ষেত্রে জুয়া খেলতে শুরু করে দেয়। এমনকি সে এক অনির্দিষ্ট ও অনিশ্চিত উপার্জনের আশায় পড়ে তার নিজের ইয্যত ও মর্যাদা এবং তার নিজের ও গোটা জাতির আকীদা-বিশ্বাসের সঙ্গেও সে জুয়া খেলতে শুরু করে দেয়-এটাই স্বাভাবিক পরিণতি।

কুরআন মাজীদ তার একটি আয়াত ও আদেশের মধ্যে মদ্য ও জুয়াকে একত্রিত করে ও একইভাবে হারাম ঘোষণা করে কত যে উচ্চমানের বাস্তবদর্শিতার প্রমাণ উপস্থাপিত করেছে, তা বিশ্লেষণ করার অপেক্ষা রাখে না। কেননা, এ দুটির ক্ষতি ও মারাত্মক অপকারিতা সমানভাবে প্রবর্তিত হয় ব্যক্তি, পরিবার, দেশ ও চরিত্র সব কিছুর উপর। জুয়ার নেশা মদের নেশার মতই সর্বাত্মক ও মারাত্মক। উপরন্তু এর একটি যেখানে তথায় অপরটির উপস্থিতি অবধারিত। (ডঃ ইউসুফ আল-কারয়াবী প্রণীত 'ইসলামে হালাল-হারামের বিধান' ৩৮৬-৩৮৭পৃঃ)

মহান আল্লাহ বলেন,
((يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِن نَّفْعِهِمَا))
অর্থাৎ, লোকে তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বল, উভয়ের মধ্যে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য (যৎকিঞ্চিত) উপকারও আছে, কিন্তু ওদের পাপ উপকার অপেক্ষা অধিক। (সূরা বাকারাহ ২১৯ আয়াত)

তিনি আরো বলেন,
((يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (۹۰) إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ (۹۱) وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَاحْذَرُوا فَإِن تَوَلَّيْتُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّمَا عَلَى رَسُولِنَا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ)) (۹২)
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ, সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাযে বাধা দিতে চায়! অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না? আল্লাহর অনুসরণ কর ও রসূলের অনুসরণ কর এবং সতর্ক হও, যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রাখ যে, স্পষ্ট প্রচারই আমার রসূলের কর্তব্য। (সূরা মাইদাহ ৯০-৯২ আয়াত)

জুয়া খেলাই নয়, বরং তার প্রতি আহবান করাও মহাপাপ। তার প্রায়শ্চিত্তের সন্ধান দিয়ে প্রিয় নবী বলেন, "যে ব্যক্তি তার সঙ্গীকে বলে, 'এস জুয়া খেলি' সে যেন কিছু সাদকাহ করে।” (বুখারী ও মুসলিম)

সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন আম্র বিন আস-এর মতে এক শ্রেণীর খেলা জুয়ারূপে (অর্থের বাজি রেখে) খেললে শূকরের মাংস খাওয়ার মত পাপ হয় এবং অর্থের বাজি না রেখে জুয়ার মত না খেললেও তা শূকরের রক্তে হাত ডোবানোর মত পাপ হয়। (আল-আদাবুল মুফরাদ ১২৭৭নং)
এই শ্রেণীর খেলা হল, পাশা, দাবা, কিরাম, তাস, কড়ি, ছক্কা, লুডু, গুটি, মার্বেল ইত্যাদি খেলা। অকর্মণ্যদের এমন সময়হন্তা খেলা এমনিই বৈধ নয় ইসলামে। পরন্তু তার উপর অর্থের বাজি রাখলে জুয়ায় পর্যবসিত হয় সেসব খেলা। খেলায় যে জিতবে বা যার পয়েন্ট বেশী হবে সেই জিতবে সকলের তরফ থেকে বাজি রাখা অর্থ। আর জুয়ায় জিতা অর্থ যে হারাম তা বলাই বাহুল্য।

প্রকাশ থাকে যে, ফ্লাশ, নাইন কাট, তিন তাস, জোড়পাতি, কলব্রিজ প্রভৃতি নামে পরিচিত টাকা-পয়সা দিয়ে খেলাও এক এক প্রকার জুয়া খেলা।
টাকা জমা দিয়ে ভাগ্য-পরীক্ষার চাকা (ডাইস) ঘুড়িয়ে অথবা বোতাম টিপে যে কোন খেলা খেলে পুরস্কার জিতা হারাম। যেমন রিং ছুঁড়ে পুরস্কার জিতা বৈধ নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভাগ্যের চাকা বা রিং শূন্যের ঘরেই লাগে। অথবা পরিশেষে নাকের বদলে নরুন মিলে। অনেক সময় খেলা-কর্তৃপক্ষের ধোকাবাজির ফলে ভরা হাত শূন্য হয়ে যায়।
লাখ-কোটি মানুষের মাঝে টিকিট বিক্রয় করে লটারী খেলায় যে পুরস্কার দেওয়া হয়, তাও হারাম। হারাম খেলা-কর্তৃপক্ষের টিকিটের মাধ্যমে জমা করা বাকী অর্থ।
রাজ্য লটারী, থাইলেন্ডী লটারী আর যে লটারীই বলুন না কেন, মুসলিমের ভাগ্যাকাশে ধনবত্তার সূর্য উদিত করার জন্য সেসব বৈধ নয়। ধনী হওয়ার স্বপ্ন বাস্তব করতে তাকে বৈধ কর্ম ও ব্যবসার পথই অবলম্বন করতে হয়। লাখ টাকা অর্জনের স্বপ্ন দেখতে গিয়ে এক টাকার টিকিট কাটা যেমন বৈধ নয়, তেমনি বৈধ নয় এক টাকার টিকিট কেটে লাখ টাকা গ্রহণ করা।
পুরস্কারের টাকা মসজিদ-মাদ্রাসায় দান করে দেওয়ার নিয়তেও লটারীতে শরীক হওয়া বৈধ নয়। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৬৪১পৃঃ)
প্রকাশ থাকে যে, বিমা বা ইনশুরেন্সেও এক প্রকার ভাগ্য-লটারী থাকে। আর সেই জন্য তা জুয়ার পর্যায়ভুক্ত কারবার।
আরো প্রকাশ থাকে যে, একই মানের একাধিক বিজয়ীদের মধ্য হতে কয়েক জনের মাঝে কোন বৈধ পুরস্কার বিতরণের জন্য যে লটারী করা হয়, তা অবৈধতার আওতাভুক্ত নয়। লটারীতে যার নাম আসবে, তার জন্য সেই পুরস্কার গ্রহণ করা বৈধ। যেমন কোন কাজ কে আগে করবে তা নিরপেক্ষভাবে দেখার জন্য কৃত লটারীও নিষিদ্ধ লটারী নয়।

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ও তার পুরস্কার

📄 বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ও তার পুরস্কার


১। বৈধ খেলা-প্রতিযোগিতায় বাজি রাখা মালও অবৈধ। অবশ্য খেলায় অংশগ্রহণকারী নয় এমন তৃতীয় পক্ষের তরফ থেকে পুরস্কার হলে সে কথা ভিন্ন। যেমন এই প্রতিযোগিতা উটদৌড়, ঘোড়দৌড় ও তীরন্দাজি (প্রভৃতি জিহাদে কাজ দেয় এমন খেলাতে দুই পক্ষের মধ্যে এক পক্ষের অথবা উভয় পক্ষের অথবা কোন তৃতীয় পক্ষের তরফ থেকে পুরস্কার বাজি রেখে হলেও তা) বৈধ। (আহমদ, সুনান আরবাআহ, সহীহুল জামে' ৭৪৯৮নং)
তদনুরূপ কোন ইল্মী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে তাতে পুরস্কার গ্রহণ দোষাবহ নয়। (আল-মুলাঙ্খাসুল ফিকহী ২/১২৪)

২। পত্রিকায় অনেক সময় অনেক রকম প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়। আসলে তাতে উদ্দেশ্য থাকে প্রতিযোগিতার পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে অধিক অধিক পত্রিকা কাটানো। অনেকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার উদ্দেশ্যেই তা ক্রয় করে থাকে। অতঃপর কয়েকজন পুরস্কার পায় এবং বাকী অবশ্যই তাদের টাকা নষ্ট করে বসে। সুতরাং এই শ্রেণীর প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা বৈধ নয়। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৬৩৭পৃঃ) যেহেতু তা এক প্রকার জুয়ার মতই।

৩। ব্যবসা বা পণ্য-প্রতিযোগিতা: অনেক সময় অনেক ব্যবসায়ী তার পণ্য বেশী পরিমাণে কাটাবার জন্য প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের ব্যবস্থা করে থাকে এবং তাতে শর্ত থাকে যে, এত টাকার মাল কিনলে তবেই সেই প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতে পারবে। ফলে সে দোকানে খদ্দের ও লাভ প্রচুর হয়। পক্ষান্তরে অন্য দোকানে মাল কম বিক্রি হয় এবং সে দোকানদার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ক্রেতাও; যেহেতু অনেক সময় প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও কেবল পুরস্কারের লোভে সেই দোকান হতে মাল ক্রয় করে থাকে। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৬৩৮, ৬৮৪, ৬৯২, ৭১৭পৃঃ) বলা বাহুল্য এটিও একটি জুয়ার মতই কারবার।
হ্যাঁ, যদি প্রয়োজনে মাল কিনতে গিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোন পুরস্কার পাওয়া যায়, তাহলে তা গ্রহণ করায় দোষ নেই।
পুরস্কার পাওয়ার লোভে পত্রিকা বা পণ্য ক্রয় করলে নিষিদ্ধ লটারীতে অংশ গ্রহণ করা হবে। পক্ষান্তরে সে লোভ বা নিয়ত না থাকলে এবং পুরস্কার পণ্যের সাথে এসে গেলে তা গ্রহণ করা বৈধ হবে。

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 তর্কপণ

📄 তর্কপণ


দুই ব্যক্তি কোন বিষয়ে মতভেদ করে তর্কের সাথে বলে, 'আমি যা বলছি তা যদি সত্য বা সঠিক হয়, তাহলে তোমাকে এই এই লাগবে।' এবং যা লাগবে তার নাম নেয়। (অর্থাৎ এত মিষ্টি খাওয়াতে হবে বা এত পয়সা দিতে হবে ইত্যাদি বলে)। 'আর তুমি যা বলছ তা যদি সত্য বা সঠিক হয়, তাহলে আমি এই এই দেব।' এবং যা দেবে তার নাম নেয়। এরূপ বাজি রাখা হারাম। কারণ এ কাজ জুয়ার পর্যায়ভুক্ত, যাকে আল্লাহ তাআলা মদের পাশাপাশি উল্লেখ করে বলেছেন, "হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য-নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর। এতে তোমরা সফলকাম হতে পারবে। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে ও নামাযে বাধা দিতে চায়। অতএব তোমরা কি নিবৃত্ত হবে?” (সূরা মা-য়েদাহ ৯০-৯১ আয়াত) (আসইলাতুম মুহিম্মাহ, ইবনে উসাইমীন, ১৪ পৃঃ)

বলাই বাহুল্য যে, এমন অর্থ গ্রহণ ও ভক্ষণ করা বৈধ নয়।
প্রকাশ থাকে যে, বাজি এক পক্ষভাবে হলে তা পুরস্কারের মত, জুয়ার মত নয়। যেমন, 'তোমার কথা যদি সত্য হয়, তাহলে তোমাকে এত টাকা দেব।' আর সত্য না হলে কেউ কিছু পাবে না। এমন বাজি রাখা বৈধ।

📘 হারাম রুযী ও রোযগার > 📄 ঘুস বা বখশিস

📄 ঘুস বা বখশিস


ঘুস খাওয়া একটি মহা অন্যায় ও বৃহৎ অপকর্ম। অসৎ উপায়ে অপরের অর্থ যে সব উপায়ে আত্মসাৎ করা হয়, তার মধ্যে ঘুস অন্যতম। ইসলামে এই ঘুসকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُواْ بِهَا إِلَى الْحُكَامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ ))
অর্থাৎ, তোমরা একে অন্যের ধন অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং লোকেদের ধন- সম্পদের কিয়দংশ জেনে-শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকগণকে ঘুস দিও না। (সূরা বাক্বারাহ ১৮৮ আয়াত)

يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تَجَرَةً عَن تَرَاضٍ مِنكُمْ وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا ( )
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। তবে তোমাদের পরস্পর রাজী হয়ে ব্যবসার মাধ্যমে (গ্রহণ করলে তা বৈধ)। আর আত্মহত্যা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। (সূরা নিসা ২৯ আয়াত)

আল্লাহর রসূল ঘুষখোর, ঘুষদাতা (উভয়কেই) অভিশাপ করেছেন। (আবু দাউদ ৩৫৮০, তিরমিযী ১৩৩৭, ইবনে মাজাহ ২৩১৩, ইবনে হিব্বান, হাকেম ৪/১০২-১০৩, সহী আবু দাউদ ৩০৫৫নং)

ঘুষকে বখশিস, পারিতোষিক, উৎকোচ, আউট ইনকাম, উপহার বা উপঢৌকন যাই বলুন না কেন, অবৈধ সম্পর্ক ও ব্যভিচারের নাম 'প্রেম' বা 'ভালোবাসা' রাখলে, সূদের নাম 'লভ্যাংশ' বা 'ইন্টারেষ্ট' রাখলে, মদের নাম 'সুরা' বা 'শারাব' রাখলে, গান-বাদ্যের নাম 'রূহের খোরাক' রাখলে, বেশ্যা ও কসবীর নাম 'যৌনকর্মী' রাখলে লোভনীয় ও পবিত্র নামে যেমন তা বৈধ হতে পারে না; তেমনিই ঘুসও নব ও সভ্য নামে সেই ঘুসই এবং তা সর্বনামে হারাম ও অবৈধ।

যে কাজ করা মানুষের কর্তব্য, সে কাজ পারিতোষিক ছাড়া না করলে ঘুস খাওয়া হয়। যে কাজ মানুষের করা অন্যায়, তা টাকার বিনিময়ে করলে ঘুস খাওয়া হয়। অর্থের লোভে পরের বাপ-মা বা দাদা-দাদী সেজে অভিভাবকত্ব করা কিছু লিখে দেওয়া।
টাকার বিনিময়ে অন্যায়ের সহযোগিতা করা এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা হতে না দেওয়া। মালের বদলে মিথ্যা সাক্ষী দেওয়া। অর্থের বিনিময়ে সত্য সাক্ষি গোপন করা। মালের বদলে সত্য গোপন করা।
মালের বদলে অপরাধী না ধরা, বরং অপরাধীর পৃষ্ঠপোষকতা বা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা; বিষধর সাপের মুখে জড়ি পড়লে যেমন সে শান্ত হয়ে যায়, জোঁকের মুখে লবণ পড়লে যেমন জোঁক গলে যায়, কুকুরের মুখে মাংস পড়লে যেমন সে চুপ হয়ে যায়, ঠিক সেই রকম শক্তিধর রক্ষকদের মুখে অর্থ পড়লে তারা শক্তিহীন হয়ে যায়। অনেক সময় রক্ষকই ভক্ষকরূপে সর্বনাশ করে দুর্বল জন-সাধারণের।
মালের বদলে অন্যায়ের প্রতিবাদ না করা। কর্মস্থলে নির্দিষ্ট বেতন আছে, তার পরেও বখশিস ছাড়া কর্তব্য পালন না করা। এ সকল কাজ হল ঘুসখোরদের। ইঙ্গিতে ভিক্ষা করে ঐ শ্রেণীর ভদ্র ভিখারীরা। সাধুর বেশে চুরি করে ঐ শ্রেণীর হারামখোরেরা। সাধারণ নাচার মানুষের নাচার অবস্থাকে সুবর্ণ সুযোগ হিসাবে ব্যবহার করে অর্থ ভক্ষণ করে ঐ শ্রেণীর হাঙ্গরেরা।

যেখানে ঘুস চলে, সেখানে আইন স্তব্ধ। যেখানে টাকা কথা বলে, সেখানে হক চুপ থাকে। যেখানে টাকার দাপ, সেখানে সাত খুন মাফ। যার আছে টাকা, তার সব পাপ ঢাকা! যার নাই টাকা, তার সব কথাই ঢাকা! টাকা যার, মামলা তার। ঘুসখোরদের শ্লোগান হল, 'ধনীর মাথায় ধর ছাতি, নির্ধনেরে মার লাথি।' পক্ষান্তরে বেতনভোগী কর্মচারীদের কাজের উপর কোন প্রকার উপহার ও হাদিয়া নেওয়া বৈধ নয়। যেহেতু তাতে উপহার-গ্রহীতার যেমন অর্থলোভ বৃদ্ধি পাবে, তেমনি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করায় মনে শিথিলতা আসবে।

মহানবী আযদের ইবনে লুতবিয়্যাহ নামক এক ব্যক্তিকে যাকাত আদায় করার কাজে কর্মচারী নিয়োগ করেছিলেন। সে ব্যক্তি (আদায়কৃত মাল সহ) ফিরে এসে বলল, 'এটা আপনাদের (বায়তুল মালের), আর এটা আমাকে উপহার স্বরূপ দেওয়া হয়েছে।' এ কথা শুনে আল্লাহর রসূল উঠে দন্ডায়মান হয়ে আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করে বললেন, "অতঃপর বলি যে, আল্লাহ আমাকে যে সকল কর্মের অধিকারী করেছেন তার মধ্য হতে কোনও কর্মের তোমাদের কাউকে কর্মচারী নিয়োগ করলে সে ফিরে এসে বলে কি না, 'এটা আপনাদের, আর এটা উপহার স্বরূপ আমাকে দেওয়া হয়েছে!' যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে তার বাপ-মায়ের ঘরে বসে থেকে দেখে না কেন, তাকে কোন উপহার দেওয়া হচ্ছে কিনা? আল্লাহর কসম! তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোন জিনিস অনধিকার গ্রহণ করবে সে কিয়ামতের দিন তা নিজ ঘাড়ে বহন করা অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে। অতএব আমি যেন অবশ্যই চিনতে না পারি যে, তোমাদের মধ্য হতে কেউ নিজ ঘাড়ে চিঁহি-রববিশিষ্ট উট, অথবা হাম্বা-রববিশিষ্ট গাই, অথবা মে-মে-রববিশিষ্ট ছাগল বহন করা অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করেছ।”
আবু হুমাইদ বলেন, অতঃপর নবী তাঁর উভয় হাতকে উপর দিকে এতটা তুললেন যে, তাঁর উভয় বগলের শুভ্রতা দেখা গেল। অতঃপর বললেন, “হে আল্লাহ! আমি কি পৌঁছে দিলাম?” (বুখারী ৬৯৭৯, মুসলিম ১৮৩২নং, আবু দাউদ)

যাকাত আদায়কারী কর্মচারীকে উপহার দেওয়ার পিছনে উপহারদাতাদের এই স্বার্থ ছিল যে, তাদের যাকাতের হিসাব গ্রহণে সে সরলতা বা শিথিলতা অবলম্বন করবে। ফলে তাদের অনেক সম্পদ রক্ষা পেয়ে যাবে। আসলে এটা যে ঘুস তাতে কোন সন্দেহ নেই। আর সেই জন্য এ কাজ উপহার দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের জন্য ক্ষতিকর ও হারাম।
তদনুরূপ কোন নেতা, পদস্থ অফিসার, ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী, প্রশাসন বিভাগের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাকে কার্যোদ্ধারের জন্য যে হাদিয়া বা উপহার দেওয়া হয়, তা আসলে খেয়ানতের মাল। তা তাঁদের জন্য গ্রহণ করা বৈধ নয়। মহানবী বলেন, "রাষ্ট্রনেতাকে দেওয়া হাদিয়া হল খেয়ানত (করা মাল)।” (সহীহুল জামে' ৭০৫৪নং)
তিনি আরো বলেন, “যাকে আমরা বেতন দিয়ে কর্মচারী নিযুক্ত করেছি, সে যদি তার পরেও কোন কিছু গ্রহণ করে, তাহলে তা হবে খেয়ানত।” (আবু দাউদ, হাকেম, সহীহুল জামে' ৬০২৩নং)

একটি লোক চাকরি করে এবং মাসিক হারে বেতনও পায়। এখন কোন কাজে খুশ হয়ে যদি কোন ব্যক্তি তাকে অতিরিক্ত বখশিস দেয়, তাহলে তাও নিজের জন্য গ্রহণ করা বৈধ নয়। কাজ সুন্দর দেখে বেতনভোগী কর্মচারীকে দেওয়া অতিরিক্ত বখশিস মালিকের প্রাপ্য। অবশ্য মালিক গ্রহণে অনুমতি দিলে কর্মচারীর জন্য তা হালাল। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৫৬৫পৃঃ)
তদনুরূপ কারো কোন কাজে সুপারিশ করে তার নিকট থেকে উপহার গ্রহণ করলেও এক প্রকার ঘুস খাওয়াই হয়। বরং হাদীস শরীফে এই উপহারকে এক প্রকার বৃহৎ সূদ বলে আখ্যায়ন করা হয়েছে। মহানবী বলেন, "যে ব্যক্তি নিজ ভায়ের জন্য কোন সুপারিশ করল, অতঃপর তাকে কোন উপহার প্রদান করা হল এবং সে তা গ্রহণ করল, সে ব্যক্তি আসলে সূদের দরজাসমূহের এক বড় দরজায় উপস্থিত হল।” (আবু দাউদ ৩৫৪১, সিলসিলাহ সহীহাহ ৩৪৬৫নং)

ঘুস দানে ও গ্রহণে অনেক সময় অপরের হক নষ্ট হয়। সরকারী হক, জনসাধারণের হক অথবা কোন ব্যক্তি বিশেষের হক।
বহু লোক কিছু পাওয়ার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একজন পরে এসে ঘুস দিয়ে তা আগে পেয়ে গেল। ক্ষতিগ্রস্ত হল তারা, যারা ঘুস দিতে পারল না।
একজন সরকারী কোন মাল পাবে ৫ কেজি। কিন্তু ঘুসের বর্কতে অনেকে পেল ১০ কেজি। ক্ষতিগ্রস্ত হল সরকার এবং অনেক জনসাধারণও।
চাকরির জন্য ইন্টারভিউ কল করা হল। চাকরি হবে যোগ্যতার বলে। যার যোগ্যতা বেশী, সেই চাকরির বেশী যোগ্য। কিন্তু যে ঘুস দিতে পারল, চাকরি তারই হল। ক্ষতিগ্রস্ত হল যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ।
বলা বাহুল্য, ঘুস দিয়ে চাকরি নেওয়া বৈধ নয়। যেহেতু তাতে অপেক্ষাকৃত যোগ্য লোক বঞ্চিত থেকে যায়।
তদনুরূপ বৈধ নয় কারো ব্যাকিং নিয়ে চাকরী গ্রহণ করা; যদি বুঝা যায় যে, এই ব্যাকিং ও সুপারিশের ফলে সে অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও চাকরী পেয়ে যাবে এবং তার থেকে অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন লোক ঐ চাকরী থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৫৬৮পৃঃ)

ঘুস যেমন খাওয়া হারাম, তেমনি তা দেওয়াও হারাম। কিন্তু নিজ অধিকার আদায় করতে অন্য কোন উপায় না পেয়ে ঘুস দিতে নিরুপায় হলে, বিনা দোষে কারো পক্ষ থেকে আগত যুগ্ম বন্ধ করার জন্য ঘুস দেওয়া ছাড়া অন্য উপায় না থাকলে, নিজের প্রাপ্য হক আদায়ের জন্য ঘুস দিতে বাধ্য হলে, সে ঘুস নিরুপায়ে দেওয়া বৈধ, কিন্তু নেওয়া হারাম।
আমার প্রাপ্য অধিকার আমাকে দেবে না, বদমাশি ও পয়সা খাবার মন। সে ক্ষেত্রে আমি নিরুপায়। পাপী হবে গ্রহীতা। আমি কোন কলেজে ভর্তি নেব, ঘুস ছাড়া উপায় নেই। আমিই ইন্টারভিউ-এর পর চাকরির সর্বাধিক বেশী যোগ্য, কিন্তু বখশিস (ডোনেশন) ছাড়া বহাল হওয়া মুশকিল। এখন কেউ যদি এমনই অনন্যোপায় হয়, তাহলে নিজের ন্যায় সঙ্গত অধিকার আদায় করার উদ্দেশ্যে ঘুস দিতে হলেও দাতা গোনাহগার হবে না; গোনাহগার হবে গ্রহীতা। (ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম ৫৭০পৃঃ) অতএব এ চাকরির বেতনও হারাম হবে না।
ঘুস একটি নোংরা ব্যাধি। ঘুস সৃষ্টি করে যুলম। ঘুসের ফলে সমাজে বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি হয়। ঘুস আনয়ন করে আরো আরো অর্থলোলুপতা। এ ঘুসের টাকা কি হালাল হতে পারে? কোন ঘুসবাবুর দুআ কি কবুল হতে পারে?

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00